সুন্দরবনের একটি গ্রাম ছোট মোল্লাখালিতে আছড়ে পড়ে একটি উল্কা। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোন চরম বার্তা বয়ে এনেছে সে?
অজানা সংক্রমণের কবলে পড়েন কলকাতার একটি বায়ো-কেমিস্ট্রি ইনস্টিটিউটের দুই তরুণ গবেষক। খবর পাওয়া যায় রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয়েছে ছোট মোল্লাখালির একটি কিশোরের। এই মৃত্যুর সঙ্গে কী যোগ আছে এই উল্কার? তদন্তে নেমে পড়েন লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের তরুণ অফিসার সাম্যরুপ সরকার। আলাপ হয় ইনস্টিটিউটের গবেষক শাবেরী রায়চৌধুরীর সঙ্গে। ইতোমধ্যে মুখঢাকা এক দুষ্কৃতী সাম্যরুপকে আক্রমণ করে তারই বাড়ির পার্কিং লটে। বিপজ্জনক একটি এক্সপেরিমেন্ট করতে লুকিয়ে ল্যাবে ঢোকে শাবেরী। কোন প্রলয়ের ইঙ্গিত পায় সে?
এরইমধ্যে ইনস্টিটিউটে আবির্ভাব হয় নতুন একজন প্রফেসর শৈবলিনী সেনের। ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ উদধি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কি পূর্ব পরিচয় আছে শৈবলিনীর? এই উল্কা রহস্যের সাথে শৈবলিনী ও উদধির কি কোনো সম্পর্ক আছে? ঘনিয়ে ওঠে রহস্য। সাম্য-শাবেরী কি পারবে রহস্যের জট খুলতে?
আকাশ থেকে নেমে আসা এক উল্কাখণ্ড আশ্রয় নিল সুন্দরবনের গণ্ডগ্রাম ছোটো মোল্লাখালি-র জঙ্গলে। অন্য কোন প্রাণের বীজ নিজের বুকে বয়ে আনল সে? সরকার থেকে একটি বিশেষ অনুসন্ধানকারী দলকে পাঠানো হল সেখানে। কিন্তু তারা এসে পৌঁছোনোর আগেই দুই কিশোর অ্যাডভেঞ্চার করতে বেরিয়ে ওই পাথরটার সংস্পর্শে এল। তারপর... একটা জমজমাট বায়োথ্রিলারের সম্ভাবনা জাগিয়ে শুরু হওয়া এই উপন্যাস কিন্তু এর পর বাঁক নিল প্রেম, ভালোবাসা, ঈর্ষা, সন্দেহ, তজ্জনিত খুনখারাপি— এইসব হার্ডকোর সামাজিক ব্যাপারস্যাপারে। সেদিক দিয়ে লেখাটা বেশ উপভোগ্যই ছিল। লেখার গুণে ও যৌক্তিক বিস্তারেও সেটি আনপুটডাউনেবল ছিল। ফলে বইয়ের শেষ অবধি ধেয়ে যেতে অসুবিধে হয়নি। কিন্তু... এত টানটান এবং স্বাদু লেখার মধ্যে তিনটি বিষয় নিয়ে প্রবল ক্ষোভ থেকে গেল। সেগুলো হল~ ১. বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান কমিটির প্রধানের নিজস্ব আর্কটি পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক এবং অর্থহীন ছিল। ২. অণুজীবটির মাত্র একটি প্রভাব— সে-ও প্রায় ফ্যান্টাসির মতো করে— দেখানো হলেও সেটির জৈব-বৈজ্ঞানিক দিকটি ব্যাখ্যা করা হয়নি। কীভাবে সে কাউকে ভেক্টর আর কাউকে ভিক্টিম করে, সেটা নিয়েও কিছু বলা হয়নি। ৩. বইয়ের শুরুটা একটা নাটকীয় কথোপকথন দিয়ে হলেও বাকি উপন্যাসে আমরা তার কোনো প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া দেখতে পাইনি। এই ধরনের ক্ষেত্রে সরকারি অনুসন্ধান যেভাবে হয়, সেটাও দেখিনি উপন্যাসে। সব মিলিয়ে এটা উত্তরের তুলনায় প্রশ্নই রেখে গেল বেশি মাত্রায়। বইটির মুদ্রণ চমৎকার। সু-অলংকৃত ও সুন্দরভাবে লে-আউট করা লেখাটি পড়তে ভালো লেগেছে। তবে ওই যে বললাম... বইটাকে বায়োথ্রিলারের বদলে "পোস্ট-করোনা দিনগুলিতে প্রেম" হিসেবেই মনে রাখব।
প্রলয়বীজ শেষ করেছি প্রায় মাস খানেকের ওপর হয়ে গেছে কিন্তু আলসেমি কাটিয়ে যুক্তিসঙ্গত ভাবে একটা রিভিউ আর লেখা হয়ে ওঠেনি। এক হঠাৎ আঁছড়ে পড়া উল্কাপিণ্ড, দুই ভাইয়ের রসায়ন, একজন ট্যালেন্টেড বিজ্ঞানী ও তাঁর টিম, একটা ভাইরাস, একজন দায়িত্ববান পুলিশ, একজন কৌতুহলী গবেষক আর এক রাশ কুয়াশায় ঘেরা রহস্য- সব মিলিয়ে গল্প টা যে সরল রেখায় যায় না সেটা বুঝতে বেশিক্ষণ লাগে না। সুন্দরবনের গ্রামে ধেয়ে আসা উল্কাপিন্ড থেকেই কি জন্ম নেয় এক অজানা নতুন রোগের ? এই রোগের উৎস কি খুঁজে পাবে ডঃ উদধি আর তার টিম নাকি তার আগেই অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে? প্রশ্ন অনেক কিন্তু উত্তর সব পাওয়া যায় না গল্পে। গল্পের গতি তার সব চেয়ে বড় স্ট্রেংথ আবার সব চেয়ে বড় দুর্বলতাও। যে দ্রুত বেগে গল্পটা ছোটে তাতে আর যাই হোক বইটা রেখে দেওয়ার ইচ্ছেও হয়না। আবার মনে হয় চরিত্র গুলো কে আরেকটু সময় দিয়ে আর একটু গভীর করতে পারতেন লেখক। গল্পের পরিধি গল্পের প্লটের তুলনায় একটু বেশিই সীমিত লেগেছে। একটা উল্কাপাতের মতো জরুরি বিষয়ে রিসার্চ জাতীয় স্তরে হওয়ার কথা, কিন্তু তা রাজ্যের মধ্যেই সীমিত থেকে যায়। গল্পের সব চেয়ে বড় গুণ তার ভাষা। লেখকের ভাষার ওপর দখল স্পষ্ট বোঝা যায়- ভাষার ব্যবহার সাবলীল আবার শেষের জায়গায় তো বেশ কাব্যিক ও । গল্পের ক্লাইম্যাক্সটি সত্যিই অপ্রত্যাশিত এবং খুবই অনন্য যদিও তার বিশ্লেষণ খুবই সাডেন। আরো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল। কিছু জায়গায় লেখক চমকের জন্য এমন কিছু ঘটিয়েছেন যা যার কোন যৌক্তিকতা নেই। গল্পে আমার মূল আকর্ষণ ছিল মানুষের জটিল মনোস্তত্ত্ব নিয়ে লেখক যেভাবে খেলেছেন। মনের গভীর গহবরে যে নিষ্ঠুর চিন্তা ভাবনা গুলোকে সমাজের নিয়মের চাপে আমরা লুকিয়ে রাখি, সেগুলোই কিভাবে আমাদের তাড়া করে বেড়ায় সেটা গল্পে খুব ভালো করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে । লেখকের প্রথম উপন্যাস হিসেবে বেশ পরিণত লেখা, কিন্তু আশা করছি লেখক পরের উপন্যাসের প্লট আরো বিস্তৃত আরো প্রসারিত করবেন।
গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন যে রাগ, হিংসা, ঘৃণা এগুলি এমন এক অস্ত্র যা অন্যের প্রতি নিক্ষিপ্ত হওয়ার সাথে সাথে অস্ত্রধারীকেও ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে। বন্দুকের রিকয়েলের মতন, এক অতি সাংঘাতিক রিকয়েল। ঋষভ চট্টোপাধ্যায় এর 'প্রলয়বীজ' আপাতদৃষ্টিতে একটি উৎকৃষ্ট মানের সায়েন্স ফিকশন ঠিকই, কিন্তু এই কল্পবিজ্ঞ্যানের আড়ালেই একটি সুক্ষ নীতিগল্প বুনেছেন লেখক। ক্রোধ, ঈর্ষা আর ঘৃণার গল্প। কোনও ভাইরাস যখন ছড়িয়ে পড়ে, সেটা আসলে তার বাঁচার চেষ্টা। বিজ্ঞানের ভাষায় 'সারভাইভাল ইন্সটিঙ্কট'। 'প্রলয়বীজ' এরকমই এক টিকে থাকার প্রবৃত্তি নিয়ে গল্প। সুন্দরবনে আছড়ে পড়া গ্রহাণু, তার থেকে ছড়িয়ে পড়া এক রহস্যময় রোগ, এবং তাতে আক্রান্ত মানুষদের এই মারাত্মক 'সারভাইভাল ইন্সটিঙ্কট' এর বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক মরিয়া যুদ্ধের গল্প 'প্রলয়বীজ'। তবে এই গল্প আদতে একটি উপক্রমণিকা বা 'প্রোলগ'। ১৪৩ পাতায় শেষ হওয়ার পরও এর একটি অবশেষ আছে, যা হয়তো আমরা ভবিষ্যতে দেখতে পাব। গল্প দ্রুতগামী, এবং পটু হাতে লেখা। দক্ষ পড়ুয়ারা একই দিনে শেষ করে দিতে পারবে এই বই। কিছু জায়গায় সংলাপ এবং দৃশ্য নির্মাণ একটু খটমট লেগেছে আমার, কিন্ত যেহেতু এটা লেখকের প্রথম উপন্যাস তাই সেগুলি নিয়ে অত মাথা ঘামাইনি। 'প্রলয়বীজ' কেন পড়বেন? যে সময়ে বাস করছি আমরা সে এক বড় উদ্ভট সময়। চার্লস ডিকেন্সের 'আ টেল অব টু সিটিজ' শুরু হয় এই উক্তি দিয়ে - "ইট ওয়াজ দ্য বেস্ট অব টাইমস, ইট ওয়াজ দ্য ওয়ার্স্ট অব টাইমস।" 'প্রলয়বীজ' কোথাও গিয়ে এই বর্তমান সময়ের সেই 'মন্দ' এর উপাখ্যান। একটি 'প্যারাবেল' যা বারবার এটাই জিজ্ঞেস করে যে মানবিকতা আসলে কী? 'বেস্ট'? 'ওয়ার্স্ট'? নাকি দুটোই? আপনি কোনটা বেছে নেবেন?