১৯০৩ সালের ১৭ জুলাই চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়ায় জন্মগ্রহণ করা আবুল ফজল বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং রাষ্ট্রপতির শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি মূলত একজন চিন্তাশীল ও সমাজমনস্ক প্রবন্ধকার। তার প্রবন্ধে সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র সম্পর্কে গভীর ও স্বচ্ছ দৃষ্টিসম্পন্ন মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়।
সাহিত্য চর্চায় অসাধারণ অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশের “সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার” হিসাবে পরিচিত “স্বাধীনতা পুরস্কার” প্রদান করা হয় তাকে।এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬২), প্রেসিডেন্ট সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৩), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬০), নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৮০), মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আব্দুল হাই সাহিত্য পদক (১৯৮২), রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পুরস্কার এবং সমকাল পুরস্কার লাভ করেছেন।
এই বইটা পড়ার কারণ কি? আমি টাইম ট্রাভেল করতে চেয়েছি। হুঁ, তাই। ডিসকাভারি চ্যানেলে ডাইনোসর নিয়ে একটা ডকু দেখাতো। ব্যপারটা অনেকটা এরকম - এখন যেখানে White House সেখানেই একসময় ঘুরে বেড়াত ডাইনোসর। এই বইটা পড়ার কারণও ওই... বন্ধু ফাহিম আমাকে কয়েকবার বলেছে এই কথা, পড় পড় এই বই।
কাজীর দেউড়িতে একসময় হানা দিত বাঘ, যে বাঘ ছিল নাসিরাবাদের পাহাড়ে। এখন বাঘ আর চট্টগ্রাম কল্পনাই করা যায় না। আজকের এম এ আজিজ স্টেডিয়াম ছিলই না, ছিল একটা টিলা, ছোটখাটো একটা মাঠ টাইপের কিছু ছিল, নাম ছিল পল্টন মাঠ। এলাকাটা ছিল গ্রাম টাইপের। কাজী বাড়িতে ছিল বড় বড় পুকুর, শাক-সবজির চাষ হত। ছিল আম, কাঠাল, লিচুর বাগান। এসব কথা বন্ধু কাজী ইকরামুল হককে বললে হয়তো চোখ উল্টাবে :P
জেনারেল হাসপাতাল ছিল সদর হাসপাতাল, তারমানে শহরটা কতটা ছোট ছিল, আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের নাম ছিল জুমা মসজিদ যে মসজিদের ইমাম ছিলেন লেখকের বাবা। একটু দূরের জেমিস্ন ম্যাটারনিটি হাসপাতাল ছিলই না, ছিল একটা মাঠ, যে মাঠে বক্তৃতা দিয়েছিলেন বড় বড় সব মানুষ, কাজী নজরুল, কাজেম আলীর মত আরো কত কত!
সাতকানিয়া থেকে দোহাজারী যেতে হলে নৌকায় যেতে হত, সময় লাগতো দুইদিন। খাবার নিতে হত সাথে। কি মজা তাই না, আমি যদি এভাবেই যেতাম! (দোহাজারী আমার ফুফুর বাড়ী, আমার দাদুরা নাকি নৌকায় করেই যেত একসময়, বোয়ালখালি থেকে) ২০১২ সালে একদিন নৌকায় করে বন্ধুর বাড়ী গিয়েছিলাম (পোপাদিয়া), কি মজার ছিল সেটা! ও আধুনিক সময়!!
লেখকের শৈশব বা গ্রামের পার্টটা পড়তে যা ভালো লেগেছিল। বাড়ীটা ছিল একেবারে পুকুরের ধারে। মাঝে মাঝে হত কি, খাচ্ছে আর ওমনি খাবারে এসে পড়ল পুকুরের ব্যাঙ। কি আর করা, আম্মু করত কি, কিছু ভাত ফেলে দিয়ে বলত, খেয়ে না বাবা :D সারা দিন ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আর কোন কাজই ছিল না। মা বকবে কি, ছেলে যে বেঁচে আছে তাতেই খুশী!
শুধু যে চট্টগ্রামের কথা আছে তাই নয়, আছে ঢাকা, খুলনা আর কলকাতার কথাও। আছে লেখকের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার কথা। বিখ্যাত সব মানুষদের সাথে আলাপচারিতার কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল, সুফিয়া কামাল, জসীমউদ্দীন, এনামুল হক, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, শওকত ওসমান, কাজেম আলী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নীলিমা ইব্রাহিম, মুজাফফর আহমেদ, আরো আরো আরো।
কি চমৎকার বন্ধুত্ব ছিল সুফিয়া কামালের সাথে। হাত ভেঙ্গে ঢাকা মেডিকেলে। এখন লেখক হাসপাতালের খাবার খেতে পারেন না, আবার বাইরে থেকে খাবার আনারও নিয়ম নেই। তো সুফিয়া কামাল করলেন কি, মাছ রেঁধে সেটা হরলিকস এর বৈয়ামে ভরে ভ্যানিটি ব্যাগে করে এনে লেখককে খাইয়ে দিলেন :D লেখককে লেখা সুফিয়া কামালের চিঠিগুলো যা ছিল না! আর নজরুল তো ভালোবেসে লেখককে ফজইল্যা বলে ডেকে ফেলেছিল একদিন! আর নজরুল মানুষটা যা মজার ছিল। একদিন বলেছিল, নোয়াখালীর মানুষ যদি পানিকে হানি বলে তাহলে নিশ্চয় হোটেলকে ফোটেল বলে 3:)
আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা। চট্টগ্রামে বোমা বর্ষিত হচ্ছিল, চট্টগ্রাম কলেজ দেয়া হয়েছিল তখন সৈন্যদেরকে। কিন্তু শিক্ষা তো থেমে থাকবে না, তো সিদ্ধান্ত হল, চট্টগ্রাম কলেজকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। মানুষ হয়ে পড়ল চিন্তিত। একবার যদি ঢাকায় চলে যায় তবে আর ফিরে নাও আসতে পারে। তো একজন বিশিষ্ট মানুষ নিজের বাড়ী দিলেন ছেড়ে। সেখানেই হচ্ছিল ক্লাস। ট্রেঞ্চ খুঁড়া হয়েছিল সেখানেও। সাইরেন বাজলেই স্টুডেন্ট-টিচার তড়িঘড়ি করে ঢুকে পড়তো ওখানে!
এরকম প্রচুর প্রচুর লিখার মত ঘটনা। আমার ভালো লাগা স্মৃতিচারণমূলক বইয়ের মধ্যে এটা উপরের দিকেই থাকবে। ধন্যবাদ আবুল ফজল, চমৎকার সময় কাটলো।
ও আচ্ছা দাদু তোমাকে একটু বকুনিও খেতে হবে। আন্দরকিল্লায় এত সময় কাটালে, একটু হেঁটে পাথরঘাটায় আসলে কি হত?! >:O
আবুল ফজলের আত্মকথা 'রেখাচিত্র'-তে তার জন্ম হতে একেবারে পঁয়ষট্টি বছরের দীর্ঘ সময়কে ধরতে চেয়েছেন৷ নানা ঘটন-অঘটনে কাটিয়ে দেওয়া ব্যক্তিজীবনকে খুবই সাদামাটা ভাষায় বর্ণনা করেছেন রেখাচিত্রে। সত্যবচন কিংবা মিথ্যাকথনের চেয়ে ভাসাভাসা ভঙিতে বলেছেন নিজের যুগধর্মের কথা।
দরিদ্র এক মৌলবি পিতার সন্তান আবুল ফজল। পিতার দারিদ্রতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল তার সততা। পড়তে গিয়ে পাঠক এর পরিচয় পাবেন৷ আবুল ফজল পড়াশোনা করেছেন মাদরাসায়। অন্যের বাড়িতে লজিং থেকে চালিয়ে যেতে হয়েছে পড়ালেখা। প্রচলিত অর্থে 'মেধাবী' শিক্ষার্থী কোনোকালেই ছিলেন না আবুল ফজল৷ বিএ পাশ করেছেন দু'বার পরীক্ষা দিয়ে। বিটি পরীক্ষাও প্রথমবার উতরাতে পারেন নি। তাই বলে সাহিত্য সাধনা কখনো থেমে ছিল না। দুর্বার গতিতে এগিয়ে গেছে৷
স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে চাকরিতে হাতেখড়ি। অবসর নেওয়ার আগে অধ্যাপক হয়েছিলেন। চাকরি জীবনের নানা ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আর দেশভাগের খণ্ড স্মৃতি।
নজরুল, গোলাম মোস্তফার সান্নিধ্য পেয়েছেন। সুফিয়া কামাল, জসীম উদদীনের সাথে সখ্যতার পাশাপাশি দেশভাগপূর্ব সাহিত্যাঙ্গনের অনেক ঘটনা লিখেছেন তার জবানিতে৷
মৌলবির সন্তান, নিজে মাদরাসায় পড়েছেন অথচ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি চোখে পড়ে না। বরং ধর্মকর্মের প্রতি অদ্ভুত এক উদাসীনতা লক্ষণীয়।
ব্যক্তিজীবন নিয়ে লিখতে গিয়ে সবকিছু যেন গুলিয়ে ফেলেছেন। ঘটনার কোনো ধারাবাহিকতা পাচ্ছিলাম না। লিখতে হয় তাই লিখি গোছের কথাবার্তা লেখা। এমন কোনো ঘটনা নেই যা পাঠককে আলোড়িত করতে পারে।
এই আত্মকথা পড়ার আগে খানিকটা প্রত্যাশা রেখেছিলাম - এই সত্য গোপন করব না। কিন্তু পড়ে মনে হলো আর দশজন ভেতো মানুষের ব্যতিক্রম নন আবুল ফজল। আপনি, আমি লিখলে যেমন ছন্দহীন, স্রোতবিহীন এবং অনুল্লেখযোগ্য ঘটনার পরম্পরায় বইয়ের পাতা ভরতি করব, আবুল ফজলও একই কাজ করেছেন তার 'রেখাচিত্র' বইতে।
বইটির নাম জানতাম অনেক আগেই। জীবনী-আত্মজীবনী আমার প্রিয় একটা জনরা, তাই বইটি সংগ্রহ করে পড়ে ফেললাম৷ সুখপাঠ্য লেখা, তরতর করে পড়ে গেছি। জেনেছি আবুল ফজলের জীবনের সাথে সাথে দেশভাগ এবং পাকিস্তান আমলের কথা। বইটির প্রথম প্রকাশ ১৯৬৫ হলেও পরবর্তীতে পরিবর্ধিত সংস্করণে যুক্ত হয়েছে পরবর্তী কিছু সাল ও৷ এছাড়াও পরিশিষ্ট এবং আরো কিছু কথাতেও অনেকখানি তথ্য-গল্প জুড়ে দেয়া আছে। বাতিঘরের সংস্করণটা খুব ভালো, পড়তে ভালো লেগেছে৷ আবুল ফজলের বেড়ে উঠেন চাঁটগাতে, মৌলভী বাবার সন্তান হওয়ায় প্রথম পড়াশোনা মাদ্রাসাতে। যদিও তাঁর চিন্তাধারা বাবার থেকে অনেকটাই ছিলো আলাদা৷ মা ছিলেন সাধারণ, কিন্তু দৃঢ়চেতা এক নারী৷ যিনি যেকোন বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রাখার আশ্চর্য গুণ নিয়ে জন্মেছিলেন৷ আবুল ফজলের শিক্ষা জীবন এবং লেখক জীবন হাত ধরাধরি করেই চলেছে। কিছুটা গ্যাপ ও পড়েছে উচ্চশিক্ষাতে৷ বিবাহিত জীবনে বেশ চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে তাঁকে। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিয়ের পরপরই স্ত্রী মারা যাবার ফলে তৃতীয়বার বিয়ে করতে হয়েছে তাঁকে৷ তবে বইটিতে তাঁর পারিবারিক জীবন খুব বেশি আলোচিত হয়নি। বরং এসেছে শিক্ষা-রাজনীতি-সমাজের কথা অনেক বেশি। এসেছে ��িখা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের কথা। এসেছে কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল হুসেন, মোতাহার হোসেন চৌধুরীর কথা। আবার পরবর্তীতে চাকরি জীবনের খাতিরে এসেছে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ এনামুল হক প্রমুখের কথা। জসীমউদ্দিন, সুফিয়া কামালের চিঠিও সংযুক্ত আছে গ্রন্থটিতে। আছে নজরুল-রবীন্দ্রনাথের প্রতি লেখকের শ্রদ্ধার কথা। আবুল ফজলের চিন্তা চেতনার ধারাবাহিকতা এবং তাঁর ব্যক্তিগত ও সাহিত্যিক জীবনের পর্যায়ক্রম বেশ সুন্দরভাবে বোঝা যায় বইটি পড়লে৷ তবে ঘটনাবলি বর্ণনাতে তেমন ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয়নি বলে কিছু পুনরুক্তি দোষ ঘটেছে৷ এছাড়াও বইটি পড়ে মনে হলো, তিনি ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছুটা নির্লিপ্ত ছিলেন। তবে তাঁর ছেলের প্রতি স্নেহের প্রকাশ একটা ঘটনায় উল্লেখ আছে। একটা আত্মজীবনী সার্থক হয়ে উঠে তখনি যখন লেখক তাঁর জীবনের সাথে সাথে পারিপার্শ্বিকতা অবলোকন করে বিশ্লেষণ করেন, ফলে তাঁর ভাবনার সাথে সাথে জানা যায় তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সেদিক দিয়ে 'রেখাচিত্র' অত্যন্ত সফল।
এমনিতেই শৈশব কৈশোরের স্মৃতিকথা পড়তে পছন্দ করি। হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিকথাগুলো পড়ে এই অভ্যাসটা তৈরি হয়েছে। পাঠ্যবইতে এই বইয়ের চতুর্থ পরিচ্ছেদের বেশ খানিকটা পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যদিও সিলেবাসে সেটা ছিল না, তবুও বার বার পড়তাম। "মনকে চোখ ঠারানো" বাগধারাটা সেখান থেকেই শিখেছি এবং সুযোগ পেলেই সেটা ব্যবহার করি! এই যে! একটা কিছু বলতে গেলে মূল বক্তব্যের বাইরের কথা এনে প্যাঁচাইতে থাকি!!
যাইহোক, তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম পুরা বইটা তো পড়বই, সাথে আবুল ফজলের লেখা যা পাওয়া যায় সবই পড়া লাগবে। বইটা পড়ে একটা বড় অতৃপ্তিতো ঘুঁচেছেই, উপরি পাওনাও ঘটেছে কিছু। তবে একটা কথা বলে রাখা ভালো, উনার লেখা প্রথাগত লেখকের মতন গোছালো নয়। মানে যা মনে আসছে, তাই লিখে ফেললাম টাইপ অবস্থা। কোনো সাজানো গোছানো ব্যাপার নেই। সাধারণ গ্রামীণ জীবনের সাদামাটা বর্ণনা করে গেছেন নিজের ভঙ্গিতে। সেই যুগে মৌলবির ছেলে হয়েও নিজের মতকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলা ভাষার চর্চা করে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন- সেসব আর বিতং করে বলে আঁতলামি না করি।
লেখকের একটা কথা শেয়ার করে এই ফাও প্যাঁচাল বন্ধ করি, "প্রত্যেক মানুষেরই একটা নিজস্ব এলাকা আছে, ইংরেজিতে যাকে Private Life বলা হয়। সেখানে ছাপার অক্ষর কেন, দেবতারও প্রবেশ নিষেধ।"
আবুল ফজলের আত্মজীবনী পড়ার ইচ্ছে মূলত এই কারণেই যে আমি নিজেও চট্টগ্রামের বাসিন্দা। বইটি কিনে সত্যিই ক্ষতি হয় নি। লেখার শুরুটা গ্রাম অঞ্চলে হলেও, গ্রামীণ বিবরণ অল্পই। কারণ লেখকের খুব বেশি দিন গ্রামে থাকা হয় নি। ছিলেন চট্টগ্রাম শহরে তাই লেখায় ১৯১৫-২০ সালের বর্ণণা খুব মনে ধরেছে। লেখকের জন্ম এমন এক পরিবারে যেখানে বাংলা ভাষার চর্চা হতো। তাঁর পিতা ছিলেন আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের ইমাম। সেখান থেকে তার উঠে আসার গল্পটা রোমাঞ্চকর বৈ কি!! বেঙ্গল রেঁনেসার ছোঁয়া একটু দেরীতে হলেও মুসলিম সমাজে ও লেগেছিল। সাবেকি মাদ্রাসা থেকে নিউ স্কিম মাদ্রাসা। এরপর ইসলামিয়া ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এর থেকে তৈরি হওয়া শিক্ষিত সমাজ, তৎকালীন মুসলিম নিস্তরঙ্গ সমাজে হালকা হলেও তরঙ্গ সৃষ্টি করেছিল। শিখা, সওগাত এর পত্রিকাগুলো রেখেছিল অগ্রণী ভূমিকা। আবুল ফজল সেই সময়ের একজন। তাঁর লেখায় অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন, ২য় বিশ্বযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, পাকিস্তানের কথাও হাল্কা পাতলা এসেছে। নেতিবাচক বলতে গেলে দুটো কথা বলতে হয়। লেখাটার টাইম ফ্রেম ঠিক নেই। কখনো গল্প আগে এগিয়ে গেছে হুট করে পিছে এসে গেছে। পাঠকের জন্য ব্যাপারটার অস্বস্তির। লেখার ভঙ্গি মাঝে মাঝেই একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল।
আত্মজীবনী পড়তে পছন্দ করি দুই কারণে। প্রথমত একজন মধ্যম মানের লেখকের ক্ষেত্রেও আত্মজীবনীর গদ্য স্বাদু হয়ে ওঠে। অন্যদিকে জানা যায় তার সময়ের কথা। আবুল ফজলের 'রেখাচিত্র'র একটা অংশ আমাদের স্কুলে পাঠ্য ছিল। পুকুরপাড়ের দাওয়া আর ভাতের থালে ব্যাঙ পড়ার ওই বর্ণনা এতো স্বাদু ছিল যে তখন মনে হইছিল 'রেখাচিত্র' অবশ্যই পড়তে হবে। পড়তে একটু দেরি হয়ে গেল আরকি।
যে স্বাদু গদ্যের কথা বলছিলাম সেটা আবুল ফজলের ছেলেবেলার অংশে কিছুটা ছিল। তারপর গদ্য ভালো, কিন্তু স্বাদু না। তবে ইনফঅরমেটিভ হয়েও গল্প বলার একটা ভঙ্গি ছিল। সেটা খুব না হলেও খানিকটা টানে। 'রেখাচিত্র' আসলে এর নামের মতোই। আবুল ফজল তার জীবনের একটা দীর্ঘ অংশের একটা রেখাচিত্র উপস্থাপন করেছেন। শরীর দেননি। অনেক কিছু অকপটে স্বিকার করেছেন কিন্তু নিজের মধ্যে লেখা সীমাবদ্ধ রাখেননি। যাদের দেখেছেন তাদের কথা লিখেছেন, সময়ের কথা লিখেছেন আর অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন রেফারেন্স। বইটা তাই একটা পর্যায়ে আত্মজীবনীর তুলনায় সময়ের খতিয়ান হয়ে ওঠে।