পাঠক, ঘুমাতে পারছেন না? মাসের পর মাস, রাতের পর রাত আপনার খোলা জানালায় এসে বসছে একটা তিন-চার ফুট লম্বা প্যাঁচা, যার মুখটা মানুষের মতো, আবার সেখানে পিরিচের মতো বড় বড় হলদে চোখ বসানো?
কিংবা আপনার ভাই গায়েব হয়ে গেছিলো, আবার ফিরে এসেছে কয়েকদিন পর, কিন্তু ভয়ংকর অশুভ একটা পরিবর্তন হয়ে গেছে তার মধ্যে?
দিশা পাচ্ছেন না এসব অপার্থিব বিপদে পড়ে? সমস্যা নেই, ডাকুন বিখ্যাত প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর শিপলুকে। দেশের এক দুর্গম প্রান্তে ছুটে যেতে হবে শিপলুকে, যাক। ভয়ানক এক অস্তিত্বের মুখোমুখি হতে হবে, হোক। শেষের উন্মোচনটা কাঁপিয়ে দেবে শিপলুকে? দিক।
সেইসাথে দেখা যাক, রহস্যময়ী মোহিনী আসলে কী চায়।
আমার কাজ তো কেবল সেই "অনাহূত"কে আপনার সামনে হাজির করা।
১৬-১৭ বছর বা তার আগে থেকে লেখালেখিতে হাতেখড়ি হওয়ার সুবিধা হচ্ছে সময় গড়ানোর সাথে সাথে লেখার ধার বাড়ে। তবে এক্ষেত্রে একটা শর্ত(একান্তই আমার মত) হচ্ছে নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে পড়া। সেটা ফিকশন হতে পারে, নন-ফিকশন হতে পারে। কারণ, কে না জানে, জীবন্ত কোন বর্ণনা আমাদের ঘুরিয়ে আনতে পারে এমন সব জগত থেকে, যেখানে কখনো হয়তো আমাদের পা-ই পড়েনি বা ভবিষ্যতেও পড়বে না। অনাহূত পড়ার সময় এই উপলব্ধিগুলোই মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল একটু পরপর। আমার মতে এটা হচ্ছে নাবিল মুহতাসিম ২.০। আগের চেয়ে অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী লেখা। কি হবে, তা জানার জন্যে উন্মুখ হয়ে ছিলাম পুরোটা সময়।
পেশাগতভাবে সাংবাদিক হলেও আর্দশির শাপুর শিপলুর আসল পরিচিতি গড়ে উঠেছে অতিপ্রাকৃত জগতের রহস্য উন্মোচনে। 'মাসিক হালচাল' পত্রিকায় নিজের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়মিত পাঠকদের সামনে তুলে ধরে সে। শ্বাপদ সনে পড়ার মাধ্যমে তার সাথে পরিচয় হয়েছিল বছর দশেক আগে। এটা সেই হিসেবে শ্বাপদ সনের প্রিকুয়েল।
গল্পের শুরুটা হয় শিপলুর বন্ধু জালালের একটি উদ্বিগ্ন কল দিয়ে। নিখোঁজ হওয়া ছোট ভাই জাহিদ ফিরে আসার পর থেকেই জালালদের পরিবারে নেমে আসে এক অজানা আতঙ্ক। জড় বস্তুর মতন সারাক্ষণ বসে থাকে সে, যেন আগের মানুষটার কেবল একটা খোলস ফিরে এসেছে। বন্ধুর পরিবারকে এই ঘোর বিপদ থেকে উদ্ধারের দায়িত্ব নেয় শিপলু।
সেই সাথে যুক্ত হয় তৌকিরের গল্প। এটাই গল্পের মূল স্টোরিলাইন বা কাহিনীসূত্র। মেডিকেল পড়ুয়া এই যুবক এক অদ্ভুত বিভীষিকার সম্মুখীন। মাঝরাতে ঘুম ভাঙলেই হোস্টেল কক্ষের জানালায় এক বীভৎস অবয়ব দেখতে পায় সে। মানুষের মুখাবয়ব বিশিষ্ট পেঁচার মতো জিনিসটা। সেই সাথে তার রুমমেটও কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছে ইদানিং। এই মানসিক অস্থিরতা আর ভয় থেকে মুক্তি পেতে তৌকিরও শেষমেশ শরণাপন্ন হয় শিপলুর। লেখক যেভাবে সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চল আর বঙ্গদেশীয় তান্ত্রিকবিদ্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল আমি নিজেই বুঝি শিপলু এবং ক্ষেত্রবিশেষে গল্পকথকের অভিযানের সহযাত্রী উঠছি।
নাবিল মুহিতাসিমের সাবলীল গদ্যশৈলী বইটিকে গতিশীল রেখেছে পুরোটা সময়। তবে, মোহিণী চরিত্রটি গল্পে আরো ভূমিকা রাখলে খুশি হতাম। তবে যেটুকু সময়ই ছিল- এক কথায় বললে 'মোহনীয়'! শিপলুর সাথে তার রসায়নটা আরও বাড়তে পারত।
যারা অতিপ্রাকৃত বা ভয়ের গল্প পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই বইটি অবসরের দারুণ সঙ্গী হতে পারে। চমৎকার মানানসই প্রচ্ছদ করেছেন আরাফাত করিম, তাঁকেও সাধুবাদ।
প্রায় ৩০০ পাতার বই, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও গল্প ঝুলে পড়েনি। খুবই আনন্দ পেয়েছি পড়ে। ভৌতিক আবহ নির্মাণ ও উত্তেজনা সৃষ্টিতে লেখক বেশ সফল। শেষ অংশটা জমজমাট। এই কাহিনি নিয়ে ভবিষ্যতে কখনো সিনেমা নির্মিত হবে সেই আশা করতেই পারি।
কতটা মোহনীয় হলে একটা ২৭২ পৃষ্ঠার বই টানা পড়ে শেষ করতে পারি আমি? যদি সেটা হয় অনাহূত লেভেলের মতো ভালো।
অনাহূতের ফ্ল্যাপ পড়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই বই পড়তে হবে এক বৃষ্টিমুখর রাতে, নয়তো কাহিনীর অমর্যাদা হবে। সেই রাতটা যে আজই আসবে, ভাবিনি। সুতরাং সেই যে সন্ধ্যার ঝড়ের সময় নিয়ে বসেছিলাম, মাত্র হাত থেকে নামালাম। এবং বলতেই হচ্ছে এই লেভেলের অতিপ্রাকৃত হরর কাহিনী বহুদিন পড়িনি।
অনাহূত কে বা কারা? সহজ ভাষায় বললে, অনাহূত মানে এমন কেউ যাকে কেউ ইচ্ছা করে কামনা করে না বা ডেকে আনে না। কিন্তু তাও সে আমাদের জীবনে আসে। কারন তার উপস্থিতি আমাদের জন্য স্বস্তিকর না হলেও আমরা তার টার্গেট। আর এ কারনেই সে অনাহূত।
এই কাহিনী ১৯৮৯ সালের। শ্বাপদ সনে উপন্যাসের শিপলু তখন কাজ করে এক মাসিক পত্রিকায়, প্যারানরমাল ইনভেস্টিগটর হিসাবে বেশ জনপ্রিয় সে। একদিন হঠাৎ করেই দুইটা কেস হাতে চলে আসে। প্রথম কেসঃ তার বন্ধু জালালের ছোট ভাই জাহিদ বাড়ি থেকে পালিয়েছিলো। কিন্তু জালালের অনুরোধে যখন শিপলু ওদের বাড়ি গেলো, তখন সে দেখলো এই জাহিদ আসলে জালালের ছোট ভাই না, সে দেখতে জাহিদের মতো কিন্তু আসলে সে অন্য কেউ! দ্বিতীয় কেসঃ ঢাকা মেডিক্যালের এক ছাত্র তৌকির, হোস্টেলে থাকে। তার রুমের জানালায় প্রায়ই এসে বসে থাকে এক প্রাণী, সেই প্রানী দেখতে পেঁচার মতো কিন্তু তার মাথা মানুষের। এমনকি মানুষের ভাষায় সে ডাকেও তৌকিরকে।
তারপর কাহিনী যত আগায় আমরা পরিচিত হই সুন্দরী মোহিনীর সাথে। কাহিনীর জটিলতা বাড়তে বাড়তে ঘুড়ির সুতার মতো আমরাও চলে যাই সুদূর সিলেট, তারপর আসাম, তারপরে হয়তো সৃষ্টির অসীমে। লেখকের লেখনী এত ভালো, এত ভালো যে বইয়ের প্রতিটা পৃষ্ঠা যেন চোখের সামনে বন্দী হয়ে গেছে। আর সামান্য কাহিনীকে কোথায় থেকে কোথায় টেনে নিলেন! কী বলবো! লা জবাব।
শ্বাপদ সনে পড়ার পর এটা আমার পড়া নাবিল মুহতাসিমের দ্বিতীয় মৌলিক। এবং এই বইটা উনি এত ভালো লিখেছেন যে আমি ইমপ্রেসড। লেখকের কাছে একটা দাবি, প্লীজ শিপলু সিরিজটা কন্টিনিউ রাখুন। এরকম ভালো মৌলিক প্যারানরমাল কাহিনীর খুব দরকার আমাদের।
আজকে রাতে আর ঘুম হবে না। বই শেষ হয়ে গেছে কিন্তু আমি জানি ঘুমালেও আমার দুঃস্বপ্নে বারবার সেই পেঁচাকেই দেখবো... তবে এটাও ঠিক,এই দুঃস্বপ্ন দেখাতেও শান্তি আছে। এখানেই অনাহূতের সার্থকতা।
Wow!ঈদের ছুটির সাথে বোনাস হিসেবে বৃষ্টিমুখর এই সন্ধ্যায় বসে শেষ করলাম সুলেখক নাবিল মুহতাসিমের "অনাহূত "। আদর্শ শিপলু সাহেবের ফেরত আসা।হ্যাঁ বিভিন্ন ঈদসংখ্যায় শিপলুর " কেস স্টাডি" নিয়ে লিখা পড়লেও এবার আক্ষরিক অর্থেই ফেরত আসা কারণ শিপলুর ছোট ছোট গল্প মন ভরাতে পারছিল না।"শ্বাপদসনে" যেভাবে মুগ্ধতা ছড়িয়েছিল অনাহূত ঠিক সেরকম ই মুগ্ধতা ছড়িয়ে গেল।বৃষ্টির রাতে পড়তে পড়তে সিলেটের এক দুর্গম অঞ্চলের ঘটা অনাহূত বইটার ঘটনা যেন শিরশিরে অনুভূতি প্রদান করে গেল।লেখনী,ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা,কামাখ্যা মন্দিরের সেই ঘটনা সব ছিল টপ নচ। যে দুইজনের সমস্যা দিয়ে পুরো উপন্যাসটা তার মধ্যে একজনের শেষ পরিনতি টা পুরোপুরি ভাবে খোলাসা করলে পরিতৃপ্তি পেতাম।
শ্বাপদ সনের শিপলু আবার চলে এসেছে এই বইয়ে। তবে গল্পটা শ্বাপদ সনের আগের সময়ের। শিপলুর কেস নিয়ে পুরো গল্প। দুটো ঘটনার ঘনঘটা বেশ অদ্ভুত ছিল। একজনকে মনে হয় অপরিচিত আর আরেকজন তার নিকটস্থের পরিচিত জিনিস দেখে ভয় পায়। ভালো লেগেছে বইটা।
আদর্শির শাপুর শিপলু। পেশায় একজন সাংবাদিক। কিন্তু তার একটা নেশা আছে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সে একজন প্যারানরমাল ই���ভেস্টিগেটর। মাসিক হালচাল পত্রিকায় প্রতি মাসে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত ঘটনা নিয়ে কেস-স্টাডি প্রকাশ করে। তাও নিজ অভিজ্ঞতার।
একদিন হঠাৎ করে শিপলু'র বন্ধু জালাল ফোন দেয়। জালালের ভাষ্যমতে তার ছোট ভাই জাহিদ নিখোঁজ হয়ে যায়। কয়েকদিন পর যখন জাহিদ ফিরে আসে তখন তার আচার আচরণে বেশ পরিবর্তন আসে। এক দৃষ্টিতে কোনো একদিকে তাকিয়ে থাকে। আবার কোনো প্রশ্ন করলে আগেভাগে তার উত্তর দিয়ে দেয়। এমন পরিবর্তনে জালালদের পরিবার ভয় পেয়ে যায়। শিপলু কে অনুরোধ করে সে যেন সাহায্য করে।
তৌকির। মেডিকেল পড়ুয়া। একদিন হুট করেই দেখা হয়ে যায় শিপলু'র সাথে। তৌকির অনেকদিন ধরেই খুজছিল শিপলুকে। দেখা পেয়েই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। বেশ কয়েকদিন ধরে তৌকির এর ঘুম হচ্ছে না। যখনই ঘুম ভেংগে যায় তখনই সে দেখে তার রুমমেট এর মাথার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের চেহারাওয়ালা পেঁচার মত একটা জিনিস। তৌকির ভয় পেয়ে যায়। সে জানে না কি করবে। শিপলুকে অনুরোধ জানায় যেন সে এই রহস্যের সমাধান করতে।
আমার গ্রামের বাড়ির আশেপাশের পরিবেশ খানিকটা ভৌতিক। সন্ধ্যার পর থেকে চারিদিকে অন্ধকার হয়ে যায়। ঝোপঝাড় তো আছেই অনেক। গা ছমছমে একটা ভাব আসে। সাথে ছিল কাল বৈশাখী ঝড়। সর্বত্রই ঠান্ডা পরিবেশ বজায় ছিল। এমনি এক পরিবেশের সাথে "অনাহূত" দারুণভাবে মিশে গিয়েছিল। শিপলু'র এডভেঞ্চার এর সাথে নিজেকে ব্লেন্ড করে নিয়েছিলাম। সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলের বর্ণনা, তান্ত্রিকের বিভিন্ন ইতিহাস চমৎকার ভাবে দিয়েছেন লেখক।
নাবিল মুহিতাসিম এর লিখনশৈলী যে বেশ ভালো তা সবার জানা। সেটার ছাপ "অনাহূত"- বইয়েও ছিল। পড়তে গিয়ে বিরক্ত হই নি। তবে "মোহিনী"- ক্যারেক্টর এর প্রেজেন্স টাইম আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করি। শিপলু'র সাথে তার কেমিস্ট্রি টা আরো বিস্তৃত হওয়া দরকার ছিল।
ঈদের অলস সময়টা বেশ ভালোভাবেই কাটিয়েছি। সুপারন্যাচারাল, হরর জনরা অনেকের পছন্দ। ট্রাই করে দেখতে পারেন। তবে হ্যা কিছু কিছু জায়গায় প্রয়োজনে কিছু বর্ণনা একটু বেশিই চলে আসছিল। সব মিলিয়ে বইটা ভালো লেগেছে।
গেলাম তাহলে! পরে অন্য বই নিয়ে আলাপ সালাপ হবে। ভালো থাকবেন সবাই। বইয়ের সাথে ভালো সময় কাটুক।
বই : অনাহূত লেখক : নাবিল মুহতাসিম প্রকাশনা : চিরকুট প্রচ্ছদ : আরাফাত করিম
আদর্শির শাপুর শিপলুকে আপনারা চিনে থাকবেন। হালচাল পত্রিকার প্যারানরমাল বিভাগের লেখক, যেকোনো আধিভৌতিক ঘটনার তদন্ত বা তার কেস স্টাডির জন্য দেশের যেকোনো প্রান্তে, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেতে দ্বিধা করে না। তার কাছে ধ্যান জ্ঞান বলতে এ কাজই প্রাধান্য পায়। নানান মানুষ তাকে ফোন করে ব্যস্ত করে তোলে। যার কিছু ঘটনা নিতান্তই মামুলি হলেও বেশকিছু ঘটনা তাকে কৌতূহল করে তোলে। যা নিয়েও মূলত শিপলুর আগ্রহ আকাশচুম্বী। এভাবেই তার কাছে একটি কেস আসে। একটি বললেও আদতে কেস সংখ্যা দুটি। যা একটি অপরটির সাথে জড়িত হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে।
শিপলুর ছোটবেলার বন্ধু জালাল একদিন শিপলুকে কল দেয়, তাও অনেক বছর পর। শিপলু বাস্তবতায় বিশ্বাসী। জানে, প্রয়োজন ছাড়া তার সাথে অনেকের যোগাযোগ করার কারণ নেই না। তাই অতিরিক্ত আবেগ, অভিমান না দেখিয়ে পুরো ঘটনা শোনে। জালালের ছোট ভাই জাহিদ একদিন বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়। ঢাকা শহর তোলপাড় করেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তখন নব্বই দশকের সময়কাল। এত সহজ ছিল না যাত্রাপথ, কিংবা যোগাযোগের মাধ্যমের। ট্রাঙ্ক কলের মাধ্যমে আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সাথে যোগাযোগ করেও সুরাহা হয়নি সমস্যার। তারপর একদিন জাহিদ ফিরে আসে। কিন্তু যে ফিরে আসে, সে কি আসলেই জাহিদ?
জাহিদের সাথে আকাশ পাতাল তফাৎ তার। কেমন যেন পুতুলের মতো চলাফেরা। কিছু জিজ্ঞেস করলে রোবটের মতো উত্তর দেয়। কখনও প্রশ্নের আগেই উত্তর তৈরি থাকে। শিপলু দেখা করতে গিয়ে বেশকিছু রহস্যময় বিষয় লক্ষ্য করে। জাহিদের মানিব্যাগে কেন একজন শিশুর দুধের দাঁত কাগজে মোড়ানো? সিলেটে যাওয়ার ট্রেনের টিকিট জানান দেয়, ছেলেটা সিলেটে গিয়েছিল। কিন্তু কেন? জাহিদের আচরণ আতঙ্কিত করেছে তার পরিবারকে। শিপলুও দ্বিধাগ্রস্থ। তবুও বন্ধুর অনুরোধে কিংবা নিজের কৌতূহলে এর শেষ দেখার একটা প্রত্যয় চোখেমুখে ফুটে উঠেছে।
জাহিদের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়েই শিপলুর সাথে পরিচয় হয় তৌকিরের। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র, কিছুদিন পরই পুরোদস্তুর ডাক্তার হয়ে যাবে। তার সমস্যা অদ্ভুত। মাঝে মাঝেই এক ভয়ংকর স্বপ্ন তার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। বিশাল আকারের এক পেঁচা তার জানালায় এসে বসে। কিন্তু এতবড় যে পেঁচা হয়, জানা ছিল না। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, সেই পেঁচার মুখ যেন অবিকল মানুষের মুখ। এমন স্বপ্ন দেখলে ভয় পাওয়াটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? যেখানে স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে দ্বিধার দেয়াল ওঠে।
তৌকিরের আত্মীয় বলতে কেউ নেই। আছে এক দাদুভাই। যার কাছেই সে মানুষ। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা অদ্ভুত সব কারণে পরলোকগত। দাদু ছাড়া আর কেউ নেই তার। সেই দাদু একদিন ফোন করে অদ্ভুত কিছু প্রশ্ন করে। কোনো দুঃস্বপ্ন দেখা বা অদ্ভুত কিছুর সাক্ষী হলে যেন তাকে জানায়। কিন্তু তরুণ তৌকির তা আমলে নেয় না। তবে দাদু বলেছে, একুশ বছরের জন্মদিনের আগেই যেন তার সাথে দেখা করে। নইলে অনর্থ হয়ে যাবে।
পরিবারের সব গোপন কথা জানা যাবে সেদিন। শিপলু সাহায্য করতে রাজি হয়। সুদূর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাই যাত্রা করে ওরা। দাদুর কণ্ঠে জানতে পারে অদ্ভুত এক গল্প। যে গল্প শিহরণ জাগায়। সিলেট পেরিয়ে আসামের কামরূপ কামাখ্যা গিয়ে থিতু হয় সেই গল্প। যখন তৌকিরের দাদু মৌলবী নাজিব উদ্দিন কামরূপ কামাখ্যায় গিয়েছিলেন, তখন সীমানার বাঁধা ছিল না। ফলে সে গিয়ে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। আর নিয়ে এসেছিলেন এক ভয়ানক অভিশাপ। যার ফল তাকে ভোগ করতে হয়েছে। এখন এই অভিশাপের সামনে দাঁড়িয়ে বংশের একমাত্র অবলম্বন তৌকির।
তৌকিরকে বাঁচাতে তাই মৌলবী নাজিব উদ্দিন সাহায্য প্রত্যাশা করছে শিপলুর। শিপলুও সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু সে জানত না, কোন ভয়ংকর প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আরবের বিখ্যাত মিথ, ভয়ংকর এক অস্তিত্ব যখন বেরিয়ে এসেছে; তখন এই গল্পের শেষটা কেমন হবে, তার নিয়ন্ত্রণ লেখকের হাতেও থাকবে না। পাঠকের হাতেও না।
“অনাহুত” নব্বই দশকের সময়ের উপাখ্যান। শিপলু চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক সেই সময়টাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তখনকার সময়ের কিছুটা ছায়া লেখকের লেখায় উপস্থিত। সেই সময়কে ধারণ করে গল্পের মূল ভিত্তি পিছিয়েছে আরও। যখন দেশভাগ হয়নি। এক জমিদারপুত্র খেয়ালের বশে গুপ্তবিদ্যা শেখার ইচ্ছায় ঘর ছাড়া হয়। চলে যায় আসামের বিখ্যাত কামাখ্যা মন্দিরে। যার মধ্য দিয়েই এই গল্পের ভিত্তি রচিত হয়।
এখানে দুইটি রহস্য সমান্তরালে চলে। জাহিদের রহস্যময় আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে গল্পের শুরু হলেও মূল গল্পটা তৌকিরের। জাহিদ এখানে পার্শ্ব চরিত্র হয়ে ওঠে। পার্শ্ব চরিত্র হয়ে উঠলেও জাহিদের গল্পটা, ওর বদলে যাওয়া মানুষের ঈর্ষা, জেদ ও মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত দিক উন্মোচন করে। হারিয়ে যাওয়া জিনিস পাওয়ার তীব্র বাসনা যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে! কেউ কেউ প্রত্যাখ্যান পছন্দ করে না। সহ্য করতে পারে না। ফলে তার মনের মধ্যে যে পরিবর্তন হয়েছে, তার পরিণত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়। একই পরিবারের দুই সন্তান, জালাল ও তার ভাই। একই পরিবেশে বড় হয়েছে। অথচ ভাইয়ের চেয়ে জাহিদের এরূপ পরিবর্তনের কারণ কী? খুব সম্ভবত নিজের স্বপ্নের কাছে যেতে পারেনি বলে বদলে গিয়েছে। নেশায় আসক্ত হয়েছে। নিজের চারিত্রিক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ যখন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে না, কেউ কেউ বাস্তবতা মেনে নতুন জীবনকে মেনে নেয়। কেউ পারে না বলেই সমাজের অন্ধকারে ডুবে যায়।
জাহিদের ঘটনা এমন এক রহস্য, যার সমাধান আসলে বইতে হয়েছে কি না, এই দ্বিধা থেকে যায়। যদিও শেষ পৃষ্ঠার শেষ বাক্যে সকল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কিছু নেই। অথচ একটি বাক্যের মধ্য দিয়ে সকল প্রশ্নের উত্তর লেখক দিয়ে দিয়েছেন। দারুণ!
“অনাহুত” উপন্যাসের মূল গল্পটা আসলে তৌকিরের। আরও স্পষ্ট করে বললে, তৌকিরের দাদুর। তার তরুণ বয়সের ছেলেমানুষি, জমিদারপুত্রের বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া, গুপ্তবিদ্যা, জাদু রহস্যের খোঁজ থেকে একটা ভয়াবহ অভিশাপ নিয়ে ফিরে আসা! যার পরিণতি নাজিব উদ্দিনকে ভোগ করতে হয়েছে পরিবারসহ। কিন্তু একটা পর্যায়ে এর শেষ দেখতে হবে। আর কত বয়ে বেড়ানো এ অভিশাপ?
লেখক খুব যত্ন নিয়ে এই অংশটিকে ভিত্তি দিয়েছেন। পিছিয়েছেন আরও ৬০/৭০ বছর আগের সময়ে। ভয়ানক পরিস্থিতির গল্পগুলো দারুণ ছিল। কিছুক্ষেত্রে গা শিউরে ওঠা বা বিবমিষা জেগে ওঠার মতো ঘটনাপ্রবাহ ছিল। তবে ভালো লেগেছে। বিশেষ করে প্রাচীন, আরবিক এক মিথলজিকাল ভয়ংকর চরিত্রকে এর সাথে জুড়ে দেওয়া বেশ চমকপ্রদ। এই ধরনের গল্প তন্ত্রমন্ত্র এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমন সব গল্প এ কারণে পড়তে বিরক্তি এসে যায় মাঝে মাঝে। তবে লেখক সূক্ষ্মভাবে তন্ত্রমন্ত্রের বিষয় এড়িয়ে গিয়েছেন বলে ভালো লেগেছে।
“অনাহুত” খুব যে টানটান থ্রিলার এমন না। খুব বেশি চমকও এতে অনুপস্থিত। লেখক মূলত গল্পের উপর নজর দিয়েছেন। ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেছেন যথাযথভাবে। এর মধ্য দিয়েই কাহিনি এগিয়েছে। আমরা মূলত শিপলুর বয়ানে গল্পগুলো জানতে পারব। উপন্যাসে থাকা দুটি আলাদা আলাদা রহস্যের একসাথে সমন্বয় করাটাও ভালো লেগেছে। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে লেখকের লেখনশৈলী। মোহনীয় লেখার জাদুর কারণে পড়তে অসুবিধা হয় না। সাবলীল বাচনভঙ্গি, সহজবোধ্য ভাষায় পাঠককে আকৃষ্ট করার গুণ লেখকের আছে।
লেখকের লেখায় একটি বিষয় লক্ষণীয়। তিনি ছোটখাট ডিটেইলিংয়ের দিকে নজর দেন। ফলে কিছুক্ষেত্রে ঘটনাপ্রবাহ ধীর হয়ে পড়ে। আবার মনে হতে পারে অনেক কিছুই আসলে অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে এর প্রয়োজনীয়তা পরিলক্ষিত হয়। আবার এমন ছোটখাট ডিটেইলিংয়ের কারণে আমার পড়তে ভালো লাগে। একটা উদাহরণ দিই — শেষ দৃশ্যের সময়ে যখন তৌকিরের দাদুর কাছে শিপলু যাচ্ছিল, তখন দেয়ালে থাকা তলোয়ারের একটা আছে, একটা নেন এমন একটা বর্ণনা ছিল। মনে হতে পারে অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু এখানেই এর প্রয়োজনীয়তার আভাস লেখক দিয়েছিলেন। যার প্রমাণ শেষে পাওয়া যায়। এ কারণে লেখকের লেখা পড়তে গিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া গেলেও, অধৈর্য হওয়া যাবে না। কেননা কোনো এক সময় লেখক ঠিকই উত্তর দিয়ে যান।
যেহেতু লেখক নব্বই দশকের সময়টা ধরেছেন, আমার মনে হয়েছে চাইলে সেই সময়টাকে চাইলে আরও ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। গল্পের প্রয়োজনে যতটুকু দরকার, ততটুকু অবশ্য লেখক এনেছেন। তারপরও আরেকটু বিস্তারিতভাবে সময়কে ধরে রাখার প্রয়োজন ছিল। একইভাবে দেশভাগের আগে সময়কেও সেভাবে ধরার ইচ্ছা লেখকের মধ্যে দেখা যায়নি। লেখক কেবল তার গল্পের যত্ন নিয়েছেন, চরিত্রগুলোর পরিচর্যা করেছেন।
উপন্যাসের সবচেয়ে ভালো লেগেছে চরিত্র গঠন। খুব বেশি চরিত্রের বহর ছিল না। তবে যেটুকু ছিল, প্রতিটি চরিত্র বেশ গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছিল। কিছু কিছু চরিত্র অল্প সময়ের জন্য এলেও, তাদের গুরুত্বও সমানভাবে ছিল। শিপলুকে যেভাবে লেখক পেশাদারিত্বের আবহে মুড়েছিলেন, বেশ দারুণ। তৌকির এখানে উচ্ছ্বল তরুণ যে ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র। তৌকির দাদুর গাম্ভীর্য বইয়ের সকল আলো কেড়ে নিয়েছিলেন। ব্যক্তিত্ব বলেও একটা বিষয় থাকে, যা নাজিব উদ্দিনের প্রবলভাবে আছে।
তবে মোহিনীর মোহনীয় জাদুতে সবকিছুই অম্লান। এমনকি যে পেশাদারিত্বের মোড়কে শিপলু রহস্যের খুঁজে ছুটে, সে-ও যেন হৃদয়ের উত্তাল হয়ে যাওয়া শুনতে পায়। খুব বেশি সময়ের জন্য মোহিনীর উপস্থিতি ছিল না। তবুও যেন গল্পের প্রয়োজনে তার উপস্থিতি মুল্যবান ছিল। বিশেষ করে যে হৃদয়ের তোলপাড়ে বিদ্ধ হয়েছিল শিপলু। একজন মোহিনীর কাছে এভাবেই তো শক্তসমর্থ যুবা পুরুষ থমকে যায়।
শেষের অংশটা বেশ ভালো লেগেছে। বিশেষ করে ভয়ংকর সে অস্তিত্বের মুখোমুখি হওয়া। লেখক এমনিতেই আক্রমণাত্মক বিষয়গুলো ভালো লিখেন। এখানেও দারুণভাবে লিখেছেন। যদিও গল্পের গাঁথুনি দিয়ে, এর গতিপ্রকৃতি পরিচালনা করার পর এর শেষ দৃশ্যের ভূমিকা নিতান্তই সামান্য। তারপরও যতটুকু প্রয়োজন ছিল, সেভাবেই সমাধান হয়ে রহস্যের। হুট করেই শেষ করে ফেলেননি কাহিনির অংশবিশেষ। বরং এখানেও যত্ন নিয়ে, পরিকল্পিতভাবে সমাপ্তি টেনেছেন। ফলে আরও বেশি তৃপ্তিদায়ক হয়ে উঠেছে বইটি।
চিরকুট প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এ বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি ভালো। সামান্য কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ছাড়া বাকি ঠিকঠাকই লেগেছে। সম্পাদনা ঠিক ছিল। বাঁধাই বেশ ভালো হয়েছে। প্রচ্ছদটাও দারুণ। এমন এক শিরশিরানি অনুভূতি দেওয়া বইয়ের প্রচ্ছদ এমনই হওয়া উচিত।
পরিশেষে, শিপলু চরিত্রকে আগেই মনে ধরেছিল। এবার যেন আরও পরিণত হয়ে শিপলু সামনে এসেছে। পাঠক হিসেবে চাওয়া, আধিভৌতিক তদন্তের কেস স্টাডি নিয়ে আবারও শিপলু সামনে আসুক। লেখক নিশ্চয় ভেবে দেখবেন বিষয়টা।
যদিও বইটা শেষ করেছি আরো দুইদিন আগে কালবৈশাখী ঝড়ের রাতে।
বিখ্যাত প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর ও সাংবাদিক আর্দশির শাপুর শিপলুর প্রথম ঘটনা "অনাহূত", কিন্তু সিরিজের বই হিসেবে এটি দ্বিতীয়। শিপলু একজন অলৌকিক রহস্য-সন্ধানী, তাই অলৌকিক ঘটনাগুলো তার কাছেই ধরা দেবে—এটাই স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ যা বুঝতে পারে না, তা সে বুঝতে পারে অনায়াসে। কাহিনি শুরু হয় দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। একটি সাধারণ দৃষ্টিতে সাদামাটা ঘর-পালানো ঘটনা, আরেকটি ভয়াবহ-অলৌকিক সত্তার আগমন। ছেলেবেলার বন্ধুর ভাই হঠাৎ কোথায় যেন চলে যায়, কেউ জানে না। আবার হঠাৎ করেই ফিরে আসে! কিন্তু যে ফিরে আসে, সে কি সত্যিই সেই মানুষ, নাকি অন্য কেউ? নাকি অন্য কিছু?
এদিকে ঢাকা মেডিকেলের এক ছাত্র, ভবিষ্যৎ ডাক্তার তার হোস্টেল রুমের জানালা দিয়ে দেখে বিশাল আকারের, মানুষের মাথাযুক্ত এক পেঁচা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভয়ংকরসব দুঃস্বপ্ন। এই ভয় থেকে মুক্তি পেতে তৌকির শিপলুর সাহায্য চায়। সাহায্য করতে শিপলু প্রস্তুত। তবে এর জন্য তাকে যেতে হবে সিলেটে- তৌকিরের দাদাবাড়িতে, এবং সাক্ষাৎ করতে হবে তৌকিরের দাদু মৌলবি নাজিব উদ্দিনের সঙ্গে। জানতে হবে কী ইতিহাস লুকিয়ে রেখেছেন তিনি সবার কাছে থেকে, কী অভিশাপ বহন করেছেন আসামের কামরূপ কামাখ্যা থেকে ফিরে আসার পর থেকে! কাহিনি যতই এগুচ্ছিল, ততই উত্তেজনা বাড়ছিল। পরবর্তীতে কী ঘটবে, কী আসছে, সামনে কী অপেক্ষা করছে জানার ব্যকুলতা পরের পৃষ্ঠা উল্টাতে বাধ্য করছিল। কারণ আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কী হতে যাচ্ছে। সিলেট থেকে আসাম পর্যন্ত যাত্রা, নানান অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কাহিনির এগিয়ে চলা, শেষটায় এসে সব কিছু এক সুতোয় গেথে ফেলা- সব কিছু মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য ছিল।
4.5/5 নাবিল ভাইয়ের এরকম অতিপ্রাকৃত গল্পই লেখা উচিত। শুরুতে অত ভাল লাগছিল না। বাট কামাখ্যার গল্প শুরু হবার পর থেকে একদম পয়সা উসুল। শেষের টুইস্ট টা বেশ মজাদার। এই বইটা আবহাওয়া নির্ভর বই। বৃষ্টির রাতে পড়লে আরো চরম ফিল পাওয়া যাবে। কয়েক জাগায় লজিক্যাল লুপহোল আছে। শিপলুর সাথে মোহিনীর সম্পর্কটা আরো ডেভেলপ করা দরকার ছিল। তবে লেখকের লেখনি যে অনেক পরিশীলিত হয়েছে সেটা লক্ষণীয়। আশা করি পড়ের বইগুলা আর ভাল করবেন লেখক। বইটার যদি ভালো মুভি বা সিরিজ অ্যাডাপটেশন করা যায় তাহলে ভালো হবে।
সন্ধ্যা ছয়টায় বইটা পড়া শুরু করেছি। সংসারের কাজ সেরে, মাঝে এটা-সেটা করে—বইটা রাতের ২টা পর্যন্ত পড়ে তবেই ঘুমাতে গেলাম।
এখানে জীবনসঙ্গীকে একটা ধন্যবাদ দেওয়াই যায়। রাতে আমার জন্য 'Peace offering' হিসেবে cold coffee নিয়ে এসে তিনি দুটি কাজ করেছেন—এক, এই পহেলা বৈশাখে আমাকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে না যাওয়ার ও রাতভর ফিফা (FIFA) নিয়ে পড়ে থাকার পাপ মোচন করেছেন; আর দুই, আমাকে অনেকদিন পর এমন আয়েশ করে রাত জেগে বই পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
যাই হোক, আবার আজ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা ০৬ মিনিট পর্যন্ত পড়ে বইটা শেষ করলাম। শেষ কবে এভাবে বুঁদ হয়ে কোনো বই শেষ করেছি জানি না। গত বছরের কথা ভুলে গেছি, তাও কেন যেন মনে হচ্ছে গত বছর থেকে এই বছর পর্যন্ত যত বই পড়েছি, এটিই তাদের মধ্যে সেরা।
বইটা কেনার কোনো ইচ্ছাই ছিল না কারণ লেখককে চিনতাম না। কিন্তু ছোট ভাই বলেছিল, আমাদের একটু নতুন ধরনের কিছু বা নতুন লেখকের লেখা পড়া উচিত। সেই ভাবনা থেকেই কেনা। পুরো বই জুড়ে আমার মধ্যে এক তীব্র কৌতূহল কাজ করছিল—কী হবে না হবে জানার জন্য। আমি ওভাবে ভয় পাই না, কিন্তু পুরো টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে বইটা পড়া শেষ করেছি।
এখন তো আমার 'শ্বাপদ সনে' পড়াই লাগবে! 😅
কাহিনী খুবই সরল-সোজা। আদর্শির শাপুর শিপলুর (এরকম উদ্ভট নাম কখনও শুনিনি, পড়িনি আর আমি ১০০ ভাগ নিশ্চিত যে নামটা আমি ভুল উচ্চারণ করছি) কাছে দুটো অতিপ্রাকৃত ঘটনা আসে আর তিনি সেগুলোর তদন্তে নেমে পড়েন। আমরা সবসময় ভাবি এসব ঘটনার কোনো একটা নিশ্চিত ব্যাখ্যা থাকবে, আমিও তেমনই ভেবেছিলাম। কিন্তু এবার বাচ্চাদের মতো কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছাড়াই অলৌকিক সমাপ্তিটা আমি খুব খুশি মনে মেনে নিয়েছি। এই বইয়ে উদ্ভট ও বিরক্তি লাগার একটাই জিনিস হল - নারী জাতির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিষয়ক আলোচনা। ছেলে মানুষের ভালো লাগতেই পারে, মেয়ে হয়ে আমার লাগে নি।
এসব বাদ দিয়ে যদি বলি গল্প বলার ধরন? এক কথায় অসাধারণ ! লেখকের লেখা আরও পড়ার ইচ্ছা আছে। পয়সা উসুল করা একটা বই কেনা হয়েছে। Office ফাঁকি দেয়া সার্থক 😅
আর্দশির শাপুর শিপলুর সাথে পরিচিত হয়েছিলাম "শ্বাপদ সনে" বইয়ে৷ অনাহুত বইয়ে আবারও শিপলুর দেখা। শিপলুর দুটো কেস স্ট্যাডি নিয়ে এ উপন্যাস। একদিন স্কুলের বন্ধু জালালের ফোনকল পায় শিপলু। তার শান্তশিষ্ট ভাই জাহিদ হঠাৎ ই নিখোঁজ হয়। খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান পাওয়া যায় না। হঠাৎ একদিন নিজে থেকেই ফিরে আসে। কিন্তু তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সেটার উত্তর পেতেই জালালের অনুরোধ শিপলুর কাছে। যে বা যেটা ফিরে এসেছে জাহিদের বেশে, সে কি আসলেই জাহিদ?
ঢাকা মেডিকেলের মেধাবী ছাত্র তৌকির। মেডিকেলের ছাত্র ছাত্রীরা নানাবিধ মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকে। তবে তৌকিরের সমস্যাকে আদৌ মানসিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঘুম ভাঙলেই সে দেখতে পায় তার জানালায় বিভৎস্য আকৃতির এক প্রাণী। কিন্তু কেন? অবশেষে সে শরণাপন্ন হয় প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর শিপলুর। দ্বিমুখী দুই ঘটনায় জড়িয়ে যায় শিপলু।
ব্যক্তিগত মতামত: আমি হরর, অতিপ্রাকৃত জনরার বই পড়তে পছন্দ করি। শ্বাপদসনে পড়ার পরে অনাহুত পড়ার আগ্রহ এজন্য বেশিই ছিলো। সত্যি বলতে আমি কিছুটা হতাশই হয়েছি। দুটো ঘটনাপ্রবাহ পাশাপাশি আগালেও মূলত আকর্ষণীয় ছিলো তৌকিরের ঘটনা এবং আগ্রহ জাগানিয়া চরিত্র "তৌকিরের দাদু"। তৌকির দাদুর ব্যাকস্টোরি জানার আগ্রহই বেশি ছিলো। সত্যি বলতে সেটা আমাকে কিছুটা হতাশই করেছে। কমবয়সের খেয়ালে ঘর ছাড়া.. খ্যাপাটে সাধু.. শাপ এ অবধি গতানুগতিক ধারায় আগালেও লেখক এক টুইস্ট এড করেছেন। " ঘুল" চরিত্রকে এনে। তবে এখানেই আমার হতাশা। কারন গল্পের গরু গাছে ওঠে, এজন্য যে গরুকে গাছে উঠিয়ে পাতা খাওয়াতে এর কোনো মানে নেই। "ঘুল" চরিত্রটাকে যেভাবে অতি দানবীয় এবং ক্ষমতাবান হিসেবে দেখানো হয়েছে, মিথ এবং লেজেন্ড অনুযায়ী তা আদৌ এতো ক্ষমতাবান না। এক ইন্ডিয়ান টিভি সিরিজ আছে ঘুল নামে। সেটা অতিরঞ্জিত হলেও উপভোগ্য। এখানে এতটাই অতিরঞ্জিত যে আমার ক্ষেত্রবিশেষে মনে হচ্ছিলো কোনো শক্তিশালী দেবতার বর্ণনা পড়ছি। অবশ্যই ব্যক্তিভেদে মত ভিন্ন হয়। যেহেতু ফিকশন, কেউ কেউ উপভোগ করবেন অবশ্যই। তবে আমার ভালো লাগেনি। এমনকী শেষের ফাইট সিন ও না তবে, জাহিদের ঘটনা এবং টুইস্ট ভালো লেগেছে। বেশ ইন্টারেস্টিং।
পজিটিভ দিক: লেখকের লেখনশৈলী ভালো। এজন্য পড়তে গিয়ে আটকায় নি কখনো। কাহিনি বিন্যাস এবং চরিত্রায়ন সুন্দর। মোহিনী চরিত্রটাও বেশ ইন্টারেস্টিং
[বইয়ে ২২ পাতায় তৌকির নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলে সে ঢাকা মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আবার ৩০ পাতায় বলা হয়েছে সে পঞ্চম বর্ষে উঠলো কেবল। এটা সম্পাদনার ত্রুটি বলে মনে করি৷ প্রকাশনীর এমন ভুলের দিকে খেয়াল রাখা উচিত]
This entire review has been hidden because of spoilers.
সাড়ে তিন আসলে। পড়তে ভালো লেগেছে। ‘শ্বাপদ সনে’র নাবিল মুহতাসিমকে অনেক দিন পর খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে একটা খটকা আছে। খটকাটা হচ্ছে ‘সময়’ নিয়ে। 'অনাহূত'র সময়কাল ১৯৮৯। কিন্তু পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে আমি ৮৯ এ নেই, আছি নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে বা ২০০০/১/২ এ। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে টেলিফোনের এভেইলেবিলিটি, ট্র্যাফিক জ্যাম, হাল ফ্যাশনের ছেঁড়া জিন্স, হলে থাকা সাধারণ ছাত্রের ঘরের দেয়ালে মাইলসের পোস্টার (আমার জানা মতে, মাইলস জনপ্রিয় হয় ১৯৯১ সালে এর প্রথম বাংলা অ্যালবাম প্রকাশের পর)। এরকম আরও অনেক আছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এ আর এমন কী! কিন্ত��� আমার কাছে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাহিত্যে সময় জিনিষটা খুবই তাৎপর্যের। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হুহু করে সময় বদলেছে (এখনও বদলাচ্ছে)। এক দশকের পরিবর্তন মানে বিরাট কিছু। ভালমতো খেয়াল করলে দেখা যায়, এক দশক থেকে পরের দশকের মধ্যেকার পার্থক্যগুলোই মূলত জাগতিক সবকিছুকে প্রভাবিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে, পরিচালনা করে। আর এখানে যেই খটকাটার কথা বলছি, সেটা তো আরও বিশাল, কেননা ৯০’এর দশকে বাংলাদেশের পরিবর্তনটা (স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র) শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছিল না, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। সেজন্য ৯০’এর দশকের শুরু এবং শেষটাকে এক করে দেখা সম্ভব হচ্ছে না।
শেষ করলাম অনাহূত বই টি ... খারাপ লাগে নি। ২৭২ পাতার বই হলেও একবারের জন্যেও বই ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করেনি । তবে, দুটো (বা তার বেশি) কথা বলতেই হবে, ১। গল্পে আরো একটা কেস ছিলো , লেখক খুব সযতনে তা আড়াল করে ফেলেছেন । একটা বাচ্চা মেয়ে, থেকে থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে , আমার মতে শিপ্লু সাহেব এটা নিয়েও কাজ করতে পারতেন। ২। জাহিদ এবং তৌকিরের সমস্যা টা এক সূতায় গাঁথা টা , নাহ ঠিক মিলল না ... কত হাজা��ে এটা সম্ভব যে, দুই প্রান্তের দুইজন মানুষের দুই রকম সমস্যা একবিন্দু তে ... নাহ , ঠিক অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছে। লেখক যেভাবে দুটো গল্প আলাদা আলাদা করে শুরু করেছিলো, শেষ টা সে ভাবে করতে পারলে আমার মনে হয় আরো বেশি অসাধারন লাগতো বই টি (আমি লিখে দিতে পারি, লেখকের সেই ক্ষমতা আছে, দুটি আলাদা আলাদা গল্প কে পাশাপাশি রেখে শেষ করা) । যাই হোক, আমি আমার মতামত দিলাম। আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে এটা একবসায় শেষ করে দেবার মতন বই। হ্যাপি রিডিং।
যেকোনো অতিপ্রাকৃত গল্পের প্রেক্ষাপট হিসেবে আশি-নব্বইয়ের দশকের চেয়ে ভালো সময় আর হয় না। এই গল্পের প্রেক্ষাপটও নব্বইয়ের দশক। গল্পের প্রধান চরিত্র এবং কথক শিপলু 'মাসিক হালচাল' পত্রিকার একজন সাংবাদিক। তবে তার কাজের ক্ষেত্রটা একটু ভিন্ন; সে দেশের নানান অলৌকিক এবং অপ্রাকৃতিক ঘটনা নিয়ে কাজ করে। দেশের যেকোনো প্রান্তে সে ছুটে যায় অতিপ্রাকৃত ঘটনার সন্ধানে। সেগুলোর পেছনের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে এবং পত্রিকাতে ফিচার হিসেবে প্রকাশ করে। দারুণ জনপ্রিয় এই সিরিজটার বদৌলতে দেশের অনেক মানুষই এখন শিপলুকে চেনে। ঘটনা শুরু হয় যখন তার ছোটবেলার বন্ধুর কাছ থেকে ফোন আসে। তার ছোট ভাই জাহিদ কদিন আগে হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। নব্বইয়ের দশকে আজকের মতো যোগাযোগ ব্যবস্থা এতো ... https://oputanvir.blogspot.com/2026/0...
মৌলবি নাজিব উদ্দিনের জবানিতে তাঁর তরুণ বয়সের গল্প শুরু হওয়ার পর থেকে আর পড়া থামাতে পারিনি—একটানা পড়ে গেছি। ‘শ্বাপদ সনে’র চেয়েও এই বইয়ের কাহিনি আমাকে বেশি মুগ্ধ করেছে।
দীর্ঘদিন পর এক বসায় কোনো বই শেষ করে উঠলাম। নাবিল মুহতাসিমের লেখা আগের চেয়েও বেশি এনগেজিং এবং হৃদয়গ্রাহী হয়েছে। পরিচিত কোনো লেখকের বইতে আমি সাধারণত পাঁচ তারা দিই না, কিন্তু এই বইতে না দিলে ভুল হয়ে যেত।