এই উপন্যাসে রয়েছে কিছু অজানা অনুভূতি, কিছু অতৃপ্ত স্মৃতি এবং মানুষের মনের অন্ধকার গলি...। কেন মানুষ ভালোবাসায় এতটা বাঁধা পড়ে যায়? কেন প্রত্যাখ্যান হয়ে ওঠে কারাবাস? কেন অপেক্ষা আমাদের কাছে যন্ত্রণা হয়েও সবচেয়ে প্রিয় অভ্যাস?
'মনের অচেনা গলি'-র কোনও চরিত্র নিখুঁত বা সম্পূর্ণ নয়। বরং তাদের অসম্পূর্ণতাই তাদের কাছে সত্যি। যে পুরুষ প্রত্যাখ্যাত, সে দুর্বলও নয়, শক্তও নয়। সে শুধুমাত্র মানুষ। আর যে খল চরিত্র, সে জীবনের আলো-ছায়ায় পথ খুঁজতে থাকা আরেক দুঃসাহসী যাত্রী। এই সম্পর্কের তৃতীয় প্রান্তটিও ততটাই মানবিক। তার উপস্থিতি কাহিনিকে জটিল করে না, বরং সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
আমাদের বিশ্বাস, এই উপন্যাস পাঠকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আয়না হয়ে উঠবে। যে পথে তিনটি চরিত্র পাড়ি দেয়, সেই পথের বাঁক যেন পাঠকের অন্তরের হারানো স্মৃতিগুলোতেও আলো ফেলে। এখানে প্রেম কোনও বিজয় উৎসব নয়, সম্পর্ক স্থাপন কোনও স্থায়ী সমাধান নয়, মানুষকে নিজের গভীরে পৌঁছে দেওয়ার উপকরণ মাত্র।
যে পাঠক এ যাত্রায় পা রাখবেন, তিনি হয়তো নিজের ভেতরের অচেনা গলিও একবার ফিরে দেখতে পারেন। সেখানেই এই বইটির প্রকৃত সার্থকতা।
আমি সাথী দাস এর যতগুলো সামাজিক ঘরানার উপন্যাস পড়েছি সেখানে গল্পগুলো মূলত একজন নারী চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এই উপন্যাসও কোজাগরী কে নিয়ে শুরু হয়। রথীন ও প্রভাতীর মধ্যবিত্ত সংসারে বেড়ে ওঠে তাদের একমাত্র মেয়ে কোজাগরী। ওদের অভাবের সংসার হলেও সুখের কমতি নেই। কোজাগরী বই পড়তে খুব ভালোবাসে। পয়সা জমিয়ে ম্যাগাজিন কিনে পড়ে। সে খুব কল্পনা প্রবন, গল্পের বই পড়ে হারিয়ে যায় নিজের এক দুনিয়ায়। কিন্তু ওর মা প্রভাতী মেয়ের পড়াশুনা নিয়ে খুব সিরিয়াস, মেয়ের পড়াসনার খুঁটিনাটি বিষয়ে খেয়াল রাখে। একদিন ওদের জীবনে গৃহশিক্ষক হিসেবে চন্দ্রের আগমন ঘটে। এর পরে ধীরে ধীরে নানা ঘটনার মাধ্যমে গল্প এগোতে থাকে। গল্প নিয়ে বেশি আলোচনা করলে পড়ার মজা নষ্ট হয়ে যাবে।
📝পাঠ প্রতিক্রিয়া- ✅প্রথমে বলি যা খুব ভালো লেগেছে- 🔹গল্পের প্রধান চরিত্র কোজাগরীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। 🔹চন্দ্রের মনের দিকটাও সমান প্রাধান্য পেয়েছে লেখিকার কলমে। একটা চাকরি জোগাড় করা থেকে নিজের ভালোবাসার জন্য ব্যাকুলতা দারুণ উপস্থাপনা। 🔹খুব সুন্দর ভাবে পারিবারিক মেলবন্ধন, মূল্যবোধের দিকটা লেখিকা তুলে ধরেছেন এই উপন্যাসে। 🔹সবচেয়ে ভালো এই গল্পের পরিসমাপ্তি, একদম বাস্তবসম্মত ভাবে ইতি পড়েছে গল্পে।
❌যা মনে ধরেনি-
🔸কিছু কিছু জায়গায় অতিরিক্ত বর্ণনা এসেছে বলে মনে হয়েছে আমার। যেমন কোজাগরীর পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে কিছু বিবরণ বড্ড একঘেয়ে লেগেছে আমার। 🔸বেশ অনেকটা পড়ার পরেও মনে হয়েছে গল্প এগোচ্ছে না, একই জায়গায় ঘুরছে। একদম শেষের দিকে গিয়ে গল্প গতি পায়। 🔸আর এই বইটির প্রচ্ছদ গল্পের হিসেবে আমার একটু বেমানান লেগেছে। আরো ভালো কিছু হতে পারতো।
✨যারা সামাজিক ঘরানা ও প্রেমের গল্প পড়তে চান তারা এই বইটি একবার হাতে নিয়ে দেখতে পারেন।
"কোজাগরী খেয়াল করে দেখেছে, পৃথিবীর যত সমস্যা সৃষ্টি হয় কথার মাধ্যমে। যত কথা, তত সমস্যা।"
গতকাল পড়ে শেষ করলাম প্রিয় লেখিকা সাথী দাসের সদ্য প্রকাশিত এই উপন্যাস। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে এই বইয়ের শব্দগুলো প্রেমের অনুভূতিদের জন্যই নিবেদিত আবার কখনও মনে হয় এ কোজাগরীর জীবন উপাখ্যান। আর কোজাগরীর সাথে এই রাস্তায় হেঁটে যায় তারাও, যাদের সাথে কোজাগরীর খুব একটা ফারাক নেই। এই গল্প তাদেরও, যারা বই পড়তে ভালোবাসে, পাহাড়ের টান থাকলেও তাঁর সব রহস্য জানার স্পর্ধা দেখায় না, একাকিত্ব কে উপভোগ করে আর নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পছন্দ করে। কোজাগরীরা কখনও সবার সাথে সহজেই মিশতে পারে না, মনের দরজা বেশিক্ষণ খোলা রাখতে পারে না, সমাজের চোখে "ভালো মেয়ে" হতে গিয়ে অচিরেই হাঁপিয়ে ওঠে। আর তারপর একসময় ভীষণ প্রতিবাদ করে। কোজাগরীর স্বভাব খানিকটা এরকম - "তুমুল ভিড়ের মধ্যেও কোজাগরী একা থাকতে বড় ভালোবাসে। মানুষের মাঝে থাকলে ওর প্রবল শ্বাসকষ্ট হয়। নতুন মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজেকে এতটাই জোর করতে হয়, তখন মনে হয় এর চেয়ে মরে যাওয়া ঢের সহজ।" আরেক জায়গায় কোজাগরীর নিজের বক্তব্য, "আমি কথা বলতে একদম ভালোবাসি না। যেটুকু বলি, নিজের সঙ্গে বলি। আমার না বলা কথা যারা বোঝে, তাদের আমি ভালোবাসি।" কোজাগরী কে জানতে গিয়ে প্রায়ই মনে হয়েছে, আমার মুখের সামনেই যেন এক স্বচ্ছ আরশি রাখা রয়েছে।
রথীন আর প্রভাতীর নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে উচ্ছল জ্যোৎস্নার মত আসে কোজাগরী। বাংলার বেশিরভাগ মায়েদের মতই প্রভাতী মেয়ের মনের ঘরের খুব একটা খেয়াল রাখতে ইচ্ছুক নন, তিনি কেবল চান সকলে যেন তাঁর মেয়ের সম্বন্ধে ভালো কথা বলেন। এরপর একদিন কোজাগরীর গৃহশিক্ষক হিসেবে তাঁদের বাড়িতে আসে চন্দ্র। সে পছন্দ করে জাগরীকে। তবে কোজাগরীর মন কি চায়?
সাথী দাসের লেখা ভালো লাগার কারণ কেবল তাঁর লেখনী নয়, ওঁনার বিষয়বস্তু নির্বাচন, মানবমনের জটিলতার সুন্দর উপস্থাপনা আর চরিত্রদের বাস্তবসম্মত রূপায়ণ - এসবই মন কেড়ে নেয়। যাঁরা প্রেম ও সামাজিক উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য অবশ্য পাঠ্য।
"প্রকৃতির এক অদ্ভুত নেশা আছে। মানুষের যে সকল অনুভূতি মনের ভিতর ঘুমিয়ে থাকে নীরবে, প্রকৃতির রোষের কাছে মাথা নত করে তারা হঠাৎ নির্লজ্জের মতো বেরিয়ে পড়ে। সময়ের পরোয়া করে না।"
গল্প টা পড়া শেষ হওয়ার পর একটা অদ্ভুত বিষন্নতায় চেয়ে গেলো। জীবন তো এইরকম, সব পাওয়ার গল্প নয় জীবন, সব না পাওয়া গুলো নিয়েই এগিয়ে যাওয়া।
It is not a love story, but a story about love and life.
কোজাগরী বইপ্রেমী, নিজের জগতে থাকা স্বল্পভাষী মেয়ে এর প্রেমে পড়ে তার থেকে ১২ বছরের বড়ো চন্দ্রায়ণ, তার টিউশন টিচার, মায়ের কড়া শাসনে থাকা মেয়ে কিছুদিনের মধ্যেই চন্দ্রায়নের বন্ধু হয়ে ওঠে।
চন্দ্রায়ণ গভীর প্রেমে পড়ে, কোনোদিন কি সে বলতে পারবে মনের কথা, যাকে মন দিয়েছে তার মনে চন্দ্রায়ণ কে নিয়ে কি আছে?
উপন্যাসটা খুব বাস্তবধর্মী, জীবনে আমরা কখনো চন্দ্রায়ণ হয়েছি, কখন কোজাগরী..
🌻পাঠ প্রতিক্রিয়া :- কোজাগরীর যে সময়টাকে তুলে ধরা হয়েছে খুব সংক্ষেপে সেখানে তার কৈশোর এবং যৌবন দুটোর বহিঃপ্রকাশ যথাযত। কিশোরী মেয়ের মনের ওঠাপড়া, গৃহশিক্ষক তাকে অন্য চোখে দেখে জেনে রাগ অপমান হওয়া, বড়ো হয়ে ওঠার পাশাপাশি নিজের সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে অনুভূতির প্রকাশ সবটাই সুন্দর। অন্যদিকে যদি চন্দ্র এর প্রসঙ্গে দেখা যায় তার মায়ের মৃত্যুর পড় বাবা এবং দাদাই সব, যেখানে দাদার সম্পর্কটা পূর্ণতা না পাবার জন্য তার এবং কোজাগরীর সম্পর্ক নিয়ে দাদার পূর্ণ মত দেখা যায়। কিন্তু চিরাচরিত গল্পের মতন এখানে শিক্ষক-ছাত্রীর সহজ প্রেমটা ঠিক সহজ হয়ে ধরা দেয়না। একটা ছেলের চাকরির চাপ, পরিবারের চাপ, মানসিক টানাপোড়েন থেকে জন্ম নেওয়া হতাশা ঘৃণাকে লেখিকা যেভাবে ফুটিয়েছেন তাতে চন্দ্র এর প্রতি খারাপই লাগে। আর উপন্যাসের শেষটায় এসে যখন পড়লাম "সংসারটা তো হলো, কিন্তু ভালোবাসা হলো না" পড়ার পড় কখন অজান্তে এক দু ফোঁটা চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল তা বোঝানো যাবেনা। শুধু এই একটা বাক্যই নয় দিদির অন্য বইয়ের মত এই বইতেও অজস্র এমন মনে দাগ কেটে যাবার মতন কথা রয়েছে যা রীতিমতো ভাবায়। "অচেনা মনের গলি" শিখিয়ে যায় সম্পর্কের সুখকর পরিণতি না হলেও সেই অনুভূতি কীভাবে বেঁচে থাকে, কীভাবে দিনের পড় দিন একটা মানুষকে এক পাক্ষিক ভালোবাসা যায়, উল্টোদিকে কীভাবে একটা সম্পর্ককে আগলে রাখতে হয়, ভালোবাসাতে হয়। অবশ্যই পড়ুন।