উর্দু সাহিত্য এমন এক সুনেহরা নহর— যেখানে একবার ডুব দিলে আর ফিরে আসার ডাক কানে পৌঁছায় না।”
গজল, হামদ-নাত, মেহফিল, মাওলিদ— এ সকল শব্দ, রীতি ও রেওয়াজের সঙ্গে আমার পরিচয় বলা যায় শৈশব থেকেই। আমার বেড়ে ওঠা ছিল এমনই এক রুহানী পরিবেশে; বস্তুবাদের চেয়ে আধ্যাত্মিকতাই জড়িয়ে ছিল যার হাওয়া-জলের পরতে পরতে।
আমার মরহুম নানাজান ও তাঁর পরিবার ছিলেন সুফি ভাবধারার মানুষ। জিকিরে, সুরে, ছন্দে— স্রষ্টাকে কীভাবে সারাক্ষণ অনুভবে ও স্মরণে রাখা যায়, তা আমি তাঁদের থেকেই দেখেছি। নানাজানের মুখে শোনা একখানা গজল আজও আমার কানে বাজে, যার দুটি লাইন— “সাধক মনোরে সদায় থাকো যোগ ধিয়ানে (ধ্যানে), যোগ ধিয়ানে জ্ঞানও বাড়ে, রাইখো মাওলা স্মরণে।”
আমি বিশ্বাস করি, ছন্দ, কবিতা ও ভাবের প্রতি আমার যে অনুরাগ— আমার এই সাধনা— তার শেকড়ও সেই রুহানী জমিনের গভীরেই প্রোথিত।
আমার সাহিত্যপিয়াসী মন সদা সেই ধিয়ানেই খুঁজে ফেরে মানুষের অন্তরাত্মার আনন্দ-বেদনা, প্রার্থনা-আকুতির সালতামামি। আর এই লাগাতার সৌন্দর্যের সন্ধানই আমাকে একদিন টেনে নিয়েছে বিশ্বসাহিত্যের এক আশ্চর্য আসর— “উর্দু গজল-কবিতার মেহফিলে।”
উর্দু সাহিত্য এমন এক সুনেহরা নহর— যেখানে একবার ডুব দিলে আর ফিরে আসার ডাক কানে পৌঁছায় না।
‘মেহফিল-এ-ওয়াসিক’— আমার এই কিতাবখানা প্রকাশের উদ্দেশ্যও মূলত, আমি যে অপার সৌন্দর্যের খাজানা পেয়েছি— স্থান ও কালের সীমানা ভেঙে তার উদযাপনে আমার প্রিয়জনদের শামিল করা।
বইটি আমি সাজিয়েছি কবিতার মেহফিল বা মুশায়রার ঢঙে। নিজেকে ‘নাজিম’ বা উপস্থাপক পরিচয় দিয়ে পাঠকদের স্বাগত জানানো, শায়েরদের আমন্ত্রণ, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, চা-বিরতি, বিদায়পর্বসহ— সর্বোপরি মুশায়রার ক্রম ও আবহ বর্ণনার মাধ্যমে চেয়েছি পাঠকদের মানসপটে উনিশ শতকের এক জাঁকজমকপূর্ণ মুশায়রার অভিজ্ঞতা তৈরি ও তার প্রতিচ্ছবি আঁকতে। সেই সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরিসরে উর্দু ভাষা উদ্ভবের ইতিহাস, শের-শায়েরির গঠনরীতি ও উপাদান, মুশায়রা এবং অন্যান্য সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়েও আলোকপাত করেছি।
উর্দু শের-শায়েরির ক্লাসিক কিংবদন্তি মীর তকি মীর, মির্জা গালিব, আকবর এলাহাবাদি থেকে শুরু করে সমকালীন জনপ্রিয় শায়ের আহমেদ ফারাজ, জউন এলিয়া, বশির বদরসহ প্রায় ২৫-এর অধিক খ্যাতনামা শায়েরদের বেশ কিছু শের-শায়েরি ও তার বাংলা ভাবানুবাদ রেখেছি। আমার জ্ঞানস্বল্পতায় অনুবাদে ভুলত্রুটি থেকে গিয়ে থাকতে পারে— সে সব ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে এড়িয়ে বাকি নিবেদনটুকু আমার অগ্রজ ও অনুজ সকল পাঠকজনের ভালো লাগবে— এই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করছি।
প্রিয়জনেরা আমার বিদায়বেলায় তবে মানবমনের সীমাহীন আশা-প্রত্যাশা নিয়ে মির্জা গালিবের বিখ্যাত শের গুনগুনিয়েই শেষ করছি— “হাজারো এমন ইচ্ছে ছিল আমার চাইতে গিয়ে বের হয়েছে দম। অনেক তার পূরণ হয়েছে বটে— তবু লাগে তাহাও যেন কম।”
অনুবাদ সাহিত্যের সবচেয়ে জটিল কাজ নিঃসন্দেহে কাব্যানুবাদ। খুব নিখুঁতভাবে অনুবাদ করতে গেলে অনেক সময় মূল রচনা থেকে সরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, আবার অনুবাদ দুর্বল হলে মূল ভাবই ঠিকমতো ফুটে ওঠে না। নতুন পাঠক হিসেবে আমি সাধারণত এসব সূক্ষ্ম বিষয়ে খুব বেশি মনোযোগ দিই না; বরং চাই সহজ, প্রাণবন্ত ও সাবলীল একটি অনুবাদ।
এই গ্রন্থে ঠিক তেমনটাই পেয়েছি। কাব্যের পাশাপাশি মাঝে মাঝে গল্প ও আলাপচারিতার সংযোজন পাঠকে আরও আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। লেখক অত্যন্ত সুন্দরভাবে পুরো বইটি সাজিয়েছেন। এটি তাঁর প্রথম অনুবাদগ্রন্থ হলেও উর্দু সাহিত্যের বিখ্যাত গজল ও শের-গায়কীদের জনপ্রিয় কাব্য দিয়ে সাজানো বইটি অনুবাদের প্রাঞ্জলতায় অনবদ্য হয়ে উঠেছে।
মেহফিল এ ওয়াসিক, উর্দু শায়ারি নিয়ে বই। শায়ারি নিয়ে আমার আগে থেকেই বেশ আগ্রহ ছিল, সে নিমিত্তে বইটা হাতে নেয়া।
বইয়ের শুরু হয়েছে কীভাবে দিল্লি ও মীরাটের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, সুফি-দরবেশদের বুলি আর রাজদরবারের ফারসি-আরবির সংমিশ্রণে তিলে তিলে গড়ে উঠেছিল এই জাদুকরী উর্দু ভাষা তার পরিচিতি দিয়ে।
গজল, মাতলা, মাকতা, রদিফ, কাফিয়ার মতো কঠিন ব্যাকরণগুলোও বইটিতে কী দারুণ গল্পের ছলে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে!
তবে বইটার পাতা উল্টাতে উল্টাতে ১১১ ও ১১২ নম্বর পৃষ্ঠায় এসে যেন চোখ আটকে যায়। সেখানে জউন এলিয়ার জীবনের এমন এক খণ্ডচিত্র আঁকা আছে, সে যেন এক বিষাদময় পটচিত্র।
আমরোহায় জন্ম নেওয়া এই শিশুটি নাকি জন্মের পর এমন শব্দ করে হাসত যে, পরিবারের মানুষ অবাক হয়ে বলত, "এই বাচ্চা কি মানুষ না জ্বিন!"
জউনের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো তাঁর সেই আট বছর বয়সের প্রেম। কেউ একজন যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, "আপনার বয়স যখন আট, তখন সেই মুহতারিমার বয়স কত ছিল জউন?"
তিনি একগাল হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, "ছয়!"। মেয়েটির আসল নাম হয়তো ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে, তবে জউন তাকে 'ফারিহা' নামে ডাকতেন।
দেশভাগের পর জউনের পুরো পরিবার পাকিস্তানে চলে গেলেও, তিনি একাকী আমরোহায় পড়ে ছিলেন কেবল ফারিহার স্মৃতির টানে। কিন্তু বাধ্য হয়ে ১৯৫৭ সালে যখন তিনি করাচি চলে যান, তখন সেই নিঃসঙ্গতা তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে।
জীবনের এই অদ্ভুত সমীকরণে আমাদের প্রায়ই হাসির আড়ালে দীর্ঘশ্বাস লুকাতে হয়। বইয়ের পাতা থেকেই আন্দালিব শাদানির একটা শায়েরি পড়ছিলাম, যেখানে তিনি ঠিক এই নিরুপায় অবস্থার কথাই বলেছেন:
আর এই ব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ তো এটাই, নিজের সবটুকু দিয়ে চাওয়া মানুষটাকে না পাওয়া। উজাইর হিজাজি ঠিক এই আক্ষেপটাই কী দারুণভাবে করেছেন:
উচ্চারণ: কিসি নে মুফত মেঁ ভো শখস পায়া / জিসে হর কিমত পর মুঝে চাহিয়ে থা অর্থ: আমি যাকে পুরো দুনিয়ার বিনিময়ে চেয়েছিলাম / তাকে কেউ বিনামূল্যে পেয়ে গেছে।
এই না পাওয়ার যন্ত্রণা এতটাই তীব্র যে, মৃত্যুতেও যেন এর থেকে নিস্তার নেই। শেখ ইবরাহিম জৌক যখন বলেন, তখন মনে হয় সত্যিই তো, পালানোর জায়গা কোথায়!
উচ্চারণ: অব তো ঘবরা কে ইয়ে কহতে হ্যায় কি মর জায়েঙ্গে / মর কে ভি চ্যায়েন না পায়া তো কিধর জায়েঙ্গে অর্থ: এখন তো অশান্তি লাগলেই বলছি মরে যাবো / মরেও যদি শান্তি না পাই, তখন কোথায় যাবো।
জীবনের পথে চলতে গিয়ে কাউকে একটু ছায়া দিতে দেখলে আমরা বড্ড দ্রুত তাকে আপন ভেবে নিই। পারভীন শাকির তাঁর লেখনিতে বারে বারে আমাদের সতর্ক করেছেন। তিনি লিখেছেন:
উচ্চারণ: রস্তে মেঁ মিল গয়া তো শরিক-এ-সফর না জান / জো ছাঁও মেহেরবাঁ হো উসে আপনা ঘর না জান অর্থ: পথ দেখা হয়েছে বলেই কি আর সবাই সঙ্গী হয়? / ক্ষণিক ছায়া দিয়েছে বলেই কি আর সে ঘর হয়?।
বিরহ যখন চরম রূপ নেয়, তখন মানুষ নিজের ভেতরের সবটুকু অনুভূতিকে পাথর বানিয়ে ফেলে। পারভীন শাকির এক বুক অভিমান নিয়ে বলেছিলেন, একদিন তিনি নিজেই নিজের ভালোবাসার মানুষের বিয়ের সাজ সাজাবেন:
উচ্চারণ: কামাল-এ-জব্ত কো খুদ ভি তো আজমাউঙ্গি / ম্যায় আপনে হাত সে উস কি দুলহন সাজাউঙ্গি অর্থ: নিজের ধৈর্য নিজেই পরখ করবো আমি / একদিন নিজ হাতে তার দুলহান সাজাবো আমি।
কখনো কখনো হারানোর শূন্যতা এতটাই বিশাল হয় যে, মানুষ ভুলেই যায় সে কী চাইছিল। পারভীন শাকিরের এই শায়েরিটা পড়লে চোখ ভিজে আসে:
উচ্চারণ: মেরি তলব থা এক শখস ভো জো নহি মিলা তো ফির / হাথ দুয়া সে ইউঁ গিরা ভুল গয়া সওয়াল ভি অর্থ: হাত আমার দোয়া থেকে এমনভাবে ছিটকে গেল যেন / আমি ভুলেই গেলাম— কী চেয়েছিলাম আর কাকে চেয়েছিলাম।
কারণ সেই মানুষটি তো ছিল কেবল এক সুবাস, তাকে কি আর বেঁধে রাখা যায়? পারভীন শাকির আক্ষেপ করে বলেন:
ফাহমি বদায়ুনীর মন পড়ে থাকে সেই এক প্রশ্নে, মানুষটা কি তাকে নিয়ে আদৌ কিছু ভাবে?
উচ্চারণ: কটি হ্যায় উমর বস ইয়ে সোচনে মেঁ / মেরে বারে মেঁ ভো ক্যা সোচতা হ্যায় অর্থ: কেটে গেল জীবন আমার এই ভেবে ভেবে / আমাকে নিয়ে সে ঠিক কী কী ভাবে।
অতীতকে ভুলে যাওয়ার এক আপ্রাণ চেষ্টা থাকে মানুষের। আমজাদ ইসলাম আমজাদ তাই নিজেকেই হয়তো সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন:
উচ্চারণ: কাঁহা আ কে রুকনে থে রাস্তে কাঁহা মোড় থা উসে ভুল যা / ভো জো মিল গয়া উসে ইয়াদ রাখ জো নহি মিলা উসে ভুল যা অর্থ: কোথায় এসে থামা লাগতো, কোথা-ইবা ছিল পথের মোড়, ভুলে যাও / যাকে পেয়েছো তাকে মনে রাখো, যাকে পাওনি তাকে ভুলে যাও।
অথচ একসময় এই মানুষটার হাত ধরেই পুরো জগৎ আপন মনে হতো। রাহাত ইন্দোরির সেই রোমান্টিক স্মৃতিটা যেন সব প্রেমিকেরই মনের কথা:
উচ্চারণ: সুরজ সিতারে চাঁদ মেরে সাথ মেঁ রহে / জব তক তুমহারে হাত মেরে হাত মেঁ রহে অর্থ: চাঁদ-তারা আসমান সুরজ, সব থাকে আমার সাথে / যতক্ষণ তোমার ঐ হাতজোড়া থাকে আমার হাতে।
এরপর বইয়ের পাতা উল্টে যখন বশির বদরের শায়েরিগুলোতে চোখ বোলালাম, মনে হলো এগুলো যেন বিরহীর রোজকার মোনাজাত। তিনি কোনো শর্ত ছাড়াই ভালোবেসেছিলেন:
উচ্চারণ: সোচা নহিঁ আচ্ছা-বুরা দেখা-সুনা কুছ ভি নহিঁ / মাঁগা খুদা সে রাত-দিন তেরে সিবা কুছ ভি নহিঁ অর্থ: ভাবিনি আমি ভালো মন্দ, শুনিনি কিছু দেখিনি কিছুই / রাত দিন কেবল চেয়েছি তোমায়, তুমি বাদে আমি চাইনি কিছুই।
সৃষ্টিকর্তার কাছে তাঁর একটাই আক্ষেপ ছিল, এত বড় দুনিয়ায় কেবল একটা মানুষকেই তো তিনি চেয়েছিলেন:
উচ্চারণ: খুদা কি ইতনি বড়ি কায়েনাত মেঁ ম্যায় নে / বস এক শখস কো মাঁগা মুঝে ওহি না মিলা অর্থ: খোদার বানানো এত বড় দুনিয়ায় / আমি কেবল একটা মানুষকেই চেয়েছিলাম / অথচ তাকেই আমি পাইনি।
কিন্তু তিনি এতটাই ভালোবাসেন যে, তাকে ভুলে যাওয়ার দোয়া কবুল হোক—সেটাও তিনি চান না:
উচ্চারণ: ভো বড়া রহিম ও করিম হ্যায় মুঝে ইয়ে সিফাত ভি আতা ক��ে / তুঝে ভুলনে কি দুয়া করু তো মেরি দুয়া মেঁ আসর না হো অর্থ: ও দয়াল পরম করুণাময় / কবুল করো তুমি আমার এই কামনা / যদি মোনাজাতেও তাকে ভুলে যেতে চাই আমি কভু / যেন বৃথা যায় মোর সেই প্রার্থনা।
কারণ, তাঁর বিশ্বাস তাঁর মতো করে ঐ মানুষটিকে আর কেউ ভালোবাসতে পারবে না: উচ্চারণ: আগর তলাশ করু কোয়ি মিল হি জায়েগা / মগর তুমহারি তরহ কৌন মুঝ কো চাহেগা অর্থ: খুঁজলে হয়তো কাউকে পেয়েই যাবো, কিন্তু / তোমার মত করে আর কে আমারে চাইবে?
তার চোখজোড়ার সেই আকুলতা অন্য কেউ কোথায় পাবে? বশির বদর আবারও বলেন: উচ্চারণ: তুমহেঁ জরুর কোয়ি চাহাতো সে দেখেগা / মগর ভো আঁখেঁ হামারি কাঁহা সে লায়েগা অর্থ: তোমারে নিশ্চয় কেউ আকুল চাহনীতেই দেখবে / কিন্তু আমার এই চোখজোড়া সে কোথায় পাবে?
আর রয়ে যায় দেখা না হওয়ার সেই চিরন্তন আক্ষেপ, যেটা প্রতিটি বিরহী আত্মাকে কুড়ে কুড়ে খায়:
উচ্চারণ: না জি ভর কে দেখা না কুছ বাত কি / বড়ি আরজু থি মুলাকাত কি অর্থ: না প্রাণভরে দেখলাম তারে, না হইলো কোনো আলাপ / কতই না ইচ্ছে ছিল করবো মোলাকাত।
এই যে না পাওয়ার গল্প, তা তো অশ্রু দিয়েই লিখতে হয়। ওয়াসিম বেরলভী যখন এই শায়েরিটি লিখেছেন, তখন হয়তো তাঁর চোখও ভিজে ছিল:
উচ্চারণ: ম্যায় উস কো আঁসুও সে লিখ রহা হুঁ / কি মেরে বাদ কোয়ি পঢ় না পায়ে অর্থ: আমি তারে অশ্রু দিয়ে লিখি / যেন আমার পরে কেউ আর তা পড়তে না পারে।
বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে আবার সেই জউন এলিয়ার লেখায় এসে থামলাম। নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে জউন যেন এক অদ্ভুত আক্ষেপে ভুগেছিলেন। তাঁর দুঃখের কারণ তাঁর নিজেরই সত্তা, যেন তিনি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু:
উচ্চারণ: সারি দুনিয়া কে গম হামারে হ্যায় / অউর সিতম ইয়ে কি হাম তুমহারে হ্যায় অর্থ: তামাম দুনিয়ার সব দুঃখ আমার / আর কী নির্মম দেখো 'আমি' তোমার।
একজনের জন্যই কেন এই দুনিয়াটা এত শূন্য মনে হয়? জউনের এই প্রশ্নটা যেন হাজারো মানুষের প্রশ্ন:
উচ্চারণ: ইয়ে মুঝে চ্যায়েন কিউঁ নহিঁ পড়তা / এক হি শখস থা জহান মেঁ ক্যা অর্থ: আহা! আমার শান্তি কেন মেলে না / সে বাদে কি আর মানুষ নেই দুনিয়ায়?
বিরহের আরেক নাম হলো দীর্ঘ নীরবতা আর অপেক্ষা।
গুলজার ঠিক সেই নীরবতার নদীটাই সাঁতরে পার হয়েছেন:
উচ্চারণ: কিতনি লম্বি খামোশি সে গুজরা হুঁ / উন সে কিতনা কুছ কহনে কি কোশিশ কি অর্থ: কত দীর্ঘ নীরবতার নদী সাঁতরে গিয়েছি আমি / কত না বলা কথা, তাকে বলতে চেয়েছি আমি।
মুনীর নিয়াজির শায়েরিগুলো পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, সত্যিকারের ভালোবাসা হয়তো হারানোর পরেই টের পাওয়া যায়:
উচ্চারণ: মহব্বত অব নহিঁ হোগি ইয়ে কুছ দিন বাদ মেঁ হোগি / গুজর জায়েঙ্গে জব ইয়ে দিন ইয়ে উন কি ইয়াদ মেঁ হোগি অর্থ: 'ভালোবাসা' এখন হবে না, হবে কিছুদিন পর / হারিয়ে যাবে যখন এই দিনগুলো, তখন তার স্মৃতির উপর।
অপেক্ষার এই মোহ বড় অদ্ভুত। সে চলে গেছে, তবু সে যেন রয়ে গেছে মনের কুঠুরিতে:
উচ্চারণ: ইয়ে ক্যায়সা নেশা হ্যায় ম্যায় কিস আজব খুমার মেঁ হুঁ / তু আ কে জা ভি চুকা হ্যায় ম্যায় ইন্তেজার মেঁ হুঁ অর্থ: এ কোন নেশায় এ কোন মোহে ডুবে আছি আমি হায় / তুমি এসে আবার চলেও গেছো, অথচ আমি এখনো অপেক্ষায়।
আর এই দেরি হয়ে যাওয়াটাই যেন মুনীর নিয়াজির জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি:
উচ্চারণ: হামেশা দের কর দেতা হুঁ ম্যায় হর কাম করনে মেঁ / জরুরি বাত কহনি হো, কোয়ি ওয়াদা নিভানা হো / উসে আওয়াজ দেনি হো, উসে ওয়াপাস বুলানা হো / হামেশা দের কর দেতা হুঁ ম্যায় অর্থ: আমার দেরি হয়ে যায় / কেবলই দেরি হয়ে যায় / কোনো কাজ করতে গেলে / কারো ওয়াদা রাখতে গেলে / তার নাম ধরে ডাকতে গেলে / 'ফিরে এসো' তাকে সাধতে গেলে / আমার দেরি হয়ে যায়, কেবলি দেরি হয়ে যায়।
যাকে হারানো হয়, তার সৌন্দর্য যেন স্মৃতিতে আরও মোহনীয় হয়ে ধরা দেয়। আহমেদ ফারাজের কলমে সেই রূপের প্রশংসা পড়ে আমি নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম:
উচ্চারণ: সুনা হ্যায় উস কে বদন কি তরাশ অ্যায়সি হ্যায় / কি ফুল আপনি কবায়েঁ কতর কে দেখতে হ্যায় অর্থ: শুনেছি তার রূপের শোভা এতটাই মনলোভা / এমনকি ফুলও তার পাপড়ি ফেলে তাকিয়ে থাকে।
আর এই রূপ দেখার নেশা তাকে পাগল করে তোলে। না দেখলে যেন প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে আসে:
উচ্চারণ: ম্যায় ক্যা কহুঁ কি মুঝে সব্র কিউঁ নহিঁ আতা / ম্যায় ক্যা করুঁ কি তুঝে দেখনে কি আদত হ্যায় অর্থ: আমি কীভাবে যে বলি— আমার প্রাণে কেন সয় না / আমি করবোটা যে কী— তোমায় না দেখলে আমার হয় না।
জেনেবুঝেও অপেক্ষা করার নামই তো প্রেম! ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের এই শায়েরিটা পড়লে মনে হয়, হৃদয় আসলে কোনো যুক্তিই শোনে না:
উচ্চারণ: জানতা হ্যায় কি ভো না আয়েঙ্গে / ফির ভি মসরুফ-এ-ইন্তেজার হ্যায় দিল অর্থ: এ হৃদয় ঠিকই জানে— সে আসবে না ফিরে / তবু দাঁড়িয়ে আছে, অনিশ্চিত অপেক্ষার তীরে।
কারণ যখন সে কাছে ছিল, তখন দুনিয়ার আর কিছুই লাগতো না। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাই বলেছেন:
উচ্চারণ: সারি দুনিয়া সে দূর হো যায়ে / জো জরা তেরে পাস হো ব্যায়ঠে অর্থ: তোমার পাশে যখন আমার একটু মেলে ঠাঁই / সারা দুনিয়া তখন যেন দূরে সরে যায়।
কিন্তু সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হলো এমন কাউকে ভালোবাসা যে কখনো আপনার হবে না। আহমেদ ফারাজ নিজের মনকে পাগল বলে গালমন্দ করেছেন ঠিক এই কারণেই:
উচ্চারণ: দিল ভি পাগল হ্যায় কি উস শখস সে ওয়াবস্তা হ্যায় / জো কিসি অউর কা হোনে দে না আপনা রক্খে অর্থ: ও আমার পাগল মন / বেঁধেছো নিজেকে তুমি এমন এক মানুষের সাথে / যে না নিজের করেছে তোমায়! না হতে দিয়েছে অন্য কারো।
এই যে কাউকে বুকে লালন করার অপরাধ, তা যেন এক পবিত্র পাপ। জিগর মোরাদাবাদি এই গুনাহ করতে পেরেও যেন আনন্দিত:
উচ্চারণ: দিল মেঁ কিসি কে রাহ কিয়্যে জা রহা হুঁ ম্যায় / কিতনা হসিন গুনাহ কিয়্যে জা রহা হুঁ ম্যায় অর্থ: এ হৃদয়ে কারো পথ খোদাই করে যাচ্ছি আমি / কত সুন্দর এক গুনাহই না করে যাচ্ছি আমি।
কিন্তু এই প্রেমের বন্দিদশা থেকে মুক্তির উপায় কী? সে তো নিজের বানিয়ে আবার মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছে।
উচ্চারণ: উস নে আপনা বানা কে ছোড় দিয়া / ক্যা অসিরি হ্যায় ক্যা রিহাই হ্যায় অর্থ: সে নিজের বানালো, বানিয়ে ছেড়েও দিল / সে কি আমায় বন্দিত্ব দিল নাকি মুক্তি দিল।
দাগ দেহলভির শায়েরিগুলো পড়ছিলাম এরপর। সেখানে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত ভুল বোঝাবুঝির আক্ষেপ:
উচ্চারণ: অর্জ-এ-অহওয়াল কো গিলা সমঝে / ক্যা কহা ম্যায় নে আপ ক্যা সমঝে অর্থ: আমি নিজের অবস্থা বললাম, তুমি তা অভিযোগ ভেবে নিলে / দেখো আমি বলছি এক, আর তুমি উল্টোটা বুঝে নিলে।
প্রেম যেন এক জুয়াখেলা, যেখানে হৃদয় বাজি রেখে হেরে যেতে হয়। দাগ দেহলভি ঠিক এমনটাই অনুভব করেছিলেন:
উচ্চারণ: হম ভি ক্যা জিন্দেগি গুজার গয়ে / দিল কি বাজি লগা কে হার গয়ে অর্থ: কী এক জীবন আমি কাটিয়ে দিলাম / হৃদয় বাজি রেখে তাতে হেরেও গেলাম।
মানুষটা চলে যায়, কিন্তু ব্যথাটা ঠিকই বুকের ভেতর বাসা বাঁধে: উচ্চারণ: রহা না দিল মেঁ ভো বেদর্দ অউর দর্দ রহা / মুকিম কউন হুয়া হ্যায় মকাম কিস কা থা অর্থ: সেই পাষাণ রইলো না হৃদয়ে, রয়ে গেল কেবলই ব্যথা / কে থেকে গেল চিরতরে, আর কার থাকার ছিল কথা।
একসময় আশা করাটাও যেন বিলাসিতা মনে হয়। হতাশার অন্ধকার এতটাই গাঢ় হয়ে যায়: উচ্চারণ: না-উম্মিদি বঢ় গয়ি হ্যায় ইস কদর / আরজু কি আরজু হোনে লগি অর্থ: হতাশা আমার এতটাই বেড়ে গেছে যে / আজকাল আশা করতেও আশা জাগে।
তবুও প্রেমিক মন বারবার প্রশ্ন করে, তার অপরাধটা কোথায় ছিল? সে তো কেবল ভালোবেসেছিল:
আকবর এলাহাবাদির শায়েরিগুলো পড়তে গিয়ে মনে হলো, এই প্রেম ছিল এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ। মস্তিষ্ক যাকে মানতে চায় না, হৃদয় তাকেই বারবার ডেকে আনে:
উচ্চারণ: বস জান গয়া ম্যায় তিরি পহচান য়্যাহি হ্যায় / তু দিল মেঁ তো আতা হ্যায় সমঝ মেঁ নহীঁ আতা অর্থ: এতটুকুই জেনেছি আমি তোমার পরিচয় / তুমি কেবল হৃদয়ে আসো, মস্তিষ্কে নয়।
তার রূপের কাছে ফুলও হার মেনে যায়। আকবর এলাহাবাদি তাকে ফুলের সাথেও তুলনা করতে নারাজ:
উচ্চারণ: তশবীহ তিরে চেহরে কো ক্যা দুঁ গুল-এ-তর সে / হোতা হ্যায় শগুফতা মগর ইতনা নহীঁ হোতা অর্থ: ফুলের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা / সেও ফোটে ঠিক তবু তোমার মত (অপরূপ) না।
প্রেমিক তার ভালোবাসার মানুষের দেওয়া শাস্তি মাথা পেতে নিতেও প্রস্তুত, শুধু সে তাকে নিজের বলে স্বীকার করুক:
উচ্চারণ: সউ জান সে হো যাউঁগা রাজি ম্যায় সাজা পর / পহলে ভো মুঝে আপনা গুনাহগার তো কর লে অর্থ: সে আমাকে তার গুনাহগার তো বানাক / শত জীবন দিয়ে তার শাস্তি টেনে নেব বুকে।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় তো একটাই, যখন ভালোবাসা কাছে থাকে না। মুজতার খয়রাবাদি তাঁর পুরো জীবনের হিসাব মিলিয়ে দেখেছেন:
উচ্চারণ: ওয়াক্ত দো মুঝ পর কঠিন গুজরে হ্যায় সারি উমর মেঁ / ইক তিরে আনে সে পহলে ইক তিরে জানে কে বাদ অর্থ: আমার সারাটা জীবন দুঃসময় এসেছে কেবল দু'বার / এক তুমি আসার আগে, আরেক তুমি চলে যাবার পর।
বইটার একেবারে শেষের দিকে এসে আল্লামা ইকবালের এই অমোঘ শায়েরিটা পড়লাম। মনে হলো পুরো বইয়ের, এতগুলো কবির বিরহের এই যেন চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি। যেখানে যোগ্যতা নয়, প্রেমিকের অপেক্ষাই তার সবচেয়ে বড় অলংকার:
উচ্চারণ: মানা কি তেরি দিদ কে কাবিল নহীঁ হুঁ ম্যায় / তু মেরা শওক দেখ মিরা ইন্তেজার দেখ অর্থ: মানলাম আমি তোমার দীদারের যোগ্য নই / তবু আমার আকাঙ্ক্ষা তো দেখো, আমার অপেক্ষা তো দেখো।
বইটা যখন বন্ধ করলাম, মনে হলো যেন সত্যি সত্যিই একটা দীর্ঘ মুশায়রা বা কবিতার আসর শেষ হলো।
জউন এলিয়ার সেই আট বছরের ফারিহা থেকে শুরু করে আল্লামা ইকবালের বুক চেরা অপেক্ষা পর্যন্ত, প্রতিটি পাতায় আমি যেন মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে গোপন কান্নাগুলোকে ছুঁয়ে দেখেছি।
This entire review has been hidden because of spoilers.