একুশে বইমেলা ২০১৫ এর সমালোচিত,সর্বাধিক বিক্রিত এবং প্রশংসিত বইয়ের তালিকা করলে যে নামটি অবধারিত ভাবে উঠে আসবে প্রথম দশে তা হলো মুহাম্মদ জাফর ইকবালের গ্রামের নাম কাঁকনডুবি।প্রকাশিত হবার প্রথম থেকেই বইয়ের মূল্য নিয়ে যেভাবে সবার সমালোচনার শিকার হয়েছে,সে অনুসারে বইয়ের বিক্রিতে তার প্রভাব দেখা যায় নি। এর কারণ হতে পারে বইটি মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের লেখা তাই, অন্য আরেকটি কারণ হয়তো এটিই যে বইটি মুক্তিযুদ্ধ এর সময়কে নিয়ে লেখা এবং জাফর ইকবাল স্যারের মতো করে এত সুন্দর , সহজ অথচ একই সাথে যুদ্ধের পাশবিকতা ছোটদের জন্য তুলে ধরতে আমার মতে এ দেশে আর কোন লেখক পারেন না।
এই বই নিয়ে বলতে গেলে কোন জায়গা থেকে বলা শুরু করবো আর কোথায় গিয়ে শেষ করবো তা সত্যি জানিনা। 'গ্রামের নাম কাঁকনডুবি' কি মায়াময় নাম! সম্পূর্ণ বইটাই তার নামের মতো মায়াময়। একদম প্রথম পৃষ্ঠা থেকে পাঠককে মায়ায় জরিয়ে ফেলতে সক্ষম।প্রধান চরিত্র কাঁকনডুবিতে থাকা কিশোর রঞ্জুর জবানিতে পুরো গল্পটা শুরু হয়েছে যুদ্ধ শুরু হবার বেশ কয়েক মাস আগে থেকে শেষ হয়েছে বিজয়ের পর পর সময়ে এসে। আর দশটা বাংলার গ্রাম যেমন হয় , সেই রকমই সাধারণ একটা গ্রাম কাঁকনডুবি। এখানে অন্য গ্রামের মতোই একজন পাগল মানুষ আছে, একজন ফালতু মানুষ আছে, একটা চায়ের দোকান আছে যেখানে গাঁয়ের মানুষ বসে রাজনৈতিক আলাপ করে, একটা বিরাট স্কুল আছে, কালী গাং নামে একটা রাক্ষুসী নদী আছে। এ গ্রামে হিন্দু মুসলমান মিলেমিশে থাকে, একসাথে উঠে বসে খায়, সবাই সবাইকে চিনে এমনকি গ্রামের গরু ছাগল কুকুর গুলো পর্যন্ত সবার সাথে পরিচিত। শান্তির দিনগুলো তে রাজনৈতিক হাওয়াবদল কিশোর রঞ্জুদের মনে না লাগলেও একসময় সময়ের দাবীতেও তারা ঠিকই সচেতন হয়ে উঠে। বড়দের ভাবনার কারণ গুলো তাদেরকেও ভাবায়। একসময় শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। যে বয়সটায় ধান কেটে ফেলা শুন্য ক্ষেতে রঞ্জুদের নির্ভয়ে খেলবার কথা ,সেই সময়টায় তারা সব বন্ধ করে মানুষের আতঙ্ক দেখে, মানুষরূপী জানোয়ারদের নির্মমতা দেখে, বেঈমানি দেখে। তারপর বদলে যাওয়া সময়টাকে টেক্কা দেবার গল্প জানতে হলে বইটার পাতায় ডুবে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় দেখিনা।
প্রথমে আসি বইয়ের লেখার কথায়। জাফর ইকবাল স্যারের লেখার ধরণ নিয়ে কথা বলাটা আমার কাছে ধৃষ্টতা মনে হয়।সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধ কে নিয়ে লেখাটা ওনার সবেচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য এর জায়গা। আমার বিশ্বাস ওনাকে এই বিষয়ে মাত্র এক প্যারা লিখতে বলা হলেও উনি তার মধ্যেই যুদ্ধের গভীরতা সব বয়সের সবার কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হবেন। ওনার পরবর্তী প্রজন্মদের ছোট থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি ছোট বড় বিষয় এর প্রতি সংবেদনশীল করে গড়ে তুল্বার পেছনে ওনার অবদান ভুলবার মতন নয়। তাছাড়া বইটি এত ভাল লাগবার পেছনে অন্যতম কারণ হলো তার বর্ণনাশৈলী। এমন ভাবে উনি কাঁকনডুবির প্রতিটা জায়গার বর্ণনা দিয়েছেন মনে হবে যেন রঞ্জু, মামুন, মাসুদ ভাই এর সাথে সাথে পাঠক নিজেও গ্রামের ভিতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বলাই কাকুর দোকানের চা হোক বা কাজী বাড়ির ফুলের বাগান , শহীদ মিনার বানানোর জন্য ইট সংগ্রহ হোক বা পাকিস্তানীদের ক্যাম্প আক্রমণ -পড়ার সময় মনে হবে প্রতিটা জায়গায় আমি নিজে ছিলাম। একটা বই একজন পাঠকের তত বেশি ভাল লাগবে যত বেশি সে কল্পনা করতে পারবে।। আর এই কল্পনাকে উশকে দেবার জন্য লেখকের লেখার- বর্ণনা করবার ধরণ টা প্রভাবকের মতো কাজ করে। একদিকে যেমন প্রচণ্ড আনন্দ পেয়েছি মজার মজার ঘটনা পড়ে, তেমনি পাকিস্তানি টর্চারসেলে অত্যাচারের বর্ণনার কথা পড়ে গা শিউরে উঠেছে, একসময় পৃষ্ঠা উলটোতেও ভয় পেয়েছি। খুব কম লেখক আছেন যারা তার পাঠককে কল্পনার নেশায় বুঁদ করে ফেলতে পারেন, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল সেই অল্প কয়েকজন সৌভাগ্যবান লেখকদের মধ্যে একজন তা তিনি আবার এই বইটার মাধ্যমে প্রমাণ করলেন।
'প্রথমে দর্শনধারী, তারপর গুনব���চারি' বলে একটা কথা আছে না? এই কথাটা কতখানি সত্য তা এই বইখানা হাতে নিলে বোঝা যায়। কি সুন্দর প্রচ্ছদ। মনকাড়া রঙ, সেইসাথে বন্দুক নিয়ে দুজন ক��শোর মুক্তিযোদ্ধার ছবি।এখানেই শেষ না। বইয়ের পাতায় কিছুদূর পর পর সুন্দর সুন্দর ইলাসট্রেশন যা কল্পনাকে আরও উশকে দেয়। ছবিগুলোর খুব বেশি দরকার ছিল নাহলে হয়তো বইটা আরেকটু কম উপভোগ করতাম। কখনো কিছু ছবি দেখে আনন্দিত হয়েছি, কখনো ক্ষোভ হয়েছে, কখনো খুব কান্না পেয়েছে। ছবিগুলো না থাকলে বোধয় ভোঁতা হয়ে যাওয়া অনুভূতিটা সেভাবে নাড়া খেতোনা।
পাতার পর পাতা লিখলেই তো লেখক হওয়া যায়না তার সাথে সাথে কাহিনীর অগ্রসরতা, চরিত্রের পরিপক্বতা , প্লট হোল এসব বিষয়েও খেয়াল রাখতে হয়। যুদ্ধ যে মানুষকে কিভাবে বদলে দিতে পারে তার প্রভাব লেখক খেয়াল করে তার চরিত্র অংকনে যেভাবে তুলে ধরেছেন তা মনকে শান্তি দেয়। রঞ্জু বা কলেজ এর ছাত্র মাসুদ এর প্রথম দিকে যেভাবে সামনে এসেছে এবং পরে তাদের চরিত্রে যে আমূল পরিবর্তন ও আচার ব্যাবহার কথাবার্তায় যে পরিপক্বতা দেখা দিয়েছে তা প্রশংসনীয়। কাহিনী পড়তে গিয়ে একটুও মনে হয়নি অযথা টেনে টেনে লম্বা করা হয়েছে বরং মনে হয়েছে আরেকট্য থাকলে কি ক্ষতি হতো। চরিত্র তা মাইনর হোক বা মেজর কোনটিই হারিয়ে যায়নি একে অন্যের ছায়ায়। ঠিক যতটুকু যেখানে দরকার সেইখানে সেইভাবে উপস্থিত করেছেন লেখক - এটি বইটির অন্যতম চমৎকার একটা দিক।রাজাকারের মতো শ্লীল-সম্মানসূচক শব্দ কিভাবে অবস্থা এবং ব্যবহারের প্রেক্ষিতে গালিতে পরিণত হয় তা ধরা পরে একটি মাত্র হতাশাময় লাইনে,- 'মানুষ রাজাকার হয় কিভাবে?' একটা কিছু ছোট খাটো ভুল তো আছেই তা অভারলুক করে যাওয়া যায় গল্পের ভাল দিকগুলোর জন্য। চরমপত্র শুনবার এক জায়গায় লেখা আছে, "বাঙালি পোলাপান বিচ্ছুরা দুইশ পঁয়ষট্টি দিন ধইরা বাঙাল মুলুকের কেদো আর প্যাকের মইদ্যে ওয়ার্ল্ড ফাইটিং পজিশন পাইয়া আরে বাড়ি রে বাড়ি!" -যুদ্ধ তো তখনও শেষ হতে অনেক দেরি, ২৬৫ দিন কিভাবে হলো। এই ভুলটা সংশোধন করবার দরকার নাহয় জানায় একটা গলদ থেকে যাবে।
অনেকেই এটাকে "আমার বন্ধু রাশেদ" এর সাথে তুলনা করছেন। আমার মতে দুটো বই নিজ নিজ মহিমায় ভাস্বর। এটি 'আমার বন্ধু রাশেদ' এর সমতুল্য কিনা সেই তর্কে জাচ্ছিনা কিন্তু সমানে সমানে টেক্কা দিয়েছে তা বলা বাহুল্য।আমার মতে তুলনায় যাওয়াও উচিত না কারণ দুটো কাহিনীর প্রেক্ষাপট এক হলেও ঘটনার অবস্থান ভিন্ন এবং গ্রামের নাম কাঁকনডুবি অপেক্ষাকৃত আরেকটু বড়দের জন্য লেখা। তাই এখানে বীরাঙ্গনাদের কথা অল্প পরিসরে উঠে আসলেও মাত্র কয়েকটা লাইনে লেখক তাদের মানসিক অবস্থা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন- 'মেয়েগুলো আমাদের দিকে তাকাল, চোখের দৃষ্টি এত আশ্চর্য যে আমার বুকটা ধক করে উঠল। এত তীব্র দৃষ্টি আমি কখনো দেখিনি, সেখানে কোনো বা আতঙ্ক নেই, দৃষ্টিটা আশ্চর্য রকম তীক্ষ্ম। আমি কী বলব, বুঝতে পারলাম না। ঢোঁক গিলে বললাম, “আপনাদের আর কোনো ভয় নাই। যুদ্ধ শেষ। খোদার কসম। যুদ্ধ শেষ।” লালচে চুলের একটা মেয়ে, যার চোখের দৃষ্টি সবচেয়ে ভয়ংকর, সে আস্তে আস্তে প্রায় ফিসফিস করে বলর, “তোমাদের যুদ্ধ শেষ আমাদের যুদ্ধ শুরু।"'
যারা বলেন মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার এর কলমের জোর কমে যাচ্ছে, উনি একই পল্টে বারবার দিস্তার পর দিস্তা লিখে যাচ্ছেন এবং প্রকাশ করছেন প্রতি বছর তাদের মত পাল্টাতে আশা করি এই বইটা সাহায্য করবে আর খাঁটি আনন্দ ও দুঃখের যে মিশ্রণ পাওয়া যাবে তার কথা নাই বা বললাম।