বাংলাদেশের আদিবাসীদের সংগ্রামের সহযাত্রী এই গল্পগুলো। আদিবাসীজীবনের মতো এই গল্পগুলোও শোকের ও প্রতিবাদের। কান্নার ও রুখে দাঁড়ানোর। ঘৃণার ও ভালোবাসার। অপরিচয়ের ও নিজেকে চেনানোর। অবর্ণনীয় দারিদ্র্যের ও স্বকীয়তার অহংকারের। শিকড়ের সন্ধানে গভীরের যাওয়ার ও আকাশের দিকে স্পর্ধাময় দুহাত বাড়িয়ে দেয়ার।
আদিবাসীদের জীবন নিয়ে লেখা একজন বাঙালি লেখকের সম্পূর্ণ গল্পগ্রন্থ প্রকাশের ঘটনা এটাই প্রথম। এতে থাকা গল্পগুলো :
জন্ম ২০ জনুয়ারি ১৯৬৫, নাটোরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে। সমকালীন মূলধারার বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অপরিহার্যতা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। অনবরত বাঁকবদল তাঁর সাহিত্যিকতার প্রধান বৈশিষ্ট। বিষয় ও আঙ্গিকে, মাধ্যম ও প্রকরণে তাঁর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত অবস্থান সকল মহলেই স্বীকৃত। পেয়েছেন বাংলা একাডেমিসহ দেশের প্রধান প্রায় সকল সাহিত্য পুরস্কার।
হোমো স্যাপিয়েন্স ছাড়াও মানুষের আরো কয়েকটা প্রজাতি ছিল। কোন কারণে এরা টিকে থাকতে পারলো না। হয়তো প্রকৃতি চায় নি। হয়তো প্রকৃতি জানতো এই হোমো স্যাপিয়েন্স সর্বশ্রেষ্ঠ হবে আর এরা রীতিমত অমানুষ হবে। এদের অত্যাচারের কথা ভেবেই হয়তো প্রকৃতি ওদের ভ্যানিশ করে দিয়েছিল।
মানুষে মানুষে কত ভেদ। বাঙালি অবাঙালিদের সহ্য করতে পারে না। কতটা নিচু মানসিকতার মানুষ বাস করে এখানে! হায় আদিবাসী এদেশে তোমাদের Flora & Fauna Act দ্বারা অত্যাচারিত করা হয়নি বটে, কিন্তু আমরা তোমাদের কি কম অত্যাচার করেছি?
সব গল্পগুলোই ভালো। তবে টানাবাবা গল্পটা সেই লেভেলের আধ্যাত্মিক টাইপের। কি অসাধারণ! লেখক কি বুঝাতে চেয়েছেন সেটা বুঝতে পারিনি অবশ্য :/ :(
অবহেলিত ও নির্যাতিত-নিপীড়িত আদিবাসীদের নিয়ে বই করা যায় এমন সংখ্যক গল্প লিখেছেন, এবং বইও করেছেন, এজন্য লেখক অবশ্যই সাধুবাদ পাবেন। কিন্তু আসল জায়গাতেই গলদ ছিল। মিথ আর বাস্তব ঘটনা ও তথ্যের সঙ্গে গল্প ভালো মিশ খায়নি। যার জন্য গল্পগুলোর খুব ভালো ‘গল্প’ হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আদিবাসীদের সম্পর্কে নতুন করে তেমন কিছু জানাও গেল না। জাকির তালুকদারের উপন্যাস পড়া থাকায় তাঁর গদ্যভাষা নিয়ে উচ্চ ধারণা ছিল। এ বইয়ের গল্পগুলোর ভাষা খুবই সাধারণ। ‘টানাবাবা’ গল্পটা একটু ভিন্নধর্মী। ছয়টি গল্পের মধ্যে হয়তো শুধু এটার কথা মনে থাকবে।
গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে যে দু-একটা সমস্যা বা সংকট লেগে থাকবে চিরকাল, আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত বোধহয় তার মধ্যে প্রধান। জাকির তালুকদার লিখেছেন এই আদিবাসীদেরই বিপন্নতার গল্প। সংগ্রামের গল্প। পাহড় বা সমতল কোথাও জায়গা না পাওয়ার গল্প। প্রথম দুটো খুবই ভালো। বাকিগুলো এভারেজ, কিছুটা অগভীর। মন ছুঁতে পারে নাই তবে মনে থাকবে বহুদিন।
বইটা আগে পড়া ছিলো। কিন্তু দ্বিতীয়বার পড়তে বসার আগে গল্পগুলোর নাম মনে করতে পারিনি। অর্থাৎ, গল্পগুলো সুন্দর হলেও মনে রাখার মতো দাগ কাটেনি। এবং গল্পগুলোর বার্তা ঠিক সূক্ষ্ণ নয়। নামগল্পটা খুবই হতাশ করেছে।
শুধু বাংলাদেশে না, সারা বিশ্বে সভ্যরাই বেশি অসভ্য। আর আদিবাসীরা সবসময় অত্যাচারিত হয়, সে যে ভৌগলিক সীমানায় হউক না কেন। সভ্যতা চিরকাল নোংরামি বয়ে নিয়ে বেরিয়েছে, যুগ থেকে যুগে।
যুগের সাথে তাল মেলাতে না পাড়া মানুষগুলো নিপীড়িত হয়েছে কখনো প্রকৃতির হাতে, কখনো মানুষের হাতে। প্রকৃতির নিপীড়ন সামলে উঠলেও মানুষেরটা অত সহজ না। এ বইটা সেই মানুষের দ্বারা মানুষ শোষণের গল্প। আপনি হয়তো আঙ্কেল টমাস কেবিন বা হাকলবেরি ফিন পড়ে হাহুতাশ করেছেন অনেক, ভেবেছেন মানুষ এতো রেসিস্ট কিভাবে হয়। কিন্তু আমাদের উপজাতি বা আদিবাসীদের সাথে আমরা কেমন ব্যাবহার করি ভেবে দেখেছেন কখনো? জানতে চাইলে বইটা পড়ে দেখতে পাড়েন। বইটা কানের কাছে ধরলে হয়তো গোঙানি শুনলেও শুনতে পাড়েন।
মানুষ নামের প্রাণীটির ইতিহাস যত পুরোনো, ততটাই জটিল। আজ আমরা নিজেদের হোমো স্যাপিয়েন্স বলি, কিন্তু আমাদের মতোই মানুষের আরও কয়েকটি প্রজাতি একসময় পৃথিবীতে বিচরণ করত। হোমো নিয়ান্ডারথালেন্সিস (নিয়ান্ডারথাল), হোমো ইরেক্টাস, হোমো ফ্লোরেসিয়েন্সিস, হোমো হাইডেলবার্গেনসিস, ডেনিসোভানস এমন আরও কত নাম ইতিহাসে রয়ে গেছে। লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তন শেষে আজ আমরা কেবল এক প্রজাতির আধিপত্য দেখি, বাকিদের নাম বইয়ের পাতায় কিংবা ফসিলের নিচে হারিয়ে গেছে। প্রশ্ন জাগে কেন হারাল তারা? বিজ্ঞানীরা বলেন, হয়তো জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যের অভাব, কিংবা হোমো স্যাপিয়েন্সের প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা অন্যদের টিকতে দেয়নি। আবার কেউ কেউ বলেন, প্রকৃতি নিজেই একসময় বেছে নিয়েছিল কেবল এক প্রজাতিকে। যেন আগাম অনুমান ছিল এই প্রজাতিই একদিন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ হবে, অথচ সেই শ্রেষ্ঠত্বের ভেতরেই লুকিয়ে থাকবে ভয়ংকর অমানবিকতা। হয়তো প্রকৃতি ভেবেছিল, একাধিক মানবপ্রজাতি থাকলে এই অমানবিকতার বোঝা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠত। তাই বাকিদের সরিয়ে রেখে কেবল হোমো স্যাপিয়েন্সকে রেখে দিল, যাতে তাদের অত্যাচার কেবল তারাই ভোগ করে। কিন্তু এ শ্রেষ্ঠত্ব আসলে কী? ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায় মানুষ বারবার অন্য মানুষকে নিপীড়ন করেছে। সভ্যতার নামে, ধর্মের নামে, ভাষার নামে, কিংবা জাতিসত্তার নামে মানুষ মানুষকে হত্যা করেছে, দাসত্বে আবদ্ধ করেছে, দেশ থেকে উৎখাত করেছে। সভ্যতার যাত্রা যতই উন্নত হয়েছে, প্রযুক্তি যত এগিয়েছে, অমানবিকতার ইতিহাসও ততই দীর্ঘ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাকালেও এই সত্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমাদের দেশ, আমাদের জাতি, স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে আমরা শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। কিন্তু স্বাধীনতার পর? নিজেদের ভেতরে আমরা কি সত্যিই উদার হয়েছি? বাঙালি অবাঙালিদের সহ্য করতে পারে না এই কথাটি কঠিন হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই। ভাষা, সংস্কৃতি, এমনকি খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্যও আমাদের কাছে অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। অথচ আমরা ভুলে যাই, ভিন্নতা কোনো অভিশাপ নয়, ভিন্নতা হলো জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। এই বইয়ে আছে ছয়টি গল্প যার প্রতিটি গল্প আদিবাসীদের উপর সিস্টেম্যাটিক দমন-পীড়নের দলিল। ঘটনাগুলো নতুন কিছু নয়; আমরা শুনেছি, পড়েছি, কেউ কেউ প্রত্যক্ষও করেছি। তবুও পড়তে গিয়ে বারবার গা শিউরে ওঠে। যেন ইতিহাসের পুরোনো ক্ষত নতুন করে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। বুক ভরে যায় ক্ষোভে, হতাশায়, অপরাধবোধে। কল্পনা চাকমার নাম আমাদের জন্য কেবল একটি হারিয়ে যাওয়া নারীর প্রতীক নয়, বরং একটি অদম্য কণ্ঠস্বর। ১৯৯৬ সালের সেই অন্ধকার রাতে তাকে নিয়ে গিয়েছিল ‘রাজার সেপাই’রা। তারপর থেকে তার কোনো খোঁজ মেলেনি। তবে গল্পে, সাহিত্যে, স্মৃতিতে তিনি ফিরে আসেন। তার প্রতিবাদী ভাষা বারবার কাঁপিয়ে দেয় নীরবতা, আমাদের মনে করিয়ে দেয় কোনো সত্য কখনও নিখোঁজ হয় না। গল্পগুলো কেবল একটি মানুষের কাহিনি নয়; এগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি। একেকটি গল্প যেন একেকটি ক্ষতচিহ্ন, যা কখনো শুকোয় না। ‘রাজার বাড়ি’ গ��্পে দেখা যায় কীভাবে বারবার শাসকের আগমনে দেশ ছোট হয়ে যায়, জমি হারিয়ে যায়, ভিটেমাটি বেহাত হয়ে যায় বনবিবির সন্তান ওঁরাওদের। আইন তৈরি হয়, আর সেই আইনে দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সামগ্রী হঠাৎ নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। কত প্রজন্মের বিশ্বাস ও মিথ আঁকড়ে থাকা ‘কারাম’ গাছটিও এভাবে হারিয়ে যায় ইতিহাসের অন্ধকারে। গল্পটি যেন বিষাদের এক করুণ গান, যেখানে ব্যক্তিগত কষ্ট মিশে যায় সমষ্টিগত ইতিহাসের সঙ্গে। ‘পণ্যায়নের ইতিকথা’ আর ‘স্বজাতি’ গল্পে লেখক আরও নির্মম এক সত্য তুলে ধরেন। বাঙালির ভেতরকার শ্রেষ্ঠত্ববোধ, অন্যকে ছোট করার মানসিকতা, সাংস্কৃতিক দমন এবং আত্মপ্রবঞ্চনা যেন এখানে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে। গল্পের প্রতিটি বাক্য আমাদের কাঁধে হাত রেখে নাড়া দেয়, প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়: আমরা কি আদৌ বদলেছি? নাকি শুধু নতুন ভঙ্গিতে পুরোনো অত্যাচারকে টিকিয়ে রেখেছি? বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই অভিজ্ঞতা একেবারেই বিচ্ছিন্ন নয়। ল্যাটিন আমেরিকায় সামরিক শাসনের সময় যেভাবে হাজারো তরুণ-তরুণী নিখোঁজ হয়েছিল, আফ্রিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠী যেভাবে উপনিবেশবাদী শাসনের কবলে তাদের ভাষা ও জমি হারিয়েছিল, কিংবা ইউরোপের বাস্ক জনগোষ্ঠী যেমন স্বাধীনতার লড়াইয়ে রক্ত ঝরিয়েছে সব ক্ষেত্রেই আমরা দেখি একই ছবি। ক্ষমতা, সেনা, শাসক আর সংখ্যাগরিষ্ঠের দম্ভ চিরকালই প্রান্তিক কণ্ঠকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করেছে। “কল্পনা চাকমা ও রাজার সেপাই” তাই শুধু বাংলাদেশের বই নয়; এটি বৈশ্বিক শোষণের ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত। সবশেষে বলা যায়, এই বইটি নিছক ফিকশন নয়। প্রতিটি গল্প যেন একেকটি নথি, একেকটি সাক্ষ্য, যেখানে লেখা আছে রাষ্ট্রের অবহেলা, সংখ্যাগরিষ্ঠের উদাসীনতা আর প্রান্তিক মানুষের কান্না। সাহিত্য এখানে ইতিহাসের বিকল্প রূপ, যেটি কেবল ঘটনার বিবরণ নয়, বরং জীবনের গভীরতম সত্য প্রকাশ করে। কল্পনা চাকমার কণ্ঠস্বর নিখোঁজ হলেও, তার প্রতিবাদ বেঁচে থাকে এই গল্পগুলোতে। আর আমাদের জন্য থেকে যায় এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন আমরা কি কখনও সত্যিই শিখব সমতা আর ন্যায়ের পাঠ? নাকি বারবার নতুন নামে, নতুন পোশাকে, নতুন সেপাইদের হাতে পুরোনো শোষণই চলতে থাকবে?
অনেকদিন আগে একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ফিকশন পড়ে কী লাভ? এগুলো তো সব মিথ্যা কথা।” আমি তার সঙ্গে বিতর্কে যাইনি। কিন্তু আমার মনে হয় বাস্তবতা সংবাদ বা ইতিহাসের চেয়েও গল্পে বেশি সূক্ষ্ম মাত্রায় ধরা পড়ে।
এই বইয়ে ছয়টা গল্প আছে, আদিবাসীদের উপর সিস্টেম্যাটিক অপ্রেশন নিয়ে। ঘটনাগুলো আমাদের জানা। তবু পড়তে গিয়ে বারবার গা শিউরে ওঠে, ক্ষোভ আর হতাশায় বুক ভরে যায়। কল্পনা চাকমাকে ধরে নিয়ে গেছে রাজার সেপাই। তার খোঁজ পাওয়া যায়নি আর। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর উঠে আসে গল্পের ভেতর থেকে। তার প্রতিবাদী ভাষা গলা মেলানোর তাগিদ নিয়ে ফিরে আসে বারবার।
একের পর এক শাসকের আগমনে বারবার দেশ, জমি, ভিটা কমে যায়, বেহাত হয়ে যায় বনবিবির সন্তান ওঁরাওদের। আইন হয়, সে আইনে দৈনিক জীবনযাপনের সামগ্রী হয় নিষিদ্ধ। কত প্রজন্মের বিশ্বাস ও মিথ আকড়ে থাকা ‘কারাম’ গাছের কী হলো? জীবনগুলো নিয়ে বিষম করুণ এক গান ‘রাজার বাড়ি’ নামের গল্প।
‘পণ্যায়নের ইতিকথা’ আর ‘স্বজাতি’ গল্প দুটো চোখে আঙুল দিয়ে, কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে বলে বাঙালির স্বভাবের কথা। এই ঘটনাগুলো দিনে দিনে চাপা পড়ে, আমাদের মন থেকে মুছে যায়, নতুন কিছু নিয়ে আমরা মেতে উঠি। কিছু কী বদলায়? একই ঘটনা কিছুদিন পর আবার, আরও কিছুদিন পর আবার।
এই বইটা একটানে পড়তে পারিনি। কিছুক্ষণ পর পর বিরতি দিয়ে পড়েছি। বিদ্রোহ, হতাশা আর হারানোর বেদনা বইয়ের পাতায় পাতায়। মন ও ভাবনাকে আলোড়িত করার মতো গল্পের সংগ্রহ।