বর্তমান কাল: ১৯৯০, হীরাপুর, ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত ঝড়ের রাতে হীরাপুরের জরাজীর্ণ জমিদার বাড়িটাকে মনে হচ্ছিল এক প্রাগৈতিহাসিক কঙ্কাল, যা সময়ের বালুচরে কোনোমতে আটকে আছে। মহানদীর বুক চিরে ধেয়ে আসা কালবৈশাখীর উন্মত্ত দাপটে শতাব্দীপ্রাচীন বটগাছগুলো এমনভাবে আর্তনাদ করছিল, যেন মাটির নিচ থেকে কোনো অদৃশ্য দানব তাদের শেকড় ধরে নাড়া দিচ্ছে। জানলার শার্সিগুলো ঝনঝন করে কাঁপছে, আর সেই শব্দের সাথে পাল্লা দিচ্ছে মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন—যেন স্বয়ং রুদ্রভৈরব ডমরু বাজাচ্ছেন। বিছানার এক কোণে কাঁথা মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল দশ বছরের টুসি। তার চোখে ভয়ের ছাপ, কিন্তু সেই ভয়ের চেয়েও বেশি এক আদিম কৌতূহল। ঘরের কোণে রাখা হারিকেনের শিখাটা বাতাসের ঝাপটায় অস্থির হয়ে নাচছে। সেই কাঁপা কাঁপা আলোয় তার দিদিমার মুখখানা দেখাচ্ছিল হাজার বছরের পুরোনো কোনো তালপাতার পুঁথির মতো—প্রতিটি ভাঁজে লেখা আছে বিস্মৃত ইতিহাসের গোপন, রক্তমাখা অধ্যায়। দিদিমার মুখে এক টুকরো পান, আর চোখে এক অদ্ভুত, জ্বলে থাকা দ্যুতি—যা এই ঝড়ের রাতের বিদ্যুতের চেয়েও তীক্ষ্ণ। “দিদিমা, সেই নীল বাতির গল্পটা বলো না,” টুসি ফিসফিস করে বলল। বাইরে একটা বাজ পড়ার বিকট শব্দে তার কথা প্রায় ডুবে গেল, কিন্তু দিদিমার কানে তা ঠিকই পৌঁছাল। দিদিমা পানের পিক ফেললেন পিতলের পিকদানিতে। ‘টুং’ করে একটা শব্দ হলো, যা এই ঝড়ের মধ্যেও বড় বেমানান ও স্পষ্ট। তিনি হাসলেন। সে হাসি বড় রহস্যময়, বড় বিষণ্ণ। “নীল বাতি? ওরে পাগলি, ওটা বাতি ছিল না। ওটা ছিল দেবতার অভিশপ্ত চোখ, আর মানুষের সর্বগ্রাসী লোভ। ওটা ছিল ‘নীল-রুদ্র-দীপ’। কলিঙ্গের মানুষেরা যাকে ভয় পেত, আবার পুজোও করত। শোন তবে… এ গল্পে রূপকথা নেই, আছে কেবল হাড় আর ছাই।” দিদিমার গলা খাদে নেমে এল। তিনি জানলার দিকে তাকালেন, যেন ঝড়ের অন্ধকারের মধ্যে তিনি সেই অতীতকে দেখতে পাচ্ছেন। “তখন কলিঙ্গ দেশে গঙ্গা রাজাদের আমল। ইন্দ্রবর্মণ সবে সিংহাসনে বসেছেন। কিন্তু মানুষের খিদে কি আর রাজত্বে মেটে? তাঁর মনে তখন বিশ্বজয়ের নেশা। দক্ষিণে পল্লব আর উত্তরে ভাকাটকদের ভয়ে তাঁর ঘুম আসত না। তিনি চাইলেন এমন শক্তি, যা তাঁকে মানুষ থেকে দেবতায় উন্নীত করবে। তিনি চাইলেন মহাকালকে বশে আনতে। আর ঠিক সেই সময়েই, আকাশ কথা বলল। এক অমাবস্যার রাতে, যখন শেয়ালেরাও ডাকতে ভয় পায়, তখন আকাশ ভেঙে পড়ল।” তারপর….
📚 নীলকন্ঠ - সহস্রাক্ষের কারাগার 🖊️ লেখক : সারদারঞ্জন রায় 💰 মুদ্রিত মূল্য : 300 টাকা 🌻 প্রকাশক : চর্যা
🪶 বছর শুরুর পাঠ অপ্রত্যাশিত ভাবেই অসাধারণ ভাবে সম্পন্ন হল। কিছু কিছু বই থাকে, যা শুধুমাত্র পাঠ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই সকল বই পাঠককে সমৃদ্ধ করে, জ্ঞান ঋদ্ধ করে, অসাধারণ এক অভিজ্ঞতাও সঞ্চিত হয় তার পাশাপাশি। এই বই হল সেই সকল বইয়েরই দলে। এবার আসি মূল কাহিনীতে...
🪶 বিজ্ঞানের ভাষায় শক্তি অবিনশ্বর। তার সৃষ্টি বা সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস সম্ভব নয়। শুধুমাত্র রূপান্তরিত করা সম্ভব। এই গল্পে এই শক্তি হল এক অপশক্তি যা পৃথিবীকে শাসন করতে চায়, চায় সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রণ। এবং এই শক্তি জগতের কিছু ক্ষমতালোভী মানুষকে অমরত্ব লাভের আশায় আকৃষ্ট করে। কিন্তু অপশক্তির পাশাপশি শুভ শক্তিও বর্তমান থাকে যা সেই অপশক্তিকে রোধ করতে কিংবা তা absorb অথবা স্থানান্তর করতে উদ্যোগী হয়। অর্থাৎ শুভ বনাম অশুভ, রক্ষক বনাম ভক্ষক এর চিরন্তন লড়াইয়ের কথা বলে এই প্রবন্ধ।
🪶গল্পের প্রেক্ষাপট ওড়িশা এবং আসাম। 498 খ্রিস্টাব্দে প্রাচীন কলিঙ্গের রাজধানী দন্তপুরে মহাশূন্য থেকে এসে পড়ে এক জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড যা তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়ায় এবং তৎকালীন রাজা ইন্দ্রবর্মণ অমরত্ব লাভের আশায় সেই পাথর খন্ড নীল রুদ্র প্রদীপ রূপে প্রাসাদে প্রতিষ্ঠিত করলে নানা অমঙ্গল ঘটতে শুরু করে। শেষে বহিঃশত্রুর আক্রমণের মুখে রাজা শরণ নেন বহু পুরোনো বিশ্বস্ত কিন্তু বিতাড়িত কেলু পাইকের। যুদ্ধজয়ের পর কেলু পুরস্কার স্বরূপ দাবি করে নীল রুদ্র প্রদীপ। এরপর ক্রমাগত মণি দাস, অজয়, রিয়ার হাত ধরে এই নীল রুদ্র প্রদীপের এক অপার্থিব শক্তি সঞ্চারিত হয় কয়েক প্রজন্ম ধরে, বাধা বিপদ আসে একের পর এক।
🪶 জেগে উঠেছে শয়তান। নীল রুদ্র প্রদীপের মাধ্যমে মণি দাসের নাতি অজয় বিপুল শক্তিধর এক অশুভ শক্তিকে নিজের মধ্যে 99 শতাংশ বন্দী করলেও এক শতাংশ হারিয়ে যায় বিজ্ঞানের পরিভাষায় যা শক্তির নিত্যতা সূত্র মেনে চলে। এই 1 শতাংশ শক্তির খোঁজের দায়িত্ব এসে পড়ে অজয়ের মেয়ে রিয়ার উপর। সে কি পারবে এই শক্তিকে বন্দী করতে?
🪶 হার্ড কোর সায়েন্স ফিকশন এবং পুরাণ এর অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছে লেখক এই উপন্যাসে। বর্তমানের বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব আবিষ্কার গুলি এবং এখনও গবেষণার পর্যায়ে আছে , এরকম বিষয়বস্তু গুলোর সংকেত ভারতীয় পুরাণের নানা ঘটনাবলীর মধ্যেই আছে। তারই যথাযথ ব্যবহার করেছেন লেখক। গল্পের প্রয়োজনে কল্পবিশ্বের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে চলেছে কোয়ান্টাম ফিজিক্স, পদার্থের পঞ্চম অবস্থা বোস আইনস্টাইন কনডেনসেসন স্টেট, চতুর্মাত্রিক ডাইমেনশন (4D), পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র, পাসকালের সূত্র , তেজস্ক্রিয়তা, গিগার মুলার কাউন্টার ইত্যাদি। এছাড়াও এসেছে বায়োলজির জিন মিউটেশন, অতি পরিচিত প্রাণী গলদা চিংড়ির চির যৌবনের রহস্য ইত্যাদি। পদার্থবিদ্যার ছাত্র হিসেবে এই উপন্যাসএর প্রতিটি ঘটনা খুব সুন্দর ভাবে relate করতে পেরেছি। কিন্তু কোথাও বইটি তথ্য ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েনি। কল্পনার মিশেলে গল্পের প্রয়োজনে যতটুকু বিজ্ঞানের প্রয়োজন, লেখক ততটুকুই দিয়েছেন নিপুণ দক্ষতায়। তবে একটা জায়গায় আমার একটু খটকা লেগেছে এই কারণে যে, ইলেকট্রিশিয়ান অজয় দাস কিংবা তার দাদু মণি দাস কেউই সেইভাবে পড়াশোনা জানতো না কিংবা করার সুযোগ পায়নি। তবুও, কোয়ান্টাম ফিজিক্সে পদার্থের পঞ্চম অবস্থা, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের রহস্য, তেজস্ক্রিয়তা র মত কড়া কড়া ফিজিক্স এর বিষয়বস্তু এত সহজে একেবারে বুঝে যাওয়ার ব্যাপারটা একটু অবিশ্বাস্য লেগেছে। 🤔 যাই হোক, গল্পের প্রয়োজনে এইটুকু হজম করে নেওয়া গেছে।
🪶 সবশেষে আসি বইয়ের making এ... বিষয়বস্তুর সাথে সাথে বইয়ের making এও চর্যার পূর্ববর্তী সমস্ত বই গুলোকে ছাপিয়ে গেছে এই বইটি। ঝকঝকে প্রচ্ছদ, বিশেষত বইয়ের ভেতরের পুরো পাতা জুড়ে কাহিনীর সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ অলঙ্করণ গুলো বইটিকে আলাদাই প্রাণ দিয়েছে। এর জন্য শিল্পী আরাত্রিকা ঘোষ এবং সম্পাদক অঙ্গিরা দত্ত দণ্ডপাট আলাদা কৃতিত্বের দাবি রাখে।
🪶সব মিলিয়ে বছরের প্রথম বই হিসেবে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হল। তবে ঘটনা প্রবাহ কিন্তু এখনও চলছে। অপেক্ষা পরবর্তী পর্বের।