আমরা সবাই দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাই। কিন্তু ছোটো থাকার ব্যাপারটা আমাদের সঙ্গেই রয়ে যায় বিভিন্নভাবে। হয়তো মায়ের দেরাজে রাখা অ্যালবামের ছবি হয়ে। কিংবা নিজেরই আঁকা কোনো আঁকাবাঁকা ছবিতে। কিংবা বাড়ির দেয়ালে কালিমাখা ছোট্টো হাতের ছাপে আমাদের ফেলে আসা সময়ের সেই ছোট্টো-আমাদের চিহ্ন রয়ে যায়। এই বইয়ের গল্পগুলো সেই অতীত শিশুদের।
আজ যে ছোটো, সে এই বইটা পড়ে যেমন জানতে পারবে, জলদস্যু হতে গেলে ছোটোদের কী খাটনিটাই না পোহাতে হয়, তেমনি আবার আজ যে বড় হয়ে গেছে, সেও ফিরে যেতে পারবে অনেক দূরের শৈশব নামের দেশটায়, যেখানে ঝড়ের সন্ধ্যায় চড়ুই পাখি উড়ে এসে বারান্দার ঘুলঘুলিতে গুটিসুটি হয়ে ঢুকে বসে থাকতো। আমাদের বয়স যা-ই হোক না কেন, সবার ভেতরেই একটা করে শিশু বাস করে, যে কখনোই বড় হয় না।
"ছোটন আর মিনি ঠিক করেছে তারা বেশি করে লালশাক আর ছোট মাছ দিয়ে ভাত খেয়ে জলদি জলদি বড় হয়ে যাবে। বড় না হলে ভালো কর্ক দিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলার কোনো উপায় নেই। ছোটো হয়ে থাকলে এই পচা কৰ্ক দিয়েই খেলতে হবে সারা জীবন"
এই যে দেখুন না, এই অংশটা পড়েই কেমন নস্টালজিক হয়ে গেলাম!! নস্টালজিক কেন হলাম তা নিয়ে একটা গল্প বলা যাক তাহলে ছোট করে...... আমি ছোট থাকতে ক্রিকেট ই বেশি খেলতাম। তো বড়দের সাথে খেলতে গেলে আমরা বাচ্চাদের 'দুধভাত' হিসেবে গণনা করা হতো। কি রাগ হতো! ভাবতাম কবে বড় হব, কবে আমাকে এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হবে না!! এমন আরো অনেক কারণে বড় হতে চাইতাম (কিন্তু এখন সেই বড় হয়েই কাল হলো। এখন মনে হয় সেই বাচ্চা থাকতেই ভাল ছিলাম)
"বারান্দায় রেলিং এর ওপরে কাঠের আস্তরণ দেয়া । বুলু এখনো ছোট, সে পায়ের পাতায় ভর করেও রেলিঙের ওপর দিয়ে কিছু দেখতে পায় না। সেই রেলিঙের ফাঁক দিয়ে সরু একটা পৃথিবী দেখা যায়, সেটা বুলুর পছন্দ নয়"
বইটাতে আছে ছোটছোট সব গল্প। প্রায় সব গল্পে এমন কিছু ছিল যা পড়ে মনের ভেতর হাসছিলাম এবং ভাবছিলাম "আরে ছোটবেলায় তো আমি এমনই ছিলাম। এসব কাজ করতাম/এভাবে চিন্তা করতাম"..... যেমন--মা রান্না করার সময়ে তার পাশে বসে থাকা, রান্নাতে পেয়াজ রসুন নিজ হাতে তেলে দেওয়ার বায়না করা, এমন কিছু বড়-মানুষ যাদের সবসময় ভয় পাওয়া, সাইকেল চালানোর চেষ্টা করে হাত-পা ভেঙে ফেলা, শিলাবৃষ্টি হলে টুকরোগুলো কুড়াতে বাইরে যাওয়া, ঘুমোতে যাওয়ার সময় আম্মুর মুখে গল্প শুনা.... এমন অনেককিছু বিষয় ছিল গল্পগুলোতে যেগুলো আমাকে নস্টালজিক করে দিচ্ছিলো!!
কি মায়া মায়া সব গল্প! গল্পগুলো পড়ে কি আনন্দ পেয়েছি বলে বুঝানো যাবে না! মনে হয়েছে এই ৭৮ পৃষ্ঠার বই ছোটবেলার নির্যাস ছড়িয়ে দিয়ে গেলো এবং আবার যেন ফিরে গেলাম ছোটবেলাতে কিছু সময়ের জন্য!
"পিপলুর মা বই পড়ে যান, পিপলু চুপচাপ মায়ের গন্ধ নেয় শুয়ে শুয়ে। এই গন্ধটা মায়ের গন্ধ। এই গন্ধটা রুটিতে নেই, চায়ে নেই, বইতে নেই, মাছে নেই, মাংসে নেই, ডালে নেই, সাবানে নেই, শ্যাম্পুতে নেই। এই গন্ধটা শুধু তার মায়ের গায়ে আছে। পরের পৃষ্ঠায় কী হয়, পিপলু শুনতে পায় না। সে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ে"
শিশুতোষ বই সবসময় আমার পছন্দের শীর্ষস্থানে থাকে। নবীন- প্রবীন, দেশী-বিদেশী নির্বিশেষে বাচ্চাদের বইগুলো বেশ আগ্রহ সহকারে পড়ি সবসময়। মাহবুব আজাদের বইটার বেশ নামডাক শুনেছিলাম, কিন্তু হাতে পাওয়ার পড়া হয়ে ওঠেনি।
১০ টা ছোট গল্পের সংকলন, সবমিলিয়ে মাত্র ৮০ পৃষ্ঠা; অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে খুঁজে পাওয়া গেলো। কোনরকম প্রত্যাশা ছাড়াই পড়তে শুরু করেছিলাম। সত্যি কথা বলতে, প্রথম গল্প 'হাবুলের জলদস্যু জাহাজ' পড়ে তেমন জুতসই লাগেনি। ছোট্ট হাবুলের স্বপ্ন: বড় হয়ে জলদস্যু হবে। সেই স্বপ্নকে কেন্দ্র করে হালকা সুরের একটা গল্প, তবে পাঠককে নস্টালজিয়ায় ভোগাবে নি:সন্দেহে। সেই যে ছোটবেলায়, আমরা কখনো পাইলট, কখনো আইসক্রিমওয়ালা, কখনো বেলুনের ব্যবসায়ী হতে চাইতাম; সে কথা কী ভোলা যায়?
পরের তিনটা গল্প পড়ে আনন্দ পেলেও, আলাদাভাবে তেমন কোন বিশেষত্ব খুঁজে পাইনি। বই এবং লেখক সম্পর্কে ধারণা বদলে গেল পঞ্চম গল্প "মিতুন যেদিন ডাল রাঁধলো" তে এসে। ছোট্ট মিতুন আর বাসার কাজের মেয়ে দুলি - এই দু'জনকে নিয়ে গল্পটা। কিছুটা নাটকীয়তা ছিল সত্যি, কিন্তু শেষ লাইনগুলোতে এসে ভেতরটা কেপে উঠেছিল রীতিমতো। এতো সাধারন একটা ঘটনাকে লেখক অসম্ভব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন! বাহ!
'দাদিভাইয়ের বাগান' গল্পটা বেশ। একজন বৃদ্ধা তার পরিবারকে যেভাবে আগলে রাখেন, যে স্নেহের বন্ধনে ফুলবতী গুল্ম বিরাটাকার মহীরুহে পরিণত হয় ; তার চেয়ে মনোমুগ্ধকর কোন ফুলের বাগানের অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই! গল্পের একটা লাইন বলি, 'বারান্দার বাগানের দিকে দাদীভাইয়ের তেমন টান নেই। দাদিভাইয়ের বাগানটা আছে তার আলমারিতে, ঐ পুরনো এলবামগুলোর মধ্যে।
'বইদাদু' গল্পটা একটু অন্যরকম। বাবা-মা'র নিত্যদিনের ঝগড়ায় ছোট্ট কুড়ানের ভেতর জমে যাওয়া অভিমান, নিভৃতচারী এক বইপড়ুয়া দাদুর ভূমিকা -- থাক, বেশী বললে গল্পের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাবে।
টুটুলের বড়বু ঢাকা মেডিকেলে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে। টুটুল আর ওর ছোটবু'র খুব পছন্দের মানুুষ এই বড়বু। প্রতি মুহূর্তে তার অনুপস্থিতিকে অনুভব করে দুই ভাইবোন। ছোট ছোট কথা জমিয়ে রেখে অপেক্ষা করে, কবে বুবু ফিরবে! বড়বু ছুটি পেয়ে গ্রামে আসে, সাথে বয়ে আনে অনাবিল আনন্দের খোরাক। পারিবারিক সম্পর্কের এই অকৃত্তিম ভালোবাসার জন্ম স্বর্গে নয়, ধুলোমাটি মাখা পৃথিবীতেই তাকে খুঁজে পাওয়া যায়।
"গুড্ডুর সাইকেল শেখা" গল্পটা নিয়ে কিছু বলব না। শুধু একটাই কথা, গল্পটা আমি পরপর চারবার পড়েছি। প্রতিবারই চোখের কোণা ভিজে উঠেছে।
তবে আমার কাছে এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ গল্প হচ্ছে "অনেক রকম গন্ধ।" প্রতিটা লাইন পাঠককে নস্টালজিয়ার সাগরে ভাসাবে। শৈশবের স্মৃতির ভিড়ে ভোতা হয়ে যাবে জাগতিক অনুভূতি। গল্পের শেষ অংশটুকু উল্লেখ করছি- "পিপলুর মা বই পড়ে যান, পিপলু চুপচাপ মায়ের গন্ধ নেয় শুয়ে শুয়ে। এইই গন্ধটা মায়ের গন্ধ। এই গন্ধটা রুটিতে নেই, বইতে নেই, মাছ-মাংস-ডালে নেই, সাবানে নেই, শ্যাম্পুতে নেই। এই গন্ধের অস্তিত্ব শুধু ওর মা'র গায়ে। পরের পৃষ্ঠায় কী হয়, পিপলু শুনতে পায় না। সে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ে।"
"হাবুলের জলদস্যু জাহাজ" আমাকে ভাসিয়েছে শৈশবের সুখস্মৃতির সাগরে, নোঙর গেড়েছি আবেগ অনুভূতির বন্দরে, ডুবে গিয়েছি চিরচেনা সেই হারানো সময়ের গভীরতায়।
আমার গোল্ডফিশ মেমোরি বড়ই অকৃতজ্ঞ। প্রায় সময়ই মনে হয়, সাদামাটা নিস্তরঙ্গ একটা কাটায়া দিলাম—শৈশবটা বড়ই সাদা-কালো গেছে এমন একটা ধারণা জাঁকায়া বসছিল মনের মধ্যে। কিন্তু 'হাবুলের জলদস্যু জাহাজ' পড়ার পর মনে পইড়া গেল, স্মৃতি আমার সাথে প্রতারণা করছে—মোটেও বর্ণহীন শৈশব ছিল না আমার।
বাচ্চাকালে একটা জিনিসের প্রতি খুব মোহ ছিল—আব্বার সাইকেল। ঠিক আব্বার বলা যায় না, নানার সাইকেল। মামা সাইকেল চালাইতে পারে না, তাই নানার পর সেই সাইকেল চলে আসে আব্বার কাছে। কমপক্ষে দেড় যুগের সাক্ষী সেই সাইকেল যখন তার পুরনো, জংধরা কিন্তু সবল দেহ নিয়া চেইনের ধাতব ঘ্যাঁচ-ঘোঁচ আওয়াজ তুইলা আব্বারে প্রত্যেকদিন বাজারে নিয়া যাইত আর ফেরত আসত, তখন সেই সাইকেলের দিকে তাকায়া থাকতাম লোভাতুর দৃষ্টিতে। আমি আর ভাইয়া ধরতে গেলে পিঠাপিঠিই—দুই বছরের বড়-ছোট। তাই একটু বড় হওয়ার পর সাইকেলের দখল নিয়া তুমুল ঝগড়া ছিল নিত্যকার ঘটনা। সাইকেলটা ছিল প্রচণ্ড ওজনদার। আমার ৮-৯ বছরের ক্ষুদ্র শরীরে সেই ভার বহন করতে হিমশিম খাওয়া লাগত—তবুও টলমল করতে করতে হাঁটতাম সাইকেল নিয়া, চালাইতে পারতাম না। কিছুদিন খালি হাঁটতাম, তারপর শুরু হইল চালানো শিখার সাধনা। প্রথমে উচ্চতার কারণে সিটের নাগাল পাইতাম না, তাই নিচ দিয়া চালাইতে শিখলাম। তার���র আরও বছরখানেক যাওয়ার পরে শিখলাম উপরে, সিটে বইসা চালাইতে। সাইকেল থেকে পইড়া কতবার যে হাঁটু-কনুই ছড়ে-কেটে গেছে তার কোন হিসাব নাই। ঠিকমতন সাইকেল চালাইতে শিখার পর মনে হইল যেন রাজ্য জয় কইরা ফেলছি। ঠিকমতন সাইকেল চালনা শিখার পর নিজেরে মনে হইত দিগ্বিজয়ী বীর আলেকযান্ডার দ্যা গ্রেট। একেকদিন পঙ্খীরাজ সাইকেলের ডানায় ভোর কইরা আশপাশের একেকটা নতুন এলাকা কিংবা পাড়া/মহল্লা চক্কর মারতাম, আর মনে হইত নতুন একটা কইরা রাজ্য জয় কইরা আসলাম। পুরনো সাইকেলের বয়স যখন দুই দশকের উপরে, আমি যখন ক্লাস সেভেন, ভাইয়া নাইনে, তখন একদিন ভাইয়ার জন্য নতুন একটা ফনিক্স সাইকেল কিনে আনল আব্বা। তখন পুরনো সাইকেল চইলা আসলো পুরাপুরি আমার দখলে। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হইলো, বছরখানেক সেই সাইকেল নিয়া স্কুলে যাওয়ার পর একদিন হারায়া গেল সেইটা স্কুল থেকেই। আবারও সাইকেলবিহীন হয়ে পড়লাম আমি। তার বছর দুয়েক পর, ভাইয়া যখন স্কুলের পড়ালেখার পাট চুকায়া নটর ডেমে চইলা আসলো তখন ভাইয়ার সাইকেল চইলা আসলো আমার দখলে। নতুন সাইকেল পায়া আবারও আলেকযান্ডার হয়ে উঠলাম আমি। এইবার শুধু স্কুলে যাওয়া আর আশেপাশে চক্কর মারাই না—সাইকেল নিয়া দূর-দূরান্তে চইলা যাইতে লাগলাম ক্রিকেট খেলতে। সেই সাইকেল এখন বাড়িতে পইড়া থাকে অনাদরে, অবহেলায় অশীতিপর বৃদ্ধের মতো।
এই দুই-দুইটা সাইকেল কতটা রঙিন করছে আমার শৈশব-কৈশোর—আমার শৈশব-কৈশোরের কতটা অংশজুড়ে বইসা আছে সাইকেল দুইটা তা শুধু আমিই জানি! আচমকা এই সাইকেলের কথা বেশি করে মনে পড়ে গেছে মাহবুব আজাদ-এর 'হাবুলের জলদস্যু জাহাজ'-এর 'গুড্ডুর সাইকেল শেখা' গল্পটা পড়ার পর। এই গল্প পড়ার পর সাইকেল-সংক্রান্ত স্মৃতিগুলা খুব বেশি ডিস্টার্ব করতেছে।
এই বইয়ের প্রায় সবগুলা গল্প মনে করিয়ে দেয় ছোটবেলার কোন না কোন স্মৃতি। এই যেমন 'শিলাবৃষ্টির গল্প' পড়ে মনে পড়ে গেল শিলাবৃষ্টি হইলেই সারা উঠোনময় দৌড়ায়া দৌড়ায়া শিলা কুড়াইতাম। ছোটবেলায় একবার বাড়ির সামনের একটুখানি জায়গা বেড়া দিয়া কয়েক জাতের ফুলগাছ লাগাইছিলাম, বাগান করার জন্য—'দাদিভাইয়ের বাগান' সেই স্মৃতি জ্যান্ত করে দিল। 'বইদাদু' করায় দেয় আব্বার ফুফুর কথা, যেই দাদী বৃদ্ধ বয়সেও চোখের সামনে বই নিয়া গুটগুট করে পড়তেন। অবশ্য 'মিতুন যেদিন ডাল রাঁধল' কোন স্মৃতি জাগ্রত করে না, কারণ এই ধরনের কোন ঘটনার সাক্ষী হই নাই। 'গুড্ডুর সাইকেল শিখা'র সাথে সাথে এই বইয়ের শ্রেষ্ঠতম গল্প 'অনেক রকম গন্ধ'—এই দুইটা গল্প সমানভাবে আমার কাছে প্রিয়। এই বই নিয়া লেখক ফ্ল্যাপে আর ভূমিকায় যে কথা বলছেন তার পরে আর কিছু বলার থাকে না—"আমরা সবাই দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাই। কিন্তু ছোটো থাকার ব্যাপারটা আমাদের সঙ্গেই রয়ে যায় বিভিন্নভাবে। এই বইয়ের গল্পগুলো সেই অতীত শিশুদের। আজ যে ছোটো, সে এই বইটা পড়ে যেমন জানতে পারবে, জলদস্যু হতে গেলে ছোটোদের কী খাটনিটাই না পোহাতে হয়, তেমনি আবার আজ যে বড় হয়ে গেছে, সেও ফিরে যেতে পারবে অনেক দূরের শৈশব নামের দেশটায়, যেখানে ঝড়ের সন্ধ্যায় চড়ুই পাখি উড়ে এসে বারান্দার ঘুলঘুলিতে গুটিসুটি হয়ে ঢুকে বসে থাকতো। আমাদের বয়স যা-ই হোক না কেন, সবার ভেতরেই একটা করে শিশু বাস করে, যে কখনোই বড় হয় না। এই বইটা সেই চিরকেলে ভেতরশিশুর জন্যে লেখা।""শুধু টের পাই, আমরা কখনোই পুরোপুরি সেরে উঠতে পারি না শৈশব নামের অসুখটা থেকে। তাই হয়তো গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে মাকে ডেকে ফেলি, যেমন ডাকতাম তিন দশক আগে। 'হাবুলের জলদস্যু জাহাজ কেবল ছোটোদের জন্যে নয়, গল্পগুলো বড়োদের ভেতর লুকিয়ে ঘুমিয়ে গুটিশুটি হয়ে থাকা শিশুটির জন্যেও, যে হঠাৎ নাম ধরে ডাকে আমাদের।"
গত জানুয়ারিতে বইটা প্রথমবার পড়েছিলাম ধার করে, আজ আবার পড়লাম—এবার কিনে। প্রথমবার পড়ার পর মনে হইছে, এই বই কিনে না পড়া লেখকের প্রতি অন্যায়। একবার, দুইবার, বার-বার পড়ার মতো বই 'হাবুলের জলদস্যু জাহাজ'। আমার পক্ষ থেকে সাড়ে চার তারা—আধা তারা কাটার কারণ হইতেছে, 'মিতুন যেদিন ডাল রাঁধল' গল্পের জন্য—বড় বেশি ড্রামাটিক লেগেছে। তবে তারা-টারা দিয়ে এই বইকে বিচার করতে যাওয়াটা আমার মনে হয় না খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। লেখককে ধন্যবাদ—এবং কৃতজ্ঞতা, একটানে মস্তিকের ধূসর কোষের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতিগুলো একটানে আবার প্রাণ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য।
"আমাদের বয়স যা-ই হোক না কেন, সবার ভেতরেই একটা করে শিশু বাস করে, যে কখনোই বড় হয় না।" বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা কথাটা চিরসত্য। আর "হাবুলের জলদস্যু জাহাজ" সেই সব শিশুদের জন্য। উপসংহার সবসময় জোরালো না হলেও কিছু গল্পের বিষয়বস্তু নির্বাচনে মাহবুব আজাদের পারদর্শিতায় ও গদ্যশৈলীর গুণে অনেক দুর্বলতা ঢাকা পড়ে গেছে। "বড়বুর কাছে লেখা চিঠি"র কথাই ধরা যাক।টুটুলের বড়বু থাকে দূরের শহরে। এদিকে টুটুল সারাদিন ছোটবু'র সাথে ঝগড়া করে আর বড়বুর জন্য লেখা চিঠিতে সেসব ঝগড়ার বিবরণ লিখে রাখে।নমুনা দেখা যাক - ১.মিথ্যা বিচার।আমি মাত্র একটা মেরেছি।ও আগে মেরেছে। ৩. চা বানাতে বলেছিলাম, বানিয়েছে কিন্তু আমাকে দেয়নি। আরেকটা গল্প আছে "আলোদাদুর গল্প" নামে। আলোদাদু বদরাগী মানুষ। তার ঘরে অনেক রঙের আলো আছে। খাবার দিতে দেরি হলে নীল বালব জ্বালান তিনি (এর অর্থ মারাত্মক রেগে গেছেন।) পরপর নীলবাতি লালবাতি হলুদবাতি বেগুনিবাতি জ্বলা মানে দাদুর মন ভালো। নামগল্পে হাবুল জলদস্যু হতে চায়।এজন্য কাঠের তলোয়ার নিয়ে ঘোরে সে। খাঁটি জলদস্যু হতে হলে একটা পা কাঠের হতে হবে (কিন্তু ওর যে দুটো পা-ই ভালো!) আর খুঁড়িয়ে হাঁটতে হবে, নিজে জাহাজ বানাতে হবে, কাঁধে কাকাতুয়া নিয়ে ঘুরতে হবে। কতো যে কাজ আর সেসব কাজ করার ফিরিস্তি শুনে হাবুলের সে কি কষ্ট! এমন বর্ণিল সব লেখা নিয়ে সাজানো "হাবুলের জলদস্যু জাহাজ।" এ ধরনের বই কেন যে সহজে পড়তে পাওয়া যায় না!
প্রথমে বলে নেই ১টা তারা কম দিলাম কেন। ‘বুলুদের বারান্দায় চড়ুইগুলি’, ‘আলোদাদুর গল্প’ আর ‘শিলাবৃষ্টির গল্প’ আমার কাছে মনে হয়েছে যে এগুলো পুরোপুরি গল্প হয়ে ওঠেনি। কাহিনীতে আরো একটু কাজ করা যেত। অন্তত এখনকার শিশু/কিশোর পাঠকরা এতটুকুতে সন্তুষ্ট হবার কথা না। এই জন্য চার আনা গুণ তিন সমান বারো আনা কাটলাম। আরো চার আনা কাটলাম কয়েকটা ছবি আড়াআড়ি (ল্যান্ডস্কেপ) দেয়াতে। জিনিসটা একেবারে বেমানান লেগেছে। তাছাড়া ছবিগুলোও ঠিক পাতাভরা না। পাতাভরা ছবি না হলে শিশু/কিশোর পাঠকদের মন ভরে না।
এবার বলি ভালো লাগার কথা। আমার কাছে এই গল্প সংকলনের সবচে’ সেরা গল্প ‘মিতুন যেদিন ডাল রাঁধলো’। কাহিনীটা হয়তো একটু সিনেমাটিক। কিন্তু তা একেবারেই বেমানান মনে হয়নি। গল্পের অন্তিম অংশ পাঠককে স্রেফ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিশোর মননের জন্য একেবারে পারফেক্ট গল্প।
এরপরে রাখবো ‘গুড্ডুর সাইকেল শেখা’কে। বড়রা কিশোরদেরকে প্রপার এস্টিমেট করতে পারেন না। কখনো আন্ডারএস্টিমেট করেন, কখনো ওভারএস্টিমেট। এই গল্পে কিশোরদের ভাবনা ও অ্যাকশন যথাযথভাবে এস্টিমেট করে চিত্রায়িত হয়েছে। ‘দাদিভাইয়ের বাগান’ গল্পটা এই ধারাতে পড়লেও র্যাং কিং-এ তাকে আরো তিন ধাপ পরে রাখবো�� মাঝখানের তিনটি ধাপ যথাক্রমে ‘হাবুলের জলদস্যু জাহাজ’, ‘বড়বুর কাছে লেখা চিঠি’ আর ‘অনেক রকম গন্ধ’র জন্য। সবশেষে রাখবো ‘বইদাদু’কে।
‘হাবুলের জলদস্যু জাহাজ’ একদম ভিন্ন মেজাজের গল্প। ছোটবেলার বেয়াড়া ইচ্ছেকে কল্পনার সাথে বাড়তে দেবার এক চমৎকার গল্প। হাবুলের বেয়াড়া ইচ্ছেকে কেউ ধমক দিয়ে থামিয়ে দিচ্ছে না, কেউ ব্যঙ্গ করে খাটো করছে না। বরং তার সামনে একটার পর একটা হার্ডল দেয়া হচ্ছে যা অতিক্রম করার জন্য সে মাথা খাটাবে, পরিকল্পনা করবে।
আজকের এক/দুই সন্তান বিশিষ্ট নিউক্লিয়াস পরিবারের কিশোরদের কাছে ‘বড়বুর কাছে লেখা চিঠি’ কতোটা আবেদন রাখবে আমি নিশ্চিত না। তবে এই গল্প ত্রিশ/চল্লিশ বছর আগে লেখা হলে তা তখনকার কিশোরদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতো। তবু ভাইবোনদের মধ্যকার দুর্নিবার ভালোবাসা, মিষ্টি দ্বন্দ্ব এখনকার কিশোরদের কাছেও অবোধ্য হবার কথা না। এই মায়াটা সবাই টের পাবার কথা।
‘অনেক রকম গন্ধ’ একটা চিরায়ত গল্প। জ্ঞান অবধি এই অভিজ্ঞতা আর ভালো লাগার ভেতর দিয়ে প্রত্যেক শিশু গেছে। তাই এই গল্পটাকে তাদের অনেক আপন মনে হবার কথা।
‘বইদাদু’ গল্পটা শিশু/কিশোরদের গল্প হিসেবে না ভেবে সাধারণ গল্প হিসেবে ভাবলেই ঠিক আছে। কারণ, এখানে যে আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে সেটা এখনকার কিশোরদের ঠিক বোধে আসবে না। আমি নিজেই মাঝে মাঝে ভাবি, আমার অবর্তমানে আমার বইগুলোর কী হবে? প্রত্যেকটা বইয়ের সাথে যে এক একটা গল্প জড়িয়ে আছে সেটা আমার উত্তরসূরীদের বোঝার কথা না। তবু এমন গল্প এখনকার কিশোরদের জন্যও থাকুক, যাতে ওরা আমাদের কষ্টটার কিছুটা হলেও বুঝতে পারে।
গদ্যসাহিত্যের মধ্যে ছোটদের জন্য লেখা সম্ভবত সবচে’ কঠিন। বেশিরভাগ লেখক কিছু ন্যাকা ন্যাকা গল্প লিখে ভাবেন — ছোটদের জন্য বেশ গল্প লিখে ফেললাম। বাস্তবে ছোটরা ওসব গল্প গ্রহন করে না। শিশুরা আগামী দিনের মানুষ, তাই তাদের জন্য গল্প লিখতে গেলে নিজেকে আরো আধুনিক, আরো অগ্রসর চিন্তার করে তুলতে হয়। ছোটদের মন, মনন না বুঝলে তাদের উপযুক্ত, তাদের পছন্দের গল্প লেখা যায় না। তাদের গল্পে পৃথিবীটাকে তাদের চোখে দেখতে হয়, ঘটনাগুলোকে তাদের মতো করে বিশ্লেষণ করতে হয়। আর ছোটদের জন্য লেখার বেশির ভাগ মাঠে মারা যায় সেগুলোকে ‘উপদেশমূলক’ আর ‘শিক্ষামূলক’ করার অর্বাচীন চেষ্টায়। শুগারকোটিং দিলেও ট্যাবলেট যে ট্যাবলেটই থাকে, ছোটরা এটা খুব ভালো করে জানে। এসব বিবেচনায় এই গল্প সংকলনের গল্পগুলো সর্বাংশে শুধু পাশই নয়, গোল্ডেন ফাইভ পেয়ে পাশ।
অনেক অনেক বছর পর একটা ঠিকঠাক মানের, মনমতো কিশোর গল্প সংকলন পড়তে পেলাম।
পুনশ্চঃ আরেকটা কথা যোগ করা প্রয়োজন বোধ করছি। বর্তমানে বাংলাদেশের শিশু/কিশোরদের জীবনে খেলার মাঠ, গাছপালা, প্রতিবেশী বন্ধু এসব নেই। তারা কবুতরের খুপরীর মতো ছোট ছোট ঘরের স্কুলে পড়ে। সেখানেই কম ছোটাছুটির খেলা খেলে। স্কুলের সহপাঠীরাই তাদের একমাত্র বন্ধু, তার সাথে বড়জোর এক-আধটা তুতো ভাইবোন। এই শিশু/কিশোরদের জীবনটা স্কুল, টেলিভিশন, ভিডিওগেম, ফাস্টফুড শপ, নানা রকমের সামাজিক অনুষ্ঠানে (যেটা আসলে বড়দের) সীমাবদ্ধ। এদের জীবন নিয়ে গল্পের অভাব বোধ করি। এই বইয়েও সেটা নেই বললেই চলে।
ভী-ষ-ণ মায়ামাখা একটা বই! ছোট ছোট দশটা গল্পে এক ঝাঁঁপি শৈশবকাল ঠেসে ঢুকিয়েছেন লেখক। এই বইয়ের গল্পগুলো অতীত শিশুদের জন্য। এই বইটা বড়োদের ভেতর লুকিয়ে ঘুমিয়ে গুটিশুটি হয়ে থাকা শিশুটির জন্য। এই বইয়ে আছে ছোটদের চোখে দেখা পৃথিবীর শৈশব গল্প! মায়ের দেরাজে রাখা এলবামের ছবি- রঙিন সাইকেল- ঘুলঘুলিতে বাসা বাঁধা চড়ুইপাখি- ঝমঝম আনন্দময় শিলাবৃষ্টি- বড়বুর কাছে লেখা চিঠিতে তুলে ধরা অভিযোগ আর মায়ের মিষ্টি গন্ধ- এক ঝটকায় ফেলে আসা ঘোরলাগা শিশুকালে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে!
এতো কিউট একটা বই! পড়লে মনে হয়, আরে! এটা কোন বিষয়? এমন তো যে কেউ লিখতে পারে। কিন্তু এরকম করে লেখার জন্য ওই মায়া আর জাদু কোথায় পাব? ফিল গুড টাইপের এই বইটা বারবার আমাকে লীলা মজুমদারের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো।
"অনেক রকম গন্ধ" গল্পটা আগে পড়া। সে সময়ের মায়া ছাপিয়ে যাক সেটা চাইনি বলে এ যাত্রায় আর পড়িনি। ভালো লেগেছে "মিতুন যেদিন ডাল রাঁধলো", "বড়বুর কাছে লেখা চিঠি" আর "গুড্ডুর সাইকেল শেখা"। এ গল্প তিনটি ঠিক শিশুদের জায়গায় দাঁড়িয়েই অনুভব করা যায়। "বুলুদের বারান্দার চড়ুইগুলি" সে তুলনায় দাগ কাটল না মনে। "হাবুলের জলদস্যু জাহাজ" মজার। হাবুলের বয়সে আমার ইচ্ছে ছিলো বড় হয়ে ট্রাক ড্রাইভার হবো। শৈশবে লালিত এই নিখাদ ইচ্ছেগুলোর আনন্দ আজও বহন করে চলি। হাবুলের ইচ্ছের আকুলতা বুঝতে তাই বেগ পেতে হয় না। "আলোদাদুর গল্প" ঠিক যেন গল্প হয়ে উঠল না। "শিলাবৃষ্টির গল্প", "দাদিভাইয়ের বাগান" আর "বইদাদু"র জায়গায় জায়গায় কিছুটা বাহুল্য ঠেকেছে। খানিকটা কাটছাঁট চললে আরো ফুরফুরে হতে পারত। বইয়ের অলংকরণ আরো বিস্তারিত হতে পারত। শিশুদের তুলনায় আটপৌরে মনে হয়েছে। বাঁধাই আরো ভালো হতে পারত। বইটা পেপারব্যাকে ছাপালে ভালো হতো বলে মনে হয়েছে। ছোটদের বইয়ের ক্ষেত্রে চেহারা গুরুত্বপূর্ণ। সেই ভাবনা থেকে বলা। সবকথার শেষ কথা হলো, বড়রা যে যা-ই বলুক, এ বইয়ের শ্রেষ্ঠ রিভিউ শিশুরাই দিতে পারবে। শিশুদের জন্য আরো আরো বই আসুক। শুভকামনা।
এই বুড়ো বয়সে এসে হঠাৎ শখ হয়েছে বাচ্চাদের মায়া মায়া লেখাগুলো পড়বো। শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে ঢের পড়া হয়েছে গত বছর। তাই ভাবলাম এবারে আমাদের দেশী কিছু পড়ি। এখানেই হলো আপদ। শিশুসাহিত্য বলতে যা ছিল, সব পড়া হয়ে গেছে আগেই। তখনই সন্ধান পাই হাবুলের জলদস্যু জাহাজের। ভাগ্যিস পেয়েছিলাম! কি দুর্দান্ত সব গল্প এতদিন না-পড়া রয়ে গেছিল। অবশ্য শুরুর তিনটে গল্প বেশ ব্ল্যান্ড ছিল। কিন্তু এরপরেই পালটে গেল হিসেব নিকেশ। শিলাবৃষ্টির গল্প আর মিতুন যেদিন ডাল রাধল গল্পটার কথা বলছি আরকি। গুড্ডুর সাইকেল শেখা তো কয়েকবার পড়লাম। প্রতিবারই ভিজে উঠলো চোখের কোণ। মাহবুব আজাদ ভাইয়ার এযাবত যা পড়েছি, সবই ভালো লেগেছে। বাচ্চাদের জন্যে আরো লিখবেন ভাইয়া, কলম পরিশুদ্ধ হবে।
....আজ যে ছোটো, সে এই বইটা পড়ে যেমন জানতে পারবে জলদস্যু হতে গেলে ছোটোদের কী খাটনিটাই না পোহাতে হয়, তেমনি আবার আজ যে বড় হয়ে গেছে, সেও ফিরে যেতে পারবে অনেক দূরের শৈশব নামের দেশটায়, যেখানে ঝড়ের সন্ধ্যায় চড়ুই পাখি উড়ে এসে বারান্দার ঘুলঘুলিতে গুটিসুটি হয়ে ঢুকে বসে থাকতো।
পিচ্চিদের জন্য লিখতে গেলে বা বলতে গেলে আমরা বরাবর এক গাদা উপদেশ দিয়ে ফেলি। এই বইটার সবচেয়ে ভালো দিক বইয়ের গল্পগুলোকে আধুনিক ঈশপের গল্প বানিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয় নি। ফিরতে চাইলেই ফেরা যায় না, কিন্তু হাবুলে জলদস্যু জাহাজ পড়তে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য এক টুকরো শৈশবে ফিরে গেছি। এরকম আরও বইয়ে আমাদের শৈশব ফিরে আসুক বারবার।
ক্যাপ্টেন জ্যাক হাবুল একটি জলদস্যু জাহাজ খুঁজছেন, কারণ জলদস্যু হতে গেলে তাকে শুধু parley বলতে পারলেই হবে না, একটা জাহাজের মালিক হতে হবে!
"হাবুলের জলদস্যু জাহাজ" একটি শিশুতোষ গল্প সংকলন। এখানে দশটি গল্প আছে। শুধুই গল্প। গল্পের প্লট নেই, টুইস্ট নেই, এন্ডিং নেই। আছে গল্প, আর কিছু ভালো লাগা।
মাহাবুব আজাদ লিখেছেন শিশুতোষ গল্প। শিশুতোষ গল্প ভেবে ইগনোর করার কিছু নেই। খুব সহজে লেখা গেছে তাও না। এই গল্পগুলোতে আহামরি কোনো ইনসাইট নেই, তবুও ভালো লেগেছে কারণ লেখক গল্প রচনা করেছেন শিশুদের চোখ দিয়ে দেখে।
বইটার নামগল্প এবং "বইদাদু" গল্প দুটো বেশি ভালো লেগেছে৷ গল্পগুলোর এন্ডিংয়ে কোনো বিশেষত্ব নেই স্বাভাবিকভাবেই। মাহাবুব আজাদ এগুলো লিখেছেন শিশুদের জন্য, আর আমাদের মতো কিছু বুড়ো-শিশুদের জন্য, এসব গল্প পড়ে যারা স্ট্রেস রিলিফ পান।
জটিল বই পড়ে হাঁপিয়ে গেলে, এই গল্প সংকলনটি পড়তে পারেন। খারাপ লাগবে না৷ বইটা রেকমেন্ড।
উড়োজাহাজের উড্ডয়ন যেন। ‘হাবুলের জলদস্যু জাহাজ’ গল্পে আড়মোড়া ভেঙে ইঞ্জিন স্টার্ট নেয় কেবল। ‘বুলুদের বারান্দায় চড়ুইগুলি’, ‘আলোদাদুর গল্প’ এবং শিলাবৃষ্টির গল্প’ - যেন রানওয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে ছুটে চলা । ‘মিতুন যেদিন ডাল রাঁধল’ গল্পে উড়জাহাজটি মাটি ছেড়ে শূণ্যে উঠে পড়ে। টেক-অফ। তারপর কি সুন্দর পাখির মত উড়ে যাওয়া।
আমার কোন বড় বোন নাই। ছোট বেলায় এক বন্ধুকে তার বড় বোনের স্নেহ-ভালবাসা পেতে দেখে একটা বড় বোন চেয়েছিল মন। দুঃখটা সয়ে এসেছিল। সেটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল ‘বড়বুর কাছে খোলা চিঠি’ পড়ে। এটাই এই বইয়ের আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প। তারপর প্রিয় তালিকায় পর্যায়ক্রমে থাকবে ‘অনেক রকম গন্ধ’, ‘গুড্ডুর সাইকেল শেখা’, ‘দাদিভাইয়ের বাগান’ এবং ‘বই দাদু’ গল্পটি।
এই বইটা আসলে আমার মত বুড়োদের ভিতরে গুটি মেরে বসে থাকা শিশুটির জন্য। লেখকের জন্য ভালবাসা।
দাদু বলেন, “সেখানে আছে অনেকগুলি ঘর! প্রত্যেকটা ঘরে অনেকগুলি আলমারি! আলমারিতে অনেকগুলি বই! সেখানে আকাশ সুন্দর, বাতাস সুন্দর, রোদ সুন্দর, বৃষ্টি সুন্দর! সেখানে মানুষ সারাদিন শুধু বই পড়ে । সেখানে একটা ছোটো নদী আছে, সেই নদীতে ছোটো ছোটো নৌকোতে করে আরো নতুন নতুন বই ভেসে আসে!”
- স্বর্গের এমন বর্ণনা আর কে কবে দিয়েছে ! অদ্ভুত সুন্দর একটা বই!! ভীষণ রিলেটেবল। নন ফিকশন বা কঠিন বই পড়তে পড়তে ক্লান্ত হোলে এমন বইই তো চাই।
বইটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায় - এটাই একটা অতৃপ্তি !
বয়স বাড়তে বাড়তে আমরা ছোট থেকে যদিও বড় হতে থাকি তবুও আমাদের একটা শিশুরূপ যেন সর্বদা রয়ে যায়। এই বইয়ের গল্পগুলো পড়তে গেলে মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। শিশুতোষ গল্প লেখা বেশ কঠিন একটা কাজ। মাহবুব আজাদ এই কাজটি করতে পেরেছেন ভাল করেই। একেবারে সহজ ভাষায় লেখা ১০টি ছোট গল্পের বেশিরভাগের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো সমাপ্তিগুলো ভাল হয়নি। সুন্দর শুরু, সুন্দর প্লট নিয়েও শেষে গিয়ে হয়ে গেছে কেমন যেন। তবে আগাগোড়া সেরা হয়েছে হাবুলের জলদস্যু জাহাজ ও গুড্ডুর সাইকেল শেখা।
তাকিয়ে থেকেই পড়ে ফেলেছি বইটা। একে তো ফন্ট বড় তার উপর কেমন একটা ঘোর লাগা কাজ করছিল যেন। নিজের শিশু বেলাকে মনে করিয়ে দিয়েছে লেখক। অদ্ভুত সব চাওয়া, আর সেটাকে পাওয়ার জন্য আরও অদ্ভুত সব কান্ড কারখানা। মিছে গল্প বানানো, সেটাকে আবার মুখ ভরে সবাইকে শুনানো, ইত্যাদি এমনই সব ছোটবেলার স্মৃতির একটা পাঁচমিশালি সম্ভার এই বইটা।