Jump to ratings and reviews
Rate this book

ডাকনাম ভুলে গেছি

Rate this book
অল্প কিছুদিনের মধ্যে গ্রামের অন্ধকারেও বিদ্যুৎ হানা দিলো। কানধরা বালকের মতো খাম্বাগুলো একটার পর একটা দাঁড়িয়ে পড়লো গাছের পাশে। রোদে তারা হাসে না, বাতাসে তারা দোলে না, অবিচল দাঁড়িয়ে থেকে শাস্তিভোগ করছে শুধু। পাখিরা এইসব খাম্বাগুলোকেও অবহেলা করে না, ওড়াওড়ি থেকে ক্ষণিক অবসর নিয়ে এখানে বসে পৃথিবীটাকে দেখে, নিজেদের মধ্যে আলোচনা সভা বসায়, খোশগল্প করে, অথবা দুটি পাখি গা ঘেঁষাঘেষি করে প্রেম করে, অভিমান ভাঙ্গে। সন্ধ্যায় অন্ধকারের পেট ফেঁড়ে আলো ফুটে উঠে গ্রামে, রাতের পাখিরা তখন বিভ্রান্ত হয়, পানকৌড়িটা ঘন ঘন পথ হারায়। গ্রামের প্রায় কেউই বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হল না, শুধু আমিই অন্ধকার পুষে বিদ্যুৎহীন রইলাম। গ্রামবাসীর কাছে আমার বাড়িটা আগের চেয়েও বেশি রহস্যময় এবং আরো বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো। ঘরে ঘরে আলো পৌঁছালেও মানুষের মনের গহীনে যে অন্ধকার ঘাপটি মেরে পড়ে আছে, একশো ওয়াটের বাল্বও সেই অন্ধকারের নাগাল পেল না।

272 pages, Hardcover

First published February 27, 2026

Loading...
Loading...

About the author

Obayed Haq

14 books325 followers
ওবায়েদ হকের জন্ম ১৯৮৬ সালে। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকেন কুমিল্লায়।
প্রকাশিত বইসমূহ-
উপন্যাস-
তেইল্যাচোরা (২০১৪)
নীল পাহাড় (২০১৫)
জলেশ্বরী (২০১৬)
কাঙালসংঘ (২০২১)
আড়কাঠি (২০২৪)
জল নেই পাথর (২০২৪)
উন্মাদ আশ্রম (২০২৫)
গল্প সংকলন-
একটি শাড়ি ও কামরাঙা বোমা (২০১৪)
নেপথ্যে নিমকহারাম (২০১৭)

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
43 (36%)
4 stars
54 (45%)
3 stars
20 (16%)
2 stars
1 (<1%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 30 of 49 reviews
Profile Image for Harun Ahmed.
1,809 reviews536 followers
Read
April 17, 2026
সত্যজিৎ রায়ের "নায়ক" সিনেমার বিখ্যাত সংলাপ হচ্ছে - 
"বিএ পাশ করা নায়িকার কখনো বিরহে গান গাওয়া উচিত না।"
"আর নায়ক হলেই দেবতুল্য লোক হওয়া উচিত না।"


হুমায়ূন আহমেদ তার সৃষ্ট "হিমু" চরিত্রের দেবতায়ন করেছিলেন মাঝপথে। প্রথমদিকের হিমুর মধ্যে কিন্তু সাধারণ মানুষের অনেক বৈশিষ্ট্য ছিলো। সে তখন নির্বাণ লাভ করার পথ অন্বেষণ করছিলো। পরে দেখা গেলো তার ফুঁ -তে বন্ধ্যা রমণীর গর্ভে বাচ্চাও জন্ম নিচ্ছে! সে সাধু থেকে সোজা দেবতাই হয়ে গেলো শেষমেশ। হিমু চরিত্রটির সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটেছিলো সেইসাথে। তার সাধুত্বে লেখক অনেক কৌতুকের উপকরণ রেখেছেন। ওবায়েদ হকের নায়করা এদিক দিয়ে অনেক কঠোর, বাসনাহীন; কিছু ক্ষেত্রে বাংলা সিনেমার রঞ্জিত মল্লিকের চাইতেও মহৎ। লেখক নায়কের চরিত্র নির্মাণে ক্লান্তিকরভাবে পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছেন। শুরু থেকেই প্রধান চরিত্ররা সাধু, তাদের কোনো রূপান্তর ঘটে না। ( সৈয়দ শামসুল হক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে যেয়ে বলেছিলেন, চরিত্রগুলো শুরুতে যে অবস্থায় থাকে শেষ পর্যন্ত তারা সে অবস্থায় থাকে না, এক ধরনের উত্তরণ ঘটে তাদের।)  "ডাকনাম ভুলে গেছি" কি আমার ভালো লাগেনি? অবশ্যই ভালো লেগেছে। চমৎকার, গোছানো ও জমজমাট কাহিনি। আগে ওবায়েদ হকের কোনো উপন্যাস না পড়া থাকলে মুগ্ধ হতাম নিঃসন্দেহে। কিন্তু এতো এতো পুনরাবৃত্তি দেখে ঠিক খুশি হতে পারছি না। লেখকের একজন ভক্ত হিসেবেই বলছি, উপন্যাসের চরিত্রচিত্রণ ও ঘটনাপ্রবাহে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন তার।
Profile Image for Sakib A. Jami.
385 reviews52 followers
March 9, 2026
গল্পের শুরুটা হয়েছে একটা খুনের মধ্য দিয়ে। ঠিক খুন না, একটি খুনের স্বীকারোক্তি। এই ঢাকা শহরে অনেক পাগল কিসিমের মানুষ আছে। নেশা করে টাল হয়ে থাকা মানুষেরও অভাব নেই। এমন অজস্র মানুষ পুলিশদের বিরক্ত করার জন্য থানায় গিয়ে অনেক গল্প ফাঁদে। এই মধ্যরাতের গভীরে এসে কেউ যখন বলে, বড় অফিসারের সাথে কথা বলতে চায়। সে একটা খুন করেছে! তবে কে-ই বা বিশ্বাস করবে?

এই গল্পটা বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে কয়েক দশক পিছনে। তখন ঢাকার আরমানিটোলায় বসবাস করত এক পরিবার। বাবা, মা ও সন্তানকে নিয়ে তাদের সংসার। বাবার পূর্বপুরুষ অনেক বেশি ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। অতীতে যাদের জমিদারি ছিল, বর্তমানে তাদের কিছু না থাকলেও সেই আভিজাত্য ঠিকই থাকে। যদিও বাইরে দিয়ে তা দেখা যায় না। কিন্তু মনের এই আভিজাত্য তার চারিপাশে একটা দেয়াল তুলে দেয়। যা খুব সহজে ভাঙা যায় না। নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কারো মুখাপেক্ষী হওয়া যায় না। স্কুলে শিক্ষকের চাকরি যার অবলম্বন।

একদিন বাবার হাত ধরে ছেলেটা স্কুলে ভর্তি হলেও তার সেই যাত্রা সুখকর হয়নি। নিশ্চুপ, শান্ত হাসান নামের ছেলেটা তাই স্কুলে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের শিকার। শিশু মন এখান থেকেই বদলে যায়। সঙ্গী খুঁজে বেড়ায়। অবশ্য তার জন্য নতুন সঙ্গী খোঁজার অবকাশ এসেছে। মা অন্তঃসত্ত্বা। তার একজন সঙ্গী হয়তো আসবে। কিন্তু সবকিছু বদলে যায় এক দুর্ঘটনায়। একদিন মাকে নিয়ে বাবা হাসপাতালে চলে যায়। ফিরে আসে একা। কিছুদিন পর মা-ও আসে। কিন্তু তার আর সঙ্গী পাওয়া হয় না। মা-ও যেন কেমন হারিয়ে গিয়েছে। মাকে সুস্থ করতে গিয়ে ঢাকার এই ভিটেমাটি বিক্রি করে দিতে হয়। তার ভাগ্যের এক গতিপথেই কি না! গ্রামের এক জমিদার বাড়িতে আশ্রয় হয় তাদের। কিন্তু সেখানে জন জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওদের তিনজনের পরিবার জীবন কাটাতে থাকে।

সেই ছেলেটার জীবনের গল্পটা নিয়েই ওবায়েদ হকের “ডাকনাম ভুলে গেছি” উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ। লেখকের সবচেয়ে দীর্ঘায়িত বই। ওবায়েদ হকের লেখা সবচেয়ে কোন দিকটি ভালো লাগে জানেন? তার উপমার ব্যবহার। তার লেখনশৈলীতে এক ধরনের ছন্দ আছে। আর উপমায় ভর করে প্রতিটি শব্দে, বাক্যে তিনি যেভাবে গল্প বলেন; অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে চলে যেতে হয়। পড়তে ভালো লাগে। এক ধরনের তৃপ্তি কাজ করে।

ঠিক যেখানে জমিদারবাড়ির গল্প বলেছেন লেখক, সেখানে কুসংস্কার আর ভয়ভীতি থাকবে না; তা তো হতেই পারে না। প্রাচীন এক জমিদারের ফুর্তির সাক্ষী ও এক গরীব দুঃখী নারীর হাহাকারের নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এ জমিদারবাড়ি। মাঝে মাঝেই এক অশরীরী অবয়ব দেখা যায়। কেউ ভিড়ে না এই বাড়িতে। কেউ মিশে না এই বাড়ির কারো সাথে। এখানে তিন মানুষের একাকীত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। তারচেয়েও প্রকট হয়ে ওঠে সেই আদিম ভয়। কাকে যেন দেখা যায় বাইরে, জমিদারবাড়ির সীমানায় থাকা জঙ্গলে?

এভাবেই একদিন মায়ের মৃতদেহ খুঁজে পায় ছেলেটা। তারপর বদলে যায় সবকিছু। বদলে যায় পারিবারিক বন্ধন। পরিবারের দৃঢ়তার সুতো সবসময় মায়ের হাতেই থাকে। কিন্তু যখন মা না থাকে সবকিছু এলোমেলো হতে শুরু করে। আর মায়ের এই প্রয়াণ সহ্য করতে না পেরে বাবাও যখন নিজের পথ খুঁজে নেয়, তখন হাসান একা হয়ে যায়। এই একাকীত্ব দুর করতে সে নিজের একটা জগৎ তৈরি করে নেয়। নিজেই কৃষক হয়ে ওঠে। গাছের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। বনের প্রাণীরা হয় তার আপনজন।

হাসানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। বাবার প্রচুর বই পড়ার অভ্যাসকে নিজের করে নিয়ে সেখান থেকেই শিখে সবকিছু। কিন্তু বই পড়ে কি আর ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করা যায়? কারো সাথে না মিশতে মিশতে অসামাজিক হয়ে যাওয়া কেউ মুখচোরা, নিষ্প্রাণ হয়ে ওঠে। এমন জীবনে ইখলাক হোসেনের মতো কেউ আসে। নতুন করে আলোর পথ দেখায়। কিন্তু একদিন প্রকৃতির বিচার বা রূঢ় বাস্তবতার কারণেই হয়তোবা হারিয়ে যায়। আমাদের জীবন তো এমনই! এই জীবনে মানুষের আসা যাওয়া লেগেই থাকে। কেউ ক্ষণিকের জন্য, কেউ সময়টা আরেকটু দীর্ঘায়িত করে।

এই গল্পের মোড় নেয় অন্যভাবে। হাসান একাকীত্বকে এমনভাবে বরণ করে নিয়েছে, তার স্বভাবে কিছুটা বন্য ভাব পরিলক্ষিত হয়। কারো সাথে মিশতে পারে না। নারী সত্তার সানিধ্য তো কখনোই পায়নি। তার মধ্যে একদিন তার জমিদারবাড়িতে আচমকা একটি মেয়ের আবির্ভাব হয়। হয়তো সেই মেয়ে, যার অবয়ব এই বাড়িকে ভৌতিক রূপ দিয়েছে। নাকি বাস্তব কেউ? অনেক কিছু জানা যায় মেয়েটা সম্পর্কে। সীমান্ত পার হয়ে যার যাওয়ার ইচ্ছে পাশের দেশে। কিন্তু সেই সুযোগ আর হলো না। প্রেমের আবেগ ভেসে নতুন প্রাণ নিজের মধ্যে বহন করে যে বিপদের পথে পা বাড়িয়েছে, হাসান তার জন্য যেন আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিয়েছে। নাহলে এমন একজন মেয়েকে একা পেলে নরপিশাচরা যে আরও হিংস্র হয়ে ওঠে।

আমি লেখককে সাধুবাদ দিবো দুইটা কারণে। প্রথমত, লেখকের বর্ণনা যেখানে দুর্দান্ত পাঠ অভিজ্ঞতা দিয়েছে। লেখকের লেখা একটা বিষয় লক্ষণীয়। তিনি সূক্ষ্ম বিষয়ের বর্ণনার দিকে বেশ গুরুত্ব দেন। ফলে পড়াটা প্রাণবন্ত হয়ে। প্রাকৃতিক বর্ণনায় লেখক অপ্রতিরোধ্য। গাছগাছালি, এর প্রাণীগুলো, তাদের আচরণ, অনুভূতিও লেখক ফুটিয়ে তুলেন দারুণভাবে। বন, জঙ্গল, প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার একটা পরিবেশ লেখক যেভাবে সৃষ্টি করেন, আমার কাছে বেশ উপভোগ্য মনে হয়।

দ্বিতীয়ত, লেখক তার চরিত্রদের এখানে দারুণভাবে উপস্থাপন করেছেন। খুব বেশি চরিত্র এখানে ছিল না। হাসান এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। তাকে জীবনে শুরু থেকে লেখক তুলে এনেছেন, একটা জীবন এখানে উন্মুক্ত হয়েছে। এর বাইরে হীরা নামের চরিত্রকেও লেখক বেশ ভালোমতো ফুটিয়ে তুলেছেন। এর বাইরে বেশকিছু ছোটখাট চরিত্র ছিল, যারা অল্প সময়ের জন্য এলেও বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছে। একটি চরিত্রও ফেলনা বা অযথা না। এই বিষয়গুলো একটি বইয়ের গুণাগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এই বইটা একটা শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। গল্পের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন সমাজকে, উপহাস করেছেন এর অসঙ্গতিগুলোকে। শিক্ষা ব্যবস্থার যে করুণ অবস্থা, তার দিকে লেখকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। স্কুলে নতুন সহপাঠীকে বুলি করা, মজা ওড়ানোর মতো ঘটনা কিন্তু মাঝে মাঝেই মনের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে। পাঠ্যবই কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার চেয়ে প্রকৃতির কাছে মানুষের শিক্ষাটা বেশি। মানুষ শিখেও বেশি এই পরিবেশে। বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের জ্ঞানকে সীমিত করে তোলে। আমাদের সমাজে পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য বই পড়াকে রীতিমতো ক্রাইম মনে করা হয়। অভিভাবকদের ভাবনা, এতে উন্নতি হয় না। অথচ লেখক দেখাতে চেয়েছেন এই বাইরের বই পড়া একটি মানুষকে কতটা জ্ঞানী করে তোলে। শিক্ষিত হওয়ার চেয়ে জ্ঞানী হওয়া উত্তম। তাছাড়া কোনো কাজ ছোটো নয়। মানুষের নিজ হাতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে হয়। অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে জীবন হয়তো চলে যায়, কিন্তু প্রকৃত স্বাদ কি পাওয়া যায়?

একজন কৃষককে এই সমাজ অবজ্ঞার চোখে দেখে। মূর্খ, অশিক্ষিত বলে মনে করে। অথচ লেখকের এই লেখাতে আমরা এমন এক কৃষক দেখতে পাই, কৃষক মাত্রই অশিক্ষিত বা মূর্খ না। বরং শিক্ষিত মানুষের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কাজে লাগাতে পারলে ভালো কিছু সম্ভব। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে কৃষকসত্তা চুপটি করে থাকে। যদিও অতিরিক্ত ভালোবাসা বা প্রত্যাশা এক সময় ঝড়ের কবলে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। সেখান থেকে আবারও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাটাই জীবনের লড়াই। তখন হয়তো সেই ভালোবাসাটা থাকে না।

এই উপন্যাসের এক পর্যায়ে ঘটনাপ্রবাহ একঘেয়েমি মনে হতে পারে।‌ তারপর থেকে গল্পের পরিবর্তন হয় হীরার আগমনে। একজন নারী মানুষের জীবনের অনেক কিছুই পরিবর্তন করে। যে মানুষটা একাকীত্ব ছাড়া কিছুই চিনত না, ধীরে ধীরে সে হয়ে ওঠে সহমর্মী। মানুষের প্রতি অনুভূতিশীল। হীরার গল্পটা অনেক দিক দিয়েই একাধিক অনুভূতি দিয়ে গিয়েছে। যেই মানুষটা সেই ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ঢাকা ছেড়েছিল, একজন মেয়ের জন্য সেই ঢাকাতেই যাওয়া!

আর সকল একঘেয়েমি দূর করে ঢাকার গল্পটা একাধিক রং ছড়িয়েছে। ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়েছে দৃশ্যের। যে খুনের গল্প দিয়ে উপন্যাসের শুরু, তার তার মূল উপজীব্য এখানে। যদিও এখানে লেখক পাঠকের ভাবনা নিয়ে খেলেছেন। একেকবার একেক রোমাঞ্চ উপস্থিত হয়েছে। স্থির হয়ে কিছু ভাবনা করার অবকাশ ছিল না। আর এভাবে শেষের দিকে যে অনুভূতি দিয়ে গল্পের হয়েছে, তার কোনো তুলনা হয় না।

পাঠক অনেক কিছু ভেবে নিতে পারেন। লেখকদের মধ্যে পাঠকের মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলা করার এক অদ্ভুত অভ্যাস আছে। আর কিছু হলেই কোনো চরিত্র মেরে ফেলতে চাওয়ার কারণ আমি ঠিক বুঝি না। কিছু মিলন না হওয়ার কারণে এ গল্প অনেক সময় মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হাসানের সাথে তার বাবার শেষ দেখা হওয়ার বাসনা ছিল। কিন্তু….

যদিও এই গল্পের অনেকটা জুড়ে হাসানের বাবার ভূমিকা আছে। না থেকেও তিনি তার দর্শনকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। বাবার আদর্শে তার বই পড়ার অভ্যাস আমার কাছে অমূল্য মনে হয়েছে। আমাদের অভিভাবকরা আমাদের হাতে বই তুলে দিতে চান না। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাদ দিয়ে যে বাবা অসীম জ্ঞানের ভান্ডার ছেলের হাতে তুলে দিতে তার নিশ্চুপ হয়ে থাকার পরও প্রভাবকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

ওবায়েদ হকের “ডাকনাম ভুলে গেছি” বইটা লেখকের সবচেয়ে বড় বই। তিনি লিখেছেনও দারুণ। কিছুটা মন খারাপের গল্প, বিষন্নতায় মোড়ানো অভিব্যক্তি বর্ণনাগুলোকে মনের মধ্যে গেঁথে যায়। এমন ভাষাশৈলী, বর্ণনার কারুকার্য, শব্দচয়নের মাধুর্য যেকোনো মাঝারি মানের বইকেও দারুণ করে তোলে। যদিও “ডাকনাম ভুলে গেছি” কিছুতেই মাঝারি মানের নয়। তার চেয়েও বেশি কিছু।

পরিশেষে, আমাদের এই জীবনে আমাদের প্রতিনিয়ত অভিনয় করতে হয়। এভাবে অভিনয় করতে করতে নিজেদের অস্তিত্ব কখনও হারিয়ে যায়। আমরা ভুলে যাই নিজেদের। হয়তো তখন অন্যের কাছে যে পরিচয়ে পরিচিত হই, নিজেদের ডাকনামটাই তখন বিলীন হয়ে যায় কোনো ইতিহাসের অভ্যন্তরে।

▪️বই : ডাকনাম ভুলে গেছি
▪️লেখক : ওবায়েদ হক
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৫/৫
Profile Image for Shaila Shaznin.
129 reviews13 followers
March 23, 2026
চাঁদরাতে পড়ে শেষ করলাম বইমেলা থেকে কিনে আনা ওবায়েদ হক এর উপন্যাসটি। অনেকদিন সময় নিয়ে ধীরে ধীরে পড়েছি বইটি।ওবায়েদ হক আমার পছন্দের লেখকদের মধ্যে একজন। স্বভাবতই বই দেখেই খুশি হয়েছিলাম এই ভেবে যে এতবড় বই লিখেছেন এবার!উনার লেখনীর গুণে ঝরঝর করে পড়া এগিয়ে যায়।
গল্পের শুরু হয় এক খুনের স্বীকারোক্তি থেকে। তারপর এই খুনের পিছনের ইতিহাস জানতে গিয়ে আমি মূল চরিত্রের সাথে একেবারে মিশে গিয়েছি বলা যায়। একজন মানুষ এতোটা ভালো কিভাবে হতে পারে?কেনো তার পরিচিত মানুষেরা এভাবে হারিয়ে যায়। হীরা,শাকের এর সাথে সাথে আমিও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি আর কৃতজ্ঞতা পোষণ করছি লেখকের প্রতি, এমন একজন বিশুদ্ধ মানুষকে দেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
একজন ডাকনাম ভুলে যাওয়া মানুষ থেকে সে এক নতুন পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠে। গল্পের শেষটা আমার মতো পাঠকের জন্য স্বস্তির। কেননা আমি কল্পনায় দেখতে পাই সব হারিয়ে নিঃসঙ্গ একাকী মানুষের জীবনে ছোট্ট এক শিশুর হাত ধরে আসে ভালোবাসা আর মুখরিত শৈশবের দিনগুলো, যে সঙ্গীর অপেক্ষায় সে একে একে সব হারিয়েছিলো সেই সঙ্গী খুঁজে পায় সে, অন্যরূপে।
বই পড়ে শেষ করে স্বভাবতই আরও একবার তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললাম।
Profile Image for Ghumraj Tanvir.
258 reviews12 followers
March 7, 2026
এত মায়াবী একটা কাহিনি।রিডার্স ব্লকে ছিলাম অনেক দিন।একটানে পড়ে ফেললাম বইটা।মাঝে মাঝে বিষন্নতা গ্রাস করেছিলো বইটা পড়তে গিয়ে।তবে সেই বিষন্নতায় ছিলো আনন্দের হাতছানি।
আহারে।কত মায়া ছড়িয়ে আছে বইটার অক্ষরে অক্ষরে।
Profile Image for Shuhan Rizwan.
Author 7 books1,146 followers
Read
March 26, 2026
প্রায় এক দশক তো হয়ে গেলো বোধহয়।

ওবায়েদ হকের উপন্যাস নিয়ে দীর্ঘ কোনো আলাপ করার সময় হয়েছে।
Profile Image for Shuk Pakhi.
541 reviews375 followers
March 16, 2026
উপন্যাসটিকে স্থানের ভিত্তিতে চারভাগে ভাগ করা যায়। ঢাকা, মহিমগঞ্জ, ঢাকা, মহিমগঞ্জ। প্রথম অংশের ঢাকা উপন্যাসের সূচনা হিসেবে ভালো ছিল। এরপর মহিমগঞ্জের অংশটা পড়ে একেবাড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। হাসানের নিঃসঙ্গতা, বাড়ির নির্জনতা, গাছ-গাছালির সবুজ, ওবায়েদ হকের ভীষণ সুন্দর গদ্য- সবটা মিলিয়ে যেন একটা দীর্ঘ কবিতা পড়লাম।
এরপরের ঢাকা অংশটায় মূলত উপন্যাসের শুরুর দিকের আলগা সুতোগুলো গিট দিয়ে কেটে দেওয়া হয়েছে। শাকের মাহমুদের সঙ্গে হাসানের ১মবার দেখা হওয়াটা ঠিকই আছে কিন্তু ২য়বার দেখা হওয়া এবং তারপরের ঘটনাগুলো ড্রামাটিক লেগেছে।
উপন্যাস শেষ হয়েছে মহিমগঞ্জে। মনে হচ্ছিল লেখক শেষটা আগেই ভেবে নিয়েছিলেন। শেষটা ঠিক ওভাবেই করা হবে ভেবে নিয়েই কি তবে হীরার আগমন হয়েছিল! যে অভিশাপ শুরু হয়েছিল সেটাকে সুন্দরভাবে শেষ করা হয়েছে। এবারের বইমেলায় কেনা প্রথম বইটি পড়ে দিল খুশ হয়ে গেছে।
এমন চমৎকার উপন্যাসের জন্য ওবায়েদ হককে সাধুবাদ। প্রচ্ছদ করেছেন ফায়জা ইসলাম, প্রচ্ছদটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে।
Profile Image for Samsudduha Rifath.
463 reviews26 followers
April 26, 2026
লেখক যেদিন প্রকাশকদের চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করবেন সেদিন উনি আবার ওবায়েদ হক হতে পারবেন। প্রথম অর্ধেক আর শেষ অর্ধেকে বিস্তর পার্থক্য। এতো সিনেমেটিক আর কাকতাল হজম করা খুবই কষ্টকর। শেষ তিনটা বইয়ে এরকম অবস্থা দেখে প্রিয় লেখকের জন্য যারপরনাই খারাপ লাগে।
Profile Image for Fatima  Tuz Saifa.
49 reviews29 followers
April 14, 2026
বহুদিন পর ওবায়েদ হকের কোনো বই পড়ে তৃপ্তি পেলাম। যদিও তার প্রতিটা বইয়ের ক্ষেত্রে যে কমন প্যাটার্ন তিনি ফলো করেন এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবুও অনেকদিন বাদে পড়লাম বলেই হয়তো বিরক্তি আসেনি তেমন ভাবে। নীল পাহাড়, জলেশ্বরীর পরে পছন্দের তালিকায় এই বইয়ের নাম উঠলো।
Profile Image for Momo.
8 reviews2 followers
April 14, 2026
সম্প্রতিক সময়ে গুণী লেখকদের তালিকায় ওবায়েদ হকের নাম অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। ‘জনপ্রিয়’ শব্দটি সচেতনভাবেই ব্যবহার করছি না, কারণ জনপ্রিয়তার ভিড়ে অনেক সময় গুণহীন লেখকরাও জায়গা করে নেন।

ওবায়েদ হক আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন লেখক। তাঁর গল্প বলার ভঙ্গি বরাবরই আমাকে আকৃষ্ট করে।
“ডাকনাম ভুলে গেছি” বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পটি যেন একটি চক্র। নিষ্ঠুরতা দিয়ে শুরু হলেও শেষটা মমতায় আবদ্ধ। এই মমতার মাধ্যমেই বহু বছরের পুরোনো কলঙ্ক মুছে যায়। যেন নতুন সূর্য উঠে চারপাশ আলোকিত করে, দূর করে সব অন্ধকারাচ্ছন্নতা।

বইটির প্রধান চরিত্র— যে মাঝেমধ্যে নিজের নামই ভুলে যায়। ছোটবেলা থেকেই সে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন, একাকী পরিবেশে বড় হয়েছে। কিন্তু এই একাকীত্ব তাকে গ্রাস করতে পারেনি। বরং সে প্রকৃতি ও জীবজগতের সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজের নিঃসঙ্গতা কাটিয়েছে। তাই এটি নিছক একাকীত্বের গল্প নয়; বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর প্রতীকী অর্থ, এমনকি সমাজের প্রতি সূক্ষ্ম এক উপহাসও।

তবে সমালোচনার জায়গাও রয়েছে। বইটি বেশ সিনেম্যাটিক, যেখানে ঘন ঘন নাটকীয় মোড় দেখা যায়। বিশেষ করে শেষের দিকে ছেলেটির সেই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কিছুটা অতিনাটকীয় মনে হয়েছে। যদিও এই নাটকীয়তাই বইটিকে উপভোগ্য করে তুলেছে, তবুও শেষাংশে এর মাত্রা একটু বেশি বলেই মনে হয়েছে।

আরেকটি বিষয় দৃষ্টিগোচর হয়েছে—শুধু এই বই নয়, লেখকের অন্যান্য বইয়েও পুরুষ চরিত্রগুলোর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।

সব মিলিয়ে, বইটি পাঠযোগ্য এবং উপভোগ্য। বইপ্রেমীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে হাইলি রিকমেন্ডেড। যদিও এর প্রয়োজন হয়তো নেই, কারণ বইটি ইতোমধ্যেই পাঠকমহলে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
Profile Image for Zoy Biswas.
33 reviews
March 20, 2026
Just one word
“Classic”

ওবায়েদ হকের এই বইটা সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি। সাধারণত তাঁর বইগুলো দ্রুত শেষ হয়ে যায়, কিন্তু আকারে বড় হওয়া সত্ত্বেও এটাও দুই দিনের মধ্যেই পড়ে শেষ করে ফেললাম।

তাঁর লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো পরিবেশ নির্মাণ। অনেক লেখক যেখানে গল্পের গতিকে বেশি গুরুত্ব দেন, তিনি সেখানে গল্পের আবহ তৈরিতে বেশি মনোযোগী। ফলে পড়তে পড়তে মনে হয়, আপনি নিজেই সেই পরিবেশের মধ্যে আছেন—প্রোটাগনিস্টের চিন্তা-ভাবনার ভেতর ঢুকে পড়েন।

“ডাকনাম ভুলে গেছি” বইটিতে চরিত্র নির্মাণ ছিল অসাধারণ। চরিত্র সংখ্যা কম হলেও প্রতিটি চরিত্রকে তিনি যথেষ্ট সময় ও গুরুত্ব দিয়েছেন, ফলে তারা একেবারে জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

বইটির সমাপ্তিটাও ছিল একদম পরিপূর্ণ।

অনেকদিন পর সত্যিই ভালো কিছু পড়লাম। সামনে তাঁর আরও লেখা পড়ার ইচ্ছা রইল।
Profile Image for তান জীম.
Author 5 books295 followers
June 7, 2026
ওবায়েদ হকের এ মেলার বই 'ডাকনাম ভুলে গেছি' বইয়ের ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে, চমৎকার একটা বই তবে এটা শুধু তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা তার বই আগে পড়েনি। যারা তার বইয়ের জন্য প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন তাদের এক্সপেক্টেশন উনি প্রতিবছর একটু একটু করে কমান। আলাদা করে তার এই বইটা অবশ্যই ভালো তবে ওবায়েদ হক তার বাবল থেকে বের হতে পারছেন তো নাই-ই বরং দিনকে দিন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যাচ্ছেন। তার নিয়মিত পাঠক হিসেবে এ বই আমাকে হতাশ করেছে।
Profile Image for K M Abrar.
31 reviews29 followers
March 12, 2026
গল্পের শুরু খুনের স্বীকারোক্তি দিয়ে। তখন মাথায় ভাবনা চলে আসে গল্পটা কোনো খুনির নয় তো? আমাদের চিন্তার মাঝেই লেখক গল্প এগিয়ে নিয়ে যান। স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে আমাদের হাজির করেন অতীত ঢাকার আরমানিটোলায়। যেখানে বাস করে ছোট্ট এক পরিবার। বাবা, মা ও তাদের একমাত্র ছেলে।

বাবার পূর্বপুরুষের একসময়ে জমিদারি থাকলেও এখন সেটা শুধুই ইতিহাস। বর্তমানে অবস্থা তাদের যেমনই হোক না কেন বাবার মাঝে বংশের আভিজাত্য ঠিকই দৃশ্যমান। এই আভিজাত্যই তাকে সংসারের দুরবস্থায়ও অন্যের সামনে হাত পাততে বাঁধা দেয়। পেশায় শিক্ষক বাবার হাত ধরেই ছেলেটার স্কুলে যাওয়া শুরু কিন্তু স্কুলের অভিজ্ঞতা তার জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। এটা বুঝতে পেরে স্কুল থেকে ছাটাই করে বাসায় তার পড়াশোনার ভার নিজেই নেয় তার বাবা। এরই মাঝে আসে পরিবারে নতুন অতিথির আগমনের খবর। ছেলেকে জানানো হয় সে খেলারসাথী পাচ্ছে।

হঠাৎ সবকিছু বদলে যায় এক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। বাবা মা-কে সাথে নিয়ে হাসপাতালে যায়। কয়দিন পর ফিরে আসে একা। এরপর মা নিজেও বাসায় ফিরে আসে তবে সাথে আসে না খেলার কোনো সাথী। হাসপাতাল থেকে এসে মায়ের জীবনও ঘটে যায় ছন্দপতন। সে যেন হারিয়ে থাকে কোথাও। এসবের মাঝেই তাদের ছেড়ে যেতে হবে ঢাকার ভিটে মাটি। কেননা এগুলো বিক্রি করে দিতে হয়েছে হাসপাতালের খরচ চালানোর জন্য।

কিন্তু ঢাকার জায়গা ছাড়ার আগেই তাদের কাছে চলে আসে গ্রামের জমিদার বাড়িতে যেয়ে থাকার সুযোগ। গ্রামের বিচ্ছিন্ন জমিদার বাড়িতেই শুরু হয় তাদের তিনজনের সংসার। এভাবেই গল্পের প্রবাহ আগাতে থাকে এবং ছেলেটার জীবনের বিভিন্ন প্লট পরিবর্তনের ছবি নিয়েই ওবায়েদ হক এঁকেছেন ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’ উপন্যাস।

একটা বইয়ে ঠিক কতটা মায়া জড়ানো থাকতে পারে আমার জানা নেই। তবে ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’ বইয়ের প্রতিটা অক্ষর যেনো মায়ায় জড়ানো। একটা সাধারণ পরিবারের ছেলেকে নিয়ে ওবায়েদ হক লিখেছেন মায়ায় জড়ানো অসাধারণ এক গল্প।

লেখকের সব থেকে বড় উপন্যাস ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’। লেখকের উপমার ব্যবহার, গদ্যের ছন্দ, বর্ণনাভঙ্গি ও চরিত্রায়ন উপন্যাসটাকে সার্থক করেছে। গল্পের পাতায় পাতায় ফুটে আছে গভীর জীবনবোধের কথা। লেখক তুলে এনেছেন স্বল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের মাঝে যে গাঢ় বন্ধুত্ব তৈরি হতে পারে তার কথা। ভালোবাসার জন্য মানুষ কোনো কিছুই তোয়াক্কা করে না এটাও যেন আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন।

বর্ণনার ক্ষেত্রে বড় ব্যাপারগুলোর পাশাপাশি লেখক যেভাবে ছোট ব্যাপারগুলোও তুলে ধরেন এই জিনিসটা খুবই কম দেখা যায়। এছাড়াও প্রকৃতির সাথে মানুষের যে নিবিড় সম্পর্ক বিভূতিভূষণের লেখায় পাওয়া যায় ঠিক তেমনই লক্ষ্য করেছি ওবায়েদ হকের লেখায়। আমার মনে হয় বর্তমানে প্রকৃতির বর্ণনা দেওয়ার ক্ষেত্রে ওবায়েদ হকের জুড়ি মেলাভার। পড়ার সময় মনে হচ্ছিল নিজেই যেনো প্রকৃতির অংশ হয়ে গিয়েছি।

উপন্যাসটা পড়তে যেয়ে কখনো হেসেছি, কখনো বা ডুবে গিয়েছি বিষন্নতায়। লেখকের ‘নীল পাহাড়’ যেভাবে মুগ্ধ ও তৃপ্ত করেছিল একইভাবে মুগ্ধ ও তৃপ্ত হলাম ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’ পড়ে। আমাদের জীবন, পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছুর গল্পই হয়ে থাকবে ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’।

আমার লেখা শেষ করবো বইয়ের একটা অংশ দিয়ে-
“মানুষ থেকে দূরে গিয়ে একা থাকা যায় না, বাবা, মানুষের মধ্যে গিয়েই একা থাকতে হয়। আমার গুরুর কথা। আমি তো শহরে, নগরে একা একা ঘুরে বেড়াই, যখন সঙ্গের প্র‍য়োজন হয় তখনই এই বনে চলে আসি।”
Profile Image for Jannatul Maowa.
36 reviews5 followers
April 2, 2026
ওবায়েদ হকের "নীল পাহাড়" পড়ার পর এবারে পড়লাম উনার সর্বশেষ বই "ডাকনাম ভুলে গেছি"।
বইটা হাসান নামের একজন একাকী ছেলেকে নিয়ে যার আবাস হল অভিশপ্ত জমিদারবাড়ি। কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ এই বাড়ির ত্রিসিমানায়ও ঘেঁষে না। লোকে তার নাম জিজ্ঞাসা করলে সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে স্মৃতি হাতড়ায়। তাকে নাম ধরে ডাকার মত কেউ নেই। তার বন্ধু হল বন্য পশু-পাখি, গাছপালা কিংবা খোলা আকাশ। কিন্তু মানুষের জীবন সবসময় একই স্রোতে যায় না। জমিদার বাড়ির অভিশাপ ঠেলে মানুষ একসময় ঠিকই এই বাড়ির চৌকাঠে পা রাখে। কিন্ত কিভাবে হাসান একা হয়, কিভাবেই বা সে সঙ্গী পায় তা জানতে হলে বইটি পড়তে হবে। শেষের কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। বইটি কেনা সার্থক।

পার্সোনাল রেটিং: ৪.৫
Profile Image for Saima  Taher  Shovon.
536 reviews221 followers
March 12, 2026
আমি টানা কিছু পড়তে পারছিনা বেশ কদিন হলো। কিন্তু এটা মোটামুটি এক বসাতেই( কয়েকটা বিরতি বাদ দিয়ে আরকি) শেষ করে ফেলেছি।
Profile Image for Mahadi Hassan.
140 reviews16 followers
March 7, 2026
কোনো একটা বই পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে শেষ করার মত আনন্দ খুব কমই আছে আমার কাছে। বহুদিন পরে আবার সেই আনন্দের অনুভূতি হলো ওবায়েদ হকের "ডাকনাম ভুলে গেছি" পড়ে।

বইটা মূলত প্রেমেরই উপন্যাস, কিন্তু প্রগাঢ় জীবনবোধের সুতো জড়িয়ে আছে পুরোটা জুড়েই৷ এ ধরনের উপন্যাস আজকাল বোধহয় খুব একটা লেখা হয় না। নিবিড় প্রকৃতির সাথে একাকী মানুষের এমন মায়ায় জড়ানো মিথস্ক্রিয়ার দেখা আমি পেয়েছি বিভূতিভূষণের উপন্যাস গুলোতে।

লেখক ওবায়েদ হকের বেশ কিছু লেখা আমি আগেও পড়েছি, ভালো লেগেছে প্রতিটাই। কিন্তু এটা তার আগের সব কিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে। ভাষায়, বর্ণনায়, উপমায়, কাহিনির বিন্যাসে... একটা নিখাঁদ বাংলা উপন্যাস।

সাহিত্যের কলাকৌশলে মধ্যে Personification এর প্রতি লেখকের খুব দুর্বলতা আছে। প্রায় প্রতিটা লাইনেই এটার এমন এমন সব ব্যাবহার করেছেন, মুগ্ধতা নিয়ে দুই তিনবার একই লাইন পড়া হয়েছে। আগের উপন্যাসের তুলনায় আয়তনেও বেশ বড়, প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার। ফলে তাড়াহুড়ো করে শেষের তাড়া ছিল না।

সবকিছু মিলিয়ে ভীষণ তৃপ্ত। হাইলি রেকমেন্ডেড।

রেটিং: ৫/৫
Profile Image for Nusrat Onnesha.
77 reviews
June 4, 2026
যতটা আশা ছিল ততটা জমল না।কিছু ব‍্যাপার অতিরিক্ত নাটকীয় লেগেছে।বাস্তব জীবনে এত কাকতালীয় ঘটনা ঘটেনা।

ওবায়েদ হকের উপমা প্রয়োগ করে লেখার ধরনটা ভালো লাগে বলে বইটা শেষ করতে পারলাম।
Profile Image for Dystopian.
503 reviews284 followers
July 19, 2026
হাসান সাহেবকে বইয়ের প্রথম পাতাতেই একরকম চিনে ফেলা যায়, অথচ শেষ পাতা পর্যন্ত তাকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। শৈশব থেকে যৌবন, এই লম্বা পথটা ওবায়েদ হক এমনভাবে পার করিয়েছেন যে মাঝখানে কোথাও সময় লাফ দিচ্ছে বলে মনে হয় না। মানুষটার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় তাকে ঘিরে থাকা সমাজের চোখও, সেই বদলটাই বইয়ের আসল ভার বহন করে।

চরিত্রগুলোর মধ্যে কোনো নায়কোচিত ভান নেই। প্রত্যেকের নিজের দুর্বলতা আছে, ভুল আছে, সেই ভুলগুলো নিয়েই তারা বাস্তব মনে হয়।

তার ভেতরের একটা জায়গা পুরো বই জুড়ে প্রায় নড়ে না, অথচ চারপাশটা বদলে যায় ক্রমাগত। এই স্থিরতাটাই লোকটাকে চেনা সহজ করে দেয়, তাকে বিশ্বাস করা যায়। ওবায়েদ হকের অন্য বইগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, তার প্রধান চরিত্ররা প্রায়ই এই একই ধরনের সংযত, ধৈর্যশীল মানুষ হয়ে থাকেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এটা দুর্বলতা মনে হয়নি আমার কাছে, বরং মনে হয়েছে এটাই তার লেখার একটা স্বাক্ষর, যদিও পরপর কয়েকটা বই পড়লে এই ছাঁচটা চেনা লাগতে শুরু করে।

ডাকনাম শব্দটাই আসলে বইয়ের কেন্দ্রে বসে আছে, কিন্তু এটা হারানোর গল্প না। শেষটায় গিয়ে বোঝা যায়, নামটা কোথাও হারিয়ে যায়নি, একটা নতুন পরিচয়ের সামনে শুধু তার আর দরকার পড়ে না।

শেষ পাতা উল্টেও এই বদলটা মাথায় থেকে যায়, কারণ সেটা কোনো ঘোষণা দিয়ে আসে না, আসে চুপচাপ, প্রায় টেরই পাওয়া যায় না কখন!
Profile Image for Musharrat Zahin.
453 reviews554 followers
May 24, 2026
গত বইমেলায় বের হওয়া বই পড়ে যতটা হতাশ হয়েছিলাম, তার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছি এই বইটা পড়ে৷ এত সুন্দর করে উনি কিভাবে লিখেন?
Profile Image for Afsan Ahmed .
61 reviews3 followers
April 1, 2026
বইটা শেষ করে একটা প্রশান্তি বয়ে গেলো। এইরকম বই বার বার চাই লেখকের কাছ থেকে।
Profile Image for Rehnuma.
483 reviews23 followers
Read
May 6, 2026
❛সমাজে বাস করেও অনেক সময় সামাজিক হওয়া যায় না। আবার একাকীত্বের রাজত্বে বাস করেও সমাজের সামাজিক মানুষগুলো থেকে ঢের বেশি সভ্য হওয়া যায়।❜


শেষ রাতে খিলক্ষেত থানায় হাজির হলো এক পুরুষ। এসেছে আত্মসমর্পণ করতে। বড়ো সাহেবের সাথে দেখা করবে। কিন্তু বড়ো সাহেবের কি কাজ এতই যে নিশির নিদ্রা ভঙ্গ করে থানায় ঝিমুবে? সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করো।
সকাল হতে হতে আমরা একটু অতীতের পাতায় ঘুরে আসি।

রূপকথার রাজা রানীর গল্পগুলো শুরুই হয় ঠিক এভাবে, ❛এক যে ছিল রাজা.... মস্ত তার প্রাসাদ...❜

আমাদের অতীতের গল্পও এভাবেই কিছুটা শুরু হোক।

শেখ বাড়ির এক কালে ছিল বিশাল প্রতিপত্তি। সম্পত্তি, নামের অভাব ছিল না। জমিদারি হয়তো তাদের র ক্তেই ছিল। তাইতো শেখ বাড়ির এক পুরুষ মামলা মোকদ্দমায় জমিজমা খুঁইয়ে শুধু শেষ সম্বল হিসেবে ছিল আরমানিটোলার একখানা বাড়ি। সময়ের সাথে বাড়ির জৌলুস মলিন হয়েছে, দেয়ালে ফাটল ধরেছে, অর্থে টান পড়েছে কিন্তু ঐ জমিদারির মনটায় কোনো মরচে ধরেনি।
শেখ বাড়ির পুত্র তাই অতীত গৌরবকে পুঁজি করেই চলে। তবে সেই পুঁজিতে গল্পের পেট ভরলেও মনুষ্য পেট মানে না। পেটের দায়ে আর স্ত্রী পুত্রের মুখে অন্ন তুলে দিতে তাকে তাই স্কুলের মাস্টারি করতে হয়।

পাতে আমিষের অভাব থাকলেও পরিবারে শান্তি তখনো ছিল। ছোট্ট পুত্র হাসান বাবার ইজি চেয়ারে বসে বই পড়া আর মায়ের ভেজা চুলে রান্নাঘরে রান্না করার নিত্য রুটিন নিয়ে বেশ যাচ্ছিল।

একদিন বাবার হাত ধরে সে পা রাখলো বিদ্যালয়ের আঙিনায়। শিক্ষালাভ করার এই স্থান তার মনে ভীতি সঞ্চার ব্যতীত কিছুই করতে পারল না। বিদ্যালয়ের সহপাঠীদের বিরূপ আচরণ আর নিজের চাপা স্বভাব মিলে বিদ্যালয় যেন এক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার নাম। বাবাও বুঝলেন হয়তো। তাই স্কুল শিক্ষক হয়েও ছাড়িয়ে আনলেন পুত্রকে স্কুলের গণ্ডি থেকে। হাসানের জীবনে শুরু হলো অন্যরকম এক শিক্ষা। কিন্তু জীবনের সবথেকে অবাক করা শিক্ষার মুখোমুখি হতে তখনো দেরি।

বাসায় হাসানের একাকীত্বের সঙ্গী হিসেবে আগমন হবে এক ছোট্ট শিশুর। হাসান প্রতীক্ষায় থাকে। একদিন বাবা তড়িঘড়ি করে মাকে নিয়ে হাসপাতাল যায়। দিন যায় বাবা ফেরে না মাকে নিয়ে। সঙ্গীও আসে না।

একদিন মলিন মুখে বাবা ততোধিক মলিনমুখী মাকে নিয়ে ফিরলেন। আসলো না কোনো নতুন সঙ্গী। মায়ের চিকিৎসায় অভাবের এই সংসারের শেষ সম্বল বাড়িটাও নাকি জমিদার বংশের বাবাকে বিকিয়ে দিতে হয়েছে।
হাসানেরা হলো ঘরছাড়া।

তবে সর্বদিক একত্রে বন্ধ হয় না। কাকতালভাবেই উত্তরাধিকার সূত্রে তারা পেয়ে যায় মহিমগঞ্জের এক পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির মালিকানা। তিনজনের সংসার পাড়ি জমায় সেই বাড়িতে।

জমিদার বাড়ি, তায় আবার পরিত্যক্ত! এক ঘিরে আছে নানা গল্প। আর বলাই বাহুল্য গল্পগুলো ভূতুড়ে। এই বাড়িতে জড়িয়ে আছে এক জমিদারের গল্প অভিসারের দাফনের গল্প। অভিশাপ নিয়ে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। নির্জন এই বাড়িতে তিনটে মানুষের নতুন সংসার।

এত বিশাল বাড়ি কিন্তু গাঁয়ের লোকেরা পা মারায় না। কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তাদের কুসংস্কারকে করেছে পোক্ত। এখানেই প্রকৃতির দান আর অল্প কিছু অর্থ দিয়ে কেটে যাচ্ছিল হাসানদের দিন।

মাথার উপর ছাদ মিললেও সেই সুখ আর আসেনি। সময়ের ফেরে একদিন মা ধরণীর মায়া ত্যাগ করলেন। বাকি রইলো পিতা পুত্র। স্ত্রীর প্রয়াণ সইতে না পেরে একদিন বাবাও কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। বিশাল জমিদার বাড়িতে অদৃশ্য অভিশাপের ছায়া সঙ্গী করে একা পড়ে রইলো হাসান। নিজেকে সঁপে দিলো বইয়ের কাছে। ধীরে ধীরে বনে গেল এক কৃষক। ফুল, পাখি, গাছ আর পুকুর নিয়ে তার একলা রাজত্ব।

এই একাকীত্বে একসময় বন্ধুত্বের ছোঁয়া নিয়ে এসেছিল ইখলাক হোসেন। জোব্বা পড়া মওলানা। তার সঙ্গ যেন হাসানের জীবনে অন্যরকম এক অনুভূতি তৈরি করল। কিন্তু সময়ের করাল গ্রাসে সেই ইখলাকও হারিয়ে গেল।

দুই দশক ধরে এভাবেই কিছু সঙ্গ, অনেকটা একাকীত্ব সঙ্গী করে হাসান পার করছিল। তবে জীবনের গল্প এবার নতুন পাতায় লেখা হচ্ছিল।

একদিন জমিদারবাড়ির বারান্দায় অচেনা অচেতন এক নারীকে আবিষ্কার করে সে। কোথা থেকে এলো সে জানা নেই।
হীরা নামের শহুরে এই মেয়েটি যখন জিজ্ঞেস করল, ❛আপনার নাম কী?❜
তখন যেন হাসানের মনে হলো বহুদিন কেউ নাম ধরে না ডাকতে ডাকতে সে হয়তো ভুলে গেছে তার ডাকনাম!

হাসানের একাকীত্বের রাজত্বে মেয়েটি অদ্ভুত এক রাজত্বের সৃষ্টি করলো। যেন স্বপ্ন কিংবা অলীক কিছু। মেয়েটির থেকে জানা গল্প আর নতুন এক সৃষ্টির প্রতি অমোঘ আকর্ষণ হাসানের জীবনের তরঙ্গ বদলে দিলো।

হাসান ঢাকায় ছুটে চলেছে একটি খামবদ্ধ চিঠি নিয়ে। পকেটে একটা সোনালী ঘড়ি। তখনো সে জানতো না সেও মানুষ খু ন করতে পারে.....


জমিদারবাড়ির অভিশাপ বয়ে চলা অভিশপ্ত বাড়িতে ফিরার আর অবকাশ কি হবে? শাপ কাটাতে নতুন কোনো ঘটনা কি ঘটবে?



পাঠ প্রতিক্রিয়া:


❝ডাকনাম ভুলে গেছি❞ ওবায়েদ হকের লেখা এপর্যন্ত দীর্ঘ কলেবরের উপন্যাস।

সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে ওবায়েদ হক অন্যতম শক্তিশালী লেখক। তার লেখায় শব্দের ব্যবহার, উপমা আর ছন্দের গভীরতা খুব সাধারণ বাক্যকেও অনবদ্য করে তোলে।

এই উপন্যাসের শুরুটাও তেমনই। গভীর রাতে হাসান নামের এক অদ্ভুত লোক হাজির হয়েছিল থানায়। উদ্দেশ্য আত্মসমর্পণ। ঠিক এই প্যারাটার বর্ণনা লেখক এত মাধুর্য্য দিয়ে দিয়েছেন যেন মনে হচ্ছিল রাত বিরেতে থানায় আত্মসমর্পণ করার ব্যাপারটা খুবই অ্যাস্থেটিক!

যাই হোক, ২৭২ পৃষ্ঠার উপন্যাসে লেখক তার লেখার উপমার আড়ালে অদ্ভুত এক দুনিয়ার গল্প বলেছেন। যে দুনিয়া আমাদের থেকে আলাদা না। কিন্তু বর্ণনার জোরে তাই হয়েছে স্বপ্নের মতো।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাসান। যার অদ্ভুত শৈশব আর একা হয়ে যাওয়ার গল্প ছিল শুরু থেকে। অভাব, জমিদারি আর বাবার কাছে শিক্ষিত হওয়ার মধ্যেই কেটেছে তার শৈশব কৈশোর। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে হাসানের কি আদৌ কোনো শৈশব কৈশোর ছিল?

লেখক উপন্যাসের দ্যোতনার মাঝেই সামাজিক নিয়মনীতির দিকে আঙুল তুলেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও যে শিক্ষিত এবং স্বশিক্ষিত হওয়া যায় তার প্রকাশ হাসানের মধ্য দিয়ে করেছেন।
এত জানে কিন্তু একটা সার্টিফিকেট নেই, আহারে!
কিংবা আহারে! এত সার্টিফিকেট কিন্তু কিচ্ছু জানে না - এই ব্যাপারটা লেখক অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে পুরো উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন।

এসেছে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের অন্য শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ও।

বংশের নাম করে আমরা আমাদের বর্তমানকে অনেক সময় বিষিয়ে তুলি কিংবা অতীত গরিমার বশবর্তী হয়ে শেষ করে দেই পরবর্তী প্রজন্মের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে। শেখ পরিবারের পূর্ব পুরুষ আর হাসানের মাধ্যমে লেখক সে বিষয়কে নির্মমভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

শুরুর থেকে প্রথমার্ধ পুরোটাই হাসানের বয়ানে আর তার জীবনের প্রতিটা পরতের নির্যাস দিয়েছেন লেখক। হাসানের নিঃসঙ্গ জীবন, জনসাধারণের মাঝে নিজের অস্বস্তি আর অল্প সময়ের সঙ্গী ইখলাকের সাথে স্মৃতিগুলো দিয়ে কেটেছে। একঘেঁয়ে মনে হতে পারতো। তবে লেখকের জাদুকরী বর্ণনার গুণে একঘেয়ে জীবনের খেরোখাতা উপভোগ্য লেগেছে।

গল্পের মোড় বদলে যেন শ্রাবণের বারিধারা এসেছিল হীরার আগমনে। হীরা এসে যেমন উপন্যাসে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে তেমনি হাসানের জীবনেও নিয়ে এসেছিল বদল। একা থেকে কারো সাথে কথা না বলে সমাজের চোখে অসামাজিক ছেলেটাই কেমন করে অনুভূতিতে আক্রান্ত হলো তার নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে উপন্যাসে।

পরিত্যক্ত বলা যায় এমন জমিদারবাড়ি, ভৌতিক আবহ ওয়ালা কুসংস্কার আর জোছনার মায়া মিলে হীরা আর হাসানের উপস্থিতি যেন মোহময় করে তুলেছিল।
লেখক পরিবেশের যে সম্মোহনী বর্ণনা দিয়েছেন তাতে করে ওই ভয় জাগানিয়া বাড়িটাও চুম্বকের মতো আকর্ষণ করেছে।

হাসান যেমন এখানে পর্যাপ্ত সময় পেয়েছে নিজেকে মেলে ধরতে ঠিক তেমনি হীরার উপস্থিতির পর হীরার ব্যক্তিত্ব, অতীত গল্প সবই ছিল দারুণ।
লেখক আগত চরিত্রের মেলা না বসালেও যাদের এনেছেন তাদের প্রতি সুবিচার করেছেন। তাদের গল্পগুলো পরিপূর্ণ ছিল।

শেষের দিকে লেখক হাসি আর হতাশা কিংবা হাহাকারকে সমান্তরালে রেখেছেন। সমাপ্তির দোটানা আর পরিণতির মুখোমুখি হয়ে পাঠক হিসেবে আমিও ভাবছিলাম কোনটা ভেবে নিবো? সুখটাই সই নাকি বেদনার পরশ নেবো?


তবে এত অসাধারণত্ব দিয়েও আমি বলব এই উপন্যাসে আসল ওবায়েদ হককে পাইনি। লেখকের গল্প বলার ধরন, উপমা কিংবা শব্দ চয়ন নিয়ে সমালোচনা করার ধৃষ্টতা নেই। এখানে তিনি মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন অসীম দক্ষতায়।

কিন্তু গল্পের মাঝে লেখক খুব বেশি কাকতালের আশ্রয় নিয়েছেন। এতগুলো কাকতাল আসলে হজম করা কঠিন। সেসব জায়গায় ঘটনার প্রেক্ষিতে রুদ্ধশ্বাস ফেলে একটু নিস্তার পাওয়া গেলেও পরিতৃপ্তি আসেনি। ব্যাখ্যাতীত ঘটনাও ছিল। যেসব একটু বেশি নাটকীয় হয়ে গেছিল।

হাসানের ঘটনা পড়তে পড়তে মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল লেখক তাকে টারজান বানাতে চাচ্ছেন নাকি? যদিও না।

শেষটা হাহাকার জাগানো সুন্দর। লেখক যে আবহের সৃষ্টি করেছেন সেখানে তিনি সার্থক। কাকতাল গুলো ছেড়ে দিলে সুন্দর এক পাঠ অভিজ্ঞতা উপন্যাসটি।

থানায় শুরু হওয়া গল্পের শেষটা থানায় গিয়ে শেষ হবে নাকি ওই জমিদার বাড়ির আরও কিছু খেল দেখানো বাকি তা জানতে হলে আপনিও ভুলে যেতে পারেন আপনার ডাকনাম!



প্রচ্ছদ:


প্রচ্ছদটা বেশ। ছিমছাম সুন্দর।





❛অরণ্যের রাজত্ব পেয়েছি
ফুল, গাছ, ফসল আর পশু পাখি
এই প্রজা নিয়ে তো বেশ আছি
তাদের মাঝে থেকে আমি ডাকনাম ভুলে গেছি।❜




Profile Image for Parvez Alam.
327 reviews14 followers
March 27, 2026
একটা খুনের স্বীকারোক্তি দিয়ে গল্পের শুরু—শুনতে যতটা সরল, ভেতরে ততটাই স্তরযুক্ত। শুরুতেই একটা রহস্য তৈরি হয়, কিন্তু গল্প আসলে ধীরে ধীরে আমাদের নিয়ে যায় এক মানুষের ভেতরের জগতে, তার বেড়ে ওঠা, হারানো আর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্পে।

ঢাকার পুরনো এক পরিবার থেকে শুরু হয়ে গল্পের পথ ঘুরে যায় এক নির্জন জমিদারবাড়িতে। সেই পরিবর্তনের সাথে বদলে যায় এক শিশুর জীবনও। ছোটবেলার কিছু আঘাত, একাকীত্ব, আর পারিবারিক ভাঙন মিলিয়ে তার ভেতরে তৈরি হয় এক ভিন্ন মানসিক জগৎ—যেখানে মানুষের চেয়ে প্রকৃতি, গাছপালা আর নীরবতাই বেশি আপন হয়ে ওঠে।

লেখক এখানে শুধু একটা গল্প বলেননি, বরং খুব সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন—একজন মানুষ কীভাবে পরিস্থিতির কারণে ধীরে ধীরে সমাজ থেকে দূরে সরে যেতে পারে, আবার নিজের মতো করে বেঁচে থাকার পথও খুঁজে নেয়। এই যাত্রায় আমরা দেখি সম্পর্কের ভাঙাগড়া, হারিয়ে যাওয়া, আবার নতুনভাবে কিছু পাওয়া।

উপন্যাসের বড় শক্তি এর পরিবেশ আর বর্ণনাশৈলী। গ্রাম, বন, নিঃসঙ্গ বাড়ি—সবকিছু এত জীবন্তভাবে উঠে এসেছে যে পড়তে পড়তে মনে হয় পাঠক নিজেই সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে হাঁটছে। একইসাথে চরিত্রগুলোও খুব স্বাভাবিকভাবে গড়ে উঠেছে। সংখ্যা কম হলেও প্রত্যেকেই গল্পে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

গল্পের মাঝামাঝি অংশে কিছুটা ধীরতা থাকলেও পরে নতুন চরিত্রের আগমনে গল্পে আবার গতি আসে। তখন একাকীত্বের গল্পের সাথে মিশে যায় সম্পর্ক, ভালোবাসা আর মানবিকতার নতুন রং। এই পরিবর্তনটাই উপন্যাসকে আরও পূর্ণতা দেয়।

এই বই শুধু একটি জীবনের গল্প নয়—এটি সমাজ, শিক্ষা, মানুষের মানসিকতা এবং ‘শিক্ষিত’ আর ‘জ্ঞানী’ হওয়ার পার্থক্য নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে। একইসাথে এটি মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যতই দূরে সরে যাক, কোথাও না কোথাও তার ভেতরে সম্পর্কের প্রয়োজন থেকে যায়।

“ডাকনাম ভুলে গেছি” আসলে এক ধরনের প্রতীক—নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলা, অথবা নতুন পরিচয়ে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। বইটা শেষ হওয়ার পরও এর অনুভূতি কিছুক্ষণ থেকে যায়, একটু নীরব করে দেয়।
Profile Image for DEHAN.
283 reviews89 followers
July 2, 2026
অনেকদিন পর কোন বই চিবিয়ে সময় নষ্ট না করে বড় বড় গ্রাসে গিললাম। ওবায়েদ হক বরাবর ই চমৎকার লেখেন। এইবার গল্পের বিষয়বস্তুতে উনি একটি মোক্ষম অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। মানুষের আদি অকৃত্রিম এক গোপন বাসনা। শহরের কোলাহল মুখর জীবন ফেলে, সংসারের ঘ্যানঘ্যানানি প্যানপ্যানানি থেকে দূরে কোথাও গিয়ে নিজের মতো জীবন যাপন করার বাসনা। এই বাসনা টা খুবই ইন্টারেস্টিং একটা বাসনা। বেশীরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে মনের কোথাও এমন একটা সুপ্ত বাসনা থাকে।যদি শোকেস কে হৃদয় হিসেবে বিবেচনা করি তাইলে এই বিচ্ছিন্ন থাকার বাসনা টিকে বলা যেতে পারে চিনামাটির কারুকার্য করা দামি কাপ পিরিচ। ঘরে মেহমান আসলে অর্থাৎ জীবনে সাংসারিক কিংবা সামাজিক জটিলতা বেড়াতে এলে এই বাসনা টিকে শোকেস থেকে বের করে সযত্নে ধোয়ামোছা করে আপ্যায়ন এর জন্যে তৈরি করা হয় । অভিমানে, ক্ষোভে পরিপূর্ণ ব্যক্তি তার প্রতিকূল সময়ের অবসর টাকে উপভোগ করে এই চিনামাটির সুপ্ত ( পড়ুন গুপ্ত ) কাপে, একাকীত্বের নির্ঝঞ্জাট আনন্দ মেশানো গরম ধোঁয়া উঠা কাল্পনিক চায়ে চুমুক দিতে দিতে। একসময় অভিমান পড়ে যায় । আবার সে বাস্তবে ফিরে আসে। তার কাছে একা থাকার চিন্তা বড্ড বিলাসিতা লাগে আর খাপছাড়া মনে হয়। হঠাৎ সে বুঝতে পারে এইসব অলীক চিন্তা করে সময় নষ্ট করার মতো সময় তো তার নাই। সে আবার তার শোকেসে রহস্যপূর্ণ চিনামাটির দামি বাসনা টি ভরে রাখে। এর ব্যবহার অল্প কিন্তু কাজে দেয়। বেশ কিছুদিন নির্বিঘ্নে কেটে যায়।
হাসান এর বড় হওয়াটা আর দশটা শিশুর মতো নয়। তার বাবা একাডেমিক শিক্ষার প্রতি ভরসা করতে পারে নি বিধায় বাল্যকালে স্কুলে না গিয়ে ঘরেই বাবার কাছে পড়াশোনা । এরপর নানা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে শহর থেকে বিচ্ছিন্ন এক গ্রামের জমিদারবাড়িতে সপরিবারে থিতু হওয়া। জমিদারবাড়িতে থাকা অবস্থায়ে মায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু ,বাবা আর তাকে একেবারে অপ্রস্তুত করে দেয় । এরপর নিঃসঙ্গ হাসান বড় হতে থাকে ঐ জমিদার বাড়ির আশেপাশেই নানা গাছপালা, বন্য জন্তু, পাখি ইত্যাদির সঙ্গে মিশে মিশে। একাকীত্বের প্রতি তার কোন অভিযোগ নেই। লোকালয়ে থাকতে না পারার জন্যে নেই আফসোস।
একদিন তার বাবাও তাকে ছেড়ে চলে যায়। আগে তাও একটি মানুষ ছিলো আশেপাশে, এখন একেবারে একা হয়ে যাওয়ার কারনে হাসান কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়লেও নিজেকে দ্রুত সামলে নেয়। এভাবে কেটে যায় অনেকদিন। যখন সে পুরোপুরি একা থাকতে অভ্যস্থ হয়ে গেছে তখন নাটকীয়ভাবে এক সকালে তার জঙ্গলে ঘেরা রাজপ্রাসাদের ফটকে এক উটকো ঝামেলা এসে উপস্থিত। ঝামেলা আসলে একা আসে না, দলবল নিয়ে আসে। জঙ্গলের এই বাড়িটি নাকি অভিশপ্ত ; মাঝেমধ্যেই এখানে একটি মেয়েকে দেখা যায়। হাসান ভেবেছিলো এমন কিছু হতে পারে। পরে এসে দেখবে শূন্যে মিলিয়ে গেছে। হাসান তার সকালে কাজকর্ম সেরে দুপরের দিকে বাড়ি ফিরে এসে দেখে দৃশ্যপট আনচেইঞ্জড। সাথে মৃদু নিঃশ্বাস পড়ছে। সারাজীবন মানুষের সাথে না মিশতে মিশতে হাসান অন্যরকম হয়ে গেছিলো। সে বুঝতে পারলো না ঝামেলাটিকে সে ঘরে নিয়ে সেবা করবে নাকি বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দিয়ে আসবে। সিদ্ধান্তহীনতা হাসান কে আরো বিপর্যস্ত করলো যখন ঝামেলাটি চোখ খুলে জিজ্ঞাস করলেন - আমি কি মারা গেছি?
আমার কাছে হাসানের একা একা থাকার গ্রামের জীবন টা বেশি ভালো লেগেছে। সবার ই লাগবে। ঐ যে রহস্যময় চিনামাটির কাপ পিরিচ; এইজন্যে। গল্পের দ্বিতীয় অংশ হাসানের শহর ভ্রমণ অতোটা নজর কাড়তে পারে নি। একটু নাটকীয়তা ছিলো। আজীবন একা একা থাকা একটি ছেলের মধ্যে গল্পের শেষে যারপরনাই অতরিক্ত মায়া , দুশ্চিন্তা , ভালোবাসা ইত্যাদি বেশি বেশি করে দেওয়াটা আমার কাছে অনৈতিক ও অর্থহীন লেগেছে। অনেক পাঠকের নাও লাগতে পারে। যাদের এই অতিরিক্ত সেন্টিমেন্ট পার্ফেক্ট লেগেছে তারা মানুষ না, প্রজাপতি। প্রজাপতিদের নিয়ে মন্তব্য করাও অর্থহীন।
যাই হোক, ওবায়েদ সাহেবের এই মনের ভেতর থেকে টান দিয়ে চিনামাটির দামি কাপ পিরিচ বের করাটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে।
এ জগতে হায় ! সবাই কখনো না কখনো হাসান হতে চায়!
Profile Image for Alvi Rahman Shovon.
524 reviews21 followers
July 12, 2026
প্রিয় লেখক ওবায়েদ হকের উপন্যাসগুলো বেশ ছোট হয়। তবে এবারের বইমেলায় প্রকাশিত লেখকের 'ডাকনাম ভুলে গেছি' বইখানা অন্য সব বইয়ের কলেবরকে ছাপিয়ে গিয়েছে।

কাহিনীর সূত্রপাত ঘটে কেন্দ্রীয় চরিত্র হাসানের শৈশব থেকে। হাসানের বাবা পেশায় স্কুল শিক্ষক। ঢাকায় পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া বাড়িটা হাসানের মায়ের চিকিৎসার খরচের যোগান দিতে বিক্রি করে দিতে হয়। পরিণামে হাসানের পরিবারের ঠাঁই হয় তার গ্রামের বাড়ির পরিত্যাক্ত জমিদার বাড়িতে। এই বাড়িতে থেকেই ঘটতে থাকে বাকি কাহিনী। স্পয়লার চলে আসবে বিধায় কাহিনীর আর কিছু বলছি না।

ওবায়েদ হকের লেখনীশৈলী নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। উনার গল্পকথনের ধারা এতো মোলায়েম যে পাতার পর পাতা পড়ে যেতে ইচ্ছে করে। 'ডাকনাম ভুলে গেছি' বইয়েও সেই ধারা অব্যাহত ছিলো। সুন্দর লেখনীর গুণেই গল্পের গভীরতা অনুভব করতে পারছিলাম।

ফাইজা ইসলামের প্রচ্ছদটা চমৎকার হয়েছে। প্রচ্ছদটাই অনেক কথা বলে যেনো। উপকথা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটিও অনেক ভালো ছিলো। তবে বেশ বানান ভুল চোখে পড়েছে যেটা পড়তে গিয়ে বিরক্তির উদ্রেক সৃষ্টি করছিলো। চতুর্থ মূদ্রনের পরেও এতো বানান ভুল কিভাবে রয়ে গেলো তা বোধগম্য হলো না।

এক নজরে:
বইয়ের নাম: ডাকনাম ভুলে গেছি
লেখক: ওবায়েদ হক
প্রচ্ছদ: ফাইজা ইসলাম
প্রকাশনী: উপকথা প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা, ২০২৬
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৭২
মুদ্রিত মূল্য: ৫০০৳
Profile Image for তিথি.
34 reviews18 followers
March 23, 2026
চুম্বকের মতো টেনে নিচ্ছিলো গল্প, ঘুমে চোখ ভারি হওয়ার আগ পর্যন্ত 1 more page করে পড়ে গেছি। শহুর শৈশবের বর্ণনা, তারপর গিয়ে নদীর তীরে সবুজের মাঝে বেঁচে থাকা, সাথে অতিপ্রাকৃতের উপাদান- সব মিলিয়ে worth it লেগেছে। খুব সামান্য একটা ইলেকট্রিসিটিবিহীন সন্ধ্যা, সারি সারি শহরের চাপা গলি, গ্রামের হাট বাজার - সবকিছুর 'অসাধারণ সুন্দর' বর্ণনা দেওয়া, শুধু চোখের সামনে ভাসে না, অনুভব ও করা যায়।

নায়কের শহরে আসার পরের ঘটনাবলীতে নাটকীয়তা বেশি লেগেছে আর ইখলাক হোসেনের পরিণতিতে কষ্ট পেয়েছি- তাই এক তারা কম দিলাম।
Profile Image for Shishir.
237 reviews52 followers
May 26, 2026
৩'৫/৫

অনেকে যা বলছেন তাইই, বইটা অন্য বইয়ের আগে পড়লে আরও ভালো লাগতো। আর অন্যগুলো পড়া থাকলে মূল চরিত্রদের খুবই চেনা লাগে, নতুনত্ব কম ।
Profile Image for শাবেকুন  শামস্.
38 reviews5 followers
March 15, 2026
এক সন্তানহারা মায়ের মৃত্যু কিংবা সব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া বালকের অভিশপ্ত একাকী জীবন আমার চোখে জল না আনতে পারলেও সদ্য জন্ম নেওয়া এক শিশু আমার চোখে এনেছে জল।

একজনকে খুন করে খুনি নিজে থানায় এসেছে রাত দুটোর সময় নিজেকে সারেণ্ডার করাতে। যাকে দেখে মনে হবেনা সে এই সভ্য সমাজের কেউ। গল্পের শুরু এমন নাটকীয় ভাবে শুরু হয়েছে।

রমিজ শেখকে কাজের জন্য প্রায়ই ঢাকায় আসতে হয় বলে তিনি ঢাকায় একটা বাড়ি বানালেন। সেখানেই একসময় স্থায়ী হলে। পিতার পর পুত্র, পুত্রের পরিবারের স্থায়ী আবাসস্থল হলো ঐ বাড়ি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস কিংবা নিছক নিয়ত'র ছোবলে একসময় সেই বাড়ি বিক্রি করে স্ত্রী'র চিকিৎসার খরচ মিটিয়ে ঘরহীন হলেন রমিজ শেখের পুত্র পরিবার।

উড়ো চিঠির মতো উড়ো একখণ্ড ভূত জমিদার বাড়ি জুটলো ঘরহীন ঐ পরিবারের। কর্মের ফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোগ করতে হয়। তারই প্রেক্ষিতে পিতা-মাতাহীন হলেন হাসান শেখ। জঙ্গলে থাকতে থাকতে হাসান একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলেন জঙ্গলে থাকা ঐ মেছোবাঘ কিংবা শেঁয়ালের মতো প্রাণহীন। তাতে তার বিশেষ কোনো অসুবিধা হতো বলে মনে হয় না। কালবৈশাখী ঝড়ের মতো তার জমিদার বাড়ির বারান্দায় এলো এক নারী। কে এই নারী? তার পরিচয় কী? এখানেই বা আসলো কিভাবে সে?

লেখকের আমি যে কয়েকটা বই পড়েছি সেসবে যেভাবে লেখার ধরন ছিলো এটাতে পুরোপুরি ভিন্ন স্টাইলে লিখেছেন বলে আমার মনে হয়। পড়ার শুরুতেই অজান্তেই মনে হয়েছে এত নাটকীয়ভাবে সবকিছু লেখা কেনো! গল্প যত সামনে এগিয়েছে তত বিষয়টা খাপ খাইয়ে গিয়েছে। মনে হয়েছে এভাবে বর্ণনা করাতেই নায্য করা হয়েছে গল্পের প্রতি, চরিত্রের প্রতি। খুব সুন্দরভাবে প্রতিটা চরিত্রে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।

গল্পের শুরুতে যে অতি দুষ্টু লোকের জন্য রাগ হয়েছে শেষে তার জন্যই মন ভারি হয়েছে। সাধারণ কাহিনীকে লেখক অতি চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। সহজেই পড়তে পেরেছি আমার মনে হয়েছে।
একটা চরিত্রকে শুরু থেকেই অতি যত্নে আস্তে আস্তে তৈরি করে পরিণয়ে যখন সেই চরিত্রের জন্ম হয়েছে তখন তৃপ্তিতে চোখে পানি এসেছে।

সবমিলিয়ে গত বছরের উন্মাদ আশ্রমের জন্য পাঠকের মনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিলো "ডাকনাম ভুলে গেছি" সেই ক্ষতের মোক্ষম ঔষধ ছিলো। মনে হলো সেই পুরনো লেখক'কে আবার ফিরে পেয়েছি। ধন্যবাদ আপনাকে।
Profile Image for Saiful Islam.
6 reviews
April 27, 2026
ওবায়েদ হকের 'ডাকনাম ভুলে গেছি' কেবল একটি কাহিনী নয়, বরং মানুষের অস্তিত্বের সংকট, একাকীত্ব এবং সামাজিক অসংগতির এক নিপুণ দর্পণ। উপন্যাসের শুরুতেই একটি খুনের স্বীকারোক্তি পাঠককে এক রহস্যময় আবহে টেনে নেয়, যার শেকড় প্রোথিত কয়েক দশক আগের এক অভিজাত অথচ ভেঙে পড়া পরিবারের ইতিহাসে।

গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হাসান। শৈশবে ঢাকার আরমানিটোলায় বেড়ে ওঠা এই শান্ত ছেলেটি স্কুলে বুলিং ও পারিবারিক বিপর্যয়ের শিকার হয়। মায়ের মৃত্যু এবং বাবার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া হাসানকে সম্পূর্ণ একা করে দেয়। এই একাকীত্ব থেকে বাঁচতে সে প্রকৃতির মাঝে আশ্রয় খোঁজে; হয়ে ওঠে এক স্বশিক্ষিত কৃষক। লেখকের বর্ণনায় হাসানের এই 'বন্য' হয়ে ওঠা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে ফুটেছে। পরবর্তীতে হীরা নামক নারী চরিত্রের আগমন গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, যা হাসানকে পুনরায় মানুষের প্রতি অনুভূতিশীল হতে শেখায়।

উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলী লেখকের উপমার ব্যবহার এবং প্রকৃতির বর্ণনা। গ্রামের অন্ধকার চিরে বিদ্যুতের আগমনকে যেভাবে তিনি 'শাস্তিভোগ করা দণ্ডায়মান বালকের' সাথে তুলনা করেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে প্রকৃতির পাঠ যে একজন মানুষকে বেশি জ্ঞানী করে তোলে, সেই দর্শনটি লেখক এখানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজের প্রত্যাশা মেটাতে অভিনয় করতে করতে আমরা এক সময় নিজেদের আসল পরিচয় বা 'ডাকনাম' হারিয়ে ফেলি। বিষণ্ণতা আর পাওয়া-না পাওয়ার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ এই উপন্যাস। যারা একটু ধীরগতির কিন্তু গভীর জীবনবোধসম্পন্ন লেখা পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার পঠন হতে পারে।
Profile Image for Nazrul Islam.
Author 8 books233 followers
May 18, 2026
ওবায়েদ হকের লেখা পড়তে আরাম। প্রতিটা বাক্য, প্রতিটা শব্দ বর্ণনায় যেন কানে মধু বর্ষণ করে। তাই কাহিনী যাই হোক বই আটকে থাকে না৷ তরতর করে পড়া যায়। পড়তে দারুণ লাগে।

কিন্তু উনার লেখার প্রধান সমস্যা উনার বইয়ের নায়কেরা সবাই সরলরৈখিক।। তারা সব সময় গড লেভেলের। তাদের কিছুই ছুতে পারে না৷ উনার গল্পের ভিলেনরাও এতো ভালো যেন তারাও নায়ক।
উনার নায়কদের হিমুর মতো গড লেভেলের নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা বাদ দিলে উনি একজন জাত লেখক। যত যাই হোক উনার লেখা পড়তে দারুণ লাগে।

অচিরেই উনি বাংলা একাডেমি পুরষ্কার পেয়ে গেলেও অবাক হবো না( ভুল হয়ে গেলো। উনার আগে হামিম কামাল আর মাহবুব ময়ুখ পাবে)
Profile Image for Tonny.
222 reviews19 followers
June 4, 2026
অনেকদিন পর এক বসায় একটা বই শেষ করলাম। আরণ্যক এর পর আজকে এই বই পড়ে মনে হলো কেও বাস্তবে প্রকৃতিকে ভালোবাসে। এটা আমার এই লেখকের পড়া ২য়/ ৩য় বই তাই বইটি আমার অনেক ভালো লেগেছে। কিছু মানুষের রিভিউতে দেখলাম মুল চরিত্রকে হিমুর সাথে তুলনা করেছেন, আবার কিছু মানুষের অভিযোগ হাসান বেশি ভালো মানুষ। আমি তাদের সাথে একমত, কিন্তু এতে আমার কোনো অভিযোগ নেই। বরং মনে হয়েছে এরকম অনেক মানুষের দরকার এই সমাজে।
আমি এটা নিয়ে একটা সিনেমা করার অনুরোধ করবো বাংলাদেশের পরিচালকদের, আশা করি বড় পর্দায় দেখতে পাবো কোনো একদিন। এখন তার আরো বই পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
Displaying 1 - 30 of 49 reviews