খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে এক অজ্ঞাতনামা গ্রিক নাবিকের লেখা দিনলিপি এ বই। যিনি গ্রিস থেকে বাংলার গাঙ্গেয় মোহনায় এসে তাঁর ভ্রমণ শেষ করেছিলেন। জানামতে এটিই পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমণপঞ্জি। দ্য পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সি নামের এই দিনলিপিটি থেকে বাংলার মসলিন রপ্তানির কথা ও উত্তর বঙ্গোপসাগরের প্রধান বন্দর গাঙ্গে নগরী সম্পর্কে জানা যায়। খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে গ্রিক জ্যোতির্বিদ টলেমির আঁকা মানচিত্রে দেখা যায় ভারতের পূর্বাঞ্চলে গঙ্গারিডই নামে একটি শক্তিশালী রাজ্য এবং তার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পেন্টাপলিস নামে একটি বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। এ দুটি তথ্য থেকে অনুমান করা হয়, পেরিপ্লাসের সেই গাঙ্গে কিংবা টলেমির পেন্টাপলিসই হলো বর্তমান চট্টগ্রাম। গ্রন্থটিতে যেসব দুর্লভ ভৌগোলিক তথ্য রয়েছে তা বিশ্ব-ইতিহাসচর্চার অমূল্য উপকরণ।
অজ্ঞাতনামা এক গ্রিক নাবিক আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিস থেকে গাঙ্গে অর্থাৎ বর্তমান বাংলায় এসে ভ্রমণ সমাপ্ত হয়েছিল। তাঁরই লিখিত দিনলিপির অনুবাদ এ বই।
বইটা পড়তে গিয়ে হুট করে যেন প্রাচীন যুগে হারিয়ে যেতে হয়। সে সময়টাতে মিসর সম্মৃদ্ধশালী এলাকা ছিল। তাই লেখক গ্রিক নাবিকের লেখায় বারংবার এ মিসরের নাম উঠে এসেছে। এ মিসরের পণ্যদ্রব্য সমগ্র পৃথিবীতে রপ্তানি করা হতো সমুদ্রপথে।
লেখক গ্রিক নাবিক গাঙ্গে অর্থাৎ বর্তমান বাংলার বেশ প্রশংসাই করেছেন। বিশেষত তিনি স্বর্ণখনির কথা তিনি লিখেছেন। এছাড়াও কালটিস নামের মুদ্রার কথা এসেছে তাঁর লেখায়।
লেখাটা পড়ার সময় কিছুটা খাপছাড়া মনে হতে পারে। তবে লেখাটি একজন নাবিকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা। অর্থাৎ আজকালকার ডায়রি লেখার মতো। তাই কিছুটা খাপছাড়া ভাব হওয়াটা স্বাভাবিক।
অনুবাদটি ব্যক্তিগতভাবে বেশ ভালোই লেগেছে। তাই অনুবাদককে ধন্যবাদ দিতে চাই।
অনুবাদকের কাছে পাঠক হিসেবে একটা আবদার। আর তা হচ্ছে লেখক চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে বেশ আগ্রহী। তাঁর লিখিত বইগুলো সবই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক। একজন নগণ্য পাঠক হিসেবে আমার চাওয়া তিনি ধীরে ধীরে পুরো বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস নিয়ে আরও গবেষণাধর্মী বই লিখবেন।
নাম না জানা এক গ্রিক নাবিক তার নৌপথে ভারত মহাসাগর ভ্রমণের দিনলিপি লিখেছিলেন আজ থেকে প্রায় দু'হাজার বছর আগে। "দ্য পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সি" নামে তাঁর সেই ভ্রমনপঞ্জি থেকে তৎকালীন বিশ্ব সমুদ্র ব্যবস্থার একটা সুন্দর চিত্র পাওয়া যায়। আবিষ্কৃত ঐতিহাসিক দলিলের মাঝে এখানেই সর্বপ্রথম গাঙ্গেয় বদ্বীপ ও চট্টগ্রামের নাম পাওয়া যায়। বাংলায় এই অনুবাদ কাজটা আরও আগে দরকার ছিল বলে মনে করি। কালের বিবর্তনে লেখকের বর্ণনার পুরো পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি, যার দরুন এই অনুবাদটা অনেকটা খাপছাড়া মনে হতে পারে। একই সাথে পাঠককে মাথায় রাখতে হবে, এ নিতান্তই একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক ধারাবিবরণী। সবকিছুর সত্যতা যেমন দাবি করা অনুচিত, সবকিছু সিরিয়াসলি নেওয়াও অনুচিত। তবে একটা মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায় তৎকালীন সময়ের, এবং এটাই এই বইয়ের অনন্য প্রাপ্তি। একই সাথে বইটা আমাদের প্রাচীন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একটা সুন্দর দলিল। যদিও সর্বস্তরের পাঠকদের কথা চিন্তা করে আরেকটু বিস্তারিত বর্ণনার ঘাটতি অনুভব করেছি, তাও অনুবাদককে ধন্যবাদ জানাই সুন্দর বইটা উপহার দেয়ার জন্যে।
নাম-বিষয়বস্তু অনেক আগ্রহোদ্দীপক, অনুবাদও ভালো। তবে ডায়েরির পৃষ্ঠা পড়ছিলাম যেন, কিছুটা একঘেয়ে লাগছিলো। আরেকটা বিষয় বিরক্তিকর, টীকাসমূহ পৃষ্ঠা উলটে শেষদিকের পৃষ্ঠায় পড়তে হয়; আমার পরামর্শ পরবর্তী সংস্করণে প্রতি পৃষ্ঠার নিচে অথবা প্যারা শেষে বন্ধনীর ভেতর টীকা থাকলে পড়া আরো সহজ হবে।