শহর কলকাতার বুকে পরপর কয়েকটা বিচ্ছিন্ন অস্বাভাবিক মৃত্যু। মৃতদেহের পাশে কোথাও দেখা গেছে সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরীর বই, কোথাও বা রয়েছে এক বিদেশি ঔপন্যাসিকের জীবনী, কোথাও বা আটকানো এক মার্কিন টেনিস খেলোয়াড়ের ছবি। মানুষ শিকারের জাল পেতেছে এক ভয়ঙ্কর ব্যাধ।
প্রতিশোধ না বিকৃত মানসিকতা?
মোটিভ খুঁজতে নাস্তানাবুদ লালবাজার গোয়েন্দা দপ্তর। ঘটনার সূত্র ধরে চলে আসছে কিছু ক্ষতবিক্ষত শৈশবের স্মৃতি। রহস্যের গোলকধাঁধার পথ ধরে পিছোতে পিছোতে কাহিনি পৌঁছে গেছে গত শতাব্দীর আটের দশকে, টালিগঞ্জের সিনেমা পাড়ায়।
পুলিশ বনাম খুনির সেই চতুরঙ্গ খেলায় গজ, ঘোটক, নৌকা আর বোড়ের ভূমিকায় চিত্রক, রাধা, শৌভিক, দেবারতি, রুদ্র, ব্রজেন, সুনীতা, পামেলা, সুবিমল, প্রফুল্ল, সত্যানন্দ ইত্যাদি নানা রঙের মানুষ।
কিন্তু চৌষট্টি খোপের আসল রাজা আর রানি কারা? অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অগ্নি সেন কি পারবে এই বিষ বাতাসের প্রকোপ থেকে শহরকে মুক্ত করতে?
ব্যোমকেশ বরাবর আমার প্রিয় গোয়েন্দা। তবে লেখকের এই গল্পটি পড়ার পর অগ্নি সেনের ও ভক্ত হয়ে গেলাম...রহস্যের নিকষ অন্ধকার থেকে কিভাবে তিনি আমাদের আলোয় নিয়ে আসেন তার ই গল্প। লেখনী, শব্দচয়ন এবং গল্প বলার ছন্দ সব কটি উপকরণ ই সঠিক মাত্রায় খুঁজে পেলাম । যারা পড়তে চলেছেন তাদের উদ্দেশ্যে জানাই, যেখানে ভাববেন গল্পের শেষ, সেখানেই আসবে আসল twist । পাশাপাশি গল্পের সাথে সাথেই অতীতের সিনেমা জগত নিয়ে বহু তথ্য পেলাম, বেশ ভালো লাগলো।
"এমনিতেই এই শহরের বাতাসে বইছে বিষ। আড়াল থেকে এক অদৃশ্য হত্যাকারী সেই বাতাসে মিশিয়ে দিচ্ছে আরো গরল বাষ্প।"
গল্পের শুরুতেই কলকাতা শহর। পরপর কিছু অস্বাভাবিক মৃত্যু। কোথাও মৃতদেহের পাশে পড়ে আছে রমাপদ চৌধুরী-র বই, কোথাও এমিল জোলার আত্মজীবনী, কোথাও এক মার্কিন টেনিস খেলোয়াড়ের ছবি। ঘটনাগুলো যেন বিচ্ছিন্ন - তবু অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। লালবাজারের তদন্তকারী অফিসার অগ্নি সেন ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, এটা সাধারণ খুনের কেস নয় - এ এক সুপরিকল্পিত মানসিক দাবাখেলা।
একাধিক টাইমলাইন, বর্তমানের তদন্তের সঙ্গে অতীতের অসমাপ্ত দুই বাংলা চলচ্চিত্রের রহস্য - সব মিলিয়ে বহুস্তরীয় গল্প। আটের দশকে টালিগঞ্জে নির্মীয়মাণ দুটি সিনেমা, শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায় না। কিন্তু সেই “না-হওয়া” ছবিই যেন কয়েকটি জীবনের ভাগ্যরেখা বদলে দেয়।
লেখক খুব কৌশলে সূত্র ছড়িয়ে দেন - কখনো বই, কখনো ছবি, কখনো কোনো নিরীহ সংলাপ। একবার হন্যে হয়ে খুঁজবেন “খুনি কে?” তো পরে ফিরে গিয়ে দেখবেন - সূত্র তো চোখের সামনেই ছিল! তবু ধরা যায়নি। ক্লাইম্যাক্সে এসে চমক আছে - এবং সেই চমক বেশ খানিকটা সিনেম্যাটিক। এদিকে লেখকের বিখ্যাত চরিত্র বিল বোসও উপস্থিত, ক্যামিও হিসেবে। তবে তাকে এভাবে দেখবো আশা করিনি।
এদিকে অগ্নি সেন কেবল রহস্যভেদী অফিসার নন। তিনি এক ক্লান্ত মানুষও - মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রীর চিকিৎসা, মানসিক অবসাদ, আর ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা তদন্ত - সব মিলিয়ে তাঁর ভিতরের দহন পাঠক স্পষ্ট অনুভব করতে পারেন। একসময় তদন্তের সুতো তাঁর ব্যক্তিজীবনের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়, আর সেখানেই গল্প নেয় ভয়াবহ বাঁক।
উপন্যাসে আলাদা করে “নায়ক” বা “নায়িকা” নেই। প্রত্যেক চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ - চিত্রক, রাধা, শৌভিক, দেবারতি, রুদ্র, ব্রেজনেভ… যেন দাবার গজ-ঘোড়া-নৌকা। কিন্তু আসল রাজা-রানি কে? সেই উত্তর পেতে পাঠককে শেষ পাতা পর্যন্ত যেতেই হবে। অতীতের লোভ, লালসা, বিশ্বাসঘাতকতা - যার বিষ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে বর্তমানের বাতাসে। প্রশ্ন ওঠে - এ কি প্রতিশোধের গল্প? না কি বিকৃত মানসিকতার? নাকি ক্ষতবিক্ষত শৈশবের প্রতিচ্ছবি?
সব প্রশংসার মাঝেও সামান্য আক্ষেপ থাকে। ক্লাইম্যাক্সে কিছু দৃশ্যের আরও বিশদ বর্ণনা থাকলে ভালো লাগত। তবু সামগ্রিকভাবে, রহস্য, সিনেমা, ইতিহাস, আর মানুষের মনের লুকানো অন্ধকারের মিশ্রণে এই মেদবর্জিত উপন্যাস টানটান উত্তেজনায় ভরপুর।
বাঙালি থ্রিলার সাহিত্যে ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায়ের অবস্থান যে ক্রমশ সুদৃঢ় হচ্ছে, এই বই তার প্রমাণ। অগ্নি সেনকে নিয়ে আরও দীর্ঘ সিরিজের প্রত্যাশা থাকল। বিষ যে কেবল বাতাসে নয়, মানুষের ভেতরেও - এই উপলব্ধিই বইটির আসল সাফল্য।
A right mixture of suspense, scientific knowledge and thrill. The climax is jaw dropping, and came very naturally. Only while turning pages, I missed a little bit of more literary description to make the reading journey smooth.