হাকিনীরা খুব নিচু স্তরের পিশাচ। এদের বুদ্ধিবৃত্তি পশু শ্রেণীর হলেও ক্ষমতা প্রচণ্ড। এদেরকে ডেথ এঞ্জেল ও বলা যায়। ডেকে এনে যার মৃত্যু চাওয়া হয় তাকে একবার চিনিয়ে দিলেই হলো। বাকি কাজ তাদের। তবে সমস্যা হলো, যার জন্য ডাকা তাকে মারতে না পারলে যে ডেকেছে তাকেই মেরে ফেলবে হাকিনী। এত কিছু জেনেও মন্ময় চৌধুরীর সাহায্যে হাকিনী জাগানোর সাধনায় বসল সঞ্জয়… প্রিয় পাঠক, হাকিনীর মত আরও বেশ কিছু রক্ত হিম করা হরর ও পিশাচ কাহিনি দিয়ে সাজানো হয়েছে এ সংকলন। অনীশ দাস অপু সম্পাদিত হরর সংকলন আপনি পছন্দ করেন কারণ, তাঁর বইয়ের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে ভয় ও রোমাঞ্চ। এই বইটিও আশা করি আপনাদেরকে হতাশ করবে না।
জন্ম ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯। জন্মস্থান বরিশাল, পিতা প্ৰয়াত লক্ষী কান্ত দাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অনার্স সহ এম, এ করেছেন। ১৯৯৫ সালে | লেখালেখির প্রতি অনীশের ঝোক ছেলেবেলা থেকে । ছাত্রাবস্থায় তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং মাসিক পত্রিকাগুলোতে চিত্তাকর্ষক ফিচার, গল্প এবং উপন্যাস অনুবাদ শুরু করেন । হরর এবং থ্রিলারের প্রতি তাঁর ঝোকটা বেশি। তবে সায়েন্স ফিকশন, ক্লাসিক এবং অ্যাডভেঞ্জার উপন্যাসও কম অনুবাদ করেননি। এ পর্যন্ত তাঁর অনুদিত গ্ৰন্থ সংখ্যা ১০০’র বেশি। অনীশ দাস অপু লেখালেখির পাশাপাশি সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত। তিনি দৈনিক যুগান্তর- এ সিনিয়র সাব এডিটর হিসেবে কাজ করেছেন । তবে লেখালেখিই তার মূল পেশা এবং নেশা ।
ষোলোটা গল্প। সেরা নিঃসন্দেহে তৈমূর সাহেবের "হাকিনী"। মিলন গাঙ্গুলীর "হরর গল্প লিখতে চেয়েছিলাম" পড়ে প্রচুর হাসলাম। ইমরান খান-এর "বালাই" অথেন্টিক ভয়ের। রুমানা বৈশাখী-র "ভয়" এবং আফজাল হোসেন-এর "বহুরূপী"-ও সলিড। বাকি গল্পগুলো বড্ড ফর্মুলাইক, নয়তো বলিয়া বা না-বলিয়া বিদেশি কাহিনির বঙ্গীকৃত রূপ। মোটের ওপর বেশ ভালোই। সন্ধেবেলা জমিয়ে বললে রাতে বউ জাপটে ধরে ঘুমোবে, এমন আশা করাই যায়। তবে বাথরুমে যাবে বলে যদি মাঝরাতে ডেকে তোলে, আমারে দোষ দিয়েন না।
- মরণবার্তা (Casting the Runes - M.R. James) - প্রেতিনী (The Apparition - Guy De Maupassant) - হ্যালোইনের রাত (Trick or Treat - J.B. Stamper) - কাল কি আমার বিয়ে হবে? ( Only a Dream - Sir Henry Rider Haggard)
বইটাতে নতুন পুরানো লেখক মিলিয়ে মোট ষোলোটা গল্প প্রকাশ হয়েছিল। সবগুলোর ব্যাপারে হালকাপাতলা লেখার চেষ্টা করলাম। গল্পের আকার ছোট ছোটই, তাই কাহিনী বিষয়ে না বলে প্রতিক্রিয়া লিখলাম।
১. হাকিনী - মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর
এই মানুষটার লেখার ব্যাপারে আমার কখনোই আসলে কিছু বলার থাকে না। বাংলাদেশে মৌলিক হিস্টোরিক্যাল ফ্যান্টাসি-থ্রিলার তার মতো কোনোদিন কেউ লিখতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না, আর পারার সম্ভাবনাও নেই। "হাকিনী" আমার পারসোনাল ফেভারিট একটা উপন্যাসিকা। আর লেখক যে সেরা এবং অসাধারণ সেটা এই লেখায় আরো একবার প্রমাণিত হয়েছে।
২. বালাই - ইমরান খান
কাহিনীর বিচারে বলতে গেলে একদম নিখুঁত না হলেও বেশ ভালো একটি গল্প৷ কিছু কিছু টুইস্ট আগে থেকেই অনেকটা ধরে ফেলা গিয়েছে, তবে লেখার ধরণ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। যে প্রেক্ষাপটে গল্পটা সাজানো হয়েছে তাও ভালো লেগেছে।
৩. ভয় - রুমানা বৈশাখী
আতঙ্কের পরিমাপে গল্পের রেটিং যদি দশে আট দেয়া যায়, তবে গা ঘিনঘিন করার পরিমাপে দশে দশ দিতে বাধ্য। হরর হিসেবে এই গল্প খুব ভালোভাবে উৎরে গেলেও পারসোনালি লেখাটা আমার পছন্দ হয় নি। পিউর হরর জন্রাটা আমাকে কখনোই ওরকমভাবে টানে না।
৪. বহুরূপী - আফজাল হোসেন
রহস্যপত্রিকার হরর লেখকদের মধ্যে আমার প্রিয় যারা সবসময় ছিলেন তাদের মধ্যে একজন আফজাল হোসেন। তার একেকটা গল্প পড়ার পর আপনি নতুন করে উপলব্ধি করতে পারবেন আতঙ্ক কাকে বলে, কতো প্রকার ও কি কি। এতো ভয়াবহ সব প্লট তার মাথায় কোথা থেকে আসে কে জানে! বহুরূপী আলাদারকম একটা ফিলিং দেয়।
৫. মরণবার্তা - এম. আর. জেমস / কাজী শাহনূর হোসেন
গল্পটাই তাড়াহুড়ো করে লেখা নাকি অনুবাদটাই এমন খাপছাড়া সেটা আমার জানা নেই৷ কিন্তু লেখা বা কাহিনী কোনোটাই পছন্দ হয় নি। ছোট একটা পরিসরের মধ্যে হুড়মুড় করে কি বুঝানো হলো বুঝতে পারলাম না।
৬. প্রেতিনী - গী দ্য মোপাসাঁ / দিলওয়ার হাসান
এটার ব্যাপারে মন্তব্যও অনেকটা মরণবার্তার মতোই। পার্থক্যটা এই যে, এটা তুলনামূলক গুছানো ছিল। কিন্তু মনে ধরবার মতো তেমন ভয়ানক কিছু নয়।
৭. সর্পকন্যা - নাকচুয়াং পেক / মিজানুর রহমান কল্লোল
সর্পকন্যা গল্পটা কোরিয়ান লোককথা ধরণের কিছু। গ্রামাঞ্চলে লোকের মুখে মুখে প্রচলিত ভূতের গল্পের অনুবাদ। পড়তে বাচ্চাদের ভূতের গল্পের মতো লাগলেও বেশ মজার ছিল।
৮. রাত ঠিক বারোটা! - রিয়াজুল আলম শাওন
এই গল্পটা তুলনামূলকভাবে ভালো লেগেছে। কয়েকটা জায়গায় ক্লিশে ধরণের থাকলেও সব মিলিয়ে অতোটা খারাপ নয়।
৯. ঘুমবাড়ি - শামীম আল মামুন
হাকিনীর পরে এই বইতে আমার দ্বিতীয় প্রিয় গল্প "ঘুমবাড়ি"। খুবই খুবই এবং খুবই দারুণ লেগেছে আমার কাছে। শামীম আল মামুন এরকম আরো কোনো গল্প লিখেছেন কি না আমার জানা নেই, কিন্তু যদি লিখে থাকেন তবে পড়ার ইচ্ছে রয়েছে।
১০. ফকির - হাসানুজ্জামান মেহেদী
গল্পটা দারুণ কিছু একটার আশা দিয়ে শুরু হয়ে বেশ কিছুক্ষণ চমৎকারভাবে এগোলো। তারপর হঠাৎ করে একদম ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো। শেষটাও আশাহত করতে ছাড়ে নি।
১১. অন্য ভুবন - রাসেল আহমেদ
এই লেখকের লেখা পড়ে অনেকটাই আফজাল হোসেনের লেখার কথা মনে হচ্ছিল। পারফেক্ট হরর স্টোরি, শেষের দিকে রীতিমতো গা শিউরে উঠেছে।
১২. মৃত্যুখেলা - মোঃ রাকিব হাসান
এই গল্পটা প্রথম পড়েছিলাম সম্ভবত রহস্যপত্রিকায়। গল্প মোটামুটি ভালো, আহামরি কিছু মনে হয় নি কেন না প্রচলিত ধরণের কাহিনীই নতুন করে লেখা।
১৩. লাল বিবি - রতন চক্রবর্তী
রতন চক্রবর্তী রহস্যপত্রিকায় বেশ কয়েকটি হরর লিখে পরিচিত। কিন্তু এই গল্পটা মুগ্ধ করতে পারে নি।
১৪. হ্যালোইনের রাতে - জে. বি. স্ট্যাম্পার / তারক রায়
জে. বি. স্ট্যাম্পার এর আরো লেখা পড়া হয়েছে রহস্যপত্রিকারই সুবাদে, তার গল্পগুলো চমৎকার হয়। তারক রায়ের লেখাও সবসময় দেখেছি ভালো লাগার মত। এই অনুবাদটা প্রশংসনীয়।
১৫. হরর গল্প লিখতে চেয়েছিলাম - মিলন গাঙ্গুলী
নেগেটিভ পজিটিভ মিলিয়ে বলছিলাম এতক্ষণ। বইয়ের অন্য যে গল্পগুলো অতোটা ভালো লাগে নি, দারুণ না হলেও ফেলে দেয়ার মতো নয়। কিন্তু এটা একদমই "লেইম" ছিল বলতে পারেন। স্কিপ করার মতো।
১৬. ��াল কি আমার বিয়ে হবে? - হেনরী রাইডার হ্যাগার্ড / অনীশ দাশ অপু
হেনরী রাইডার হ্যাগার্ডের লিখা গল্প। অতএব বুঝতে পারছেন, অনুবাদের হিসাব বাদ ��িলেও গল্পটা পড়তে পারেন। কেবল হ্যাগার্ড বলেই মিস করা ঠিক হবে না।
অনীশ দাস অপু সম্পাদিত ভৌতিক গল্প সংকলন। যে গল্প দুটির কারণে বইটি খুব ভালো লেগেছে, সে গল্প দুটি নিয়ে আলোচনা করলাম। বইয়ের বাকী গল্পগুলো মোটামুটি মানের। তবে মন্দ বলা যাবে না। বইটি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
বহুরূপী (আফজাল হোসেন) - বইয়ের সবচাইতে দারুণ গল্প। আসলে এই একটা গল্পের কারণেই এই বইটা এত প্রিয়। হায়দার সাহেবের বাড়ির নিচতলায় নতুন এক দম্পতি এসে ওঠে। তারা দম্পতি হলেও তাদের একসাথে কখনই দেখা যায় না। স্বামী বাড়িতে থাকলে স্ত্রী সে সময় থাকেন না। আবার স্ত্রী থাকলে স্বামী বাইরে। একদিন হায়দার সাহেবের বড় মেয়ে লিলি হঠাৎ বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। তারপরই জমে ওঠে কাহিনী। গল্পটার শেষে এসে জোর একটা ধাক্কা খাবেন।
হাকিনী (মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর) - বইয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্প। বাবাকে ফাঁসানোর চক্রান্তকারীকে শিক্ষা দেবার জন্য ছেলে একজন সাধকের সাহায্য নিয়ে হাকিনীকে ডাকে। তন্ত্র মন্ত্র, শব সাধনা, হাকিনীকে ডাকার প্রক্রিয়া ইত্যাদি পড়ার সময় বার বার বিভূতিভূষণের তারানাথ তান্ত্রিকের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। লেখক আলমগীর তৈমূরের লেখার হাত ভালো। তবে বড় গল্প হলেও কিছু কিছু জায়গায় তিনি অতিরিক্ত বর্ণনা দিয়ে ফেলেছেন।
আপডেট: হাকিনী গল্পটা আসলে তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত তারানাথ তান্ত্রিক বইয়ের প্রথম গল্পটার (এটা আগে পড়া হয়নি, একটু আগে পড়লাম) একখানা বর্ধিত সংস্করণ। আলমগীর তৈমূর কেবল গল্পটাতে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা জুড়ে দিয়ে কলেবর বাড়িয়েছেন। মূল প্লট সেইম। তারানাথের গল্পে প্রতিশোধের নেশায় তন্ত্র সাধনা করে বেতালকে জাগিয়ে প্রতিশোধ নিতে পাঠানো হয়। বেতাল ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে কাপালিককেই হত্যা করে। আর হাকিনী গল্পে বেতালের পরিবর্তে হাকিনীকে জাগিয়ে তুলে প্রতিশোধ নিতে পাঠানো হয় এবং যথারীতি হাকিনী প্রতিশোধ নিতে ব্যর্থ হয়ে প্রতিশোধকামী ব্যক্তিকে হত্যার জন্য ফিরে আসে। বইয়ের মাত্র দুইটা গল্প ভালো লাগছিলো, তার ভেতর একটার প্লট কপি। একটা তারা কমিয়ে দিলাম। কে জানে, 'বহুরূপী' গল্পটাও আবার অন্য কোনো লেখকের প্লটের কপি কিনা!
বইতে আরো যেসব গল্প রয়েছেঃ বালাই (ইমরান খান), ভয় (রুমানা বৈশাখী), মরণবার্তা (কাজী শাহনূর হোসেন), প্রেতিনী (দিলওয়ার হোসেন), সর্পকন্যা (মিজানুর রহমান কল্লোল), রাত ঠিক বারোটা (রিয়াজুল আলম শাওন), ঘুমবাড়ি (শামীম আল মামুন), ফকির (হাসানুজ্জামান মেহেদী), অন্য ভুবন (রাসেল আহমেদ), মৃত্যুখেলা (মোঃ রাকিব হাসান), লাল বিবি (রতন চক্রবর্তী), হ্যালোইনের রাতে (তারক রায়), হরর গল্প লিখতে চেয়েছিলাম (মিলন গাঙ্গুলী), কাল কি আমার বিয়ে হবে? (অনীশ দাস অপু)।