হীরালাল বসু কলকাতায় চাকরি পেয়ে বাগবাজার অঞ্চলে এসে মধু মুখুজ্জেদের বাড়িতে ওঠে। সময়টা উনিশ শতকের ষাটের দশকের প্রথম দিক। সেখানে থাকার সময় তার সঙ্গে আলাপ হয় বসন্তসেনার। আশ্রিতা বসন্তসেনা কিশোরী অবস্থা পেরিয়েছে সদ্য। হীরালাল আর বসন্তসেনার মধ্যে এক আশ্চর্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে তার মধ্যে চলে আসেন বড়মা, বিনিদি, পিশেবাবু। আসেন জনসাহেব। হীরালালের বন্ধু সতু ও তার স্ত্রী লীলাও থাকে এই ঘটনা প্রবাহের মধ্যে। কিন্তু তারপর জীবন পালটায়। হীরালালের বেঁচে থাকা এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। বসন্তসেনার সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ে। ক্রমে সময় কাটে। হীরালাল নানান দেশ ঘুরে বেড়ায় কাজের সূত্রে। তারপর জীবন আবার বাঁক নেয় তার। আর আবার সেই আশ্চর্য সম্পর্ক ফিরে আসে জীবনে। কিন্তু তারপর? হীরালাল কি আদৌ পৌঁছতে পারে তার ইচ্ছের কাছে? তার মনের বাউল সুতো কি আদৌ নিজের বীজ বপন করতে পারে জীবনের মাটিতে?
উনিশ শতকের কলকাতাও উপন্যাসের এক চরিত্রের মতোই এসে ধরা দেয় পাঠকের কাছে। সহজ, মসৃণ গদ্যে লেখা এক আশ্চর্য প্রেমের উপাখ্যান এই ‘বাউল সুতো’। জীবনের চড়াই উতরাই পার করে এই উপন্যাস আমাদের কাছে পৌঁছে দেয় ভালবাসার চিরন্তন আলো।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর জন্ম ১৯ জুন ১৯৭৬, কলকাতায়। বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। পৈতৃক ব্যবসায় যুক্ত। প্রথম ছোটগল্প ‘উনিশ কুড়ি’-র প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত। প্রথম ধারাবাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত। শৈলজানন্দ স্মৃতি পুরস্কার ২০১৪, এবিপি এবেলা অজেয় সম্মান ২০১৭, বর্ষালিপি সম্মান ২০১৮, এবিপি আনন্দ সেরা বাঙালি (সাহিত্য) ২০১৯, সানডে টাইমস লিটেরারি অ্যাওয়ার্ড ২০২২, সেন্ট জেভিয়ার্স দশভুজা বাঙালি ২০২৩, কবি কৃত্তিবাস সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩, উৎসব পুরস্কার ২০২৪, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড ২০২৪, আনন্দ পুরস্কার (উপন্যাস: '‘শূন্য পথের মল্লিকা') ২০২৫ ইত্যাদি পুরস্কারে সম্মানিত ।
এই বইয়ে এমন কিছু নেই যা পড়ার পর মনে দাগ কেটে যাবে। একটি ছেলে তার চেয়ে উঁচু জাতের মেয়ের প্রেমে পড়ে। সেই মেয়েটির বিয়ে অন্য কোথাও হয়ে যায়। বিয়ের পর মেয়েটি বিধবাও হয়ে যায়। ততদিনে ছেলেটি বড় চাকরি করে সমাজের উঁচু স্তরে চলে এসেছে। সর্বশেষে সে মেয়েটিকে নিয়ে পালায়। চেনা-পরিচিত একঘেয়ে প্লট। লেখকের অনবদ্য লেখনীই এই বইয়ের একমাত্র প্রাপ্তি।
"নদীও কি মানুষের মনের মতো হয়? সেখানেও কি গোপন টান প্রবাহিত হয় অবিরাম? নদী না হয় সমুদ্রের দিকে যায়। কিন্তু মন, সে কার দিকে যায়? কার কাছে গিয়ে মিশে যেতে চায় তার স্রোত? নদীর জল যেমন সমুদ্রের জলে মিশে অস্তিত্ব হারায়, তেমন মানুষের মন কেন অন্যের মনে মিশে, নিজের অস্তিত্ব হারিয়েও সুখী হয়?"
উনিশ শতকের কলকাতাকে পটভূমি করে লেখা হলেও বাউল সুতো আসলে সময়ের উপন্যাস নয়, এটি হৃদয়ের উপন্যাস। বেনারস থেকে আগত হীরালাল এবং মুখুয্যে বাড়ির আশ্রিতা বসনের প্রেমই এর কেন্দ্রবিন্দু। জাতপাতের কঠোরতা, লালসার অন্ধকার, অপমানের দহন এবং দীর্ঘ বিরহের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যে মিলনের দিকে তাদের যাত্রা, সেই পথচলাই এই আখ্যানের প্রাণ।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী বরাবরই প্রেমের কথক। এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। ‘বাউল সুতো’ নামের মধ্যেই আছে রূপক। তুলোর উড়ে যাওয়া আঁশের মতোই প্রেম এখানে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, তবু অদৃশ্য সুতোর টানে বাঁধা। বসনের জন্য তুলে রাখা আতরের শিশি যেমন অপেক্ষার সুগন্ধ বহন করে, তেমনি এই সুতো বহন করে স্মৃতি, প্রত্যাবর্তন আর অঙ্গীকারের ইশারা।
ঐতিহাসিক আবহ নির্মাণে কিছু অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে। চরিত্রদের ভাষা অনেক সময় সমকালীন শোনায়; ঘটনাপ্রবাহেও কোথাও কোথাও কাকতালীয়তার ছাপ রয়েছে। ফলে ১৮৭০-এর কলকাতার বাস্তবতা পুরোপুরি স্পর্শ করা যায় না। তবে গদ্যের মেদুরতা, আবেগের ঘনত্ব এবং বিরহের দীর্ঘ সুর পাঠককে টেনে নিয়ে যায় শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। ইতিহাসের নির্ভুলতা নয়, অনুভূতির সত্যই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অমিতাভ চন্দ্র-এর অলঙ্করণ উপন্যাসটিকে দিয়েছে দৃশ্যমান এক আবেশ। পুরনো গলির ধুলো, অন্দরমহলের আলো-আঁধারি, চোখের ভেতর জমে থাকা আকাঙ্ক্ষা—সবই যেন ছবির রেখায় স্পন্দিত।
সব মিলিয়ে বাউল সুতো নিখুঁত ঐতিহাসিক উপন্যাস না-ও হতে পারে; বরং ইতিহাসের আড়ালে এটি প্রেমের এক গীতিকাব্য। আর আজ, ১৪ই ফেব্রুয়ারি—ভ্যালেন্টাইনস ডে-র দিনে, এই উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হয়, সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, কিন্তু প্রেমের সেই অদৃশ্য ‘সুতো’ আজও সমান টানেই জড়িয়ে রাখে মানুষকে।
সেই টানেই, সমস্ত ত্রুটি সত্ত্বেও, পাঠকের হৃদয়ে আবারও জায়গা করে নেন প্রেমের ম্যাজিশিয়ান।
"I almost wish we were butterflies and lived but three summer days - three such days with you I could feel with more delight than fifty common years could ever contain." - John Keats
বেনারস থেকে কর্মসূত্রে হীরালাল এসে পৌঁছেছে কলকাতায়। হীরালালের বাবা মা নেই; তাঁর ইচ্ছে কিছু সময় চাকরি করার পর পরিব্রাজক হয়ে বেড়িয়ে পরবে। কোনো পিছুটান রাখতে চায় না সে। মায়ের কথা মতো হীরা বাউল সুতোর মতো হতে চায়। তবে জীবন কি সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলে? পিশেবাবুর গদিতে চাকরি করার সময়ে এবং তাঁদের বাড়িতে থাকাকালীন আচমকা হীরারলালের দেখা হয়ে যায় বসন্তসেনার সাথে। কি হয় এরপর?
উপন্যাসের প্রেক্ষাপট সিপাহী বিদ্রোহের কিছু সময় পরের কলকাতা। প্রাসঙ্গিকভাবেই সেই সময়ের নানান সমাজ ব্যবস্থা, রীতি, নীতি এসবই উঠে এসেছে উপন্যাসে কিন্তু ওই সময়ের আসল ম্যাজিক এই উপন্যাসে খানিকটা ম্রিয়মান। তবে স্মরণজিৎ ম্যাজিক পুরো মাত্রায় আছে - যা এই উপন্যাসের চালিকা শক্তি। ওঁনার বাকি উপন্যাস গুলোর মতই শেষটা হয়তো সবার জানা তবে লেখনীর গুণেই না থেমে সবটা পড়ে ফেলা যায়। আমার ব্যক্তিগত ভাবে বেশ ভালোই লেগেছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছাড়াও বেশ কিছু চরিত্র মন কেড়েছে। যাঁরা প্রেমের উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, তাঁরা একবার পড়ে দেখতেই পারেন।
"হীরালাল বোঝে, একাকিত্বের মতো বড় অভিশাপ আর কিছু নেই এই পৃথিবীতে। এত মানুষের মধ্যে একাকী থাকা এক অদ্ভুতরকমের কষ্ট।"