দেব্রীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (English: Debiprasad Chattopadhyaya) ভারতের কলকাতায় ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভারতের একজন প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী দার্শনিক। তিনি প্রাচীন ভারতের দর্শনের বস্তুবাদকে উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁর লেখাগুলো একাধারে দর্শন ও বিজ্ঞানের সমন্বয়। এছাড়াও তিনি প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানের ইতিহাস ও বিজ্ঞানের পদ্ধতি সম্পর্কেও গবেষণা করেছেন। তিনি ১৯৯৩ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
আজ থেকে বহু-বহু আগে, যখন ইতিহাস আর সমাজচেতনা— দুটো নিয়েই ধারণা একটু-একটু করে জমাট বাঁধছিল, তখন পড়েছিলাম এই ৬৩৭ পৃষ্ঠার মহাগ্রন্থটি। তারপর আড়াই দশকেরও বেশি কেটে গেছে। বইটা বহুবার পড়েছি— কখনও সম্পূর্ণ একটি অধ্যায়, কখনও শুধু প্রয়োজনীয় অংশটুকু। তবে লেখকের প্রজ্ঞা এবং নির্ভার লেখনীর সমন্বয় এমনই জাদুকরী যে প্রায়ই পড়তে শুরু করে চলেই গেছি বহুদূর অবধি। বইটিতে মোট তিনটি অংশ আছে। তারা হল~ প্রথম অংশ: পটভূমি~ এতে আছে লোকায়ত-র সংজ্ঞা বিচার এবং এই বইয়ে তা আলোচনার পদ্ধতি; দ্বিতীয় অংশ: বস্তুবাদ~ এই অংশটির নাম শুনলে যে কেউ ভাববেন যে মার্কসবাদী ডায়ালেকটিক নিয়ে কচকচিই হয়তো এখানে পাওয়া যাবে। তা একেবারেই নয়! গণপতির ইতিহাসের সূত্রে ভারতের লোকায়ত ইতিহাসটিই বরং ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। তৃতীয় অংশ: ভাববাদ~ এও এক অতুলনীয় অংশ, যা বরুণের সূত্র ধরে ইন্টার-ডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচের সাহায্যে দর্শনের বিবর্তনই তুলে ধরে। এমন এক ঘন-সন্নিবিষ্ট বই হওয়া এই বইয়ের মতো সহজপাঠ্য বই একান্তই দুর্লভ। সবচেয়ে বড়ো কথা, প্রকাশিত হওয়ার প্রায় সাত দশক পরেও বইটা অদ্বিতীয়ই রয়ে গেছে। না পড়ে থাকলে তো বটেই, এমনকি আগে পড়া থাকলেও আবার পড়ুন। এই বই লা-জবাব।
লোকায়ত ঠিক কি? কেন? কোথা হতে এর উৎপত্তি, বিকাশ কেমন করে হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণের এই বই।
আর্যদের ভারত ভূখণ্ডে আসার অনেক আগে থেকেই এখানকার আদি বাসিন্দাদের ছিল নিজস্ব দর্শন, রীতিনীতি। আর্য আগমনের পর ধীরে ধীরে বৈদিক দর্শনের আড়ালে চাপা পড়ে যায় তা। শুধু তা-ই নয়, আর্যদের ভাষ্য অনুসারে লোকায়ত দর্শন ছিল অতি নিচু শ্রেণীর দর্শন। দুঃখের বিষয় লোকায়তর কোন নির্দিষ্ট পুস্তক পাওয়া যায় না। সম্ভবত বৈদিক ভাবধারার মানুষেরা তা ধ্বংস করেছিলেন।
তাহলে লোকায়তর খোঁজ পাওয়া যাবে কোথা হতে? আর্যদের ভাষ্যে থেকেই বিশ্লেষণ করে বের করতে হবে লোকায়তর স্বরূপ ইতিহাস। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ঠিক সে কাজটিই করেছেন। বিভিন্ন ভাষ্য, পুস্তক গবেষণা থেকে একটু একটু আহরন করে সে সব জুড়ে লোকায়ত দর্শনকে তুলে ধরেছেন আমাদের সামনে।
দর্শনের পাশাপাশি এখানে আছে ভারতের আদি ইতিহাস। এখানকার মানুষের ইতিহাস। দেবগুরু বৃহস্পতি থেকে চার্বাক, সাংখ্য, শঙ্কর ভাষ্য প্রভৃতিকে নৃতত্ত্ব, ইতিহাসের আলোকে আলোচনা করেছেন লেখক। এ বই দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের একটি অমূল্য কর্ম।
*কেবল উৎসাহ নয়, এই বই পড়ার জন্য গভীর অধ্যবসায় এবং পরিপক্বতা প্রয়োজন।