এক অদ্ভুত জীবন। কত তার বাঁক। কতগুলো শাখা-প্রশাখা। কত মানুষের সঙ্গে মেশামেশি, কত্ত দেশ-বিদেশ যাত্রা, কাজে বা অকাজেও। সেই জীবন নিয়ে কলম ধরলেন অঞ্জন দত্ত। ছবি বানানো, অভিনয়, গান আরও কত কত বিভাগে তাঁর যাতায়াত। এর আগে কলম ধরেছেন মূলত থ্রিলার রচনায়। এবার নিজের কথা। তা-ও কোনও অংশেই থ্রিলারের থেকে কম নয়।
অঞ্জন দত্তের সিনেমার একটা সাধারণ সমস্যা আছে। কাহিনি, নির্দেশনা, অভিনয় সবই ঠিকঠাক কিন্তু প্রায় প্রতিটা সিনেমার শেষদিকে যেয়ে তার গল্পে তাড়াহুড়ো লক্ষ্য করা যায়, অস্থিরতা লক্ষ্য করা যায়।যেন কোনোভাবে সমাপ্ত করতে পারলেই তিনি বর্তে যান। বইটা পড়তে যেয়ে সেই একই অস্থিরচিত্তের মানুষটির দেখা পেলাম। সব কেমন অসংলগ্ন। অঞ্জনের আত্মজীবনীতে মনে রাখার উপাদান প্রচুর কিন্তু তিনি সেগুলো উপস্থাপন করেছেন এলোমেলোভাবে। পড়ে আর যা-ই হোক, তৃপ্তি পাওয়া যায় না।
অঞ্জন দত্ত। ব্যক্তিগত জীবনে গানের মাধ্যমে তাঁর সম্পর্কে জানাশোনা। পরবর্তীতে "বং কানেকশন" দেখে জানলাম তিনি অভিনয়, পরিচালনাও করেন। মূলতঃ তাঁর জীবনের নানান দিক নিয়ে এ বই। লিখেছেন তিনি নিজেই।
অঞ্জন দত্তের সাথে পরিচয় "২৪৪১১৩৯" গানটির মাধ্যমে। তবে গানটার মতোই তাঁর জীবনটাও বহুবিচিত্র।
বনেদী উকিল বাড়ির ছেলে তিনি। পড়েছেন দার্জিলিঙের বোর্ডিং স্কুলে। তাই তাঁর সিনেমাগুলোতে অবধারিতভাবে এসেছে দার্জিলিঙের কথা। এমনকি আত্মজীবনীতেও বহুবার ঘুরেফিরে এসেছে দার্জিলিং।
প্রাথমিক অবস্থায় সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু। এরপর উকিল বাবার মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে অভিনয় জীবনের শুরু। বাদল সরকারের সাহচর্যে মঞ্চ নাটকের দীক্ষা নেন। সে সূত্রে একটা সময় পশ্চিম জার্মানিতে যান। যাওয়ার আগেই বিয়ে করেন তিনি। স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি তাঁর অনেক কৃতজ্ঞতা।
জার্মানি থেকে ফিরে মৃণাল সেনের সাথে পরিচয় ও সরাসরি জীবনের সূচনা। একটা সময় পছন্দের না হলে-ও গান গাওয়া শুরু করেন। সে গানগুলোর মাধ্যমে তাঁর খ্যাতি দেশের সীমানা পেরিয়েছে।
অঞ্জন দত্ত সবসময় নিজের শর্তে বাঁচতে চেয়েছেন। বাবার সাথে তর্ক করে অভিনয় শুরু করলেও একটা সময় সেই বাবার সাথে তাঁর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এমনকি বাবার রেখে যাওয়া ধার শোধ করেন তিনি। স্রেফ মতের মিল না হওয়ায় অনেক লোভনীয় অফার ফিরিয়েছেন। চলচ্চিত্র পরিচালনা করতে গিয়ে ঝামেলায় জড়িয়েছেন, গোয়েন্দা কাহিনি পর্যন্ত লিখেছেন। তিনি চেয়েছেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে। স্বাধীনভাবে চলতে।
আত্মজীবনী মানে কী? ব্যক্তির নিজের জীবনের কথা। নিজের কথা। কিন্তু এক জীবনের সব কথা কি সবাই বলতে পারে? কেউ কেউ পারে। যারা বেপরোয়া হয়। অঞ্জন দত্তের মতো। যে নিজের জীবনকে ‘সার্কাস’ বলতে পারে। অথবা যার জীবন সত্যিই সার্কাস, সে-ই এমন আত্মজীবনী লিখতে পারে।
অঞ্জন দত্ত জানাচ্ছেন তিনি একজন আইনজীবীর সন্তান। অঞ্জন তার ছোটবেলায় দার্জিলিংয়ে পড়াশোনা করেছেন, মাসিক বেতন ছিল ১৪ হাজার রুপি। এখন থেকে প্রায় ৬০ বছর আগের কথা। সেই সময় অঞ্জনের বাবা পবিত্র দত্তর সেই সামর্থ্য ছিল। কিন্তু একটা সময় পসার কমে গেলে পবিত্র দত্তর রেখে যাওয়া দেনা মেটাতে হয়েছিল অঞ্জন দত্তকে। সেই ছেলেটা যে সিনেমা করতে চেয়েছিল, তাকে গান গেয়ে বাবা টাকা রোজগার করে বাবার দেনা মিটিয়েছে। সে গান করতে চায়নি কখনো, সিনেমাই করতে চেয়েছিল কিন্তু জনপ্রিয়তা পেয়েছিল গান গেয়ে। এজন্য তার জীবন সার্কাস।
কপাল একদিকে ভালো ছিল অঞ্জনের। ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন মৃণাল সেনের সঙ্গে। এটা আবার একটা সমস্যাও। কেননা এই কারণে একটা স্ট্যান্ডার্ড সেট হয়ে যায়। বেরনো যায় না সেখান থেকে। অঞ্জন অভিনীত বা পরিচালিত সব সিনেমা বা বেশিরভাগ সিনেমা কি ঐ মানের? না। সেটা অঞ্জন স্বীকারও করেছেন।
অঞ্জন দত্তর মতো লোকেরা কেমন করে তৈরি হয় তার একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই বই। বারো না, রীতিমতো ষোলো ঘাটের পানি খাওয়া মানুষ সে। ছোটবেলায় সাহেবি স্কুলে পড়েছেন। শিক্ষকের বেতের বাড়ি খেয়েছেন। সেকথা লিখেছেন। তেমনি অকপটে লিখেছেন সিনিয়র ছেলেরা কেউ তাকে রাতে জড়িয়ে ধরে চুমু খেত কিন্তু তাদের ওপর অঞ্জনের রাগ নেই। তেমনি অঞ্জন বলেছেন হরদীপের কথা। স্কুলের সেই লোকটিকে কিছুটা বাবার আসনই দিয়েছেন তিনি। যেমন দিয়েছেন বাদল সরকারকে, মৃণাল সেনকে। মৃণাল অনেকখানি জুড়ে আছেন অঞ্জনের জীবনে কিন্তু বাদল সরকারের সান্নিধ্য খুব বেশি পাননি অঞ্জন। কিন্তু কাটা কাটা শব্দে-বাক্যে কী সুন্দর করেই না তাকে সম্মান দিলেন।
ঘাটের পানি খাবার কথা হচ্ছিল। অঞ্জন সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ ছিল কলকাতার ওপর মাসে চারটা ফিচার লেখা। তিনি অকপটে বলছেন, ইংরেজি লিখতে পারতেন বলে কাজটা করতে পেরেছেন। থিয়েটার করেছেন। সেখানে পরিচয় হয়েছে অদ্ভূত সব মানুষের কাছে। জার্মানি গিয়েছেন। বোকার মতো এদিক সেদিক ঘুরেছেন। কত কত জায়গায় কেঁদেছেন সেই কথাও বলেছেন।
সিনেমা বানানোর অভিজ্ঞতা লিখেছেন। কোন সিনেমা কেন খারাপ হলো, কোন সিনেমা নিজের পছন্দ না সবই বলেছেন। গান গেয়েছেন কেবল টাকার জন্য। সেই গানের মধ্যেও শ্রোতার কাছে তুমুল জনপ্রিয় গানটি যে তার নিজের পছন্দ না, সেটাও বলেছেন। টাকার জন্য দূরদর্শন, ইটিভি ও আরো কোথায় কোথায় টেলিফিল্ম বানিয়েছেন। মদ খেয়েছেন। আত্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। আবার কারো জন্য হাঁপুস কেঁদেছেন। নিজেই বলছেন সেসব কথা।
অঞ্জনের লেখার ধরনটা খুব সাদামাটা। বাক্য তুলনামূলক ছোট। আর ছাড়া ছাড়া। একটা বাক্য পড়লে মনে হয় ওখানেই শেষ। পরের বাক্যের সঙ্গে কোনো সংশক্তি নেই। কিন্তু প্রতিটা অধ্যায় সুষ্পষ্ট। অঞ্জন জানেন তিনি কী বলছেন, কোন বিষয়ে বলছেন। পড়তে তাই খারাপ লাগে না। সাহিত্যিক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, অঞ্জন দত্তের লেখার ধারাটা ব্রিটিশ। কোনো অতিরিক্ত শব্দ নেই, অতিরিক্ত আবেগ নেই। নেই কোনো আত্মকরুণা। অঞ্জন নিজেই জানাচ্ছেন তিনি অনেক ভুল করেছেন, ভাগ্য বিড়ম্বিত হয়েছেন কিন্তু সেসব নিয়ে ন্যাকা আবেগ তার নেই। দার্জিলিংয়ে বেড়ে ওঠার পর বিশ্বের বহু দেশ ঘুরেছেন অঞ্জন। তিনি নাগরিক। পছন্দ করেন আধুনিকতা। রোজ সন্ধ্যায় মদ্যপান তার অভ্যাস। কারো ধারা মানেন না, কারো ধারায় চলেন না। তার লুক, তার গান, তার সিনেমা দেখলে মনে হবে একেবারেই রুথলেস একটা মানুষ। বইটা পড়তেও বহু জায়গায় পাঠকের মনে হবে—লোকটা অভদ্র। লেখক নিজেই বলছেন তাতে তার কিছু যায় আসে না। অভদ্র বলার অধিকারটিও তিনি মেনে নিচ্ছেন। এটাও সার্কাস। এই সার্কাসের কারণেই অঞ্জনের গান নতুন করে শুনতে ইচ্ছা করে। সিনেমাগুলো ফিরে দেখতে ইচ্ছা করে।
‘অঞ্জন নিয়ে’ পড়লে মনে হবে তার প্রত্যেকটা বৈশিষ্ট্যের একটা বিপরীত বৈশিষ্ট্যও তার মধ্যে আছে। কিন্তু অঞ্জন নিজেকে কন্ট্রাডিক্ট করেন না, বিষয়গুলো তার চরিত্রের বহুমুখীতা। তিনি রুথলেস, তিনি নরম মনের মানুষ। বইয়ের দুটো অংশ দিয়ে শেষ করি। তিনি কলকাতায় নিজের বাড়ি নিয়ে লিখেছেন, ‘কলকাতার সবথেকে পুরোনো পাড়ার, এঁদো গলি বেনিয়াপুকুর লেনে আমি থাকি। শব্দ দূষণ কাকে বলে আমি জানি। প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো একতলা বিশাল বাড়ির চারপাশে অনেক নতুন উঁচু বাড়ি হয়ে গেছে। আমি সেই পুরোনো বাড়ি ছেড়ে দিলে, ঝকঝকে একটা বহুতল বাড়ির ফ্ল্যাটে দমবন্ধ হয়ে মারা যাব।…আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। আমার পুরোনো বাড়ির নাম ‘মোহন বংশী’। আমাদের একটা বড় ঠাকুর ঘর আছে। বেশ কয়েক বছর ধরে আমি সেখানে ধূপ জ্বালাই। আমার সিনেমা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা, বা নাটকের মহড়ার মধ্যে, বাড়ির পুরুত আরতি করে। আমাদের বাড়িতে পার্টি বা মদ্যপানের মধ্যে, সে এসে শান্তির জল ছিটিয়ে দেয়।’
নিজের জীবনকে বারবার সার্কাস বলেছেন অঞ্জন দত্ত। তার বহু উদাহরণও আছে বইয়ে। শেষটা করেছেন এভাবে—
আমার বাপি জুয়া খেলতে ভালবাসতো। বন্ধুদের সঙ্গে, বাড়িতে। বিশাল রান্নাবান্না আর তিনপাত্তি। হঠাৎ বাপি বায়না ধরল আমাকে তার কোলে বসতে হবে। আমি দার্জিলিং থেকে ফিরে এসেছি ছুটিতে। বয়স ১৩। বাপি হারছে। আমি তার কোলে বসলে সে নাকি জিতবে। অথচ এক বছর দার্জিলিঙে কাটিয়ে আমি তখন বড় হতে চাইছি। আমি খোকার মতো তার কোলে বসবো কেন? বাপি হুইস্কি খাচ্ছে আর আমাকে ডাকছে। আমার সকলের সামনে হাফ প্যান্ট পরা বাপির কোলে বসতে অসুবিধে হচ্ছে। বাপি আমাকে ডেকে আমায় কানে কানে বলল যে সে আমার স্কুলের সিনিয়র ছেলেদের মতো নয়। আমি কোলে বসলে, বাপি জিতবে আর আমিও বড় হয়ে যাব। আমি বাপির গা ঘেঁষে বসেছিলাম, কোলে নয়। পবিত্র দত্ত সেদিন সকলের টাকা জিতে নিয়েছিল। এটা সার্কাস নয়?