বইমেলায় বুকপকেটে একটা ইকোনো কলম নিয়ে ঘুরে বেড়ায় যে যুবক; তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল একদিন। সে আমায় শুনিয়েছিল আফরিনের গল্প। তখন থেকে আমি আফরিনকে জানি। আমি জানি কাসেদকেও। তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল তারও আগে; মধ্যরাতে। সিএনজির পেছনে একটা লাশ নিয়ে সে আমার পিছু নিয়েছিল। আমার পিছু নিয়েছিল মনোজও। কারণ তার স্ত্রীকে অনুসরণ করছিল একজন প্রাক্তন। প্রায়শই প্রাক্তনের জুতোর ছাপ পাওয়া যায় তার বাড়ির জানালার ওপাশে, রাস্তায়।
আমায় গল্প শুনিয়েছিল কঙ্কন। ঠাণ্ডা মাথায় যে খুন করেছিল ছয়-ছয়টি মানুষ। না চাইলেও আমাকে হতে হয়েছিল হামিদ উল্ল্যাহ'র অদ্ভুত অসুখের অংশ। নিঃশ্বাস নেওয়ার পর ওই হাওয়া শরীর থেকে বের হতো না তার। আমার চোখের সামনে তিনি বেলুনের মতোন ফুলতে ফুলতে বিস্ফোরিত হোন। অসুখের পাশাপাশি আমাকে চিনতে হয়েছিল একটা বুনোফুলও। আমাকে চিনতে হয়েছিল কুশিয়ারা নদীর পাড়; যেখানে পায়ের আঙুলের ফাঁকে একেক সন্ধ্যায় গজিয়ে উঠে নির্মল সবুজ ঘাস।
আশির দশকে পুরান ঢাকার একটা বদ্ধ বিল্ডিং-এর বাসায় হুটহাট চলে আসা বাবলির গল্প শোনার আগে আমাকে জানতে হয়েছিল ভাগ অংকের পর ভাজ্য ও ভাজকের গতি হয়, ভাগশেষটা কোথায় যায়? যে শুভ্র আড়ালে ঢাকা ছিল তৃষ্ণা, দু'হাতে বেশ যত্ন নিয়ে ওই চাদর সরাতে হয়েছিল আমায়। সরিয়ে আমি দেখতে পেয়েছি আমগাছের ডালে স্কুল মাস্টার ইয়াকুব আলির ঝুলন্ত দেহ। তাকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী। আর দেখতে পেয়েছি, ওই আমগাছজুড়ে চকচক করছে একগাদা স্বর্ণলতা।
আমাকে পুরাণে যেতে হয়নি কখনো। আমি আমার মফস্বলে খুঁজে পেয়েছি পৌরাণিক লিলিথ, মায়ের পিঠ হাতড়ে পেয়েছি একজাড়া ডানা, গভীর রাত্তিরে ঘুম ভেঙে উঠে পেয়েছি অপরিচিত আপনজন আর ভাঙতে চেয়েছি মানবজন্মের প্রকৃত ব্যাকরণ।
অবগুণ্ঠন আমার সকল গল্পের উৎস। অবগুন্ঠনে আপনাদের স্বাগত...
প্রথম গল্প 'আফরিন' পড়ে পাক্কা এক সপ্তাহ এই বই থেকে দুরে থেকেছি। ভেবেছিলাম ২য় গল্পটা যদি আবার ওরকম হয় তাইলে আর বাকি গল্পগুলো পড়ব না। ওতো ইমোশন আসলে আমার ধাতে সয় না। তবুও শেষমেশ সবগুলো গল্প কিভাবে যেন পড়ে ফেলেছি। এবং একটা গল্পকেও অপছন্দের তালিকায় ফেলতে পারিনি।
সবশেষে, ঐ প্রথম গল্প 'আফরিন' ই আমার সবচেয়ে প্রিয়। এরকম একটা গল্প নিয়ে এক সপ্তাহ অনায়াসেই মন খারাপ করে থাকা যায়। এমনকি এক বছরও। যতদিন বইটা আমার চোখের সামনে থাকবে ততদিন 'আফরিন' আমাকে ঐ মন খারাপ করা কষ্টকর অনুভূতি অবিরাম দিতেই থাকবে। তাই বইটা ট্রাঙ্কে তুলে রাখব যেন চোখে না পড়ে।
নিজের স্ত্রীকে খুন করে লাশ বস্তায় ভরে বাইকের পেছনে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে মাটি চাপা দেওয়ার জন্য, পুলিশ চেকিং করে ছেড়ে দিলেও খেয়াল করে একটা সিএনজি পিছু নিচ্ছে তবে কি পুলিশ সন্দেহ করেছ?
চন্দ্রকূহর
ধ্রুবকে তার গণিত শিক্ষক ইয়াসিন স্যার অদ্ভুত এক গল্প শোনান, বাবলির গল্প।
তার বাসগৃহ পৃথিবীতে নয়, পৃথিবীর বাইরের কোন জগতে, সেই গ্রহে কোন এক প্রবল রেডিয়েশনে সব পুরুষের বিলুপ্তি ঘটেছে। থেকে গেছে শুধু নারী। তারা নিজদের টিকিয়ে রাখতে চায়, বহু খোঁজের পর তারা পায় পৃথিবী নামক এই সবুজ গ্রহ তারপর?
কুশিয়ারা
কুশিয়ারা এই নাম রেখেছিল কুশিয়ারার মামা। কুশিয়ারা একটা নদীর নাম। সে হবে নদীর মতোন সুন্দর। কোনো জায়গা দিয়ে হেঁটে গেলে ওই জায়গায় ঘাস গজাতে শুরু করবে, ফুল ফুটতে শুরু করবে।
কিন্তু কুশিয়ারা কি নদী হতে পেরেছিল? যে মাত্র ষোল বছর বয়সে এক সনাতন ধর্মাবলম্বী বান্ধবীকে কৌশলে গরুর মাংস খাইয়ে দেয়, কুকুরের বাচ্চা পলিথিনে বেঁধে ড্রেনে ফেলে দেয়, শুধুমাত্র কাক কালো এবং ককর্শ কন্ঠ বলে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে, অপর দিকে নদী? নদীজলে সবাই স্নান করে৷ কখনই কোন নদী সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ার অপরাধে কোনো মজুমদার, চক্রবর্তী কিংবা ঠাকুরকে ঘাট থেকে উঠিয়ে দেয় না। শুধুমাত্র মনুষ্য না হওয়ার অপরাধে কোনো প্রাণীকেও জল ছুঁতে বারণ করে না নদী। কুশিয়ারা কি কখনো নদী হয়ে উঠতে পারবে?
সমাস
এই গল্পে জীবনের ভঙ্গুরতা ফুটে উঠেছে।
ছোট একটি ঘটনা কীভাবে একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে তার করুণ গল্প।
লিলিথ
একজন সিঙ্গেল মাদারের গল্প। কিংবা বলা যায়
পৌরাণিক লিলিথের আধুনিক রূপ লিলি।
মাথা নিচু করে স্বর্গে বেঁচে থাকার চেয়ে, মাথা উঁচু করে এই পৃথিবীতে বাস করতে চাওয়া এক বাস্তব লিলিথ।
একটি নারীকে বিয়ের পর কত সেক্রিফাইস করতে হয়, মানিয়ে নিতে হয়, যেন সব দ্বায় নারীর।
কল্ক
“তুমি সত্য কইবা মাইয়া। দুপুরে ঐ রাস্তায় কী করতে গেছিলা বদরুলের লগে?
হাফসা কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল, “আমি কলেজ থেইকা...”
রফিকুল্লাহ কথা শেষ করতে দিলেন না। উপস্থিত মুরব্বিদের দিকে তাকিয়ে হতাশ স্বরে বললেন, “কলেজ...কলেজ। ওই এক জিনিস পাল্টাই দিলো সমাজ। ”
আজকে যুগে এসেও দেখি যখন কোন নারী রেইপ, ইভটিজিং, হ্যারেসমেন্টের শিকার হয় তখন আমরা ওই নারীর আমলনামা নিয়ে বসি, ওই নারী বুকে ওড়না ছিল কিনা, মুখে হিজাব ছিল কিনা, ওই নারীর এতো রাতে রাস্তায় কেন গেল? এতো রাতে বাইরে গেছে নিশ্চয়ই ওই নারীর মধ্যে দোষ আছে। এভাবে আমরা ওই লম্পট শাস্তির দাবী না করে বরং ভিক্টিমকেই আসামী বানিয়ে দিই। অথচ আমরা ভুলে যাই ২৭ মার্চ ২০১৯ সালে মাদ্রাসা পড়ুয়া নুসরাতকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছিল।
বিসর্গ
যে মানুষটাকে একটা সময় পৃথিবীর সবচেয়ে আপন এবং পথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে হত সেই মানুষটাই জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে!
ধ্রুপদ
এই গল্পটা পড়ার পর সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারিনি। আমার বোধগম্য হয় গল্পটা পড়ার দুয়েক মিনিট পর,
মাহমুদ তার বাবাকে দুইটা রূপে দেখে, একজন উলঙ্গ হয়ে সোফায় বসে থাকে, আরেকটা সভ্য, স্বাভাবিক।
একই মানুষের দুই রূপ। সভ্য এবং অন্ধকার, এই দ্বৈততা গল্পটাকে গভীর করে তোলে।
ভূতবৈরবী
ভূতবৈরবী একটা ফুলের নাম, কোন একদিন হামিদ উল্লাহ জঙ্গল সাফ করতে গিয়ে অনেকগুলো ভূতবৈরবী ফুল গাছ দেখতে পায়, তার মেয়ের জন্য একটা ভূতবৈরবী গাছের ফুলওয়ালা ডাল ছিঁড়ে নেয়, এরপরই বাধে বিপত্তি, তার মাথা ঘুরে উঠে, হঠাৎ অনুভব করে তার চোখ নেই, চোখের জায়গাটা মসৃণ, এরপর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় কোন রোগ দেখে না কিন্তু হামিদ উল্লাহর পেট ফুলে উঠতে থাকে।
এই গল্পে মুলত আমাদের সমাজের কুসংস্কার কিভাবে মানুষকে উন্মাদ, যুক্তি বিহীন পশুতে পরিণত করে তা হয়েছে, একজন ভন্ড ওঝার কথায় খেপে গিয়ে গ্রামবাসি খুন করতে যায় ডাক্তারকে, এরা যুগ যুগ ধরে গ্রামীণ সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে কুসংস্কার ছড়িয়ে যাচ্ছে।
পাঠ_প্রতিক্রিয়া
“অহনা টের পেল, খুব সন্তর্পণে তাকে অনুসরণ করছে কেউ একজন। চুপিচুপি। অহনা তাকে চেনে, খুব ভালো করেই চেনে—তার গন্ধ পর্যন্ত চেনে। অনুসরণকারীর আদ্যোপান্তই জানা, শুধু জানা নেই,—কেন সে এখনও তাকে অনুসরণ করছে, এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরেও।”...
এভাবে গল্পের শুরু পাঠককে তৎক্ষণাৎ গল্পের ভেতরে টেনে নেয়। পাঠক ভাবতে থাকে—কে এই মানুষ? কেন অনুসরণ করছে? আর অহনাই-বা কীভাবে তাকে এতটা চেনে? এই প্রশ্নগুলোর ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে পাঠক ডুবে যায় গল্পে।
গল্পগুলো কবি গুরুর ভাষায় "শেষ হইয়াও হইল না শেষ" টাইপের, একটা গল্প পড়া শেষে আরেকটা গল্প পড়া শুরু করতে পারিনি। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে, একটা ঘোরের মধ্যে থাকি।
প্রত্যেক লেখক তার সময়ের একজন মুখপাত্র। সমাজের ভেতরে জমে থাকা রাগ, ক্ষোভ, হতাশা আর স্বপ্ন, সমাজের অসঙ্গতি সবকিছুই তার কলমের খোঁচায় জীবন্ত হয়ে উঠে বইয়ের পৃষ্ঠায়।
সাখাওয়াত হোসেনের লেখার একটি নিজস্ব ভঙ্গি আছে, এতেই তাকে আলাদা করে চেনায়। তার গল্পগুলো একেকটি ভিন্ন টাইপের হলেও একটি জায়গায় এসে মিলেছে—অস্থিরতা। কোনো চরিত্রই যেন সম্পূর্ণ শান্ত বা সুখী নয়; প্রত্যেকের ভেতরেই রয়েছে টানাপোড়েন, দ্বন্দ্ব, অদৃশ্য চাপ।
মানুষের অন্ধকার দিক যেমন নির্মমভাবে তুলে ধরেছেন, ঠিক ততটাই সূক্ষ্মতা আর যত্ন নিয়ে দেখিয়েছেন মানুষের ভেতরের ভালো দিকটাও।
মানুষ কখনো ফেরেস্তা নয়, আবার নিখাদ শয়তানও নয়; মানুষ মানুষই। এই দুয়ের মাঝে এক জটিল সত্তা। তার ভেতরে যেমন নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা, হিংসা আছে, তেমনি আছে মমতা, অনুতাপ, ভালোবাসা।
গল্পগুলো নিদিষ্ট কোন জনরায় ফেলা যায় না। কোনটা রোমান্টিক, কোনটা সাইকোলজিক্যাল হরর, কোনটার মধ্যে মিথ আছে। এই গল্পগুলোর মধ্যে আফরিন, ধ্রুপদ, লিলিথ আগে পড়া হয়েছে আবারও পড়লাম এবং মুগ্ধ হলাম।
এবার আসি কোন কোন বিষয় ভালো লাগেনি, যেহেতু কিছু গল্প তার প্রথম দিককার লেখা গল্প। তাই হুমায়ূন আহমেদ এর প্রভাব কিছুটা লক্ষ করা যায়। যেমন ধ্রুপদ গল্পে, "সব পুরুষের স্পর্শ অশুদ্ধ নয় মাহমুদ পৃথিবীতে কিছু কিছু পুরুষের স্পর্শ অপবিত্র হয় না"
মাঝে মাঝে Judging a book by its title নীতি অনুসরণ করে বই পড়া শুরু করি। এক্ষেত্রেও ফেবুতে একজনের বইমেলা উইশলিস্টে 'অবগুণ্ঠন' শব্দটা দেখে ভাবলাম বইমেলা গিয়ে কিনে ফেলবো এটা।
"তিমির-অবগুণ্ঠনে বদন তব ঢাকি কে তুমি মম অঙ্গনে দাঁড়ালে একাকী" রবীন্দ্রসঙ্গীত গুনগুন করতে করতে সতীর্থের স্টল খোঁজা শুরু করলেও সারা বইমেলা দুবার ঘুরপাক খেয়েও যখন স্টলের দেখা পাচ্ছিলাম না, তখন একবার ভাবলাম থাক, পরে কোনোসময় দেখব নাহয়! ঠিক তখনই ভোজবাজির মতো চোখের সামনে পরে গেল বড় করে লেখা 'স' টা। বই হাতে নিয়ে তো দেখি আরোও অদ্ভূত ব্যাপার। রবি ঠাকুরের নাম নিতে নিতে যে বই কিনতে এলাম, সেই বইয়ের প্রচ্ছদে কিছু কিম্ভূতকিমাকার হাত-পা আঁকা? যাক, অতিপ্রাকৃতে বরাবরই আগ্রহ, তাই টুপ করে ব্যাগে পুরে হাঁটা ধরলাম।
বইটা পড়তে পড়তে বেশ অনেকগুলো প্রশ্ন এলো। -সাইকোপ্যাথদের মস্তিষ্ক বিকৃতির পরিমাণ কতটুকু? -কল্পনার দরজায় খিল আঁটতে কোন শক্তির প্রয়োজন? মানসিক না শারীরিক? -মিথোলজি কি কেবলই বইয়ের পৃষ্ঠায় লেখা কিছু ঘটনা, নাকি মানবচেতনার চির বহমান বহিঃপ্রকাশ?
অবগুন্ঠিত (কিংবা উন্মোচিত!) উত্তরগুলো গল্পের ভাঁজে ভাঁজেই পড়ে রইলো। আর আমি রয়ে গেলাম তাদের পেছনে, মধ্যরাতে জানালার বাইরের হিমশীতল বাতাসের অসারতা নিয়ে।
আফরিন: রোমান্টিক উপন্যাস। অদ্ভুত ধরনের। এ পৃথিবীতে আমরা তাদেরই বেশি কষ্ট দিই যারা আমাদের ভালোবাসে। কিন্তু একবার সে ভালোবাসা হারিয়ে গেলে তার বোঝা বয়ে বেড়ানো যে বেজায় কষ্টের এই গল্পে সেই দৃশ্যই তুলে ধরেছে সুন্দর ভাবে।
অবম: সাইকোলজিক্যাল ঘরাণার উপন্যাস। মূলত সাইকোপ্যাথ এক কিলারের গল্প নিয়ে এই উপন্যাস।
চন্দ্রকূহর: কেমন হবে যদি হঠাৎ পাশের ঘর থেকে কারো হাসির শব্দ আসে আর সেই হাসির প্রতি একসময় নেশা ধরে যায়! কিন্তু সেই হাসি কি আদৌ কোনো মানুষের নাকি অন্য কোনো জগতের! গল্পের শুরু গণিতের শিক্ষক ইয়াসিন স্যারের বাসায় পড়া থেকে। ইয়াসিন স্যারের বাসার দেয়ালে টাঙানো এক নারীর ছবি গল্পকথকের মাথায় গেঁথে যায়, কিন্তু সে ছবি কার এবং কেন এখানে টাঙানো হয়েছে তা নিয়েই এই গল্প!
কুশিয়ারা: মামার দেওয়া আদুরে নাম কুশিয়ারা। কিন্তু কুশিয়ারা যতই বড় হতে থাকল, ততই সে স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে অদ্ভুত আচরণ করতে থাকল, নিষ্পাপ মানুষ, পশু-পাখিকে আঘাত করতে থাকল। একসময় সে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে থাকল আর যখন তার এ বিষয় উপলব্ধি হল তখন বেশ সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে।
সমাস: গল্পের শুরু একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবারের সকালের খুনসুটি দিয়ে কিন্তু ধীরে ধীরে গল্পের মোড় নিতে থাকে এক অন্ধকার দিকে। একটি সুস্থ পরিবার এক সময় ভেঙে যায় শুধুমাত্র লোভ আর অসৎ কর্মের জন্যে। গল্পটি মূলত ট্র্যাজেডি এবং রিভেঞ্জ ঘরাণার মিশ্রণ।
অব্যয়: সমাজের যথারীতি নিয়ম থেকে ভিন্ন একটি মেয়ে তৃষ্ণার সাথে বন্ধুত্ব আর তৃষ্ণার শেষ পরিণতি নিয়ে এই গল্প। গল্পটা বেশ হাস্যোজ্জ্বল পরিবেশে শুরু হলেও এর শেষ হৃদয়বিদারক!
মন্দন: ট্র্যাজেডি আর রোমান্টিসিজম এর সমন্বয়ে রচিত গল্প এটি।
লিলিথ: মাহমুদ নামের এক যুবকের এক ডিভোর্সি নারী ও তার একমাত্র মেয়ের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে গল্প। বেশ ভালোই।
পুষ্পক: দীর্ঘ ২২ বছরের পর কিশোরের ভাগ্যে নেমে আসে প্রেমের ধারা, আর সবকিছু কেমন যেন ঠিক চলতে থাকে কিন্তু বাঁধ সাধে কিশোরের জীবনে ক্যান্সারের আগমনে। স্তিমিত হয়ে যায় জীবন তার, একদিকে নিজের প্রেমিকার অপেক্ষা অপর দিকে পরগাছা স্বর্ণলতার মতো বাসা বাঁধতে থাকে ক্যান্সার। শেষ পরিণতি কি হলো কেউ জানতে পারলো না।
কল্ক: ইয়াকুব আলী বিদ্যাকুমারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক, কিন্তু তারই বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে আজ সে আসামীর কাঠগড়ায় আর তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির। কিন্তু সে আজ এই পরিণতির শিকার তার পিছনে রয়েছে এক গভীর ষড়যন্ত্র। গল্পে অযথা যৌনতা টেনে আনা হয়েছে কিছু জায়গায় এবং ১৮+ গল্প এটি।
বিসর্গ: মানুষের মন বড়ই অদ্ভুত। একবার কিছু তার মাথায় গেঁথে গেলে তা কিভাবে দিনে দিনে মানুষকে কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলে তা এই গল্পে বিদ্যমান। গল্পের চরিত্র অহনার ধারণা হতে থাকে কেউ তাকে ফলো করছে এবং এই চিন্তা তার মাথায় সর্বক্ষণের জন্যে গেঁথে যায়। যার জন্যে সে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হতে থাকে। কিন্তু কেউ কি আসলেই তাকে ফলো করছিলো নাকি সে মনে মনে এসব কাহিনী রচনা করছিল তা গল্পের শেষে ডিসক্লোজ করা হয়েছে।
ধ্রুপদ: কেমন হবে যদি হঠাৎ মধ্য রাতে ঘুম ভেঙে যায় আর দেখতে পান কেউ একজন আপনার সামনে নগ্ন অবস্থায় বসে আছে! এমনই কিছু ঘটনা ঘটে মাহমুদের সাথে। আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে থাকে সেই নগ্ন ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, তার নিজের পিতা। কিন্তু তার পিতা তো পাশে ঘুমাচ্ছে, তবে সোফায় বসে থাকা ব্যক্তিটি কে! জানতে হলে পড়তে হবে এই ছোট গল্পটি।
ভূতভৈরবী: ভূতভৈরবী দেখতে অন্য দশটা স্বাভাবিক ফুলের মত হলেও এ ফুল যে কারো জীবন নিয়ে নিতে পারে তা কল্পনাতীত। আর এই ফুলের জন্যে কাউকে নিজের প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে দু’বছর। কিন্তু কেন? কি আছে রহস্যময় এ ফুলে?
অবগুন্ঠন : কেমন হবে যদি কেউ উদ্দেশ্যহীন ভাবে ছয়টা খুন করে কিন্তু সে নিজেও জানে না কেন করে বেড়ায়! এই গল্পের মূল চরিত্র অর্কের নিজের জবানীতে বলা এই গল্পে দেখা যায় তার মামাতো বোন খুনের মতো এক ভয়ানক পাপে জড়িয়ে পড়েছে আর তার এই খুনের শিকার হচ্ছে নিজের কাছের মানুষ। কিন্তু কেন সে খুনে করে আর কি আনন্দ পায় সে এই খুন করে, আদৌ কি সে সজ্ঞানে এসব হত্যা করে নাকি সে মানসিক ভাবে অসুস্থ এসকল প্রশ্নের খোঁজেই গল্পকথক অর্ক।
ছোট গল্প সংকলন এর আগে কয়েকটা পড়েছি। ১০-১২ টা গল্প থাকলে তার মধ্যে ৫-৬ টা সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে বাকিগুলো মোটামুটি চলে আর কি। কিন্ত লেখক ' সাখাওয়াত হোসেন' ছোট গল্প সংকলন গুলা এত্ত জোস হয়, প্রতিটি গল্পই ভিন্ন জনরার কিন্ত কোনোটা কোনোটার থেকে কম না। প্রথম পড়েছিলাম " সুবর্ণ রাধিকা"। এই বইয়ের প্রতিটা গল্পই ছিলো রহস্যময়,ভয়ের। শেষ করার পর ভাবতে হয় কি হলো। এবার নতুন বের হয়েছে " অবগুণ্ঠন " এটার প্রতিটা গল্পই জোশ। কোনোটাই খারাপ না। পুরো বই দেবো ৫ এ ৫। ছোট গল্প নাম হলেও গল্পগুলো বিস্তৃত। কিছু গল্প শেষ করার পর কাদাবে, আবার কিছু গল্প শেষ করার পর আপনাকে ভাবাতে বাধ্য করবে। যারা ভালো ছোট গল্প সংকলন পড়তে চাচ্ছেন তারা এই দুইটা পড়তে পারেন। নিরাশ হবেন না নিশ্চিত । এই বইয়ের একটা গল্প নিয়ে নাটকও বানানো হয়েছে " লিলিথ" নামে। চাইলে নাটক টাও দেখতে পারেন, ভালো লাগবে। বই: অবগুণ্ঠন লেখক: সাখাওয়াত হোসেন প্রকাশনী: সতীর্থ প্রকাশনা