বইটির শুরু স্যান্ডারসনের গোয়ালন্দ থেকে স্টিমারে ঢাকা আসার বর্ণনার মধ্য দিয়ে। গোয়ালন্দ থেকে লঞ্চে উঠে পড়া বাঘের আতঙ্ক কিংবা বুড়িগঙ্গায় ভেসে আসা মৃত চিতাবাঘ আপনাকে টেনে নেবে দেড়শ বছর আগের অজানা, রোমাঞ্চকর এক জগতে। তারপর অপেক্ষা করছে পুরানো দিনের ঢাকার অলিগলি, বুড়িগঙ্গার তীরের ঘাট, পিলখানার হাতিশালা আর নবাব আবদুল গনির দানশীলতার বিস্ময়। ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে আপনি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়বেন অরণ্য, শিকার আর অভিযানের অনবদ্য এক জগতে। বর্তমান গাজীপুরের শ্রীপুর কিংবা কাশিমপুর কারাগারের আশপাশের অরণ্যে বুনো মোষ শিকারের বর্ণনা চমকে দেবে আপনাকে। তারপর পোষা হাতির দল নিয়ে স্যান্ডারসন রওনা দেবেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। উদ্দেশ্য বুনো হাতি ধরা অর্থাৎ খেদা অভিযান। শুধু বুনো হাতির পালকে বাগে আনাই নয়, পথের নানা বিপদ, পাহাড়ের লুসাই আতঙ্ক, বাঘের আক্রমণ মিলিয়ে দেড়শ বছর আগের গহিন পার্বত্য চট্টগ্রাম আপনাকে স্বাগত জানাবে। এখানেই শেষ নয়। দক্ষিণ ভারতের পাহাড়ি এলাকা এবং গারো পাহাড়ে হাতি শিকার করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া, মানুষখেকো বাঘের সঙ্গে টক্কর, পার্বত্য চট্টগ্রামে গয়াল শিকার এমন অনেক রোমাঞ্চকর উপাদানই আকর্ষণ বাড়িয়েছে বইটির। অরণ্য, পাহাড়, বন্যপ্রাণী আর ইতিহাসের মিলনে এই বই এমন এক অভিযাত্রা, যা পড়া শুরু করলে শেষ না করে ওঠা অসম্ভব।
১৮৭৫ সালের আগে পরের সময়। বেঙ্গল কমিসারেট এর জন্যে হাতি ধরার কাজে নিয়োজিত হলেন লেখক। ঢাকার পিলখানায় তাঁর হেড কোয়ার্টার। এখান থেকে প্রতি বছর শীতকালে পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল থেকে বুনোহাতি ধরে আনা ছিল এঁদের কাজ। ধরে এনে ঢাকার পিলখানায় পোষ মানানো হতো, এরপর পাঠানো হতো সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। রাজকীয় মনস্তত্ত্বের অধিকারী এই বুনো হাতিদের ধরার পরিকল্পনা, উপায়, ফাঁদ পাতা, জনবল ও রেশনিং ব্যবস্থাপনা, আপৎকালীন কার্যক্রম সহ বিষদ বিবরণ পেলাম এখানে। অপটু হাতে আঁকা ম্যাপ নিয়ে পাহাড়ি ট্রেইল ধরে এগিয়ে হাতির পাল খোঁজার কাহিনী খুবই চমকপ্রদ। এই চাকরির পর আছে মানুষখেকো বাঘ শিকারের বর্ণনা। সাথে উনি শিকার করার সময় সুরক্ষিত থাকার টোটকা দিয়েছেন। ওই সময়ের বনজীবী মানুষদের সম্পর্কেও একটা সুন্দর ধারণা পাওয়া যাবে বইতে।
“Until the lions have their own historians, the history of the hunt will always glorify the hunter” - Chinua Achebe সুতরাং আমরা বইয়ের সর্বত্র লক্ষ্য করবো কথকের জয়গাঁথা। তবে একটা ব্যাপার হচ্ছে যে, কথক বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছেন: কোনো নিরপরাধ প্রাণীকে শিকার করার পর তার ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করেছে - কেন করলাম? করা ঠিক হয় নাই ইত্যাদি ইত্যাদি। সম্ভবত লেখক প্রৌঢ় বয়সে যখন স্মৃতিকথা লিখতে বসেছেন, এটা তখনকার আত্মশ্লাঘা। এর আগ পর্যন্ত উনার শিকারী পৌরুষ জেগেই ছিল।
বইটাকে একটা লাইটরিড ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ধরে নেয়া যায়। অনুবাদ ঝরঝরে। দ্রুত টানা যেতে পারে।
বইটা শুরুর দিকে বোরিং লেগেছে। স্পেশালি যখন জর্জ পি স্যান্ডারসন পার্বত্য চট্টগ্রামে খেদায় হাতি ধরে বেড়াচ্ছেন। কুকি কাহিনি ছাড়া তেমন স্পেশাল কিছু পাইনি। জুমিয়াদের উপর কুকিদের ভয়ানক আক্রমণ, লুটতরাজ, নারী লুন্ঠনের কাহিনীগুলো আমার জন্য নতুন (পৃষ্ঠা ৬২-৬৪)। সত্যি বলতে হাতি ধরা ও শিকারের কাহিনীগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বোরিংই হয়। আমি আফ্রিকান পটভূমিতে কিছু হাতি শিকারকাহিনী পড়েছি, যেমন হান্টার ও আত্তেলিও গত্তিদের। সেগুলো দুর্দান্ত ছিল।
বইয়ের একদম শুরুতে গাজীপুরে বুনোমহিষ শিকার ও পদ্মায় কুমিরের গায়ে গুলি করার উল্লেখ আছে, যেগুলোকে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের ঐতিহাসিক প্রমাণক বলা যায়।
বইয়ের মাঝামাঝি গিয়ে লেখা একটু ইন্টারেস্টিং হওয়া শুরু হয়। যখন লেখক চট্টগ্রাম ছেড়ে কর্ণাটকের মহীশূরের কাহিনী বলা শুরু করেন। সেখানেও শুরুতে হাতি৷ কাকনকোটের দুষ্ট হাতির বিরুদ্ধে অভিযানে নামেন লেখক। সেই হাতির পাশাপাশি একটা নিঃসঙ্গ সুবিশাল মদ্দা হাতিকেও শিকার করেছেন তিনি, যাকে মারার পর শিকারীকে ঘিরে ধরে নিদারুণ হতাশা (পৃ ১৪১)। এছাড়া গারোদের নিয়ে কিছু নতুন তথ্য আছে। অজানা গারো পাহাড়, গারোদের সমতলে লুটপাট ও ব্রিটিশদের সাথে ১৮৬৮ এর সংঘর্ষ, শত্রুকে শিরশ্ছেদ করে মাথার খুলি সংগ্রহ করা, তাদের পোশাক ও অলংকার - স্পেশালি মহিলাদের কানের বিশাল মাকড়ি দেখে স্যান্ডারসন ভালোই অবাক হয়েছিলেন। একজনের প্রতিটা কানে নাকি ৩২ টা মাকড়ি ছিলো - লেখকের হিসাবে এক কেজি!
একই অধ্যায়ে ভারতের সবচেয়ে বড় দাঁতাল হাতি শিকারের বর্ণনা আছে, যেটিকে শিকার করেছিলেন স্যার ভিক্টর ব্রুক।
বইয়ের দুই তৃতীয়াংশ জুড়েই হাতি। শেষদিকে বাঘ শিকারের কয়েকটি গল্প আছে। সেগুলোও মেমোরেবল না। মরলাই/আয়েনপুরের একটি মানুষখেকো বাঘিনী ও ডন নামে এক গরুখেকো চর্বিওয়ালা বাঘ শিকারের গল্প। লেখক সেই বাঘের শরীর থেকে চার ইম্পেরিয়াল গ্যালন বা ৪*৪.৫=১৮ লিটার চর্বি সংগ্রহ করেছিলেন! এছাড়া আছে জাল দিয়ে বাঘ ঘেরার গল্প - যেটা আমার জন্য নতুন।
বইয়ের একদম শেষটা দারুণ। অধ্যায় আট-এ বনগরু ও গয়ালের পার্থক্য, চট্টগ্রামের পাহাড়ে গৃহপালিত গয়ালের বিবরণ, বাঘডাঁশ (Large Indian Civet) শিকার, বাঘের ভাল্লুক শিকার, বাঘের ক্যানিব্যালিজম (তিনটি বাঘ মিলে চতুর্থ একটা বাঘ খাওয়ার গল্প, যদিও স্যান্ডারসনের মতে এটি ইচ্ছাকৃত নয়, হঠাৎ ঘটে যাওয়া) এবং বুনো কুকুরের হিংস্রতা - সব মিলিয়ে শেষ অধ্যায়টাই সেরা।
জর্জ পি স্যান্ডারসনের লেখা ও ইশতিয়াক হাসানের অনুবাদে ‘বাংলার পাহাড়ে-জঙ্গলে' কে আমি দিলাম ৩। শেষ অধ্যায়ের মতই পুরো বইটা আরেকটু ইন্টারেস্টিং হলে ভালো লাগতো।
বইটিকে আসলে খুব হাইলি রেট করতে পারছি না। তার কারণ অবশ্য অনুবাদক নন, লেখকই। ১৮৭৫ সালের কাছেপিঠে মূল লেখক স্যান্ডারসন সাহেব ঢাকায় আসেন সেনাবাহিনীর কমিসারিয়েট বিভাগের হাতি ধরার প্রয়োজন মেটাতে। বুনো হাতি ধরার জন্য লেখক পাড়ি জমিয়েছিলেন বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি এলাকায়। সেখানকার গভীর অরণ্যে হাতি খেদা, বুনো হাতিকে পোষ মানানো এবং বুনো বৈরী পরিবেশে মৃত্যুর সাথে ঝুঝে ফেরত আসার বিবরণই মূলত প্রাধান্য পেয়েছে বইটিতে। অল্প পরিসরে আছে বাঘ ও মহিষ শিকারের দুই একটা ঘটনা। শিকার বা বনজঙ্গলে যারা লম্বা সময় কাটান তাদের লেখায় বন ও বন্যপ্রাণ নিয়ে এক অকৃত্রিম টান চোখে পড়ে, যা তাদের বর্ণনাকে প্রাণবন্ত। কিন্তু স্যান্ডারসনের লেখায় তা পুরোপুরি অনুপস্থিত। তাই বইটাকে মনে হচ্ছিল যেন পত্রিকার সম্পাদকীয়ের নিষ্প্রাণ বিবরণী। প্রকৃতির বর্ণনাগুলো এতই নিরস যে চট্টগ্রামের পাহাড়শ্রেণীতে লম্বা সময় কাটানো আমার মনেও তা কোন চিত্ররুপকল্প ফোটাতে পারে নি। শিকারের বিবরণও যে এতো ম্যারম্যারে হতে পারে তা এই বই না পড়লে কল্পনা করাটা মুশকিল হতো। শিকারী হিসেবেও লেখক খুব একটা যে সুবিধের ছিলেন না তা তার বর্ণনা পড়লেই স্পষ্ট হয়। সত্যি বনের পথে তার মোকাবেলা করে বেশ কিছু বিপত্তির জন্য দায়ী তিনি স্বয়ং।