একটা সময়ে ঝাড়খণ্ডের দেবীপুরের তালুকদার পরিবারের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। কয়েক যুগ ধরে এই পরিবার ওই এলাকায় জমিদারি করে এসেছে। সেখানকার সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় ট্রাইবালদের ওপরে অত্যাচারও চালিয়ে এসেছে নির্বিচারে। যদিও তালুকদারদের সেই দাপট এখন আর নেই। বাড়ির বড় ছেলে অমিত তালুকদারের একমাত্র সন্তান আচমকাই একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। খবর যায় লোকাল থানায়। তদন্তে নামে দেবীপুর থানার পুলিশ। এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই তালুকদার বাড়িতে আবারও বড়সড় একটা বিপর্যয় নেমে আসে। খুন হয়ে যান বাড়ির কোনও এক সদস্য। এদিকে সম্পত্তি, টাকাপয়সা নিয়ে বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে শুরু হয় বিবাদ। তারপর কী হল? অমিতবাবুর সন্তান কি বাড়িতে ফিরে এসেছিল? খুনের তদন্তে নেমে পুলিশ কী জানতে পেরেছিল? এই ঘটনাগুলো কি আলাদা, নাকি একটা অন্যটার সাথে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত? কিছুটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই এসবের মধ্যে জড়িয়ে যায় বিবেক সিংহ। কিন্তু কীভাবে? ধীরে ধীরে ঘনিভুত হয় রহস্য। তদন্তে উঠে আসে একের পর এক চমকে দেওয়া তথ্যপ্রমাণ। শেষ পর্যন্ত বিবেক কি পারবে ষড়যন্ত্রের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে আসল অপরাধীকে গ্রেফতার করাতে? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে নেমে এই উপন্যাস পাঠককে টেনে নিয়ে যাবে শিহরণ জাগানো থ্রিলারের রোলার কোস্টার রাইডে।
পুলিশী থ্রিলার জঁরার মধ্যে 'দীপচক্র' একজন প্রসিদ্ধ লেখক। কীভাবে একটি কাহিনী সত্যিকারের পুলিশ প্রসিডিউরের কাছাকাছি রেখে লেখা সম্ভব তা বেশ ভালোভাবেই জানেন নিজে পেশাগতভাবে জড়িয়ে থাকার দরুন। 'দ্য ডার্ক সিক্রেট' - এও তার অন্যথা হয়নি। লেখার গতি যথেষ্ট সাবলীল এবং গতিশীল। কোথাও মনে হয়নি গল্পের গতি স্লো হয়ে গেছে। একদম মেদহীন কাহিনী।কোনো এক্সট্রা সাবপ্লট নেই। লেখক ভিক্টিমের 'পিওভি' (point of view) খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন। যে ঘৃণ্যতম অপরাধ মালহারকে মানসিকভাবে দুর্বল করেছিল, যার আঘাতে সে অত্যন্ত মর্মাহত ছিল তা যথাযথ। আমাদের চারপাশে এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটে থাকে কিন্তু স্বীকার করার সাহস কেউ পায় না। দ্বীপচক্রকে কুর্নিশ, এমন অন্ধকার একটি দিক তুলে ধরার জন্য। ক্রিয়েটিভ লিবার্টি নিয়ে লেখক বিবেককে পুলিশ নয় এবারে কিছুটা সত্য অনুসন্ধানী রূপে প্রতীষ্ঠা করেছেন। যতটা তদন্তের থেকে মানসিক দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছেন তা প্রসংশনীয়। পাঠক মালহারকে ফিল করতে পারবেন, তার দুঃখে দুঃখী হবেন। এজন্যই এই বইটি অন্যান্য থ্রিলারের থেকে কিছুটা আলাদা।
তবে বইটিতে পাঠক অ্যাকশন তেমন নেই। তাই অনেকের কাছেই এটি একমাত্রিক লাগতে পারে। আসলে বাস্তবে এত অ্যাকশন সচারচর হয় না তাই কিছু পাঠক হতাশ হতেই পারেন। আর আমার ব্যক্তিগত মতে বিবেক এবং দেবীপুরের পুলিশকর্তার আরেকটু "সাপে-নেউলে" নেচারটা এক্সপ্লোর করা যেত। তবে লেখকের কলমের গুনে গল্পটি উপাদেয় হয়েছে। রহস্যের থেকে এখানে মনের অন্ধকার জানালাকে উন্মুক্ত করা হয়েছে, তাই মাঝে মাঝে মনে হতে পারে এটি কোনো সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। তবে এ অনুভূতি শিহরণের, উত্তেজনার।