প্রাণতোষদা তন্ত্র-মন্ত্র-যন্ত্র ইত্যাদিতে অনভিজ্ঞ, অলৌকিকে উৎসাহী এক সাধারণ মানুষ। তাঁর কাছে ভৌতিক উপদ্রবের উপশম নেই, কিন্তু সেই উপদ্রবের শিকড় অবধি পৌঁছোনোর অধ্যবসায় আছে। বিশ্বাস করেন, যে-সব লৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, যা ভয়ের উদ্রেক করে, মানুষকে অস্থির করে, তার অধিকাংশেরই সুত্র থাকে মানুষের মনে থেকে যাওয়া কোনও গভীর গহন পাপবোধে। অলৌকিক রহস্যের পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চারও সমান প্রাধান্য পেয়েছে গল্পগুলিতে। মিশরের প্রাচীন দেবদেবী, উত্তর-পূর্ব ভারতের আরবান লেজেন্ড, দক্ষিণ ভারতের এক পর্তুগিজ উপনিবেশ, এমনকি কলকাতার দক্ষিণতম প্রান্তের এক বিমর্ষ মাস্টারমশাই ও তার আশ্চর্য এক চশমাও প্রাণতোষদার কাহিনির উপজীব্য।
যথাসময়ে ভিডিও বানাবো। তখন বিস্তারিত কথা বলবো। শুধু এটুকু বলবো, বর্তমান সময়ের বেশিরভাগ ভয়ের বই পড়লে মনে হয় GATE এর ৯৫ পার্সেন্টাইল। ভালো কিন্তু কোনো ভালো ইনসিটিউট থেকে কল আসবে না। এই বইটা আক্ষরিক অর্থে ৯৮/৯৯ পার্সেন্টাইল হয়ে উঠতে পেরেছে। কারণগুলো ভিডিওতে বলবো।
এক নম্বর কেটেছি। আমি একজনকে চিনি যার phd পোটেনশিয়াল ছিল। কিন্তু MSC পর তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। বেশ কয়েকটা গল্প ইটসেলফ বড় উপন্যাস হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কিছুটা জোর করে গল্পে কনভার্ট করা হয়েছে।
বই সম্পর্কিত সবচেয়ে বিখ্যাত প্রবাদটি বোধহয়, ‘Don’t judge a book by its cover’। কিন্তু বর্তমানের এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যখন ছবি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, তখন কোনও বইয়ের প্রচ্ছদ সুদৃশ্য হওয়াই কাম্য। তাতে করে বিপণনের ক্ষেত্রে পাঠকদের আকৃষ্ট করতে পারারও একটা বিষয় তৈরি হয় স্বাভাবিকভাবে। ঠিক যেমন, এই বইটির প্রচ্ছদ প্রথমবার সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে ভালো লাগার কারণেই বইটি সংগ্রহ করার ইচ্ছা জাগে। হরর জ্যঁরে কঙ্কাল-করোটি সম্বলিত প্রচ্ছদ হাজার-এক রকমের দেখা যায়, কিন্তু সেটাকেই এরকম শৈল্পিক নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তোলা আজকাল বিরল। ছবি যেন সত্যিই কথা বলে!
তবে প্রবাদের কথাও একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। বইয়ের মূল কন্টেন্টের বিষয়েও ওয়াকিবহাল থাকা জরুরি। সে-সম্বন্ধে বইটির বিবরণ পড়তে গিয়ে জানতে পারি যে, এই সিরিজ়ের প্রধান নায়ক প্রাণতোষ দাশগুপ্ত (প্রাণতোষদা) সাধারণ একজন মানুষ এবং তিনি অলৌকিকে উৎসাহী হলেও তন্ত্র-মন্ত্রে পারদর্শী নন। — দ্বিগুণ পরিমাণে সবুজ সংকেত। প্রথমত, মূল চরিত্রটির নাম মোটামুটি স্বাভাবিক ধরনের, ভেবেচিন্তে বার করা কোনও কেতাদুরস্ত ব্যাপার নয়। অর্থাৎ, চরিত্রটিকে অতিমানবীয় করার প্রচেষ্টা না থাকাই স্বাভাবিক। এর পাশাপাশি দ্বিতীয় সবুজ সংকেত ছিল, মূল চরিত্রের তন্ত্র-মন্ত্রে অপারদর্শিতা। কারণ, এযাবৎকালের বাংলা ভাষার বেশিরভাগ হরর সিরিজ়ের মধ্যে তন্ত্র-মন্ত্রের উপজীব্যতাই একমেবাদ্বিতীয়ম্। সেসবের ন্যারেটিভ প্রতিবার এতই একরকম মনে হত যে, একঘেয়েমির কারণেই পড়া বন্ধ করে দিই। সেখানে এই সিরিজ়ে তন্ত্রের বাইরে নতুন-কিছুর প্রতিশ্রুতি দেখে সংগ্রহ করার বিষয়ে একেবারে নিশ্চিত হয়েছিলাম।
এরপর পড়ার পালা। সেখানে শুরুতেই এক চমক। বইটির ভূমিকাতে বলা হয়েছে যে, এই সিরিজ়ের অনুপ্রেরণা হুমায়ূন আহমেদ-এর ‘মিসির আলি’ সিরিজ়। কাকতালীয়ভাবে আমি নিজেই কিছু সময় আগে মিসির আলি সিরিজ় পড়া শুরু করেছিলাম, এবং সেটা ভালোও লেগেছিল, বলাই বাহুল্য। তো সেই পছন্দের সিরিজ় থেকে অনুপ্রেরণার ব্যাপারটাই পড়ার উৎসাহ বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। — কিন্তু মূল কাহিনিগুলির মধ্যে প্রবেশ করার পরেই শুরু হয়, মিশ্র-অনুভূতির ব্যাপার।
বইটিতে রয়েছে মোট চারটি কাহিনি। হেকা, অমোঘ, অনিমেষ সামন্তের অদ্ভুত চশমা, মার্লো’জ় এন্ড। প্রথম কাহিনিটি আকারে তুলনামূলকভাবে বড়, এবং প্রাপ্তবয়স্ক উপাদান সম্বল করে রচিত। বাকি তিনটি আড়ে-বহরে মাঝারি, এবং কিশোর-কাহিনি হিসেবে রচিত।
প্রথম কাহিনি ‘হেকা’-র উপজীব্য প্রাচীন মিশরীয় ব্যাপারস্যাপার। বহুল ব্যবহৃত একটি ট্রোপ। বিভিন্নরকমের অলৌকিক রহস্য, থ্রিলিং উপাদান, ভয়াল উপাদান দিয়ে সমস্ত কাহিনি গড়ে উঠলেও, সমস্তটা চেনা-পরিচিত অকাল্ট গোত্রের কাহিনির ছায়া থেকে একেবারেই বেরোতে পারেনি। যে-ধরনের, বা যে প্যাটার্নের (জাদুবিদ্যা, অভিশাপ, অকাল্ট প্র্যাকটিস, শুভাশুভ দ্বন্দ্ব) কাহিনির সঙ্গ একদা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম, এটিও ঠিক তাই-ই। মূল চরিত্র প্রাণতোষদা তন্ত্রমন্ত্রের ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও সমস্তটা আখেরে সেরকম পথেই এগোয়।
দ্বিতীয় কাহিনি ‘অমোঘ’-এর উপজীব্য বিষয় ভারতবর্ষের নর্থ ইস্ট অঞ্চলের একটি অফবিট জায়গায় গড়ে ওঠা অলৌকিক রহস্য। এই কাহিনিটি থেকেই সিরিজ়টি প্রকৃত অর্থে স্বকীয়তা পেতে শুরু করেছে। জাদুর বদলে বর্ণনা-ভিত্তিক অলৌকিকত্ব-ই প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে এই কাহিনি থেকে। ঘটনাক্রম ঘটে আপন গতিতে, তাতে চরিত্রেরা জড়িয়ে পড়ে নিজে থেকেই। ‘Retribution’ শব্দটিই বোধহয় এই কাহিনির বিষয়বস্তুর সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য সংজ্ঞা।
তৃতীয় কাহিনি ‘অনিমেষ সামন্তের অদ্ভুত চশমা’ এই সংকলনে আমার সবচেয়ে পছন্দের। দুরন্ত গতির গল্প, মেদহীন বর্ণনা, এবং নতুনরকমের একটি কনসেপ্ট। অলৌকিকের আভাস পাওয়ার জন্য দূরদূরান্তের অজ্ঞাত এলিমেন্টের বদলে পরিচিত গণ্ডির মধ্যেই ঘটে চলে সবকিছু। এবং এইটাই কাম্য। কাহিনির উপজীব্য বিষয় আলাদা করে বলে দিতে লাগে না, অনিমেষ সামন্ত নামক এক রিটায়ার্ড স্কুল হেডমাস্টারের অদ্ভুত চশমা এবং তার পেছনে একজোড়া অতি-রহস্যময় চোখ নিয়েই যাবতীয় ব্যাপার।
চতুর্থ এবং সর্বশেষ কাহিনি ‘মার্লো’জ় এন্ড’ আবারও একবার দূরবর্তী (এবং রহস্যময়) লোকেশনে গড়ে ওঠা অলৌকিক অভিযান। অকুস্থল : দক্ষিণ ভারতের ‘মার্লো’ নামক সমুদ্রতীরবর্তী এক গ্রাম। বর্ণনা-ভিত্তিক অলৌকিকত্বের যে বিষয়টা দ্বিতীয় কাহিনি থেকে ইনকর্পোরেট করা শুরু হয়েছিল, তা এই কাহিনির শেষের দিকে দুর্দান্তরকমের ঘোর-লাগা একটা আমেজের রূপ নিয়েছে। অসাধারণ। একটা ভুতুড়ে লাইটহাউস, বিষণ্ণ ইতিহাস, এবং স্বজন হারানোর দুঃখের মায়াময় বর্ণনা — সবমিলিয়ে মনে গভীরভাবে রেখাপাত করার মতো বিষয়।
বইটিতে উপরিউক্ত চারটি কাহিনি রচনাকালের নিরিখে কালানুক্রমে সাজানো। ‘হেকা’ সবচেয়ে পুরনো, ‘মার্লো’জ় এন্ড’ সাম্প্রতিকতম। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, সময় যত এগিয়েছে সিরিজ়টি তত বেশি স্বকীয় তথা গতিময় হয়ে উঠেছে। কোনও সিরিজ়ের ট্রায়াল ফেজ়ের ক্ষেত্রে এই প্রগ্রেসিভ ব্যাপারটি অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে, মিসির আলি সিরিজ়ের থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও, কাহিনির মধ্যে মনস্তত্ত্বের সাবলীল প্রয়োগ করার সবচেয়ে মূল্যবান দিকটিই আলোচ্য সিরিজ়ে সচেতনভাবে (ভূমিকায় বিবৃত) উপেক্ষিত। এই বিষয়টিকে এড়িয়ে না গেলে বোধহয় আরও বেশি গ্রাউন্ডেড হত সমস্তকিছু। গতে বাঁধা অলৌকিক রোমাঞ্চ-কাহিনির তো অভাব নেই, তার মাঝে একরকমের স্বকীয়তা আশা করেই এতকিছু বলা। কার্য-কারণ না-হয় রইল অলৌকিক, কিন্তু সেসবের নেপথ্যে লৌকিক উপাদান যোগ করতে পারলে বোধহয় আরও বেশি উপভোগ্য পরিবেশনা অপেক্ষা করবে পাঠকদের জন্যে।