কুহেলিকা বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি উপন্যাস। ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে কলকাতা থেকে প্রকাশিত মাসিক নওরোজ পত্রিকায় “কুহেলিকা” উপন্যাসের প্রথম অংশ প্রকাশিত হয়। তার কিছুদিন পর নওরোজ বন্ধ হয়ে গেলে সওগাত পত্রিকায় তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে এটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে কাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিফলিত হয়, স্বাধীনতাকামী ভারতবাসীর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে এই উপন্যাসে।
Kazi Nazrul Islam (Bengali: কাজী নজরুল ইসলাম) was a Bengali poet, musician and revolutionary who pioneered poetic works espousing intense spiritual rebellion against fascism and oppression. His poetry and nationalist activism earned him the popular title of Bidrohi Kobi (Rebel Poet). Accomplishing a large body of acclaimed works through his life, Nazrul is officially recognised as the national poet of Bangladesh and commemorated in India.
"নজরুল, তুসি গ্রেট হো " এতো এতো আলোকপ্রাপ্তের লেখা আমরা পড়ি। উপন্যাস, গপ্পো আর কবিতাও বাদ দিই না। কিন্তু নজরুলের উপন্যাসের পাঠক পাওয়া ভার, আলোচনা তো নাই ই।
৯১ পৃষ্ঠার দারুণ একটি উপন্যাস। বিশশতকে যখন স্বদেশী আন্দোলন তুঙ্গে, বাঙালি বিপ্লবীরা প্রাণ দেয়া নেয়ার নেশায় মগ্ন, অথচ দলে নিতে নিমরাজি বাঙালি কোনো মুসলমানকে। হিন্দু- মুসলমান সম্পর্ক বিষিয়ে উঠছে। সেই সময়কে উপন্যাসের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখলেন নজরুল।
"কুহেলিকা" বিদ্রোহ কবির অতুল চন্দনে দেখা সকাল বেলার স্বপ্নের মত। এত সুন্দর প্রতিটি জায়গা, যাতে আছে শুধু দেশের বন্দনা। মানুষ জন্ম শুধু তো দেশকে কিছু দেওয়ার জন্য। জন এফ কেনেডি বলেছেন, দেশ তোমাকে কি দিল তা খোঁজ কর না, তুমি দেশকে কি দিয়েছো তা দেখ! কবি তো তার জীবন সর্বস্ব দিয়ে দিয়েছে দেশ মাতৃকার সেবায় যার প্রতিফলন কুহেলিকা।
তিনি জাহাঙ্গীরের চোখে দেশ মাতাকে স্বাধীন করতে চেয়েছেন। বিদ্রোহীর চেয়ে বড় প্রেমিক কেউ নয়, তার জন্য ভূণীর জন্য হঠাৎ জাহাঙ্গীরের মনে দিয়েছেন অঢেল ভালোবাসা। যার চোখের কোণে হিন্দু মুসলমানের মিলন তিনি এঁটে দিয়েছেন। প্রমত্ত দা জানেন মুসলমানের রক্তের দান কেমন? তারা কখন পিছপা হয় না শত মৃত্যুর ভয় থাকলেও। জাহাঙ্গীর পুরো বাংলার মুক্তির সংগ্রাম। যে নারীকে ঘৃণা করে, তাদের ভালোবাসাকে অভিশাপ মনে করে আত্মহুতি দিতে চায় দেশের জন্য। কিন্তু যেখানে মায়ার অর্গল খাড়ার মত দাঁড়িয়ে সেখানে যে মায়া তৈরী হয়, শত পাথর হৃদয়েও।
কুহেলিকার সংক্ষিপ্ত সার্রমম হল, জাহাঙ্গীর একজন বিদ্রোহী। সে চায় দেশকে স্বাধীন করতে। কিন্তু তার মনে শুধু ঘৃণা কারণ সে জারজ সন্তান। তার কুমিল্লা জেলায় জমিদারী কিন্তু সে সেই জমিদারের অংশত দাবিদার নয়। দুঃখের মাঝেও সে স্বপ্ন দেখে দেশকে স্বাধীন করে সে দেশমাতৃকার সন্তান হবে।
এটা পড়ে শুধু জানালা দিয়ে উড়াল দিতে ইচ্ছে করে আকাশর।বিষন্ন মন খারাপের সকালে উসকোখুসকো ভাবনা নিয়ে রাস্তায় বের হলে আমার খুব বাজে ভাবে মরে যেতে ইচ্ছে করে। এত আর্বজনার ভীড়ে নিজেকে সবচেয়ে বড় আর্বজনা লাগে। চারদিকে ধূলো জমা প্রস্তর রাস্তা, পাশে মৃত গাছ, ল্যাম্পপোস্ট গুলো মৃত্তিকা জমানো স্থির দৃঢ় অশ্বত্থের মতো দাড়িয়ে। কেবলি মনে হয়, এই বাংলা তো এমন ছিল না। এই রাস্তায় ঘাসের বিচালি ছিল। পাশে সবুজ, স্বর্ণালি ধানের খেত ছিল, কচুরিপানায় ফুটে থাকে পানা ভরা ফুল ছিল, কোথায় গেল? বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে করে। শত অনিয়মের ভিতর নিজের জন্মটাকে ঘৃণা লাগে। আমি কি কিছুই করতে পারব না?
সুখের সামনে সৌন্দর্য খসে পড়ছে, মানুষ বদলে যাচ্ছে। আমি কেন আদিম সভ্যতার দিকে তাকিয়ে আছি, আমি জানি না!
কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কোন উপন্যাস পড়ে শেষ করলাম। স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা উপন্যাসটি আমার মনে ধরেছে। জাহাঙ্গীর, তহমিনা (ভূণী), হারুন, চম্পা, প্রমত্তদা- চরিত্রগুলো যেন বাংলার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে পাঠকের সামনে তুলে এনেছে। নজরুলের লেখা অন্যান্য সাহিত্যকর্মগুলো পড়ার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে 'কুহেলিকা'। এতদিন কঠিন মনে করে পড়ার সাহস করিনি। কিন্তু এই উপন্যাস পড়ে মনে হল নজরুলের লেখা অত কঠিন না, অন্তত আমি হজম করতে পারব 😶
পৃষ্ঠা সংখ্যা- ১০০ প্রধান চরিত্র- জাহাঙ্গীর, ভুণী, হারুন, প্রমত, চম্পা। পটভূমি- স্বদেশী আন্দোলন
বইটা পড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। প্রধান চরিত্র 'উল্ ঝলুল'। জাহাঙ্গীর তার ভালো নাম। এলোমেলো, বিশৃঙ্খল এক তরুণ। কিন্তু তেজোদ্দীপ্ত। আর ভুণী! যদি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে বলি, ব্যক্তিত্ব আছে, কিন্তু ব্যক্তিত্বের ব্যবহার নেই। ভুণী কেন তার অপ্রকৃতস্থ মায়ের প্রলাপকে নিজের জীবন বলে মনে করবে? যে তাকে পায়ে দলিত করে চলে যায়, তাকে কেন নিজের সর্বস্ব দিবে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো যৌক্তিক উত্তর নজরুল খোলাসা করেননি।
বিংশ শতাব্দীর স্বদেশী আন্দোলন, বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড আর প্রাণ দেয়া-নেয়ার নেশা, হিন্দু-মুসলিমের মধ্যকার বৈরী সম্পর্ক সবকিছুই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে উপন্যাসটিতে; কিন্তু ঘটনাকে যারা প্রবাহিত করে নিয়ে গেছে, তারা প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত জীবনে আনস্টেবল, আর খানিকটা মাংসপিপাসুও বটে।
হ্যাঁ, সেই দিক থেকে নজরুল সার্থক। তিনি চরিত্রগুলোকে কেবল বইয়ের পৃষ্ঠার জন্য সৃষ্টি না করে বাস্তব জগতের সাথে সাদৃশ্য রেখেই সৃষ্টি করেছেন।
বারবার বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে ঠোঁটের পাশের মাংসপেশি প্রসারিত করার মাধ্যমে “হা” করে চিন্তা করছিলাম–“আমি কবি কাজী নজরুল ইসলামকে চিনেছিলাম,তাঁর কবিতায় ভরা ঠাসা বই সময়ের স্রোতে আর মনের তরঙ্গে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম;কিন্তু কবির এ আবার কেমন রুপ দেখছি এই উপন্যাসখানার প্রতিটি পৃষ্ঠার অপরুপ দীপ্তিতে।অস্তিত্ব আর মানব চরিত্রের মধ্যে যতটুকু ফাঁক আমার চিন্তার তলানিতে ঘষা লেগে তৈরি হয়েছিলো তা যেনো এক নিমেষে ভেদাভেদ ভুলে আপন ছন্দে একাকার হয়ে গেলো।” নানান সুরের কবিতা লেখার পাশাপাশি নজরুল কেবল তিনটি উপন্যাস লেখার অবকাশ পেয়েছিলেন এবং এই তিনটি উপন্যাস আমার মনোজগতের দালানে এমনভাবে আঘাত হানবে যে, ঐ মনোজগতের যেই প্রবৃত্তি তাকে প্রতিনিয়ত আফিম খাইয়ে সত্যের বালুচরে মরুভূমির মরিচীকা দেখাচ্ছিলো তা কুঁড়েঘরের কোণে সারাক্ষন প্রার্থনা করার পর অনাবৃত সূর্যের নগ্ন সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে অনায়াসে সত্যের বালুচরে ডুবে যেতে সক্ষম।
কবি নজরুল তুখোড় হাতে কাব্য রচনা করে গেলেও উপন্যাসের বেলায় শুধুমাত্র তিনটে উপন্যাস রচনা করেই ক্ষান্ত দেন। সেই তিনটার একটা, কুহেলিকা পড়ছিলাম আজ। পড়ার পর থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া কাজ করছে!
উপন্যাসের পটভূমি স্বদেশী আন্দলন যেটা ব্রীটিশদের শাসন থেকে ভারত স্বাধীনতার একটা অংশ। এ সম্পর্কে আরো জানতে গিয়ে গুগলে একটা সে সময়ের জনপ্রিয় পোস্টার পেলাম যাতে মহাত্মা গান্ধী চরকা কাটছেন এবং তাতে লেখা, "নিজ চরকা ও স্বদেশে মনোযোগ দিন!" অর্থাৎ, স্বদেশ তো অবশ্যই সাথে নিজ চরকার দিকেও খেয়াল রাখা উচিত। এসব কথা বলার কারণ? পর্যায়ক্রমে উপন্যাসের কয়েকটি চরিত্রের উপর প্রথমে ভালোবাসা, পরে রাগ এবং শেষে বিরক্তি চলে আসা!
মূল চরিত্র জাহাঙ্গীর। বন্ধুমহলে সে পরিচিত "উলঝেলুল" নামে। নামের পেছনের কারণ তার এলোমেলো খেয়ালি আচরণ! জমিদারপুত্র জাহাঙ্গীর বুকে বয়ে চলে এক ভীষণ বেদনা, সে বেদনা কি? উপন্যাস পড��ে জানতে হবে। এমন বেদনা নিয়ে সে মধ্যাহ্নের সূর্যকে নমস্কার করে বলেছিলো,- "জানিনা বন্ধু তোমার বুকে কিসের এতো জ্বালা! কোন অভিমানে তুমি পুড��াইয়া মারিতেছ এই শান্ত ধরণীকে! আমার এ বুকে তোমারই মতো জ্বালা বন্ধু! কিন্তু সে জ্বালায় জ্বলিয়া আমিও কেন তোমার মত মধ্যাহ্ন দিনেক সূর্য হইয়া উঠিনা? কেন আমার জ্বালা তাহার জ্বালার সাথে আলোও দান করিতে পারেনা!" তার আরেক পরিচয় সে বিপ্লবী। স্বদেশী আন্দলনের বিপ্লবী। উপন্যাসের শুরুর দিকে তার প্রতি কী ভিষন একটা ভালো লাগা যে গড়ে উঠে!
উপন্যাসের কাহিনী বাঁক নেয় উলঝেলুল তার দরিদ্র কবি বন্ধু হারুনের বাড়িতে গেলে। এখানে অবতারনা হয় উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র তহমিনা ওরফে ভূণী'র। ভূণীকে লেখক তুলে ধরতে চেয়েছেন এক দৃঢ়চিত্ত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী চরিত্র হিসেবে। তবে এ কেমন দৃঢ়চিত্ত নারী যে উন্মাদ মায়ের প্রলাপ অনুযায়ী জীবন উৎসর্গ করে দিতে চায় এমনই এক মানুষকে, যে তাকে হেলায় ফেলে দেয় বারবার? জীবন তো উন্মাদিনীর প্রলাপে চলতে পারে না। আর কেউ যদি তার জীবন সে অনুযায়ী পরিচালনা করে, তবে সে নিজেও উন্মাদ বই কিছুনা!
প্রমত্ত দা! উপন্যাসের বেস্ট পার্ট ছিলো প্রমত্ত দা'র বিপ্লবী চিন্তাধারা। পড়তে পড়তে বেশ অনেকবার মনে হয়েছে বর্তমান সময়ে এমন পরিষ্কার, শুদ্ধচিন্তার মানুষ ভীষন দরকার।
উপন্যাসের কাহিনী এগুতে থাকে তার মতো করেই। তবে, কেন নারীকে কুহেলিকা বলা হলো আর এই উপন্যাসের নামও কেনই বা সেটা হলো, আমি আসলেই বুঝতে পারিনি। মানে, উপন্যাসের ধারা ও বিষয়বস্তুর সাথে রিলেট করতে পারিনি। আবার, চরিত্র গুলোর নিজ জীবনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখে বিরক্ত হতে যেয়েও হঠাতই মনে হয়েছে হয়ত লেখক তাদের উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে না দেখে বাস্তব জীবনের চরিত্র মনে করেছেন। যেখানে মানুষের মনে বিচিত্র রঙ খেলা করে, যেটা উপন্যাসের পাতার চেয়েও বেশি বৈচিত্র্য ভরা।
কাজী সাহেবের ‘কুহেলিকা’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই নজরুল ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের উল্লেখ আসবেই। দুটি বইই বাংলা সাহিত্যের বুকে দুটো দ্রোহের শিখা। দুটোই প্রায় এক সময়েই রচিত, তবে তাদের প্রকাশনার ইতিহাস খানিকটা জটিল আর ঘটনাবহুল।
‘কুহেলিকা’ প্রথম প্রকাশ পায় ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে ‘নওরোজ’ নামের এক পত্রিকায়। আষাঢ় সংখ্যায় বেরোয় প্রথম অধ্যায়, তার পরের দুটো সংখ্যায় আসে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়। কিন্তু পাঁচ নম্বর অধ্যায় বেরোনোর পর পত্রিকাটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়—সেই অধ্যায়টি পরে আর গ্রন্থে অন্তর্ভুক্তই হয়নি। পরে উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে চলে যায় ‘সত্তগাত’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়।
অন্যদিকে, ‘মৃত্যুক্ষুধা’র গ্রন্থ প্রকাশ ঘটে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখে, অর্থাৎ ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে। আর ‘কুহেলিকা’ সম্পূর্ণ উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হয় আরও পরে, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে।
‘মৃত্যুক্ষুধা’র রচনার সময় নজরুল কৃষ্ণনগরে পরিবারসহ বসবাস করছিলেন। কমিউনিস্ট নেতা মুজফফর আহমদের বয়ানে পাওয়া যায় সেই সময়কার জীবনের এক ঝলক ছবি—একটা খোলা প্রকৃতির বাড়ি, যার পাশেই আমবাগান আর গরিব খ্রিষ্টান-মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা। সেখানেই, রাজনৈতিক সম্মেলনের গরম হাওয়ায় বসে লেখা হচ্ছিল এই উপন্যাস।
‘মৃত্যুক্ষুধা’র প্রেক্ষাপট প্রধানত সামাজিক এবং ধর্মীয় টানাপোড়েনে মোড়া—যেখানে জাতপাত, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, এবং মনের অমিল মুখোমুখি দাঁড়ায়। পক্ষান্তরে ‘কুহেলিকা’ একদম আলাদা এক মেজাজের কাহিনি। এখানে গল্প এগোয় একটা মেস বা আড্ডার জায়গা ঘিরে, যেখানে বিশ-বাইশজন তরুণ একসাথে থাকে, হাসে, ভাবে, আর বিপ্লবের কথা বলে।
নজরুল লিখছেন, এই ‘মেস’ যেন এক ধরণের আড্ডার তীর্থস্থান—একজনের ঊরু বালিশ, আরেকজনের কাঁধে পা তুলে কেউ সিগারেট ফুঁকছে, কেউ তর্ক জুড়েছে আত্মত্যাগ আর স্বাধীনতার আদর্শ নিয়ে।
দু'টি উপন্যাসেই একাধিক স্মরণীয় চরিত্র আছে। ‘মৃত্যুক্ষুধা’-তে যেমন আমরা পাই আনসার, মেঝবৌ, প্যাকাল, কুর্শী—তেমনি ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসে আসেন প্রমত্ত, জাহাঙ্গীর, ভূনী—যারা প্রত্যেকেই নতুন সময়ের ডাক শুনে তাতে সাড়া দিয়েছে।
আনসার আর প্রমত্ত—দুজনেই বিপ্লবী, দুজনেই দেশকে ভালোবাসে, কিন্তু তাদের বিপ্লবের ভঙ্গিমা আলাদা। আনসার যেন হঠাৎ আবির্ভূত এক চরিত্র—তাকে ঘিরে নেই বড়সড় প্ল্যান, নেই সুসংগঠিত রণকৌশল। আর প্রমত্ত? তিনি যেন আগুনের ফুলকি—নিয়ন্ত্রিত, পরিকল্পিত, জ্বলন্ত। তিনি শুধু স্বরাজের ডাক দেন না, সেই ডাকের পেছনে প্রাণ সঁপে দিতে দ্বিধা করেন না।
একটা জায়গায় তিনি বলেন:
“যে মাটি আমাদের ফুল, ফল, জল, শস্য দিয়ে বড় করেছে, তার ঋণ শোধের সময় এসেছে। আমাদের রক্তে সেই ঋণবোধের মন্ত্র জ্বলুক। …দেশ শুধু আমার পিতার জননী নয়, আমার জননীরও জননী!”
‘মৃত্যুক্ষুধা’-তে ধর্মীয় সীমারেখা যেমন আনসারকে স্পর্শ করতে পারেনি—যেমন তার প্রেমিকা খ্রিষ্টান হয়ে গেলেও সে দোটানায় পড়েনি—তেমনি ‘কুহেলিকা’-র প্রমত্তও মুসলিম যুবক জাহাঙ্গীরকে বিপ্লবী দলে নেওয়ার ব্যাপারে একটুও পিছপা হন না। বরং জাহাঙ্গীর নিজের নাম পালটে ‘স্বদেশ কুমার’ নামে স্বরাজ আন্দোলনে যোগ দেন—একটা প্রতীকি রূপান্তর, যা বুঝিয়ে দেয় স্বাধীনতার লড়াইতে জাত-ধর্মের গণ্ডি কত অপ্রাসঙ্গিক।
আরো অবাক লাগে যখন দেখা যায়—তিনজন বিপ্লবী: প্রমত্ত, জাহাঙ্গীর, বজ্রপাণি—তাদেরকেও পাঠানো হয় দ্বীপান্তরে। কিন্তু সেখানে গিয়েও থেমে থাকে না দেশপ্রেম।
আনসার একবার বলেছিলেন—
“সব দেশ যদি মাথা কেটে স্বাধীন হয়, তবে এ দেশ কি সূতা কেটে স্বাধীন হবে?”
এ কথার মর্ম বুঝিয়ে দেন প্রমত্ত—যিনি রক্ত ঝরিয়ে সেই স্বপ্নের বাস্তবতা গড়তে চেয়েছিলেন।
যখন আনসার গ্রেফতার হন, তখন তার মুখে শোনা যায় এক বিস্ফোরক ভাষণ—যা ব্রিটিশ শাসকের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল:
“তোমাদের ওপর অত্যাচার হবে, শিকল পরানো হবে, নিজের দেশের লোকও বাধা দেবে—তবু থেমো না। তোমাদের শরীরের উপর দিয়েই আসবে মুক্তির আলো।”
শ্রমজীবী, মেথর, রাজমিস্ত্রি—সবাইকে তিনি ডাক দিয়েছিলেন স্বরাজের সৈনিক হওয়ার জন্য। অস্ত্রহীন হলেও সাহসে ভরপুর সেই ডাক আজও কানে বাজে।
এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে নজরুলের রাজনৈতিক আদর্শ ও মতবাদ প্রতিফলিত হয়েছে। বিপ্লবী যুবক জাহাঙ্গীর চরিত্র দিয়ে সমাজনীতি, রাজনীতি, ধর্মনীতির সফল প্রতিফলন ঘটেছে এই উপন্যাসে। উপন্যাসের রূপরেখা সমসাময়িক হলেও লেখক কাহিনী পরিচর্যা করেছেন নিজের মত করে। ব্যঙ্গ, হাস্যরস ও প্রাণের স্পর্শের পাশাপাশি মিথ-কথনের প্রয়াস রয়েছে।
নজরুলের কবিতা বা গান নিয়েই বেশি আলোচনা বা চর্চা হয়, অন্তত আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের মধ্যে। কিন্তু কথাসাহিত্যিক নজরুলও কম যান না। সময় খারাপ যাচ্ছে, তাও চেষ্টা করছি বই পড়া ধরে রাখতে। এবং আমি খুশি যে এই বইটা পড়া হলো এর মধ্যে। অসাধারণ।
একজন মানুষ দেশকে কত বেশি ভালোবাসতে পারে তা লিখে প্রকাশ করা খুবই কঠিন একটা কাজ ।কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর দেশপ্রেমের জন্য স্বার্থক । পড়া শেষ করে অবশ্যই লোকটার উদ্দেশ্যে একটা স্যালুট দেওয়া অপরিহার্য ।
উপমহাদেশে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে এক অসাধারণ গল্প। এই গল্পের মূল প্রতিপাদ্য দেশপ্রেমে উদবুদ্ধ কিছু জীবনের কাহিনী, ভালবাসার টানাপোড়েন। ঐ সময়ে সমাজের এক চুলচেরা বিশ্লেষণও উঠে এসেছে এই উপন্যাসে।