What do you think?


রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রং: ফেলে আসা শহর ঢাকায় দিনযাপন
বিশ শতকের সত্তর-আশির দশকে যারা ঢাকা অথবা বাংলাদেশের যে কোনো বড়ো শহরে শৈশব-কৈশোর-যৌবন কাটিয়েছেন, তাদের জন্য যেমন-তেমনি সেই সময়টি একেবারেই না-দেখা উত্তরপ্রজন্মের জন্যও ‘রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রং’ রীতিমতো এক টাইমমেশিন। এর প্রতিটি অধ্যায়ে এত নিপুণভাবে স্মৃতির সুতো বোনা হয়েছে যে পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে হবে এ যেন তার নিজের জীবনেরই কোনো একটা ভুলে যাওয়া আশ্চর্য অধ্যায়। সুখপাঠ্য-সুলিখিত গদ্যে হারিয়ে যাওয়া শহর ঢাকাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চাইলে এ বই বিকল্পহীন।
304 pages, Hardcover
Published January 1, 2026
About the author
Jahangir Muhammad Arif
3 books38 followersJahangir Muhammad Arif is an avid reader, aspiring writer, literary reviewer, and researcher whose intellectual journey has unfolded across history, literature, society, and contemporary affairs. His engagement with writing began in the mid-1980s, through contributions to and publication in a number of little magazines and periodicals, including Pilsunj, Durbar, Phulki, Dwanda-Ananda, Ekhaney Kokhono, and Leo Voice. Those early encounters with the world of little magazines marked the beginning of a literary journey that has continued for several decades.
To date, one of Arif’s books has been published, while two others are currently at the printing stage. His writings have appeared extensively in both literary and public forums. Hundreds of his articles have been published on the online writers’ forum Sachalayatan and the publisher-blog Guruchandali. His work has also appeared in leading national newspapers, including The Business Standard, Prothom Alo, and Daily Bonik Barta. Alongside his own writing, he has contributed to more than a dozen books as an editor, contributor, or researcher.
Arif’s interests as a writer are broad and eclectic. He writes on the history of the Indian subcontinent, the Liberation War of Bangladesh, economics, contemporary issues, literature, and society. He also writes short stories, literary reviews, and travelogues, often bringing together historical curiosity, close observation, and a reflective sensibility. His interest in literature extends beyond Bangla as well; he has translated several short stories by Assamese and Bulgarian writers into Bangla, introducing readers to voices and literary worlds beyond their familiar horizons.
For Arif, writing is not merely an occupation or an act of publication; it is an enduring way of reading, observing, questioning, and making sense of the world. His body of work reflects a continuing engagement with the past and present—an attempt to understand history through human experience, to view contemporary realities through a critical lens, and to discover in literature the many ways in which people and societies tell their stories.
To date, one of Arif’s books has been published, while two others are currently at the printing stage. His writings have appeared extensively in both literary and public forums. Hundreds of his articles have been published on the online writers’ forum Sachalayatan and the publisher-blog Guruchandali. His work has also appeared in leading national newspapers, including The Business Standard, Prothom Alo, and Daily Bonik Barta. Alongside his own writing, he has contributed to more than a dozen books as an editor, contributor, or researcher.
Arif’s interests as a writer are broad and eclectic. He writes on the history of the Indian subcontinent, the Liberation War of Bangladesh, economics, contemporary issues, literature, and society. He also writes short stories, literary reviews, and travelogues, often bringing together historical curiosity, close observation, and a reflective sensibility. His interest in literature extends beyond Bangla as well; he has translated several short stories by Assamese and Bulgarian writers into Bangla, introducing readers to voices and literary worlds beyond their familiar horizons.
For Arif, writing is not merely an occupation or an act of publication; it is an enduring way of reading, observing, questioning, and making sense of the world. His body of work reflects a continuing engagement with the past and present—an attempt to understand history through human experience, to view contemporary realities through a critical lens, and to discover in literature the many ways in which people and societies tell their stories.
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 10 of 10 reviews
April 21, 2026
ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফ তাকে করে তুলেছেন সামষ্টিক।তাই বইটি হয়ে উঠেছে সময়ের দলিল। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ঢাকা তখনো পুরোপুরি আজকের আধুনিক যান্ত্রিক শহর হয়ে ওঠেনি। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লেখক ঢাকার জীবনযাত্রা, পরিবেশ, উৎসব প্রভৃতির বর্ণনা দিয়েছেন। ( ঢাকার আটপৌরে নাগরিক জীবনে এতো বৈচিত্র্য, এতো সৌন্দর্য লুকিয়ে ছিলো যে আজ তা অবিশ্বাস্য মনে হয়।) সে বর্ণনায় আক্ষরিক অর্থেই কিছুই বাদ যায়নি।এতে পড়ার গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে কিন্তু লেখার পেছনের বিপুল আয়োজন প্রত্যক্ষ করে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। আলাদাভাবে শবে বরাত ও লেখকের বিবাহোত্তর সংসার জীবনের অম্লমধুর অধ্যায়দুটো সবচেয়ে ভালো লেগেছে। আত্মজীবনী রচনার সহজ পথ পরিহার করে, গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করে, বহুবর্ণিল এক জগতে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ।
July 2, 2026
4.5 ⭐
February 10, 2026
বইটা পড়তে গিয়ে এক ধাক্কায় হারিয়ে গিয়েছিলাম আশি ও নব্বই দশকের ঢাকা নগরীতে। লেখকের স্মৃতি চারণে উঠে এসেছে সে সময়টা।
ধর্মীয় উৎসব, একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের পাড়ায় অনুষ্ঠান আয়োজন স্মৃতিগুলো এক ঝটকায় মানসপটে ভেসে উঠলো।
কাঠের বাক্সে টিভি, ভিসিপি, ভিসিআরে সিনেমা দেখা, রেডিওতে নিয়মিত শোনা, রমজান মাসে কাসিদা গাওয়া, শবে বরাতে নানানরকম আয়োজন এ বিষয়গুলো আজকাল রীতিমতো রূপকথার মতোই শোনায়।
যেকোনো নাইনটিজে জন্ম নেয়া ব্যক্তি বইটা পড়লে রীতিমতো স্মৃতিকাতর হবেন। আর এর পরের জন্ম নেয়ারা ভাববেন হয়তো এ-সব কোনো কল্পকাহিনির উপাদান।
লেখক সে সময়টার সাধারণ বিষয়গুলো বেশ অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন বইটাতে। পড়ে বেশ ভালো লাগলো।
ধর্মীয় উৎসব, একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের পাড়ায় অনুষ্ঠান আয়োজন স্মৃতিগুলো এক ঝটকায় মানসপটে ভেসে উঠলো।
কাঠের বাক্সে টিভি, ভিসিপি, ভিসিআরে সিনেমা দেখা, রেডিওতে নিয়মিত শোনা, রমজান মাসে কাসিদা গাওয়া, শবে বরাতে নানানরকম আয়োজন এ বিষয়গুলো আজকাল রীতিমতো রূপকথার মতোই শোনায়।
যেকোনো নাইনটিজে জন্ম নেয়া ব্যক্তি বইটা পড়লে রীতিমতো স্মৃতিকাতর হবেন। আর এর পরের জন্ম নেয়ারা ভাববেন হয়তো এ-সব কোনো কল্পকাহিনির উপাদান।
লেখক সে সময়টার সাধারণ বিষয়গুলো বেশ অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন বইটাতে। পড়ে বেশ ভালো লাগলো।
March 17, 2026
৮০ এবং ৯০ দশকের ঢাকা নিয়ে স্মৃতির ঝাপি খুলে বসেছেন লেখক এই বই এ।সুপাঠ্য।
August 25, 2026
যে বইটা নিয়ে লেখা শুরু করছি এই বইটা ঠিক সবাইকে মনে হয় না নাড়িয়ে দিতে পারবে। কাউকে নষ্টালজিয়া করলেও কারো কাছে বুড়োর ঘুমের প্রলাপের মতো মনে হবে। কিন্তু পুরোনো দিনের মানে আশির কিংবা নব্বইয়ের দশকের সেই চেনা শহর ঢাকার রূপ, রস আর গন্ধ নিয়ে কারো জানা থাকলে তাহলে বইটা তার মনকে ভালোও করে দিবে আবার বিষন্নও করে দিবে। সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকের ঢাকা, তার অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, খাবারদাবার, আড্ডা, বিনোদন, মানুষের জীবনযাপন এবং ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা সবকিছুই উঠে এসেছে বইটিতে লেখকের চোখের পাতা হয়ে কলমের ডগায়। বইটির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে এমন সব স্মৃতি, যেগুলো হয়তো আজকের ঢাকায় দাঁড়িয়ে কল্পনা করাও কঠিন। ইটপাথরের এই জঞ্জালের শহরও যে তার উদরে কী বিষন্ন সুন্দর স্মৃতি গোপন করে রেখেছে তা ভাবতেও অসাধারণ লাগে। প্রবাহমান জীবনের উজানের গল্পের এক ছটকা অনূভুতিতে ডুব দিতে চাইলে বইটা পড়তে হবে।
আমার জন্ম, বেড়ে উঠা সবই চট্টগ্রামের এক অজপাড়া গাঁয়ে। তাই এই গল্পের ঢাকার অলিগলির স্মৃতির মিনার কিংবা শহুরে জীবন আমার কাছে খুব বেশি উপভোগ্য মনে না হলেও দালানকোঠার ফাঁকে পাড়াগাঁয়ের জীবনগুলোর এক ছলক আমারো দেখা হয়েছে ছোটো বেলায়৷ তাই পড়তে পড়তে অনেক অনেক বিষয়ই আমার স্মৃতিকেও নাড়িয়ে দিয়ে গেছে।
সেই সময়ের শীতের সকালের কথাটাই ধরুন না প্রথমে, মাটির কলসে কাঁচা খেজুরের রস নিয়ে বাঁশের বাঁকে করে গাছিদের শহরে হাজির হওয়া, সেই রসের ঘ্রাণ। বাড়িতে এই রস গাছ থেকে নামিয়েই খাওয়া, খাঁটি রসের সেই স্বাদ সবই যেন এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের দরজা খুলে দেয়। সন্ধ্যার পর চারপাশে ছোট বড় বাদুড়ের ওড়াওড়া, বাড়ির দাওয়ায় বসে সবাই মিলে গুনতে বসা, তাদের ফল খাওয়ার দৃশ্য কিংবা শৈশবের বিচিত্র কৌতূহল এসবও ছিল সেই সময়ের জীবনের অদ্ভুত সুন্দর অংশ। একসময়ে কাঁচা ঢকঢক করে খেয়ে ফেলা রস এখন অবশ্য নিপাহ ভাইরাসের মতো বাদুড়বাহিত রোগের আশঙ্কায় খাওয়া অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাথে সাথে বদলে গেছে পুরোনো অভ্যাসও।
একসময় ঢাকার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। মতিঝিল, তোপখানা রোড, দিলকুশা, পল্টন, ধানমন্ডি, জিগাতলা, সিদ্ধেশ্বরী, মগবাজার কিংবা নিউ ইস্কাটনের পরিচিত জায়গাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সেইসব প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলেছে, দূতাবাসগুলোও চলে গেছে নির্দিষ্ট কূটনৈতিক এলাকায়। কিন্তু একটি শহরের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বেদনা তো কেবল কোনো দূতাবাস কিংবা দোকান হারিয়ে যাওয়ায় নয়। একটা পরিচিত গাছ কেটে ফেলা কিংবা বহুদিনের চেনা দোকান উঠে যাওয়া, কোনো গলির চেহারা বদলে যাওয়া এসবের সঙ্গেই যেন মুছে যায় শহরের, গ্রামের যেকোনো জায়গার একেকটি স্মৃতি, বদলে যায় পুরোনো চেহারা। আজকের ঢাকার গলিগুলো তাই অনেক সময় ভুলভুলাইয়ার মতো মনে হয়, যেখানে প্রবেশ করা যায় সহজেই কিন্তু পুরোনো পথ চিনে বেরিয়ে আসা কঠিন।
একটা সময় পিজ্জা বার্গার ছিল কল্পনাতীত আজ সেই পিজ্জা-বার্গার আমাদের নিত্যদিনের খাবারের অংশ। অথচ আশির দশকের শেষভাগে এগুলো ছিল একেবারেই নতুন নাগরিক অভিজ্ঞতা। পিজ্জা লেক, পিজ্জা প্যালেস, পিজ্জা গার্ডেন এসব নাম তখন তরুণদের আড্ডা, গল্প আর নতুন স্বাদের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল। কাচের দরজার পাশে পেঙ্গুইন আকৃতির শোপিস, নিচু চেয়ার-টেবিল, পাউরুটির ওপর মাংসের কিমা, টমেটো সস, মেয়োনিজ ও মটরশুঁটির প্রলেপ আজকের আধুনিক পিজ্জার সঙ্গে যার হয়তো কোনো তুলনাই চলে না। কিন্তু লেখকের মতে সেই সময়ের তরুণদের কাছে এটাই ছিল নতুন পৃথিবীর স্বাদ। তাওয়ায় ভাজা বার্গারের প্যাটি, অল্প খরচে দীর্ঘক্ষণ বসে গল্প করার সুযোগ সব মিলিয়ে এসব জায়গা দ্রুতই তরুণ-তরুণীদের আড্ডার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। হাতিরপুলের পিজ্জা প্যালেস আজ নেই, কিন্তু নিউ ইস্কাটনের পিজ্জা গার্ডেন যেন এখনো সেই সময়ের একটি টুকরো স্মৃতি ধরে রেখেছে।
সত্তর ও আশির দশকের স্মৃতিচারণে ঢাকার অভিজাত নাইটলাইফের যে বিচিত্র ছবি পাওয়া যায়, বইটিতেও তার নানা টুকরো উঠে এসেছে। মগবাজার ও নিউ ইস্কাটনের আভিজাত্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পিয়াসী, পিপাসা কিংবা গ্রিন রোড থেকে বাংলামোটরে এসে ঠাঁই নেওয়া শ্যালে বার সবই আজ যেন অন্য এক সময়ের গল্প। শ্যালে বারের মালিককে ঘিরে প্রচলিত নানা কৌতূহলোদ্দীপক গল্প, তাঁর সকালে দুধ ও সন্ধ্যায় মদ বিক্রির কাহিনি কিংবা একতারা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ানোর স্মৃতি এসব গল্প বইয়ের বর্ণনাকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
পুরো বইটা পড়তে পড়তে মনে হয়, আমরা আসলে শুধু পুরোনো ঢাকাকে পড়ছি না পড়ছি নিজেদেরও। আমাদের বেড়ে ওঠার দিনগুলো, আমাদের শহর, আমাদের মানুষ, আমাদের উৎসব, আমাদের খাবার আর আমাদের হারিয়ে যাওয়া সময়কে। সময়ের সঙ্গে শহর বদলাবে, গলি বদলাবে, পুরোনো দোকান হারিয়ে যাবে, নতুন ভবন উঠবে। কিন্তু স্মৃতির ভেতরে যে জীবন একবার জায়গা করে নিয়েছে, তাকে কি সত্যিই কখনো হারানো যায়? হয়তো যায় না। আর সেই না হারানো জীবনকে, ঢাকাকে খুঁজে পেতে চাইলে, এই বইটি হাতে নেওয়া যেতে পারে।
বইটিতে পুরোনো পত্রিকার বিজ্ঞাপন ওয়াইন ইম্পোরিয়াম, এফ এল শপ কিংবা গোল্ডেন ড্রাগনের সামনে যাত্রী পাওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালকদের দৃশ্য সব মিলিয়ে ফুটে ওঠে এমন এক রাতের ঢাকারও গন্ধ আজকের শহরে আর সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না।
তারপর তো ভিসিআর, আইসক্রিম আর প্রযুক্তির প্রথম ছোঁয়ায় সত্তরের শেষভাগ থেকে আশির দশকে ঢাকা দ্রুত বদলাতে শুরু করে। গড়ে উঠতে থাকে বিউটি পার্লার, চাইনিজ রেস্তোরাঁ, কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও ভিডিও ক্লাব। বিনোদনের জগতে আসে ভিসিআর। টিকিট কেটে ভিসিআরে হিন্দি সিনেমা দেখা, তিনটি ভিএইচএস ক্যাসেট নিয়ে সিনেমা দেখার আয়োজন, ফিলিপস বা প্যানাসনিকের ২০ কিংবা ২৪ ইঞ্চি টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা এসব ছিল তখনকার প্রজন্মের কাছে অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চকর মূহুর্ত।
পাড়ার মাঠ, প্রতিবেশী আর একসঙ্গে বেড়ে ওঠার দিন
এই বইয়ের সবচেয়ে মায়াময় অংশগুলোর একটা। কেননা এই বইয়ের ঢাকা শহর কেন্দ্রীক বর্ণনা হয়তো সবার ভালো লাগবে না। কিন্তু স্মৃতির এই অংশটা মনে হবে আরে! এ তো আমাদেরই জীবন ছিলো। সেই সময়ের গ্রাম আর শহরের পাড়ায় পাড়ায় যে সংস্কৃতি ছিলো যে শৈশব আমরা কাটিয়েছিলাম এই গল্প তারই।
পাড়া মহল্লার সেই জীবন, যেখানে মানুষের মধ্যে দূরত্ব এতটা বেশি ছিল না। পাড়ায় ছিল অনেক খেলার মাঠ ও ফাঁকা জায়গা। ধনী-গরিব, সামাজিক অবস্থান এসবের হিসাব না করে সোই সময় শিশুরা একসঙ্গে খালি পায়ে ফুটবল, ক্রিকেট, কানামাছি কিংবা দাঁড়িয়াবান্ধা খেলত। বড় হয়ে তাদের কেউ হয়তো জীবনের সাধারণ কোনো পেশা বেছে নিয়েছে, কিন্তু শৈশবের সেই বন্ধুত্বের প্রতি মমতা থেকে যাবে আজীবন। প্রতিবেশীর বাসায় নির্দ্বিধায় টেলিভিশন দেখতে যাওয়া, এক ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ না থাকলে অন্য ফ্ল্যাটে ছুটে যাওয়া, কারও মৃত্যুসংবাদ প্রতিবেশীর টেলিফোনে পাওয়া কিংবা জানানো। এসব দৃশ্য আজকের নগরজীবনে প্রায় অচেনা। সকালে রেডিওর সুর, নাশতার আয়োজন, খবরের কাগজ, পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডা, ফেরিওয়ালার কাছ থেকে মাঠা কেনা কিংবা লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে সবাই মিলে বাইরে এসে গল্প করা এসব মিলিয়ে জীবন তখন হয়তো সহজ ছিল না, কিন্তু একের সাথে অন্যের সম্পর্কগুলো ছিল অনেক বেশি উষ্ণ।
সেই সময়কার বাংলা নববর্ষ, চৈত্রসংক্রান্তি, শবেবরাত কিংবা রমজান প্রতিটি উৎসবেরই ছিল আলাদা উৎসবের আমেজ। চৈত্রসংক্রান্তিতে বিশাল ভোঁ ঘুড়ি ওড়ানো, কাচ-মাঞ্জা দেওয়া, শবে বরাতের আগে চাল ভেঙে গুঁড়ো করা, হরেক রকম হালুয়া-রুটি তৈরি, দরিদ্রদের মধ্যে খাবার ও নতুন পয়সা বিলানো। প্রতিবেশীদের বাড়িতে খাবার নিয়ে যাওয়া এসব ছিল খুব সাধারণ এক সমাজেরই অংশ। এ সবকিছু লেখক এতো চমৎকার ভাবে লিখেছেন মনে হয় চোখের সামনেই সব ঘটছে।
তখন রমজান এলেই স্কুল দীর্ঘ ছুটিতে চলে যেত। পড়াশোনার পাশাপাশি কোরআন শরিফ পড়া, কায়দা-আমপারা শেষ করা, সহপাঠীদের সাথে নতুন কোরআন নেওয়ায় খই-মুড়কি ও জিলাপি খাইয়ে উদযাপন সবকিছুতেই ছিল শৈশবের সরল আনন্দ। বাইরে খেলাধুলা করা সম্ভব না হলে ঘরের ভেতর লুডু, সাপ-মই, কোটিপতি, নাম-দেশ-ফল-ফুল কিংবা চোর-ডাকাতের মতো খেলায় মেতে থাকত শিশুরা। ডিসেম্বরের ছুটিতে আবার অন্যরকম আনন্দ ছিলো। চৌকি, মায়ের সুতি শাড়ি আর কল্পনাশক্তি দিয়ে বানিয়ে ফেলা হতো মঞ্চ ও উইংস। সমবয়সীরা মিলে আয়োজন করত ছোটখাটো নাটক। টিভি, রেডিও আর পত্রিকায় আজকের শত শত টেলিভিশন চ্যানেল, ইউটিউব কিংবা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের যুগের তুলনায় সেই সময়ের বিনোদনের জগত ছিল সীমিত। কিন্তু সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ছিল অপেক্ষার আনন্দ।
ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, সংবাদ এর শিশুমেলা ও কচি-কাঁচার আসর কিংবা শিশুর মতো সাহিত্য সাময়িকীর জন্য অপেক্ষা করা, পাড়ায় পত্রিকা, বই বদলাবদলি করে পড়া এসবই ছিল একসময়কার পাঠাভ্যাসের অংশ। হেমন্ত শীতের মৌসুমে যোগ হতো যাত্রা, সার্কাস, পুতুলনাচ, উরস ও মেলা। নবাব সিরাজউদ্দৌলা কিংবা পাগলা রাজা'র মতো জনপ্রিয় যাত্রাপালা চলতো গভীর রাত পর্যন্ত যা দেখতে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসত।
খাবারের স্বাদেও ছিল এক অন্য রকম আনন্দ। সেই সময়ের ঢাকার খাবারের স্মৃতিও কম আকর্ষণীয় নয়। ফুটপাতে ইট পেতে বসা অস্থায়ী রেস্তোরাঁকে কৌতুক করে বলা হতো ইটালিয়ান হোটেল। সেখানে কাঠের চুলা বা কেরোসিন স্টোভে সস্তায় পাওয়া যেত ভাত, ডাল, আলুবাস, ডিম কিংবা মুরগির ঝোল। আটার বড় গোল রুটি আর আখের গুড় ছিল নিম্ন আয়ের মানুষের পরিচিত খাবার। শীতকালে ঘরে ঘরে খেজুরি গুড় বয়ামে তুলে রাখা হতো। রুটি-পরোটার সঙ্গে গুড়, গুড় দিয়ে চা বা শরবত, কিংবা পাড়ার চায়ের দোকানের গুলগুল্লা এসব খাবারের স্বাদও বহন করে একেকটি সময়ের গল্প।
তখনকার সকালটা রেডিওর সুরে শুরু হতো আর জাতীয় সংগীতে শেষ হতো। সেই সময়ের শিশুদের কল্পনার জগতও গড়ে উঠত টেলিভিশনের সীমিত কিছু অনুষ্ঠানকে ঘিরে। টারজান দেখে উঠোনে দড়ি বেঁধে খেলা, কিংবা বিদেশি সিরিজ দেখে বিপজ্জনক দুঃসাহস দেখানোর গল্পও সেই শৈশবের অংশ। আমি অবশ্য আলিফ লায়লা দেখা যুগের মানুষ। তাই টারজান না হলেও আলিফ লায়লার সিন্দবাদ আর দৈত্যরা ঠিকই এই অনূভুতি দিয়ে গিয়েছিলো। সেইসময়ের দিনের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল রেডিও। ছাদে টাঙানো তারের এরিয়াল ঘুরিয়ে ভালো সিগন্যাল পাওয়ার চেষ্টা, ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে তা নিয়ে শিশু-কিশোরদের নানা বৈজ্ঞানিক কৌতূহল সব মিলিয়ে রেডিও ছিল ঘরের এক অপরিহার্য সদস্য। ভোর ছয়টার দিনের সূচনা সংগীত থেকে রাত সাড়ে এগারোটার জাতীয় সংগীত রেডিওর সুরে সুরেই যেন একটি দিনের শুরু ও সমাপ্তি হতো। খবর, গান, অনুষ্ঠান কিংবা নাটক রেডিও ছিল মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী।
একসময় মেঝের ওপর খড় ও সাদা কাপড় বিছিয়ে পঙ্ক্তিভোজনে সবাই মিলে খাওয়ার যে আনন্দ আর আন্তরিকতা ছিল, তা আজ ক্যাটারিং আর আধুনিকতার কৃত্রিম ভিড়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলতে হয়। গ্রামের দূর-দূরান্তে খাল বিলের মাঝ দিয়ে হেঁটে বিয়েতে গিয়ে বিচিত্র সব ধাঁধা পার হওয়া, অচেনা মিষ্টি শরবত আর এলাহি কারবারের পঙ্ক্তিভোজনের অভিজ্ঞতাও লিখেছেন লেখক।
সেখান থেকেই গল্প ডানা মেলে নব্বইয়ের দশকের সেই অদ্ভুত সুন্দর দিনগুলোতে, যখন পকেটে মাত্র জমানো ৫০০ টাকা হলেই বন্ধু-বান্ধবদের সাথে পুরো বাংলাদেশ ঘুরে ফেলা যেত! কোনো বিলাসিতা নেই, লোকাল বাসের ভিড়, ফেরিঘাটের কমদামী খাবারের স্বাদ আর কম বাজেটের যে রোমাঞ্চ তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকত ঘুরে বেড়ানোর আসল স্বাধীনতা।
সেই ভ্রমণের নেশাই লেখক আর তাঁর বন্ধুদের টেনে নিয়ে যায় ১৯৯৫ সালের এক ডিসেম্বরে, রূপসী সেন্টমার্টিন দ্বীপে। উখিয়া টেকনাফের পাহাড়, জাদিপাড়া জাদিমুড়ার নয়নাভিরাম প্রকৃতির কোল ঘেঁষে নাফ নদী ও মিয়ানমারের আবছা সীমান্ত দেখতে দেখতে এগিয়ে যাওয়া। এরপর স্থানীয়দের মতো কাঠগোলা শ্যালক ইঞ্জিনের ট্রলারে চড়ে উত্তাল বঙ্গোপসাগরে ভেসে নাফ নদীর মোহনা পার হতেই হঠাৎ যখন ট্রলারে ইঞ্জিনের গর্জন স্তব্ধ হয়ে যায়, তখনকার সেই আতঙ্কের মুহূর্ত আর সমুদ্রের বিশালতার রোমাঞ্চ এ সবই লেখক দেখা পেলেও আমাদের হয়তো দেখা হবে না।
তখন সেন্টমার্টিনে ছিল না কোনো বড় হোটেল বা আধুনিক সুযোগ সুবিধা। তাই লেখক আর তার বন্ধুরা বাতিঘরের নিরাপত্তা প্রহরীর এক চিলতে ঘরে ব্যাগ রেখে খোলা সৈকতে আর কাঠের নৌকায় শুয়ে পুরো রাত কাটিয়েছিলো। দিনের আলোয় প্রবাল প্রাচীর, কেয়াবন, লাল কাঁকড়ার অবাধ ছোটাছুটি, সামুদ্রিক কচ্ছপের পদচ্ছাপ এবং হুমায়ূন আহমেদের 'সমুদ্র বিলাস' দেখার মুগ্ধতা আর অন্যদিকে রাতে আকাশে সাড়ে চার বিলিয়ন বছরের পুরনো চাঁদের আলোর সাথে কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা আর কালচে বালিতে আছড়ে পড়া হিংস্র ঢেউয়ের গা ছমছমে রূপ যেন এক মুহূর্তে পুরো পৃথিবী ভুলে গিয়ে স্টার ওয়ার্স সিনেমা বা অদেখা অন্য কোনো গ্রহে হারিয়ে যাওয়া! পড়তে পড়তেই চোখের সামনে সেই সব দৃশ্য আদিম সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দিচ্ছিলো। বইটির এই অংশটা আমার প্রচন্ড রকম ভালো লেগেছে।
বইটা শেষ করতে আমার অনেকদিন সময় লেগেছে। সময় নিয়ে এক একটা অধ্যায় পড়েছি আর সেই অধ্যায়ে ফুটে উঠা লেখকের চোখের সেই সোনালী দিনগুলোর রস আস্বাদন করেছি। সব অধ্যায়ই যে আমাকে নস্টালজিক করতে পেরেছে ব্যাপারটা এমন নয়, লেখকের কাটানল সময়ের শেষদিকের এক ঝলক জীবন আমারও দেখা হয়েছে এক গ্রামীণ শিশু থেকে কিশোর হওয়ার বয়সে। ঢাকাকে হয়তো আমি সেই সময়ে দেখিনি কিন্তু সেই সময়ের সাংস্কৃতিগুলো যেন স্থানগত দূরত্ব গুছিয়ে গ্রামীন জনপদে আরো বেশি প্রাচীন হয়ে বহমান ছিলো।
বইটি অতীতে ফেলে আসা জীবনের, শহরের, জনপদের এক সোনালী সময়ের সাক্ষী দেয়। আজ তার বলতে গেলে সবই সময়ের স্রোতে কোথায় হারিয়ে ফেলেছি তা আমরা কেউ জানি না। তবুও এমন একটা বইয়ের দরকার ছিলো সময়ের সাক্ষী দেওয়ার জন্য, মাঝেমাঝে বর্তমানের এই প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সময়ে সোনালী অতীতের কথা বলার জন্য যেখানে আজকের কৃত্রিমতা ছিলো না, ছিলো সব আদিম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। সেই কালের গহবরে হারিয়ে যাওয়া আদিম সৌন্দর্যের গল্প শুনতে বইটি অবশ্যই পাঠ্য।
আমার জন্ম, বেড়ে উঠা সবই চট্টগ্রামের এক অজপাড়া গাঁয়ে। তাই এই গল্পের ঢাকার অলিগলির স্মৃতির মিনার কিংবা শহুরে জীবন আমার কাছে খুব বেশি উপভোগ্য মনে না হলেও দালানকোঠার ফাঁকে পাড়াগাঁয়ের জীবনগুলোর এক ছলক আমারো দেখা হয়েছে ছোটো বেলায়৷ তাই পড়তে পড়তে অনেক অনেক বিষয়ই আমার স্মৃতিকেও নাড়িয়ে দিয়ে গেছে।
সেই সময়ের শীতের সকালের কথাটাই ধরুন না প্রথমে, মাটির কলসে কাঁচা খেজুরের রস নিয়ে বাঁশের বাঁকে করে গাছিদের শহরে হাজির হওয়া, সেই রসের ঘ্রাণ। বাড়িতে এই রস গাছ থেকে নামিয়েই খাওয়া, খাঁটি রসের সেই স্বাদ সবই যেন এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের দরজা খুলে দেয়। সন্ধ্যার পর চারপাশে ছোট বড় বাদুড়ের ওড়াওড়া, বাড়ির দাওয়ায় বসে সবাই মিলে গুনতে বসা, তাদের ফল খাওয়ার দৃশ্য কিংবা শৈশবের বিচিত্র কৌতূহল এসবও ছিল সেই সময়ের জীবনের অদ্ভুত সুন্দর অংশ। একসময়ে কাঁচা ঢকঢক করে খেয়ে ফেলা রস এখন অবশ্য নিপাহ ভাইরাসের মতো বাদুড়বাহিত রোগের আশঙ্কায় খাওয়া অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাথে সাথে বদলে গেছে পুরোনো অভ্যাসও।
একসময় ঢাকার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। মতিঝিল, তোপখানা রোড, দিলকুশা, পল্টন, ধানমন্ডি, জিগাতলা, সিদ্ধেশ্বরী, মগবাজার কিংবা নিউ ইস্কাটনের পরিচিত জায়গাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সেইসব প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলেছে, দূতাবাসগুলোও চলে গেছে নির্দিষ্ট কূটনৈতিক এলাকায়। কিন্তু একটি শহরের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বেদনা তো কেবল কোনো দূতাবাস কিংবা দোকান হারিয়ে যাওয়ায় নয়। একটা পরিচিত গাছ কেটে ফেলা কিংবা বহুদিনের চেনা দোকান উঠে যাওয়া, কোনো গলির চেহারা বদলে যাওয়া এসবের সঙ্গেই যেন মুছে যায় শহরের, গ্রামের যেকোনো জায়গার একেকটি স্মৃতি, বদলে যায় পুরোনো চেহারা। আজকের ঢাকার গলিগুলো তাই অনেক সময় ভুলভুলাইয়ার মতো মনে হয়, যেখানে প্রবেশ করা যায় সহজেই কিন্তু পুরোনো পথ চিনে বেরিয়ে আসা কঠিন।
একটা সময় পিজ্জা বার্গার ছিল কল্পনাতীত আজ সেই পিজ্জা-বার্গার আমাদের নিত্যদিনের খাবারের অংশ। অথচ আশির দশকের শেষভাগে এগুলো ছিল একেবারেই নতুন নাগরিক অভিজ্ঞতা। পিজ্জা লেক, পিজ্জা প্যালেস, পিজ্জা গার্ডেন এসব নাম তখন তরুণদের আড্ডা, গল্প আর নতুন স্বাদের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল। কাচের দরজার পাশে পেঙ্গুইন আকৃতির শোপিস, নিচু চেয়ার-টেবিল, পাউরুটির ওপর মাংসের কিমা, টমেটো সস, মেয়োনিজ ও মটরশুঁটির প্রলেপ আজকের আধুনিক পিজ্জার সঙ্গে যার হয়তো কোনো তুলনাই চলে না। কিন্তু লেখকের মতে সেই সময়ের তরুণদের কাছে এটাই ছিল নতুন পৃথিবীর স্বাদ। তাওয়ায় ভাজা বার্গারের প্যাটি, অল্প খরচে দীর্ঘক্ষণ বসে গল্প করার সুযোগ সব মিলিয়ে এসব জায়গা দ্রুতই তরুণ-তরুণীদের আড্ডার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। হাতিরপুলের পিজ্জা প্যালেস আজ নেই, কিন্তু নিউ ইস্কাটনের পিজ্জা গার্ডেন যেন এখনো সেই সময়ের একটি টুকরো স্মৃতি ধরে রেখেছে।
সত্তর ও আশির দশকের স্মৃতিচারণে ঢাকার অভিজাত নাইটলাইফের যে বিচিত্র ছবি পাওয়া যায়, বইটিতেও তার নানা টুকরো উঠে এসেছে। মগবাজার ও নিউ ইস্কাটনের আভিজাত্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পিয়াসী, পিপাসা কিংবা গ্রিন রোড থেকে বাংলামোটরে এসে ঠাঁই নেওয়া শ্যালে বার সবই আজ যেন অন্য এক সময়ের গল্প। শ্যালে বারের মালিককে ঘিরে প্রচলিত নানা কৌতূহলোদ্দীপক গল্প, তাঁর সকালে দুধ ও সন্ধ্যায় মদ বিক্রির কাহিনি কিংবা একতারা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ানোর স্মৃতি এসব গল্প বইয়ের বর্ণনাকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
পুরো বইটা পড়তে পড়তে মনে হয়, আমরা আসলে শুধু পুরোনো ঢাকাকে পড়ছি না পড়ছি নিজেদেরও। আমাদের বেড়ে ওঠার দিনগুলো, আমাদের শহর, আমাদের মানুষ, আমাদের উৎসব, আমাদের খাবার আর আমাদের হারিয়ে যাওয়া সময়কে। সময়ের সঙ্গে শহর বদলাবে, গলি বদলাবে, পুরোনো দোকান হারিয়ে যাবে, নতুন ভবন উঠবে। কিন্তু স্মৃতির ভেতরে যে জীবন একবার জায়গা করে নিয়েছে, তাকে কি সত্যিই কখনো হারানো যায়? হয়তো যায় না। আর সেই না হারানো জীবনকে, ঢাকাকে খুঁজে পেতে চাইলে, এই বইটি হাতে নেওয়া যেতে পারে।
বইটিতে পুরোনো পত্রিকার বিজ্ঞাপন ওয়াইন ইম্পোরিয়াম, এফ এল শপ কিংবা গোল্ডেন ড্রাগনের সামনে যাত্রী পাওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালকদের দৃশ্য সব মিলিয়ে ফুটে ওঠে এমন এক রাতের ঢাকারও গন্ধ আজকের শহরে আর সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না।
তারপর তো ভিসিআর, আইসক্রিম আর প্রযুক্তির প্রথম ছোঁয়ায় সত্তরের শেষভাগ থেকে আশির দশকে ঢাকা দ্রুত বদলাতে শুরু করে। গড়ে উঠতে থাকে বিউটি পার্লার, চাইনিজ রেস্তোরাঁ, কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও ভিডিও ক্লাব। বিনোদনের জগতে আসে ভিসিআর। টিকিট কেটে ভিসিআরে হিন্দি সিনেমা দেখা, তিনটি ভিএইচএস ক্যাসেট নিয়ে সিনেমা দেখার আয়োজন, ফিলিপস বা প্যানাসনিকের ২০ কিংবা ২৪ ইঞ্চি টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা এসব ছিল তখনকার প্রজন্মের কাছে অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চকর মূহুর্ত।
পাড়ার মাঠ, প্রতিবেশী আর একসঙ্গে বেড়ে ওঠার দিন
এই বইয়ের সবচেয়ে মায়াময় অংশগুলোর একটা। কেননা এই বইয়ের ঢাকা শহর কেন্দ্রীক বর্ণনা হয়তো সবার ভালো লাগবে না। কিন্তু স্মৃতির এই অংশটা মনে হবে আরে! এ তো আমাদেরই জীবন ছিলো। সেই সময়ের গ্রাম আর শহরের পাড়ায় পাড়ায় যে সংস্কৃতি ছিলো যে শৈশব আমরা কাটিয়েছিলাম এই গল্প তারই।
পাড়া মহল্লার সেই জীবন, যেখানে মানুষের মধ্যে দূরত্ব এতটা বেশি ছিল না। পাড়ায় ছিল অনেক খেলার মাঠ ও ফাঁকা জায়গা। ধনী-গরিব, সামাজিক অবস্থান এসবের হিসাব না করে সোই সময় শিশুরা একসঙ্গে খালি পায়ে ফুটবল, ক্রিকেট, কানামাছি কিংবা দাঁড়িয়াবান্ধা খেলত। বড় হয়ে তাদের কেউ হয়তো জীবনের সাধারণ কোনো পেশা বেছে নিয়েছে, কিন্তু শৈশবের সেই বন্ধুত্বের প্রতি মমতা থেকে যাবে আজীবন। প্রতিবেশীর বাসায় নির্দ্বিধায় টেলিভিশন দেখতে যাওয়া, এক ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ না থাকলে অন্য ফ্ল্যাটে ছুটে যাওয়া, কারও মৃত্যুসংবাদ প্রতিবেশীর টেলিফোনে পাওয়া কিংবা জানানো। এসব দৃশ্য আজকের নগরজীবনে প্রায় অচেনা। সকালে রেডিওর সুর, নাশতার আয়োজন, খবরের কাগজ, পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডা, ফেরিওয়ালার কাছ থেকে মাঠা কেনা কিংবা লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে সবাই মিলে বাইরে এসে গল্প করা এসব মিলিয়ে জীবন তখন হয়তো সহজ ছিল না, কিন্তু একের সাথে অন্যের সম্পর্কগুলো ছিল অনেক বেশি উষ্ণ।
সেই সময়কার বাংলা নববর্ষ, চৈত্রসংক্রান্তি, শবেবরাত কিংবা রমজান প্রতিটি উৎসবেরই ছিল আলাদা উৎসবের আমেজ। চৈত্রসংক্রান্তিতে বিশাল ভোঁ ঘুড়ি ওড়ানো, কাচ-মাঞ্জা দেওয়া, শবে বরাতের আগে চাল ভেঙে গুঁড়ো করা, হরেক রকম হালুয়া-রুটি তৈরি, দরিদ্রদের মধ্যে খাবার ও নতুন পয়সা বিলানো। প্রতিবেশীদের বাড়িতে খাবার নিয়ে যাওয়া এসব ছিল খুব সাধারণ এক সমাজেরই অংশ। এ সবকিছু লেখক এতো চমৎকার ভাবে লিখেছেন মনে হয় চোখের সামনেই সব ঘটছে।
তখন রমজান এলেই স্কুল দীর্ঘ ছুটিতে চলে যেত। পড়াশোনার পাশাপাশি কোরআন শরিফ পড়া, কায়দা-আমপারা শেষ করা, সহপাঠীদের সাথে নতুন কোরআন নেওয়ায় খই-মুড়কি ও জিলাপি খাইয়ে উদযাপন সবকিছুতেই ছিল শৈশবের সরল আনন্দ। বাইরে খেলাধুলা করা সম্ভব না হলে ঘরের ভেতর লুডু, সাপ-মই, কোটিপতি, নাম-দেশ-ফল-ফুল কিংবা চোর-ডাকাতের মতো খেলায় মেতে থাকত শিশুরা। ডিসেম্বরের ছুটিতে আবার অন্যরকম আনন্দ ছিলো। চৌকি, মায়ের সুতি শাড়ি আর কল্পনাশক্তি দিয়ে বানিয়ে ফেলা হতো মঞ্চ ও উইংস। সমবয়সীরা মিলে আয়োজন করত ছোটখাটো নাটক। টিভি, রেডিও আর পত্রিকায় আজকের শত শত টেলিভিশন চ্যানেল, ইউটিউব কিংবা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের যুগের তুলনায় সেই সময়ের বিনোদনের জগত ছিল সীমিত। কিন্তু সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ছিল অপেক্ষার আনন্দ।
ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, সংবাদ এর শিশুমেলা ও কচি-কাঁচার আসর কিংবা শিশুর মতো সাহিত্য সাময়িকীর জন্য অপেক্ষা করা, পাড়ায় পত্রিকা, বই বদলাবদলি করে পড়া এসবই ছিল একসময়কার পাঠাভ্যাসের অংশ। হেমন্ত শীতের মৌসুমে যোগ হতো যাত্রা, সার্কাস, পুতুলনাচ, উরস ও মেলা। নবাব সিরাজউদ্দৌলা কিংবা পাগলা রাজা'র মতো জনপ্রিয় যাত্রাপালা চলতো গভীর রাত পর্যন্ত যা দেখতে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসত।
খাবারের স্বাদেও ছিল এক অন্য রকম আনন্দ। সেই সময়ের ঢাকার খাবারের স্মৃতিও কম আকর্ষণীয় নয়। ফুটপাতে ইট পেতে বসা অস্থায়ী রেস্তোরাঁকে কৌতুক করে বলা হতো ইটালিয়ান হোটেল। সেখানে কাঠের চুলা বা কেরোসিন স্টোভে সস্তায় পাওয়া যেত ভাত, ডাল, আলুবাস, ডিম কিংবা মুরগির ঝোল। আটার বড় গোল রুটি আর আখের গুড় ছিল নিম্ন আয়ের মানুষের পরিচিত খাবার। শীতকালে ঘরে ঘরে খেজুরি গুড় বয়ামে তুলে রাখা হতো। রুটি-পরোটার সঙ্গে গুড়, গুড় দিয়ে চা বা শরবত, কিংবা পাড়ার চায়ের দোকানের গুলগুল্লা এসব খাবারের স্বাদও বহন করে একেকটি সময়ের গল্প।
তখনকার সকালটা রেডিওর সুরে শুরু হতো আর জাতীয় সংগীতে শেষ হতো। সেই সময়ের শিশুদের কল্পনার জগতও গড়ে উঠত টেলিভিশনের সীমিত কিছু অনুষ্ঠানকে ঘিরে। টারজান দেখে উঠোনে দড়ি বেঁধে খেলা, কিংবা বিদেশি সিরিজ দেখে বিপজ্জনক দুঃসাহস দেখানোর গল্পও সেই শৈশবের অংশ। আমি অবশ্য আলিফ লায়লা দেখা যুগের মানুষ। তাই টারজান না হলেও আলিফ লায়লার সিন্দবাদ আর দৈত্যরা ঠিকই এই অনূভুতি দিয়ে গিয়েছিলো। সেইসময়ের দিনের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল রেডিও। ছাদে টাঙানো তারের এরিয়াল ঘুরিয়ে ভালো সিগন্যাল পাওয়ার চেষ্টা, ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে তা নিয়ে শিশু-কিশোরদের নানা বৈজ্ঞানিক কৌতূহল সব মিলিয়ে রেডিও ছিল ঘরের এক অপরিহার্য সদস্য। ভোর ছয়টার দিনের সূচনা সংগীত থেকে রাত সাড়ে এগারোটার জাতীয় সংগীত রেডিওর সুরে সুরেই যেন একটি দিনের শুরু ও সমাপ্তি হতো। খবর, গান, অনুষ্ঠান কিংবা নাটক রেডিও ছিল মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী।
একসময় মেঝের ওপর খড় ও সাদা কাপড় বিছিয়ে পঙ্ক্তিভোজনে সবাই মিলে খাওয়ার যে আনন্দ আর আন্তরিকতা ছিল, তা আজ ক্যাটারিং আর আধুনিকতার কৃত্রিম ভিড়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলতে হয়। গ্রামের দূর-দূরান্তে খাল বিলের মাঝ দিয়ে হেঁটে বিয়েতে গিয়ে বিচিত্র সব ধাঁধা পার হওয়া, অচেনা মিষ্টি শরবত আর এলাহি কারবারের পঙ্ক্তিভোজনের অভিজ্ঞতাও লিখেছেন লেখক।
সেখান থেকেই গল্প ডানা মেলে নব্বইয়ের দশকের সেই অদ্ভুত সুন্দর দিনগুলোতে, যখন পকেটে মাত্র জমানো ৫০০ টাকা হলেই বন্ধু-বান্ধবদের সাথে পুরো বাংলাদেশ ঘুরে ফেলা যেত! কোনো বিলাসিতা নেই, লোকাল বাসের ভিড়, ফেরিঘাটের কমদামী খাবারের স্বাদ আর কম বাজেটের যে রোমাঞ্চ তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকত ঘুরে বেড়ানোর আসল স্বাধীনতা।
সেই ভ্রমণের নেশাই লেখক আর তাঁর বন্ধুদের টেনে নিয়ে যায় ১৯৯৫ সালের এক ডিসেম্বরে, রূপসী সেন্টমার্টিন দ্বীপে। উখিয়া টেকনাফের পাহাড়, জাদিপাড়া জাদিমুড়ার নয়নাভিরাম প্রকৃতির কোল ঘেঁষে নাফ নদী ও মিয়ানমারের আবছা সীমান্ত দেখতে দেখতে এগিয়ে যাওয়া। এরপর স্থানীয়দের মতো কাঠগোলা শ্যালক ইঞ্জিনের ট্রলারে চড়ে উত্তাল বঙ্গোপসাগরে ভেসে নাফ নদীর মোহনা পার হতেই হঠাৎ যখন ট্রলারে ইঞ্জিনের গর্জন স্তব্ধ হয়ে যায়, তখনকার সেই আতঙ্কের মুহূর্ত আর সমুদ্রের বিশালতার রোমাঞ্চ এ সবই লেখক দেখা পেলেও আমাদের হয়তো দেখা হবে না।
তখন সেন্টমার্টিনে ছিল না কোনো বড় হোটেল বা আধুনিক সুযোগ সুবিধা। তাই লেখক আর তার বন্ধুরা বাতিঘরের নিরাপত্তা প্রহরীর এক চিলতে ঘরে ব্যাগ রেখে খোলা সৈকতে আর কাঠের নৌকায় শুয়ে পুরো রাত কাটিয়েছিলো। দিনের আলোয় প্রবাল প্রাচীর, কেয়াবন, লাল কাঁকড়ার অবাধ ছোটাছুটি, সামুদ্রিক কচ্ছপের পদচ্ছাপ এবং হুমায়ূন আহমেদের 'সমুদ্র বিলাস' দেখার মুগ্ধতা আর অন্যদিকে রাতে আকাশে সাড়ে চার বিলিয়ন বছরের পুরনো চাঁদের আলোর সাথে কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা আর কালচে বালিতে আছড়ে পড়া হিংস্র ঢেউয়ের গা ছমছমে রূপ যেন এক মুহূর্তে পুরো পৃথিবী ভুলে গিয়ে স্টার ওয়ার্স সিনেমা বা অদেখা অন্য কোনো গ্রহে হারিয়ে যাওয়া! পড়তে পড়তেই চোখের সামনে সেই সব দৃশ্য আদিম সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দিচ্ছিলো। বইটির এই অংশটা আমার প্রচন্ড রকম ভালো লেগেছে।
বইটা শেষ করতে আমার অনেকদিন সময় লেগেছে। সময় নিয়ে এক একটা অধ্যায় পড়েছি আর সেই অধ্যায়ে ফুটে উঠা লেখকের চোখের সেই সোনালী দিনগুলোর রস আস্বাদন করেছি। সব অধ্যায়ই যে আমাকে নস্টালজিক করতে পেরেছে ব্যাপারটা এমন নয়, লেখকের কাটানল সময়ের শেষদিকের এক ঝলক জীবন আমারও দেখা হয়েছে এক গ্রামীণ শিশু থেকে কিশোর হওয়ার বয়সে। ঢাকাকে হয়তো আমি সেই সময়ে দেখিনি কিন্তু সেই সময়ের সাংস্কৃতিগুলো যেন স্থানগত দূরত্ব গুছিয়ে গ্রামীন জনপদে আরো বেশি প্রাচীন হয়ে বহমান ছিলো।
বইটি অতীতে ফেলে আসা জীবনের, শহরের, জনপদের এক সোনালী সময়ের সাক্ষী দেয়। আজ তার বলতে গেলে সবই সময়ের স্রোতে কোথায় হারিয়ে ফেলেছি তা আমরা কেউ জানি না। তবুও এমন একটা বইয়ের দরকার ছিলো সময়ের সাক্ষী দেওয়ার জন্য, মাঝেমাঝে বর্তমানের এই প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সময়ে সোনালী অতীতের কথা বলার জন্য যেখানে আজকের কৃত্রিমতা ছিলো না, ছিলো সব আদিম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। সেই কালের গহবরে হারিয়ে যাওয়া আদিম সৌন্দর্যের গল্প শুনতে বইটি অবশ্যই পাঠ্য।
February 9, 2026
“এইভাবে সবকিছু একদিন গল্প হয়ে যায়। জামার পকেটে একটা ফিতে, ফিতেয় চুলের গন্ধ, যে গন্ধে অনেক দুঃখ, যে দুঃখে অনেক ভালবাসা, যে ভালবাসায় অনেক ছেলেবেলা...
মাহমুদুল হক, কালো বরফ
হারিয়ে যাওয়া দুপুরের গল্প, এক চিলতে রোদের জলছবি
রোদের ঘ্রাণ শোঁকার অবসর বাল্যে ছিল না। বাতাসের রং চেনারও। সে এক অমল উদ্দামতার দিনকাল, অসংখ্য অসংলগ্ন ব্যস্ততার। সক্কালবেলা স্কুল, ফিরেই হুজুরের কাছে আরবি পড়া, এরপর সাততাড়াতাড়ি গোসল সেরে দুপুরের খাবারের পাট চোকানো। জোর করে চেপে ধরে নানুমনি ছোটভাইকে শুইয়ে দিতেন। আজন্ম আমি ও রসে বঞ্চিত, দুপুরে কক্ষনো ঘুমাতাম না।
নিঝুমপুরির মতো নানুবাসার সিঁড়িঘর, লাগোয়া বিশাল জায়গায় সযত্নে করা বাগানের হাস্নুহেনার ঝাড়ে কিংবা বাগানবিলাসের ডালে, ঝরে পড়া সুপুরির মুকুল—যারা অবন ঠাকুরের ‘শকুন্তলা’ পড়ার পরে কল্পনার রং-এ হরিতকী হয়ে উঠেছিলো, সেইসব ফেলে আসা চনমনে রোদেলা দুপুরের গল্প মনে করিয়ে দেন জাহাঙ্গীর আরিফ। এ যেন এক জন্মান্তরের জলছবি!
নীলফুলের দিনগুলো...
আরিফ ভাইয়ের সাথে যে বয়সে পরিচয়, এখনকার তুলনায় সেটা খানিক বাল্যকালই। আজকাল এ বয়সী চ্যাংড়া-চ্যাংড়িদের তাই মনে হয়। বিশেষত ইন্টারভিউ বোর্ডে বসে যখন জন্মসাল দেখি ২০০১, রীতিমতো বুকে ব্যথা হয়। কী সর্বনাশ!
কমিউনিটি সাইট সচলায়তনের পথে আমার হাঁটা শুরু যে বছরে, সে বছর সদ্য গ্রাজুয়েশনের সিঁড়ি ডিঙিয়েছি। বয়স অল্প, বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা তার চাইতেও স্বল্প। বুভুক্ষু পাঠকের মতো যা পাই পড়ি, বুঝে না বুঝে মন্তব্য সাঁটাই। বাংলা ব্লগিংয়ের জগতের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম সেইসব দিন—আহা, মনে হয় যেন গতজন্মের স্মৃতি!
লেখকের সাথে পরিচয় সেইসব নীলফুলের দিনে। তখনো ভয় পেতাম, সম্ভ্রমের সাথে নিরাপদ দূরত্ব রাখতাম।
ইয়ে, প্রায় ১৫ বছরের ব্যবধানে এখনো ভয় পাই।
স্মৃতির মানচিত্র: ঢাকা বনাম বন্দরনগরী...
সাত দুগুণে চৌদ্দর চারের সান্ত্বনা এটুকুই, রিভিউ লেখায় ভয়ডরের সে নিরাপদ দূরত্ব সংযোজনের প্রয়োজন নেই। যদিও স্মৃতির যে শহর জুড়ে এ চারণ, আমি সে শহরের বাসিন্দা নই। ঢাকার বায়ান্ন গলির মোড়, দিলু রোড কিংবা সিদ্ধেশ্বরীর রিপ্লেসমেন্ট আমার কাছে সার্সন রোড আর চট্টেশ্বরী। সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারের বদলে আমার মেমোরি লেন জোহরা ম্যারেজ হল আর লেডিস ক্লাব।
সময়ের টাইম মেশিনেও আমি বেশ খানিকটা পিছিয়ে, ঠিক আশির দশকের মানুষ তো নই। কিন্তু বাজে বকা যে রাত্রিদিন, তাতে কমন ফ্যাক্টর টিনটিন আর এসটেরিক্সই। টিনটিনের দাম বেশি ছিল বলে সে ছিল হাতের নাগালের বাইরে। রেডিওতে খবর শোনার পাট আমার ছেলেবেলায় আকর্ষণহীন, ততোদিনে সাদাকালো টিভি ঘরে ঘরে। কিন্তু কমন পড়ে পাড়ায় বাক্স কাঁধে আর কাঁচের ডিসপ্লে সমেত বক্স নিয়ে ঘুরে বেড়ানো লেইসফিতাওয়ালা; মিলে যায় ডাকটিকেট আর কয়েন জমানোর রেষারেষি নেশা।
সেকালে আমার প্রবাসী স্বজন বলতে তেমন কেউ ছিল না। তবুও নানা সূত্রে পাওয়া বেশকিছু মুদ্রা আর বড়মামার সৌজন্যে কিছু ডাকটিকেট জমে গিয়েছিল। ক্লাস ফোরে যখন পড়ি, বাসায় ল্যান্ডলাইন এলো—সেই আমলের প্রেস্টিজিয়াস ল্যান্ডমার্ক। তার আগ অব্দি আঁকাবাঁকা অক্ষরে কিংবা রুলটানা খাতায় আমরা চিঠি লিখেছি। লিখে জানিয়েছি 'এবার তবে ৮০'।
বাবার বদলির সূত্রে শহর বদলানো বন্ধুকে জানিয়েছি এবারের জব্বারের বলি খেলায় যাওয়া হয়নি, বড্ড ভিড় ছিল। সেজন্য মিস হয়ে গেছে মুড়কি আর কদমা, পলকা কাঁচের রকেট আর পাখি, তালপাতার সেপাই। হালখাতা কি জানতাম? কিংবা মিলাদ? জিলিপি আর নিমকির তবারুকের কথা মনে আছে। সাথে একটা কলা আর আপেল। তখনও মেয়েরা মিলাদে যায় না—এমন বয়সে পা দিইনি।
I'd trade all my tomorrows for one single yesterday....
পড়তে পড়তে স্মৃতিকাতর হই রমজান, ঈদ আর শবে-বরাত নিয়ে। তিন দিন আগে থেকেই আতশবাজি আর তারাবাতি নিয়ে কী তুমুল উত্তেজনা! ৫০ রাকাত নামাজ পড়ার সুমহান আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কিশোরদের গন্তব্য পাড়ার মসজিদ, মায়ের বড় সুতির ওড়না পেঁচিয়ে আমাদের গন্তব্য পাশের বাড়িতে, ইফতারের থালা বাঁটতে। প্রিয় খাবার শামি কাবাব কিংবা শাসলিক, কাস্টার্ড পরবের খাবার, ঈদের দিনের 'মাস্ট হ্যাভ'। চাকরিজীবী মায়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না নিত্যনতুন রেসিপির, কিন্তু পছন্দ করতাম বলে শিলপাটায় পিষে মাংসের কাবাব তিনি নিত্য খাইয়েছেন।
মায়ের চাকরির কারণেই আরো মিস করেছি গান শেখা। যদিও সে বয়সে ছবি আঁকার নেশাই ছিল তীব্র। ছিল 'মনের কথা' আর 'এসো গান শিখি'র নিয়মিত দর্শকপ্রিয়তা। মুস্তফা মনোয়ার নিববিহীন কলম কিংবা পাইপের স্ট্রতে ফুঁ দিয়ে কেমন করে এতো সুন্দর জলরং করতেন, সে বিস্ময় আর কৌতূহলী জিজ্ঞাস্য আমার এখনো মেটেনি।
One for sorrow, two for joy—ছড়া অনুযায়ী আমাদের মুনিয়া ছিল দুটো, বিজয় মেলা থেকে ছোটমামা কিনে দিয়েছিলেন। তারা দীর্ঘদিন বারান্দার বাসিন্দা ছিল প্রমাণ সাইজের খাঁচায়; খাবার ছিল চাল, মুড়ি। একই খাবার দিয়ে কই মাছ পুষেছিলাম, বেঁচে ছিল সাড়ে তিন মাস। খুব শখ করে স্কুলের বন্ধুর বাসা থেকে আনা মিনা আর রাজু নামের দুই খরগোশকে পত্রপাঠ ফেরত দিয়ে আসতে হয়েছিল।
তেমনি বাড়ির পেছনে স্ব-উদ্যোগে খোঁড়া খুদে পুকুরে হাঁসছানাদের পোষার অনুমতিও মেলেনি। অশ্রুসিক্ত এসব হাউশের বিষাদবেদনা এখনো ঠিক দ্রবীভূত হয়নি বলেই আশংকা করি।
আরেকটি বেদনাদায়ক স্মৃতি নিয়ে তীব্র অপরাধবোধে ভুগি। পাশের বাড়ির রাসেল মামার ‘ভীষণ অরণ্য ২’, ঝগড়ার প্রতিশোধ হিসেবে ছিঁড়ে কুচিকুচি করেছিলাম। আমাদের বাসায় বই পড়া আর কেনা নিয়ে কোন বিধিনিষেধ না থাকলেও সেবাপ্রিয়তা ছিল না, বিশেষত তিন গোয়েন্দা আর মাসুদ রানা। ছোটবোনের সঙ্গিনীকে আবাল্য তিনি প্রবল স্নেহ এবং বাৎসল্য দেখিয়েছেন। শেলফের ডুপ্লিকেট চাবি আমার কাছেই থাকতো। বড় হয়ে ক্ষতিপূরণ দেব, এই মর্মে নিজের কাছে নিজেই শপথ করলেও সেই প্রতিজ্ঞা রাখতে পারিনি।
ভদ্রলোক এখন সুদূর ট্রাম্পল্যান্ড নিবাসী; শেষবার দেশে এসে বিষয়সম্পত্তি নিয়ে পিতার সাথে আংরেজিতে গালিগালাজের গল্প শুনে শৈশবস্মৃতির সেই উষ্ণতা মুছে গেছে।
এসব মোহগ্রস্ত দিনলিপি অন্যকেউ লিখে গেছে আগে...
রোদের রং আর ঘ্রাণের কোন প্রথাগত রিভিউ কি হয়?
এ আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির পাঁচালি—নারায়ণগঞ্জ নিবাসী লেখকের আশির দশকের স্মৃতিগাঁথার বিপরীতে নব্বই দশকের বন্দরনগরীর কিশোরীর রোমন্থন আর ভীমরতির চর্চা। যে অংশটুকু লেখকের একক, নিতান্তই অল্পবয়সী এক দম্পতির অসংখ্য স্বপ্নমাখা সেইসব দিনরাত্রির -সেই নিখাদ ভালবাসায় দিনযাপনের অংশটুকু পুরো বইতে আমার সবচেয়ে প্রিয়—ফেসবুকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত অবস্থায় যখন পড়েছি, তখনো তাই ছিল।
কী অর্বাচীনতা নিয়ে এই দূরাশা যুগের পর যুগ ধরে লোকে করে যায়, আহারে...
গন্তব্য দিকশূন্যপুর?
ত্রিশ পেরুনো জীবনে যে অংশ আমার প্রিয়, তার এক শব্দের নাম স্বাধীনতা। আর্থিক, মানসিক, সামাজিক। চাইলেই উপেক্ষা করতে পারি অপ্রিয় স্বজনের উপস্থিতি, ক্রয়ের সামর্থ্য আছে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় শৌখিন সামগ্রীর। সুযোগ আছে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার অনেক অ-নেক পরে বাড়ি ফেরার। মায়ের শাসন আর ভ্রুকুটির সেই গা শিরশিরে ভয়ের দিন কেটে গেছে, জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার।
চাইলেও সুযোগ নেই শৈশবে ফেরার। শাসনে, বারণে, পাড়াতুতো আত্মীয়তায়, টিফিন ভাগ করে নেয়া বন্ধুত্বের উষ্ণতায়, বারান্দার গ্রিলে লতিয়ে ওঠা জুঁইফুলের ঘ্রাণের শৈশব!
যে শৈশবে শীতের নরম রোদে ছাদে মেলে দেওয়া মাদুরের ওপর বসে গ্রোগাসে গিলে নিতাম ‘অথই সাগর’ কিংবা ‘বাক্সটা প্রয়োজন’; যে বয়সে ‘নীল হাতি’ আর ‘তোমাদের জন্য রূপকথা’র প্রথম পাতায় লেখা থাকতো—“তিথীকে আদর—বড়মামা”...
সেই অপাপবিদ্ধ জীবনের পাতায় ফিরিয়ে নেয় আলতো এক বাতাস।
কালো ধোঁয়ামাখা রাজধানীর বদ্ধ, বক্র জীবনে ঘুমের মতো ক্লান্তিহীন মুহূর্তের সেই বাতাসকে টেনে আনতে পারার জন্য লেখককে ধন্যবাদ। :)
মাহমুদুল হক, কালো বরফ
হারিয়ে যাওয়া দুপুরের গল্প, এক চিলতে রোদের জলছবি
রোদের ঘ্রাণ শোঁকার অবসর বাল্যে ছিল না। বাতাসের রং চেনারও। সে এক অমল উদ্দামতার দিনকাল, অসংখ্য অসংলগ্ন ব্যস্ততার। সক্কালবেলা স্কুল, ফিরেই হুজুরের কাছে আরবি পড়া, এরপর সাততাড়াতাড়ি গোসল সেরে দুপুরের খাবারের পাট চোকানো। জোর করে চেপে ধরে নানুমনি ছোটভাইকে শুইয়ে দিতেন। আজন্ম আমি ও রসে বঞ্চিত, দুপুরে কক্ষনো ঘুমাতাম না।
নিঝুমপুরির মতো নানুবাসার সিঁড়িঘর, লাগোয়া বিশাল জায়গায় সযত্নে করা বাগানের হাস্নুহেনার ঝাড়ে কিংবা বাগানবিলাসের ডালে, ঝরে পড়া সুপুরির মুকুল—যারা অবন ঠাকুরের ‘শকুন্তলা’ পড়ার পরে কল্পনার রং-এ হরিতকী হয়ে উঠেছিলো, সেইসব ফেলে আসা চনমনে রোদেলা দুপুরের গল্প মনে করিয়ে দেন জাহাঙ্গীর আরিফ। এ যেন এক জন্মান্তরের জলছবি!
নীলফুলের দিনগুলো...
আরিফ ভাইয়ের সাথে যে বয়সে পরিচয়, এখনকার তুলনায় সেটা খানিক বাল্যকালই। আজকাল এ বয়সী চ্যাংড়া-চ্যাংড়িদের তাই মনে হয়। বিশেষত ইন্টারভিউ বোর্ডে বসে যখন জন্মসাল দেখি ২০০১, রীতিমতো বুকে ব্যথা হয়। কী সর্বনাশ!
কমিউনিটি সাইট সচলায়তনের পথে আমার হাঁটা শুরু যে বছরে, সে বছর সদ্য গ্রাজুয়েশনের সিঁড়ি ডিঙিয়েছি। বয়স অল্প, বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা তার চাইতেও স্বল্প। বুভুক্ষু পাঠকের মতো যা পাই পড়ি, বুঝে না বুঝে মন্তব্য সাঁটাই। বাংলা ব্লগিংয়ের জগতের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম সেইসব দিন—আহা, মনে হয় যেন গতজন্মের স্মৃতি!
লেখকের সাথে পরিচয় সেইসব নীলফুলের দিনে। তখনো ভয় পেতাম, সম্ভ্রমের সাথে নিরাপদ দূরত্ব রাখতাম।
ইয়ে, প্রায় ১৫ বছরের ব্যবধানে এখনো ভয় পাই।
স্মৃতির মানচিত্র: ঢাকা বনাম বন্দরনগরী...
সাত দুগুণে চৌদ্দর চারের সান্ত্বনা এটুকুই, রিভিউ লেখায় ভয়ডরের সে নিরাপদ দূরত্ব সংযোজনের প্রয়োজন নেই। যদিও স্মৃতির যে শহর জুড়ে এ চারণ, আমি সে শহরের বাসিন্দা নই। ঢাকার বায়ান্ন গলির মোড়, দিলু রোড কিংবা সিদ্ধেশ্বরীর রিপ্লেসমেন্ট আমার কাছে সার্সন রোড আর চট্টেশ্বরী। সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারের বদলে আমার মেমোরি লেন জোহরা ম্যারেজ হল আর লেডিস ক্লাব।
সময়ের টাইম মেশিনেও আমি বেশ খানিকটা পিছিয়ে, ঠিক আশির দশকের মানুষ তো নই। কিন্তু বাজে বকা যে রাত্রিদিন, তাতে কমন ফ্যাক্টর টিনটিন আর এসটেরিক্সই। টিনটিনের দাম বেশি ছিল বলে সে ছিল হাতের নাগালের বাইরে। রেডিওতে খবর শোনার পাট আমার ছেলেবেলায় আকর্ষণহীন, ততোদিনে সাদাকালো টিভি ঘরে ঘরে। কিন্তু কমন পড়ে পাড়ায় বাক্স কাঁধে আর কাঁচের ডিসপ্লে সমেত বক্স নিয়ে ঘুরে বেড়ানো লেইসফিতাওয়ালা; মিলে যায় ডাকটিকেট আর কয়েন জমানোর রেষারেষি নেশা।
সেকালে আমার প্রবাসী স্বজন বলতে তেমন কেউ ছিল না। তবুও নানা সূত্রে পাওয়া বেশকিছু মুদ্রা আর বড়মামার সৌজন্যে কিছু ডাকটিকেট জমে গিয়েছিল। ক্লাস ফোরে যখন পড়ি, বাসায় ল্যান্ডলাইন এলো—সেই আমলের প্রেস্টিজিয়াস ল্যান্ডমার্ক। তার আগ অব্দি আঁকাবাঁকা অক্ষরে কিংবা রুলটানা খাতায় আমরা চিঠি লিখেছি। লিখে জানিয়েছি 'এবার তবে ৮০'।
বাবার বদলির সূত্রে শহর বদলানো বন্ধুকে জানিয়েছি এবারের জব্বারের বলি খেলায় যাওয়া হয়নি, বড্ড ভিড় ছিল। সেজন্য মিস হয়ে গেছে মুড়কি আর কদমা, পলকা কাঁচের রকেট আর পাখি, তালপাতার সেপাই। হালখাতা কি জানতাম? কিংবা মিলাদ? জিলিপি আর নিমকির তবারুকের কথা মনে আছে। সাথে একটা কলা আর আপেল। তখনও মেয়েরা মিলাদে যায় না—এমন বয়সে পা দিইনি।
I'd trade all my tomorrows for one single yesterday....
পড়তে পড়তে স্মৃতিকাতর হই রমজান, ঈদ আর শবে-বরাত নিয়ে। তিন দিন আগে থেকেই আতশবাজি আর তারাবাতি নিয়ে কী তুমুল উত্তেজনা! ৫০ রাকাত নামাজ পড়ার সুমহান আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কিশোরদের গন্তব্য পাড়ার মসজিদ, মায়ের বড় সুতির ওড়না পেঁচিয়ে আমাদের গন্তব্য পাশের বাড়িতে, ইফতারের থালা বাঁটতে। প্রিয় খাবার শামি কাবাব কিংবা শাসলিক, কাস্টার্ড পরবের খাবার, ঈদের দিনের 'মাস্ট হ্যাভ'। চাকরিজীবী মায়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না নিত্যনতুন রেসিপির, কিন্তু পছন্দ করতাম বলে শিলপাটায় পিষে মাংসের কাবাব তিনি নিত্য খাইয়েছেন।
মায়ের চাকরির কারণেই আরো মিস করেছি গান শেখা। যদিও সে বয়সে ছবি আঁকার নেশাই ছিল তীব্র। ছিল 'মনের কথা' আর 'এসো গান শিখি'র নিয়মিত দর্শকপ্রিয়তা। মুস্তফা মনোয়ার নিববিহীন কলম কিংবা পাইপের স্ট্রতে ফুঁ দিয়ে কেমন করে এতো সুন্দর জলরং করতেন, সে বিস্ময় আর কৌতূহলী জিজ্ঞাস্য আমার এখনো মেটেনি।
One for sorrow, two for joy—ছড়া অনুযায়ী আমাদের মুনিয়া ছিল দুটো, বিজয় মেলা থেকে ছোটমামা কিনে দিয়েছিলেন। তারা দীর্ঘদিন বারান্দার বাসিন্দা ছিল প্রমাণ সাইজের খাঁচায়; খাবার ছিল চাল, মুড়ি। একই খাবার দিয়ে কই মাছ পুষেছিলাম, বেঁচে ছিল সাড়ে তিন মাস। খুব শখ করে স্কুলের বন্ধুর বাসা থেকে আনা মিনা আর রাজু নামের দুই খরগোশকে পত্রপাঠ ফেরত দিয়ে আসতে হয়েছিল।
তেমনি বাড়ির পেছনে স্ব-উদ্যোগে খোঁড়া খুদে পুকুরে হাঁসছানাদের পোষার অনুমতিও মেলেনি। অশ্রুসিক্ত এসব হাউশের বিষাদবেদনা এখনো ঠিক দ্রবীভূত হয়নি বলেই আশংকা করি।
আরেকটি বেদনাদায়ক স্মৃতি নিয়ে তীব্র অপরাধবোধে ভুগি। পাশের বাড়ির রাসেল মামার ‘ভীষণ অরণ্য ২’, ঝগড়ার প্রতিশোধ হিসেবে ছিঁড়ে কুচিকুচি করেছিলাম। আমাদের বাসায় বই পড়া আর কেনা নিয়ে কোন বিধিনিষেধ না থাকলেও সেবাপ্রিয়তা ছিল না, বিশেষত তিন গোয়েন্দা আর মাসুদ রানা। ছোটবোনের সঙ্গিনীকে আবাল্য তিনি প্রবল স্নেহ এবং বাৎসল্য দেখিয়েছেন। শেলফের ডুপ্লিকেট চাবি আমার কাছেই থাকতো। বড় হয়ে ক্ষতিপূরণ দেব, এই মর্মে নিজের কাছে নিজেই শপথ করলেও সেই প্রতিজ্ঞা রাখতে পারিনি।
ভদ্রলোক এখন সুদূর ট্রাম্পল্যান্ড নিবাসী; শেষবার দেশে এসে বিষয়সম্পত্তি নিয়ে পিতার সাথে আংরেজিতে গালিগালাজের গল্প শুনে শৈশবস্মৃতির সেই উষ্ণতা মুছে গেছে।
এসব মোহগ্রস্ত দিনলিপি অন্যকেউ লিখে গেছে আগে...
রোদের রং আর ঘ্রাণের কোন প্রথাগত রিভিউ কি হয়?
এ আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির পাঁচালি—নারায়ণগঞ্জ নিবাসী লেখকের আশির দশকের স্মৃতিগাঁথার বিপরীতে নব্বই দশকের বন্দরনগরীর কিশোরীর রোমন্থন আর ভীমরতির চর্চা। যে অংশটুকু লেখকের একক, নিতান্তই অল্পবয়সী এক দম্পতির অসংখ্য স্বপ্নমাখা সেইসব দিনরাত্রির -সেই নিখাদ ভালবাসায় দিনযাপনের অংশটুকু পুরো বইতে আমার সবচেয়ে প্রিয়—ফেসবুকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত অবস্থায় যখন পড়েছি, তখনো তাই ছিল।
ভালবাসা করে আশা তোমার অতল জল, শীতল করবে মরুভূমি..
কী অর্বাচীনতা নিয়ে এই দূরাশা যুগের পর যুগ ধরে লোকে করে যায়, আহারে...
গন্তব্য দিকশূন্যপুর?
ত্রিশ পেরুনো জীবনে যে অংশ আমার প্রিয়, তার এক শব্দের নাম স্বাধীনতা। আর্থিক, মানসিক, সামাজিক। চাইলেই উপেক্ষা করতে পারি অপ্রিয় স্বজনের উপস্থিতি, ক্রয়ের সামর্থ্য আছে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় শৌখিন সামগ্রীর। সুযোগ আছে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার অনেক অ-নেক পরে বাড়ি ফেরার। মায়ের শাসন আর ভ্রুকুটির সেই গা শিরশিরে ভয়ের দিন কেটে গেছে, জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার।
চাইলেও সুযোগ নেই শৈশবে ফেরার। শাসনে, বারণে, পাড়াতুতো আত্মীয়তায়, টিফিন ভাগ করে নেয়া বন্ধুত্বের উষ্ণতায়, বারান্দার গ্রিলে লতিয়ে ওঠা জুঁইফুলের ঘ্রাণের শৈশব!
যে শৈশবে শীতের নরম রোদে ছাদে মেলে দেওয়া মাদুরের ওপর বসে গ্রোগাসে গিলে নিতাম ‘অথই সাগর’ কিংবা ‘বাক্সটা প্রয়োজন’; যে বয়সে ‘নীল হাতি’ আর ‘তোমাদের জন্য রূপকথা’র প্রথম পাতায় লেখা থাকতো—“তিথীকে আদর—বড়মামা”...
সেই অপাপবিদ্ধ জীবনের পাতায় ফিরিয়ে নেয় আলতো এক বাতাস।
কালো ধোঁয়ামাখা রাজধানীর বদ্ধ, বক্র জীবনে ঘুমের মতো ক্লান্তিহীন মুহূর্তের সেই বাতাসকে টেনে আনতে পারার জন্য লেখককে ধন্যবাদ। :)
March 20, 2026
ঈদের ছুটিতে মোট ৩টা নতুন বই পড়ার ইচ্ছে ছিল আমার। এই বইটি তার প্রথম বই। কিনে জমিয়ে রেখেছিলাম বেশ কিছুদিন, কারণ স্মৃতিকথা আর ফেলে আসা সময়ের গল্প একটা অলস সময়েই পড়তে ভালো লাগে আমার। সময় নিয়ে রোমন্থন করতে ইচ্ছে করে স্মৃতির গুপ্তখাতা।
ঢাকা আমার পছন্দের শহর নয়। দুদিনের জন্য গেলেই হাঁপিয়ে ওঠে মন। কিন্তু পুরনো ঢাকার ঐশ্বর্য আমাকে বিপুল আলোড়িত করে। গত বছর তাই প্ল্যান করেই পুরনো ঢাকার কিছু দ্রষ্টব্য দেখতে গিয়েছিলাম। যেসব গল্প বইয়ের পাতায় এত জীবন্ত, সেই অতীতের ঘ্রাণ মাখা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে যখন শ্যাওলামাখা ইট, বহু দশক আগের প্যাটার্নের বাড়িঘর নিজ হাতে ছুঁয়ে দেখেছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন অতীত ছুঁয়েছি।
রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রং- আরো একবার ফিরিয়ে নিয়ে গেল এক অপার্থিব সময়ে। লেখকের শৈশবের সঙ্গে পুরোপুরি না মিললেও অনেক কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, যেন এক টাইমমেশিনে করে ফিরে গিয়েছিলাম সুদূর সময়ে।
বেকারির ব্রেড আর কলাপাতায় মোড়া মাখনের ঘ্রাণ এসে ধাক্কা মারছিল নাকে। এই সময়গুলো দেখা হয়নি, উৎসবে পালাপার্বণে ধর্ম নির্বিশেষে একই ধরনের আচার পালন করছেন সবাই। নিরামিষের দিন, আমিষের দিন আলাদা।আমরা এখনো এর কিছু কিছু রিচুয়ালস পালন করি যদিও।
তিন গোয়েন্দা শুরুর আগেই লেখক বড় হয়ে যান। তাই তাঁর স্মৃতিতে বেশি এসেছে অ্যাসটেরিক্স আর মাসুদ রানা। আমরা অ্যাসটেরিক্স এর যুগটা তেমন পাইনি। আমাদের শৈশব ঘিরে ছিল প্রাণের কমিক্স। চাচা চৌধুরী, বিল্লু, পিংকি ছিল নিত্যসঙ্গী। আর টিনটিন তো টাইমলেস।
সকাল থেকে চাইছিলাম খুব বৃষ্টি হোক। আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে, রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রঙের সঙ্গে মেঘ আর বৃষ্টির মিতালি কিন্তু মন্দ হয় নি। এমন আয়েশী, ইচ্ছেমতো ছুটির সকাল-খুব বেশি যেন নস্টালজিয়া উস্কে দেয়। চোখে জল আসে।
পুরনো ঢাকার অলিগলি একসময় যাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠত, এখন নানা ব্যস্ততার ভীড়ে যাদের সময় হয় না সেই অতীতকে অনুভব করার তাদের জন্য এই বইটি একটা সময়যানই বটে।
পথ বদলে যায়,
স্মৃতিরা কথা কয়,
পুরনো শহরেই,
নতুন রূপান্তরের সময়...
আমার শহর যেন
এক মস্ত টাইম মেশিন...
ঢাকা আমার পছন্দের শহর নয়। দুদিনের জন্য গেলেই হাঁপিয়ে ওঠে মন। কিন্তু পুরনো ঢাকার ঐশ্বর্য আমাকে বিপুল আলোড়িত করে। গত বছর তাই প্ল্যান করেই পুরনো ঢাকার কিছু দ্রষ্টব্য দেখতে গিয়েছিলাম। যেসব গল্প বইয়ের পাতায় এত জীবন্ত, সেই অতীতের ঘ্রাণ মাখা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে যখন শ্যাওলামাখা ইট, বহু দশক আগের প্যাটার্নের বাড়িঘর নিজ হাতে ছুঁয়ে দেখেছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন অতীত ছুঁয়েছি।
রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রং- আরো একবার ফিরিয়ে নিয়ে গেল এক অপার্থিব সময়ে। লেখকের শৈশবের সঙ্গে পুরোপুরি না মিললেও অনেক কিছুই যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, যেন এক টাইমমেশিনে করে ফিরে গিয়েছিলাম সুদূর সময়ে।
বেকারির ব্রেড আর কলাপাতায় মোড়া মাখনের ঘ্রাণ এসে ধাক্কা মারছিল নাকে। এই সময়গুলো দেখা হয়নি, উৎসবে পালাপার্বণে ধর্ম নির্বিশেষে একই ধরনের আচার পালন করছেন সবাই। নিরামিষের দিন, আমিষের দিন আলাদা।আমরা এখনো এর কিছু কিছু রিচুয়ালস পালন করি যদিও।
তিন গোয়েন্দা শুরুর আগেই লেখক বড় হয়ে যান। তাই তাঁর স্মৃতিতে বেশি এসেছে অ্যাসটেরিক্স আর মাসুদ রানা। আমরা অ্যাসটেরিক্স এর যুগটা তেমন পাইনি। আমাদের শৈশব ঘিরে ছিল প্রাণের কমিক্স। চাচা চৌধুরী, বিল্লু, পিংকি ছিল নিত্যসঙ্গী। আর টিনটিন তো টাইমলেস।
সকাল থেকে চাইছিলাম খুব বৃষ্টি হোক। আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে, রোদের ঘ্রাণ আর বাতাসের রঙের সঙ্গে মেঘ আর বৃষ্টির মিতালি কিন্তু মন্দ হয় নি। এমন আয়েশী, ইচ্ছেমতো ছুটির সকাল-খুব বেশি যেন নস্টালজিয়া উস্কে দেয়। চোখে জল আসে।
পুরনো ঢাকার অলিগলি একসময় যাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠত, এখন নানা ব্যস্ততার ভীড়ে যাদের সময় হয় না সেই অতীতকে অনুভব করার তাদের জন্য এই বইটি একটা সময়যানই বটে।
পথ বদলে যায়,
স্মৃতিরা কথা কয়,
পুরনো শহরেই,
নতুন রূপান্তরের সময়...
আমার শহর যেন
এক মস্ত টাইম মেশিন...
September 22, 2026
ভিত্তিহীন সময়গুলোতে সিনেমার কৌতুকের মতো নীল ঘন মেঘে হুড়মুড় করে গড়িয়ে পড়ে দর্শকদের অশ্রুভেজা গান উপহার দেয়া কিংবা ফেলে আসা শহরের স্মৃতিতে কাতর হয়ে ছাদে শুকোতে দেয়া পুরোনো বয়সের কাপড়গুলোতে লেপ্টে থাকা স্পর্শাতীত ঘ্রাণ নিতে নিতে শৈশবের হাতাকাটা সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পড়ে মহল্লার পর মহল্লা আইসক্রিম গাড়ির পেছনে ছুটতে থাকা বলাকটির চিন্তা লেখকের স্মৃতি চিড়ে চলে আসে আমাদের কল্পনায়। বইটা পড়তে গিয়ে আমরাও ডুবে আসতে থাকি লেখকের সাথে তার শৈশবে-কৈশোরের পুতুলনাচ আর বনের ধারের বৃষ্টি পূর্ব গন্ধে ভেসে বেড়ানো উদাস দুপুরের মতো। স্মৃতিগদ্য আমার বরাবরই প্রিয়। মানুষের অতীতে বাঁচার লোভের ফাঁদ কল্পনার চেয়েও আদিম। তারা বার বার ফিরে যেতে চায় ফেলো আসা দিনগুলোর গর্জন করা অনাবিষ্কৃত সময়গুলোত-ভেসে ডুবে আসতে চায় তাদের হৃদয় কয়েক দশক ধরে না দেখা সেই বিকেল পালিয়ে দোকান থেকে রিং চিপস আর ঝাঁঝালো পানীয় পান করা স্বাদের নস্টালজিয়ায়।
ঢাকা শহরে বসবাসরত জীবগুলোর অবস্থান থেকে স্কুল ছুটির আগের দিন রাত্রি জাগার আনন্দের মতো একটা শিশুসুলভ আগ্রহ আর আবেগে আপ্লূত করে দিতে পারে বইটা পড়তে গেলে। কিংবা পড়তে পড়তে বহুকাল আগে খাওয়া কোন খাবারের স্বাদ ইন্দ্রিয়তে আঘাত করে জল এনে দিতে পারে জিহ্বে। worth it একটা বই।
ঢাকা শহরে বসবাসরত জীবগুলোর অবস্থান থেকে স্কুল ছুটির আগের দিন রাত্রি জাগার আনন্দের মতো একটা শিশুসুলভ আগ্রহ আর আবেগে আপ্লূত করে দিতে পারে বইটা পড়তে গেলে। কিংবা পড়তে পড়তে বহুকাল আগে খাওয়া কোন খাবারের স্বাদ ইন্দ্রিয়তে আঘাত করে জল এনে দিতে পারে জিহ্বে। worth it একটা বই।
March 31, 2026
কক্সবাজারে শৈশব আর চট্টগ্রামে কৈশোর কাটানো একজন মানুষের জন্য ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে সহজে নিজেকে মেলানো স্বাভাবিকভাবেই একটু কঠিন। মাঝেমধ্যে শুধু চাকরির পরীক্ষার জন্য ঢাকায় যাওয়া—এই শহরের সঙ্গে গভীর কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি গড়ে ওঠার সুযোগ দেয় না। তবু লেখকের জাদুকরি বর্ণনায় ৮০-৯০ দশকের ঢাকাকে যখন জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখি, তখন সেই দূরত্বটুকু আর থাকেনা। বরং মনে হয়েছে গল্পের সব ঘটনা যেন আমার নিজের বেড়ে ওঠা শহরেই ঘটছে।
চমৎকার।
চমৎকার।
April 21, 2026
নস্টালজিয়া টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি।
Displaying 1 - 10 of 10 reviews











