What do you think?
Rate this book


84 pages, Hardcover
First published May 1, 1979
যাকে বলে চোখ জুড়ানোর হাজারো এলোমেলোমি। পাহাড়ের গায়ে ধস নেমেছে কোথাও। খিলখিলে হাসির মতো রোদে ভাঁজ খেলানো নানা রঙের মাটির স্তর সেখানে কতো রকমেরই না নকশা টাঙিয়ে রেখেছে। হাতে রঙপেন্সিল পেলে নতুন ইল্টু-বিল্টুরা ঘরের দেয়ালে মনের আনন্দে যেমন দাগকাটা ছবি আঁকে। ধরো, মাথা থেকে রেললাইনের পাটির মতো দুটো পা, কানের ওপর থেকে দুটো হাত, যা মনে আসে তাই।আর কী দারুণ অনন্যসাধারণ সব উপমা!
পাহাড়ের গায়ে ঝামরে উঠেছে কতকটা সেইরকম ঘাস। মাটির ধস নামায় কোথাও ঝুলছে কালো কুচকুচে রাশি রাশি ঘাসের শেকড়। পাহাড়গুলো রোদে এভাবে তাদের চুল শুকোয়।
আমার সবচেয়ে যেটা ভালো লাগে সেটা হচ্ছে প্রকৃতির ভেতরের স্বাধীনতা। এখানে দ্যাখো শতেক জাতের গাছ-গাছড়া হাত ধরাধরি করে কেমন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একজোট পাকিয়ে বেড়ে উঠেছে। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ তারই মাঝখানে উঁকি দিচ্ছে একটা ভোঁতা নাকের ভুঁইফোঁড় আজগুবি ধরনের পাহাড়। ওর ইচ্ছে হয়েছে ও ঠেলে উঠেছে মাঝখানে, কারো কিছু বলার নেই। জঙ্গলভাই তুমিও থাকো আমিও থাকি, আমাদের কারো সঙ্গে কারো কোন বিরোধ নেই। এইভাবে আছে। সবাই এরা ঠিক এমনিভাবে গলা জড়াজড়ি করে যুগ যুগ ধরে আছে। ওদের কাউকে ছাড়া আর কারো চলে না, একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাচ্ছে।
গাছের ফাঁক দিয়ে চেরা চেরা আলো এসে পড়েছে এখানে ওখানে। চারপাশে এলোপাতাড়ি বালিশের ধবধবে ওয়াড় শুকোতে দিয়েছে কেউ, এরকম মনে হয়। বনময় আলো-আঁধারির গা-জড়াজড়ি।
ঝোপঝাড় ডালপালা কেটে পথ করে নিতে হচ্ছে, যেভাবেই হোক এগোতে হবে। অরণ্যরাজ দুজন শহুরে ভূতকে একটু বিপাকে ফেলে রগড় দেখছে, ব্যাপারটা তো আর বেশি কিছু নয়। ... বড় বড় গাছপালাদের নিয়ে কোনো ঝক্কি নেই, ছুটকো ছাটকাগুলোকে নিয়েই যত ল্যাঠা। দু'পা অন্তর হাত বাড়িয়ে রেখেছে, না বাপু, তোমাকে যেতে দেওয়া হবে না, তুমি দাঁড়াও, তোমার বাড়ি কোথায়, কি চাও এখানে, এ রকম সব বায়নাক্কা।
সে এক রাত্রি বটে! কবি হয়ে জন্মালেও বেশ লাভ ছিল। কতো ভাবই না এলো মনে, অতোসব কি মনে রাখা যায়, না বোঝানো যায় সবটুকু পষ্ট করে। ভাবের মতো ভাব এক একটা, কোনোটা হাতির মতো শুঁড়অলা, কোনোটা বা চিতাবাঘের মতো গায়ে টিকে তোলা। ... খুব আপসোসের কথা, কেন যে ডায়েরি লেখার অভ্যাসটা করিনি। ওই অভ্যেস থাকলে ঠিকই লিখতাম, 'একটি স্মরণীয় রাত্রি', কি চমৎকার সব ভাবের যে আনাগোনা হচ্ছিলো। এক একটা ভাব চড়ুই পাখির মতো ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে মগজের ভেন্টিলেটরে আসছিল আর খড়কুটো দিয়ে বাসা বাঁধছিল। কয়েকটা ভাব পালকের মতো হালকা, কিন্তু শিশির-বিন্দুর মতো স্বচ্ছ। এইসব ভাবের মেজাজগুলোও বড় অদ্ভুত।অমন মায়াবী কাব্যিক কিন্তু ভারি মজাদার গল্পকথনে যেন মনে হচ্ছিল পুরো উপন্যাসটাই যদি টুপু ও মামার ট্রেকিং-অ্যাডভেঞ্চারে চলতো ভালো হতো... তবে যেহেতু এটা কিশোর রোমাঞ্চ অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি তাই অবধারিত ভাবে একসময় এলো ভয়ানক দস্যু দল, বুদ্ধিমান সাহসী কিশোর চিক্কো ও কুশল, আর দস্যুদের সাথে সংঘাত। সত্যি বলতে প্রথমার্ধের অতুলনীয় স্বপ্নময় সেই খাগড়াছড়ির তৎকালীন মার্মা অঞ্চলে সভ্যতার সংস্পর্শবিহীন বনজঙ্গল-পাহাড়ে টুপুদের দুর্গম অভিযাত্রা-শিকার করা-বন্য পশুপাখির মোকাবেলা ইত্যাদি পড়ে যে মোহমুগ্ধতায় ডুবে গিয়েছিলাম, দ্বিতীয়ার্ধের ওই একইধরনের গৎবাঁধা দস্যুদের সাথে সংঘর্ষের অ্যাডভেঞ্চারে অতটা মজা পাইনি। বিশেষ করে শেষটা খুবই অকস্মাৎ হয়ে গেছে মনে হয়েছে, এত দুর্দান্ত একটি অভিযানের আরো অন্তত আট-দশ পাতায় গোছানো একটা সমাপ্তির প্রয়োজন ছিল।
"এক একটা ভাব চড়ুই পাখির মত ফুড়ু ফুড়ুৎ করে মগজের ভেন্টিলেটরে আসছিল আর খড়কুটো দিয়ে বাসা বাঁধছিল। কয়েকটা ভাব পালকের মত হালকা, কিন্তু শিশির-বিন্ধুর মত স্বচ্ছ। এই সব ভাবের মেজাজগুলোও বড় অদ্ভুত। যেমন ধরো ফুল, সে তোমার গ্যালাডুলি হোক আর গোলাপই হোক, এরা তো জানোই কোনো শব্দ না করে সুগন্ধ ছড়ায়। ভাবের স্বভাব-ই ওই ধাঁচের।"
'বাংলাদেশ, বল দেখি ছোকরা এর রং?'
ট��পু বললে, 'সবুজ!'
আমি বললাম, 'গুলতাপ্পি মারা হচ্ছে?'
ও দাঁত দিয়ে কুটকুট করে নখ কাটতে কাটতে বললে, 'আচ্ছা আবার বলো তো!'
বললাম, 'বাংলাদেশ বাংলাদেশ।'
ও বিজ্ঞের মতো হেঁড়ে মাথাটি নেড়ে বললে, 'বাংলাদেশ সবুজ। আর যদি একসঙ্গে পরপর দুবার উচ্চারণ করো তবে তার রং লাল।'