কশুমামা অর্থাৎ কৌশিককে, আপনারা এর আগেও পেয়েছেন। কী বললেন, কোথায়? কেন প্রফেসর রুদ্র সোমের বাড়িতে! জমিয়ে কড়াইশুঁটির কচুরী আর আলুর দম সহযোগে প্রফেসরের হাড় হিম গপ্পগুলোকে গোগ্রাসে গিলতে ! বোরিংপুরের বাইফোকাল কৌশিককে আপনারা পেয়েছেন, কালোর মাঝে আলোর গপ্প বলতে! আবার নভেম্বারের স্যাঁতস্যাঁতে বৃষ্টিতে, কৌশিককে আপনারা পেয়েছেন, কালো আর আলোর মাঝের সূক্ষ্ম সীমারেখায়, ট্র্যাপিজ খেলায় মাততে!
এবার কৌশিক-কশুমামা সম্পূর্ন একা। তবে তার গল্পগুলো নয়। সিঙ্গেল মেরুদন্ড বেয়ে প্লুরাল হিমস্রোত এবারেও গ্যারান্টিড! শহর বা গ্রামের নিঝুম রাত, কুয়াশার চাদরে ঢাকা পথ কিংবা নির্জন সমুদ্রতট—ভয় ও রহস্য কি কেবল নির্জনতাতেই বাসা বাঁধে? নাকি আমাদের চেনা মুখগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকে আদিম কোনো অন্ধকার? দুদিন অন্তর বদলি হওয়া ব্যাংকার কৌশিক, ওরফে 'কশুমামা'র গল্পের ঝুলিতে জমা আছে, বিভিন্ন শহর গ্রামের হাড়হিম করা সব অভিজ্ঞতা।
বাস্তব আর পরাবাস্তবের সীমারেখা যেখানে ঝাপসা হয়ে আসে, সেই গোধূলি বেলায় আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে— 'কুয়াশা যখন'।
হরর সাহিত্যের প্রতি বাঙালি পাঠকের যে স্বাভাবিক আকর্ষণ, তার একটি আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় প্রতিফলন দেখা যায় “কুয়াশা যখন” গল্পসংকলনে। এটি কেবল ভয় দেখানোর বই নয়; বরং পরিচিত জীবনের আবহে অচেনা অন্ধকারকে মিশিয়ে দেওয়ার এক সূক্ষ্ম সাহিত্যিক প্রয়াস।
বইটির আখ্যান কাঠামো বেশ চমকপ্রদ এবং ঘরোয়া। এর প্রথমদিকের গল্পগুলো আবর্তিত হয়েছে আড্ডাপ্রিয় এবং সবার আদরের চরিত্র 'কশুমামা'-কে কেন্দ্র করে। পারিবারিক আড্ডার উষ্ণ আবহে, ভাইবোন ও বড়োদের মাঝখানে বসে কশুমামা তার নিজের জীবনের বা ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে একের পর এক অদ্ভুত, গায়ে কাঁটা দেওয়া গল্প বের করে আনেন। এই ঘরোয়া পরিবেশের মাঝেই কখন যে বাস্তব আর পরাবাস্তবের সীমারেখা মুছে যায়, তা পাঠক টেরও পান না।
লেখকের সবচেয়ে বড়ো মুন্সিয়ানা হলো বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে। এখানে চিরাচরিত ভূতের ভয় নেই, বরং রয়েছে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং দাম্পত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন অন্ধকারের গল্প। রয়েছে বংশানুক্রমিক কোনো অভিশাপের হাত থেকে বাঁচার এক মর্মান্তিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের আখ্যান। নির্জন পাহাড়ি শহরে এক অদ্ভুত নাপিতের সেলুন হোক বা মন্দারমণির সমুদ্রতীরে এক নির্জন হোটেলের অজানা বিপদের হাতছানি— প্রতিটি গল্পই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।
বইয়ের শেষভাগে এসে গল্পের ক্যানভাস আরও বড়ো ও বিস্তৃত হয়। সেখানে লোককথার সঙ্গে মিশে যায় আন্তর্জাতিক স্তরের ডেমনোলজি, এক্সরসিজম এবং প্রোফেসর রুদ্র সোমের মতো অকাল্ট ইনভেস্টিগেটরের চরম রোমাঞ্চকর অভিযান।
যারা ম্যাজিক রিয়্যালিজম এবং র-হররের মিশ্রণ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য "কুয়াশা যখন" একটি চমৎকার পাঠ্য। চেনা পৃথিবীর আড়ালে যে কত অচেনা ভয় ঘাপটি মেরে বসে থাকতে পারে, এই বইয়ের গল্পগুলো সেই অস্বস্তিকর অনুভূতিটাই বারবার মনে করিয়ে দেবে।