জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি
মহিউদ্দিন আহমদ
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে যে রাজনৈতিক দলটি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেটি হচ্ছে জাসদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। এই বইয়ে প্রথমে স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি, জাসদের গঠন, উত্থান, পরবর্তীতে তার অবস্থান জৌলুসহীন হয়ে যাওয়া এগুলো সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
শুরুতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিকা আলোচনা করা হয়েছে। ১৯৬২ সাল থেকেই ছাত্রলীগের মধ্যে একটি 'নিউক্লিয়াস' গড়ে ওঠে, যার কেন্দ্রে ছিলেন সিরাজুল আলম খান। যাদের লক্ষ্যই ছিল সশস্ত্র প্রক্রিয়ায় দেশ স্বাধীন করা।
১৯৭০ এর নির্বাচন এবং ইয়াহিয়া খানের টালবাহানা, গণহত্যা একটি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিল। মার্চ মাসে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে ইয়াহিয়া খানের বৈঠক চলে৷ ২২ মার্চের পর শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ইয়াহিয়া খানের আর বৈঠক হয়নি। ২৪ মার্চ আওয়ামী লীগের একটি দল ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টাদের সাথে বৈঠক হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংশোধনী প্রস্তাব দেয়া হয়, দেশের নাম হবে 'কনফেডারেশন অব পাকিস্তান'। (পৃ ৪১)
এরপর ২৫ মার্চের সামরিক অভিযান ও গণহত্যা শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেই বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং গ্রেপ্তার হন। (পৃ ৪৩)
এরপর তাজউদ্দীন আহমদের প্রধানমন্ত্রিত্বে প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। এ সরকারের সাথে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের দ্বন্দ্ব ছিল প্রকাশ্য। মুক্তিবাহিনীর সমান্তরালে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ (শেখ মনি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক) বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট, বিএলএফ গঠন করেন, যা পরবর্তীতে মুজিব বাহিনী নামে পরিচিতি পায়।
স্বাধীনতার পরে ছাত্রলীগের মধ্যে দুইটি ধারাকে কেন্দ্র করে ভাঙন স্পষ্ট হয়ে পড়ে৷ একটি ছিল সিরাজুল আলম খানের সমাজতান্ত্রিক ধারা, আরেকটি মুজিববাদী ধারা। ২১-২৩ জুলাই ১৯৭২ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিভক্তি হয়ে পড়ে এবং সমাজতন্ত্রপন্থী ছাত্রলীগের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে এই ধারাটিই জাসদ গঠন করেন। ৩১ অক্টোবর ১৯৭২ আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয় এবং ২৩ ডিসেম্বর ১৯৭২ পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। সভাপতি হন মেজর (অব) জলিল, সাধারণ সম্পাদক আ স ম আবদুর রব।
১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের তখন যে পপুলারিটি ছিল তাতে তাদের এমনিতেও জেতার কথা৷ কিন্তু তার পরেও সেই নির্বাচন প্রভাবমুক্ত ছিল না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চারটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে একটি ছিল ভোলায়। সেখানে জাসদের শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন ডা. আজহারউদ্দিন৷ মনোনয়নপত্র জমার দিন তাঁকে অপহরণ করা হয়, শেখ মুজিব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতেন ওই আসন৷ এরকম আওয়ামী লীগের আরো ৬ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। (পৃ ৯৮)। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের বিশ্লেষণ এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। তিনি ৭২ এ বঙ্গবন্ধুর সাথে এক সাক্ষাতে জওহরলাল নেহেরুর উদাহরণ টেনে অপজিশন পার্টির রাজনীতি করার সুযোগ দানের প্রশ্ন তোলেন৷ জবাবে মুজিব বলেন, অপজিশন ৫ টার বেশি সিট পাবে না। অধ্যাপক রাজ্জাক অপজিশনের জন্য ১০০ আসন ছেড়ে দেয়ার কথা বললে শেখ মুজিব হাসলেন৷ এ প্রসঙ্গে জনাব রাজ্জাক বলেন, ইতিহাস শেখ সাহেবরে স্টেটসম্যান অইবার একটা সুযোগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাবার পারলেন না। (পৃ ১০১)
আওয়ামী লীগের সাথে ন্যাপ এবং কমিউনিস্ট পার্টির জোট তৈরি হয়৷ দেশের এহেন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাসদ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে৷ দেশে কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগের শাসনে জাসদ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। তবে জাসদের এই উত্থান মেনে নেওয়ার মতো উদারতা আওয়ামী লীগের ছিল না। ১৯৭৩ এর ৩ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচন হয়। মুজিববাদী ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন একত্রে নির্বাচন করে৷ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়, কিন্তু গণনার সময় যখন দেখা যায় জাসদ ছাত্রলীগ জেতার কাছাকাছি তখন ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া হয়। শেখ কামালের নেতৃত্বে এ কাজ করা হয়। (পৃ ১০৬) এখানেই শেষ নয়, বিভিন্ন হলে জাসদ ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের কক্ষগুলোর তালা ভেঙে লুটপাট করা হয়। পুলিশ গণকণ্ঠ অফিসে হামলা চালায় এবং সাংবাদিক-কর্মচারীদের বিতাড়িত করে দেয়। মাস খানেক পরে টিপু সুলতান রোড়ের একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে গণকণ্ঠ ফের চালু হয়, তবে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যায়। (পৃ ১০৭)
জাসদের রাজনীতিতে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ। এদিন তাদের সমাবেশের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করে তারা। পুলিশ গুলি চালায়, সরকারি প্রেসনোটে বলা হয় ৩ জন মারা গেছে। মাঈনউদ্দিন খান বাদল তাঁর বাবা আহমদউল্লাহ খানের (পুলিশের তৎকালীন তেজগাঁও অঞ্চলের ডিএসপি) কাছে শুনেছিলেন, রক্ষীবাহিনী ৪০-৫০ টি লাশ ট্রাকে করে নিয়ে গেছে। (পৃ ১১১) ঐদিন রাতে পুলিশ গণকণ্ঠ অফিসে হামলা চালায় এবং সম্পাদক আল মাহমুদকে গ্রেপ্তার করে। বাসভবন ঘেরাওয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে নেতৃবৃন্দ বিভক্ত হয়ে পড়েন। এ ঘটনার পর বিভিন্ন স্থানে জাসদের 'সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াড' গঠন করতে থাকে। বিপ্লবী গণবাহিনীর কর্মকাণ্ডও এই ঘটনার পরপরই শুরু হয়। এরপর তারা 'শ্রেণিশত্রু' খতম করতে নামে। অনেক জোতদার, শাসক দলের এমপি এ সময়ে তাদের হাতে খুন হয়।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনী আইন পাস হয়। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার বিলোপ করে রাষ্ট্রপতির শাসন কায়েম হয়৷ ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একটিমাত্র দল বাকশ���ল গঠন করেন। বাকশালে যোগদান করার জন্য সর্বস্তরে হিড়িক পড়ে যায়।
এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এর অন্যতম কুশীলব বজলুল হুদা বলেন, তাঁর দায়িত্ব ছিল বঙ্গবন্ধু মুজিবকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যাওয়া যেন তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেন। হত্যার ব্যাপারটা তিনি জানতেন না। অপারেশনে কার কী ভূমিকা তা রশিদ-ফারুক ঠিক করে দেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর তারা আর কোনো সাক্ষী রাখতে চায়নি, তাই সবাইকে হত্যা করা হয়। (পৃ ১৭৪) এরপর খোন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন।
৩রা নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান হয় এবং জিয়াউর রহমান নিজ বাসভবনে অন্তরীণ হন। ৪ নভেম্বর খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করেন খোন্দকার মোশতাক। ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের পরামর্শমতো বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।
জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হলেও তাঁর বেডরুমের টেলিফোন লাইনটি সচল ছিল। তিনি কর্নেল তাহেরের সাথে যোগাযোগ করতে থাকেন। ৩ নভেম্বরের পর থেকে খালেদ মোশাররফ ভারতের দালাল— এই প্রচার চলতে থাকে সেনানিবাসগুলোতে। এতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন কর্নেল তাহের। জাসদ, বিপ্লবী গণবাহিনী, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পক্ষে প্রচারপত্র বিলি হতে থাকে সেনানিবাসগুলোতে, খালেদ মোশাররফকে উৎখাত করার কথা বলা হয়। কর্নেল তাহের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মাধ্যমে সৈনিকদের বিদ্রোহ করতে বলেন। জিয়ার অনুগামী সৈনিকরা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের দিকে ধাবমান হতে থাকে। ৭ নভেম্বর সৈনিকদের অভ্যুত্থান হয়, জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। খালেদ মোশাররফ নিহত হন।
কর্নেল তাহের জিয়ার নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী সরকার গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। জিয়ার মুক্তির পর তাঁকে নিয়ে রেডিও স্টেশনে ঘোষণা দিতে নিয়ে যেতো চান তাহের, কিন্তু জিয়া বেকে বসেন। তিনি সেনানিবাসে বসেই ঘোষণা রেকর্ড করেন, পরে তা রেডিওতে প্রচার করা হয়। (পৃ ১৯৬) ঢাকা নগর গণবাহিনীর উদ্যোগে একটি সমাবেশে জিয়া ও তাহেরের উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল। জিয়া সেনানিবাস ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান।( পৃ ১৯৭) জিয়াকে নিয়ে করা কর্নেল তাহের এবং জাসদের করা পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
এরপর ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়াউর রহমান। জাসদের অনেক নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার হন। ১৯৭৬ এর ২১ জুন জাসদ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, গণবাহিনী এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ৩৩ জনের বিরুদ্ধে বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হয়। মামলার শিরোনাম ছিল — 'রাষ্ট্র বনাম মেজর জলিল ও অন্যান্য'। অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন কর্নেল তাহের, মেজর জলিল, আ স ম রব, হাসানুল হক ইনু, আনোয়ার হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ। ১৭ জুলাই রায় দেওয়া হল। কর্নেল তাহের, মেজর জলিল, আবু ইউসুফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। মেজর জলিল ও আবু ইউসুফের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২১ জুলাই কর্নেল তাহের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মেজর জলিল কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাঁকে পিজিতে ভর্তি করা হয়৷ জিয়াউর রহমান শাহ আজিজুর রহমানকে সাথে নিয়ে তাঁকে দেখতে গেলে জলিল জিয়াকে প্রশ্ন করেন, হোয়াই ডিড ইয় হ্যাং তাহের? কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিয়া বলেন, তাঁর উপর প্রেশার ছিল। সবাই এটাই চেয়েছিল। (পৃ ২৩৯)
৭ ই নভেম্বরের ব্যর্থ বিপ্লবের প্রভাব জাসদ আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি৷ স্বাধীনতার পরপরই যে দলের সূচনা এবং যারা জনপ্রিয় হয়েছিল, চার বছরের ব্যবধানে তারা জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হতে শুরু করে৷ অনেক জায়গায় তারা জনগণের কাছে ধাওয়াও খায়।
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল স্বাস্থ্যগত কারণে বিচারপতি সায়েম পদত্যাগ করেন এবং জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। জিয়া রাজনৈতিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার আশ্বাস দেন এবং একে একে দলগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। ১৯৭৭ এর ১৭ এপ্রিল জিয়া রাজনৈতিক দলবিধি বাতিল করেন। ১৯৭৮ এর ১ মে থেকে রাজনৈতিক সভা সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়। নিজের শাসনকে বৈধ করার অভিপ্রায়ে ১৯৭৭ সালের ৩০ মে একটি গণভোট আয়োজন করা হয়, জিয়ার পক্ষে ৯৮.৯ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পড়ে। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে নিজেই নিজেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দেন। এর আগে এ অঞ্চলে এরকম ঘটনা একবারই ঘটেছিল, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৯ সালে নিজেকে ফিল্ড মার্শাল হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। (পৃ ২৩৬)
জিয়াউর রহমান নিজস্ব রাজনৈতিক হল গঠনের উদ্যোগ নেন। তিনি জাসদ, আওয়ামী লীগ, ইসলামপন্থী সবার সাথেই আলোচনা চালিয়ে যান। তিনি প্রথমে একটি জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠনের ইচ্ছা পোষণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠন করেন। এরপর ১৯৭৮ সালে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ এর নির্বাচনে বিএনপি ১৯০ টি, আওয়ামী লীগ ৩৯ টি আসন লাভ করে। জাসদ ৮ টি আসন লাভ করে।
জাসদ নেতৃবৃন্দ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তাদের বন্দি নেতাদের মুক্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৮০ সালের ২৪ মার্চ মেজর জলিল মুক্তি পান। আ স ম রব প্যারোলে জার্মানি চলে যান, পরে তার প্যারোল বাতিল করে মুক্তি দেয়া হয়। তিনি ১৯৮০ সালের ১৭ মে ঢাকা আসেন। সিরাজুল আলম খান ১৯৮০ সালের ১ মে মুক্তি পান। ১৯৮১ সালের ৯ মে সিরাজুল আলম খানের সাথে জিয়াউর রহমানের বৈঠক হয়। দীর্ঘক্ষণ তাঁরা বিভিন্ন বিভিন্ন বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়৷ সেটিই ছিল তাঁদের প্রথম এবং শেষ বৈঠক। ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থান জিয়াউর রহমান নিহত হন।
৭ ই নভেম্বরের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ধাক্কা জাসদ সামলে উঠতে পারেনি৷ নিজেদের ব্যর্থতা, নেতৃবৃন্দের কারাগারে যাওয়া, নিজেদের প্রতি বিশ্বাসের অভাব দলের মধ্যে ভাঙন প্রক্রিয়া শুরু করে। জাসদের অনেক নেতৃবৃন্দ জেল থেকে মুক্তির পর পশ্চিম জার্মানি যাওয়া শুরু করেন, তখন পশ্চিম জার্মানি যেতে ভিসা লাগত না। অনেক কর্মী ফিলিস্তিনে গিয়ে পিএলওর সাথে সংগ্রামে এবং প্রশিক্ষণে অংশ নেন। লিবিয়ার গাদ্দাফির সাথে জাসদ নেতৃবৃন্দের সুসম্পর্ক তৈরি হয়, গাদ্দাফির কাছ থেকে তারা ডোনেশনও পাওয়া শুরু করে। কিন্তু নেতৃবৃন্দের মধ্যে অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়, ফলে লিবিয়া ডোনেশন বন্ধ করে দেয়। ডোনেশন মূলত আসত মেজর জলিলের হাত ধরে, তাঁর উপর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। লেখকের মতে জলিল ছিলেন সহজ-সরল মানুষ। তিনি হিরোইজমে আচ্ছন্ন ছিলেন। (পৃ ২৫৬) নিজের প্রতি অভিযোগের জবাবে মেজর জলিল অভিযোগকারীদের নীতি নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের সত্যিকার চেহারা উন্মোচন করার চেষ্টা করেন প্রশ্নবাণে। তিনি লিখিত বক্তব্যে বলেন," মাননীয় বিচারকমণ্ডলী, আজ আপনাদের রায় দিতে হবে আমাদের রাজনীতি বিদেশের ব্যাংকে টাকা রাখা অনুমোদন করে কি না? যখন তখন বিদেশে যাওয়া, বিশেষত, ভারতে যাওয়া অনুমোদন করে কি না? চাঁদার অর্থ দিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন সমর্থন করে কি না?" (পৃ ২৫৯) জলিলের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তিনি নিজেই ১৯৮৩ সালে পদত্যাগ করেন এবং 'জাতীয় মুক্তি আন্দোলন' নামে নতুর দল গঠনের ঘোষণা দেন। ১৯৮৪ সালে উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাসদ আবার ভাঙে৷ ১৯৮৫ সালে শাজাহান সিরাজ আরেকটি জাসদ গঠন করেন, অন্যেরা এরশাদবিরোধী অবস্থান বজায় রাখেন। ১৯৮৬ এবং ৮৮ এর নির্বাচনে জাসদের দুইটি ধারাই অংশ নেয়৷ ১৯৯১ সালে জাসদ (সিরাজ) থেকে একমাত্র শাজাহান সিরাজ জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের নির্���াচনের পর আ স ম রব আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হন৷ ১৯৯৭ সালে জাসদ একীভূত হয়, ২০০১ এর নির্বাচনের পর তা আবার ভেঙে যায়। আ স ম রব আলাদা হয়ে যান। দলের মূল ধারাটি হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে, তারা আওয়ামী লীগের শরিক। ২০০৮ এর নির্বাচনে জাসদ ৩ টি আসন লাভ করে৷ আ স ম রবের নেতৃত্বের জাসদ এখন জেএসডি নামে পরিচিত। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জাসদ ৫ টি আসন লাভ করে। আ স ম রবের জেএসডি নির্বাচন বর্জন করে। (পৃ ২৬৩)
এই বইতে জাসদের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, তৎকালীন রাজনৈতিক পরস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কীভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক দল দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় এবং ভুল কৌশলের কারণে জনবিচ্ছিন্ন এবং ভাঙনের সম্মুখীন হয় তা আলোচনা করা হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্রের আগমন ঘটেছে। নন ফিকশন আমার তেমন পড়া হয় না। এই বইয়ের লেখাগুলা সহজ৷ তাছাড়া বইটিতে ঘটনাপ্রবাহ সিরিয়ালি লেখা হয়েছে। অনেক অজানা জিনিস সম্পর্কে জানতে পেরেছি। জাসদের রাজনীতির উত্থান, বিকাশ, পতন বিশ্লেষণ করা হয়েছে বিভিন্ন রেফারেন্স দিয়ে। দেশের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী থাকলে পড়তে পারেন।