শহুরে যানজট থেকে বহু দূরে ঘন বিস্তারিত শালবনে নিহিত ছোটো মফসসল নভোনীল নগর। পরিবৃত্তি আর প্রগতির দিবাস্বপ্ন দেখতে দেখতে এগিয়ে চলে নিত্য নতুনের দিকে। দশমীর রাতে আকস্মিক উত্তরে হাওয়ার মৃদু ইঙ্গিত পেয়ে অনেকের মন কু ডেকেছিল। পরিযায়ী পাখির বদলে ছোটো ছোটো অভিমুখী ডানায় আগমন ঘটল একদল মথের। তারপর ঘটল দুটো নৃশংস খুন! বাদ গেল না একটি কিশোর বয়সি বালকও। কীভাবে যেন অগোচরে থাকা এই ছোট্ট মফস্সলের খোঁজ পেয়ে এক চরম বিপদ এসে ঘাঁটি গেড়ে বসল। ইন্সপেক্টর সুবীর দত্তের সঙ্গে প্রমাদ গুনতে লাগল মফসসলবাসী। হঠাৎ বেড়ে উঠল শেয়ালদের আনাগোনা। দুটি মৃতদেহের কাঁধে কীসের যেন দাগ দেখে শিউরে উঠলেন ডাঃ মীর আহমেদ। জঙ্গলের কিনারে উনিশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত, ভগ্ন বাড়িটার পলাতক বাসিন্দার নাম উঠে এল আরও একবার। কৈশোর বয়সের ধাঁধার সমাধান খুঁজতে খুঁজতে এক ভয়ানক প্রহেলিকার সম্মুখীন হল সার্থক আর চব্বিশ বছর বয়সী জনি। রক্তের অনুপুরণ দিয়ে মথের ঝাঁক আড়াল করে রাখতে চাইল এক আঁধারসত্তাকে, সে... চন্দ্রগ্রাসী।
আজ থেকে তিন দশকের কিছু বেশি আগের এক আধা-পরিত্যক্ত শিল্প-শহর নভোনীল নগর। স্থানীয় থানার ইনস্পেক্টর সুবীর দত্তের ছেলে সার্থকের চোখ দিয়েই শহরটাকে আমরা দেখি। নয়ের দশকের তুলনামূলকভাবে মন্থর জীবন, কৈশোরের সংকট ও মানসিক টানাপোড়েন, ঈর্ষা ও প্রেম, দীর্ঘশ্বাস আর এগিয়ে চলা— এইসব দিয়েই ভরে থাকে তার দিনরাত্রি। তারও প্রায় দু'দশক আগে এই শহরের ডি-ব্লক-এ ঘটেছিল কয়েকটি বীভৎস অপরাধ ও অন্তর্ধান। ততদিনে তার রেশ থিতিয়ে এসেছিল; কিন্তু হঠাৎই ঘটল এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড। শুধু পুলিশ অফিসার সুবীর নন; সার্থকও ভীষণভাবে নাড়া খেল সেই ঘটনায়। তারপর থেকেই শহরটাকে ঢেকে ফেলতে লাগল এক অদ্ভুত কুয়াশা। এল অদ্ভুতদর্শন মথের ঝাঁক। শালবনে এল অসংখ্য শিয়াল। আর হারিয়ে যেতে লাগল মানুষেরা। তারা ফিরেও এল; কিন্তু অনুভূতি বলতে তাদের মধ্যে রইল শুধুই হিংস্রতা... আর রক্ততৃষ্ণা! কেন? কী হয়েছে নভোনীল নগরের ওই ডি-ব্লক-এ? কী হয়েছিল ওই ডি-ব্লকে সেই সাতের দশকে?
'চন্দ্রগ্রাসী' পড়তে-পড়তে এতরকম অনুভূতি জেগেছে যে পড়া শেষ করার পরেও তাদের সবগুলোকে গুছিয়ে লিখে উঠতে পারছি না। তবু যদি চেষ্টা করি, তাহলে মোটের ওপর চারটি কথা লেখা যায়। সেগুলো হল~ প্রথমত, বাংলা ভাষায় ভ্যাম্পায়ার নিয়ে প্রথম মৌলিক উপন্যাস এটিই। আমি জানি এই অবধি পড়েই অনেকে হাঁ-হাঁ করে উঠতে চাইবেন। বিশ্বাস করুন, এই এলাকাটা নিয়ে আমি মোটামুটি খবর রাখি। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের বেশ কিছু 'বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে' লেখাকে আমি বাদই দিচ্ছি। বাণী রায়ের 'রাসমণির কাহিনি' দিয়ে বাংলায় এই বিশেষ অপজীবটির যথাযথ আবির্ভাব ঘটে। তার উত্তরসূরিদের মধ্যে শিশির বিশ্বাসের রাইমণি সিরিজের সব লেখাই পড়বে। এছাড়া আছে গৌরী দে'র বহু গল্প। 'পিশাচ' নামে, বা সরাসরি ভ্যাম্পায়ার হিসেবেই এই জীবেদের নিয়ে অনীশ দেবের সুললিত লেখনীর বহু রচনায় সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা সাহিত্য। শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায় 'ইটি' নাম দিয়ে একটি সিরিয়াসলি ভয়োৎপাদক উপন্যাস লিখেছিলেন 'ভূত পেত্নি রক্তচোষা' সংকলনে। এমন আরও বহু লেখা আছে চারদিকে। কিন্তু তাদের কোনোটিই মৌলিক নয়। সত্যি বলতে কি, বাণী রায়ের লেখার চরিত্র-ভাবনাটি আমদানিকৃত হলেও আমি সেটিকে তবু অনেকাংশে মৌলিক বলব। তার কারণ, বাংলার ঢিলেঢালা জীবন, সেই সময়ের সামাজিক অবস্থা, আর খুব হাল্কা একটা ইরোটিসিজম মিশিয়ে তিনিই একটা সলিড টেমপ্লেট দিয়েছিলেন আমাদের। বাকিরা... কিছু না বলাই ভালো। কিন্তু আলোচ্য উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ভাবনা, বিশেষত এতে 'ভ্যাম্পায়ার' জিনিসটা ফ্যান্টাসি হলেও তাকে যেভাবে একটা জৈববৈজ্ঞানিক মোড়কে পরিবেশন করা হয়েছে, তা বাংলায় এযাবৎ দেখিনি। দ্বিতীয়ত, হরর জগতের বেতাজ বাদশা স্টিফেন কিঙের উদ্দেশে এই লেখা এক অসাধারণ শ্রদ্ধার্ঘ্য। সুধীজন জানেন, কিং শুধুই ভয় পাওয়ান না। বরং ছোটো শহরের ছোটো-ছোটো মানুষের জীবন নিয়ে তিনি এক বিচিত্র নকশা গড়ে তোলেন, তার আঠালো আকর্ষণে আটকে পড়া মানুষদের ওপর ক্রমে, এক বিশাল মাকড়সার মতো করে নেমে আসে বিপদ— চেহারা-বদলানো মাকড়সা, ভিনগ্রহী, লোভ, শয়তান, ভ্যাম্পায়ার... সবকিছুই হতে পারে তা। আলোচ্য উপন্যাসটি মূলত 'সালেম'স লট', আর তারই সঙ্গে কিঙের অন্য একগুচ্ছ কিংবদন্তি হয়ে ওঠা লেখার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। না; সে-সব উপন্যাস থেকে কিচ্ছু নেওয়া (সাদা বাংলায় ঝাড়া) হয়নি এতে। কিন্তু ছোট্ট শহরে নেমে আসা মারাত্মক বিপদ আর তাতে সাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তরণ বা অধোগমনের ছবি তুলির মৃদু আঁচড়ে ভারি সুন্দরভাবে এঁকেছেন লেখক। তৃতীয়ত, পলড্যরির রচনা থেকে আজ অবধি ভ্যাম্পায়ার নিয়ে যা-কিছু লেখা হয়েছে, তার প্রায় সবেই প্রচ্ছন্ন (ক্ষেত্রবিশেষে প্রকট) হয়ে থেকে সাইকোসেক্সুয়াল ইরোটিসিজম। এই উপন্যাসে তা এসেছে সূক্ষ্ম অথচ সুন্দরভাবে। তবে তার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হিসেবে ঘৃণার দহনটি যত স্পষ্টভাবে ফুটেছে, অনুতাপ কিন্তু তেমনভাবে দেখা যায়নি। সবচেয়ে বড়ো কথা, উপন্যাসের পটভূমি হিসেবে স্মল-টাউন সেটিং তৈরি করতে, সেইসব চরিত্রদের কথা আর ব্যথায় যত পাতা ও শব্দ লেখক ব্যয় করেছেন, দু'দশক পুরোনো ঘটনাটি কিন্তু ধরা দিয়েছে তার তুলনায় প্রায় নগণ্য— কিছু আভাস, কিছু অনুমান, অনেক অপমান— হয়েই। তার পরের অভিঘাত এসেছে বিস্ফোরক আকারে। কিন্তু উপন্যাসের অন্ধকার কেন্দ্রের যুগ্ম নক্ষত্রটির সেই দ্বিতীয়জন দেখা দিয়েছে শুধু শেষ ক'টা পাতায় ডিউস এক্স মাখিনা হয়ে। এটা আমার বড্ড অসম মনে হয়েছে। চতুর্থত, গল্পের শেষটা অনেকাংশে অ্যান্টি-ক্লাইমেটিক। অত শক্তিশালী এক ভ্যাম্পায়ার, যে প্রায় অন্ধকারের দেবীই হয়ে উঠতে পেরেছিল, সে এত সহজে ফুরিয়ে গেল? তার দ্বারা সৃষ্ট (অন্ধকার জীবনপ্রাপ্ত?) চরিত্রেরাও প্রাণহীন পুতুলের মতো রণে ভঙ্গ দিল এত দ্রুত? ব্যাপারটা ঠিক হজম হল না। তবে সুধীজন জানেন 'সালেম'স লট' পুড়ে গেলেও সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ সেখানে ফিরে যায়নি। গেলে... তারা আর ফিরত না। এই উপন্যাসে আতঙ্কিত নগরবাসী একসময় পালিয়ে গেলেও পরে প্রশাসনের আশ্বাস পেয়ে নভোনীল নগরে প্রত্যাবর্তন করেছিল। সেই খবর ছেপেই এই বইয়ের সূচনা। তাহলে কি একটা 'ওয়ান ফর দ্য রোড' আমরা পেতে পারি ভবিষ্যতে? আশায় রইলাম, কারণ "দ্য ডেড ট্রাভেল ফাস্ট।" গ্রন্থনির্মাণের ক্ষেত্রে জাস্ট কোনো কথা হবে না। অসাধারণ প্রচ্ছদ ও অলংকরণ (রণি বসু জিন্দাবাদ!), নয়নসুখকর বর্ণ-সংস্থাপন, শুদ্ধ মুদ্রণ, রঙিন বুকমার্ক— সব মিলিয়ে বইটা বিষয়ের মতো পরিবেশনের ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। এইসব এতোল-বেতোল কথা অনেক হল। পুরো ব্যাপারটা সামারাইজ করে দিই এইবার। ১. হররপ্রেমী হলে বইটা পড়ুন। এইরকম ভালো হরর উপন্যাস বাংলায় খুব বেশি পড়ার সৌভাগ্য হয় না আমাদের। ২. পড়ার পর কী মনে হল, সেটা লিখুন। এই লেখক অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তালি ও গালির মিশ্রণ নামক সার-জল না পেলে ইনিও কিছুদিন পর গুষ্টির পিন্ডি লিখে পাতা ভরাবেন। তেমন কিছু হওয়ার বদলে তাঁকে লাইনে রাখুন। আর সেটা করার জন্য বইটা পড়ুন, কারণ এ আপনার সামাজিক কর্তব্য। অলমিতি।
দারুণ!!!😯🩷 এই পার্সপেক্টিভ টা আসবে ভাবতেই পারিনি✨ এন্ডিং টাও একদম পারফেক্ট (উপরন্তু বইমেলা থেকে পাওয়া প্রথম কোন বইয়ের signed copy 🥹) thank you!! ভীষণ ভিন্ন স্বাদের একটি গল্প! এক দিনে পড়ে ফেলেছি!! ps. "Carmilla" -র বাজে ভক্ত হওয়ায় বইটা উপরি পাওনা ছিল 🫢🧛🏻♀️