মানুষ কি মাটির টানে ফেরে, নাকি মানুষের টানে? এই প্রশ্নকেই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে একদল ঘরছাড়া মানুষ। কৃষিজীবী মানুষ কখনো দেশ ছাড়তে চায় না, সে তার মাটিকে ভালোবাসে। কিন্তু দেশভাগ সেই শিকড় ছিঁড়ে পূর্ব বাংলার এক বিরাট জনপদকে ভাসিয়ে দিয়েছিল স্রোতের শ্যাওলার মতো। দণ্ডকারণ্য থেকে মানা ক্যাম্প, আর সেখান থেকে মরিচঝাঁপির রক্তঝরা ইতিহাস-শিকড়হীন এই মানুষগুলো বারবার চেষ্টা করেছে পাথুরে মাটিতেও ভালোবাসার ঘর বাঁধতে। সভ্যতার মূলধারা থেকে দূরে, নিভৃত অরণ্যগ্রামে এক শ্যাওলা-পুরুষ যখন তার কাঙ্ক্ষিত নারীকে খুঁজে পেতে শুরু করে, ঠিক তখনই আবার বেজে ওঠে ফেলে আসা মাটির মোহিনী ডাক। দীর্ঘ পনেরো বছরের মাঠপর্যায় এবং দুর্লভসাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা এই আখ্যান কেবল রাজনীতির দস্তাবেজ নয়। এটি আসলে একইসঙ্গে দুটি প্রেমের গল্প-একদিকে মাটির সঙ্গে মাটির মানুষের চিরকালীন প্রেম ও বিচ্ছেদ, অন্যদিকে মানুষ ও মানুষীর রসঘন মিলন ও বিরহ। দাঙ্গা আর ইতিহাসের চোরাবালিতে দাঁড়িয়েও যে ভালোবাসা বেঁচে থাকে, ‘শ্যাওলা ভেসে যায়’ সেই অবিনশ্বর অনুভূতিরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
দাঙ্গা আর ইতিহাসের চোরাবালিতে দাঁড়িয়েও যে ভালোবাসা বেঁচে থাকে, ‘শ্যাওলা ভেসে যায়’ সেই অবিনশ্বর অনুভূতিরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের "শ্যাওলা ভেসে যায়" পড়া শেষ হওয়ার পরও উপন্যাসটি যেন আমার ভেতর থেকে শেষ হয়ে যায়নি। বরং তার রেশ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে স্মৃতির অলিন্দে, ঠিক যেন উপড়ে ফেলা কোনো শিকড় মাটির সন্ধানে এখনও নীরবে বেঁচে আছে।
তেরোটি অধ্যায়ে বিস্তৃত এই উপন্যাস কেবল উদ্বাস্তু মানুষের জীবনসংগ্রামের বিবরণ নয়; এটি দেশহারা মানুষের মনোজগতের এক দীর্ঘ, বিষণ্ণ এবং গভীর প্রত্নখনন। প্রতিটি অধ্যায় ইতিহাসের এমন সব চাপা আর্তনাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যাদের কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়নি, যাদের বেদনার কোনো রাষ্ট্রীয় ভাষ্য নেই। আছে শুধু ভেসে থাকার ক্লান্তি, আর একটুখানি নিজের মাটি খুঁজে ফেরার অবিরাম আকাঙ্ক্ষা।
পূর্ববঙ্গ থেকে দণ্ডকারণ্য, মানা ক্যাম্প থেকে মরিচঝাঁপি... স্রোতের টানে ভেসে চলা শ্যাওলার মতোই মানুষগুলোকেও বারবার স্থানচ্যুত করেছে ইতিহাস। তাদের জীবন, অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার আদিম তাগিদ মিলিয়ে এই উপন্যাস এমন এক উপমহাদেশীয় আখ্যান নির্মাণ করে, যার সমাপ্তি শেষ পৃষ্ঠায় নয়, পাঠকের ভেতরে দীর্ঘকাল ধরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
দেশভাগের পর পূর্ববাংলার অসংখ্য মানুষ একবার ভেসে গিয়েছিল। তারপর থেকে যেন আর কোনো মাটিই তাদের সম্পূর্ণ নিজের হয়ে ওঠেনি। ইতিহাস, রাজনীতি, রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার অদৃশ্য যন্ত্র তাদের বারবার উপড়ে ফেলেছে, ঠেলে দিয়েছে এক অনিশ্চয়তা থেকে আরেক অনিশ্চয়তার দিকে।
সরকারি পুনর্বাসনের নামে দণ্ডকারণ্যে পাঠানো হয় হাজার হাজার উদ্বাস্তুকে। কাগজে যার নাম ছিল পুনর্বাসন, বাস্তবে তা যেন নির্বাসনেরই আরেক রূপ। নদী, কাদা আর সবুজের বাংলার পরিবর্তে অনুর্বর, রুক্ষ ভূমিতে শুরু হয় নতুন জীবন। খাদ্যের সংকট, জলের অভাব, অপরিচিত ভাষা ও প্রতিকূল প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করেও মানুষগুলো বেঁচে থাকে। কারণ মানুষ শুধু জীবন ধারণ করে না, সে বেঁচে থাকার কারণও সৃষ্টি করে। তারা ঘর তোলে, ভালোবাসে, সন্তান মানুষ করে, স্বপ্ন দেখে। আর সেখানেই রাজনৈতিক ইতিহাসকে অতিক্রম করে এই উপন্যাস হয়ে ওঠে গভীর মানবিকতার এক প্রেমকাব্য।
শিবনাথ, সরস্বতী, অনন্ত, রিখি, ঊষা... দাঙ্গা, মৃত্যু, অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রের নির্লিপ্ত নিষ্ঠুরতার মাঝেও যাদের ভালোবাসা, অপরাধবোধ, স্বপ্ন এবং মাটির প্রতি টান অটুট থাকে। নীরোদচন্দ্র, গীতা, সীতামতি, গুমাই, বুধু... প্রত্যেকেই এত জীবন্ত যে তাদের আর নিছক সাহিত্যিক চরিত্র বলে মনে হয় না; বরং ইতিহাসের ভাঁজে হারিয়ে যাওয়া বাস্তব মানুষ বলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়।
উপন্যাসটির গতি ধীর, কিন্তু সেই ধীরতাই তার শক্তি। কারণ লেখক কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং ভূগোলের সম্মিলিত ক্ষতচিহ্নও সমান সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছেন। এমন কিছু ক্ষত, যা চোখে ধরা পড়ে না, অথচ প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের ভেতরে বহমান থাকে।
সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে লেখকের "দেশ" ভাবনার নির্মাণ।
দেশ কি কেবল মানচিত্রের সীমানা, নাকি স্মৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি আর অনুভূতির সমষ্টি?
ঊষার কাছে দেশ মানে ফেলে আসা ভিটে, নদী, বাতাস, পরিচিত জীবন। আর বুধু, যে দণ্ডকারণ্যেই বড় হয়েছে, তার কাছে বাংলা কেবল শোনা গল্পের এক ভূগোল। ফলে একই ইতিহাস বহন করেও দুই প্রজন্মের দেশবোধ সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে ওঠে। এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব উপন্যাসটিকে অন্য এক গভীরতায় পৌঁছে দেয়।
"শ্যাওলা ভেসে যায়" শেষ পর্যন্ত মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের প্রকৃত খলনায়ক সবসময় কোনো ব্যক্তি নয়। অনেক সময় সময়, রাজনীতি, রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার নির্লিপ্ত চক্রই মানুষের জীবনকে সবচেয়ে নির্মমভাবে বিপর্যস্ত করে।
তবু মানুষ শ্যাওলার মতো ভেসে গেলেও তার শিকড়ের স্মৃতি মুছে যায় না। সে সারাজীবন এমন এক মাটির খোঁজ করে, যেখানে একদিন নিশ্চিন্তে থিতু হতে পারবে।
কিন্তু সবার ভাগ্যে সেই মাটি জোটে না।
রয়ে যায় শুধু স্রোতের টান, ইতিহাসের ধূসর সাক্ষ্য, আর সেইসব নামহীন মানুষের দীর্ঘশ্বাস, যারা শেষ পর্যন্ত শুধু একটুখানি জায়গা চেয়েছিল।
◈পটভূমিকা: ➤১৯৪৭ এ দেশভাগের সময় পূর্ব বাংলার উচ্চবিত্তের কিছু বাঙালি পরিবার নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে পশ্চিম বাংলায় স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করে। এরপর ১৯৬৪ ও তার পরবর্তী সময়ে লক্ষাধিক নিম্ন মধ্যবিত্ত উদ্বাস্তু বাঙালি পরিবার মুসলমান বাহিনীর অত্যাচারে ওপার বাংলা থেকে এপারে এসেছিল ঠাঁই খুঁজতে। তাদের তৎকালীন সরকার প্রথমে বেনেদা উদ্বাস্তু শিবিরে এবং পরবর্তীতে মধ্যপ্রদেশের মানা ক্যাম্প থেকে জঙ্গলপ্রধান দণ্ডকারণ্য ও আশেপাশের পাথুরে জমিতে পুনর্নিবাস দেয়। ➤তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রায় ৭০ লক্ষ উদ্বাস্তুদের পাঞ্জাবেই স্থায়ী বাসস্থান দেওয়া হলেও এদিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় ৪০-৫০ লক্ষ বাঙালি উদ্বাস্তুদের শুধুমাত্র জমির অভাবের অজুহাত দিয়ে তৎকালীন ভারত ও রাজ্য সরকারের আদেশে সুদূর মধ্যপ্রদেশের জঙ্গল-পাহাড়ের পাথুরে রুক্ষ ভূখণ্ডে স্থানান্তরিত করা হয় তাও আবার ট্রেনের ওয়াগন এ, গরু-ছাগলের মতো... ধর্ষণ, মৃত্যু ছিল তাদের কাছে নিত্য ঘটনা। পরবর্তীতে মাটির টানে সেইসব বাঙালি উদ্বাস্তুর দল বারবার ফেরার চেষ্টা করেছে পশ্চিম বাংলার মাটিতে; দক্ষিণে সুন্দরবনের দুর্গম দ্বীপভূমি মরিচঝাঁপিতে নিভৃতে একটু আশ্রয় প্রত্যাশা করেছিল এই শেকড়বাকড়হীন মানুষেগুলো... কিন্তু তা কি অত সহজে হওয়ার ছিল! বাঙালির এই কলঙ্কিত ইতিহাসকে আশ্রয় করে এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট বুনেছেন লেখক।
◈বিষয়বস্তু: ➤গল্পটি শুরু হয় ১৯৭৯ সালের মে মাসে। এক বৃদ্ধা ও অসহায় এক দম্পতিকে নিয়ে। কথকের বাড়িতে আশ্রয়ের ভিক্ষা চাইতে আসায় কথকের নরম মনের ঠাকুমা কেন তাঁদের পূর্বপরিচিত এক অসহায় পরিবারকে 'নেমকহারামের রক্ত' - এই তকমা দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তা দেখে খানিক অবাক হয়েছিলেন কথক। যদিও তাঁরা সেই বাড়িতেই আশ্রয় পায়। তারপর আস্তে আস্তে আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় সেই রক্তাক্ত ইতিহাস যা ছারখার করে দিয়েছিল হাজার হাজার বাঙালি পরিবারকে। ➤শুরুতে আমরা মুখুজ্জে পরিবারের ইতিহাস জানতে পারি যার পটভূমিকা দেশভাগের পূর্ববর্তী সময়ে; এবং পরবর্তীতে এই উপন্যাসের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয় পূর্ব বাংলার শীতলক্ষ্যা- কাঁটাবানিয়ার মন্ডল পরিবার। এই উপন্যাসে একদিকে যেমন মাটির প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও বিচ্ছেদের কাহিনী ফুটে উঠেছে ঠিক তেমনই অপরদিকে ফুটে উঠেছে মানুষ-মানুষীর প্রেম ও বিরহের কাহিনীও।
◈পাঠ-প্রতিক্রিয়া: ➥প্রখ্যাত লেখক দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য মহাশয়ের পারদর্শী কলমে এই উপন্যাস যেন তৎকালীন সমাজ ও বাঙালি উদ্বাস্তু সমস্যার এক জ্বলন্ত দলিল; এবং সেইজন্য লেখকের গবেষণার প্রশংসা না করলেই নয়। ➥ঊষা, অনন্ত, শিবনাথ, সরস্বতী, বুধু, রিখি, গুমাই, সীতামতি, নীরদচন্দ্র, গীতা, যোগেন্দ্র, সুগত - এই চরিত্রগুলি যেন সেই সময়ের একাধিক মানুষের কথা বলে আমাদের। লেখক এই চরিত্রগুলিকে যেভাবে বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ➥শ্যাওলা যেমন স্রোতের টানে ভেসে যায় ঠিক তেমনি এইসমস্ত পরিবারও শ্যাওলার মতোই নিয়তি ও সময়ের স্রোতের টানে ভেসে গিয়েছিল দূর-দূরান্তে - এইখানেই উপন্যাসটির নামকরণের সার্থকতা। ➥উপন্যাসটির শেষে লেখক এত সুন্দরভাবে মুখার্জী পরিবার ও মন্ডল পরিবারের দীর্ঘযাত্রার বৃত্তকে সূচনাবিন্দুর সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন... তা সত্যিই অসাধারণ লেগেছে। ➥দণ্ডকারণ্য ও পারিপার্শ্বিক অঞ্চলের উপজাতি সম্প্রদায় এবং তাদের ভাষা, রীতিনীতি, আচার-আচরনের একটা সুস্পষ্ট ধারণাও লেখক দিয়েছেন এই উপন্যাসে - যা প্রথমে অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও পরে বোঝা যায় সমকালীন ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য সেটির প্রয়োজন ছিল। ➥বইটির প্রচ্ছদ খুবই ভালো লেগেছে। দু'একটি মুদ্রণপ্রমাদ বাদ দিলে তেমন আর কিছু নজরে আসেনি।
সীমান্তের ওপারে। অচেনা মাটিতে। কখনও বা এমন এক জীবনের দিকে, যার ঠিকানা সে নিজেও জানে না।
কিন্তু তারপর? তারপর শুরু হয় আসল গল্প।
ঘর হারানোর, পরিচিত মাটি হারানোর, আবার নতুন করে ঘর বানানোর। নিজের বলে ভাবা একটা পৃথিবীকে পিছনে ফেলে অন্য একটি ভূগোলে গিয়ে জীবনকে নতুন করে সাজানোর। আর সেই নতুন ভূগোল যদি হয় দণ্ডকারণ্য?
তাহলে?
পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য যে দণ্ডকারণ্য প্রকল্প তৈরি হয়েছিল, ইতিহাসের পাতায় তার প্রশাসনিক বিবরণ হয়তো পাওয়া যায়। কিন্তু সেই পাতায় কি পাওয়া যাবে অনাত্মীয় মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের অসহায়তা? পাওয়া যাবে নতুন জায়গায় ঘর বাঁধার চেষ্টা? পরিচিত নদী, উঠোন, প্রতিবেশী, ভাষা আর জীবনযাত্রাকে পিছনে ফেলে আসার দীর্ঘশ্বাস?
এইখানেই ‘শ্যাওলা ভেসে যায়’ নিছক ঐতিহাসিক উপন্যাস হয়ে ওঠে না। কারণ ইতিহাস এখানে বাইরে থেকে এসে চরিত্রগুলির জীবনকে ছুঁয়ে যায়নি; বরং চরিত্রগুলির জীবন থেকেই ইতিহাসকে দেখতে হয়।
এই উপন্যাসের নীরদচন্দ্র, গীতা, অনন্ত, উষা, শিবনাথ, সরস্বতী, সীতামতী, গুমাই, রঞ্জন ডাক্তার, বুধুয়া, রিখিদের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। এরা কেউ ইতিহাসের বইয়ের পাদটীকায় থাকা নাম নয়। এরা সেই ইতিহাসের ভিতরে বেঁচে থাকা মানুষ।
কারও মধ্যে আছে হারানোর ক্ষত। কারও মধ্যে নতুন করে দাঁড়ানোর জেদ। কারও মধ্যে অভিমান, কারও মধ্যে অসহায়তা। কোথাও ভালোবাসা, কোথাও ক্রোধ। আর এই সমস্ত কিছুর ভিতর দিয়েই তারা নিজেদের জীবনটাকে টেনে নিয়ে যায়।
রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়। সীমান্ত তৈরি হয়। পুনর্বাসনের পরিকল্পনা হয়। নাগরিকত্বের সংজ্ঞা তৈরি হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পরে একজন মানুষের কী হয়?
তার ঘরের কী হয়? তার সম্পর্কের কী হয়? তার স্বপ্নের কী হয়?
এই প্রশ্নগুলিই উপন্যাসের ভিতরে ধীরে ধীরে আরও বড় হয়ে ওঠে।
আর সেই কারণেই মরিচঝাঁপির প্রসঙ্গ এসে বইটির বেদনা অন্য মাত্রা পায়। দণ্ডকারণ্য থেকে ফিরে আসা মানুষগুলির জীবন সেখানে যেন আবারও ইতিহাসের নির্মম পরীক্ষার সামনে দাঁড়ায়। একবার দেশছাড়া হওয়ার পরেও যদি নিজের মাটি খুঁজে পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত না হয়, তবে ‘পুনর্বাসন’ শব্দটির অর্থই বা কোথায়?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। লেখকও সহজ উত্তর দিতে যাননি। বরং মানুষের জীবনের জটিলতাগুলিকেই জায়গা দিয়েছেন। কারণ উদ্বাস্তু হওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক পরিচয় নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারিবারিক টানাপোড়েন, ভালোবাসা, ঈর্ষা, অভিমান, ভয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
আর এইসবের মধ্যেই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় আলোটি এসে পড়ে ভালোবাসার উপর। এত রক্তক্ষরণ, এত স্থানচ্যুতি, এত হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেও মানুষ ভালোবাসে। সংসার করে। স্বপ্ন দেখে। অন্য একজন মানুষের পাশে দাঁড়ায়। নতুন মাটিতে নিজের জন্য সামান্য একটু জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করে।
হয়তো এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় জেদ। ভেসে গেলেও আবার ঘর বানানোর জেদ। আর এখানেই এসে বইটির নামটা নতুন করে মনে পড়ে।
শ্যাওলা ভেসে যায়।
স্রোত তাকে যেখানে নিয়ে যায়, সে সেখানেই যায়। তার নিজের কোনও গন্তব্য নেই। ঠিক তেমনই ইতিহাসের স্রোতেও কত মানুষকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক আশ্রয় থেকে অন্য আশ্রয়ে ভেসে যেতে হয়েছে।
কিন্তু মানুষ কি শুধু ভেসে যায়?
না।
সে ফিরে তাকায়। সে মনে রাখে। সে ভালোবাসে। সে আবার শিকড় গাড়ার চেষ্টা করে।
"তবে তার এই অপরাধবোধ কিংবা ঊষার কান্না... এর কিছুতেই নিয়তির কিছু এসে যায়নি। তাদের কর্মফলের গণিত তখন এক অবশ্যম্ভাবী ভবিতব্যের নির্দেশ লিখে দিয়েছে তাদের কপালে।"
তেরোটি অধ্যায়ে বিস্তৃত এই উপন্যাসটিকে নিছক একটি উপন্যাস বললে ভুল হবে। এর প্রতিটি অধ্যায় শেষ পর্যন্ত এসে মিশে যায় আর-একটি বৃহত্তর, আরও ভয়ংকর অধ্যায়ে - উদ্বাস্তু জীবনের অধ্যায়ে। দীর্ঘ সময়জুড়ে পূর্ববঙ্গ, দণ্ডকারণ্য, মানা ক্যাম্প, মরিচঝাঁপি, সুন্দরবন - এক মাটি থেকে আরেক মাটিতে ভেসে বেড়ানো কিছু মানুষের জীবনে, এই উপমহাদেশের ইতিহাসে, বাংলার রাজনৈতিক স্মৃতিতে এই অধ্যায়টি এত দীর্ঘ, এত গভীর, যে তার শেষ যেন কোথাও নেই।
শুরুতেই খেয়াল পড়ে বইয়ের নামের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই গভীর রূপক - শ্যাওলা। শ্যাওলাকে তো জল যেদিকে ঠেলে দেয়, সে সেদিকেই ভেসে যায়। দেশভাগের পর পূর্ববাংলার অগণিত মানুষও ঠিক তেমনই ভেসে গিয়েছিল, দেশভাগ তাদের শিকড় ছিঁড়ে দিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় পূর্ণেন্দু পত্রী-র সেই বিখ্যাত লাইন - “আমরা যেন শ্যাওলার, কচুরিপানার নিকট আত্মীয় হয়ে…”। বইয়ের চরিত্রগুলোও যেন ঠিক তাই। তারা কোথাও শিকড় গাড়তে পারে না। স্রোত তাদের বারবার ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তারা নিজেরা কোথাও যেতে চায় না; কিন্তু ইতিহাস, দাঙ্গা, রাজনীতি, রাষ্ট্র, ক্ষমতা - সব মিলিয়ে তাদের ঠেলে দেয় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়।
দণ্ডকারণ্য এই উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি। ভারত সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্পে হাজার হাজার বাঙালি উদ্বাস্তুকে পাঠানো হয়েছিল সেখানে। কাগজে-কলমে সেটা ছিল পুনর্বাসন; বাস্তবে তা ছিল আরেক রকম নির্বাসন। পরিচিত নদীমাতৃক বাংলা থেকে হাজার মাইল দূরে, অনুর্বর জমি, পানীয় জলের অভাব, অপরিচিত ভাষা, অচেনা মানুষ আর কঠিন জলবায়ুর মধ্যে গিয়ে নতুন করে বাঁচতে শেখা। তবু এই মানুষগুলো হার মানেনি। তারা আবার ঘর বেঁধেছে, জমি চাষ করেছে, সন্তান মানুষ করেছে, প্রেমে পড়েছে।
এইখানেই বইটার সবচেয়ে বড় শক্তি। এটি শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, এটি একই সঙ্গে দুটি প্রেমের গল্প। একদিকে মাটির সঙ্গে মানুষের প্রেম - যে মাটি তাকে বারবার ছেড়ে যেতে হয়, তবু সে তাকে ভুলতে পারে না। অন্যদিকে মানুষ ও মানুষীর প্রেম - যে প্রেম দাঙ্গা, উদ্বাস্তু জীবন, অনিশ্চয়তা, মৃত্যু, রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতার মধ্যেও টিকে থাকে। শিবনাথ-সরস্বতী, বুধু-রিখি, অনন্ত-ঊষাদের সম্পর্ক তাই নিছক ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়। এই মানুষগুলো যখন ভালোবাসে, তখন তারা আসলে বাঁচতে চায়। কিন্তু ঠিক তখনই আবার বাজতে শুরু করে “ফিরে যাওয়ার” ডাক।
তাই বইয়ের একদম কেন্দ্রে রয়েছে “দেশ” কথাটার অর্থ। বইটা শুধু হারানো দেশের গল্প নয়, বরং “কোন দেশ সত্যি নিজের?” - এই প্রশ্নেরও গল্প। দেশ কি কেবল জন্মভূমি? দেশের ভাষা, লোকাচার, পূজা, ব্রত, উৎসব, মানুষের সঙ্গে মনের সম্পর্ক তৈরি না হলে সেই মাটির সঙ্গে সত্যিকারের যোগ গড়ে ওঠে না। বুধুর চরিত্রটা এই প্রশ্নের সবচেয়ে বড় উত্তর। তার ঠাকুমা ঊষা, বাবা-মা বাংলা ফেরার স্বপ্ন দেখে। কারণ তাদের কাছে বাংলা মানে শৈশব, হারানো ভিটে, পরিচিত আকাশ। কিন্তু বুধুর কাছে বাংলা কেবল একটা গল্প। যেখানে সে বড়ো হয়েছে সেই বন, সেই মানুষ, সেই উপভাষা, সেই উপজাতি জীবনই তার নিজের। ফলে সে যখন শুনতে পায় যে তাকে সব ছেড়ে বাংলায় ফিরে যেতে হবে, তখন তার যন্ত্রণাটা অন্যরকম। কারণ দেশ মানে শুধু মানচিত্র নয়, দেশ মানে স্মৃতি, গন্ধ, মানুষ, প্রেম, অভ্যাস। সাধারণত উদ্বাস্তুদের গল্পে আমরা প্রথম প্রজন্মের যন্ত্রণা দেখি - যারা নিজের দেশ হারিয়েছে। কিন্তু এখানে দ্বিতীয় প্রজন্মের যন্ত্রণাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যারা নতুন মাটিতেই শিকড় গেড়ে ফেলেছিল, তাদেরও আবার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। এই দ্বন্দ্বটাই বইটাকে এত অসাধারণ করে তোলে।
কিন্তু ‘শ্যাওলা ভেসে যায়’-এর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এই যে, এটি শুধু উদ্বাস্তু জীবনের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা দেখায় না; সেই যন্ত্রণার পিছনের রাজনীতি, রাষ্ট্র, ইতিহাসকেও নির্মমভাবে উন্মোচন করে। আর এখানেই “কর্মফল” কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মরিচঝাঁপির অংশগুলোয় এই বিশ্বাসঘাতকতা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। উদ্বাস্তুরা ভাবে - এবার তারা নিজের দেশে ফিরেছে, এবার তাদের আর কেউ তাড়াবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে, এ দেশও তাদের চায় না। বইয়ের প্রশাসনিক অংশগুলো তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সুগত মুখার্জি, রাইটার্স বিল্ডিং, মুখ্যমন্ত্রীর আবেদন, পুলিশের ঘেরাও, সাহায্য আটকানো, ১৪৪ ধারা, খাদ্যের অভাব - এই সবকিছু দেখিয়ে লেখক বুঝিয়ে দেন, কীভাবে উদ্বাস্তুরা ধীরে ধীরে মানুষের জায়গা থেকে সরে গিয়ে “সমস্যা”, “ঢল”, “ম্যানেজ করার বিষয়” হয়ে ওঠে, কীভাবে “নিজের দেশ”-ও তাদের কাছে আরেকটি কারাগার হয়ে ওঠে।
তবে এত রাজনৈতিক, এত ইতিহাসঘন বই হওয়া সত্ত্বেও ‘শ্যাওলা ভেসে যায়’ কখনও শুষ্ক হয়ে ওঠে না। কারণ এর ভিতরে সবসময় মানুষ আছে। নীরদচন্দ্র, গীতা, অনন্ত, ঊষা, শিবনাথ, সরস্বতী, সীতামতী, গুমাই, রঞ্জন ডাক্তার, বুধু, রিখি - প্রতিটি চরিত্র এত জীবন্ত যে তারা কেবল সাহিত্যিক চরিত্র বলে মনে হয় না। মনে হয়, এরা কোথাও সত্যিই ছিল। হয়তো এখনও আছে। তাদের রাগ, অভিমান, ক্ষুধা, লজ্জা, হতাশা, প্রেম - সব এত বাস্তব যে পাঠক তাদের থেকে দূরে থাকতে পারে না।
কিছু দৃশ্যের বর্ণনা বেশ সিনেম্যাটিক, কিন্তু কখনোই তা বাড়াবাড়ি মনে হয়না। কারণ জীবন নিজেই তো অনেক সময় সিনেমার থেকেও বেশি নির্মম, বেশি অবিশ্বাস্য। হ্যাঁ, বইয়ের কিছু অংশ একটু ধীর গতির। উপজাতিদের জীবন, স্থানীয় সংস্কৃতি, সরকারি কথোপকথন, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ - এই জায়গাগুলোয় গতি কমে। কিন্তু পরে বোঝা যায় সেটা জরুরি ছিল। কারণ লেখক শুধু কয়েকজন মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি দেখাতে চাননি; তিনি সেই ট্র্যাজেডির চারপাশের সমাজ, রাজনীতি, ভূগোল, সংস্কৃতি - সবকিছুকে বুঝতে চেয়েছেন। নতুন মানুষদের আগমনে, দণ্ডকারণ্যে আগে থেকেই থাকা উপজাতিদের টানাপোড়েনের জটিলতাও এই বই এড়িয়ে যায়নি।
‘শ্যাওলা ভেসে যায়’ আসলে ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা এক দীর্ঘ, রক্তাক্ত, অথচ ভীষণ মানবিক সময়ের দলিল। যে ইতিহাস আমরা বইয়ে দু’লাইন পড়ে পাশ কাটিয়ে যাই, কিন্তু যার ভিতরে ছিল অনন্ত, ঊষা, সরস্বতী, বুধুদের মতো মানুষ। যেখানে প্রকৃত খলনায়ক কোনও ব্যক্তি নয়, খলনায়ক হল জীবন, সময়, রাজনীতি, রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দ্বিচারিতা বইয়ের সেই স্তরটিকে আরো তীব্র করে তোলে।
পড়া শেষ হলেও শেষ হয়না। একটা কথাই মনে থাকে - মানুষ হয়তো সত্যিই শ্যাওলার মতো ভেসে যায়। কিন্তু তার ভিতরে কোথাও একটা শিকড় বেঁচে থাকে। সেই শিকড় খুঁজে ফেরে ভালোবাসা, মানুষ, আর একটা নিজের মাটির। থেকে যায় বুধুর সেই পিছু না-ফিরে চলে যাওয়া, কিংবা মরিচঝাঁপির দিকে ছুটে যাওয়া মানুষেরা - যারা শেষ পর্যন্ত শুধু একটু জায়গা চেয়েছিল।
লেখক মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে সম্ভবত গোটা বইটাই লিখে ফেলেছেন। এই স্কেলের একটা এপিক বই যিনি ছয়মাসের কম সময়ে লিখে ফেলতে পারেন, তাঁর অতিমানবিক কলম ও লেখার দক্ষতাকে সেলাম না করে উপায় নেই।
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের লেখা আবারও মুগ্ধ করে দিলো, আর সেই সাথে বুকের ভেতর এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে দিয়ে গেল। 'শ্যাওলা ভেসে যায়' উপন্যাসটি শেষ করার পর সত্যি বলতে শব্দ হারিয়ে যায়, মনটা বড্ড ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে।
উপন্যাসটির নামকরণ একশো ভাগ সার্থক ও অর্থবহ। জলস্রোতে যেমন শ্যাওলার নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা থাকে না, সে কেবল ভেসে চলে অনিশ্চয়তার দিকে—ঠিক তেমনই লেখক এখানে 'শ্যাওলা'কে ভিটেমাটিহীন, উদ্বাস্তু মানুষের রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। স্বদেশের টানে, একটু স্থায়ী আশ্রয়ের আশায় এই মানুষগুলো দিগ্বিদিক ছুটে চলেছে। আমরা যারা নিজের ভিটেতে শান্তিতে বাস করি, তারা কতটা ভাগ্যবান—উপন্যাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা এই বাস্তুহারা মানুষের আর্তনাদ না পড়লে হয়তো তা উপলব্ধি করা যেত না। এরা তো জন্মসূত্রে উদ্বাস্তু ছিল না; এদেরও একটা দেশ ছিল, ঘর ছিল, স্বাদের আঙিনা ছিল। কিন্তু রাজনীতির কুটিল চাল আর ভাগ্যের বিদ্রূপে তারা রাতারাতি নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে গেল, রাজনীতির দাবার চালের পুতুল হয়ে রইল।
তেরো অধ্যায়ের এই উপন্যাসে লেখক সহজ-সরল ভাষার বুননে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনটি প্রজন্মের জীবনসংগ্রাম, মাটির টান আর ভালোবাসার আকুতি।
অনন্ত – ঊষা: যাদের ভিটেছাড়ার ব্যথার ওপর দাঁড়িয়ে শুরু হয় এই উচ্ছেদ কাহিনি।
শিবনাথ – সরস্বতী: যারা মাঝের প্রজন্মে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইটা চালিয়ে যায়।
বুদ্ধিনাথ (বুধু) – রিকি: নতুন প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি, যারা সমস্ত ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়েও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে।
মুখার্জি ও মণ্ডল পরিবারের জীবন কীভাবে রাজনীতির চালে আর নিয়তির টানে একবিন্দুতে এসে মিলে যায়, তা পড়তে পড়তে বুকের ভেতর এক চাপা কষ্ট ও ক্ষোভের জন্ম নেয়। মনে হয়, দিনশেষে নিয়তি যেন তার খেলা সম্পূর্ণ করল। বুধু ও রিকির হাত ধরে নতুন যাত্রার সূচনা গল্পে খানিকটা আশার আলো দেখায়।
উপন্যাসের অন্যতম শক্তিশালী ও বেদনাদায়ক দিক হলো মানা ক্যাম্প এবং দণ্ডকারণ্য (দণ্ডক) ক্যাম্পের যন্ত্রণাক্লিষ্ট দিনগুলোর চিত্রায়ন। দেশভাগের পর ঘরছাড়া মানুষগুলোকে কীভাবে মানা ক্যাম্পের পশুর মতো পরিবেশে কিংবা দণ্ডকারণ্য রুক্ষ, অচেনা প্রান্তরে এনে ফেলে রাখা হয়েছিল—লেখক তা অত্যন্ত নিষ্ঠুর সততার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। কোনো রকমে ত্রাণের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা, একটু মানবিক মর্যাদার লড়াই এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার সেই রক্তাক্ত দলিল পড়তে পড়তে পাঠক হিসেবে নিজেকেও অপরাধী মনে হয়।
গল্পে সুগত চরিত্রটি এবং তার পারিবারিক প্রেক্ষাপট বাস্তুচ্যুত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে খুব চমৎকারভাবে সামনে আনে। পূর্ববঙ্গ ছেড়ে আসার পেছনে সুগতর মায়ের চোখে যে ক্ষোভ ও রাগ ছিল—বিশেষ করে ঊষা ও অনন্তর ওপর তাঁর জমতে থাকা সেই উষ্মা—তা কেবল ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাগ নয়, তা ছিল সর্বস্ব হারানোর এক প্রকাশ্য আক্রোশ। ভিটেমাটি ছেড়ে আসার জন্য কাউকে না কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার এই মরিয়া চেষ্টা রিফ্রিউজি মানসিকতার এক করুণ ও বাস্তব ছবি। অন্যদিকে, এই দুই প্রজন্মের টানাপোড়েন ও ক্ষোভের মাঝে দাঁড়িয়ে সুগত চরিত্রটি পুরো গল্পের আবেগের পাল্লাকে আরও ভারী করে তোলে।
'শ্যাওলা ভেসে যায়' কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি আমাদের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের দলিল। রাজনীতির খেলায় সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর জীবন কীভাবে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়—দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য তা আমাদের অনুভূতির গভীরে পৌঁছে দিয়েছেন। বইটির শেষ পাতা বন্ধ করার পরেও মানা ক্যাম্পের ধুলো আর উদ্বাস্তু মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাস বহুক্ষণ তাড়া করে বেড়ায়।
যাঁরা ইতিহাসের চালচিত্রে মানবের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক আবেগ পড়তে ভালোবাসেন, তাঁদের হৃদয়ে এই উপন্যাস দীর্ঘস্থায়ী দাগ কেটে যাবে।