কলকাতার একদিকে সেপারেটিস্ট মিছিলের দাবানল, অন্যদিকে অজানা অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া নিরপরাধ কিছু মানুষের জীবন। সেই সময়েই শুরু হয় এই কাহিনি।
শ্যামবাজারে একটা রক্তাক্ত ক্রসফায়ার, মুহূর্তে বদলে দেয় অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের শান্ত-নির্বিবাদী জীবন। স্ত্রী প্রিয়া নিহত, পাঁচ বছরের ছেলে আরভ নিখোঁজ। কীভাবে?
এই সময়েই প্রবেশ ঘটে তূর্য ভট্টাচার্যর। দিনের পর দিন বেকারত্বের পাঁকে ডুবে থাকা প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। সে নিজেও জানে না, এই তদন্তই তার জীবনের সবথেকে কঠিন, বিপজ্জনক ও বিধ্বংসী অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।
হারিয়ে যাওয়া আরভের খোঁজে নেমে তূর্য আবিষ্কার করে, এই কেসটা নিছক নিখোঁজের ঘটনা নয়। সেখানে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক ক্ষমতার দানবীয় খেলা।
তুর্য কি সত্যের কাছে পৌঁছতে পারবে? নিখোঁজ শিশু আরভ কি এখনও বেঁচে আছে? এই শহরের আলো-আঁধারির আড়ালে কারা লিখছে এই রক্তাক্ত ইতিহাস?
একটা রাজনৈতিক থ্রিলার, যেখানে উত্তেজনা, আবেগ, রহস্য এবং বিপদ-একই সুতোয় গাঁথা।
সারাংশ : শ্যাম বাজারের চৌমাথার মোড়ে হঠাৎ করেই যেন শুরু হয় আর্মি আর কিছু আতঙ্কবাদীদের মধ্যে খন্ড যুদ্ধ যাতে প্রাণ যায় অনেক সাধারণ মানুষের। সেই নিহতদের মধ্যে ছিল ব্যাঙ্ক কর্মী অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী প্রিয়া। পুলিশের কাছ থেকে এই তথ্য পাওয়ার পর হতভম্ব হয়ে অরিন্দম বাবু থানায় ছুটে আসে এবং জানতে চায় যে তাহলে তাঁর ছোট ছেলে আরভের কী খবর? সেও তো গেছিল তাঁর মায়ের সাথে। তদন্তকারী অফিসার তখন আরভের বিষয় খোঁজ খবর নিতে গিয়ে জানতে পারেন যে তাকে নাকি সেখান থেকে কোন এক বোরখা পরিহিতা মহিলা নিয়ে গিয়েছে, কিন্তু কোথায়, তা জানা যায়না। এরপরে সেই অফিসার যখন আরও গভীরে তদন্ত করতে যান, তখন হঠাৎই তাঁর মৃত্যু হয়ে যায়। তখন অরিন্দম বাবু নিরুপায় হয়ে যায় প্রাইভেট ডিটেকটিভ তুর্জ ভট্টাচার্জের কাছে সাহায্যের আশায়। তুর্জ কেসটি ইনভেস্টিগেট করতে গিয়ে বুঝতে পারে কেসটি আসলেও এত সহজ নয়। এই কেসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, রাজ্য রাজনীতি এমনকি দেশের সুরক্ষা ব্যবস্থা। সাধারণ একজন ছা পোষা প্রাইভেট ডিটেকটিভ কী পারবে সেই জটিল রহস্যের সমাধান করে আরভকে উদ্ধার করে আনতে নাকি এই কেসই হবে তাঁর জীবনের শেষ কেস?
পজিটিভ : প্রথম পজিটিভ পয়েন্ট তো অতি অবশ্যই গল্পের প্লট। কোথা থেকে শুরু করে কোথায় চলে যাবে, তা আগে থেকে আন্দাজ করা যায় না, যার ফলে নেক্সট যেটা পজিটিভ পয়েন্ট চলে আসে, সেটা হল এর আনপ্রেডিক্টেবিলিটি। এই জিনিসটা না থাকলে মনে হয় থ্রিলার গল্পকে থ্রিলার বলে মনে হয় না। সেই কারণেই এর থ্রিলিং পোর্শণ গুলোও দারুণ ভাবে ওয়ার্ক করেছে। সেই কারণে এর নেক্সট প্লাস পয়েন্ট হল গল্পের মধ্যেকার থ্রিল। শুরু থেকে শেষ পর্জন্ত রয়েছে এই থ্রিলিং বিষয়টি। নেক্সট পজিটিভ পয়েন্ট হল এর ক্যারেকটার বিল্ডিং। মেইন ক্যারেকটার তুর্জ ছাড়াও বাকি ক্যারেকটারদের যথেষ্ট জায়গা দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিটা ক্যারেকটার ভালো মতন স্ট্রাইক করে। তবে এর কিছু নেগেটিভ দিকও রয়েছে, যেটা নেগেটিভ পয়েন্ট বলার সময় জানাবো। নেক্সট যেটা পজিটিভ পয়েন্ট সেটা হল লেখকের লেখনী, যার গুণে এই লেখা একবার পড়া শুরু করলে দুর্বার গতিতে পাঠককে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং এই কাহিনীকে অনেকগুলি চ্যাপ্টারে ভাগ করে লেখা হয়েছে, যেগুলো প্রায়শই ক্লিফ হ্যাঙ্গারে শেষ হয়, যা পরবর্তী পার্টে পাঠককে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। শেষ পজিটিভ পয়েন্ট হল এর ক্লাইম্যাক্স, যেটাকে মাইন্ড ব্লোয়িং বললেও অত্যুক্তি করা হবে না। শেষে এসে এমন একটি জায়গায় কাহিনী শেষ হয়, যেখান থেকে অটোমেটিক্যালি পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা শুরু হয়ে হয়ে যায়, নন স্পয়লার রিভিউ বলে এর থেকে বেশি আর বলছি না।
নেগেটিভ : প্রথম নেগেটিভ পয়েন্ট হল তুর্জর প্রথম বিল্ড আপ। তাঁর একটি ভালনারেবল সিচ্যুয়েশন দেখানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সূত্রে সে তাঁর হাতে ধরা কেস নিয়ে কেন সিরিয়াস হচ্ছিল না, তাঁর কোন সদুত্তর দেওয়া হয়নি, কারণ তারপরেই যখন বাচ্চা মিসিং এর কেস সে হাতে নেয়, সেখান থেকে তাঁর তদন্ত করার কোন গাফিলতি আর হয়নি। দ্বিতীয় নেগেটিভ পয়েন্ট হল যে ক্রসফায়ার দিয়ে কাহিনী শুরু হল, সেই বিষয়ে জাস্ট ইনফরমেশন দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল, কিন্তু শেষে এসে কাহিনী যেইদিকে টার্ন নিয়ে নিল, সেই হিসেবে ক্রসফায়ারের আরও জাস্টিফিকেশন দেওয়া উচিৎ ছিল যে, কেন সেই রিলেটেড কোন অ্যাকশন নেওয়া হল না। নন স্পয়লার রিভিউ বলে এর থেকে বেশি ডিটেইলসে বলতে পারছি না। এছাড়া তুর্জকে যেই কারণে এই বিশেষ দলের অন্তর্ভুক্ত করা হল, সেখানে তারা কেন তুর্জর ওপর এত রিলাই করতে শুরু করল, সেই জায়গা নিয়ে আমার একটু ডাউট রয়েছে। এর কারণ হিসেবে যদি এইটা বলা হয় যে সে কোন ভাবে কিছু গোপন তথ্য বুঝতে পেরেছিল, তাহলে সেটা আমার স্ট্রং পয়েন্ট বলে মনে হয়নি। তার সাথে সাথে তুর্জর ইনভেস্টিগেশন বিষয়টাকে শুধু মাত্র ইনফরমেশন শেয়ার করার মতন ভাবে না দেখিয়ে, তার পদ্ধতি যদি আরেকটু দেখানো হত, তাহলে বেটার হত বলে মনে হয়েছে আমার। এছাড়া প্রথম দিকে সমস্ত কিছু যেন নিজে থেকে এসে তুর্জর সামনে চলে আসছে বলে মনে হয়েছে। একজন ডিটেকটিভকে একটুও না খেটে পরপর ক্লু যেন সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে এই জায়গাটি আমার একটু নজরে লেগেছে।
উপসংহার : কাহিনীতে কিছু সমস্যা থাকলেও রণদীপ বাবুর দুরন্ত লেখনীর গুণে এই কাহিনী গোগ্রাসে পড়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছি। কাহিনী আসলে যত এগিয়েছে, যত খোলসা হয়েছে, তত অবাক হয়ে গেছি আমি। পড়া শুরু করেছিলাম গোয়েন্দা কাহিনী হিসেবে, কিন্তু তারপরে যা পেলাম, তাতে অবাক না হয়ে পারিনি এবং এর পরবর্তীতে এই কাহিনী কোন দিকে এগোয়, তাঁর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে রইলাম। শেষের ওই ট্যুইস্ট চরম লেগেছে। যারা থ্রিলার গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তাদের আশা করি এই কাহিনী ভালোই লাগবে, বিকজ অফ দি এন্ডিং। তবে রনদীপ বাবুর কাছ থেকে আরেকটু বেটার লেখা আমি এক্সপেক্ট করেছিলাম, যে কারণে আমি হালকা হলেও হতাশ হয়েছি। গল্পের দিক থেকে আমি নিশিচরকে এগিয়ে রাখবো।
"সেই একঘেয়ে রৌদ্রজ্জ্বল সকালে দাঁড়িয়ে অরিন্দমের জীবনে কোনও অসামঞ্জস্য ছিল না। ছিল না কোনও ইশারা যে, আজ অন্যরকম কিছু ঘটবে। তবু ঠিক সেইদিন, শহরের রাস্তায়, সময় তার জন্য এমন এক ফাঁদ পাতছিল, যার গভীর গহ্বরে তলিয়ে যেতে চলেছিল তার ছাপোষা মধ্যবিত্ত জীবন।"
পাঁচ বছরের ছোট্ট ছেলে আরোভকে নিয়ে তার মা প্রিয়া গিয়েছিল শ্যামবাজারে, নিজের সাধারণ ব্যক্তিগত দরকারে। সাথে আরভের বায়না ছিল সে ম্যাঙ্গো আইসক্রিম খাবে কিন্তু তার আগেই তিলোত্তমার বুকে ঘটে গেল এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা। প্রিয়া আর আরভ যেখানে দাঁড়িয়েছিল, তার বিপরীত দিক থেকে এগিয়ে আসে একটা রাজনৈতিক মিছিল আর তাঁদের ধ্বনি ছিল ভীতিপ্রদ। অন্যদিকে আরভের বাবা অরিন্দম যখন ব্যাংকে নিজের কাজে মত্ত, হঠাৎই এক ফোন তাঁকে বুঝিয়ে দেয় যে তাঁর চেনা জীবনের ছন্দপতন হয়েছে। প্রিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে অরিন্দম ছুটে যায় মর্গে কিন্তু আরভ কোথায়? তার খোঁজ কেউ দিতে পারে না। ভেঙে পড়া অরিন্দম এবার যোগাযোগ করে তাঁর স্কুল জীবনের সহপাঠী তূর্যর সাথে, যে পেশায় একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। সামান্য বাচ্চা নিখোঁজের কাজে নেমে তূর্য দেখে, সমস্যার শিকড় আরও গভীরে। উঠে আসে প্রশ্নের পর প্রশ্ন আর বেকার তূর্যর জীবনে ঘনিয়ে আসে সমস্যা, কর্ম ব্যস্ততা, উত্তেজনা ও ভয়। আপাত সাধারণ একটা ঘটনা এক বিশাল কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এই রহস্যের শেষ কোথায়?
বেশ টানটান রহস্য, উত্তেজনা আর কি হবে-কি হবে অনুভূতির মধ্যে দিয়ে অন্তিমের দিকে এগিয়েছে এই উপন্যাস। তবে তূর্যর কাহিনী - "শেষ হয়েও হইল না শেষ।" আর তার খানিকটা আভাস লেখক নিজেই দিয়েছেন উপন্যাসের শেষে। পলিটিকাল থ্রিলার হওয়া সত্ত্বেও লেখক যেভাবে সাধারণ মানুষের অনুভূতিগুলো গুছিয়ে তুলে ধরেছেন তা সত্যিই প্রশংসা যোগ্য। এছাড়াও গল্পের প্রয়োজনে পাঠকের পরিচয় হয় অনেক চরিত্রের সঙ্গে। এরকম একটা সিরিয়াস গল্পেও লেখক কিছু জায়গায় যে সেন্স অফ হিউমারের পরিচয় দিয়েছেন, সেটা খুবই উপভোগ্য।
রণদীপ নন্দীর লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় "কুয়াশাঘেরা কাওনঝোরা" র ���াত ধরে। তখন থেকেই ওঁনার লেখা আমার খুব ভালো লাগে। তূর্যর প্রথম কাহিনী বোধ হয় "নিশিচর", তবে তা এখনও আমার পড়া হয়নি। যাই হোক, যাঁরা থ্রিলার আর রহস্য পড়তে ভালোবাসেন, তাঁরা একবার পড়ে দেখতেই পারেন "ক্রসফায়ার"।
"পথের হদিস পথই জানে, মনের কথা মত্ত মানুষ বড় শস্তা, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো।"