কত জন মহিষী ছিল রাজা দশরথের? তিন, নাকি তিনশ পঞ্চাশ? অথবা সাতশ জন, যেমন লিখেছেন কৃত্তিবাস? কেমন ছিলেন রাবণ? যদি বলা যায়, বেদান্তশাস্ত্রে সুপণ্ডিত, বৈদিক কর্মকাণ্ডে অগ্রণী এক পুরুষ, তাহলে? বিশ্বাস করা কঠিন। কেমন কঠিন এমন ছবি চিন্তা করা, যেখানে স্বয়ং রামচন্দ্র সীতার হাতে তুলে দিচ্ছেন মদের পানপাত্র, কিংবা বনবাসকালে খাচ্ছেন হরিণের মাংসের রোস্ট! কথায় বলে, সাত নকলে আসল খাস্তা। বাল্মীকির রামায়ণও যেন তাই। ভারতের সব প্রদেশেই রচিত হয়েছে একটি করে প্রাদেশিক রামায়ণ। বাল্মীকির সঙ্গে টেক্কা দিয়েও তৈরি হয়েছে আরও এক দঙ্গল সংস্কৃত রামায়ণ -মহারামায়ণ, অদ্ভুত রামায়ণ, অধ্যাত্ম রামায়ণ এমন কত কী। এ-ছাড়া, প্রাদেশিক লিপিকরদের হাতে পড়েও মূল রামায়ণ হয়েছে নানাভাবে পরিবর্তিত। সেইসব বদল থেকে মূল বাল্মীকি রামায়ণের স্বরূপটিকে ফিরিয়ে আনা বড় সহজ কাজ নয়। সেই দুঃসাধ্য কর্মেই ব্রতী নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী। দারুণ আকর্ষণীয় তাঁর আলোচনা-ভঙ্গি, ভারি সরস তাঁর নানান মন্তব্য ও টীকা। প্রত্যেক বাঙালীর অবশ্যপাঠ্য এই আলোচনা।
Nrisingha Prasad Bhaduri (Bengali: নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি Nr̥sinha Prasād Bhāduṛi; born 23 November 1950) is an Indologist and a specialist of Indian epics and Puranas. He is also a writer.
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর জন্ম ২৩ নভেম্বর, ১৯৫০ অধুনা বাংলাদেশের পাবনায়। কৈশোর থেকে কলকাতায়। মেধাবী ছাত্র, সারা জীবনই স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা। অনার্স পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে পেয়েছেন গঙ্গামণি পদক এবং জাতীয় মেধাবৃত্তি।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত সাহিত্যে এম-এ। স্বর্গত মহামহোপাধ্যায় কালীপদ তর্কাচার্য এবং সংস্কৃত কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্যের কাছে একান্তে পাঠ নেওয়ার সুযোগ পান। নবদ্বীপ বিদ্যাসাগর কলেজের অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবনের সূচনা। ১৯৮১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছেন কলকাতার গুরুদাস কলেজে। বর্তমানে মহাভারত-পুরাণকোষ সংক্রান্ত গবেষণায় ব্যাপৃত। ১৯৮৭ সালে প্রখ্যাত অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করে ডক্টরেট উপাধি পান। বিষয়— কৃষ্ণ-সংক্রান্ত নাটক। দেশি-বিদেশি নানা পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘দেশ’ ও ‘বর্তমান’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক। প্রিয় বিষয়— বৈষ্ণবদর্শন এবং সাহিত্য। বৌদ্ধদর্শন এবং সাহিত্যও মুগ্ধ করে বিশেষভাবে। বাল্যকাল কেটেছে ধর্মীয় সংকীর্ণতার গণ্ডিতে, পরবর্তী জীবনে সংস্কৃত সাহিত্যই উন্মোচিত করেছে মুক্তচিন্তার পথ।
এ এক ভারি অদ্ভুত বই! লেখকের প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য এবং রসবোধ ছড়িয়ে আছে এর প্রতিটি লাইনে। রামায়ণকে ঐশ্বরিক আখ্যান হিসেবে বর্ণনা করেও তাতে কোথায় কীভাবে মানুষী ষড়রিপুতাড়িত চেহারাগুলো সামনে এনেছেন বাল্মীকি - তার একটি মনোজ্ঞ বিবরণ এটি। কিন্তু... বইটা পড়তে গিয়ে আমার সামনে তিনটে প্রকাণ্ড সমস্যা উঠে এল। প্রথমত, পাশ্চাত্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি আর দেশি ভক্তিমূলক ভাবনার মাঝামাঝি একটি মজ্ঝিম পন্থা অবলম্বন করার দাবি করেছেন লেখক। কিন্তু আমি লেখাগুলোতে আদতে ভাষাগত বা তুলনাত্মক কোনো আলোচনা পেলাম না। ভাষার বিচারে রামায়ণের বিবর্তন তুলে ধরায় অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় আজও অদ্বিতীয় তা জেনেই বলছি, আমাদের সত্যিকারের ইতিহাসের উৎস লুকিয়ে আছে ওখানেই। একইভাবে কীভাবে বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনা অন্যান্য ভাষা ও সংস্কৃতির নিজস্ব রামায়ণে বদলে গেছে, সেটা সুবিন্যস্তভাবে আলোচিত হলেও বোঝা যেত, কীভাবে এই আপাত সরল কাহিনি ক্রমে হয়ে দাঁড়িয়েছে অজস্র ভাষা ও জাতির ইতিহাস। দ্বিতীয়ত, বইটাতে আর্য-অনার্য ডায়ালেকটিকের মার্ক্সীয় ভ্রান্তিটিকে প্রায় চোখ-কান বন্ধ করে অনুসরণ করা হয়েছে। এই 'আর্য' ব্যাপারটা যে একটা প্রকাণ্ড মিথ্যা - এটা এখন প্রমাণিত। এমতাবস্থায় বইটার প্রায় ষাট শতাংশই ভুলভাল হয়ে গেছে। রামায়ণ যে আসলে মেটাফরের আড়ালে ভূমিজ, বনজ এবং সামুদ্রিক সম্পদের জন্য সংগ্রাম, এটা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিলে বোঝা যেত কেন রামায়ণ আজও প্রাসঙ্গিক। তৃতীয়ত, সুইপিং স্টেটমেন্ট (বিশ্বামিত্র বা দ্রোণাচার্যের মতো ক্ষত্রিয় থেকে ব্রাহ্মণ বা ব্রাহ্মণ থেকে ক্ষত্রিয় হওয়া 'দো-আঁশলা' লোকেরাই অস্ত্রবিদ্যার শিক্ষক) এবং ভুল (দাবি করা হয়েছে যে ঋষ্যশৃঙ্গের মগজ-ধোলাইয়ের জন্য গণিকা নিয়োগের কাহিনিটিই এমন কাজে প্রথম রিপুর প্রয়োগের আদিমতম ঘটনা। এটা ঠিক নয়। গিলগামেশ রামায়ণের পূর্বসূরি।) তথ্য মাঝেমধ্যেই লেখাটার ফোকাস নড়িয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে আমার বইটা পড়ে অপ্রাপ্তির অনুভূতিটাই বেশি করে হল। আগামী দিনে সত্যিই রামায়ণের পূর্বাপর বিশ্লেষণ করে কেউ লিখবেন, এই আশায় রইলাম।