লেখক জিম্বাবুয়েতে যান নজিরবিহীন নিপীড়নে মানুষের দুঃখ, সংঘাত ও মৃত্যু সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করতে। তথ্য সংগ্রহের অভিযোগে তিনি বহিষ্কৃত হন। আবার বিপুল ঝুঁকি নিয়ে ফিরে যান, মেলামেশা করেন হরেক রকম মানুষের সঙ্গে। নিভৃতে নিজেকে প্রশ্ন করেন—হীরা ও স্বর্ণের বিপুল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটি কেন তার চল্লিশ লাখ মানুষের আহার জোটাতে পরছে না? লেখকের সহজ ভাষা, অতুলনীয় রসবোধ আর মানুষের প্রকৃত সত্তা তুলে ধরার ক্ষমতা ভ্রমণগল্পগুলোকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
মঈনুস সুলতানের জন্ম ১৯৫৬ সালে, সিলেট জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে। তাঁর পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি। খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেসের। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার ভিজিটিং স্কলার। শিক্ষকতা, গবেষণা ও কনসালট্যান্সির কাজে বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ‘জিম্বাবুয়ে : বোবা পাথর সালানিনি’ গ্রন্থটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বই হিসেবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৪ সালে ভ্রমণসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরোনো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে মঈনুস সুলতানের।
ভ্রমন সাহিত্য বা ট্রাভেলগ জাতীয় মননশীল লেখা বোধহয় বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি একটা বেশি নেই। এ জাতীয় লেখায় এতদিন পর্যন্ত আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। এখন সেই প্রিয়'র তালিকায় যুক্ত হলেন মঈনুস সুলতান। মজার ব্যাপার হলো, এই দুই ভদ্রলোকেরই আদিনিবাস শ্রীহট।
লেখক গবেষণার কাজে জিম্বাবুয়ে তে ছিলেন দীর্ঘসময়। জিম্বাবুয়ে খনিজসম্পদ আর হীরার খনিতে পরিপূর্ণ এক দেশ কিন্তু সেই দেশেরই নিজ জনসংখ্যার অর্ধেক তথা চল্লিশ লক্ষ মানুষ প্রায় অনাহারে থাকে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ হ্নদয়বিদারক রক্তাক্ত ইতিহাস এবং অবশ্যই স্বৈরাচারী শাসকের কালো হাত। লেখক শুধু নিজ ভ্রমনের সুন্দর সুন্দর স্পটের মনোহারি বৃত্তান্ত লিখেননি; তিনি জিম্বাবুয়ের মানুষের দুঃস্থ অবস্থা,এর পেছনের ঐতিহাসিক কারণ এবং দেশটির সংস্কৃতি তথা দেশের মানুষদের আত্মার স্বরুপ বোঝার চেষ্টা করেছেন। মঈনুস সুলতানের লেখার ভাষা প্রাঞ্জল, সুখপাঠ্য এবং নিজস্ব লেখনশৈলী ধারণ করে। তার লেখায় জিম্বাবুয়ে নামক বিমূর্ত দেশটি মূর্ত হয়েছে তার সমস্ত সৌন্দর্য, আহাজারি ও রিক্ততাসহ। স্বৈরচারের অনাচার পড়তে পড়তে বারবার নিজ দেশের কথা মনে হচ্ছিলো।একদিন এই বাংলাদেশ যেনো দ্বিতীয় জিম্বাবুয়ে তে পরিণত না হয় সেই প্রার্থনা ই জপসিলাম।
জিম্বাবুয়ের মানুষদের অমানবিক জীবনযাপনের ভীড়ে সামান্য বেঁচে যাওয়া মানবিকতা এতো চমৎকারভাবে লেখক তুলে ধরেছেন! মঈনুস সুলতানের বাকি সব বই শীঘ্রই পাঠের আশা রাখি..
মঈনুস সুলতানের ভ্রমণগল্পে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক বলে আমার মনে হয় ভিন্ন ভাষার- বিশেষত আরবি ফারসি উর্দুর-চমকপ্রদ ব্যবহার। ভাষাটি ঠিক আমাদের প্রচলনের বাইরে বলে গড়গড়িয়ে পড়া যায় না ঠিক, একটু থেমে, খানিক বিস্মিত খানিক মুগ্ধ হয়ে অনুধাবন করতে হয় অর্থটাকে। এই অবসরে পাঠকের যেন লেখার ভেতরেও খানিকটা নিবিষ্ট হয়ে ওঠা হয় আরো। এই সিগনেচার স্টাইলের বাইরে যায় নি জিম্বাবুয়ে, বোবা পাথর সালানিনি গ্রন্থটিও।
এই গ্রন্থের বহু গল্পের পট রবার্ট মুগাবের অধীনে জিম্বাবুয়ের আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি, বহু গল্পের পট প্রতি চার সোমত্ত নারী বা পুরুষের একজনের এইডস রোগী হয়ে থাকা নিয়ে। এক শতক পূর্বে কালো মানুষদের ভিটেছাড়া করে রোডেশিয়ায় আস্তানা গেড়েছিলো যারা, সেই শ্বেতাঙ্গদের ওপর এ কালের মুগাবের প্রতিশোধমূলক রাষ্ট্রনীতি নিয়েও এই গ্রন্থের অনেকটা অংশ। প্রেসিডেন্টের ক্যাডারবাহিনি জানুপিএফ হামলা করছে মুগাবের বিরোধী গোত্রের ওপর, তাদের মেয়েদের বিবসনা করে ধারালো অস্ত্রাঘাত করা হচ্ছে, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে এমনকি দশ বছর বয়েসি শিশুও। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা সেইসব শিশুদের কাছে গিয়ে অনেকবার থমকে পড়তে হচ্ছে পাঠককে। পাঠককে থামতে হচ্ছে সে দৃশ্যে, যখন শিক্ষা বিভাগের স্যুটেড ব্যুটেড এক কর্মকর্তা গাড়ির জানালায় এসে ফুলের তোড়া কিনতে কাতর মিনতি করছে লেখককে, কারণ অপরিসীম মুদ্রাস্ফীতি বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার শিশুকন্যার ওষুধ কিনতে।
বাদামী রঙা ঘাস আর দিগন্ত বিস্তৃত নানা আকারের পাথরের মাঝে প্রকৃতি যেমন ঘুরে ঘুরে আসছে বারবার, মানুষও তেমনি মঈনুস সুলতানের থিম হয়ে উঠছে- যখন অন্ধ মা’কে ভিক্টোরিয়া ফলসের ওপর দিয়ে প্লেনে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে টাকা জামানোর কথা বলতে বলতে আনমনা হয়ে ওঠে তার মার্কিনি সঙ্গিনী।
পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে ভাবনা আসে, যদি কখনো কালক্রমে এমন দশায় পড়তে হয় আমাদেরও? প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরেও জীবনের ন্যুনতম চাহিদা মেটাতে যেখানে অপারগ প্রায় অর্ধেক দেশ, যেখানে দলে দলে মানুষ শরণার্থী হয়ে পাড়ি জমাচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে- তেমনটা যদি কখনো সত্য হয়ে ওঠে আমাদের জন্যেও, কী হবে তখন ?
... উত্তর জানা হয় না। যেমনটা জানা হয় না, বছর কয়েক আগেও অস্টিন গাড়িতে চেপে বিলাসবহুল প্রাণখোলা আমুদে ক্যারি লুইস নামের শ্বেতাঙ্গ ভদ্রলোকটি, যিনি জীবনের শেষে এসে সব হারিয়েছেন সাদাদের জমি কেড়ে নেয়ায়, মৃত্যুর কিছু আগে কেনো তিনি লেখকের হাত দিয়ে বয়ে আনান তার শৈশবের ফেলে আসা বাড়ির আঙিনায় লুকিয়ে রাখা ঐ হরিণ আঁকা পাথর খন্ডটি।
কারো লেখার ভঙ্গি যদি অনুকরণ করতেই হয়, তবে ভাষার জাদুকর সৈয়দ মুজতবা আলীর অনুকরণই করা উচিত। মঈনুস সুলতানের লেখনী মুজতবার প্রভাবে উর্বর হয়েছে। মুজতবার ভাষা যেমন আরবি ফার্সি বাংলা সংস্কৃত আঞ্চলিক শব্দের অলংকারে সজ্জিত হয়েও এদের ভার বহন করে সম্পূর্ণ অনায়াসে, খনখন করে না, বরং ঝনৎকার তোলে-- মঈনুস সুলতানের লেখনী অবশ্যই ততটা স্বতস্ফূর্ত হয়ে উঠতে পারেনি। কিছু কিছু জায়গায় তাঁর লেখা আয়াসসাধ্য, কখনো সামান্য ঠেলেঠুলে এগোনো। একই উপমা দু'বার ব্যবহার করে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। তবু মঈনুস সুলতানের লেখনী পড়ার মত। বিদেশী শব্দের বর্ণিল পসরার পাশাপাশি চিত্রাপাকরা, সালুনের কট্টা-- ইত্যাদি আঞ্চলিক শব্দমালা খুব যুতসই ভাবে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। তবে খটকা লাগার মত একটা দিক হলো, প্রায় প্রত্যেকটা সংলাপ একবার ইংরেজিতে একবার বাংলায় লিখতে যাওয়াটা; দুয়েকবার করলে ওটা বেশ কার্যকর স্টাইল, তিন লাইন পর পর করলে বেহদ বিরক্তিকর।
জিম্বাবুয়ে বোবা পাথর সালানিনি সরলরৈখিক ভ্রমণকাহনী নয়। এক অধ্যায়ে আফ্রিকান লেখকদের ছোট্ট মিলনসভায় যোগ দেয়ার ঘটনা। পরের অধ্যায়ে হয়ত প্রায়-কপর্দকহীন অবস্থায় ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির বাজারে পাকস্থলী ভরার চেষ্টার গল্প। ইতস্তত চলার পথে যেখানে কোনো মনে দাগ কাটার মত চরিত্র সামনে এসেছে, তাদের জীবনের সুখদুঃখের ছবি এঁকেছেন লেখক। ছোট ছোট ছড়ানো ছিটানো ঘটনার মধ্যে দিয়ে জিম্বাবুয়ের বর্ণবাদী স্বৈরশাসনের সময়ে সামাজিক অর্থনৈতিক দুর্গতি, রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘর্ষ, নীরব দীর্ঘমেয়াদী নিপীড়ন, এসবই উঠে এসেছে। ৩.৫/৫