অমিয়েন্দ্র পড়ার পরপর ই অপেক্ষায় ছিলাম কখন অমিয়েত্রা বের হবে । মাঝে মাঝে কিছু জায়গাতে মনে হয়েছে বাড়তি লেখা । কিন্তু কাহিনীটা খুবই চমত্কার । আর ভৌতিক আবহটা বরাবরের মতই পারফেক্ট ।
পৈত্রিক সূত্রে চট্টগ্রামের মানুষ। যদিও বান্দরবান, ঢাকা আর সিলেটেই থাকা হয়েছে জীবনের বেশির ভাগ সময়। বাবা মোঃ আয়ুব ও মা ফাহিমা পারভীন রিতা। একমাত্র বড় বোন শারমিন আক্তার শিমু। পড়াশোনা করেছি চট্টগ্রাম টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে। বিএসসি শেষ করে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছি চট্টগ্রাম এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনের একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। ছোটবেলা থেকেই আঁকা আঁকির সাথে ছিলাম। ঘটনাক্রমে লেখক হয়ে গেছি। দুটো শখ মানুষের কখনো থাকে না একসাথে। তবুও মাঝে মধ্যে নিজেকে আঁকিয়ে, কখনো বা লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে আনন্দ পাই। নিজের সম্পর্কে এটুকুই।
আগেরবার বলেছিলাম লেখকের বৃষ্টির উপর সামান্য দুর্বলতা আছে। কথা পুরাপুরি সত্য নয়। লেখকের সম্ভবত বৃষ্টির উপর ভয়ানক অবসেশন আছে। উপন্যাসের বেশির ভাগ পাত্র পাত্রী রে সুযোগ পাইলেই কারনে-অকারনে বৃষ্টিতে ভেজানো হয়েছে৷ ভাগ্য ভালো চরিত্র গুলার বিদ্রোহ করার সুযোগ নাই নাহলে লেখকের এরকম অত্যাচারের কারণে পাত্র পাত্রীরা হয়তো লেখকের নামে মামলা করে দিতো। সত্যি কথা বলতে কি আমার মনে হয় লেখকের ঝড় বৃষ্টি নিয়া কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। শৈশবে বৃষ্টির দিনে হয়তো ফুটবল খেলতে গিয়ে পিছলে পা ভেঙে যাওয়া কিংবা ঝড়ে আম কুড়াতে গিয়ে গাছের মালিকের দৌড়ানি খাওয়া এরকম টাইপ কোন ঘটনা লেখকের জীবনে বড় একটা প্রভাব ফেলতে পারে৷ ( আমি নিশ্চিত নই। এটা একটা হাইপোথিসিস মাত্র) কোন বিদেশি লোক রে এই বই পড়ানো হইলে তার খবর ছিলো! সে ধরেই নিতো বাংলাদেশে বর্ষাকাল ছাড়া অন্য কোন ঋতু নাই। এই দেশের লোকজন ছাত্তি ছাড়া ঘর থেকে বের ই হয় না। কি আর বলবো! এমনকি লেখক কাউকে গাল দিলেও বর্ষাকালের ব্যাঙ এর সাথে তুলনা করেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মনে হয়েছে দেশে একটাই আছে৷ হয় ঝড় হয় বৃষ্টি আর নাহয় বিদ্যুৎ চমকানো। এতো বৃষ্টি কবে হইলো ভাই? দেশে তো অনেকদিন ধরেই আছি কই এমন তো নজরে পড়লো না। তিরিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ার পর ভাবছিলাম যাক এবার মনে হয় বৃষ্টি ফৃষ্টির ঝামেলায় লেখক যান নাই।ধুম করে একত্রিশ পৃষ্ঠাতেই শুরু হয়ে গেলো তুমুল ঝড়বৃষ্টি। কি এক যন্ত্রণা! বেশ কয়েকবার ঝড়ে উড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলায় নিয়েছি। আমার পরামর্শ -- যারা এই বই পড়বেন অবশ্যই একটা রেইনকোট পিন্ধা কোন শক্তপোক্ত গাছ জড়ায় ধরি পড়বেন। ঝড়ে উড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। আই রিপিট ঝ-ড়ে উ-ড়ে যা-ও-য়া-র স-মূ-হ স-ম্ভা-ব-না
অবশেষে শেষ হল !! অনেক দিন এরকম মোটাসোটা কোন বাংলা বই পড়ি নি থ্রিলার বাদে । বইটা নিয়ে প্রতিক্রিয়া যদি বলতে হয়, তবে বলব মিশ্র প্রতিক্রিয়া কিন্তু ভালো লাগার পরিমাণ টাই বেশী । আসলে আমি খুব সহজেই মুগ্ধ হয়ে যাই । তাই আমাকে খুশী করতে দুই একটা ভালো চরিত্র, একটা চলনসই প্লট আর সহজ সাবলীল ধরণের লেখার ধরণ ই যথেষ্ঠ । তবে এই বই এর প্লট টা কেবল চলনসই না, একদম ভালোরকম চলনসই । ভালোবাসার গল্প অবশ্যই, কিন্তু তা ছাপিয়ে মূল প্লটটা অতিপ্রাকৃতিক । এই জন্যে আরো বেশী ভালো লেগেছে । অবশ্য এই অতিপ্রাকৃত টুকু ভালোমত বুঝতে আমাকে একটা জায়গা বেশ কয়েকবার করে পড়তে হয়েছে । কিন্তু পয়সা উশুল শেষ পর্যন্ত । বই এর কাহিনী সংক্ষেপ বলা খুব সহজ না – কারণ আপাতদৃষ্টিতে জীবনধর্মী উপন্যাস গুলোতে বলার মত তেমন কিছু থাকে না । বই এর মূল প্রোটাগোনিস্ট একজন ই – কান্তা । তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে সমস্ত বই । কিন্তু কান্তার পাশাপাশি আরো অনেকগুলো মূল চরিত্র এসেছে একদম শুরু থেকে । বই এর শেষ দিকে গিয়ে পাওয়া যায় অ্যান্টিহিরো কে । তবে তার কার্যকলাপ কেও দোষারোপ করা যায় না তার নিজের দিক থেকে চিন্তা করলে । গল্পের বিল্ড আপ বেশ যত্ন করে করেছেন লেখক, অন্তত অমিয়েন্দ্র থেকে ভালো হয়েছে । সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে শেষ দিকে মূল অংশে প্রবেশ করেছেন । ম্যাটার আর আন্টিম্যাটার এর ব্যাপারটাও ভালো লেগেছে । বই এর কতগুলো লাইন অসাধারণ । কয়েকবার করে পড়েছি । আর লেখকের অতিপ্রাকৃতিক দৃশ্য গুলো বর্ণনা করার ধরন টাও ভালো লেগেছে । সব কিছুর মধ্যেই একটা বাঙ্গালী বাঙ্গালী ভাব ছিল । কাহিনী কোথাও কোথাও একটু ঝুলে গেলেও লেখকের লেখার কারণে শেষ পর্যন্ত ভালোই লেগেছে । এবার আসি একটু খারাপ লাগাটুকু তে । বইটাতে একটা জিনিস অবশ্যই চোখে পড়বে- সেটা হল একটু পর পর কবিতার ব্যাবহার । প্রথম দিকে খারাপ না লাগলেও শেষ পর্যন্ত একটু বাড়াবাড়ি ই মনে হয়েছে । আর অনেক ক্ষেত্রেই কবিতার প্রয়োজন ছিল না । কারণ উপন্যাস পড়তেই বসেছিলাম , কবিতার বই নয় । সব শেষে লেখককে ধন্যবাদ । আশা করি সামনের বই গুলো এর থেকেও ভালো হবে ।
সাধারণত সমসাময়িক লেখকেদের বই নিয়ে কিছুই বলতে চাইনা, কেননা সেটা তারা কোনও কারণে সহ্য করতে পারেনা। কিন্তু তবুও বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। কেননা এগুলো না বলে কেবল গল্পকে একটা রেটিং দিয়ে দায় সারলে তা ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবেনা। অথচ অনেকে তাই-ই করে। বলে বই জঘন্য, কেন সেটা বলেনা। বলে বই ভালো, কিন্তু কি কি কারণে ভালো সেটা ভাঙ্গে না। এসব লেখকের জন্য নিদারুণ কষ্টের হয়। নিজেকে দিয়ে বুঝি, তাই জানি।
দেশীয় বইতে একটি বস্তুর সমূহ অভাব রয়েছে। সেটা হচ্ছে যথার্থ সম্পাদক। বিদেশে এই জিনিশ বাইপাস করা যায় কেবলমাত্র সেলফ পাবলিশড বই হলে, অন্যথায় নয়। কিন্তু বাংলাদেশে কোনও কারণে বইয়ের সম্পাদনায় খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়না। (কিছু কিছু ব্যক্তিক্রম ব্যাতিত।)
এই বইতে কিছু জিনিশ বার বার এসেছে এবং সেটা মাত্রাতিরিক্ত, এই বিষয়টি নিঃসন্দেহে একজন ভালো সম্পাদকের চোখে পড়তো এবং তিনি বই প্রকাশের পূর্বে লেখককে সেগুলো পরিমার্জন করার উপদেশ দিতেন। আমি এটা বলছিলনা যে সেসব জায়গার লেখা খারাপ হয়েছে, কিন্তু সচেতনভাবে যদি একবার আপনার চোখে বিষয়টা ধরা পড়ে যায় তাহলে পরবর্তীতে যথেষ্ট বিরক্তির উদ্রেক করে সেটাই।
উদাহরণ হিসাবে বলা যায় - বৃষ্টি, চাঁদ, কবিতা, প্রভৃতি।
বইটিতে এতোবার বৃষ্টির কথা এসেছে যে মনে হয় বৃষ্টি ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনও পরিস্থিত নেই। হ্যাঁ, কাহিনী অবশ্যই বর্ষাকালে হতে পারে, কিন্তু তাই বলে বার বার তার বর্ননা দেবার কি প্রয়োজন? অনেকগুলো দৃশ্যে ব্যাপারটা সামলে নিয়ে অন্যভাবে বলা যেত। একই কথা বলা যায় চাঁদের ক্ষেত্রেও। রোজ রাতে চাঁদ আকাশে উঁকি মারবে এমন কোনও কথা নেই, সেই চাঁদ বরাবর নীল হবে এমনও কোনও কথা নেই। কয়েকবার অবশ্য লালও হয়েছে। পরিশেষে এমন পরিস্থিত হয়েছে যে রাতে আকাশে তাকালেই একটা চাঁদ দেখা যাবে এবং সেই চাঁদ রহস্যময়তা কিংবা বিচিত্রতা নির্দেশ করবেই। আর কবিতা? জত্রতত্র!! এখানেও ঘোর আপত্তি রয়েছে। একটা বইয়ে কবিতা অবশ্যই থাকতে পারে, একটি কিংবা দুটি চরিত্র কবিতা লিখতেও পারে ঘন ঘন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অনেক চরিত্রই যখন কবি হয়ে উঠে, তখন ভালো লাগেনা। কবিতা হতে হবে সঙ্গতিপূর্ণ এবং পরিমিত, যাতে ভাব প্রকাশ পায় এবং পরিস্থিতির সাথে খাপ খায়। উপরন্তু আমি একটি উপন্যাস পড়তে বসেছি, কবিতার বই নয়, এই কথাটি মাথায় রাখতে হবে।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় হুমায়ূন আহমেদ এর 'কবি' বইটির কথা, যেটা ছিলই কবিদের নিয়ে, কিন্তু তারপরেও অমিয়েত্রার মতো এতো কবিতা সেখানে দেখা যায়নি, এবং কবি চরিত্রের বাইরেও কবিতার স্বল্পতা লক্ষণীয়।
এসব বিষয় নির্দেশনা করা একজন ভালো সম্পাদকের দায়িত্ব। একজন লেখক যখন গল্প লেখেন তখন অনেক খুঁটিনাটি বিষয় তার নজর এড়িয়ে যায়। সেটাই স্বাভাবিক, কেননা গল্প লেখা একটি ধারাবাহিক অনিয়মিত প্রক্রিয়া, যা অনির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে হয়। সুতরাং পূর্ববর্তী অধ্যায়ের সমস্ত খুঁটি নাটি মাথায় নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়না স্বাভাবিকভাবেই। যখন লেখক নিজে প্রাথমিক সংশোধ��� করেন তখনও এসব বিষয় অনায়াসেই এড়িয়ে যায়। তাই এই দোষ লেখককে দেওয়া যায়না। তাই লেখকের কর্তব্য সম্পাদকের সাহায্য নেওয়া, তারপর লেখার প��নরায় সংশোধন করা। যদি নীল গেইম্যান, জে কে রাউলিং, স্টিফেন কিং এর মতো বড় বড় লেখক এডিটরের পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে পারেন, তাহলে আমার মনে হয় আমাদেরও তাতে আপত্তি কিংবা সঙ্কোচ থাকা যৌক্তিক নয়।
[স্পয়ালার এলার্ট]
আরও একটি বিষয় আছে গল্পে যেটা স্বাভাবিক মনে হয়নি। সেটা হচ্ছে বিভিন্ন চরিত্রের একই রকম আচরণ কিংবা বাচনভঙ্গি। রাবেয়ার প্রেমিক, কান্তার প্রেমিক কিংবা, কান্তার চাচাতো ভাই, কিংবা কান্তার ক্লাসমেট ছেলেটির সেন্স অফ হিউমার তদুপরি কথা বলার ভঙ্গি সম্পূর্ণ একই রকম হয়েছে। বিষয়টা ঐচ্ছিক কিনা জানিনা, তবে ঐচ্ছিক হলেও পরিবর্তন করা উচিত।
রাবেয়ার ডায়েরির অংশটিতেও ত্রুটি আছে। শুরুতে সেটা সাল এবং তারিখ উল্লেখ করে লেখা হচ্ছিল। কিন্তু পরের দিকে সেটা বাদ দিয়ে করা হয়, অধ্যায়ের শুরুতে আচমকা গল্প রাবেয়া মুডে চলে যেতে শুরু করে। এখানে ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়োজন ছিল। যদি আচমকা রাবেয়া মুড রাখা হতো তাহলে পুরোটাই রাখা উচিত ছিল, জহর শেখ সেটা পড়া শুরু করেছে সেটা প্রথম দিকে না দেখালেও হয়তো চলতো।
বইতে রয়েছে কিছু তথ্যগত অসামঞ্জস্যতা। যেমন এক পর্যায়ে বলা হয়েছে রাবেয়া কেবল স্বপ্নের থেকে অন্য ধাপে যেতে পারে, পরবর্তী সম্ভাব্যতাগুলোর ছবি দেখতে পারে, কিন্তু কিছু করতে পারেনা। যেটা কান্তা পারে, কান্তা বদলে দিতে পারে, বেঁছে নিতে পারে। অথচ শেষের দিকে দেখা গিয়েছে রাবেয়া নিজেও পারে। এবং কান্তার জন্মের আগেই সেটা করেছে।
বলা হয়েছে মৃত মানুষেরা দেখা দিতে পারবেনা স্বপ্নের জগতে। তাহলে জহর শেখ কিভাবে সিদ্দিক মাস্টারের দেখা পেল? ব্যাখ্যা করা হয়নি। যদি ধরেও নেওয়া হয় জহর শেখ মৃত মানুষদের দেখতে পায়, তাহলে রাবেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি তাকে আগেই দেখতে পেলেন না? আর শেষই বা রাবেয়া কেন আসতে যাবে? যখন ডায়েরিটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা তখন রাবেয়া কেন সেটার সন্ধান নিজে দিলনা? কেন সরাসরি এসে জহর শেখ কিংবা কান্তাকে বলল না মিরাজের ভয়ংকতার কথা? এখানে দুটো ধারা পরস্পর বিরোধী, যদি রাবেয়া মৃত্যুর পরেও ফিরে আসতে পারে, তাহলে তার সব বলা উচিত ছিল, আর যদি সে না বলে থাকে, তাহলে তার মৃত্যুর পরে ফিরে আসা অসম্ভব। যেমনটা অসম্ভব সিদ্দিক মাস্টারের পক্ষে। উপরন্তু সিদ্দিক মাস্টার যদি নিজে রাবেয়ার সাথে বিয়ের আগেই স্বপ্ন জগতে দেখা করতে পারে, আলাপ করতে পারে তাহলে ওরা দুজন কেন আরও সহজ হলনা, কিংবা পরস্পরের অনুভূতি বুঝতে পারলোনা সেটাও যথেষ্ট ঘোলাটে।
রাবেয়া কেন জহর শেখকে বিয়ে করলনা সেটাও গল্পে শেষতক বলা হয়নি। যদি জহর শেখের সুপারন্যাচারাল পাওয়ারের জন্য বিয়ে না করে থাকে, তাহলে তার সিদ্দিক মাস্টারের সাথেও বিয়ে করা যৌক্তিক না। কারণ ওই ভদ্রলোকেরও সুপারন্যাচারাল পাওয়ার রয়েছে।
[স্পয়ালার এলার্ট শেষ]
গল্পের অ্যান্টি হিরো চরিত্র ভালোই লেগেছে। তার কাজের পেছনে যৌক্তিকতা রয়েছে। রহস্যটা একটা ধারাবাহিকতার মধ্যে ছিল আলগোছাভাবে সেটাও শেষে এসে জট খুলেছে মোটামুটি, মন্দ লাগেনি। বিভিন্ন অভিযোগ সত্ত্বেও বলার অপেক্ষা রাখেনা, লেখকের শব্দচয়ন এবং প্রকৃতির বর্ণনা অনবদ্য। লেখার হাত খুবই ভালো। এবং ভবিষ্যতে তিনি আরও ভালো ভালো বই উপহার দেবেন এই আশাই করি। কিন্তু ভদ্রলোকের একজন ভালো এডিটর প্রয়োজন। তাহলেই তার ভালো বইগুলো হয়ে উঠবে কিংবদন্তি।
অমিয়েত্রা মূলত একটি সামাজিক উপন্যাস, আধিভৌতিকতা এখানে আগাগোড়া গৌণ থাকলেও প্রায় শেষের দিকে এসে মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই আধিভৌতিকতা টুকু না থাকলেও গল্প কোনও অংশে খারাপ বলা যেতোনা, বরং ভালোই লাগতো।
উপন্যাসের আকৃতি আমার মোটামুটিভাবে আদর্শ মনে হয়েছে। দেশীয় লেখকদের উচিত এমন বড় বড় উপন্যাস লেখার কাজে হাত দেওয়া। আমাদের পাঠকদের অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে ছোট ছোট উপন্যাস পড়তে পড়তে, যেগুলো আসলে উপন্যাসের থেকে উপন্যাসিকাই বেশি বলা যায়। এই বইটি উপন্যাসিকা নয়, যথাযথ আকৃতির একটি উপন্যাস। তাই উপন্যাসপ্রেমিরা বইটি অবশ্যই পড়বেন, ভালো লাগবে। আর দেখতেই পাচ্ছেন, এতকিছু বলার পরেও রেটিং ৫ এ ৪ দিয়েছি। সুতরাং বাকিটা বুঝে নিন। :D
পাঠক হিসেবে আমি একদমই সাধারণ। মোটামুটি মানের বই হলেই রেটিং ৪ দিয়ে দিই। হাল যুগের পাঠকের মত ব্যবচ্ছেদও করতে পারি না, উপন্যাসের ভুল-চুকও আমার চোখে খুব একটা ধরা দেয় না। কিন্তু এ গল্পে অনেক ফ্ল, লুজ এন্ডস আমার চোখে পড়েছে। মনে হয়েছে লেখকের আরো অনেক কিছু বলার ছিলো। শুরু করে খানিকটা টেনেছিলেনও ভালো কিন্তু শেষ অব্দি গিয়ে আর মেলাতে পারেননি। এবং শেষটা পড়ে মনে হয়েছে তিনি হুমায়ূন আহমেদ দ্বারা বেশ ভালো ভাবে প্রভাবিত। যার ফলস্বরুপ সিরিজের প্রথম বই 'অমিয়েন্দ্র'তে মূল কিন্তু হালকা একটা ক্যারেক্টার এসেছিলো। আসতেই পারে, তবে সেটা 'অমিয়েত্রা'তেও বিদ্যমান। সেই সাথে রয়েছে বৃষ্টি নিয়ে অতি মাত্রার অবসেশান। 'অমিয়েন্দ্র'তে মেনে নিলেও এই বৃষ্টির ব্যাপারটা 'অমিয়েত্রা'তে আমার ঠিক হজম হয়নি। আর এই দুটো জায়গাই গল্পকে একদম দূর্বল করে তুলেছে। তা সত্ত্বেও একটা জিনিস স্বীকার না করলে অন্যায় হবে। তা হলো লেখকের লিখনশৈলী। বৃষ্টির ব্যাপারটা বাদ দিলে তার লেখা নিয়ে আমার তেমন কোন অভিযোগ নেই বললেই চলে (ছোটখাটো গুলো বাদ দিলাম)। তার চরিত্রগুলো বেশ স্ট্রং, রিলেটেবল। ব্যাকস্টোরী পরিপূর্ণ না হলেও যথেষ্ট। বাস্তবে লেখক মানুষ হিসেবে কেমন জানি না, তবে তার সৃষ্টি চরিত্রগুলো বেশ পজিটিভ এবং বুকে বেশ মায়া ধারণ করে। বিশেষ করে মামী চাচী টাইপের চরিত্রগুলো। আর একান্নবর্তী পরিবারের যে ছবিগুলো লেখক এঁকেছেন তা নিঃসন্দেহে মনে ভালোলাগার উদ্রেক ঘটিয়েছে।
সব মিলিয়ে বইটা মোটামুটি ধরণের। হাতে নিলে সময় একদম খারাপ কাটবে না তবে মোটেও মাস্টরিড টাইপের কিছু না।
অমিয়েন্দ্র পড়ে খুব হাই এক্সপেকটেশন ছিল। অমিয়েন্দ্র যদি অদ্ভুত রকমের অসাধারন হয় তাহলে এই বইটা অসাধারন। লেখায় ঠিক কি জানি আছি পড়া শুরু করলে শেষ না করে বই ছাড়া যায় না।আমি সহজেই মুগ্ধ হয়ে যাই। মুগ্ধতার তালিকায় আরো একটা বই যোগ হল।
অনেকটা রিয়েল-লাইফ ফ্যান্টাসিতে বসবাস করার ছবি আঁকে অমিয়েত্রা। হুমায়ুন আহমেদের 'দেবী' কিংবা 'নিশীথিনী'র মতো এক মায়াবী অতিপ্রাকৃত অস্তিত্বের স্থান রয়েছে এখানেও, নাম 'অমিয়েত্রা'। যেখানে দেবী কিংবা নিশীথিনীর সংক্ষিপ্ত ব্যাপ্তি পাঠককে নিজের প্রশ্নগুলোর মাঝে রেখে শেষ হয়, সে জায়গায় লেখক ফরহাদ চৌধুরী শিহাব কাহিনী নির্মাণের সাথে তুলে এনেছেন তিনটি পরিবার ঘিরে কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রদের অতীত এবং বর্তমানকে। কাহিনীর মোড় ঘুরিয়েছেন ধীরেসুস্থে, দৃষ্ট এবং অনুভূতির বর্ণ��া দিয়েছেন যত্ন করে। যদিও 'চোখের সামনে তুলে ধরা'র জন্য তার বর্ণনাভঙ্গি যথেষ্ট লাগে নি, তবু সবসময় মনে হচ্ছিল তার চিন্তাগুলোর সফল চিত্রায়ন করা গেলে তা, যেকোন আধুনিক হরর মুভির মতোই শিহরণ জাগাতে পারতো।
চট করে এসে কাহিনীর দরকারি উপাদান আর গল্পের সাথে হুট করে পড়ে শেষ করে দেওয়া পাঠকদের জন্য অমিয়েত্রা নয়। জুৎ করে বসুন, দখিনবাড়ী গ্রামের মাঝে উত্তরবঙ্গের আবহে মিলিয়ে যান। বাকিটুক��� গল্পই আপনাকে টেনে নিবে, একটানে পড়ে শেষ করতে ইচ্ছে হবে পুরো বই।
সবশেষে অমিয়েত্রা আপনার মাঝে সেই পরিচিত মায়ার অনুভূতিটাই ছেড়ে যাবে, যেমনটা 'দেবী' করতে পারতো। দুই লেখককে পাশে দাঁড় করানোর স্পর্ধা আমার নেই, তবে অমিয়েত্রা যদি সত্যি আপনার চাওয়া বইটা হয়, কখনো আবারও পড়ে দেখার ইচ্ছে আপনার জাগবেই।
আমার মনে হয় হজমে সমস্যা হয়েছে। হজম হইল না বইটা। আমারই হয়ত দোষ৷ কিন্তু তাও নিজের তরফের সাফাইগুলা গেয়ে ফেলি। উপন্যাসের প্লটটা খুব বেশী এবস্ট্রাকট। আমার বুঝতে অনেক সমস্যা হয়েছে। গল্পের সময়কালের হিসেবেও গ্যাঞ্জাম লেগে গিয়েছে অনেক। বাহাদুর শাহের আমলটা হটাৎ করে যেন আকাশ থেকে পড়েছে। আর এসব অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার উৎস, কারণ এবং এগুলার শেষ নিয়ে কিছুই বলা নাই। আর পুরো কাহিনিটাই কেমন যেন রহস্যে মোড়ানো। যেটার কোন উত্তর দেয়া নাই। আরেকটা জিনিসে আমার চোখে পড়েছে যেটা হল গায়ত্রী মন্ত্র জপ করা নিয়ে। হিন্দু ধর্মে উচ্চ বর্ণের লোক ছাড়া অন্য গোত্র গায়ত্রী মন্ত্র জপ করতে পারে না৷ বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলে কোন কামার বাড়ীর লোকের এটা করাটা খুব অস্বাভাবিক৷ জহর শেখ ও কেমনে কি করল কিচ্ছু বুঝলাম না। পজিটিভ জিনিস হইল লেখক ভাল লেখেন। লেখা পড়তে খুব আরাম৷ আর এত বড় বইটা শেষটা ভাল হলে আসলে পড়ার আরামটা স্বার্থক হত।
সমস্যা সমস্যা! লেখকেরা এভাবে কথায় কথায় ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদতে থাকা মেয়েদের গ্লোরিফাই করা শুরু করলে আমার মতো শুকনো-খটখটে মেয়েরা কোথায় যাবে! 😶 আচ্ছা জোকস এপার্ট। ভালো লাগার কথা খানিক বলি। বইটা পড়তে নিলে লেখকের লিখনশৈলীর প্রশংসা অবচেতনেই চলে আসে। বেশ সুখপাঠ্য এবং স্মুথ। পড়তে নিয়ে হুটহাট কোথাও ব্রেক কষতে হয় না, স্পিড ব্রেকারও পড়ে না। একটা বইতে তিনি এত এত চরিত্র আর সাবপ্লট এনেছেন, এটাও একটা প্রশংসনীয় ব্যাপার বটে। এই আলাদা আলাদা সাবপ্লট পড়তে নিয়ে মনে হচ্ছিলো নতুন কোনো বই পড়ছি। ব্যাপারটা এভাবে চিন্তা করলে ভালো, কিন্তু সামগ্রিক বই হিসেবে চিন্তা করা হলে এজন্য আমি ০.২৫ কেটে নেবো। তার কারণ ব্যাকস্টোরি সুস্পষ্ট করতে বেশ কিছু সাবপ্লটের প্রয়োজন থাকলেও আমার মনে হয়েছে এই বইতে সাবপ্লটের আধিক্যই হয়ে গেছে কিছুটা। যার ফলে বেজলাইন ধরে নিয়ে আগাতে খুব হিমশিম খেতে হয়েছে। সেই সাথে শেষে এসে সব চরিত্র পূর্ণাঙ্গতা পেয়েছে এটাও বলতে পারছি না। আরেকটা ব্যাপার, বৃষ্টি নিয়ে যে আক্ষেপ সবার ছিল, আমারও তেমন আছে। বৃষ্টি অবশ্যই একটা আকর্ষণীয় বিষয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিবেচনায়। কিন্তু তাই বলে একটা বইয়ের নব্বই ভাগ ঘটনার বেলায় বৃষ্টি থাকাটা একটু অতিবর্ষণ(!) হয়ে যায়। অমিয়েন্দ্র পড়ার পরপরই এই বইটা পড়তে নিয়ে এই বৃষ্টির বর্ণনায় খানিক বিরক্ত হয়েছিলাম, পড়াতে বিরতিও এনেছিলাম মাঝে। কিছুদিন বিরতি দিয়েছিলাম বলেই হয়তো বইটা পড়ে শেষ করতে পারলাম, নাহলে আর হতো না। এজন্য ০.২৫ কাটা!
তো সব মিলিয়ে ৩.৫ তারা! যারা সামাজিক উপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন তারা দিব্যি পড়ে ফেলতে পারেন। সেই সাথে সায়েন্স ফিকশনের হালকা একটা স্বাদ পেয়ে যাবেন। অমিয়েন্দ্রতে এটার উপর ফোকাস বেশি থাকলেও আমার মনে হয়েছে অমিয়েত্রাতে এই ফোকাসটা সরে এসেছে। জনরা স্পেসিফিক করা যায় না ঠিক, তবে এন্টিম্যাটার আর প্যারালাল ইউনিভার্সের থেকে সামাজিক জীবনের গল্পের দিকে পাল্লা কিছুটা ভারীই ছিল। আর এটা অবশ্যই মন্দ কিছু না।
মায়াময় ভাষা, জটিল ঘটনাক্রম, রহস্যময় নানা চরিত্র, সর্বোপরি এক ব্যাখ্যাতীত ভাবনা - এই ক'টি উপাদানের সমাহারে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাস। এত বড়ো প্যারানরমাল উপন্যাস পড়ার অভ্যাস নেই বলেই প্রথমদিকে মনোযোগের ক্ষেত্রে বড়ো ঘনঘন বিচ্যুতি ঘটছিল। কিন্তু একবার ওই রহস্যময় চরিত্রেরা আমাকে পাপ, অনুতাপ, আর চাওয়া-পাওয়া দিয়ে চিহ্নিত খেলাঘরে ডেকে নেওয়ার পর আমি অন্য কোনোদিকে তাকাতে পারিনি। যদি এমন সুবৃহৎ অলৌকিক আখ্যান পড়ার মতো সময় আর ইচ্ছে থাকে, তাহলে অবশ্যই পড়ুন।
ব্যাখ্যাহীন মিশ্র একটা অনুভূতি। লেখক প্রমাণ করেছেন 'কল্পনা শক্তি মানুষ জাতিত সবথেকে বড় অস্ত্র... '। লেখকের ডিটেলাইজেশান ক্ষমতা, স্টোরি-টেলিং অদ্ভুত সুন্দর। মিশ্র অনুভূতির মাঝে ভালো লাগার পরিমাণ বেশী। প্লটটা দারুণ জীবনবোধের। ভালোবাসার গল্প। সেখানেই শেষ না। তার সাথে আছে অতিপ্রাকৃত ও। এটাকে ক্লাসিকাল অকাল্ট ফিকশান টাইপের অদ্ভুত কিছু বলা যেতে পারে। কারন জনরাটাও এরকম মিশ্র,স্বতন্ত্র নয়। সব কিছু ছাপিয়ে মনঃস্তাত্ত্বিক ব্যাপার-স্যপার, দর্শনও উঠে এসেছে। প্লট ও ক্যারেক্টার বিল্ডাপে রয়েছে যথেষ্ট যত্নের ছোঁয়া। পাশ্চাত্যের কোনো ভাব ই নেই। কপাট বাঙ্গালিয়ানার ছোঁয়া। এসবের সাথে লেখক এক জায়গায় যুক্ত করেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কার জীবন। তখনকার যুগের ভালোবাসা! এ বইটাও থেকে থেকে মনে হচ্ছিলো ঝুলে যাচ্ছে, তবে শেষের দিকে এসে ঠিক হয়েছে কিছুটা। বই এর দার্শনিক উপলব্ধিগুলো এবং সাইন্সের ব্যবহার (ম্যাটার-এন্টি ম্যাটার ব্যাখ্যা) ও দারুণ উপভোগ্য। আমি জানি না কবিতার প্রতি অনুরাগ নেই এইজন্য কি না, শেষের দিকে আসতে আসতে বিরক্ত হয়েছি কবিতার বহুল ব্যবহার দেখে। এটা হতে পারে কবিতা আমাকে টানে কম, এজন্য।
জহর শেখ-রাবেয়া আমাকে ভাবাবে অনেকদিন। চিন্তার রেশে থেকে যাবে দীর্ঘ দিন। রশিদা বানু, আনোয়ার সাহেব, আয়েশা খানম, তমাল- কান্তা চরিত্রগুলোকে আমার মনে থাকবে অনেকদিন। লেখকের জন্য ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা।
অনেকদিন দেখা হবে না তারপর একদিন দেখা হবে। দুজনেই দুজনকে বলব "অনেকদিন দেখা হয়নি।" এইভাবে যাবে দিনের পর দিন। বৎসরের পর বৎসর।
তারপর একদিন হয়ত জানা যাবে, বা হয় জানা যাবে না, যে, তোমার সঙ্গে আমার অথবা আমার সঙ্গে তোমার আর দেখা হবে না...
অতিপ্রাকৃত তবে ভালোবাসার গল্প, মায়ার গল্প। "অমিয়েন্দ্র" পড়েই ঠিক করে ফেলেছিলাম "অমিয়েত্রা" পড়তেই হবে- তবে প্রথম বইয়ের জহর শেখ ছাড়া কারো উপস্থিতি সিক্যুয়েলে নেই। "অমিয়েত্রা" জহর শেখের ছোটবেলার গল্প, তাঁর যৌবনের গল্প, তাঁর প্রথম ভালোবাসার মানুষ রাবেয়ার গল্প, তাঁদের অপরিণত-অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প, রাবেয়ার মেয়ে কান্তার গল্প, কান্তার জীবনের গল্প, দিনশেষে অমিয়েত্রাদের গল্প।
আগেও বলেছি লেখকের লেখনী পড়লেই হুমায়ুন আহমেদের কত প্রভাব বিরাজমান বোঝা যায়। অনেক কবিতার প্রভাব বইতে লক্ষণীয়। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে এতোটা না থাকলেও হত।
রাবেয়া এবং জহর শেখ দুইজনেই প্রিয় চরিত্র। তমালকে কেন জানি ভালো লাগে নি- এটা মনে হয় আরো কম বয়সে পড়লে হতো না, তমালের সাথে হুমায়ুন আহমেদের লেখা অনেক চরিত্রের মিল আমি পেয়েছি~ কান্তার ক্ষেত্রেও টিপিকাল হু.আ. চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। ওভেরাল, ইট ওয়াস আ গুডরিড!
ps. আমার কাছে "অমিয়েন্দ্র" কে ছাপিয়ে যেতে পারে নি "অমিয়েত্রা", যদিও "অমিয়েত্রা"-এর আরো অনেক অনেক ভালো করার অনেক স্কোপ ছিল- :')
বইয়ের নাম: অমিয়েত্রা লেখক: মো. ফরহাদ চৌধুরী শিহাব প্রথম প্রকাশ: ডিসেম্বর ২০১৪ প্রকাশনী: আদী প্রকাশন মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ টাকা পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩৩৫
সংক্ষিপ্ত রিভিউ: কাহিনির শুরু রশিদা বানুর চল্লিশা উপলক্ষ্যে জহর শেখের জমিদার বাড়িতে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে। জহর শেখ আয়েশা খানমের ছোট ভাই৷ জহর শেখ খুব ছোট থাকতে আয়েশা খানমের বিয়ে হয়। বড় বোনের প্রতি অগাধ ভালোবাসার জন্য তাই প্রায়সময়েই বোনের শ্বশুরবাড়িতে এসে থাকতেন। শাশুড়ি রশিদা বানু জহর শেখকে অনেক আদর করতেন। ছোটবেলা থেকেই জহর শেখ বোনের শ্বশুরবাড়িতে নিজস্ব স্নেহের জগত গড়ে তুলেন৷
রশিদা বানুর মেয়ে মেজ মেয়ে রাবেয়াকে জহর ভালোবাসতেন। রাবেয়া কখনো মুখ ফুটে না বললেও জহরের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা প্রকাশ পেয়ে যেতো ছোটখাট ঘটনার মাধ্যমে। পরিবারে কারো অমত ছিল না৷ জহর যখন পারিবারিকভাবে প্রস্তাব আনেন তখন হুট করে রাবেয়া বেঁকে বসে৷ কোনোভাবেই তাকে বিয়ের জন্য রাজি করা যায় না৷ এতে জহর শেখ মারাত্মক মানসিক আঘাত পান ও রাবেয়ার উপর অভিমান করে বিদেশ পাড়ি জমান।
সময় বয়ে যায়৷ জহর শেখ অনেকগুলো বিয়ে করেন৷ রাবেয়া গ্রামের এক স্কুলমাস্টারকে বিয়ে করেন যার পূর্বপুরুষও জমিদার ছিলেন। রাবেয়ার পরিবারে ও শ্বশুড়বাড়িতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে৷ তার দুই পক্ষের পরিবারেই কখনো সদস্যদের সংখ্যা বাড়ে না। অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যু হার সমান থাকে৷ পরিবারে নতুন কেউ আসলে বা জন্ম নিলে কেউ না কেউ সপ্তাহখানেকের মধ্যেই মারা যায়৷ এটা একটা রহস্য হয়ে থাকে বছরের পর বছর৷ অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে রাবেয়া আর জহর শেখ দুজনই অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ। রাবেয়া এই অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমেই তার স্বামীর সাথে পরিচিত হয়৷ সংসারের প্রয়োজনে তাদের দুটি মেয়ে হয়৷ বড় মেয়ে নিশাত সাধারন হলেও ছোট মেয়ে কান্তা একদিন দুর্ঘটনার মাধ্যমে মা-বাবার ক্ষমতার অধিকারী হয়। এ ঘটনার পর থেকে সে পূর্বের সবকিছু ভুলে যায়। তাই মামারবাড়িতে বড় হলেও আগের জীবনের কোনো কথা মনে রাখতে পারেনি৷
কান্তা তার মামাতো ভাই তমালকে প্রচন্ড ভালোবাসে কিন্তু মায়ের মতোই অন্তর্মুখী স্বভাবের কারনে তা প্রকাশ করতে পারে না৷ তমাল সবসময় কান্তাকে ক্ষেপায়। সে কান্তার ভালোবাসার কথা জানতে পেরেও কান্তাকে দূরে সরিয়ে রাখতো নিজের অবস্থানের কথা ভেবে৷ অন্যদিকে তমালের দায়সারা আচরনে কান্তা নিজের চারপাশে দুর্ভেদ্য দেয়াল গড়ে তোলে৷
এমন পরিস্থিতিতে জহর শেখের সাথে কান্তার পরিচয় হয়৷ নিজের মা ও জহর শেখের ভালোবাসার কথা জানতে পেরে কান্তা বিব্রত হয়৷ রাবেয়ার সাথে কান্তার সাদৃশ্য পেয়ে জহর শেখও বিব্রত হন৷ জমিদারবাড়িতে ঘটনাক্রমে লাইব্রেরি ঘেটে রাবেয়ার ডায়েরি পড়ে জানতে পারেন কান্তার বিপদ আসছে৷
জহর শেখ কি পারবেন কান্তাকে বাঁচাতে? কান্তা কি পারবে তমালের সাথে নতুন করে সবকিছু শুরু করতে? জন্ম-মৃত্যু হার দুই পরিবারে একইরকম কেন? কান্তা ও তার মা-বাবার অলৌকিক শক্তি কী ছিল? জহর শেখ কীভাবে জানেন কান্তার বিপদ? জানতে হলে পড়তে হবে "অমিয়েন্দ্রা"।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
পুরো বই মারাত্মক রকমের ভালো লেগেছে৷ ঘটনাগুলো অতীত বর্তমান পাশাপাশি এতো সুন্দর করে দেখানো হয়েছে যে মুগ্ধ হয়ে গেছি। "অমিয়েন্দ্র" বইয়ের সিকুয়্যাল এই বই। যদিও আগের বইয়ের লেখক লেখিকার সাথে এই বইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই৷ তবে জহর শেখকে এই বইতে পেয়ে অনেক ভালো লেগেছে। তমালের ডায়লগগুলো অনেক মজার ছিল। পড়ার সময় মনে হচ্ছিল জহর শেখের যৌবনকালের ডায়লগ পড়ছি৷ তবে এই বইতে কবিতার আধিক্য অনেক বেশি মনে হয়েছে আমার কাছে৷ স্পেশালি জুয়েলের বর্ণনার কোনো প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয়নি৷ এই দুটো দিক ছাড়া বলতে হবে বইয়ের কাহিনি অনেক ভালো লেগেছে। লেখকের লেখা বড় পরিসরের প্রথম বই তাই এইসব ব্যাপার এড়ানো যায়৷ রেটিং দিয়ে আমি আমার ভালোলাগা পুরোপুরি বুঝাতে পারবো না৷ পুরো বই পড়ার সময় মনে হচ্ছিল এরকম কাহিনিই তো চেয়েছিলাম! এতো অল্প পরিসরে ভালোলাগা বুঝাতে পারবো না৷ অতিপ্রাকৃত কাহিনি এমনটাই চাই। আশা করি লেখক ভাইয়া আরো বেশি বেশি এমন বই আমাদের উপহার দিবেন৷
আমি আসলে বই পড়ে কিছু লিখি না। ভালো কোন বই পড়লে শুধু চুপচাপ কিছুক্ষন বসে থাকি। আজও ছিলাম। অমিয়েন্দ্র পড়ে যে এক্সপেকটেশন তৈরি হয়েছিলো লেখক তার মর্যাদা রেখেছেন।
চমৎকার একটা অতিপ্রাকৃত উপন্যাস। অমিয়েন্দ্র পড়ার পর থেকেই এটা পড়ার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। কিন্তু সময়ের অভাবে পড়া হচ্ছিল না। অবশেষে শেষ করতে পারলাম। সিরিজের দুইটা বই-ই ভাল লাগার কারণ এই যে, অতিপ্রাকৃত আবহে লেখা হলেও এগুলোকে দিব্যি সামাজিক উপন্যাস হিসেবে চালিয়ে দেয়া যাবে। পুরো বইয়ের কোথাও গা শিউরানো কিছু নেই। কিন্তু একটা গা ছমছমে ভাব ছড়িয়ে আছে প্রতিটা পাতায়। স্বাভাবিক ভাবেই পড়া শেষে অমিয়েন্দ্র এর সাথে একটা তুলনা চলে আসে। অমিয়েত্রার ব্যাপ্তি বিশাল। সুগঠিত চরিত্রায়ন আর ধাপে ধাপে বুনে চলা কাহিনি অমিয়েত্রার মূল শক্তি। কিন্তু হতাশ হয়েছি ক্লাইমেক্সে গিয়ে। সেদিক থেকে অমিয়েন্দ্রকেই এগিয়ে রাখব। সর্বোপরি, হররপ্রেমিদের অবশ্যই পড়ে দেখা উচিত সিরিজটা।
যে বইটা আপনার পড়তে ভাল লাগবে, সে বইটা শেষ হয়ে যাবার পর মনে হবে: এত তাড়াতাড়ি কেন শেষ হল? আরেকটু বড় হলে কী এমন ক্ষতি হত! অমিয়েত্রা পড়ার সময় বার বার আমার একটাই কথা মনে হচ্ছিল: এতদিন ধরে একটা বই পড়ে যাচ্ছি, তারপরও শেষ হচ্ছে না কেন?
এই বিকট প্রচ্ছদের জন্য ০ ষ্টার দিতে ইচ্ছা করছিল। কত কিছু হতে পারত, একটা চারকোল দিয়ে আঁকা প্রাসাদ, অথবা অনেক লিচু গাছের ভেতরে এক প্রাচীন বাড়ি। সেবা প্রকাশনীর স্টাইল মেনে নেটের ছবি দেওয়ার মানে কি।
হুমায়ুন আহমেদের প্রভাব বাংলাদেশী লেখকদের ভেতর প্রবল। এই বইয়ের পটভূমীর সাথে "নি" এবং "শূন্য " দুইটারই মিল। আমি এই creative influence কে খারাপ কিছু ধরছি না , কিন্ত হুমায়ুন আহমেদের লেখনীর মূল আকর্ষণ এখানে নাই - সংক্ষিপ্ত লিখনি যেটা কাহিনীটা আরেকটু লিখার আগ্রহ জাগায়। এই বইয়ে কবিদের অংশ , কান্তার ক্রাশ এর কাহিনী সম্পূর্ণ অযাচিত লেগেছে। এই অংশ মনে করিয়ে দিয়েছে হুমায়ুন আহমেদের কবিকে।
এই ঢাউস বই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরে জানলাম না কেন জহির শেখ আর কান্তার মায়ের বিয়ে হলো না। জহির শেখের সুপার পাওয়ার কি ? Animagus ? নিউট স্ক্যাম্যান্ডের?
হুমায়ুন আহমেদের নায়িকাদের শুধু চোখে পানি এসে যায় , এখানেও। এত চোখে পানি আসতে থাকলে তো ড্রাই eye এর জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। (ক্রাশ কে ��াছ বেছে খেতে দেখলে কেন চোখে পানি আসবে ? পোলাও খেতে দেখলেও? নাকি খাওয়া সাধে নাই দেখে চোখে পানি আসছে ?)
বইয়ের কাল্পনিক জগতের world building আরো ভালো হতে পারত। আমি কিছু ব্যাখ্যা করব না , এইটাও রহস্য - যথেষ্ঠ না। Why did the "others" choose to manifest in this family? Not some other family?
ভালো দিক হচ্ছে লেখকের লিখার হাত আছে। পারিবারিক সম্পর্কগুলো সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। তবে, উনার বৃষ্টি অবসেশন মাত্রাতিরিক্ত। আমি একজন বাংলাদেশী হয়ে বৃষ্টির ডিটেলস জানতে চাই না। এই বইয়ের বৃষ্টি অংশগুলো একজন বিদেশী বৃষ্টি ফেটিশ ওয়ালা মানুষের ভালো লাগতে পারে।
লেখকের জন্য শুভকামনা। উনি শহুরে জীবন বাদ দিয়ে একটা মফস্বলের প্রেক্ষাপটে Sci-Fi লিখেছেন , এটা প্রশংসার দাবিদার। (Apologies for my bad Bengali)
আগে সামু ব্লগে শিহাব ভাইয়ের লেখা পড়তাম । তবে ওনার লেখার খোজ পেয়েছিলাম ভুতুরে গল্প নামে একটা ফেসবুক পেইজ থেকে । সেখান থেকে সামুতে । একে একে সব গুলো লেখা পড়ে শেষ সেই কবে । একটু আগে শেষ করলাম অমিয়েত্রা । ৩৩৫ পৃষ্ঠার মোটা একটা বই । বেলায় যেদিন প্রথম গিয়েছিলাম সেদিনই বইটা নেড়ে চেড়ে দেখেছিলাম কিন্তু দাম বেশি হওয়ার কারনে কিনি নি । সেই বই কিনলাম মেলার একেবারে শেষ দিন । বই শুরু করতেও আরও কয়েকদিন লেগে গেল ।
মানুষ হিসাবে আমি এমনি এমনি কোনদিন কারো প্রশংসা করি না যদি সত্যি সেটা আমার কাছে ভাল না লাগে । আমার কাছে কেবল মনে হয়েছে অমিয়েত্রা পড়ার সময় আমি অন্য জগতে ছিলাম । এতো লম্বা লেখা অথচ একটুও বিরক্ত লাগে নি । চোখের সামনে যেন প্রতিটা দৃশ্য যেন আমার ভাশছিল । এতো এতো চমৎকার প্লটের উপর লেখা আমি অনেক দিন পড়ি নি ! সব থেকে ভাল লেগেছে অমিয়েত্রার লেখার সমৃদ্ধিটা । এতো সম্মৃদ্ধ লেখা আমি খুব কম পড়েছি ।
শিহাব ভাই, আপনি অবশ্যই লেখা লেখি ছাড়বেন না । কোন ভাবেই না । দরকার হলে অন্য সব কিছু ছেড়ে দিবেন তবুও এইটা ছাড়বেন না ! আপনার আরও লেখা পড়তে চাই ! অনেক বেশি বেশি পড়তে চাই !