আট তারিখের সন্ধ্যায় ঋদ্ধ প্রকাশের স্টলে থাকা ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিতে চাই, বইটির ফ্ল্যাপপেজ পড়ে সন্দিহান থাকলেও উনি রিভিউ দিয়ে বেশ প্রলুব্ধ করলেন বইটি কিনতে, নাহলে যেমন ভয়ানক প্রচ্ছদ, ছুঁয়েও দেখতাম না হয়তো।
বেতাল পঞ্চবিংশতি পড়া হয় নি, সাধুভাষার খটমটানি তে। ছোটবেলার সামান্য স্মৃতি আছে এনিমেশন দেখার। তবে সবচেয়ে পছন্দ ছিলো Jetix এর Vicky & Vetaal নামের সিটকম। সে হিসেবে বেতালের সাথে পূর্ব পরিচয় থাকলেও বইয়ের পাতায় এই প্রথম সাক্ষাৎ।
বইটি পড়ে মন্দ লাগে নি, বরং রিডার্স ব্লক কাটিয়ে স্বল্প কলেবরের বইটি পড়ে ফেলেছি অনায়াসে। সাবলীল কাহিনী ও লেখনী দুইটা ই চুম্বকের মতো টেনেছে। সুপর্ণ সরকারের লেখা আগে পড়া হয় নি কখনো, প্রথমবারেই মুগ্ধ হলাম।
অপছন্দের মধ্যে অলংকরণে এ আই জেনারেটেড ছবিগুলো দেখে কেমন অস্বস্তি হচ্ছিলো। ১১০ পেজের বইয়ের দামটাও বেশি লেগেছে।
"বাঙালি একই সাথে বুদ্ধি ও বাহুবলে পৃথিবীতে না হলেও এশিয়াতে অন্তত অবিসংবাদী রূপে শ্রেষ্ঠ ছিলো।" . সুপর্ণ সরকারের লিখা বেতাল অষ্টাবিংশতি অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ এর অন্যতম সেরা একটা বই হতে যাচ্ছে। বইটা নানা ধরনের মিথ আর ধাঁধায় ভরপুর। একবার পড়া শুরু করলে আপনার মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম এবং বইয়ের ভাষাও সহজ আর পরিষ্কার। এমনকি বইটা আপনার মস্তিষ্ককে বারবার চ্যালেঞ্জ করবে, ভাবাবে। যারা মিথ এবং বিভিন্ন ধাঁধার সমাধান করতে চান বইটা পড়তে পারেন।
সম্পাদনায় আরও একটা চমক, বইটায় একটা বানানও ভুল দেখলাম না।
বইটা হাতে তুলে নিলাম। ছোট কলেবরের বই। পড়তে ঘন্টাখানেকের মতো লাগলো। পড়তে গিয়ে দেখি গল্পকথকের এলাকায়ও কালবৈশাখী, অ্যাঁ?!
দারুণ। শেষ করে তবেই উঠলাম। লেখকের গদ্যশৈলী আর প্লটের এরেঞ্জমেন্ট; দুটোই নিওডিমিয়াম চুম্বকের মতো টেনে রাখলো।
বেতাল নিয়ে আমি যেভাবে আগ্রহী হয়েছিলাম, লেখকও সেভাবেই হয়েছেন দেখলাম 'লেখকের কথায়'। সেই রহস্য পরে খোলাসা করবো একদিন।
বেতাল নিয়ে আমার যেই আগ্রহ ছিল, লেখক সেটা পরিপূর্ণ করার প্রথম ধাপটা পূর্ণ করেছেন। পাতি বাঙালি আমি, খুজে পড়া হয় না আলস্যের কারণে। সে কারণেই চাচ্ছিলাম বইটা আরেকটু বড় হলে বেশ হতো।
লেখককে অভিবাদন। ছোট কলেবরে দারুণ ইম্প্যাক্ট রেখেছেন তিনি। বইয়ের ইম্প্যাক্ট আমি বিবেচনা করি বইটার কন্টেন্ট কতদিন আমার মাথায় ঘুরবে তার উপরে। এই বইটা নির্ঘাত বেশ কিছুদিন মাথা থেকে নামবে না।
একটা বিস্তারিত রিভিউ ডিজার্ভ করেন লেখক এবং তার বইটা। সেইটেও পূর্ণ করে ফেলব।
সত্যি বলতে কী বেতাল সম্পর্কিত কোনো কিছু এর আগে আমার পড়া হয়নি। নাম শুনেছি, কিন্তু পড়িনি। তবে ঋদ্ধ প্রকাশ যেহেতু কন্টেন্টের ওপর জোর দেয় বেশি, তাই ভাবলাম অন্তত পড়ে দেখা যায়। ছোট বই, ভালো না লাগলেও সময় বেশি নষ্ট হবে না। তবে আমাকে বলতেই হচ্ছে এটা মোটেও সময় নষ্ট করা বই মনে হয়নি। উলটো এক বসায় একটানা পড়ে শেষ করেছি। বইটার দুটো অংশ আছে। ঐতিহাসিক অংশ এবং বেতালের গল্প। আর এই দুটো জায়গাই আমার খুবই ভালো লেগেছে।
বেতালের ইতিহাস
বইয়ের একদম শুরুতেই পাঠককে "বেতাল" কে কিংবা তার মূল কাহিনিটা আসলে কী-সে ব্যাপারে একটা বিশদ ধারণা দেওয়া হয়। আমার মতো নাদান পাঠকদের, যাদের বেতাল সম্পর্কে ইতোপূর্বে কোনো ধারণাই ছিল না; তাদের জন্য এই অংশটা রীতিমতো আশীর্বাদ। সরাসরি গল্পে চলে গেলে আমার মতো খানিকটা খুঁতখুঁতে স্বভাবের পাঠকেরা বরং হিমশিম খেয়ে যেতাম। তো, উজ্জয়িনী নগরের বিক্রামাদিত্য কীভাবে বেতালের সন্ধান পেল? কিংবা বেতাল কীভাবে বেতাল হলো সেই গল্পটা জানা যায় এখান থেকে। তবে বেতালের ইতিহাস শুধু এখানেই থেমে থাকে না। বইয়ের মূল গল্পে বরং বেতালের গল্পগুলো কোথা থেকে কীভাবে এল সেই ইতিহাস আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয় করেছিলেন বেতালকে। কিন্তু বেতাল পঞ্চবিংশতির অরিজিনাল লেখক আসলে কে? গল্পে গল্পে সেটাই তুলে এনেছেন লেখক এখানে। সাথে রয়েছে এসব ইতিহাসের বেশ কিছু রেফারেন্স৷ লেখক যে ভালো পরিমাণে পড়াশোনা করেছেন বইটা লেখার আগে তা স্পষ্ট বুঝা যায়। পৈশাচিক ভাষা নামে এক ধরণের ইন্দো-আর্য ভাষা যে ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল তা এই প্রথম জানলাম এই বইয়ের সুবাদে। শুভ্র ও মিহির নামের দুই বন্ধুর কথোপকথনে আরও উঠে আসে প্রাচীন ভারতের কিছু ইতিহাস। খুবই স্বল্প পরিসরে, তবে এতে করে সেসব ইতিহাস সম্পর্কে আরও বেশি জানার আগ্রহ তৈরি হয়। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে শুরু হওয়া বেতালের এই গল্পের ইতিহাস অল্প কথায় তুলে আনা মোটেও সহজ কাজ নয়। কিন্তু সে কাজটা খুবই দক্ষতার সাথে করেছেন লেখক। যথারীতি সাথে রয়েছে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন।
বেতালের প্রশ্ন, বেতালের উত্তর
এবার শুরু হয় বইয়ের মূল গল্প অর্থাৎ বেতালের কাহিনি। রাজা বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর পর কে হবে বেতালের পরবর্তী প্রভু? বিক্রমাদিত্যের তিন সন্তান। বেতাল কোন নতুন বিক্রমাদিত্যকে আড়াল থেকে সাহায্য করবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এই তিন সন্তানের পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে। পরীক্ষা নিবে স্বয়ং বেতাল নিজে। আর সেই পরীক্ষা চাক্ষুস করে তা লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব চেপেছে কবি কালিদাসের ওপর! কালিদাসের বয়ানে বেতালের পরবর্তী তিন কাহিনি সম্পর্কে জানা হবে পাঠকের। সাথে থাকবে ভয়াল দর্শন বেতালের বর্ণনা। এক কথায় চমৎকার লেগেছে এই গল্পগুলো। পাশাপাশি যে আবহ তৈরি করেছেন লেখক সেটাতেও মুগ্ধ হয়েছি।
(হালকা স্পয়লার। যারা বইয়ের পুরোপুরি স্বাদ আস্বাদন করতে চান তারা এটুকু অংশ এড়িয়ে যেতে পারেন)
প্রথম গল্প, অনেক কাল আগে অনন্তপুর রাজ্য শাসন করত এমন এক রাজা যাকে কেউ কখনো দেখেনি। এক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠল জনমনে, আদৌ তাদের রাজা বলে কেউ আছে কি? নাকি সেনাপতি কিংবা রাজমাতা নিজেই রাজার আদেশ নাম দিয়ে রাজ্য পরিচালনা করছে? অবশেষে নেওয়া হলো পরীক্ষা। পরীক্ষার ফলাফলে এল তিনটে উত্তর। বিক্রমাদিত্যের জ্যেষ্ঠ পূত্র কুমারগুপ্তকে বের করতে হবে তিনটে উত্তরের মধ্যে কোনটা সঠিক? আমি নিজে সামান্য সময় ধরে উত্তরগুলো নিয়ে ভাবলেও সঠিক জবাব বের করতে পারিনি। তবে বেতালের উত্তরটা পছন্দ হয়েছে। বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। দ্বিতীয় গল্পটা তিনটে রাজ্যের মধ্যেকার শান্তিচুক্তি ভেস্তে যাওয়ার গল্প। এই গল্পের প্রশ্নগুলো একটু কঠিন। কারণ বিচারকের রায়ের ভালো ও মন্দ দুটো দিকই রয়��ছে। তবে শেষে গিয়ে বেতাল যে ব্যাখ্যা দেয় তা সুন্দর লেগেছে। তৃতীয় গল্প রাজ্যের একমাত্র রাজকুমারী প্রভাবতীগুপ্তের জন্য৷ তবে প্রভা��তী নিজেকে নিজেই চ্যালেঞ্জ করে বসে। সে তার ভাইদেরকে করা প্রশ্নগুলোর উত্তর আগে দিতে চায়। যদি সেগুলোতে সফল হয়, তবেই দিবে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত প্রশ্নের জবাব। আর এখানে এসে আগের দুই গল্পের সমাপ্তি বদলে যায়। প্রভাবতীর কল্যানে আমরা একই সমাধানের নতুন একটা রূপ দেখতে পাই। এটা দিয়ে প্রকাশ হয় আমাদের জানা ও মেনে নেওয়ার মাঝেও থেকে যায় অনেক ফাঁকফোকর। সে যাই হোক, রাজকন্যার জন্য রাখা তৃতীয় গল্পটা একটা প্রেমের কিংবা পরকীয়ার গল্প। যেখানে রাজার দরবারে যজ্ঞ করতে এসে রানীর প্রেমে পড়ে যায় এক তপস্বী। কিন্ত তাদের প্রেমে থাকে না কোনো কামনা, হয় না কোনো দৈহিক সম্পর্ক। এক পর্যায়ে তপস্বী চলে যায় রানীকে রেখে। কিন্তু রানী বাকি জীবন সংসার ধর্ম করে গেলেও, মন তার পড়ে থাকে সেই তপস্বীর কাছে। প্রশ্ন আসে, তাহলে কি একে পরকীয়া বলা যায়? যদি মিলন না হয়, তবে প্রেম কি পাপ? এই প্রশ্নের জবাব দিয়েই অবশেষে ফুরায় বেতালের অষ্টাবিংশতি। তবে আমাদের বইয়ের গল্প তখনো অনেকটা বাকি রয়ে গেছে।
বেতাল ও খনার কাহিনী
বইয়ের এই শেষ ভাগে বেতালের সাথে খনার পরিচয়, খনাকে দেওয়া বেতালের অভিশাপ ও আশীর্বাদ দুটোই গল্পের ছলে জানানো হয়। এই খনা সেই খনা, যার বচন আজও আমাদের সমাজে প্রচলিত। এর পাশাপাশি রয়েছে খনাকে বলা বেতালের গল্প, যা বইয়ের সবচেয়ে বড় গল্প। সেটা না হয় আর নাইই বলি। বইয়ের শেষটা হয় আরও সামান্য কিছু ইতিহাস ও অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখে।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৮/১০ (বেতালের আগের কোনো কাহিনী আমি পড়িনি। তবে ছোট্ট এই বইটিতে লেখক যেভাবে অনেক তথ্য, ইতিহাস ও গল্পের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন তা আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে৷ আমার মনের খোড়াক মেটাবার মতো সকল উপাদানই বইটিতে ছিল। পাশাপাশি ঋদ্ধ প্রকাশের দারুণ সব ইলাস্ট্রেশন বইটি পড়ার অভিজ্ঞতা আরও সুন্দর করেছে।)
বইটা শুরু করার আগে মূলত অন্য একটা বই পড়ছিলাম।তো সেই গল্পটার মাঝে গিয়ে কেমন একঘেয়েমি পেয়ে বসেছিল তখন এইটা হুট করে পেয়ে গেলাম। বিক্রম বেতাল এর কত গল্প শুনেছি, কার্টুন, সিরিজ নাকি আছে.. কিন্তু কেনো জানি না আগ্রহ হয়নি। এইটা পড়ার পর মনে হলো আরো আগেই পড়া উচিত ছিল। এখন ইশ্বরচন্দ্রের পঞ্চবিংশতি পড়তেই হবে ❤️ বেতাল এর যে প্রশ্নের বহর আর আমার যে বুদ্ধির বহর নির্ঘাত কল্লা টা কাটা যেতো ভাবতেই শিউরে উঠছিলাম 😬
"মহারাজ, প্রতিবারই তো তুমি কথা বলে ফেলেছ। এবার আমি তোমায় একটা গল্প বলব। আর তোমাকে তার উত্তর দিতে হবে। ভুল উত্তর যদি দাও তোমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে মহারাজ। শোনো, শোনো তবে।" ছোটবেলায় বিক্রম বেতাল দেখতে দেখতে প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছে এই কয়েকটি লাইন। একসময় বেতালের মত কণ্ঠ নকল করে বলতাম। আজ সেই বেতালের সাথে ঘুরে এসেছি অজানা অনেক ইতিহাস ও গল্পে। লেখক সুপর্ণ সরকারের লেখার সাথে আমার পরিচয় গত বছরই হয়েছে। চমৎকার গদ্যশৈলীতে পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নেওয়ার মত ক্ষমতা রাখেন তিনি। উনার সাথে এই বছর প্রকাশিত বুগিম্যান থেকে জুজু নন ফিকশন সংকলনে অংশ নেওয়া হয়েছে দুটি লেখা নিয়ে। তাই বেতাল অষ্টাবিংশতি যখন ঘোষণা করা হয় তখন থেকেই এটা সংগ্রহের জন্য বধ্যপরিকর হয়েছিলাম। আজকে শেষ করলাম পড়া আর বলতেই হচ্ছে বইটা আমাকে হতাশ করেনি। একদম শেষ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে আমাকে বেতালের রহস্য। গল্পটা শুরু হয় দুই বন্ধুকে ঘিরে। শুভ্রকে নিজের বাড়িতে ডেকে পাঠায় মিহির। সেখানে পৌছালে শুভ্র জানতে পারে মিহিরের কাছে আছে মিশনারি জিওভানির পুরাতন ডায়েরি যেটায় আছে বেতালের তিনটি অজানা কাহিনী আর তার আসল পরিচয়। সেই থেকে দুই বন্ধুর তর্ক বিতর্কে উঠে আসে বিক্রম বেতালের অজানা অনেক কিছু। বইটার জনরা ইনফো ফিকশন। এই জনরা হলো এমন এক ধরণের সাহিত্য, যা তথ্যের বা বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও তাতে কল্পনার মিশ্রণ থাকে। গল্পের আদলে আপনি জানতে পারেন সেই বিষয়ের ইতিহাস, যুক্তি। যার ফলে নন ফিকশনের খটমটে ব্যাপারটা নেই এখানে। বেতালকে আমরা যেমন ভয়ংকর এক পিশাচ যেনে এসেছিলাম সেটাকে ভেঙে লেখক এক অন্য বেতালকে আমাদের সামনে তুলে এনেছেন চমৎকার ভাবে। তার উপর বইয়ে বেতালের ৩টি নতুন গল্প সাথে আরেকটি চমকও আছে। বেতালের পরিচয়েও নতুনত্ব এসেছে। বইটা পড়ে আপনাকে ভাবাবে অনেক। ধাধা, মিথের বেড়াজালে আপনি বেতালকে আবিষ্কার করবেন অন্যভাবে। সমাপ্তিটা আরেকটু সময় নিয়ে হলে ভালো হতো। ধুম করেই যেন শেষ হয়ে গিয়েছে। যারা নভেলা পছন্দ করেন আর টান টান সাসপেন্স খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাদের জন্য এই বইটা রেকোমেন্ডেড রইল। বইয়ের শেষ পাতায় বেতাল পঞ্চবিংশতি চলিত ভাষায় প্রকাশিত হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আশা করি শীঘ্রই তা চলে আসবে।
সুপর্ণ সরকারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ঋদ্ধ প্রকাশকে ধন্যবাদ। ভদ্রলোকের গদ্যশৈলী দারুণ। আমি রীতিমতো বিমহিত। অচিরেই উনার লেখা প্রকাশিত সবগুলো বই পড়ে দেখার অভিপ্রায় রাখছি। এবং যারা ইতিহাস পছন্দ করেন, তাদেরকেও উনার লেখা পড়ে দেখার আহবান জানাচ্ছি।
এই বইটাও খুব ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে বৃষ্টিস্নাত চাঁদ রাতে, ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে পড়ার জন্য এরচেয়ে ভালো বই হয় না।
বইয়ের একেবারে শেষ পাতায় প্রকাশনী থেকে একটি ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে সুপর্ণ সরকারের লেখনীতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'বেতাল পঞ্চবিংশতি'র চলিত ভাষার সংস্করণ ঋদ্ধ থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। ব্যাপারটা জানার পর থেকে আমি এমনই অধির আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষার মায়ায় আঁটকে গেছি, অতটা অপেক্ষার মায়ায় অভাবের সংসারে মাসের বেতন নিয়েও আমি আঁটকাই না।।
বেতালের কথা মনে আছে আপনাদের? সেই কিংবদন্তির প্রেতসম্রাট। যার প্রগাঢ় জ্ঞান আর বিচক্ষণতায় ভরা গল্পগুলো আমরা ছোটবেলায় শুনেছি। মহারাজ বিক্রমাদিত্যের ঘাড়ে চেপে বসে তাঁর কানে কানে নানা কাহিনি শোনানো ছিলো বেতালের কাজ। তারপর মহারাজকে তার শোনানো গল্পের বিষয়বস্তুর ওপর বেতাল প্রশ্ন করতেন। নিজের প্রজ্ঞা আর সুবিবেচনা কাজে লাগিয়ে মহারাজ বিক্রমাদিত্য যদি বেতালকে সঠিক উত্তর দিতেন, সে আবারও ফিরে যেতো শ্মশানের শ্যাওড়া গাছে। মহারাজ আবারও তাকে আনতে যেতেন। এই চক্র চলতেই থাকে যতোদিন বেতাল মহারাজকে তাঁর পঞ্চবিংশতি বা পঁচিশতম গল্প শোনায়। বেতালের বলা পঁচিশতম গল্প নিয়ে করা প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন মহারাজ বিক্রমাদিত্য। এরপর বেতাল তাঁর পরম মিত্রে পরিণত হন। মহারাজের বাকি জীবন বেতাল তাঁর পাশে ছিলেন ছায়ার মতো। রাজ্যপরিচালনা করতে তাঁকে সর্বদা সুপরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছেন মহাজ্ঞানী প্রেতসম্রাট বেতাল।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অনূদিত বিখ্যাত বই 'বেতাল পঞ্চবিংশতি'-এর কল্যাণে আমরা জানি মহারাজ বিক্রমাদিত্যকে বেতাল মোট পঁচিশটা কাহিনি শুনিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ যদি আপনাকে বলা হয়, বেতালের বলা কাহিনির সংখ্যা আরো বেশি? যে কাহিনিগুলো এতোদিন অনাবিস্কৃত ছিলো। কি, অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? পুরো ব্যাপারটা এমন অবিশ্বাস্যই মনে হয়েছিলো প্রথমে মিহিরের, আর তারপর তার বন্ধু শুভ্রর। ইংল্যান্ডের এক প্রাচীন চার্চের লাইব্রেরি থেকে ১২৯২ সালে লিখিত এক প্রাচীন ডায়েরি পায় মিহির। ডায়েরিটার লেখক বিখ্যাত খ্রিস্টান মিশনারি জিওভানি দা মনতেকর্ভিনো৷ ভদ্রলোক তাঁর এই ডায়েরিতে বেতালের আরো তিনটা কাহিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন। অর্থাৎ মহারাজ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের পরেও বেতাল খুঁজে নিয়েছিলেন আরেক বিক্রমাদিত্যকে। এই চমকে দেয়া আবিস্কার বিস্ময়ে রীতিমতো স্তব্ধ করে দিলো মিহির আর শুভ্রকে।
মহারাজ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন সময় এসে যায় বেতালের পরবর্তী বিক্রমাদিত্য নির্বাচনের। যাকে একইসাথে হতে হবে জ্ঞানী ও সাহসী। এই লক্ষ্যে মহারাজের দুই পুত্র কুমারগুপ্ত ও গোবিন্দগুপ্ত, এবং একমাত্র কন্যা প্রভাবতীগুপ্তের পরীক্ষা নিতে চান বেতাল। পরীক্ষার নিয়মও বেতাল ঠিক করে দেন। তিনি মহারাজের উত্তরাধিকারীদের একটা করে গল্প শোনান। এবং পরবর্তীতে সেই গল্পের ওপর ভিত্তি করে তাদেরকে কিছু প্রশ্ন করেন। যে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে তাদের ভেতরের মেধা, প্রজ্ঞা আর সুবিবেচনা দিয়ে। বেতালের শোনানো ষড়বিংশতি গল্পে উঠে এলো এক অদ্ভুত ছায়া রাজার কথা। সপ্তবিংশতি গল্পে তিনি শোনালেন তিন রাজ্যের রাজাদের নিজেদের মধ্যেকার রাজনীতি ও অদ্ভুত এক বিচারিক সিদ্ধান্তের কথা। আর তাঁর শোনানো অষ্টাবিংশতি গল্পে স্থান পেলো সাংসারিক দায়িত্ব, পরকীয়া প্রেম আর ত্যাগের এক অনন্য মেলবন্ধন। মহাজ্ঞানী প্রেতসম্রাট বেতালের দেয়া ধাঁধার সমাধান কে করতে পেরেছিলেন। রাজপুত্র কুমারগুপ্ত, রাজপুত্র গোবিন্দগুপ্ত নাকি রাজকন্যা প্রভাবতীগুপ্ত? গুপ্ত বংশ থেকে কে হতে পেরেছিলেন পরবর্তী বিক্রমাদিত্য। বেতালের পরম মিত্র হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল কার?
সদ্য আবিস্কৃত প্রাচীন এই ডায়েরিতে লেখক উল্লেখ করে গেছেন মহাকবি কালিদাস, খনা আর বরাহমিহিরের মতো ঐতিহাসিক চরিত্রদের কথাও। অমূল্য এই ডায়েরির লেখাগুলো প্রবল এক বর্ষণমুখর রাতকে মিহির আর শুভ্রর জন্য কতোটা মাহাত্ম্যপূর্ণ করে তুললো, তা বলে বোঝানো যাবে না৷ আজও কি বেতাল আছেন কোথাও? নাকি তিনি মুক্ত হয়ে গেছেন জাগতিক সমস্ত বেড়াজাল থেকে? বেতাল রহস্যের সমাধান কি মিহির আর শুভ্র করতে পারলো পুরোপুরি? এই সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে 'বেতাল অষ্টাবিংশতি' বইয়ে।
ইনফো ফিকশন, মিথোলজি আর হররের এক অপূর্ব সংমিশ্রণে লেখা সুপর্ণ সরকারের 'বেতাল অষ্টাবিংশতি' বইটা। ছোটবেলায় পড়া ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অনূদিত 'বেতাল পঞ্চবিংশতি'-এর পরও যে বেতালকে নিয়ে ওই একই স্বাদের নতুন কিছু কখনও পড়তে পারবো তা এই বইটা পড়ার আগে ভাবিনি। মহাপ্রাজ্ঞ ও মহাবিচক্ষণ বেতালের বলা নতুন গল্পগুলোতে যেন সেই আদি ও অকৃত্রিম স্বাদটাই পেলাম। লেখক সুপর্ণ সরকার এতো চমৎকারভাবে বেতালকে দিয়ে গল্পগুলো বলিয়েছেন যে মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। প্রতিটা গল্পের শেষে প্রেতসম্রাটের করা প্রশ্নগুলো আমাকেও ভাবিয়েছে। আমিও যেন রাজপুত্র ও রাজকন্যাদের সাথে সাথে প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর খুঁজেছি। ছোট্ট কলেবরের এই বইটা আমাকে এতোটা চিন্তার খোরাকের যোগান দেবে আশা করিনি। নিজের জ্ঞান ও সুবিবেচনা কাজে লাগিয়ে যখন কোন সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আসে, সেই সময়ে মানুষ আসলে কেমন অনুভব করে সেটা খুব ভালোভাবে বুঝলাম 'বেতাল অষ্টাবিংশতি' পড়ে।
বইটার নাম আসলে হওয়া উচিত ছিলো 'বেতাল ঊনবিংশতি'। কারণ এখানে বেতালের বলা নতুন গল্পের সংখ্যা তিনটা না, বরং চারটা। খনা-কে বেতাল যে গল্পটা বলেছিলেন, সেটাকে হিসাবে ধরলে বইটার নাম এমনই হওয়ার কথা ছিলো৷ জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এই মহীয়সী নারীর সাথে বেতালের কথোপকথন আমি খুবই উপভোগ করেছি। খনার ত্যাগের গল্পটা আমাকে আপ্লুত করেছে, মুগ্ধ করেছে। ভালো লেগেছে রাজকন্যা প্রভাবতীগুপ্তের সাথে মহাজ্ঞানী প্রেতসম্রাট বেতালের যুক্তির খেলা। যুক্তি আর পাল্টা যুক্তির এই সিকোয়েন্সটা 'বেতাল অষ্টাবিংশতি'-এর অন্যতম পজিটিভ দিক আমার মতে। এই উপন্যাসিকার মূল কাহিনিতে মহাকবি কালিদাসের উপস্থিতি একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 'বেতাল অষ্টাবিংশতি' পড়ার পর আপনারাও সম্ভবত এই ব্যাপারটাতে আমার সাথে একমত পোষণ করবেন।
'বেতাল অষ্টাবিংশতি'-তে কিংবদন্তির প্রেতসম্রাট বেতালের ভয়াবহতাকে ছাপিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে মানবিকতা, নীতিবোধ আর সুবিবেচনার মতো বিষয়গুলো। বেতালকে যারা এতোদিন শুধুমাত্র একটা বীভৎস প্রেত হিসেবে জানতেন, তাদের এই ধারণার অনেকটাই পরিবর্তন ঘটবে বইটা পড়লে। লেখক সুপর্ণ সরকারের লেখার ধরণ ভালো লেগেছে আমার। তাঁর বর্ণনার ভঙ্গিমা সুন্দর। বাহুল্যবর্জিত ও একইসাথে চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে পুরো কাহিনিটা পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন তিনি। আর এই বইটা লিখতে গিয়ে যে তাঁকে প্রচুর রিসার্চ করতে হয়েছে, সেটাও বেশ বোধগম্য হয়। রেফারেন্স সহ তিনি প্রচুর তথ্যের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন এই উপন্যাসিকায়। আর এই ব্যাপারটাই 'বেতাল অষ্টাবিংশতি'-কে একটা পারফেক্ট ইনফো ফিকশন করে তুলেছে। ইনফো ফিকশন ধরণের লেখা যাদের ভালো লাগে, এই বইটাও তাদের ভালো লাগার কথা।
এই উপন্যাসিকাটাকে সম্পূর্ণ আলাদা এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে দুটো জিনিস। এক, পরাগ ওয়াহিদের করা চমৎকার প্রচ্ছদ। আর দুই, বইয়ের ভেতরে ব্যবহার করা রাজশ্রী ব্যানার্জির করা চমৎকার সব ইলাস্ট্রেশন। 'বেতাল অষ্টাবিংশতি' পড়তে গিয়ে এই ইলাস্ট্রেশনগুলো বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আর বইটার প্রচ্ছদ আমার মতে পরাগ ওয়াহিদের করা ওয়ান অভ দ্য বেস্ট কাজ। বইটার সম্পাদনাও বেশ ভালো হয়েছে। আমি অন্তত কোন ভুল-চুক খুঁজে পাইনি পুরো বইয়ে। 'বেতাল অষ্টাবিংশতি' উপন্যাসিকাটা ঋদ্ধ নভেলা ম্যাডনেস প্রোজেক্টের প্রথম নিবেদন। ভবিষ্যতে এই প্রোজেক্ট নিয়ে ঋদ্ধ প্রকাশের আরো অনেক পরিকল্পনা আছে। একজন পাঠক হিসেবে ঋদ্ধ নভেলা ম্যাডনেস-এর জন্য আমার শুভ কামনা থাকবে। বইয়ের শেষে ঋদ্ধ প্রকাশ থেকে ঘোষণা দিয়েছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অনূদিত বিখ্যাত বই 'বেতাল অষ্টাবিংশতি'-এর চলিত রূপান্তর প্রকাশ করার। আমার মতে বইটার চলিত রূপান্তর আনার দরকার আছে। এতে নতুন প্রজন্মের পাঠকরা মহারাজ বিক্রমাদিত্য আর বেতাল বিষয়ক কাহিনিগুলো বেশ সহজেই পড়তে পারবে।
২০২৬-এ 'বেতাল অষ্টাবিংশতি' আমার পড়া ২৬ তম বই। আর এই কথা আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে এটা এই বছর আমার পড়া অন্যতম সেরা একটা বই। এক বসায় শেষ করার মতো এই উপন্যাসিকাটা চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন। হাইলি রিকমেন্ডেড।
দ্য প্রেতসম্রাট, দ্য মিথ, দ্য লিজেন্ড বেতালের জয় হোক!
বেতাল সম্পর্কে আপনার জ্ঞান শূন্যের কোঠায় , থাকলেও বইটা পড়তে পারবেন।
১২:১০ এ বইটা নিয়ে বসেছিলাম এ-ই ভেবে যে “শুধু ভূমিকাটাই পড়ব”। ভূমিকা শেষ করে কখন যে বইয়ে ঢুকে গেলাম এবং কখন যে শেষ হয়ে গেল একপ্রকার টেরই পাইনি। লেখা অত্যন্ত সাবলীল , যেকোনো বয়সের পাঠকের কাছেই লেখাটা উপভোগ্য।
এতো ছোট কলেবরের বইয়ে বেতাল ও তার ইতিহাস যে এতো চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে , এটা আসলেই প্রসংশার দাবিদার। বইয়ের কন্টেন্টটা দীর্ঘদিন মাথায় থাকবে
বিদ্যাসাগর বেতাল পঞ্চবিংশতি অনুবাদ করেছেন, এছাড়া আর বেশি কিছু জানা ছিল না। তাই, বেতালের মূল গল্প গুলো পড়া না থাকলেও এখানে শুরুতে ঈশ্বরচন্দ্রের বইয়ের মূল ভূমিকা, নতুন তিনটা ছোট কাহিনী, বেতালের আবির্ভাবের গল্প আর খনার সাথে বেতালের ঘটনা পড়ে আকর্ষণীয় লাগলো। ঋদ্ধপ্রকাশ নতুন করে চলিত ভাষায় বিদ্যাসাগরের বইটা আনলে তখন পড়ার ইচ্ছে আছে।
আমাদের পড়া বিভিন্ন বাংলা অতিপ্রাকৃত বা ভয়ের গল্পে আমরা বেতালকে দেখে থাকি এক ক্ষতিকর সত্ত্বা হিসেবে যে বিভিন্নভাবে মানবজাতির উপরে আঘাত হেনে থাকে। আবার আমরা দেখতে পাই রাজা বিক্রমাদিত্যের সাথে থাকা এক বেতালকে যে তার জ্ঞান এবং ধী এর মাধ্যমে বারবার আমাদের অভিভূত করে।
তাহলে বেতাল আসলে কেমন সত্ত্বা?
লেখক সুপর্ণ সরকার তার বই "বেতাল অষ্টাবিংশতি" তে দিয়েছেন এর এক চমৎকার উত্তর। তিনি ভ্যাম্পায়ার এবং কাউন্ট ড্রাকুলার তুলনার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে কাউন্ট ড্রাকুলা সংজ্ঞা অনুযায়ী ভ্যাম্পায়ার হলেও সব ভ্যাম্পায়ার কাউন্ট ড্রাকুলা নয়। সেরকম আমাদের পড়া বিভিন্ন হরর গল্পের বেতাল চরিত্রগুলো মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর হলেও রাজা বিক্রমাদিত্যের বেতাল তাদের থেকে আলাদা এক সত্ত্বা যে অমর,অবিনশ্বর,তার বুদ্ধি ও জ্ঞান তাকে করে তুলেছে আরও অভেদ্য।
বেতাল অষ্টাবিংশতি বইয়ের মূল কাহিনী আসলে কী? আমরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর অনুবাদকৃত বেতাল পঞ্চবিংশতি বা বেতালের ২৫ কাহিনী এর সাথে অনেকেই পরিচিত। কিন্তু বেতাল অষ্টাবিংশতি বইয়ে লেখক সুপর্ণ সরকার নিয়ে এসেছেন বেতালের হারিয়ে যাওয়া আরও তিন কাহিনী। আরও তিন বুদ্ধির খেলা যা পাঠককে আরেকবার নিয়ে যাবে বেতালের সেই রহস্যময় দুনিয়ায়। সাথে খোঁজা হয়েছে বেতালের শুরুর গল্প, বেতালের গল্পের উৎস, সে সময়কালের জীবনব্যবস্থা এবং সাথে কিছুটা ইতিহাস।
লেখক বই শুরু করেছেন বিদ্যাসাগর রচিত বেতাল পঞ্চবিংশতি বইয়ের কিছু অংশ সাধু ভাষা থেকে চলিত ভাষায় নিজের মতো করে রূপান্তর করে। এই অংশে উঠে এসেছে বেতালের অরিজিন স্টোরি বা শুরুর কাহিনী। যারা বেতাল পঞ্চবিংশতি পড়েছেন, তারা চাইলে এই অংশটুকু স্কিপ করে গেলেও কিছু মিস করবেন না।তবে লেখকের এই সাধু থেকে চলিত ভাষায় করা ট্রান্সফরমেশন ছিলো চমৎকার ও সাবলীল।
এই কাহিনী যেমন বেতাল এর, একইভাবে এই কাহিনী বর্তমান সময়ের দুই বন্ধু শুভ্র এবং মিহিরেরও। মিহিরের কাছে আছে ইতালিয়ান এক মিশনারি জিওভানির ডায়েরি যেখানে তিনি লিপিবদ্ধ বা copy করে রেখে গেছেন বেতালের আরও তিনটি কাহিনী। এই কাহিনী পড়ার আগে মিহির এবং শুভ্র এর মধ্যে বেতাল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং একইসাথে তাদের কথোপকথনে উঠে আসে বেতালের গল্পসমূহের উৎসের গল্প। সেই গল্পের মাধ্যমে পাঠক ইতিহাসের ডানায় চড়ে বেতালের দুনিয়ায় প্রবেশ করে। শুভ্র-মিহিরের চরিত্র দুটো বইয়ে তুলনামূলক কম সময়ের জন্য উপস্থিত ছিলো, ফলে চরিত্র হিসেবে তারা খুব বেশি বিল্ডআপ পায়নি কাহিনীতে। তবে বেতালের দুনিয়ায় প্রবেশের জন্য তারা ছিলো মূল চাবি।
লেখক সুপর্ণ সরকার বইয়ে বেতালের শুরুর কাহিনী,বেতালের গল্পের উৎস, শুভ্র-মিহির এর বেতাল নিয়ে তর্কের মাধ্যমে ইতিহাস উঠিয়ে আনলেও এই বইয়ের মূল বিষয়বস্তু বা মূল essence ছিলো বেতালের হারিয়ে যাওয়া ঐ তিনটা গল্প। পুরো বইয়ের কাহিনী ছিলো একপাশে, আর লেখকের বর্ণনাকৃত হারিয়ে যাওয়া তিন বেতাল কাহিনী ছিলো তার থেকে আরও অনেক উঁচুতে। লেখক কাহিনীগুলোতে নিয়ে এসেছেন চিরচেনা সেই বেতালকে যে বুদ্ধির খেলায়,প্রশ্নের প্যাচে কুপোকাত করতে সিদ্ধহস্ত। সাথে লেখক আরও এনেছেন সে সময়ের এক বিখ্যাত মহাকবিকে যাকে নিয়ে আমরা এখনও আলোচনা করি এবং গ্রাম-বাংলার মানুষের অনেক কাছের এক নারী সাহিত্যিককে যার বচন সাহিত্য হিসেবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সম্পদ।
এই বইয়ের মাধ্যমে লেখক পাঠকের সামনে বেতালের চিরচেনা ভয়াল রূপ ভেঙে উপস্থাপন করেছেন এক মানবিক অতিপ্রাকৃতিক সত্ত্বা হিসেবে, যে মূলত বুদ্ধিতে,প্রজ্ঞায় তার সমকক্ষ বিক্রমাদিত্যকে খুঁজে বেড়ায়। লেখক বেতালের শুরুর গল্প তুলে ধরেছেন নতুন ভাবে। সেই গল্প থেকে তার উদ্দেশ্যগুলো জানা যায় আরও নিখুঁতভাবে,আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে।
এতোকিছু আলোচনা হলেও বইয়ের পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিলো মাত্র ১১০। এই ১১০ পেজের ছোট আঙিনায় লেখক দারুণ মুন্সীয়ানায় নিয়ে এসেছেন অতীতের বেতাল ও তার দুনিয়া এবং বর্তমানের শুভ্র-মিহিরকে। সাথে ইতিহাস ও চমৎকার ইনফো-ডাম্পিং তো ছিলোই। এই ছোট বইটা পড়ে খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলতে পারবেন, কিন্তু এই বইয়ের রেশ থেকে যাবে অনেকদিন যাবৎই।
তো যারা অতিপ্রাকৃত জনরায় নতুন কিছু পড়তে চান, শুধু ভয় নয়, বুদ্ধির খেলা আর ইতিহাসের ডানায় চড়ে যারা ঘুরে আসতে চান, চেনা পরিচিত হাজার বছরের পুরাতন এক সত্ত্বার সাথে যদি নতুন করে পরিচিত হতে চান, তাহলে হাতে তুলে নিতে পারেন "বেতাল অষ্টাবিংশতি"। সময়টা খারাপ কাটবে না কিন্তু!
বেতাল পঞ্চবিংশতির নাম শুনেছেন। বেতালের পঁচিশটা কাহিনীর বাইরেও যে আরও তিনটা গল্প কালের গর্ভে হারায়ে গেলো, তা জানেন? এই তিনটা গল্পের লেখক কে? বেতাল পঞ্চবিংশতির শুরুটা কোথা থেকে? তারচেয়েও বড় কথা, আমরা গাছে উলটা লটকায়া থাকা যে বেতালের গল্প জানি, আমাদের সে জানায় কি কমতি আছে নাকি এতদিন আসলে ভুল জানতাম?
সাহিত্য, ইতিহাস, পাজল, বিক্রম-বেতাল নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে, তাদের জন্য এই বইটা একটা ট্রিট। প্রচণ্ড উপভোগ করসি। ছোট্ট সাইজের একটা নভেলা, কিন্তু শুরু থেকেই মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম। লেখক সুপর্ণ সরকারের ভাষাটা খুবই স্বাদু। আরাম দেয়। আমার জন্য ট্রিট, নতুন কিছু শব্দ শিখলাম। প্রচ্ছদটা একইসাথে ভয়ংকর, এবং আকর্ষণীয়। সম্পাদনার কাজটাও খুব যত্ন নিয়ে করা হইসে। যেসব জায়গায় টীকা কিংবা তথ্যসূত্রের দরকার, লেখক তা সংযোজন করে দিসেন। তবে একটা পেইজে দেখলাম তথ্যসূত্র হিসেবে উইকিপিডিয়ার লিংক দেয়া হইসে। উইকি আসলে তেমন রিলায়েবল কিছু না। বাদবাকি ঠিকঠাক। ওয়েল রিসার্চড একটা বই।
ঋদ্ধ প্রকাশকে ধন্যবাদ এমন একটা বই উপহার দেয়ার জন্য। এইবারের ঈদের ছুটিতে এই একটা বই-ই পড়লাম। Worth my time and money
সুপর্ণ সরকারের লেখা সুন্দর। তার লেখা ভবিষ্যতে চেখে দেখার ইচ্ছা থাকবে। বেতালের নতুন গল্পগুলো লিখতে গিয়ে তিনি একইসাথে আধুনিক এবং ক্লাসিক ্মেশানো একটা স্টাইল নিয়েছেন, স্টাইলটা আমার ইন্টারেস্টিং লেগেছে। এছাড়া ছোট্ট এই বইটাতে আমাদের সাহিত্য আর ইতিহাসের অনেক বড় বড় নাম ঢুকে গেছে, যেমন- দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, মহাকবি কালিদাস, খনা ইত্যাদি। এই এই ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর পদচারণাও বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে।
ইলাস্ট্রেশনগুলো আমার মন কাড়তে পারেনি, আবার খারাপ যে লেগেছে তাও নয়। আরও কিছু ছোট অসংগতি মনে হয়েছে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে কথা বলাটা এখানে অপ্রয়োজনীয়, কারণ সবমিলিয়ে বইটার সাথে সময়টা এত ভালো যায়, যারা এখনও পড়েননি তাদের রিকমেন্ড করার জন্য সেই অসংগতিগুলো কোনো বাধাই তৈরি করে না। আগ্রহী পাঠকদের খুব সহজেই রিকমেন্ড করার মত বই এই ‘বেতাল অষ্টবিংশতি’।
ছোটবেলায় বিক্রম ও বেতাল কার্টুনটা আমার অনেক পছন্দের ছিলো। তবে জানতাম না যে সিরিজটা বই থেকে অনুপ্রাণিত! তাই যখন বইটা সম্পর্কে জানতে পারলাম তখন সাথে সাথেই অর্ডার করে ফেলি। Now i can say that সিদ্ধান্তটা ভুল ছিলো না ভৌতিক গল্প আমার পছন্দের আর যদি হয় বৃষ্টিময় অন্ধকারে বসে ভৌতিক গল্প পড়া তাহলে আমার আর কিছুই চাই না। বইয়ের গল্পগুলো কিছুটা ছোট আর ইলাস্ট্রেশনগুলো দেখে মনে হলো AI দিয়ে নির্মিত যার কারণে ইলাস্ট্রেশনগুলো আমার মন জয় করতে পারে নি। তবে বইটা পড়া যেতেই পারে আর মাত্র ১১৪ পাতার হওয়ায় এক বসাতেই পুরোটা পড়ে ফেলা সম্ভব।
প্রাচীন ভারতের কূটনৈতিক আখ্যান। স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা, উত্তরাধিকারনীতি, ন্যায়বোধ ইত্যাদি খুব কৌশলে, গল্পের ছলে শেখানো হয়েছে। বিচার ব্যবস্থা, বিশেষতঃ বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা আলোচনা করা হয়েছে। একটা জায়গায় গনতন্ত্রের বিষয়েও আলোকপাত করা হয়েছে। আমার কাছে এই বইটি একবারের জন্যেও ভৌতিক/পৈশাচিক এমন কি ঐতিহাসিক ও মনে হয়নি। প্রাচীন ভারতের বেশ কিছু কিংবদন্তির সন্নিবেশ। এই সন্নিবেশটা কতোটা যৌক্তিক ছিলো, সে প্রশ্ন তোলা রইলো। বেতালের প্রশ্নগুলোর উত্তর আগ বাড়িয়ে দেবার লোভ সামলাতে পারবেন তো? #BookReview #RayhanAbbasBooks #TheRayhanAbbas
বেতাল অষ্টাবিংশতি - নামটার মধ্যেই যেনো একাধারে ইতিহাস, রূপকথা আর রহস্য লুকিয়ে আছে , তাই না? বেতাল পঞ্চবিংশতির সাথে আমার ছোটবেলার অনেক ভালোলাগার দুপুর জড়িয়ে আছে । মায়ের কাছে এই উপাখ্যানগুলি বারবার শুনতে শুনতে প্রতিটি কাহিনী আত্মস্থ হয়ে গিয়েছিল । কোন পাতায় কোন উপাখ্যান আছে বলে দিতে পারতাম । তখন সবে অক্ষরজ্ঞান হয়ে সহজ পাঠ শেষ করেছি । বেতাল শুনতে শুনতে যুক্তাক্ষর শেখা হয়ে গেলো - যক্ষ, মাণিক্য, বিক্রমাদিত্য । কল্পনায় আসত সেই মহাশ্মশান - যেখানে একদিকে তপস্যা রত এক রহস্যময় যোগী , আর অন্যদিকে চলছে এক রাজার ধৈর্য্যের পরীক্ষা । বারবার তিনি স্কন্ধে শবদেহ রূপী বেতালকে নিয়ে চলেছেন গন্তব্যে, নির্ভয়ে বারবার তার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিচ্ছেন - আর প্রতিবার বেতাল তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে নিজ স্থানে । শিশু মনে প্রশ্ন জাগত - বেতাল কে? কেনো এতো প্রশ্ন তার? কি তার উদ্দেশ্য ? বেতাল কি অমর? এদের দুজনের মধ্যে প্রভু কে ? বিক্রমাদিত্য না বেতাল ? বেতাল কি এখনও আছে ? কোথায় আছে ? বড় হয়ে প্রশ্নগুলি কালস্রোতে বহুদিন লোপ পেয়েছিল । তারপর একদিন বেতাল অষ্টাবিংশতি হাতে পেলাম । কিছু লেখকের জ্ঞানের পরিধি আর ভাষার মাধুর্য্য এমন যে তাদের রচিত প্রতিটি অক্ষর মোহাচ্ছন্ন করে রাখে । এই বইটি সেরকমই একটি আখ্যান । পাঁচটি আলাদা গল্প আমরা এখানে খুঁজে পাই। তিনটি গল্পের শ্রোতা বিক্রমাদিত্যের উত্তরসূরিরা । একটির শ্রোতা স্বয়ং কালিদাস - বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার অন্যতম নক্ষত্র । l বেতালের নিজের সৃষ্টি রহস্য বর্ণনা করেছেন কালিদাসকে ! এছাড়াও এই গল্পে আমরা খনার বচন খ্যাত খনাকে দেখতে পাই । তিনি যে এনাদের সমসাময়িক ছিলেন এটা আমার জানা ছিল না । তাঁরও নিষ্ঠা, বোধ এবং বুদ্ধির কঠিন পরীক্ষা নেন প্রেতসম্রাট । এই বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রদের এক সূত্রে বেঁধেছেন লেখক । আরও একটি গল্প আছে - যেটি মূল গল্প । বর্তমান সময়ের দুই বন্ধু মিহির আর শুভ্রর গল্প । তাঁরাই খুঁজে পেয়েছে এক অদ্ভুত দিনলিপি - যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে বেতালের তিনটি হারিয়ে যাওয়া কাহিনী । যে কাহিনী ভারতবর্ষ থেকে সুদূর ইউরোপে পাড়ি দিয়ে আবার ফিরে এসেছে । দুই বন্ধুর ডায়রি পড়ার মাধ্যমে গল্প এগিয়ে চলে । গল্পগুলিতে রাজনীতি, প্রেম, তপস্যা, অহংকার , বিশ্বাসঘাতকতা ফিরে ফিরে আসে । শ্রোতাদের সাথে পাঠকও ভাবতে থাকেন - এই গভীর প্রশ্নের উত্তর কি ? বেতাল আদতে কিসের পরীক্ষা নিচ্ছেন - সঠিক উত্তরের নাকি ভাবনার গভীরতার, নাকি পরীক্ষার অছিলায় সন্ধান করছেন কারোর । প্রতিটি গল্পই স্বমহিমায় শ্রেষ্ঠতর এবং লেখকের কলমের মুন্সিয়ানার এবং সেই সময়ের ভারতবর্ষ নিয়ে গবেষণার পরিচয় দেয় । পড়তে পড়তে যেমন গল্পের রস আস্বাদন করেছি , লেখকের বর্ণনায় তৎকালীন সমাজের ছবিও স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি । সেই জন্যই এই বইয়ের অলংকরণ করার সাহস পেয়েছিলাম । সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এই যে আমার পড়তে গিয়ে একবারও মনে হয়নি যে এই গল্পগুলি পুরোনো বেতাল পঞ্চবিংশতির অংশ নয় । এর থেকে উচ্চ প্রশংসা আমার কাছে নেই । অত্যন্ত সুচারু ভাবে লেখক আমার ছেলেবেলার পড়া বইটির সিক্যুয়েল লিখেছেন । এটি এক নিঃশ্বাসে পড়ার পর যেন আশ মেটে না । মনে হয় - আরও বড় হলে আরও ভালো লাগতো ! বইটি নিশ্চিতভাবে আমার এই বছরের পড়া সেরা বইগুলির মধ্যে আসবে ।