বিশ শতকের সত্তর-আশির দশকে যারা ঢাকা অথবা বাংলাদেশের যে কোনো বড়ো শহরে শৈশব-কৈশোর-যৌবন কাটিয়েছেন, তাদের জন্য যেমন-তেমনি সেই সময়টি একেবারেই না-দেখা উত্তরপ্রজন্মের জন্যও ‘রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রং’ রীতিমতো এক টাইমমেশিন। এর প্রতিটি অধ্যায়ে এত নিপুণভাবে স্মৃতির সুতো বোনা হয়েছে যে পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে হবে এ যেন তার নিজের জীবনেরই কোনো একটা ভুলে যাওয়া আশ্চর্য অধ্যায়। সুখপাঠ্য-সুলিখিত গদ্যে হারিয়ে যাওয়া শহর ঢাকাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চাইলে এ বই বিকল্পহীন।
Jahangir Muhammad Arif is an avid reader, aspiring writer, literary reviewer, and researcher whose intellectual journey has unfolded across history, literature, society, and contemporary affairs. His engagement with writing began in the mid-1980s, through contributions to and publication in a number of little magazines and periodicals, including Pilsunj, Durbar, Phulki, Dwanda-Ananda, Ekhaney Kokhono, and Leo Voice. Those early encounters with the world of little magazines marked the beginning of a literary journey that has continued for several decades.
To date, one of Arif’s books has been published, while two others are currently at the printing stage. His writings have appeared extensively in both literary and public forums. Hundreds of his articles have been published on the online writers’ forum Sachalayatan and the publisher-blog Guruchandali. His work has also appeared in leading national newspapers, including The Business Standard, Prothom Alo, and Daily Bonik Barta. Alongside his own writing, he has contributed to more than a dozen books as an editor, contributor, or researcher.
Arif’s interests as a writer are broad and eclectic. He writes on the history of the Indian subcontinent, the Liberation War of Bangladesh, economics, contemporary issues, literature, and society. He also writes short stories, literary reviews, and travelogues, often bringing together historical curiosity, close observation, and a reflective sensibility. His interest in literature extends beyond Bangla as well; he has translated several short stories by Assamese and Bulgarian writers into Bangla, introducing readers to voices and literary worlds beyond their familiar horizons.
For Arif, writing is not merely an occupation or an act of publication; it is an enduring way of reading, observing, questioning, and making sense of the world. His body of work reflects a continuing engagement with the past and present—an attempt to understand history through human experience, to view contemporary realities through a critical lens, and to discover in literature the many ways in which people and societies tell their stories.
ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফ তাকে করে তুলেছেন সামষ্টিক।তাই বইটি হয়ে উঠেছে সময়ের দলিল। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ঢাকা তখনো পুরোপুরি আজকের আধুনিক যান্ত্রিক শহর হয়ে ওঠেনি। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লেখক ঢাকার জীবনযাত্রা, পরিবেশ, উৎসব প্রভৃতির বর্ণনা দিয়েছেন। ( ঢাকার আটপৌরে নাগরিক জীবনে এতো বৈচিত্র্য, এতো সৌন্দর্য লুকিয়ে ছিলো যে আজ তা অবিশ্বাস্য মনে হয়।) সে বর্ণনায় আক্ষরিক অর্থেই কিছুই বাদ যায়নি।এতে পড়ার গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে কিন্তু লেখার পেছনের বিপুল আয়োজন প্রত্যক্ষ করে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। আলাদাভাবে শবে বরাত ও লেখকের বিবাহোত্তর সংসার জীবনের অম্লমধুর অধ্যায়দুটো সবচেয়ে ভালো লেগেছে। আত্মজীবনী রচনার সহজ পথ পরিহার করে, গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করে, বহুবর্ণিল এক জগতে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ।
“এইভাবে সবকিছু একদিন গল্প হয়ে যায়। জামার পকেটে একটা ফিতে, ফিতেয় চুলের গন্ধ, যে গন্ধে অনেক দুঃখ, যে দুঃখে অনেক ভালবাসা, যে ভালবাসায় অনেক ছেলেবেলা... মাহমুদুল হক, কালো বরফ
হারিয়ে যাওয়া দুপুরের গল্প, এক চিলতে রোদের জলছবি
রোদের ঘ্রাণ শোঁকার অবসর বাল্যে ছিল না। বাতাসের রং চেনারও। সে এক অমল উদ্দামতার দিনকাল, অসংখ্য অসংলগ্ন ব্যস্ততার। সক্কালবেলা স্কুল, ফিরেই হুজুরের কাছে আরবি পড়া, এরপর সাততাড়াতাড়ি গোসল সেরে দুপুরের খাবারের পাট চোকানো। জোর করে চেপে ধরে নানুমনি ছোটভাইকে শুইয়ে দিতেন। আজন্ম আমি ও রসে বঞ্চিত, দুপুরে কক্ষনো ঘুমাতাম না। নিঝুমপুরির মতো নানুবাসার সিঁড়িঘর, লাগোয়া বিশাল জায়গায় সযত্নে করা বাগানের হাস্নুহেনার ঝাড়ে কিংবা বাগানবিলাসের ডালে, ঝরে পড়া সুপুরির মুকুল—যারা অবন ঠাকুরের ‘শকুন্তলা’ পড়ার পরে কল্পনার রং-এ হরিতকী হয়ে উঠেছিলো, সেইসব ফেলে আসা চনমনে রোদেলা দুপুরের গল্প মনে করিয়ে দেন জাহাঙ্গীর আরিফ। এ যেন এক জন্মান্তরের জলছবি!
নীলফুলের দিনগুলো...
আরিফ ভাইয়ের সাথে যে বয়সে পরিচয়, এখনকার তুলনায় সেটা খানিক বাল্যকালই। আজকাল এ বয়সী চ্যাংড়া-চ্যাংড়িদের তাই মনে হয়। বিশেষত ইন্টারভিউ বোর্ডে বসে যখন জন্মসাল দেখি ২০০১, রীতিমতো বুকে ব্যথা হয়। কী সর্বনাশ! কমিউনিটি সাইট সচলায়তনের পথে আমার হাঁটা শুরু যে বছরে, সে বছর সদ্য গ্রাজুয়েশনের সিঁড়ি ডিঙিয়েছি। বয়স অল্প, বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা তার চাইতেও স্বল্প। বুভুক্ষু পাঠকের মতো যা পাই পড়ি, বুঝে না বুঝে মন্তব্য সাঁটাই। বাংলা ব্লগিংয়ের জগতের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম সেইসব দিন—আহা, মনে হয় যেন গতজন্মের স্মৃতি! লেখকের সাথে পরিচয় সেইসব নীলফুলের দিনে। তখনো ভয় পেতাম, সম্ভ্রমের সাথে নিরাপদ দূরত্ব রাখতাম। ইয়ে, প্রায় ১৫ বছরের ব্যবধানে এখনো ভয় পাই।
স্মৃতির মানচিত্র: ঢাকা বনাম বন্দরনগরী...
সাত দুগুণে চৌদ্দর চারের সান্ত্বনা এটুকুই, রিভিউ লেখায় ভয়ডরের সে নিরাপদ দূরত্ব সংযোজনের প্রয়োজন নেই। যদিও স্মৃতির যে শহর জুড়ে এ চারণ, আমি সে শহরের বাসিন্দা নই। ঢাকার বায়ান্ন গলির মোড়, দিলু রোড কিংবা সিদ্ধেশ্বরীর রিপ্লেসমেন্ট আমার কাছে সার্সন রোড আর চট্টেশ্বরী। সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারের বদলে আমার মেমোরি লেন জোহরা ম্যারেজ হল আর লেডিস ক্লাব। সময়ের টাইম মেশিনেও আমি বেশ খানিকটা পিছিয়ে, ঠিক আশির দশকের মানুষ তো নই। কিন্তু বাজে বকা যে রাত্রিদিন, তাতে কমন ফ্যাক্টর টিনটিন আর এসটেরিক্সই। টিনটিনের দাম বেশি ছিল বলে সে ছিল হাতের নাগালের বাইরে। রেডিওতে খবর শোনার পাট আমার ছেলেবেলায় আকর্ষণহীন, ততোদিনে সাদাকালো টিভি ঘরে ঘরে। কিন্তু কমন পড়ে পাড়ায় বাক্স কাঁধে আর কাঁচের ডিসপ্লে সমেত বক্স নিয়ে ঘুরে বেড়ানো লেইসফিতাওয়ালা; মিলে যায় ডাকটিকেট আর কয়েন জমানোর রেষারেষি নেশা। সেকালে আমার প্রবাসী স্বজন বলতে তেমন কেউ ছিল না। তবুও নানা সূত্রে পাওয়া বেশকিছু মুদ্রা আর বড়মামার সৌজন্যে কিছু ডাকটিকেট জমে গিয়েছিল। ক্লাস ফোরে যখন পড়ি, বাসায় ল্যান্ডলাইন এলো—সেই আমলের প্রেস্টিজিয়াস ল্যান্ডমার্ক। তার আগ অব্দি আঁকাবাঁকা অক্ষরে কিংবা রুলটানা খাতায় আমরা চিঠি লিখেছি। লিখে জানিয়েছি 'এবার তবে ৮০'। বাবার বদলির সূত্রে শহর বদলানো বন্ধুকে জানিয়েছি এবারের জব্বারের বলি খেলায় যাওয়া হয়নি, বড্ড ভিড় ছিল। সেজন্য মিস হয়ে গেছে মুড়কি আর কদমা, পলকা কাঁচের রকেট আর পাখি, তালপাতার সেপাই। হালখাতা কি জানতাম? কিংবা মিলাদ? জিলিপি আর নিমকির তবারুকের কথা মনে আছে। সাথে একটা কলা আর আপেল। তখনও মেয়েরা মিলাদে যায় না—এমন বয়সে পা দিইনি।
I'd trade all my tomorrows for one single yesterday....
পড়তে পড়তে স্মৃতিকাতর হই রমজান, ঈদ আর শবে-বরাত নিয়ে। তিন দিন আগে থেকেই আতশবাজি আর তারাবাতি নিয়ে কী তুমুল উত্তেজনা! ৫০ রাকাত নামাজ পড়ার সুমহান আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কিশোরদের গন্তব্য পাড়ার মসজিদ, মায়ের বড় সুতির ওড়না পেঁচিয়ে আমাদের গন্তব্য পাশের বাড়িতে, ইফতারের থালা বাঁটতে। প্রিয় খাবার শামি কাবাব কিংবা শাসলিক, কাস্টার্ড পরবের খাবার, ঈদের দিনের 'মাস্ট হ্যাভ'। চাকরিজীবী মায়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না নিত্যনতুন রেসিপির, কিন্তু পছন্দ করতাম বলে শিলপাটায় পিষে মাংসের কাবাব তিনি নিত্য খাইয়েছেন। মায়ের চাকরির কারণেই আরো মিস করেছি গান শেখা। যদিও সে বয়সে ছবি আঁকার নেশাই ছিল তীব্র। ছিল 'মনের কথা' আর 'এসো গান শিখি'র নিয়মিত দর্শকপ্রিয়তা। মুস্তফা মনোয়ার নিববিহীন কলম কিংবা পাইপের স্ট্রতে ফুঁ দিয়ে কেমন করে এতো সুন্দর জলরং করতেন, সে বিস্ময় আর কৌতূহলী জিজ্ঞাস্য আমার এখনো মেটেনি।
One for sorrow, two for joy—ছড়া অনুযায়ী আমাদের মুনিয়া ছিল দুটো, বিজয় মেলা থেকে ছোটমামা কিনে দিয়েছিলেন। তারা দীর্ঘদিন বারান্দার বাসিন্দা ছিল প্রমাণ সাইজের খাঁচায়; খাবার ছিল চাল, মুড়ি। একই খাবার দিয়ে কই মাছ পুষেছিলাম, বেঁচে ছিল সাড়ে তিন মাস। খুব শখ করে স্কুলের বন্ধুর বাসা থেকে আনা মিনা আর রাজু নামের দুই খরগোশকে পত্রপাঠ ফেরত দিয়ে আসতে হয়েছিল। তেমনি বাড়ির পেছনে স্ব-উদ্যোগে খোঁড়া খুদে পুকুরে হাঁসছানাদের পোষার অনুমতিও মেলেনি। অশ্রুসিক্ত এসব হাউশের বিষাদবেদনা এখনো ঠিক দ্রবীভূত হয়নি বলেই আশংকা করি।
আরেকটি বেদনাদায়ক স্মৃতি নিয়ে তীব্র অপরাধবোধে ভুগি। পাশের বাড়ির রাসেল মামার ‘ভীষণ অরণ্য ২’, ঝগড়ার প্রতিশোধ হিসেবে ছিঁড়ে কুচিকুচি করেছিলাম। আমাদের বাসায় বই পড়া আর কেনা নিয়ে কোন বিধিনিষেধ না থাকলেও সেবাপ্রিয়তা ছিল না, বিশেষত তিন গোয়েন্দা আর মাসুদ রানা। ছোটবোনের সঙ্গিনীকে আবাল্য তিনি প্রবল স্নেহ এবং বাৎসল্য দেখিয়েছেন। শেলফের ডুপ্লিকেট চাবি আমার কাছেই থাকতো। বড় হয়ে ক্ষতিপূরণ দেব, এই মর্মে নিজের কাছে নিজেই শপথ করলেও সেই প্রতিজ্ঞা রাখতে পারিনি। ভদ্রলোক এখন সুদূর ট্রাম্পল্যান্ড নিবাসী; শেষবার দেশে এসে বিষয়সম্পত্তি নিয়ে পিতার সাথে আংরেজিতে গালিগালাজের গল্প শুনে শৈশবস্মৃতির সেই উষ্ণতা মুছে গেছে।
এসব মোহগ্রস্ত দিনলিপি অন্যকেউ লিখে গেছে আগে...
রোদের রং আর ঘ্রাণের কোন প্রথাগত রিভিউ কি হয়? এ আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির পাঁচালি—নারায়ণগঞ্জ নিবাসী লেখকের আশির দশকের স্মৃতিগাঁথার বিপরীতে নব্বই দশকের বন্দরনগরীর কিশোরীর রোমন্থন আর ভীমরতির চর্চা। যে অংশটুকু লেখকের একক, নিতান্তই অল্পবয়সী এক দম্পতির অসংখ্য স্বপ্নমাখা সেইসব দিনরাত্রির -সেই নিখাদ ভালবাসায় দিনযাপনের অংশটুকু পুরো বইতে আমার সবচেয়ে প্রিয়—ফেসবুকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত অবস্থায় যখন পড়েছি, তখনো তাই ছিল।
ভালবাসা করে আশা তোমার অতল জল, শীতল করবে মরুভূমি..
কী অর্বাচীনতা নিয়ে এই দূরাশা যুগের পর যুগ ধরে লোকে করে যায়, আহারে...
গন্তব্য দিকশূন্যপুর?
ত্রিশ পেরুনো জীবনে যে অংশ আমার প্রিয়, তার এক শব্দের নাম স্বাধীনতা। আর্থিক, মানসিক, সামাজিক। চাইলেই উপেক্ষা করতে পারি অপ্রিয় স্বজনের উপস্থিতি, ক্রয়ের সামর্থ্য আছে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় শৌখিন সামগ্রীর। সুযোগ আছে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার অনেক অ-নেক পরে বাড়ি ফেরার। মায়ের শাসন আর ভ্রুকুটির সেই গা শিরশিরে ভয়ের দিন কেটে গেছে, জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার। চাইলেও সুযোগ নেই শৈশবে ফেরার। শাসনে, বারণে, পাড়াতুতো আত্মীয়তায়, টিফিন ভাগ করে নেয়া বন্ধুত্বের উষ্ণতায়, বারান্দার গ্রিলে লতিয়ে ওঠা জুঁইফুলের ঘ্রাণের শৈশব! যে শৈশবে শীতের নরম রোদে ছাদে মেলে দেওয়া মাদুরের ওপর বসে গ্রোগাসে গিলে নিতাম ‘অথই সাগর’ কিংবা ‘বাক্সটা প্রয়োজন’; যে বয়সে ‘নীল হাতি’ আর ‘তোমাদের জন্য রূপকথা’র প্রথম পাতায় লেখা থাকতো—“তিথীকে আদর—বড়মামা”... সেই অপাপবিদ্ধ জীবনের পাতায় ফিরিয়ে নেয় আলতো এক বাতাস।
কালো ধোঁয়ামাখা রাজধানীর বদ্ধ, বক্র জীবনে ঘুমের মতো ক্লান্তিহীন মুহূর্তের সেই বাতাসকে টেনে আনতে পারার জন্য লেখককে ধন্যবাদ। :)
ঈদের ছুটিতে মোট ৩টা নতুন বই পড়ার ইচ্ছে ছিল আমার। এই বইটি তার প্রথম বই। কিনে জমিয়ে রেখেছিলাম বেশ কিছুদিন, কারণ স্মৃতিকথা আর ফেলে আসা সময়ের গল্প একটা অলস সময়েই পড়তে ভালো লাগে আমার। সময় নিয়ে রোমন্থন করতে ইচ্ছে করে স্মৃতির গুপ্তখাতা।
ঢাকা আমার পছন্দের শহর নয়। দুদিনের জন্য গেলেই হাঁপিয়ে ওঠে মন। কিন্তু পুরনো ঢাকার ঐশ্বর্য আমাকে বিপুল আলোড়িত করে। গত বছর তাই প্ল্যান করেই পুরনো ঢাকার কিছু দ্রষ্টব্য দেখতে গিয়েছিলাম। যেসব গল্প বইয়ের পাতায় এত জীবন্ত, সেই অতীতের ঘ্রাণ মাখা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে যখন শ্যাওলামাখা ইট, বহু দশক আগের প্যাটার্নের বাড়িঘর নিজ হাতে ছুঁয়ে দেখেছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন অতীত ছুঁয়েছি।
রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রং- আরো একবার ফিরিয়ে নিয়ে গেল এক অপার্থিব সময়ে। লেখকের শৈশবের সঙ্গে পুরোপুরি না মিললেও অনেক কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, যেন এক টাইমমেশিনে করে ফিরে গিয়েছিলাম সুদূর সময়ে। বেকারির ব্রেড আর কলাপাতায় মোড়া মাখনের ঘ্রাণ এসে ধাক্কা মারছিল নাকে। এই সময়গুলো দেখা হয়নি, উৎসবে পালাপার্বণে ধর্ম নির্বিশেষে একই ধরনের আচার পালন করছেন সবাই। নিরামিষের দিন, আমিষের দিন আলাদা।আমরা এখনো এর কিছু কিছু রিচুয়ালস পালন করি যদিও।
তিন গোয়েন্দা শুরুর আগেই লেখক বড় হয়ে যান। তাই তাঁর স্মৃতিতে বেশি এসেছে অ্যাসটেরিক্স আর মাসুদ রানা। আমরা অ্যাসটেরিক্স এর যুগটা তেমন পাইনি। আমাদের শৈশব ঘিরে ছিল প্রাণের কমিক্স। চাচা চৌধুরী, বিল্লু, পিংকি ছিল নিত্যসঙ্গী। আর টিনটিন তো টাইমলেস।
সকাল থেকে চাইছিলাম খুব বৃষ্টি হোক। আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে, রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রঙের সঙ্গে মেঘ আর বৃষ্টির মিতালি কিন্তু মন্দ হয় নি। এমন আয়েশী, ইচ্ছেমতো ছুটির সকাল-খুব বেশি যেন নস্টালজিয়া উস্কে দেয়। চোখে জল আসে।
পুরনো ঢাকার অলিগলি একসময় যাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠত, এখন নানা ব্যস্ততার ভীড়ে যাদের সময় হয় না সেই অতীতকে অনুভব করার তাদের জন্য এই বইটি একটা সময়যানই বটে।
পথ বদলে যায়, স্মৃতিরা কথা কয়, পুরনো শহরেই, নতুন রূপান্তরের সময়... আমার শহর যেন এক মস্ত টাইম মেশিন...
কক্সবাজারে শৈশব আর চট্টগ্রামে কৈশোর কাটানো একজন মানুষের জন্য ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে সহজে নিজেকে মেলানো স্বাভাবিকভাবেই একটু কঠিন। মাঝেমধ্যে শুধু চাকরির পরীক্ষার জন্য ঢাকায় যাওয়া—এই শহরের সঙ্গে গভীর কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি গড়ে ওঠার সুযোগ দেয় না। তবু লেখকের জাদুকরি বর্ণনায় ৮০-৯০ দশকের ঢাকাকে যখন জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখি, তখন সেই দূরত্বটুকু আর থাকেনা। বরং মনে হয়েছে গল্পের সব ঘটনা যেন আমার নিজের বেড়ে ওঠা শহরেই ঘটছে।