ব্রিটিশ ভারতের পুলিশ-গোয়েন্দা ইউ-মেস-নট ওরফে উমেশনাথের চারটি অনুসন্ধানের কাহিনি সংকলিত হয়েছে এই বইয়ে। একটি দীর্ঘ সময়কাল ধরে কলকাতার রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বদলাতে থাকা সমাজের পটভূমিতে সংঘটিত বেশ ক'টি অপরাধের মুখোমুখি হয়েছেন উমেশনাথ। তারা হল~ ১) আগুনপাখি: লবণ সত্যাগ্রহের সময়কার কলকাতায় বিপ্লবীদের সঙ্গে উমেশনাথের এক পরোক্ষ অথচ অত্যন্ত নিকট সাক্ষাতের এই ছোট্ট গল্পটির মধ্যে যতখানি ইতিহাস, আবেগ, আর বাস্তব মিশে রয়েছে, তা অনেক পাঠ্য বইয়েও পাওয়া যায় না। অথচ উমেশনাথের চরিত্রটিকে নির্ভুলভাবে চিনিয়ে দেয় এই আখ্যান। ২) খাঁচার ভিতর অচিন পাখি: টেগার্ট সাহেবের পুলিশ থেকে অবসর নেওয়ার একেবারে মুখেই এক বিচিত্র হত্যারহস্যের সম্মুখীন হল ইম্পিরিয়াল পুলিশ। দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য 'ডিমোটেড' উমেশনাথকেই অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হল। অর্থনীতি ও শ্রেণিবিদ্বেষ, রাজনীতি ও লোভ, সর্বোপরি লকড-রুম মিস্ট্রির হেঁয়ালি— এইসবের মধ্য থেকে সত্যকে উদ্ধার করতে সচেষ্ট হলেন উমেশনাথ ও তাঁর সহকর্মী গিরীশ। পারলেন কি? ৩) স্মরগরল: কুয়াশার মধ্য দিয়ে মাতাল এক সাহেবের র্যাশ ড্রাইভিং, একটা ফুলের দোকানে ডাকাতি ও বীভৎস হত্যাকাণ্ড, শহরের অন্য প্রান্তে অন্য একটি হত্যা— এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর পিছু নিতে গিয়ে আলাদা-আলাদা উত্তর পেতে লাগল পুলিশ। কিন্তু যেমন-তেমন একটা সমাধান চাপিয়ে মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার ঠিক আগে, শ্বেতাঙ্গ সমাজের টানাপোড়েনের অর্থ বুঝে বিচ্ছিন্ন সূত্রগুলো জুড়ে ফেললেন উমেশনাথ। আর তারপর... ৪) উল্কা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক পরের ঘটনা। এক ধনী পরিবারে পরপর দুটি রহস্যজনক মৃত্যু হওয়ায় পরিবারের কর্তা ব্যক্তিগতভাবেই উমেশনাথের সাহায্যপ্রার্থী হলেন। এদিকে তার ঠিক আগেই উল্কাপাতে মৃত্যু হল এক ব্যবসায়ীর। আপাতভাবে বিচ্ছিন্ন দুটি ঘটনা, আর তারই সঙ্গে কলকাতায় দেখা যাওয়া কিছু পরিবর্তন উমেশনাথকে বোঝাল, এদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে। তাঁর অনুসন্ধান কি এবারও রহস্যের কুয়াশা ভেদ করে সত্যিকে আমাদের সামনে তুলে ধরতে পারল? অসাধারণ রিসার্চ, বাস্তবানুগ চরিত্র নির্মাণ ও সংলাপ, সর্বোপরি রহস্যের অনন্যতায় এই বইয়ের প্রথম তিনটি গল্পই মুগ্ধ করেছিল। চতুর্থ কাহিনিটি পড়ে, কিছুমাত্র অতিশয়োক্তি না করেই বলি, স্বর্গত শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার কথা মনে পড়ে গেল। ঠিক সেইরকম শুষ্ক অথচ ব্যঞ্জনাময় ভঙ্গিতে এক জটিল রহস্য আর তার ধারক-বাহকদের ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। সেখানে সমকালীন সমাজের ঘাত-প্রতিঘাত আর ব্যক্তির ছোটো প্রাণ-ছোটো কথা একইরকম গুরুত্ব পেয়েছে রহস্যের ধরনটি বুঝতে ও বোঝাতে। এইভাবে "ইনার শরদিন্দু"-কে চ্যানেলাইজ করার শখ হয়তো অনেকেরই থাকে; কিন্তু গবেষণা ও লেখনীর মেলবন্ধন ঘটিতে তাঁদের অধিকাংশই সেই জায়গাটায় পৌঁছোতে পারে না। এই বইয়ের লেখক তা পেরেছেন। তাঁকে সেলাম। বইটির মুদ্রণ, অলংকরণ, বর্ণ-সংস্থাপন শুদ্ধ এবং নয়নসুখকর। রহস্য গল্পের অনুরাগী হলে, বিশেষত প্রোসিডিওরাল এবং বাস্তবানুগ রহস্য পড়তে ভালোবাসলে এই বইটিকে কোনোমতেই উপেক্ষা করবেন না।
ছড়িয়ে থাকার জন্য এবং গল্পগুলোকে পড়তে গেলে প্রচুর স্ট্রাগল ছিল বলে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির জনপ্রিয়তা যতটা থাকা উচিত ততটা এখনও নেই। এবার বাড়বে কারন বই হয়েছে। পাঠক সহজেই পাবেন।
বর্তমান সময়ে পিরিয়ডিক গোয়েন্দা বইগুলোতে মূলত যেটা অফার করা হয়, সেটা হলো এখনকার তদন্ত পদ্ধতির সুযোগ সুবিধা বাদ দিয়ে কি করে ক্রাইম সলভ করা যায়। এর থেকে বেশি কিছু আমি অন্তত পাইনি। এই সিরিজ, এটা ছাড়াও আর দুটো জিনিস অফার করছে। এক, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা। বইয়ের নামটা লক্ষ্য করুন। উল্কা, অর্থাৎ সিস্টেম থেকে ছিটকে গেছে কেউ। বছর তিনেক আগে যখন প্রথম দুটো গল্প পড়েছিলাম তখনই মনে হয়েছিল উমেশের মধ্যে ডিসকমফোর্ট আছে। আর এখন থেকে আসছে দ্বিতীয় জিনিস। অর্থাৎ, দুই, চরিত্রের ইনার কনফ্লিক্ট। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমলাদের মধ্যে যেটা থাকে। এজন্য রিলিফ পয়েন্ট হিসেবে বহু খ্যাতনামা সাহিত্যিক আমরা দেখতে পাই যারা আমলা ছিলেন। যেমন বঙ্কিমচন্দ্র। এক্ষেত্রে বিষয়টা বোঝা সহজ। কারন উমেশ এর এমপ্লয়ার ইংরেজ। গল্পের নাম গুলোর মধ্যেও ডিস্কমফোর্ট রয়েছে। সুতরাং ত্রিমুখী প্লট পয়েন্ট।
মৃত্যু বিসর্পিল অনওয়ার্ড লেখিকার নতুন ভার্সন আমরা দেখছি। গদ্যের দিকে আলাদা নজর দেওয়া হচ্ছে। লেখাগুলো সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু গদ্য হিসেবে দুর্দান্ত।