অল্প কিছুদিনের মধ্যে গ্রামের অন্ধকারেও বিদ্যুৎ হানা দিলো। কানধরা বালকের মতো খাম্বাগুলো একটার পর একটা দাঁড়িয়ে পড়লো গাছের পাশে। রোদে তারা হাসে না, বাতাসে তারা দোলে না, অবিচল দাঁড়িয়ে থেকে শাস্তিভোগ করছে শুধু। পাখিরা এইসব খাম্বাগুলোকেও অবহেলা করে না, ওড়াওড়ি থেকে ক্ষণিক অবসর নিয়ে এখানে বসে পৃথিবীটাকে দেখে, নিজেদের মধ্যে আলোচনা সভা বসায়, খোশগল্প করে, অথবা দুটি পাখি গা ঘেঁষাঘেষি করে প্রেম করে, অভিমান ভাঙ্গে। সন্ধ্যায় অন্ধকারের পেট ফেঁড়ে আলো ফুটে উঠে গ্রামে, রাতের পাখিরা তখন বিভ্রান্ত হয়, পানকৌড়িটা ঘন ঘন পথ হারায়। গ্রামের প্রায় কেউই বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হল না, শুধু আমিই অন্ধকার পুষে বিদ্যুৎহীন রইলাম। গ্রামবাসীর কাছে আমার বাড়িটা আগের চেয়েও বেশি রহস্যময় এবং আরো বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো। ঘরে ঘরে আলো পৌঁছালেও মানুষের মনের গহীনে যে অন্ধকার ঘাপটি মেরে পড়ে আছে, একশো ওয়াটের বাল্বও সেই অন্ধকারের নাগাল পেল না।
সত্যজিৎ রায়ের "নায়ক" সিনেমার বিখ্যাত সংলাপ হচ্ছে - "বিএ পাশ করা নায়িকার কখনো বিরহে গান গাওয়া উচিত না।" "আর নায়ক হলেই দেবতুল্য লোক হওয়া উচিত না।"
হুমায়ূন আহমেদ তার সৃষ্ট "হিমু" চরিত্রের দেবতায়ন করেছিলেন মাঝপথে। প্রথমদিকের হিমুর মধ্যে কিন্তু সাধারণ মানুষের অনেক বৈশিষ্ট্য ছিলো। সে তখন নির্বাণ লাভ করার পথ অন্বেষণ করছিলো। পরে দেখা গেলো তার ফুঁ -তে বন্ধ্যা রমণীর গর্ভে বাচ্চাও জন্ম নিচ্ছে! সে সাধু থেকে সোজা দেবতাই হয়ে গেলো শেষমেশ। হিমু চরিত্রটির সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটেছিলো সেইসাথে। তার সাধুত্বে লেখক অনেক কৌতুকের উপকরণ রেখেছেন। ওবায়েদ হকের নায়করা এদিক দিয়ে অনেক কঠোর, বাসনাহীন; কিছু ক্ষেত্রে বাংলা সিনেমার রঞ্জিত মল্লিকের চাইতেও মহৎ। লেখক নায়কের চরিত্র নির্মাণে ক্লান্তিকরভাবে পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছেন। শুরু থেকেই প্রধান চরিত্ররা সাধু, তাদের কোনো রূপান্তর ঘটে না। ( সৈয়দ শামসুল হক উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে যেয়ে বলেছিলেন, চরিত্রগুলো শুরুতে যে অবস্থায় থাকে শেষ পর্যন্ত তারা সে অবস্থায় থাকে না, এক ধরনের উত্তরণ ঘটে তাদের।) "ডাকনাম ভুলে গেছি" কি আমার ভালো লাগেনি? অবশ্যই ভালো লেগেছে। চমৎকার, গোছানো ও জমজমাট কাহিনি। আগে ওবায়েদ হকের কোনো উপন্যাস না পড়া থাকলে মুগ্ধ হতাম নিঃসন্দেহে। কিন্তু এতো এতো পুনরাবৃত্তি দেখে ঠিক খুশি হতে পারছি না। লেখকের একজন ভক্ত হিসেবেই বলছি, উপন্যাসের চরিত্রচিত্রণ ও ঘটনাপ্রবাহে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন তার।
গল্পের শুরুটা হয়েছে একটা খুনের মধ্য দিয়ে। ঠিক খুন না, একটি খুনের স্বীকারোক্তি। এই ঢাকা শহরে অনেক পাগল কিসিমের মানুষ আছে। নেশা করে টাল হয়ে থাকা মানুষেরও অভাব নেই। এমন অজস্র মানুষ পুলিশদের বিরক্ত করার জন্য থানায় গিয়ে অনেক গল্প ফাঁদে। এই মধ্যরাতের গভীরে এসে কেউ যখন বলে, বড় অফিসারের সাথে কথা বলতে চায়। সে একটা খুন করেছে! তবে কে-ই বা বিশ্বাস করবে?
এই গল্পটা বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে কয়েক দশক পিছনে। তখন ঢাকার আরমানিটোলায় বসবাস করত এক পরিবার। বাবা, মা ও সন্তানকে নিয়ে তাদের সংসার। বাবার পূর্বপুরুষ অনেক বেশি ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। অতীতে যাদের জমিদারি ছিল, বর্তমানে তাদের কিছু না থাকলেও সেই আভিজাত্য ঠিকই থাকে। যদিও বাইরে দিয়ে তা দেখা যায় না। কিন্তু মনের এই আভিজাত্য তার চারিপাশে একটা দেয়াল তুলে দেয়। যা খুব সহজে ভাঙা যায় না। নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কারো মুখাপেক্ষী হওয়া যায় না। স্কুলে শিক্ষকের চাকরি যার অবলম্বন।
একদিন বাবার হাত ধরে ছেলেটা স্কুলে ভর্তি হলেও তার সেই যাত্রা সুখকর হয়নি। নিশ্চুপ, শান্ত হাসান নামের ছেলেটা তাই স্কুলে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের শিকার। শিশু মন এখান থেকেই বদলে যায়। সঙ্গী খুঁজে বেড়ায়। অবশ্য তার জন্য নতুন সঙ্গী খোঁজার অবকাশ এসেছে। মা অন্তঃসত্ত্বা। তার একজন সঙ্গী হয়তো আসবে। কিন্তু সবকিছু বদলে যায় এক দুর্ঘটনায়। একদিন মাকে নিয়ে বাবা হাসপাতালে চলে যায়। ফিরে আসে একা। কিছুদিন পর মা-ও আসে। কিন্তু তার আর সঙ্গী পাওয়া হয় না। মা-ও যেন কেমন হারিয়ে গিয়েছে। মাকে সুস্থ করতে গিয়ে ঢাকার এই ভিটেমাটি বিক্রি করে দিতে হয়। তার ভাগ্যের এক গতিপথেই কি না! গ্রামের এক জমিদার বাড়িতে আশ্রয় হয় তাদের। কিন্তু সেখানে জন জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওদের তিনজনের পরিবার জীবন কাটাতে থাকে।
সেই ছেলেটার জীবনের গল্পটা নিয়েই ওবায়েদ হকের “ডাকনাম ভুলে গেছি” উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ। লেখকের সবচেয়ে দীর্ঘায়িত বই। ওবায়েদ হকের লেখা সবচেয়ে কোন দিকটি ভালো লাগে জানেন? তার উপমার ব্যবহার। তার লেখনশৈলীতে এক ধরনের ছন্দ আছে। আর উপমায় ভর করে প্রতিটি শব্দে, বাক্যে তিনি যেভাবে গল্প বলেন; অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে চলে যেতে হয়। পড়তে ভালো লাগে। এক ধরনের তৃপ্তি কাজ করে।
ঠিক যেখানে জমিদারবাড়ির গল্প বলেছেন লেখক, সেখানে কুসংস্কার আর ভয়ভীতি থাকবে না; তা তো হতেই পারে না। প্রাচীন এক জমিদারের ফুর্তির সাক্ষী ও এক গরীব দুঃখী নারীর হাহাকারের নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এ জমিদারবাড়ি। মাঝে মাঝেই এক অশরীরী অবয়ব দেখা যায়। কেউ ভিড়ে না এই বাড়িতে। কেউ মিশে না এই বাড়ির কারো সাথে। এখানে তিন মানুষের একাকীত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। তারচেয়েও প্রকট হয়ে ওঠে সেই আদিম ভয়। কাকে যেন দেখা যায় বাইরে, জমিদারবাড়ির সীমানায় থাকা জঙ্গলে?
এভাবেই একদিন মায়ের মৃতদেহ খুঁজে পায় ছেলেটা। তারপর বদলে যায় সবকিছু। বদলে যায় পারিবারিক বন্ধন। পরিবারের দৃঢ়তার সুতো সবসময় মায়ের হাতেই থাকে। কিন্তু যখন মা না থাকে সবকিছু এলোমেলো হতে শুরু করে। আর মায়ের এই প্রয়াণ সহ্য করতে না পেরে বাবাও যখন নিজের পথ খুঁজে নেয়, তখন হাসান একা হয়ে যায়। এই একাকীত্ব দুর করতে সে নিজের একটা জগৎ তৈরি করে নেয়। নিজেই কৃষক হয়ে ওঠে। গাছের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। বনের প্রাণীরা হয় তার আপনজন।
হাসানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। বাবার প্রচুর বই পড়ার অভ্যাসকে নিজের করে নিয়ে সেখান থেকেই শিখে সবকিছু। কিন্তু বই পড়ে কি আর ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করা যায়? কারো সাথে না মিশতে মিশতে অসামাজিক হয়ে যাওয়া কেউ মুখচোরা, নিষ্প্রাণ হয়ে ওঠে। এমন জীবনে ইখলাক হোসেনের মতো কেউ আসে। নতুন করে আলোর পথ দেখায়। কিন্তু একদিন প্রকৃতির বিচার বা রূঢ় বাস্তবতার কারণেই হয়তোবা হারিয়ে যায়। আমাদের জীবন তো এমনই! এই জীবনে মানুষের আসা যাওয়া লেগেই থাকে। কেউ ক্ষণিকের জন্য, কেউ সময়টা আরেকটু দীর্ঘায়িত করে।
এই গল্পের মোড় নেয় অন্যভাবে। হাসান একাকীত্বকে এমনভাবে বরণ করে নিয়েছে, তার স্বভাবে কিছুটা বন্য ভাব পরিলক্ষিত হয়। কারো সাথে মিশতে পারে না। নারী সত্তার সানিধ্য তো কখনোই পায়নি। তার মধ্যে একদিন তার জমিদারবাড়িতে আচমকা একটি মেয়ের আবির্ভাব হয়। হয়তো সেই মেয়ে, যার অবয়ব এই বাড়িকে ভৌতিক রূপ দিয়েছে। নাকি বাস্তব কেউ? অনেক কিছু জানা যায় মেয়েটা সম্পর্কে। সীমান্ত পার হয়ে যার যাওয়ার ইচ্ছে পাশের দেশে। কিন্তু সেই সুযোগ আর হলো না। প্রেমের আবেগ ভেসে নতুন প্রাণ নিজের মধ্যে বহন করে যে বিপদের পথে পা বাড়িয়েছে, হাসান তার জন্য যেন আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিয়েছে। নাহলে এমন একজন মেয়েকে একা পেলে নরপিশাচরা যে আরও হিংস্র হয়ে ওঠে।
আমি লেখককে সাধুবাদ দিবো দুইটা কারণে। প্রথমত, লেখকের বর্ণনা যেখানে দুর্দান্ত পাঠ অভিজ্ঞতা দিয়েছে। লেখকের লেখা একটা বিষয় লক্ষণীয়। তিনি সূক্ষ্ম বিষয়ের বর্ণনার দিকে বেশ গুরুত্ব দেন। ফলে পড়াটা প্রাণবন্ত হয়ে। প্রাকৃতিক বর্ণনায় লেখক অপ্রতিরোধ্য। গাছগাছালি, এর প্রাণীগুলো, তাদের আচরণ, অনুভূতিও লেখক ফুটিয়ে তুলেন দারুণভাবে। বন, জঙ্গল, প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার একটা পরিবেশ লেখক যেভাবে সৃষ্টি করেন, আমার কাছে বেশ উপভোগ্য মনে হয়।
দ্বিতীয়ত, লেখক তার চরিত্রদের এখানে দারুণভাবে উপস্থাপন করেছেন। খুব বেশি চরিত্র এখানে ছিল না। হাসান এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। তাকে জীবনে শুরু থেকে লেখক তুলে এনেছেন, একটা জীবন এখানে উন্মুক্ত হয়েছে। এর বাইরে হীরা নামের চরিত্রকেও লেখক বেশ ভালোমতো ফুটিয়ে তুলেছেন। এর বাইরে বেশকিছু ছোটখাট চরি���্র ছিল, যারা অল্প সময়ের জন্য এলেও বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছে। একটি চরিত্রও ফেলনা বা অযথা না। এই বিষয়গুলো একটি বইয়ের গুণাগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই বইটা একটা শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। গল্পের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন সমাজকে, উপহাস করেছেন এর অসঙ্গতিগুলোকে। শিক্ষা ব্যবস্থার যে করুণ অবস্থা, তার দিকে লেখকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। স্কুলে নতুন সহপাঠীকে বুলি করা, মজা ওড়ানোর মতো ঘটনা কিন্তু মাঝে মাঝেই মনের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে। পাঠ্যবই কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার চেয়ে প্রকৃতির কাছে মানুষের শিক্ষাটা বেশি। মানুষ শিখেও বেশি এই পরিবেশে। বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের জ্ঞানকে সীমিত করে তোলে। আমাদের সমাজে পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য বই পড়াকে রীতিমতো ক্রাইম মনে করা হয়। অভিভাবকদের ভাবনা, এতে উন্নতি হয় না। অথচ লেখক দেখাতে চেয়েছেন এই বাইরের বই পড়া একটি মানুষকে কতটা জ্ঞানী করে তোলে। শিক্ষিত হওয়ার চেয়ে জ্ঞানী হওয়া উত্তম। তাছাড়া কোনো কাজ ছোটো নয়। মানুষের নিজ হাতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে হয়। অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে জীবন হয়তো চলে যায়, কিন্তু প্রকৃত স্বাদ কি পাওয়া যায়?
একজন কৃষককে এই সমাজ অবজ্ঞার চোখে দেখে। মূর্খ, অশিক্ষিত বলে মনে করে। অথচ লেখকের এই লেখাতে আমরা এমন এক কৃষক দেখতে পাই, কৃষক মাত্রই অশিক্ষিত বা মূর্খ না। বরং শিক্ষিত মানুষের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কাজে লাগাতে পারলে ভালো কিছু সম্ভব। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে কৃষকসত্তা চুপটি করে থাকে। যদিও অতিরিক্ত ভালোবাসা বা প্রত্যাশা এক সময় ঝড়ের কবলে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। সেখান থেকে আবারও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাটাই জীবনের লড়াই। তখন হয়তো সেই ভালোবাসাটা থাকে না।
এই উপন্যাসের এক পর্যায়ে ঘটনাপ্রবাহ একঘেয়েমি মনে হতে পারে। তারপর থেকে গল্পের পরিবর্তন হয় হীরার আগমনে। একজন নারী মানুষের জীবনের অনেক কিছুই পরিবর্তন করে। যে মানুষটা একাকীত্ব ছাড়া কিছুই চিনত না, ধীরে ধীরে সে হয়ে ওঠে সহমর্মী। মানুষের প্রতি অনুভূতিশীল। হীরার গল্পটা অনেক দিক দিয়েই একাধিক অনুভূতি দিয়ে গিয়েছে। যেই মানুষটা সেই ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ঢাকা ছেড়েছিল, একজন মেয়ের জন্য সেই ঢাকাতেই যাওয়া!
আর সকল একঘেয়েমি দূর করে ঢাকার গল্পটা একাধিক রং ছড়িয়েছে। ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়েছে দৃশ্যের। যে খুনের গল্প দিয়ে উপন্যাসের শুরু, তার তার মূল উপজীব্য এখানে। যদিও এখানে লেখক পাঠকের ভাবনা নিয়ে খেলেছেন। একেকবার একেক রোমাঞ্চ উপস্থিত হয়েছে। স্থির হয়ে কিছু ভাবনা করার অবকাশ ছিল না। আর এভাবে শেষের দিকে যে অনুভূতি দিয়ে গল্পের হয়েছে, তার কোনো তুলনা হয় না।
পাঠক অনেক কিছু ভেবে নিতে পারেন। লেখকদের মধ্যে পাঠকের মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলা করার এক অদ্ভুত অভ্যাস আছে। আর কিছু হলেই কোনো চরিত্র মেরে ফেলতে চাওয়ার কারণ আমি ঠিক বুঝি না। কিছু মিলন না হওয়ার কারণে এ গল্প অনেক সময় মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হাসানের সাথে তার বাবার শেষ দেখা হওয়ার বাসনা ছিল। কিন্তু….
যদিও এই গল্পের অনেকটা জুড়ে হাসানের বাবার ভূমিকা আছে। না থেকেও তিনি তার দর্শনকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। বাবার আদর্শে তার বই পড়ার অভ্যাস আমার কাছে অমূল্য মনে হয়েছে। আমাদের অভিভাবকরা আমাদের হাতে বই তুলে দিতে চান না। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাদ দিয়ে যে বাবা অসীম জ্ঞানের ভান্ডার ছেলের হাতে তুলে দিতে তার নিশ্চুপ হয়ে থাকার পরও প্রভাবকে অস্বীকার করার উপায় নেই।
ওবায়েদ হকের “ডাকনাম ভুলে গেছি” বইটা লেখকের সবচেয়ে বড় বই। তিনি লিখেছেনও দারুণ। কিছুটা মন খারাপের গল্প, বিষন্নতায় মোড়ানো অভিব্যক্তি বর্ণনাগুলোকে মনের মধ্যে গেঁথে যায়। এমন ভাষাশৈলী, বর্ণনার কারুকার্য, শব্দচয়নের মাধুর্য যেকোনো মাঝারি মানের বইকেও দারুণ করে তোলে। যদিও “ডাকনাম ভুলে গেছি” কিছুতেই মাঝারি মানের নয়। তার চেয়েও বেশি কিছু।
পরিশেষে, আমাদের এই জীবনে আমাদের প্রতিনিয়ত অভিনয় করতে হয়। এভাবে অভিনয় করতে করতে নিজেদের অস্তিত্ব কখনও হারিয়ে যায়। আমরা ভুলে যাই নিজেদের। হয়তো তখন অন্যের কাছে যে পরিচয়ে পরিচিত হই, নিজেদের ডাকনামটাই তখন বিলীন হয়ে যায় কোনো ইতিহাসের অভ্যন্তরে।
চাঁদরাতে পড়ে শেষ করলাম বইমেলা থেকে কিনে আনা ওবায়েদ হক এর উপন্যাসটি। অনেকদিন সময় নিয়ে ধীরে ধীরে পড়েছি বইটি।ওবায়েদ হক আমার পছন্দের লেখকদের মধ্যে একজন। স্বভাবতই বই দেখেই খুশি হয়েছিলাম এই ভেবে যে এতবড় বই লিখেছেন এবার!উনার লেখনীর গুণে ঝরঝর করে পড়া এগিয়ে যায়। গল্পের শুরু হয় এক খুনের স্বীকারোক্তি থেকে। তারপর এই খুনের পিছনের ইতিহাস জানতে গিয়ে আমি মূল চরিত্রের সাথে একেবারে মিশে গিয়েছি বলা যায়। একজন মানুষ এতোটা ভালো কিভাবে হতে পারে?কেনো তার পরিচিত মানুষেরা এভাবে হারিয়ে যায়। হীরা,শাকের এর সাথে সাথে আমিও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি আর কৃতজ্ঞতা পোষণ করছি লেখকের প্রতি, এমন একজন বিশুদ্ধ মানুষকে দেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। একজন ডাকনাম ভুলে যাওয়া মানুষ থেকে সে এক নতুন পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠে। গল্পের শেষটা আমার মতো পাঠকের জন্য স্বস্তির। কেননা আমি কল্পনায় দেখতে পাই সব হারিয়ে নিঃসঙ্গ একাকী মানুষের জীবনে ছোট্ট এক শিশুর হাত ধরে আসে ভালোবাসা আর মুখরিত শৈশবের দিনগুলো, যে সঙ্গীর অপেক্ষায় সে একে একে সব হারিয়েছিলো সেই সঙ্গী খুঁজে পায় সে, অন্যরূপে। বই পড়ে শেষ করে স্বভাবতই আরও একবার তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললাম।
এত মায়াবী একটা কাহিনি।রিডার্স ব্লকে ছিলাম অনেক দিন।একটানে পড়ে ফেললাম বইটা।মাঝে মাঝে বিষন্নতা গ্রাস করেছিলো বইটা পড়তে গিয়ে।তবে সেই বিষন্নতায় ছিলো আনন্দের হাতছানি। আহারে।কত মায়া ছড়িয়ে আছে বইটার অক্ষরে অক্ষরে।
লেখক যেদিন প্রকাশকদের চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করবেন সেদিন উনি আবার ওবায়েদ হক হতে পারবেন। প্রথম অর্ধেক আর শেষ অর্ধেকে বিস্তর পার্থক্য। এতো সিনেমেটিক আর কাকতাল হজম করা খুবই কষ্টকর। শেষ তিনটা বইয়ে এরকম অবস্থা দেখে প্রিয় লেখকের জন্য যারপরনাই খারাপ লাগে।
বহুদিন পর ওবায়েদ হকের কোনো বই পড়ে তৃপ্তি পেলাম। যদিও তার প্রতিটা বইয়ের ক্ষেত্রে যে কমন প্যাটার্ন তিনি ফলো করেন এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবুও অনেকদিন বাদে পড়লাম বলেই হয়তো বিরক্তি আসেনি তেমন ভাবে। নীল পাহাড়, জলেশ্বরীর পরে পছন্দের তালিকায় এই বইয়ের নাম উঠলো।
উপন্যাসটিকে স্থানের ভিত্তিতে চারভাগে ভাগ করা যায়। ঢাকা, মহিমগঞ্জ, ঢাকা, মহিমগঞ্জ। প্রথম অংশের ঢাকা উপন্যাসের সূচনা হিসেবে ভালো ছিল। এরপর মহিমগঞ্জের অংশটা পড়ে একেবাড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। হাসানের নিঃসঙ্গতা, বাড়ির নির্জনতা, গাছ-গাছালির সবুজ, ওবায়েদ হকের ভীষণ সুন্দর গদ্য- সবটা মিলিয়ে যেন একটা দীর্ঘ কবিতা পড়লাম। এরপরের ঢাকা অংশটায় মূলত উপন্যাসের শুরুর দিকের আলগা সুতোগুলো গিট দিয়ে কেটে দেওয়া হয়েছে। শাকের মাহমুদের সঙ্গে হাসানের ১মবার দেখা হওয়াটা ঠিকই আছে কিন্তু ২য়বার দেখা হওয়া এবং তারপরের ঘটনাগুলো ড্রামাটিক লেগেছে। উপন্যাস শেষ হয়েছে মহিমগঞ্জে। মনে হচ্ছিল লেখক শেষটা আগেই ভেবে নিয়েছিলেন। শেষটা ঠিক ওভাবেই করা হবে ভেবে নিয়েই কি তবে হীরার আগমন হয়েছিল! যে অভিশাপ শুরু হয়েছিল সেটাকে সুন্দরভাবে শেষ করা হয়েছে। এবারের বইমেলায় কেনা প্রথম বইটি পড়ে দিল খুশ হয়ে গেছে। এমন চমৎকার উপন্যাসের জন্য ওবায়েদ হককে সাধুবাদ। প্রচ্ছদ করেছেন ফায়জা ইসলাম, প্রচ্ছদটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে।
ওবায়েদ হকের এই বইটা সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি। সাধারণত তাঁর বইগুলো দ্রুত শেষ হয়ে যায়, কিন্তু আকারে বড় হওয়া সত্ত্বেও এটাও দুই দিনের মধ্যেই পড়ে শেষ করে ফেললাম।
তাঁর লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো পরিবেশ নির্মাণ। অনেক লেখক যেখানে গল্পের গতিকে বেশি গুরুত্ব দেন, তিনি সেখানে গল্পের আবহ তৈরিতে বেশি মনোযোগী। ফলে পড়তে পড়তে মনে হয়, আপনি নিজেই সেই পরিবেশের মধ্যে আছেন—প্রোটাগনিস্টের চিন্তা-ভাবনার ভেতর ঢুকে পড়েন।
“ডাকনাম ভুলে গেছি” বইটিতে চরিত্র নির্মাণ ছিল অসাধারণ। চরিত্র সংখ্যা কম হলেও প্রতিটি চরিত্রকে তিনি যথেষ্ট সময় ও গুরুত্ব দিয়েছেন, ফলে তারা একেবারে জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
বইটির সমাপ্তিটাও ছিল একদম পরিপূর্ণ।
অনেকদিন পর সত্যিই ভালো কিছু পড়লাম। সামনে তাঁর আরও লেখা পড়ার ইচ্ছা রইল।
গল্পের শুরু খুনের স্বীকারোক্তি দিয়ে। তখন মাথায় ভাবনা চলে আসে গল্পটা কোনো খুনির নয় তো? আমাদের চিন্তার মাঝেই লেখক গল্প এগিয়ে নিয়ে যান। স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে আমাদের হাজির করেন অতীত ঢাকার আরমানিটোলায়। যেখানে বাস করে ছোট্ট এক পরিবার। বাবা, মা ও তাদের একমাত্র ছেলে।
বাবার পূর্বপুরুষের একসময়ে জমিদারি থাকলেও এখন সেটা শুধুই ইতিহাস। বর্তমানে অবস্থা তাদের যেমনই হোক না কেন বাবার মাঝে বংশের আভিজাত্য ঠিকই দৃশ্যমান। এই আভিজাত্যই তাকে সংসারের দুরবস্থায়ও অন্যের সামনে হাত পাততে বাঁধা দেয়। পেশায় শিক্ষক বাবার হাত ধরেই ছেলেটার স্কুলে যাওয়া শুরু কিন্তু স্কুলের অভিজ্ঞতা তার জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। এটা বুঝতে পেরে স্কুল থেকে ছাটাই করে বাসায় তার পড়াশোনার ভার নিজেই নেয় তার বাবা। এরই মাঝে আসে পরিবারে নতুন অতিথির আগমনের খবর। ছেলেকে জানানো হয় সে খেলারসাথী পাচ্ছে।
হঠাৎ সবকিছু বদলে যায় এক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। বাবা মা-কে সাথে নিয়ে হাসপাতালে যায়। কয়দিন পর ফিরে আসে একা। এরপর মা নিজেও বাসায় ফিরে আসে তবে সাথে আসে না খেলার কোনো সাথী। হাসপাতাল থেকে এসে মায়ের জীবনও ঘটে যায় ছন্দপতন। সে যেন হারিয়ে থাকে কোথাও। এসবের মাঝেই তাদের ছেড়ে যেতে হবে ঢাকার ভিটে মাটি। কেননা এগুলো বিক্রি করে দিতে হয়েছে হাসপাতালের খরচ চালানোর জন্য।
কিন্তু ঢাকার জায়গা ছাড়ার আগেই তাদের কাছে চলে আসে গ্রামের জমিদার বাড়িতে যেয়ে থাকার সুযোগ। গ্রামের বিচ্ছিন্ন জমিদার বাড়িতেই শুরু হয় তাদের তিনজনের সংসার। এভাবেই গল্পের প্রবাহ আগাতে থাকে এবং ছেলেটার জীবনের বিভিন্ন প্লট পরিবর্তনের ছবি নিয়েই ওবায়েদ হক এঁকেছেন ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’ উপন্যাস।
একটা বইয়ে ঠিক কতটা মায়া জড়ানো থাকতে পারে আমার জানা নেই। তবে ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’ বইয়ের প্রতিটা অক্ষর যেনো মায়ায় জড়ানো। একটা সাধারণ পরিবারের ছেলেকে নিয়ে ওবায়েদ হক লিখেছেন মায়ায় জড়ানো অসাধারণ এক গল্প।
লেখকের সব থেকে বড় উপন্যাস ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’। লেখকের উপমার ব্যবহার, গদ্যের ছন্দ, বর্ণনাভঙ্গি ও চরিত্রায়ন উপন্যাসটাকে সার্থক করেছে। গল্পের পাতায় পাতায় ফুটে আছে গভীর জীবনবোধের কথা। লেখক তুলে এনেছেন স্বল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের মাঝে যে গাঢ় বন্ধুত্ব তৈরি হতে পারে তার কথা। ভালোবাসার জন্য মানুষ কোনো কিছুই তোয়াক্কা করে না এটাও যেন আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন।
বর্ণনার ক্ষেত্রে বড় ব্যাপারগুলোর পাশাপাশি লেখক যেভাবে ছোট ব্যাপারগুলোও তুলে ধরেন এই জিনিসটা খুবই কম দেখা যায়। এছাড়াও প্রকৃতির সাথে মানুষের যে নিবিড় সম্পর্ক বিভূতিভূষণের লেখায় পাওয়া যায় ঠিক তেমনই লক্ষ্য করেছি ওবায়েদ হকের লেখায়। আমার মনে হয় বর্তমানে প্রকৃতির বর্ণনা দেওয়ার ক্ষেত্রে ওবায়েদ হকের জুড়ি মেলাভার। পড়ার সময় মনে হচ্ছিল নিজেই যেনো প্রকৃতির অংশ হয়ে গিয়েছি।
উপন্যাসটা পড়তে যেয়ে কখনো হেসেছি, কখনো বা ডুবে গিয়েছি বিষন্নতায়। লেখকের ‘নীল পাহাড়’ যেভাবে মুগ্ধ ও তৃপ্ত করেছিল একইভাবে মুগ্ধ ও তৃপ্ত হলাম ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’ পড়ে। আমাদের জীবন, পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছুর গল্পই হয়ে থাকবে ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’।
আমার লেখা শেষ করবো বইয়ের একটা অংশ দিয়ে- “মানুষ থেকে দূরে গিয়ে একা থাকা যায় না, বাবা, মানুষের মধ্যে গিয়েই একা থাকতে হয়। আমার গুরুর কথা। আমি তো শহরে, নগরে একা একা ঘুরে বেড়াই, যখন সঙ্গের প্রয়োজন হয় তখনই এই বনে চলে আসি।”
ওবায়েদ হকের "নীল পাহাড়" পড়ার পর এবারে পড়লাম উনার সর্বশেষ বই "ডাকনাম ভুলে গেছি"। বইটা হাসান নামের একজন একাকী ছেলেকে নিয়ে যার আবাস হল অভিশপ্ত জমিদারবাড়ি। কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ এই বাড়ির ত্রিসিমানায়ও ঘেঁষে না। লোকে তার নাম জিজ্ঞাসা করলে সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে স্মৃতি হাতড়ায়। তাকে নাম ধরে ডাকার মত কেউ নেই। তার বন্ধু হল বন্য পশু-পাখি, গাছপালা কিংবা খোলা আকাশ। কিন্তু মানুষের জীবন সবসময় একই স্রোতে যায় না। জমিদার বাড়ির অভিশাপ ঠেলে মানুষ একসময় ঠিকই এই বাড়ির চৌকাঠে পা রাখে। কিন্ত কিভাবে হাসান একা হয়, কিভাবেই বা সে সঙ্গী পায় তা জানতে হলে বইটি পড়তে হবে। শেষের কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। বইটি কেনা সার্থক।
সম্প্রতিক সময়ে গুণী লেখকদের তালিকায় ওবায়েদ হকের নাম অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। ‘জনপ্রিয়’ শব্দটি সচেতনভাবেই ব্যবহার করছি না, কারণ জনপ্রিয়তার ভিড়ে অনেক সময় গুণহীন লেখকরাও জায়গা করে নেন।
ওবায়েদ হক আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন লেখক। তাঁর গল্প বলার ভঙ্গি বরাবরই আমাকে আকৃষ্ট করে। “ডাকনাম ভুলে গেছি” বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পটি যেন একটি চক্র। নিষ্ঠুরতা দিয়ে শুরু হলেও শেষটা মমতায় আবদ্ধ। এই মমতার মাধ্যমেই বহু বছরের পুরোনো কলঙ্ক মুছে যায়। যেন নতুন সূর্য উঠে চারপাশ আলোকিত করে, দূর করে সব অন্ধকারাচ্ছন্নতা।
বইটির প্রধান চরিত্র— যে মাঝেমধ্যে নিজের নামই ভুলে যায়। ছোটবেলা থেকেই সে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন, একাকী পরিবেশে বড় হয়েছে। কিন্তু এই একাকীত্ব তাকে গ্রাস করতে পারেনি। বরং সে প্রকৃতি ও জীবজগতের সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজের নিঃসঙ্গতা কাটিয়েছে। তাই এটি নিছক একাকীত্বের গল্প নয়; বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর প্রতীকী অর্থ, এমনকি সমাজের প্রতি সূক্ষ্ম এক উপহাসও।
তবে সমালোচনার জায়গাও রয়েছে। বইটি বেশ সিনেম্যাটিক, যেখানে ঘন ঘন নাটকীয় মোড় দেখা যায়। বিশেষ করে শেষের দিকে ছেলেটির সেই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কিছুটা অতিনাটকীয় মনে হয়েছে। যদিও এই নাটকীয়তাই বইটিকে উপভোগ্য করে তুলেছে, তবুও শেষাংশে এর মাত্রা একটু বেশি বলেই মনে হয়েছে।
আরেকটি বিষয় দৃষ্টিগোচর হয়েছে—শুধু এই বই নয়, লেখকের অন্যান্য বইয়েও পুরুষ চরিত্রগুলোর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
সব মিলিয়ে, বইটি পাঠযোগ্য এবং উপভোগ্য। বইপ্রেমীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে হাইলি রিকমেন্ডেড। যদিও এর প্রয়োজন হয়তো নেই, কারণ বইটি ইতোমধ্যেই পাঠকমহলে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
কোনো একটা বই পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে শেষ করার মত আনন্দ খুব কমই আছে আমার কাছে। বহুদিন পরে আবার সেই আনন্দের অনুভূতি হলো ওবায়েদ হকের "ডাকনাম ভুলে গেছি" পড়ে।
বইটা মূলত প্রেমেরই উপন্যাস, কিন্তু প্রগাঢ় জীবনবোধের সুতো জড়িয়ে আছে পুরোটা জুড়েই৷ এ ধরনের উপন্যাস আজকাল বোধহয় খুব একটা লেখা হয় না। নিবিড় প্রকৃতির সাথে একাকী মানুষের এমন মায়ায় জড়ানো মিথস্ক্রিয়ার দেখা আমি পেয়েছি বিভূতিভূষণের উপন্যাস গুলোতে।
লেখক ওবায়েদ হকের বেশ কিছু লেখা আমি আগেও পড়েছি, ভালো লেগেছে প্রতিটাই। কিন্তু এটা তার আগের সব কিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে। ভাষায়, বর্ণনায়, উপমায়, কাহিনির বিন্যাসে... একটা নিখাঁদ বাংলা উপন্যাস।
সাহিত্যের কলাকৌশলে মধ্যে Personification এর প্রতি লেখকের খুব দুর্বলতা আছে। প্রায় প্রতিটা লাইনেই এটার এমন এমন সব ব্যাবহার করেছেন, মুগ্ধতা নিয়ে দুই তিনবার একই লাইন পড়া হয়েছে। আগের উপন্যাসের তুলনায় আয়তনেও বেশ বড়, প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার। ফলে তাড়াহুড়ো করে শেষের তাড়া ছিল না।
একটা খুনের স্বীকারোক্তি দিয়ে গল্পের শুরু—শুনতে যতটা সরল, ভেতরে ততটাই স্তরযুক্ত। শুরুতেই একটা রহস্য তৈরি হয়, কিন্তু গল্প আসলে ধীরে ধীরে আমাদের নিয়ে যায় এক মানুষের ভেতরের জগতে, তার বেড়ে ওঠা, হারানো আর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্পে।
ঢাকার পুরনো এক পরিবার থেকে শুরু হয়ে গল্পের পথ ঘুরে যায় এক নির্জন জমিদারবাড়িতে। সেই পরিবর্তনের সাথে বদলে যায় এক শিশুর জীবনও। ছোটবেলার কিছু আঘাত, একাকীত্ব, আর পারিবারিক ভাঙন মিলিয়ে তার ভেতরে তৈরি হয় এক ভিন্ন মানসিক জগৎ—যেখানে মানুষের চেয়ে প্রকৃতি, গাছপালা আর নীরবতাই বেশি আপন হয়ে ওঠে।
লেখক এখানে শুধু একটা গল্প বলেননি, বরং খুব সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন—একজন মানুষ কীভাবে পরিস্থিতির কারণে ধীরে ধীরে সমাজ থেকে দূরে সরে যেতে পারে, আবার নিজের মতো করে বেঁচে থাকার পথও খুঁজে নেয়। এই যাত্রায় আমরা দেখি সম্পর্কের ভাঙাগড়া, হারিয়ে যাওয়া, আবার নতুনভাবে কিছু পাওয়া।
উপন্যাসের বড় শক্তি এর পরিবেশ আর বর্ণনাশৈলী। গ্রাম, বন, নিঃসঙ্গ বাড়ি—সবকিছু এত জীবন্তভাবে উঠে এসেছে যে পড়তে পড়তে মনে হয় পাঠক নিজেই সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে হাঁটছে। একইসাথে চরিত্রগুলোও খুব স্বাভাবিকভাবে গড়ে উঠেছে। সংখ্যা কম হলেও প্রত্যেকেই গল্পে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
গল্পের মাঝামাঝি অংশে কিছুটা ধীরতা থাকলেও পরে নতুন চরিত্রের আগমনে গল্পে আবার গতি আসে। তখন একাকীত্বের গল্পের সাথে মিশে যায় সম্পর্ক, ভালোবাসা আর মানবিকতার নতুন রং। এই পরিবর্তনটাই উপন্যাসকে আরও পূর্ণতা দেয়।
এই বই শুধু একটি জীবনের গল্প নয়—এটি সমাজ, শিক্ষা, মানুষের মানসিকতা এবং ‘শিক্ষিত’ আর ‘জ্ঞানী’ হওয়ার পার্থক্য নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে। একইসাথে এটি মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যতই দূরে সরে যাক, কোথাও না কোথাও তার ভেতরে সম্পর্কের প্রয়োজন থেকে যায়।
“ডাকনাম ভুলে গেছি” আসলে এক ধরনের প্রতীক—নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলা, অথবা নতুন পরিচয়ে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। বইটা শেষ হওয়ার পরও এর অনুভূতি কিছুক্ষণ থেকে যায়, একটু নীরব করে দেয়।
চুম্বকের মতো টেনে নিচ্ছিলো গল্প, ঘুমে চোখ ভারি হওয়ার আগ পর্যন্ত 1 more page করে পড়ে গেছি। শহুর শৈশবের বর্ণনা, তারপর গিয়ে নদীর তীরে সবুজের মাঝে বেঁচে থাকা, সাথে অতিপ্রাকৃতের উপাদান- সব মিলিয়ে worth it লেগেছে। খুব সামান্য একটা ইলেকট্রিসিটিবিহীন সন্ধ্যা, সারি সারি শহরের চাপা গলি, গ্রামের হাট বাজার - সবকিছুর 'অসাধারণ সুন্দর' বর্ণনা দেওয়া, শুধু চোখের সামনে ভাসে না, অনুভব ও করা যায়।
নায়কের শহরে আসার পরের ঘটনাবলীতে নাটকীয়তা বেশি লেগেছে আর ইখলাক হোসেনের পরিণতিতে কষ্ট পেয়েছি- তাই এক তারা কম দিলাম।
❛সমাজে বাস করেও অনেক সময় সামাজিক হওয়া যায় না। আবার একাকীত্বের রাজত্বে বাস করেও সমাজের সামাজিক মানুষগুলো থেকে ঢের বেশি সভ্য হওয়া যায়।❜
শেষ রাতে খিলক্ষেত থানায় হাজির হলো এক পুরুষ। এসেছে আত্মসমর্পণ করতে। বড়ো সাহেবের সাথে দেখা করবে। কিন্তু বড়ো সাহেবের কি কাজ এতই যে নিশির নিদ্রা ভঙ্গ করে থানায় ঝিমুবে? সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করো। সকাল হতে হতে আমরা একটু অতীতের পাতায় ঘুরে আসি।
রূপকথার রাজা রানীর গল্পগুলো শুরুই হয় ঠিক এভাবে, ❛এক যে ছিল রাজা.... মস্ত তার প্রাসাদ...❜
আমাদের অতীতের গল্পও এভাবেই কিছুটা শুরু হোক।
শেখ বাড়ির এক কালে ছিল বিশাল প্রতিপত্তি। সম্পত্তি, নামের অভাব ছিল না। জমিদারি হয়তো তাদের র ক্তেই ছিল। তাইতো শেখ বাড়ির এক পুরুষ মামলা মোকদ্দমায় জমিজমা খুঁইয়ে শুধু শেষ সম্বল হিসেবে ছিল আরমানিটোলার একখানা বাড়ি। সময়ের সাথে বাড়ির জৌলুস মলিন হয়েছে, দেয়ালে ফাটল ধরেছে, অর্থে টান পড়েছে কিন্তু ঐ জমিদারির মনটায় কোনো মরচে ধরেনি। শেখ বাড়ির পুত্র তাই অতীত গৌরবকে পুঁজি করেই চলে। তবে সেই পুঁজিতে গল্পের পেট ভরলেও মনুষ্য পেট মানে না। পেটের দায়ে আর স্ত্রী পুত্রের মুখে অন্ন তুলে দিতে তাকে তাই স্কুলের মাস্টারি করতে হয়।
পাতে আমিষের অভাব থাকলেও পরিবারে শান্তি তখনো ছিল। ছোট্ট পুত্র হাসান বাবার ইজি চেয়ারে বসে বই পড়া আর মায়ের ভেজা চুলে রান্নাঘরে রান্না করার নিত্য রুটিন নিয়ে বেশ যাচ্ছিল।
একদিন বাবার হাত ধরে সে পা রাখলো বিদ্যালয়ের আঙিনায়। শিক্ষালাভ করার এই স্থান তার মনে ভীতি সঞ্চার ব্যতীত কিছুই করতে পারল না। বিদ্যালয়ের সহপাঠীদের বিরূপ আচরণ আর নিজের চাপা স্বভাব মিলে বিদ্যালয় যেন এক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার নাম। বাবাও ব���ঝলেন হয়তো। তাই স্কুল শিক্ষক হয়েও ছাড়িয়ে আনলেন পুত্রকে স্কুলের গণ্ডি থেকে। হাসানের জীবনে শুরু হলো অন্যরকম এক শিক্ষা। কিন্তু জীবনের সবথেকে অবাক করা শিক্ষার মুখোমুখি হতে তখনো দেরি।
বাসায় হাসানের একাকীত্বের সঙ্গী হিসেবে আগমন হবে এক ছোট্ট শিশুর। হাসান প্রতীক্ষায় থাকে। একদিন বাবা তড়িঘড়ি করে মাকে নিয়ে হাসপাতাল যায়। দিন যায় বাবা ফেরে না মাকে নিয়ে। সঙ্গীও আসে না।
একদিন মলিন মুখে বাবা ততোধিক মলিনমুখী মাকে নিয়ে ফিরলেন। আসলো না কোনো নতুন সঙ্গী। মায়ের চিকিৎসায় অভাবের এই সংসারের শেষ সম্বল বাড়িটাও নাকি জমিদার বংশের বাবাকে বিকিয়ে দিতে হয়েছে। হাসানেরা হলো ঘরছাড়া।
তবে সর্বদিক একত্রে বন্ধ হয় না। কাকতালভাবেই উত্তরাধিকার সূত্রে তারা পেয়ে যায় মহিমগঞ্জের এক পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির মালিকানা। তিনজনের সংসার পাড়ি জমায় সেই বাড়িতে।
জমিদার বাড়ি, তায় আবার পরিত্যক্ত! এক ঘিরে আছে নানা গল্প। আর বলাই বাহুল্য গল্পগুলো ভূতুড়ে। এই বাড়িতে জড়িয়ে আছে এক জমিদারের গল্প অভিসারের দাফনের গল্প। অভিশাপ নিয়ে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। নির্জন এই বাড়িতে তিনটে মানুষের নতুন সংসার।
এত বিশাল বাড়ি কিন্তু গাঁয়ের লোকেরা পা মারায় না। কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তাদের কুসংস্কারকে করেছে পোক্ত। এখানেই প্রকৃতির দান আর অল্প কিছু অর্থ দিয়ে কেটে যাচ্ছিল হাসানদের দিন।
মাথার উপর ছাদ মিললেও সেই সুখ আর আসেনি। সময়ের ফেরে একদিন মা ধরণীর মায়া ত্যাগ করলেন। বাকি রইলো পিতা পুত্র। স্ত্রীর প্রয়াণ সইতে না পেরে একদিন বাবাও কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। বিশাল জমিদার বাড়িতে অদৃশ্য অভিশাপের ছায়া সঙ্গী করে একা পড়ে রইলো হাসান। নিজেকে সঁপে দিলো বইয়ের কাছে। ধীরে ধীরে বনে গেল এক কৃষক। ফুল, পাখি, গাছ আর পুকুর নিয়ে তার একলা রাজত্ব।
এই একাকীত্বে একসময় বন্ধুত্বের ছোঁয়া নিয়ে এসেছিল ইখলাক হোসেন। জোব্বা পড়া মওলানা। তার সঙ্গ যেন হাসানের জীবনে অন্যরকম এক অনুভূতি তৈরি করল। কিন্তু সময়ের করাল গ্রাসে সেই ইখলাকও হারিয়ে গেল।
দুই দশক ধরে এভাবেই কিছু সঙ্গ, অনেকটা একাকীত্ব সঙ্গী করে হাসান পার করছিল। তবে জীবনের গল্প এবার নতুন পাতায় লেখা হচ্ছিল।
একদিন জমিদারবাড়ির বারান্দায় অচেনা অচেতন এক নারীকে আবিষ্কার করে সে। কোথা থেকে এলো সে জানা নেই। হীরা নামের শহুরে এই মেয়েটি যখন জিজ্ঞেস করল, ❛আপনার নাম কী?❜ তখন যেন হাসানের মনে হলো বহুদিন কেউ নাম ধরে না ডাকতে ডাকতে সে হয়তো ভুলে গেছে তার ডাকনাম!
হাসানের একাকীত্বের রাজত্বে মেয়েটি অদ্ভুত এক রাজত্বের সৃষ্টি করলো। যেন স্বপ্ন কিংবা অলীক কিছু। মেয়েটির থেকে জানা গল্প আর নতুন এক সৃষ্টির প্রতি অমোঘ আকর্ষণ হাসানের জীবনের তরঙ্গ বদলে দিলো।
হাসান ঢাকায় ছুটে চলেছে একটি খামবদ্ধ চিঠি নিয়ে। পকেটে একটা সোনালী ঘড়ি। তখনো সে জানতো না সেও মানুষ খু ন করতে পারে.....
জমিদারবাড়ির অভিশাপ বয়ে চলা অভিশপ্ত বাড়িতে ফিরার আর অবকাশ কি হবে? শাপ কাটাতে নতুন কোনো ঘটনা কি ঘটবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝ডাকনাম ভুলে গেছি❞ ওবায়েদ হকের লেখা এপর্যন্ত দীর্ঘ কলেবরের উপন্যাস।
সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে ওবায়েদ হক অন্যতম শক্তিশালী লেখক। তার লেখায় শব্দের ব্যবহার, উপমা আর ছন্দের গভীরতা খুব সাধারণ বাক্যকেও অনবদ্য করে তোলে।
এই উপন্যাসের শুরুটাও তেমনই। গভীর রাতে হাসান নামের এক অদ্ভুত লোক হাজির হয়েছিল থানায়। উদ্দেশ্য আত্মসমর্পণ। ঠিক এই প্যারাটার বর্ণনা লেখক এত মাধুর্য্য দিয়ে দিয়েছেন যেন মনে হচ্ছিল রাত বিরেতে থানায় আত্মসমর্পণ করার ব্যাপারটা খুবই অ্যাস্থেটিক!
যাই হোক, ২৭২ পৃষ্ঠার উপন্যাসে লেখক তার লেখার উপমার আড়ালে অদ্ভুত এক দুনিয়ার গল্প বলেছেন। যে দুনিয়া আমাদের থেকে আলাদা না। কিন্তু বর্ণনার জোরে তাই হয়েছে স্বপ্নের মতো।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাসান। যার অদ্ভুত শৈশব আর একা হয়ে যাওয়ার গল্প ছিল শুরু থেকে। অভাব, জমিদারি আর বাবার কাছে শিক্ষিত হওয়ার মধ্যেই কেটেছে তার শৈশব কৈশোর। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে হাসানের কি আদৌ কোনো শৈশব কৈশোর ছিল?
লেখক উপন্যাসের দ্যোতনার মাঝেই সামাজিক নিয়মনীতির দিকে আঙুল তুলেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও যে শিক্ষিত এবং স্বশিক্ষিত হওয়া যায় তার প্রকাশ হাসানের মধ্য দিয়ে করেছেন। এত জানে কিন্তু একটা সার্টিফিকেট নেই, আহারে! কিংবা আহারে! এত সার্টিফিকেট কিন্তু কিচ্ছু জানে না - এই ব্যাপারটা লেখক অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে পুরো উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন।
এসেছে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের অন্য শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ও।
বংশের নাম করে আমরা আমাদের বর্তমানকে অনেক সময় বিষিয়ে তুলি কিংবা অতীত গরিমার বশবর্তী হয়ে শেষ করে দেই পরবর্তী প্রজন্মের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে। শেখ পরিবারের পূর্ব পুরুষ আর হাসানের মাধ্যমে লেখক সে বিষয়কে নির্মমভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
শুরুর থেকে প্রথমার্ধ পুরোটাই হাসানের বয়ানে আর তার জীবনের প্রতিটা পরতের নির্যাস দিয়েছেন লেখক। হাসানের নিঃসঙ্গ জীবন, জনসাধারণের মাঝে নিজের অস্বস্তি আর অল্প সময়ের সঙ্গী ইখলাকের সাথে স্মৃতিগুলো দিয়ে কেটেছে। একঘেঁয়ে মনে হতে পারতো। তবে লেখকের জাদুকরী বর্ণনার গুণে একঘেয়ে জীবনের খেরোখাতা উপভোগ্য লেগেছে।
গল্পের মোড় বদলে যেন শ্রাবণের বারিধারা এসেছিল হীরার আগমনে। হীরা এসে যেমন উপন্যাসে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে তেমনি হাসানের জীবনেও নিয়ে এসেছিল বদল। একা থেকে কারো সাথে কথা না বলে সমাজের চোখে অসামাজিক ছেলেটাই কেমন করে অনুভূতিতে আক্রান্ত হলো তার নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে উপন্যাসে।
পরিত্যক্ত বলা যায় এমন জমিদারবাড়ি, ভৌতিক আবহ ওয়ালা কুসংস্কার আর জোছনার মায়া মিলে হীরা আর হাসানের উপস্থিতি যেন মোহময় করে তুলেছিল। লেখক পরিবেশের যে সম্মোহনী বর্ণনা দিয়েছেন তাতে করে ওই ভয় জাগানিয়া বাড়িটাও চুম্বকের মতো আকর্ষণ করেছে।
হাসান যেমন এখানে পর্যাপ্ত সময় পেয়েছে নিজেকে মেলে ধরতে ঠিক তেমনি হীরার উপস্থিতির পর হীরার ব্যক্তিত্ব, অতীত গল্প সবই ছিল দারুণ। লেখক আগত চরিত্রের মেলা না বসালেও যাদের এনেছেন তাদের প্রতি সুবিচার করেছেন। তাদের গল্পগুলো পরিপূর্ণ ছিল।
শেষের দিকে লেখক হাসি আর হতাশা কিংবা হাহাকারকে সমান্তরালে রেখেছেন। সমাপ্তির দোটানা আর পরিণতির মুখোমুখি হয়ে পাঠক হিসেবে আমিও ভাবছিলাম কোনটা ভেবে নিবো? সুখটাই সই নাকি বেদনার পরশ নেবো?
তবে এত অসাধারণত্ব দিয়েও আমি বলব এই উপন্যাসে আসল ওবায়েদ হককে পাইনি। লেখকের গল্প বলার ধরন, উপমা কিংবা শব্দ চয়ন নিয়ে সমালোচনা করার ধৃষ্টতা নেই। এখানে তিনি মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন অসীম দক্ষতায়।
কিন্তু গল্পের মাঝে লেখক খুব বেশি কাকতালের আশ্রয় নিয়েছেন। এতগুলো কাকতাল আসলে হজম করা কঠিন। সেসব জায়গায় ঘটনার প্রেক্ষিতে রুদ্ধশ্বাস ফেলে একটু নিস্তার পাওয়া গেলেও পরিতৃপ্তি আসেনি। ব্যাখ্যাতীত ঘটনাও ছিল। যেসব একটু বেশি নাটকীয় হয়ে গেছিল।
হাসানের ঘটনা পড়তে পড়তে মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল লেখক তাকে টারজান বানাতে চাচ্ছেন নাকি? যদিও না।
শেষটা হাহাকার জাগানো সুন্দর। লেখক যে আবহের সৃষ্টি করেছেন সেখানে তিনি সার্থক। কাকতাল গুলো ছেড়ে দিলে সুন্দর এক পাঠ অভিজ্ঞতা উপন্যাসটি।
থানায় শুরু হওয়া গল্পের শেষটা থানায় গিয়ে শেষ হবে নাকি ওই জমিদার বাড়ির আরও কিছু খেল দেখানো বাকি তা জানতে হলে আপনিও ভুলে যেতে পারেন আপনার ডাকনাম!
প্রচ্ছদ:
প্রচ্ছদটা বেশ। ছিমছাম সুন্দর।
❛অরণ্যের রাজত্ব পেয়েছি ফুল, গাছ, ফসল আর পশু পাখি এই প্রজা নিয়ে তো বেশ আছি তাদের মাঝে থেকে আমি ডাকনাম ভুলে গেছি।❜
এক সন্তানহারা মায়ের মৃত্যু কিংবা সব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া বালকের অভিশপ্ত একাকী জীবন আমার চোখে জল না আনতে পারলেও সদ্য জন্ম নেওয়া এক শিশু আমার চোখে এনেছে জল।
একজনকে খুন করে খুনি নিজে থানায় এসেছে রাত দুটোর সময় নিজেকে সারেণ্ডার করাতে। যাকে দেখে মনে হবেনা সে এই সভ্য সমাজের কেউ। গল্পের শুরু এমন নাটকীয় ভাবে শুরু হয়েছে।
রমিজ শেখকে কাজের জন্য প্রায়ই ঢাকায় আসতে হয় বলে তিনি ঢাকায় একটা বাড়ি বানালেন। সেখানেই একসময় স্থায়ী হলে। পিতার পর পুত্র, পুত্রের পরিবারের স্থায়ী আবাসস্থল হলো ঐ বাড়ি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস কিংবা নিছক নিয়ত'র ছোবলে একসময় সেই বাড়ি বিক্রি করে স্ত্রী'র চিকিৎসার খরচ মিটিয়ে ঘরহীন হলেন রমিজ শেখের পুত্র পরিবার।
উড়ো চিঠির মতো উড়ো একখণ্ড ভূত জমিদার বাড়ি জুটলো ঘরহীন ঐ পরিবারের। কর্মের ফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোগ করতে হয়। তারই প্রেক্ষিতে পিতা-মাতাহীন হলেন হাসান শেখ। জঙ্গলে থাকতে থাকতে হাসান একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলেন জঙ্গলে থাকা ঐ মেছোবাঘ কিংবা শেঁয়ালের মতো প্রাণহীন। তাতে তার বিশেষ কোনো অসুবিধা হতো বলে মনে হয় না। কালবৈশাখী ঝড়ের মতো তার জমিদার বাড়ির বারান্দায় এলো এক নারী। কে এই নারী? তার পরিচয় কী? এখানেই বা আসলো কিভাবে সে?
লেখকের আমি যে কয়েকটা বই পড়েছি সেসবে যেভাবে লেখার ধরন ছিলো এটাতে পুরোপুরি ভিন্ন স্টাইলে লিখেছেন বলে আমার মনে হয়। পড়ার শুরুতেই অজান্তেই মনে হয়েছে এত নাটকীয়ভাবে সবকিছু লেখা কেনো! গল্প যত সামনে এগিয়েছে তত বিষয়টা খাপ খাইয়ে গিয়েছে। মনে হয়েছে এভাবে বর্ণনা করাতেই নায্য করা হয়েছে গল্পের প্রতি, চরিত্রের প্রতি। খুব সুন্দরভাবে প্রতিটা চরিত্রে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।
গল্পের শুরুতে যে অতি দুষ্টু লোকের জন্য রাগ হয়েছে শেষে তার জন্যই মন ভারি হয়েছে। সাধারণ কাহিনীকে লেখক অতি চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। সহজেই পড়তে পেরেছি আমার মনে হয়েছে। একটা চরিত্রকে শুরু থেকেই অতি যত্নে আস্তে আস্তে তৈরি করে পরিণয়ে যখন সেই চরিত্রের জন্ম হয়েছে তখন তৃপ্তিতে চোখে পানি এসেছে।
সবমিলিয়ে গত বছরের উন্মাদ আশ্রমের জন্য পাঠকের মনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিলো "ডাকনাম ভুলে গেছি" সেই ক্ষতের মোক্ষম ঔষধ ছিলো। মনে হলো সেই পুরনো লেখক'কে আবার ফিরে পেয়েছি। ধন্যবাদ আপনাকে।
ওবায়েদ হকের 'ডাকনাম ভুলে গেছি' কেবল একটি কাহিনী নয়, বরং মানুষের অস্তিত্বের সংকট, একাকীত্ব এবং সামাজিক অসংগতির এক নিপুণ দর্পণ। উপন্যাসের শুরুতেই একটি খুনের স্বীকারোক্তি পাঠককে এক রহস্যময় আবহে টেনে নেয়, যার শেকড় প্রোথিত কয়েক দশক আগের এক অভিজাত অথচ ভেঙে পড়া পরিবারের ইতিহাসে।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হাসান। শৈশবে ঢাকার আরমানিটোলায় বেড়ে ওঠা এই শান্ত ছেলেটি স্কুলে বুলিং ও পারিবারিক বিপর্যয়ের শিকার হয়। মায়ের মৃত্যু এবং বাবার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া হাসানকে সম্পূর্ণ একা করে দেয়। এই একাকীত্ব থেকে বাঁচতে সে প্রকৃতির মাঝে আশ্রয় খোঁজে; হয়ে ওঠে এক স্বশিক্ষিত কৃষক। লেখকের বর্ণনায় হাসানের এই 'বন্য' হয়ে ওঠা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে ফুটেছে। পরবর্তীতে হীরা নামক নারী চরিত্রের আগমন গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, যা হাসানকে পুনরায় মানুষের প্রতি অনুভূতিশীল হতে শেখায়।
উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলী লেখকের উপমার ব্যবহার এবং প্রকৃতির বর্ণনা। গ্রামের অন্ধকার চিরে বিদ্যুতের আগমনকে যেভাবে তিনি 'শাস্তিভোগ করা দণ্ডায়মান বালকের' সাথে তুলনা করেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে প্রকৃতির পাঠ যে একজন মানুষকে বেশি জ্ঞানী করে তোলে, সেই দর্শনটি লেখক এখানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজের প্রত্যাশা মেটাতে অভিনয় করতে করতে আমরা এক সময় নিজেদের আসল পরিচয় বা 'ডাকনাম' হারিয়ে ফেলি। বিষণ্ণতা আর পাওয়া-না পাওয়ার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ এই উপন্যাস। যারা একটু ধীরগতির কিন্তু গভীর জীবনবোধসম্পন্ন লেখা পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার পঠন হতে পারে।
কোন এক অজানা কারনে আজকে মনটা খুবই খারাপ, বলা যায় অনেকদিন এরকম একাকিত্ব বোধ করিনি। বইয়ের ২৫ নম্বর চ্যাপটার টা ছিল পিক।যেখানে লেখকও অনেক একাকিত্ব বোধ করছিলেন। তার সাথে কিছুটা রিলেট করতে পেরে আরো মন খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু বইটা চমৎকার আর অসাধারণ। ওবায়েদ সার হতাশ করেননি, বরাবরের মতই উৎসাহ ধরে রেখেছেন প্রতিটা চ্যাপটারে। hats off!!!
৪.৭৫/৫.০০! ইন্টারভিউয়ের ওয়েট করতে করতে যখন বইটা শেষ করলাম, তখন হীরার মতোই প্রশান্তির হাসি ছিল মুখে, চোখের কোণে পানিও! বইয়ের মাঝের এক মৃত্যু কষ্টের কান্না কাঁদিয়েছিল, শেষের এক জন্ম আনন্দের কান্না কাঁদিয়েছে! খুব প্রশান্তি নিয়ে শেষ করলাম অনেকদিন পর একটা বই! হয়ত ড্রামাটিক লাগতে পারে অনেকের কাছে, তবুও ভালো লাগা ছড়ায়ে গেল এইটা ই বড় কথা!
বাংলাদেশের উপন্যাসের পাঠক এখনো ফ্যান্টাসি পছন্দ করেন। ফ্যান্টাসি বলতে আমরা এখন আরআর মার্টিন, জেকে রাওলিংদের বলা গল্পগুলোর ধারাকেই বুঝি। কিন্তু ফ্যান্টাসি মূলত একটা ধারণা। বাস্তবের সঙ্গে যার যোগ সামান্য। সে জায়গা থেকেই আমার কাছে ওবায়েদ হকের গল্পের দুনিয়াকে ফ্যান্টাসি মনে হয়। ‘ড্রামা’ বলতে পারতাম, ইউটোপিয়াও বলতে পারতাম, কিন্তু ঐ দুটো বিষয়ের তুলনায় ফ্যান্টাসি কথাটাই আমার মাথায় বেশি কাজ করল।
‘ডাকনাম ভুলে গেছি’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র তার ডাকনাম ভুলে যায়। আমরা ভুলে যাবার আগে জানিয়ে দিই, তার নাম হাসান। হাসানের বাবা স্কুলশিক্ষক ছিলেন। তার ছিল জমিদার পূর্বপুরুষের বংশ গৌরব। বাস্তব দুনিয়া তিনি বুঝতেন না। বই পড়তে ভালোবাসেন। কিন্তু জাগতিক অন্যান্য বিষয় থেকে তিনি দূরে। তিনি বোঝেন না ব্যক্তির উন্নতি। বোঝেন না অর্থ উপার্জনের বন্দোবস্ত। ফলে তার চাকরিটি যায়। মরা সন্ত��ন প্রসব করে স্ত্রী। তাকে বাঁচাতে পৈতৃক বাড়িটা হারাতে হয়। তারা খবর পান মহিমগঞ্জ নামে এক স্থানে তার চাচার একটি জমিদারবাড়ি আছে। স্ত্রী পুত্র নিয়ে সেখানেই বাস করতে যান তারা।
উপকথা থেকে প্রকাশিত ‘ডাকনাম ভুলে গেছি’। এ ধারার গল্প বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ না। তবে গল্পটা পাঠক পড়বেন ওবায়েদ হকের লেখার কারণে। তার গদ্যের কারণে? না। ভাষা, বর্নণাভঙ্গি বা গল্প বুননের কারণে। ওবায়েদ হকের সবচেয়ে বড় গুণ হলো সহজ ভাষায় গল্প বলা। তিনি এমন ভাষায় গল্প বলেন যা তরতর করে পড়া যায়। থামার প্রয়োজন পড়ে না। সেই কারণেই ওবায়েদ হকের অতি সাধারণ গল্পও পাঠক পছন্দ করবেন। তার গল্পে যুক্তি বা ব্যাখ্যা খুঁজতে যাবেন না।
বর্তমান উপন্যাসে মায়ের মৃত্যুর পর বড়ো জমিদার বাড়িতে একাই বাস করে হাসান। এ বাড়িতে মহিমগঞ্জের কেউই যায় না। কেননা, সেখানে কোনো এক কালের জমিদারের ওপর অভিশাপ আছে এক নারীর। তাকে গর্ভবতী করে জমিদার দায়িত্ব নেয়নি। কুয়ায় ফেলে মেরে ফেলেছেন। পরিচিত গল্প। কিন্তু ভালো লাগে। আমরা পরিচিত গল্প শুনতেই পছন্দ করি। অপরিচিত হয় কোনোভাবে তখন, যখন এ বাড়িতে হাসান একা বেড়ে ওঠে। তার বাবার সংগ্রহে থাকা প্রচুর বই সে পড়ে আর বেড়ে ওঠে নিজের মতো। এক সময় বাবাও তার মায়ের মৃত্যুতে নিজেকে অপরাধী মনে করে বাড়ি ছাড়লে হাসান একাই বাস করে। প্রায় কোনো মানুষের সংস্পর্শহীন—বৃক্ষ, লতা, শেয়াল, সাপ ও মেছোবাঘের সঙ্গে। এরপর সে মাছ ধরে, মুরগী পালে। মাঝে মাঝে বাজার গিয়ে সদায় করলে পরিচয় হয় মাওলানা ইখলাকের সঙ্গে। সাধারণত কারো লেখাকে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টা আমার অপছন্দ। তবে ইখলাকের চরিত্রটি হুমায়ূন আহমেদের অনেক মাওলানা চরিত্রের সঙ্গেই মেলে।
ইখলাকের হারিয়ে যাওয়া অবধি এ উপন্যাস যথেষ্ট সরল। ফ্যান্টাসি হলেও বিশ্বাসযোগ্য। উপন্যাস নাটকীয় হয়ে ওঠে হীরার আগমনে। শহুরে সেই মেয়ের অচেতন শরীর মেলে হাসানের জমিদার বড়ির সিঁড়িতে। সেই পর্যন্তও মেনে নেয়া যায়। আমরা মেনে নিতে পারি তার অতীত তথা ব্যাক স্টোরিও। গল্পটা ঝুলে যায়, হাসানকে যখন সে পাঠায় ঢাকায়, তার প্রেমিকের কাছে একটা চিঠি পৌঁছে দিতে।
ওবায়েদ হক একটা মায়াবী দুনিয়া তৈরি করতে চান। তার চরিত্রের প্রতি তার পাঠক স্নেহ, সহমর্মিতা অনুভব করবে। আর সেটা তৈরি করতে নাটকীয় মোড়, দুর্যোগ, দুর্ঘটনাময় গল্প তৈরি করেন লেখক। তার নীল পাহাড়, জলেশ্বরীতেও এই ফর্মুলা রয়েছে। জলেশ্বরীতে আছে একাধিক নাটকীয় মোড়। কিছু ক্ষেত্রে আশির দশকের সিনেমার মতোও বলা চলে। বর্তমান উপন্যাসে শাকের মাহমুদ সেই সিনেম্যাটিক উত্থান ও চরিত্রের উদাহরণ। তার সঙ্গে হাসানের দেখা থেকে পুরো অংশটাই অতিনাটকীয়। এই জায়গায় এসে উপন্যাসটি এর প্রথম ভাগের ইনোসেন্স কিছুটা হারায়।
তবে ওবায়েদ হক আমাদের মনে করিয়ে দেন বাংলা সাহিত্যের উপন্যাসের ক্ল্যাসিক ধারা। সেই ধারাতেও এরকম চরিত্র, আবেশ ও মায়া থাকত। প্রধান চরিত্রটির প্রতি পাঠকের তৈরি হতো মায়া। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা সেখানে যুক্ত করেন নাটকীয় কিছু মোড়। ডাকনাম ভুলে গেছি মনোযোগী পাঠককে এ সবই মনে করিয়ে দেবে।
উপন্যাসটি শুরু হয় উত্তম পুরুষের জবানিতে—একটি চমৎকার 'হুক পয়েন্ট' দিয়ে। গল্পের বুনন অতীত থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে বর্তমানে এসে সেই হুক পয়েন্টের সাথে মিলে যায়। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ''হাসান''। জমিদারের বংশধর বাবার আত্মগরিমার কারণে সপরিবারে ঢাকার বাড়ি ছেড়ে তাদের চলে যেতে হয় মহিমগঞ্জের এক পরিত্যক্ত, জঙ্গলকীর্ণ ও জরাজীর্ণ জমিদার বাড়িতে। লোকমুখে এই বাড়িটিকে ঘিরে ছড়িয়ে আছে নানা আতঙ্ক ও অভিশপ্ত হওয়ার উপাখ্যান।
বাবা-মায়ের সাথে সেখানে থাকতে শুরু করলেও সময়ের বিবর্তনে এবং ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে সদ্য কৈশোরে পা রাখা হাসান সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ে। সেই বিজন জমিদার বাড়িতে গাছপালা, পুকুর আর পশুপাখিকে সঙ্গী করেই তার একাকী কৈশোর ও তারুণ্য অতিবাহিত হয়। ঘটনাক্রমে তার জীবনে প্রবেশ ঘটে ''হীরা'' নামক এক চরিত্রের, যা হাসানের জীবনে প্রভাব ফেলে। তবে উল্লেখ্য যে, এটি কোনো গতানুগতিক রোমান্টিক ঘরানার উপন্যাস নয়।
✪মূল উপজীব্য ও জীবনদর্শন: "ডাকনাম ভুলে গেছি" মূলত একজন নিঃসঙ্গ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। যার ডাকনাম ধরে ডাকার মতো আপনজন নেই, একসময় সে নিজেই নিজের ডাকনাম ভুলে যায়। হাসান চরিত্রটি বাহ্যত সরল হলেও বেশ বুদ্ধিমান ও সংবেদনশীল। লেখক দেখিয়েছেন, মানুষ আসলে কখনোই পুরোপুরি একা নয়; প্রকৃতির অপার সৃষ্টি রহস্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন।
একইসাথে আমাদের তথাকথিত 'ভদ্র' সমাজের ভেতরের কদর্য রূপটি লেখক নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। মুখোশধারী মানুষেরা নিজেদের স্বার্থে কতখানি নিচে নামতে পারে এবং তাদের কারণে কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবন অভিশপ্ত হয়ে ওঠে, তা এই উপন্যাসের অন্যতম মূল সুর। বইটির ফ্ল্যাপের সেই কথাটিই যেন বারবার প্রতিধ্বনিত হয়: "ঘরে ঘরে আলো পৌঁছালেও মানুষের মনের গহীনে যে অন্ধকার ঘাপটি মেরে পড়ে আছে, একশো ওয়াটের বাল্বও সেই অন্ধকারের নাগাল পেল না।" হাসান এই বৈরী সমাজের বিপরীতে এক মানবিক দৃষ্টান্ত। রশীদ চোরার মতো সমাজচ্যুত মানুষের প্রতি তার মমতা কিংবা মাওলানা ইখলাক ও হীরাকে আশ্রয় দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার চরিত্রের উদারতা প্রকাশ পায়। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও হাসানের সততা ও নৈতিকতা তথাকথিত 'সুশিক্ষিত' সমাজের গালে যেন এক সপাটে চড়।
শুরুতে থ্রিলার এবং মাঝে কিছুটা 'হরর ভাইব' দিলেও, আমার কাছে এটি দিনশেষে একটি সার্থক "মানবিক উপন্যাস"। ২৭২ পৃষ্ঠার এই ঢাকা-মহিমগঞ্জ যাত্রা মোটেও একঘেয়ে ছিল না। ওবায়েদ হকের লেখনী অত্যন্ত সুখপাঠ্য এবং প্রাসঙ্গিক বর্ণনাগুলো এতটাই জীবন্ত যে চোখের সামনে দৃশ্যপট ফুটে ওঠে। আপনি যদি ভিন্নধর্মী জীবনবোধের কোনো গল্প পড়তে চান, তবে এটি আপনার সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই। ❤️
রোজার ছুটির রাতে এক টানে পড়ে ফেললাম। শেষ কবে এভাবে না ঘুমিয়ে কোন বই শেষ করেছি মনে করতে পারলামনা। সম্ভবত হবে করোনার সময়। এই বইটার বিশেষত্বই সম্ভবত এইটাই।
বইয়ের মূল জিনিস হল একাকীত্ব। ঘুরে ফিরে এসেছে সেই জিনিসটাই। নিজেদের পরিবারের ভেতর কিংবা বাইরের সমাজের সবাই থাকার পরও আমরা কিভাবে একা হয়ে যাচ্ছি দিনের পর দিন। কিভাবে প্রযুক্তি আমাদের নিস্তরঙ্গ দিনগুলিকে সরিয়ে দিচ্ছে তার কথন।
হাসান, আমজাদ শেখ, সুলতানা, হীরা, ইখলাক, রশীদ, শাকের, মোতালেব এই উপন্যাসের সবাই একাকী। কথা শোনার জন্য একটা মানুষ চাই তাদের।
হয়তো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তাদেরকে কিছুদিনের জন্য সেই একাকীত্ব কাটানোর একটু সুযোগ দেয়। পরে তা আবারও কেড়ে নিয়ে অকূল সমুদ্রের পারে ভাসিয়ে দেয়। শুরু হয় আবার সংগ্রাম।
এখানে একাকীত্বের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন, গ্রাম্য সমাজের কুসংস্কার, তার পরিচিতি সবই দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
ওবায়েদ হকের নামের সুবিচার করেছেন তার এই লেখায়।
আমি একে ৫ স্টারই দিতাম। কিন্তু কেন জানি শেষটা আমার ভাল লাগেনি। তাই এ��� স্টার কম দিলাম।
কালোকফি খেতে বেশ লাগে।একটু তেতো।একটু গরম।একটু ধোঁয়া। হালকা জ্বালে ফুটানো, চিনি ছাড়া কফি খেতে দারুণ লাগে।একটা মোহনীয় গন্ধ।তাড়াহুড়ো করলে চলে না।রয়ে সয়ে খেতে হয়।শীর্ষেন্দু'র পার্থিব যেভাবে পড়তে হয় আরকি। কফি খাওয়ার পরে বেশ কয়েক ঘন্টা চাঙা লাগে।মাথা ঝরঝরে লাগে। ওবায়েদ হকের 'ডাকনাম ভুলে গেছি' বইটা কি তেমন ই কোনো কালোকফি? কি জানি!
কি দরকার এতো ব্যবচ্ছেদের।টাকা দিয়ে কেনা বই পড়ে ভালো লেগেছে সেটা ই বড়ো কথা। ওবায়েদ সাহেব চতুর লেখক। কাদের জন্যে রান্না করছেন জানেন ভালো করে।মশলা - ফোঁড়নের জ্ঞানও টনটনে। মুখরোচক তবে অস্বাস্থ্যকর নয় মোটেও।
এক এক করে ভদ্রলোকের সব উপন্যাস ই পড়ে নিলাম।আনন্দদায়ক ভ্রমণ।হূমায়ন আহমেদ আছে,মুরাকামি আছে।ভদ্রলোকের সততা আছে ।খারাপ কি?
'জল নেই পাথর' কিংবা 'উন্মাদ আশ্রম' পড়ার পর মনের মধ্যে যে অতৃপ্তি জমেছিল, 'ডাকনাম ভুলে গেছি' পড়ার পর তা অনেকটাই কমে গেছে।
এই গল্পে কাকতালীয় ঘটনার প্রাচুর্য জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে ছাপিয়ে গেছে। প্রধান চরিত্রের মত এভাবে জীবনের একটা বড় সময় অতিবাহিত করা মনে হয় না কখনও কারো পক্ষে সম্ভব হবে।
তাও গল্পতো পড়া হয় বাস্তবতা থেকে একটু ছুটি নিতে। আমার সেই ছুটিটা ভালো কেঁটেছে। ☺️
বইয়ের শেষে একটা কথা বলতে চাই, লেখকের সৃষ্ট নারী চরিত্রগুলো আমার কাছে বরাবরই অতি-নাটকীয় মনে হয়েছে। যদিও এই নিয়মের এক অনন্য ব্যতিক্রম হয়ে থাকবে 'জলেশ্বরী'।