ইনস্পেক্টর অভিরাজ সেনের তদন্ত করার পদ্ধতি আর পাঁচজন পুলিশ অফিসারের থেকে অনেকটাই আলাদা। রহস্যের গভীরে পৌঁছে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখা ওঁর অনেকদিনের স্বভাব। ভরসা রাখেন নিজের কর্মক্ষমতা এবং সহকারী পুলিশ অফিসারদের উপরে। নিজেকে একজন লিডার হিসেবে দেখতেই বেশি পছন্দ করেন। সবসময় টিম হিসেবে কাজ করেন। প্রতিটি কেসের কার্যকারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একদিকে তিনি যেমন সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নিখুঁত জেরা করেন ঠিক তেমনই অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সুবিধাটুকু নিয়ে ক্রাইমের সাথে ক্রিমিনালের যোগসূত্র নির্মাণ করেন। তাঁরই তৈরি করা পথে কলকাতার বুকে ঘটে যাওয়া একের পর এক মার্ডার কেস সল্ভ হয়ে যায় নির্দ্বিধায়। প্রতিটি কেসের প্লট, মোটিভ, ক্রাইম করার পদ্ধতি ভিন্ন। আর তাই, পুলিশি অনুসন্ধান প্রক্রিয়াও পৃথক। শুধুমাত্র রহস্য উদ্ঘাটনের বর্ণনা নয়, বিগত তিন বছরে কলকাতা শহরের বুকে ঘটে যাওয়া এবং সংবাদপত্রে স্থান করে নেওয়া ঘটনাগুলোকেই স্থান, কাল, পাত্র ভেদে কিছুটা পরিবর্তন করে এই বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে। এই বইয়ের চারটি উপন্যাসিকার মধ্যেই মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার আর সেই অন্ধকারে মিশে থাকা অপরাধ বোধের প্রবৃত্তি গুলোকেই তুলে ধরা হয়েছে। ক্রাইমের পিছনে যে মনস্তাত্ত্বিক ওঠাপড়া জুড়ে থেকে সেটাকেই ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এই বইতে।
Shadows over kolkata Review অভিরাজ সিরিজ একলব্য প্রকাশন কর্তৃক প্রকাশিত দ্বীপচক্র স্যার লেখক
একটি ভালোবাসার গল্প হলো মানব মনস্তত্ত্বের একটি বিস্তারিত অধ্যয়ন।
The hunt এটি একটি রাস্তার শিশুকে অপহরণ করার গল্প যা সমাধান করা দেখতে বেশ সহজ কিন্তু চরিত্রগত অধ্যয়ন যে একজন মানুষ প্রতিশোধ নিতে কতদূর যেতে পারে যা অন্যদেরও ক্ষতি করতে পারে।
The last frame আমাদের সমাজের নৈতিকতাকে বলে যে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা রয়েছে।
Phaand শেষ গল্পটি মানুষ কীভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং এটি তাদের জীবন এবং অন্যদের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে তার একটি আত্মদর্শন। চমৎকার পুলিশ গল্প এবং উজ্জ্বলভাবে লিখিত বিশদ তদন্ত, কোনও শীর্ষ সমাধানের সঠিক তত্ত্ব দেওয়া হয়নি এবং আমাদের নায়ক অভিরাজ মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। 4.5/5
🔸 সম্প্রতি করে শেষ করেছি, লেখক দ্বীপচক্রের অতি জনপ্রিয় সিরিজ অভিরাজ সিরিজের তৃতীয় বই ❝শ্যাডোজ ওভার কলকাতা❞। চলুন এবার বইটির আলোচনায় আসা যাক। 🔍 বইটিতে মোট মিলিয়ে চারটে কাহিনী রয়েছে। ১.একটি ভালোবাসার গল্প ২.দ্য লাস্ট ফ্রেম ৩.দ্য হান্ট ৪.ফাঁদ
🎭 একটি ভালোবাসার গল্প:- ৩০ নম্বর নেতাজি নগর রোডের বাসিন্দা অন্তিম পাল তদন্ত করতে আসা অফিসার উৎসর্গ ঘোষের উদ্দেশ্যে বলেন যে তার বাড়ির ভাড়াটিয়ে সুপর্ণা দাস বেডরুমে জ্বলন্ত অবস্থায় পড়ে আছেন, গ্রাউন্ড ফ্লোরের দরজাটাও হাট করে খোলা এবং নিচের বড় লোহার গেটটাও খোলা। পাশের বাড়ির নমিতা সান্যাল নাকি এই ঘটনাটি দেখেই চিৎকার করে ওঠেন। শুরুতে এটিকে "কেস অফ পোস্টমর্টেম বার্ন" হিসেবে তুলে ধরা হলেও, ঘটনাস্থলে আবির্ভাব ঘটে দুঁদে অফিসার অভিরাজ সেনের। ময়নাতদন্তে অনেক কিছু উঠে আসে। শুধুমাত্র এখানেই ঘটনাটি থেমে থাকে না আস্তে আস্তে যেন উত্তেজনার পারদ যেন বাড়তে থাকে, সেখানে সুপর্ণা স্বামী রমেশ দাস, সুপর্ণার মা গীতা দেবী এবং তার দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান সত্যম, রত্নাবলী বটব্যাল, আকাশ সামন্ত, বিপ্লবেন্দু ধর অনেক চরিত্র উঠে আসেন। শেষমেষ কি এই কেসের সমাধান হয়? এটা কি ক্লিয়ার ন্যাচারাল ডেথ? নাকি এ ক্লিন কেস অফ মার্ডার?
সত্যি কথা বলতে গল্পটা প্রচন্ড টানটান এবং যথেষ্ট "ডোপামিন" খরচ করে পড়ার সময়। গল্পের মধ্যে এত চরিত্র, প্রথমদিকে হয়তো কিছুটা মাথার উপর দিয়ে যেতে পারে, কিন্তু যত সময় পেরোতে থাকে ধীরে ধীরে প্রত্যেকটা চরিত্রের অভিপ্রায় ( Motive ) এবং চাটুকারিতা (Assentation) ধরতে পারা যায়, এবং সবথেকে প্রশংসার গ্রেটার করতেই হয়, প্রত্যেকটা চরিত্রের কিছু না কিছু ভূমিকা রয়েছে এই গোটা ঘটনাতে! কোন চরিত্র অপব্যবহার করা হয়নি। খুব ভালো লেগেছে গল্পটি 💜।
🪟 দ্য লাস্ট ফ্রেম:-
"চ্যাটার্জি ম্যানশন" এর মালিক রাহুল চ্যাটার্জি একজন বড় মাপের বিজনেস পার্সোনালিটি। তাকে বিজনেস টাইকুনও বলা যায়। তার মত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের জুড়ি মেলা ভার। সেই চ্যাটার্জি ম্যানশনেই রাহুলের ছেলে মনোজকে মৃত অবস্থায় ঘরের বিছানায় পাওয়া যায়। শুরু হয় তদন্ত। লইয়ার বিদিত বাসু জানান যে রাহুল তার সম্পত্তি নাকি তার স্ত্রী নমিতা দেবী, প্রথম পক্ষের পুত্র বৈশম্পায়ন এবং মনোজকে সমানভাগে ভাগ করে উইল করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পরবর্তীতে সেই উইল পরিবর্তন করে মনোজকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেন, বলে জানান। ওদিকে একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির আড়ালে রাহুল চ্যাটার্জি চালাচ্ছিলেন অনৈতিক কাজ। মনোজ কেন খুন হলেন? রাহুলই বা কেন তাড়াতাড়ি এই কেসটাকে গুটিয়ে ফেলতে চাইছেন? তিনি কিছু লুকাচ্ছেন কি? প্রত্যেকটা চরিত্র যথেষ্ট সন্দেহপরায়ন!
আবার যে কথাটি প্রথমেই বলবো সেটি হচ্ছে টানটান গল্পটি, প্রচুর চরিত্র, তবে কোন ক্ষেত্রে তারা বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে না। তবে লেখকের লেখনী কতটা গবেষণা (Research) ও ক্ষেত্র সমীক্ষা (Field Work) করে লেখা তা আপনারা এই বইটা পড়লেই বুঝতে পারবেন। প্রচুর তথ্যসমৃদ্ধ এবং অনেক নতুন নতুন শব্দ জানতে পারলাম। লেখক কিন্তু সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা, গোয়েন্দা পদ্ধতি এখানে অবলম্বন করেননি। তিনি আমাদের বর্তমান "জেন জি" পাঠকদের কথা মাথায় রেখেও সেই ভাবে কাহিনীটি কে ভেবেছেন এবং ক্লাইম্যাক্স অবধি টেনে নিয়ে গিয়েছেন। লেখক এখানে যেভাবে "মেইন অ্যাকিউসড" এর বয়ানে ওয়েব সিরিজ দেখে প্ল্যান করা মার্ডারের প্রসঙ্গ এনেছেন, সেটাও কিন্তু বর্তমান ভার্চুয়াল মিডিয়ার কথা মাথায় রেখেই লেখক লিখেছেন। দারুন লিখেছেন ✨।
🎯 দ্য হান্ট:- ৭০ বছর বয়সী সাগরিকা লাহা খিদিরপুর থেকে ময়দান থানায় ছুটে আসেন। তার অভিযোগ তিনি রাস্তার পাশে ব্রিজের নিচেই কোনরকমে আস্তানা গেঁড়ে থাকেন। তার সঙ্গে তার দুটো বাচ্চা রাতুল এবং রিঙ্কু থাকে। তাদের সাথে সাগরিকা দেবীর রক্তের কোন সম্পর্ক না থাকলেও তিনিই ছোটবেলা থেকে তাদেরকে কোলেপিঠে মানুষ করেছেন। প্রতিদিন রাতে এগারোটা বারোটা নাগাদ রোজের মতোই তারা তিনজনেই রাস্তার ধারে শুয়ে পড়েন। রাত তিনটা নাগাদ যখন তার আচমকা ঘুম ভাঙে, পাশ ফিরে তিনি রিঙ্কুকে দেখতে পান না। আশেপাশে খুঁজেও তিনি রিঙ্কুর হদিস পাননি, তাকে খুঁজে দেবার জন্যই তিনি থানায় ছুটে এসেছেন। অভিযোগ জানানো মাত্র বিভিন্ন থানার মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এবং পুলিশি তদন্ত করে জানতে পারা যায়, ড্রেনের মধ্যে একটা বাচ্চার ডেড বডি পড়ে রয়েছে, এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, তার শরীরে সেক্সুয়াল অ্যাসল্টের চিহ্ন দেখা গেছে। কে বা কারা শারীরিক নির্যাতন খুন করলো তিন বছরের বাচ্চা রিঙ্কুকে? অভিরাজ সেন কি পারবেন তদন্তের সুরাহা করতে?
মানুষ যে কতটা নির্মম হতে পারে তার নিদর্শন আমরা রোজই সমাজমাধ্যম, দৈনন্দিন সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারি। সেরকমই আরো একটি ঘটনার বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে লেখক দ্বীপচক্র এই সুন্দর কিন্তু ভয়ানক একটি কাহিনী ব্যক্ত করেছেন। আরো একটা বিষয়ে যেটা এখানে খুব প্রবলভাবে বলতেই হয়, লেখক এখানে প্রত্যেকটা ঘটনার সময়, জোন, এরিয়ার বিবরণ শুরুতেই লিখেছেন, তারপর প্রত্যেকটি টুকরো টুকরো কাহিনীর সূত্রপাত ঘটছে। লেখক প্রত্যেকটা পুলিশ কাস্টডির বিবরণ এত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখিয়েছেন যেটা একমাত্র ফিল্ড ওয়ার্ক দ্বারাই সম্ভব। তবে এই গল্পটা বাকি তিনটি গল্পের থেকে কিন্তু আলাদা। কারণ এক্ষেত্রে প্লট অনেকটাই বেশি সিরিয়াস। কাজেই এখানে, এই গল্পটি পড়ে "খুব আনন্দিত" হয়েছি এমন বলতে পারব না, কারণ তিনি এরকম একটি সিরিয়াস বিষয়কে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, সে ক্ষেত্রে লেখক কে একটা স্যালুট জানাতেই হয় ✨।
🪤 ফাঁদ:- বিবেকানন্দ পার্কের একটি বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে চার জন মেয়ে ভাড়া থাকতেন। বাড়ির মালকিন বিমলা দেবী। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে গ্রাউন্ড করে নেবে বিমলা দেবী দেখলেন রুমের দরজা হাট করে খোলা এবং চৌকির উপর ওই চারজন তরুণীর মৃতদেহ পড়ে রয়েছে, রক্তে চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। অভিরাজ সেন, সত্যেন মোহান্তী, নীলাভ বটব্যাল সকলে কেসের দায়িত্ব নিয়ে এগোতে থাকেন। হাতের মধ্যে সেরকম ভাবে কোন বিগ ডিল আসে না। ওদিকে উপর মহল থেকে যথেষ্ট চাপ প্রদান করা হয় কেসটাকে খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলার জন্য। এদিকে উঠে আসে বৈধ-অবৈধ অনেকগুলো সম্পর্কের আভাস। কে কাকে ইন্ধন যোগাচ্ছিলো এসব করতে? নিজেদের শরীরে নাকি ড্রাগসও পাওয়া গেছে! এদিকে উপযুক্ত অ্যালিবাই হাতে আসছে না। অভিরাজ কি এবারের মতো সফল হবেন? এই গল্পটির মতন থ্রিল, এর আগে কোনদিন এরকম "পুলিশ কেস স্টাডি থ্রিলারে" পাইনি। আর গল্পটা এতটাই প্যাঁচালো, ঘোরালো, শুরু থেকে পড়তে শুরু করলে একদম শেষ পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাসে পড়ে যেতে হবে, না হলে কিন্তু বুঝতে একটু চাপ হলেও হতে পারে। কারণ, এর মধ্যে বেশ কিছু চিকিৎসা পরিভাষা ( Medical Terminology) এবং অপরাধবিজ্ঞান ( Criminology ) নিয়ে ভরপুর তথ্য দেওয়া রয়েছে, যা একদিক থেকে মাথার সমস্ত বন্ধ হয়ে থাকা অসচল নার্ভগুলোকে জাগিয়ে তুলেছিল। সেরা ছিল এই গল্পটি 💜✨।
🔹 যা কিছু ব্যক্তিগত/মূল্যায়ণ:-
১.শুধুমাত্র বিদেশি ছবি, বই পড়ে ঘরে বসে এমন একটি বিষয়কে ঘিরে সাহিত্য রচনা করা, যথেষ্ট চাপের। সেখানে দাঁড়িয়ে বাংলা সাহিত্যে দ্বীপচক্র স্যার "পুলিশ কেস স্টাডি থ্রিলার" ধারাকে (Genre)একাকীই স্তম্ভের মতো ঘাড়ে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। যেটা সত্যি প্রশংসাতীত। আরো লিখতে থাকুন এমন লেখা 😊।
২.প্রত্যেকটা থ্রিলার পড়ার ক্ষেত্রে আমার মনে বারবার সংশয় দেখা দেয় যে থ্রিলারটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক দাঁড়াচ্ছে কিনা, যদি শেষ পর্যন্ত সাসপেন্স অংশটুকু লেখক জিইয়ে রাখতে পারেন, তবেই সেই থ্রিলার লেখাটা সার্থক বলে আমি মনে করি। দ্বীপচক্র স্যার এই ধারাতে সফলতর, সেটা বারবার তা লেখনি দিয়ে প্রমাণ করেছেন।
৩.এই সেনসিটিভ বিষয়গুলোকে ঠিকঠাক ভাবে সংগ্রহ(Extract)করে নিষ্পন্ন(Execute) করতেও সাধনা দরকার। শুধুমাত্র ভাষার মারপ্যাঁচ দিয়েই তো আর থ্রিলার হয়না, সেক্ষেত্রে কেসের মূল বিবরণ, ভিক্টিম সাজানো, অ্যালিবাই বের করা, যে থানার নামগুলো এখানে লেখক দেখাচ্ছেন সেগুলো নখদর্পণে রাখা এবং কিছুটা কল্পনার খাদ নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা কে পাঠকের সামনে উজাড় করে দেওয়া, সবটাই দরকার এমন থ্রিলার রচনা করার ক্ষেত্রে, যেটা আমি এই বইয়ের মধ্যে ভরপুর পেয়েছি।
৪.চারটি গল্প। চারটি, চারটির জায়গায় অনবদ্য। কোন গল্পকে পেছনে রাখা যাচ্ছে না। আর লেখক শুরু থেকেই প্লট তৈরি করে একদম শেষ পর্যন্ত যতটা দরকার ততটাই লেখাকে টেনেছেন, এবং একটা সামঞ্জস্য রক্ষা করেছেন। প্রত্যেকটা গল্প এখানে ৫০+ পাতার এবং রয়েছে যথাযথ থ্রিল। কাজেই, ল্যাদ লাগলেও পরক্ষণেই পাঠক গল্পগুলো পড়তে পড়তে শিহরিত হবেন।
৫.Last But Not At My Vocabulary , আমি বারবার বলি একটা বই পাঠক যখন পড়ছেন তখন তার প্রথম উদ্দেশ্য থাকবে, তাকে ওই উল্লিখিত লেখাটা কতটা ভাবাচ্ছে এবং সে কতটা শিখতে পারছে সেই লেখা থেকে। লেখক দ্বীপচক্র এখানে এমন কিছু শব্দ এবং পরিভাষা ব্যবহার করেছেন যেগুলো সত্যি কথা বলতে আমার কাছে ছিল নতুন,আমাকে সেগুলি অনেক ভাবিয়েছে এবং আমি অনেক নতুন কিছু জানতে, শিখতে পেরেছি। এছাড়াও যেটা বলার, কোন গল্পকেই যেন জোর করে শেষ করে দেওয়া হয়নি, অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় বাড়তি ঝুঁকি নিতে অনেক লেখক বিব্রত বোধ করেন, সে ক্ষেত্রে কোনো রকম করে গল্পের ইতি টেনে দেন, "শ্যাডোজ ওভার কলকাতা" র ক্ষেত্রে এটা হয় না।
🔸 অপেক্ষায় থাকবো সিরিজের পরবর্তী নিবেদনের জন্য।পাঠ সুখকর হলো।
না আমি কোনও পাঠ প্রতিক্রিয়া দেওয়ার উপযুক্ত বলে নিজেকে মনে করিনা।তার দুটো কারণ আছে। ১) পাঠ প্রতিক্রিয়া দিতে গেলে মনে করি নিজেরও সাহিত্য গুণ থাকাটা বাঞ্ছনীয়। যেটা আমার ক্ষেত্রে তেমন আছে বলে আমি অন্ততঃ মনে করিনা। ২) গল্প পড়ার গতিতে এবং তাতে নিমজ্জিত থাকার কারণে কী কী উল্লেখ করার আছে, ভালো বা মন্দ দিক,তা খাতায় হোক বা মনের কোঠায় হোক, টুকে রাখতে আমি অপারগ। বই সংক্রান্ত আলোচনা করতে গেলে আমি মনে করি সেটা আরও কয়েকবার পড়া অবশ্যই উচিত। যাইহোক,লেখক দ্বীপচক্রের অনুরোধে আমি তাই বইটি সম্পর্কে কটা কথা লিখছি যেটা অন্য পাঠকদের কিছুটা আকর্ষণ করতে পারে। প্রথমেই বলি, বইটি আমি একবারই পড়েছি।তাই বিশেষ বিশ্লেষণ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এটুকু বলি, এক কথায় বইটি পড়ে আমি যারপরনাই আনন্দিত হয়েছি এবং প্রতিটি গল্প উপভোগ করেছি। হ্যা বইটি চারটি রহস্য গল্পের সমাহার।লেখকের মতানুসারে,প্রতিটি গল্পের পটভূমি কলকাতার মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের চারটি থানা এলাকার অন্তর্গত,যথা- নেতাজী নগর,পাটুলি, ময়দান এবং রিজেন্ট পার্ক। প্রথম গল্প - একটি ভালোবাসার গল্প। হুম ভালোবাসাই বটে।এ কেমনতরো ভালোবাসা যা একটি নব্যগৃহবধূর অকালমৃত্যু ডেকে আনে? আসলে ভালোবাসার আড়ালে থাকে আরও অনেক কিছু।যা জটিল করে তোলে বিভিন্ন সম্পর্ককে।তারই ফলে গৃহবধূকে পাওয়া যায় তারই ঘরের বিছানায় জ্বলন্ত অবস্থায়। দিনেরবেলায় কিভাবে সকলের চোখের সামনে এমন একটা অবিশ্বাস্য হত্যা কী করে সম্ভব, জানতে হলে পড়তে হবে। দ্বিতীয় গল্প - দ্যা লাস্ট ফ্রেম এখানে আর একটি অদ্ভুত মার্ডার কেস।নিজের ঘরে রাতের বেলা, বাড়িতে উপস্থিত বাবা, মা, ভাই, কাজের লোক, কেয়ারটেকার দ্বারা পরিবেষ্টিত, তারই মাঝে খুন। কী দিয়ে খুন তাও চোখের সামনে রাখা। বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে।তাও বড় জটিল এ কেস। না পড়লে এ রহস্য কিভাবে সমাধান করা গেল, না-জানাই থেকে যাবে। তৃতীয় গল্প - দ্য হান্ট এটি আমাদের এই সমাজের এক কলুষিত অধ্যায়ের ছবি।যেখানে একটি ছোট্ট শিশুকে শারীরিক অত্যাচার করে ময়দানের পাশে এক নয়ানজুলিতে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়।পাশবিক কামনা বাসনার এক জ্বলন্ত নিদর্শন।পথশিশুরাও যে এই পাশবতার হাত থেকে নিস্তার পায় না।কিভাবে রাতের অন্ধকারে এমন ঘটনা ঘটলো তা পড়তে পড়তে উৎকন্ঠিত হয়ে উঠতে হয়। শেষ এবং চতুর্থ গল্প - ফাঁদ আধুনিকতা আর তার সাথে স্বাধীনচেতা যুব সমাজের একটা অন্ধকার দিক হলো নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও তার সাথে মদ,লালসা এবং নেশা। এর জটিল মিশ্রণ কিভাবে একই ঘরে বসবাসকারী চার চারটি কলেজের মেয়ের জীবন নিয়ে নিল তারই নথি। সমাজের বিভিন্ন তলায় বসবাস করলেও ক্রাইম সর্ব জায়গায় বিরাজ করে।চারটি ঘটনা চার রকম পরিবেশে ঘটলেও একটা জিনিস পরিষ্কার যে মানব মন বিচিত্র পথে সঞ্চরণ করে।আর যুগে যুগে মানুষের উন্নত বুদ্ধি ষড় রিপু দ্বারা অনেকাংশেই চালিত হয়। গল্পের মুখ্য চরিত্র অভিরাজ সেন, লালবাজারের গোয়েন্দা দফতরের অফিসার।দীর্ঘ কুড়ি বছরের অভিজ্ঞতায় পুষ্ট তিনি, পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতন রহস্যের জালকে ছাড়িয়ে প্রকৃত দোষীকে আইনের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। লেখকের গুণ এখানেই যে, প্রতিটি গল্প বাস্তবধর্মী, পুলিশ ডায়রীর পাতা থেকে যেন নেওয়া হয়েছে।এছাড়া সব থেকে আকর্ষণীয় তদন্ত পদ্ধতি।যার মধ্যে কোনও অবাস্তবতা নেই।উপর মহলের চাপ, রাজনৈতিক প্রেশার ও তদুপরি প্রেসের নাগপাশের মধ্যে থেকে দ্রুততার সাথে সফলতা অর্জন করা। ক্ষুরধার বুদ্ধির প্রয়োগে, আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পর্যায়ক্রমিক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সুচারুভাবে সকল রহস্যের সমাধান প্রকৃতই লেখককে বিশিষ্ট করে তুলেছে। আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই গল্পগুলির সেটা অভিরাজ সেন। সে যেন কোনও গল্পের গোয়েন্দা নয়।বাস্তবের গোয়েন্দা পুলিশ।তার একটা তদন্তকারী টিম থাকে।পুলিশি তদন্তে যেমন প্রতিটি সেল পরষ্পরকে সহায়তা করে তেমনটি এখানে দেখা যায়। একাই একজন সত্যানুসন্ধানী হয়ে সহকারীকে নিয়ে প্রবলেম সল্ভ করে দিচ্ছেন তা নয়।এটা যে একটা সম্পুর্ন দলগত কাজ, সেটা প্রতিটি পদক্ষেপে লেখক অভিরাজ সেনকে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।এটাই লেখকেরও সিগনেচার স্টাইল। দু একটা জায়গায় প্রিন্টিং ত্রুটি ছাড়া বাকি অসাধারণ। একটা মিস্টেক বলি।একটি তদন্ত ক্ষেত্রে ৮ এবং ৯ নম্বর প্ল্যাটফর্ম যেমন হাওড়া ওল্ড কম্প্লেক্স বলা হয়েছে।সেখানেই ১৮ নম্বর টাও ভুলক্রমে ওল্ড কম্প্লেক্স লেখা হয়েছে।এটা আমি লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বললাম।পাঠকদের এতে কেনও অসুবিধা হবে না। লেখক আমার অত্যন্ত প্রিয়।ওনার আগের দুটো অভিরাজ সিরিজের বই ও বিবেক সিরিজের বই পড়েছি।প্রতিটিই বেশ মন জয় করে নিয়েছে। আশাকরি এ লেখা পড়ে যদি কেউ বইগুলি পাঠ করেন তাঁরা আমাকে কোনও দোষারোপ করতে পারবেন না এ বিশ্বাস আছে।🙏🙏
আমার থ্রিলার পড়তে দারুন লাগে, তাই এই বছরে শুরুটা আমি করেছি এক নতুন থ্রিলার বইকে নিয়ে। এই বইটির মূল চরিত্র হোমোসাইট এক অফিসার অভিরাজ, তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির দ্বারা সল্ভ করা চারটি কেস হিস্ট্রি কে নিয়ে লেখা এই বইটি,
⏩একটি ভালবাসার গল্প
৩০ নম্বর নেতাজি নগর রোডের এক দোতলা বাড়ি সেখানে ভাড়া থাকেন রমেশ দাস ও তার স্ত্রী সুপর্ণা। একদিন হঠাৎ দুপুর বেলা নিজের ঘরেই স্বামীর সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে আগুন লেগে মৃত্যু হয় সুপর্ণার। স্বাভাবিকভাবেই যে ডিউটি অফিসার তাকে সাহায্য করার জন্য দাগ পড়ে অভিরাজের। এবং জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতে রমেশ দাসের পরকীয়া, ও সুপর্ণার মায়ের নতুন সম্পর্ক উঠে আসা। কে করেছে সুপর্ণাকে খুন, তার পরম আপনজন নাকি আরো কোন ঘটনা আছে এই হত্যার পেছনে??
⏩দ্য লাস্ট ফ্রেম
কলকাতার এক বিজনেস টাইকুনের ছেলের মৃত্যুতে গোটা পুলিশ ডিপার্টমেন্ট কেঁপে ওঠে, মৃতের শরীরে কোন ক্ষয়ক্ষতি না হওয়ার জন্য সেটাকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে ধরে নেওয়া হলেও অভিরাজ গিয়ে আবিষ্কার করেন এটি খুন। বড়লোকের বিগড়ে দেওয়া সন্তান, উশৃংখল জীবন যাপন, পারিবারিক ব্যবসা ও দায়িত্ববোধের জন্য বাবার সাথে ঝামেলা লেগেই থাকতো, এবং কিছুদিন আগে তার এক প্রেম ভেঙে যায় এইসবের জন্যই বলা হয় সে নাকি খুবই ডিপ্রেসড ছিল কিন্তু অভিরাজ সে তদন্ত করতে থাকে এবং খুঁড়তে খুঁড়তে বেরিয়ে পড়ে অনেক সত্য বিজনেসের আড়ালে কিছু কালোবাজারি যেটার জন্য ছেলে তার বাবাকে ব্ল্যাকমেল করত অন্যদিকে এক সৎ ছেলে যে বিলাসবহুলজীবন পেলেও সমাজের সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি, সবার চোখের সামনে ভাইকে ভালবাসলেও এক চোরা প্রতিহিংসা কাজ করতে দুই ভাইয়ের মধ্যে। কে খুন করল? এর মধ্যেও কি কোন রহস্য লুকিয়ে আছে? নাকি চূড়ান্ত উশৃংখল জীবন যাপন ছেলেটির মৃত্যুর জন্য দায়ী?
📕মতামত:- ∆যেগুলো সবচেয়ে ভালো লেগেছে বা পজিটিভ দিক- 1. মেদহীন কাহিনী- বাস্তবের ব্যোমকেশ বা ফেলু মিত্তিররা আর্মচেয়ারে বসে কেস সলভ করে না। দিনের পর দিন অপেক্ষা করে এভিডেন্স জোগাড় করে তবেই মেলে উত্তর। তাই সব ঘটনা লিপিবদ্ধ করতে গেলে আস্ত মহাভারত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এখানেই লেখক বাজিমাত করেছেন। অপ্রয়োজনীয় অংশ কাট-ছাট করে মেদহীন গল্পের কাঠামো খাড়া করেছেন। তাই গল্প পড়তে গিয়ে কখনই বোরিং ফিল হয়নি। প্রতিটি কেস জটিল তবে লেখকের কলমের জোরে তা যথেষ্ট উপাদেয় হয়েছে।
2. গতিশীল ঘটনা- লেখক নিজে পুলিশ তদন্তবিভাগে জড়িত থাকার কারণে প্রপার পুলিশ ইনভেস্টিগেশন সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। এতে গল্পের গতি এক মুহুর্তের জন্যও স্লো হয়নি। মনে হবে নিজেও যেন পুলিশের সঙ্গে তদন্তে জড়িয়ে গেছি। তবে যেহেতু সত্য ঘটনার তদন্ত তাই এতে সিগারেট থেকে উচ্চতা মাপের বিষয় নেই, নেই "দু হাতে বন্দুক, আরেক হাতে কুঠার" নিয়ে টানটান অ্যাকশন। তাই হয়ত অনেকের কাছেই এটি 'ফ্ল্যাটট্রাক স্টোরি' মনে হতে পারে, তবে পুলিশি তদন্ত এমনই হওয়া উচিত।
3. সত্য ঘটনার চমৎকার সংমিশ্রণ- সেই কবে মার্ক টোয়েইন, বাইরনরা বলে গেছেন, "Truth is stranger than fiction"; এখানে বর্ণিত চারটি ঘটনা বাস্তব কেসের সাথে কয়েকটি জিনিস অদলবদল করে সুন্দর ব্যাঞ্জন রান্না করেছেন দ্বীপচক্র। হয়তো পাঠকের সুবিধার্থেই শেষদিকে 'আর্মচেয়ার ডিটেকটিভ ডিডাকশন' মেথড ব্যবহার করেছেন যাতে গোয়েন্দা কাহিনীর মতই আনন্দ পাওয়া যায়। তবে আমার ব্যক্তিগত মতে এটি আরও প্রপার পুলিশ প্রসিডিউর হতেও পারত। যদিও তাতে গল্পের ওপর তেমন প্রভাব পড়েনি।
∆নেগেটিভ দিক- 1. ছবির অভাব- কেস গুলি যেহেতু বাস্তব তাই এর সাথে কিছু ছবি যোগ করে দিলে তা অনেক বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠবে বলেই আমার বিশ্বাস। আশাকরি লেখক এ বিষয়টি খেয়াল রাখবেন।
**Not a negative- দু-তিনটে জায়গায় টাইপিং মিসটেক আছে। পরের সংস্করণে শুধরে দেবেন আশাকরি।