Shuhan Rizwan is from Bangladesh. His debut novel, a historical fiction named 'সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ (Knight in the Oblivion)' was published in 2015; since then, he published 3 more full-fledged novels. His novels often centered around the geo-political nuances and predicaments of life in contemporary Dhaka.
Apart that, Shuhan is a screenwriter too, and the recipient of Chorki Best Screenplay Award-2022.
Being a Mechanical Engineering Graduate, Shuhan choose to be a fulltime writer since 2020. Now when he is not writing in his muddled studio, he spends most of his time reading, traveling with his wife and watching sports events.
১. মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সেরা উপন্যাসটি কিন্তু অলিখিত থেকে গেছে। এটা আমি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের তৃতীয় উপন্যাসটি হতো মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক, ক্যান্সারের কারণে তা আর লিখে যেতে পারেননি তিনি। এটা বাংলা সাহিত্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। এই অলিখিত উপন্যাস, এর স্রষ্টা ইলিয়াস আর তাকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করার স্বপ্নে বিভোর দুই খ্যাপাটে মানুষকে সুহান রিজওয়ান একত্রিত করেছেন "অন্য কারও খোঁয়ারি"তে। প্রথমেই চোখে পড়ে লেখকের প্রস্তুতি ও যত্ন। ৩২৮ পাতার উপন্যাস, কিন্তু কোথাও বাড়তি মেদ চোখে পড়ে না। ক্যান্সারে আক্রান্ত ইলিয়াস, তার পারিবারিক ভুবন, তার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মহাকাব্যিক উপন্যাস রচনার আকাঙ্ক্ষা, শারীরিক অসুস্থতার কারণে লিখতে না পারার চূড়ান্ত হতাশা লেখক বর্ণনা করেছেন স্নায়ুক্ষয়ী তীব্রতার সঙ্গে। মারা যাচ্ছেন অকালে কিন্তু সব ভুলে "খোয়াবনামা" রচয়িতার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ছিলো উপন্যাসটি যেন তিনি শেষ করে যেতে পারেন। মাত্র দুইটা বছর পেলেই হতো!
ইলিয়াসকে নিয়ে সিনেমা বানাতে চাওয়া হিমেল আর অনীম আছে উপন্যাসের আরেক সময়রেখায়। সিনেমা নির্মাণের জন্য ফান্ড সংগ্রহ করা, দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানোর ক্লান্তিকর (এবং মানহানিকর) প্রক্রিয়া, নানান কর্পোরেট ঝামেলা যে সুহান রিজওয়ানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইলিয়াস জ্বরে আক্রান্ত স্বাপ্নিক হিমেলের চাইতে অনিচ্ছুক বাস্তববাদী অনীমের ব্যক্তিগত রূপান্তরটাই ভালো লাগে বেশি। ইলিয়াস কতো দুর্দমনীয়ভাবে তার সমকালীন ও পরবর্তী শিল্পীদের প্রভাবিত করেছেন তা দুটি চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতিক বাস্তবতার প্রচ্ছন্ন কিন্তু অবধারিত উপস্থিতিতে এই দুজনের গল্প আরো ঋজু ও বাস্তবসম্মত হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে ইলিয়াসের অরচিত উপন্যাসের চিন্তাবীজ থেকে লেখা তৃতীয় কাহিনিটি আমাকে কম আকর্ষণ করেছে। এখানে যা বর্ণিত হয়েছে তা সবই বিশ্বাসযোগ্য, উপস্থাপনের ভঙ্গিও যথাযথ কিন্তু কোনো নতুনত্ব পাইনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত উপাখ্যানের যে সাধারণ কিছু ট্রোপ থাকে তা থেকে মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদের গল্প বের হতে পারেনি। এখানকার সবচেয়ে জীবন্ত চরিত্র নাসিমা। তার সংসার করার ব্যাকুলতা ও স্বাভাবিক যৌন আকাঙ্ক্ষা চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
২. বুদ্ধদেব বসু বোদলেয়ারের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করে আলোড়ন তুলেছিলেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে। সমালোচকরা অভিযোগ করেন, রূপান্তরের সময় যথেচ্ছাচার করেছেন অনুবাদক। কবিতাগুলো শুধু বোদলেয়ারের থাকেনি, সেখানে বুদ্ধদেবের কাব্যিক প্রতিভা আর তার নিজস্ব বক্তব্য প্রবেশ করে হয়ে গেছে "বুদ্ধদেবীয় বোদলেয়ার।" সুহানও যখন ইলিয়াসকে নিয়ে লিখেছেন সেটাও অবধারিতভাবে হয়ে গেছে তার নিজস্ব ইলিয়াস। ইলিয়াসের কর্মতৎপরতা, হাহাকার, শিল্পের জন্য ত্যাগস্বীকার, নিজের লেখাকে নিখুঁত করার নির্মম অধ্যবসায়ের চিত্রের মধ্যে ব্যক্তি ও শিল্পী সুহান রিজওয়ানও নিশ্চিতভাবে উপস্থিত।
ইলিয়াসের শেষ লড়াই ছিলো সময়ের বিরুদ্ধে, নিজের করোটিতে আবদ্ধ চিন্তাকে কালো অক্ষরে প্রকাশ করার বাসনায় উন্মুখ ছিলেন কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তা সম্ভব হয়নি। নিজেকে শেষ একটিবার প্রকাশ করে যেতে পারেননি তিনি। তার খোঁয়ারি কিন্তু সংক্রমিত করেছে অন্যদের, তাদের করে তুলেছে শিল্পী, সাহস দিয়েছে নিজের শৈল্পিক সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার - শেষ বিন্দু পর্যন্ত।
মার্চের প্রথম পূর্ণ বৃষ্টির পরের শীতল হাওয়ায় শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের মধ্যে ট্রেনে বসে থেকে মোশন সিকনেসের শিকার হবো কিনা সেই অস্বস্তি কাটাতে কাটাতে আমি যখন এই উপন্যাস শেষ করলাম তখন একবার পুরো যাত্রার দিকে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখার সাধ হয়।
মহৎ সাহিত্য আমার কাছে সবসময় দীর্ঘ এক যাত্রার মতো। যে যাত্রা পাঠকের মস্তিষ্কের ভেতরে পরিবর্তন আনে, নতুন চিন্তার বীজ বুনে দেয়। সুহান রিজওয়ানের এই উপন্যাস তার ব্যতিক্রম নয়।
নিজের সাহিত্য জীবনে মাত্র দুইটা উপন্যাস লিখেছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। খোয়াবনামা-তে এসেছে সাতচল্লিশ আর চিলেকোঠার সেপাই-এ উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। একাত্তর নিয়ে তার একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছা ছিল। অসুস্থতা তাকে যথেষ্ট আয়ু না দেওয়ায় সে ইচ্ছা পূরণ করতে পারেননি। এই উপন্যাসে আমরা ইলিয়াসের ভেতর সেই উপন্যাসের স্বপ্নের জন্ম-মৃত্যু দেখি।
বাহাত্তর সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধের শহীদের তালিকা করতে শুরু করা পীরবাড়ির সাজ্জাদ যখন উপন্যাসের পাতায় পাতায় হেঁটে যেতে থাকেন জেলার পর জেলা জুড়ে তখন তার ছায়া দেখে আমরা ভারাক্রান্ত হতে বাধ্য হই মুক্তিযুদ্ধ আজও আমাদের জাতির কপালে সঠিকভাবে দেগে যেতে পারেনি ভেবে।
বর্তমান কালের ভেতরে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং সাজ্জাদদের নিয়ে এক আর্ট ফিল্ম বানানোর প্রয়াস চালানো হিমেল আর অনীমের লড়াইয়ের ফাঁক দিয়ে নানা ভাবে আমরা দেখতে থাকি পোস্ট-জুলাইয়ের বাংলাদেশের সমাজের রাজনৈতিক অবস্থা।
রাতারাতি দেশ পালটে যাবে এমন এক স্বপ্ন দেখে রাস্তায় নামা সর্বস্তরের জনতা যে কীভাবে প্রতারিত হয়েছে তা সিনেমা বানানোর পথে আসা বাধার ভেতর দিয়ে আমাদের সামনে স্পষ্ট হতে থাকে।
শুরুর দিকে সাজ্জাদের অংশ কিছুটা শ্লথ গতির হলেও এক তৃতীয়াংশ পার হওয়ার পর থেকেই পুরো উপন্যাসই গতিময়তার সাথে যাত্রা করে। বলতেই হবে, সুহান রিজওয়ান একটি মাস্টারপিস উপহার দিয়েছেন।
"... ঔপন্যাসিকের সমর্থন যার প্রতিই থাক, তাঁর ব্যবহার সকলের সঙ্গে সমান। সকলের ভেতরে ঢুকে তাদের অন্তর্গত বাণীকে ধরে আনবেন তিনি। ঔপন্যাসিকের ওপর লেখা ডব্লু, এইচ, অভেনের কবিতা নকল করে বলি, তিনি "among the just be just, among the filthy filthy too"। ঔপন্যাসিকের নিজের ব্যক্তিত্ব আপাতদৃষ্টিতে শিথিল, কারণ সবাইকে তিনি তাদের মতো করে দেখতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাঁকে শক্ত থাকতে হয়। তাঁর এই আপাতশিথিল ব্যক্তিতে তিনি ধারণ করেন সবাইকে, সকলের দুঃখ-বেদনা বহন করতে হয় তাঁকে। এর মধ্যেও তাঁর নিজের বক্তব্য আছে, এবং সেই বক্তব্য রচনার। সর্বত্র ছড়ানো রয়েছে, চরিত্রের পরতের পর পরত উদ্ঘাটনে, কাহিনীর ক্রমবিকাশের মধ্যে তাঁর নিজের কথা এমনভাবে বলা হয় যে তিনি যেন কিছুই জানেন না, চরিত্র ও কাহিনীর এই বিকাশই তাঁকে এরকম সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য করেছে।
এজন্য মানুষকে তিনি দেখেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ভক্তিগদগদ হলে এই কর্মটি করা অসম্ভব। ভক্তিগদগদভাব মানুষের বিশ্লেষণের পথে প্রচণ্ড বাধা। তাই নিরঙ্কুশ ভক্তির দাপটে কী ঈশ্বরের সামনে কী তার প্রতিনিধি কী সামন্ত-প্রভুর সামনে মানুষকে যখন সদাসর্বদা নতজানু হয়ে লেজ নাড়তে হতো সেই সময় উপন্যাস লিখিত হতে পারেনি।
তাই ঔপন্যাসিকের প্রধান অবলম্বন হল তাঁর সংশয়। সংশয়ের তাড়াতেই লেখক প্রত্যেকের ভেতরে ঢোকেন তাকে তদন্ত করার জন্য, এই সংশয়ের তাড়ায় তাঁকে আখ্যানের চে���়ে বেশি তাড়া করে ভেতরের মনোজগৎ, এবং তাঁর সমাজ-কারণ তা-ই তাঁকে সাহায্য করে মানুষের বিশ্লেষণে...
... উপন্যাস কি তা হলে শেষ পর্যন্ত মানুষে�� দ্বন্দ্ব আর সংঘাতের কুরুক্ষেত্র হয়েই টিকে থাকবে? হ্যাঁ, তা-ই। সংশয়ই মানুষকে ধাপে-ধাপে নিয়ে যেতে পারে বড় ও গভীর কোনো উপলব্ধির দিকে।"
উপন্যাস প্রসঙ্গে ইলিয়াসের ধারণা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, ইলিয়াসকে ভরকেন্দ্রে রেখে দুর্দান্ত একটি উপন্যাস এটি। সাজ্জাদ, ইলিয়াস এবং হিমেলকে ঘিরে তিনটি ধারায় প্রবাহিত হয়ে চলতে চলতে চরিত্রগুলোর মনোজাগতিক সংশয়কে লেখক বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। রাজারাজড়া, দেবদেবীদের বন্দোনামূলক মহাকাব্য থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষ এবং সমাজকে নিয়ে লেখার মধ্যে দিয়ে উপন্যাসের সূচনা হয় — যার নায়ক শতভাগ ভালো অথবা শতভাগ মন্দ নয় বরং রক্তে মাংসে গড়া একজন। আমরা উপন্যাস পাঠ করি, কারণ উপন্যাস স্থান-কাল-পাত্রভেদে আমাদের নিয়ে যার ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছে — যে মানুষ ভালো, মন্দ, কিংবা উভয়ই হতে পারে — এক জীবনে যেভাবে বহু জীবন যাপন করা যায়। জেলে না হয়েও একজন কুবের আমাদের জেলেদের কাছে নিয়ে যায়, রাস্তায় হাজারো হাড্ডি খিজির আমরা দেখি কিংবা একজন আবু ইব্রাহীমের জীবন অনুভব সম্ভব হয় উপন্যাসের কারণেই। একজন কবি চাইলেই খারাপকে খারাপ বলে খারিজ করতে পারে, কিন্ত একজন ঔপন্যাসিক তা পারেনা।অপছন্দের চরিত্রের ভেতরে ঢুকেও তাকে মনোবিশ্লেষণ চালাতে হয়; ক্ষেত্রবিশেষে ভিলেনের স্বপক্ষে তাকে সাফাই গাইতে হয়। সাহিত্যরচনায় একজন ঔপন্যাসিকের ভার থাকে অনেক বেশি।
সুহান রিজওয়ান এই ভার ভালোভাবে সামলাতে পেরেছেন। উপন্যাসের প্রতিটি মৌলচরিত্র তাদের জীবনে সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ক্যান্সার আক্রান্ত ইলিয়াস মৃত্যুর আগে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে চান। চিত্রনাট্যকার হিমেল ইলিয়াসকে নিয়ে একটি সিনেমা বানাতে চান। বগুড়ার মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ পঞ্চাশ বছর ধরে পঁচিশ জেলার আশি হাজার শহীদের নাম লিস্ট করেন। তাঁদের যাপনকাল, আর্থিক-সামাজিক সঙ্গতি, বয়সে কোনো মিল না থাকলেও তিন চরিত্রের অন্তর্নিহিত মিল হচ্ছে তাদের কারো স্বপ্নই পূর্ণতা পায় না। তিনজনই সংশয়গ্রস্ত — গন্তব্য লক্ষ্যস্থির করলেও যাত্রাপথ তাদের কাছে ধরা দিচ্ছে না। তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের প্রশ্ন করে চলে, যে বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে উপন্যাসের কাহিনী। চরিত্রগুলোর স্বপ্ন পূর্ণতা না পেলেও সুহানের লেখার মাধ্যমে পরিণতি যেন পাঠককে পূর্ণতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। তাইতো শহীদদের সেই লিস্ট, ইলিয়াসের সেই উপন্যাস কিংবা হিমেলের সিনেমা অসম্পূর্ণ থেকেও আমাদের সম্পূর্ণ করে তোলে। উপন্যাসপাঠে প্রত্যেক পাঠকের মনোজগতে স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র যে লিস্ট, উপন্যাস কিংবা সিনেমা জন্ম নিবে তার কৃতিত্ব লেখককে দিতে হয়। উপন্যাসের একমাত্র সমালোচনা বলতে বলবো যে রাজাকার আব্বাস চরিত্রটিকে আরেকটু ফুটিয়ে তোলা যেতো। কনটেম্পোরারি লেখকদের মধ্যে সুহানের একনিষ্ঠ পাঠক আমি — তার উপন্যাসগুলো পড়ে কখনো হতাশ হতে হয় না। আপনারা স্বাচ্ছন্দ্যে বইটি সংগ্রহ করতে পারেন।
একধরনের নীরব সম্মান লেপ্টে আছে সুহান রিজওয়ানের "অন্য কারও খোঁয়ারি" উপন্যাসে। স্রষ্টার সৃজনশীল দৃষ্টির মোড়কে এই সম্মান, কোন আধ্যাত্মিক বা রিলিজিয়াস প্রফুল্লতায় আচ্ছন্ন না।
আত্মানুসন্ধানী কথক বা লেখক হিসাবে লেখা এই আখ্যান; সুহান রিজওয়ান এখানে ইতিহাসবিদ নয়। "অন্য কারও খোঁয়ারি" এর ভাষা তাই বহমান, প্র্রাঞ্জল কিন্তু বহতা স্রোতের তোড় ও reverential detachment এর আবেশে সিক্ত হয়েও অসংযত নয়; যথেষ্ঠ সংযত। বিশেষ করে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে বিভিন্ন তথ্যবহুণ যে অংশগুলো, সেটা অনেক লেখকের কলমেই ইনফো-ড্যাম্পিং হয়ে ক্লিশে হয়ে উঠতে পারত। সুহান রিজওয়ানের শব্দ, বাক্য বা ন্যারেশন এখানেই অসম্ভব সংযত।
ফলতঃ অ্যাকাডেমিক ঢং হয়ে ওঠে নি উপ্যন্যাসটি। উপন্যাসটির চিন্তা-ভাবনার জায়গায় লেখক তো অবশ্যই স্পেসিফিক ছিল, পাশাপাশি সেটা এক্সপ্যান্ড করাতেও সফল ছিল সুহান রিজওয়ান। যার ফলে পাঠকের কাছে "অন্য করও খোঁয়ারি" হয়ে উঠবে healing narrative.
"অন্য কারও খোঁয়ারি" উপন্যাসের ভরকেন্দ্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। সমান্তরালে চলে তিনটি গল্প। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের, সাজ্জাদের এবং হিমেলের। তবে উপন্যাসের ভরকেন্দ্র হিমেল ধরে "অন্য কারও খোঁয়ারি"কে "ওয়ান্ডারিং ইম্প্রেশন" হিসাবে দেখার বা ভাবার সুযোগও থেকে যায়। উপন্যাসের শুরুতে ভূমিকা এবং হিমেলের শুরুর গল্পে আমি নিশ্চিতভাবে লেখক সুহান রিজওয়ানের "এক টুকরো আমিত্ব"-কেও দ্রবীভূত হতে দেখি। সুহান রিজওয়ানের প্রথম উপন্যাস লেখাকালীন তার জার্নিটা যদি "সচলায়তনের" আলোচনা ঘীরে আপনি সে সময়ে উপস্থিত থাকেন, তাহলে খুব সহজেই রিলেটেবল।
যে কথায় ছিলাম, উপন্যাসের ভরকেন্দ্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। "অকাখোঁ" তে লেখক যেটা করেছেন - আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সামনে ও পিছে দুটো মিরর সেট করে দিয়েছেন। ফলতঃ আমরা সাজ্জাদ এবং হিমেলের গল্পে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মিরর ইমেজকেই দেখি। সাজ্জাদের শ্রম, শেষে তার পরিনতি, হিমেলের স্ট্রাগল, ডেডিকেশন, ইলিয়াসের অন্দরমহল ও বহির্জগৎ - সব যেন এসে এক সুতোয় মিশে। কোথাও যেন সাজ্জাদ বা হিমেলরা হয়ে ওঠে অন্য এক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসেরই প্রেতাত্মা।
উপন্যাসের এই মূল ৩টি চরিত্রের ব্যক্তিগত ভাঙাগড়ার বর্ণনা সেখানে অপ্রপ্তির আলোকচ্ছটা ঠিকরালেও - তা আর্তনাদের ভাষা না, বরং নিরবতার ভাষা হয়ে রয় শব্দ জুঁড়ে। খুব কন্ট্রোলড ওয়েতে সহান রিজওয়ান এগিয়েছেন এই ত্রি-মূখী বয়ানের সমাপ্তি। আখতারুজ্জামানের অংশে লেখক অতিরঞ্জিত ভক্তির বহুর্মত্রিক আলোতে বিচরন না করে অনুভব আর শ্রদ্ধার বন্ধনীতে সরল কষে গিয়েছেন। অন্য দুটো চরিত্রের বেলাও মেলাড্রামাটিক কোন পরিনতি নেই। কাব্যিক বর্ণনা আছে বৈকী, মহাকব্যিক পরিনতি নেই। কোন মহান সংস্কারক বা ক্যারেকটারলেস শহরে চরিত্রগুলো ব্যাটম্যান বা সুপারহিরো হয়ে ওঠে না। নিববে ও নির্ভিতে রক্তমাংসর পরিপূর্ন মানুষের দেখা মেলে। একর খোঁয়ারিতে সিক্ত অন্য একজন ইলিয়াস হয়ে ওঠে।
পাঠকের নিজস্ব একটা সেল্ফ-মেড গল্পের সমাপ্তিও থাকে। "অকাখোঁ" উপন্যাসে যখন অনীম সৈয়দের মোবাইলে টেক্টট ম্যাসেজ আসে - পাঠক হিসাবে আমি বারবার মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম, হিমেল বা অনীমদের গল্প যেন এখানেই সমাপ্তি হয়। পাঠক হিসাবে যেন আমি সেই "টেক্সস্ট ম্যাসেজ" এর কৌতুহুলটুকু ইমাজিন করে প্রশ্ন রাখতে পারি - হিমেল কি ইলিয়াস হয়ে উঠেছে? যদিও গল্প সেখানে শেষ হয় না।
কিন্তু হিমেলের গল্পটা আমার ইচ্ছের বিপরীতে যেখানে এসে আর প্রলম্বিত হলো - তখন মনে হল - এটাই দারুন। পুরো উপন্যাসের ব্রিদিং স্পেস ওই "আলোর মিছিল"-টাই - যা খুবই দরকার ছিল। "অকাখোঁ"র পরিধি জুঁড়ে অন্য রকম এসেন্সে এনে দেয় ওই সমাপ্তিটুকু -
"তবুও তো ফোটে ফুল, পাখি গান গায়, ভাবে না তো কেউ তারে চায় কি না চায় ...।"
শুরুতেই বলেছিলাম, উপন্যাসের ভরকেন্দ্র হিমেল বা তার সেই ফিল্ম "অন্য কারও খোঁয়ারি" কেও ভাবা যায়। যেখানে উপন্যাসের বাকি অংশ ওই ফিল্মের স্ক্রিপ্ট হয়েও রয়ে যায়। সাজ্জাদ, ইলিয়াস.. এরা সব সেই স্ক্রিপ্টের কুশীলব।
তবে উপন্যাসের অপার ���ীপ্তি হয়ে থাকে নাসিমা। সাজ্জাদের স্ত্রী। বিশেষ করে -
"সাজ্জাদের সংশয় আর কাটে না। নয় মাস পর নাসিমা আক্তার একটি পুত্রসন্তান প্রসব করলে সেই সংশয় আরও বাড়ে।"
এই অভিব্যক্তি নাসিমার নিঃসঙ্গ উপস্থিতি ভেদ করে যেন পুরো বাংলাদেশ হয়ে ওঠে নিমিষেই! "সংশয়" শব্দটি যেন এক অনুচ্চারিত সামাজিক আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ, এবং লেখক সুহান রিজওয়ানের শব্দে পাঠকের স্থিতাবস্থায় একটি বোল্ড প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে যান।
সুহান রিজওয়ানের "অন্য কারও খোঁয়ারি" অন্বেষণের স্পন্দনে আলোড়িত উপন্যাস - যার অন্দরমহলে প্রবেশ মাত্রেই পাঠকের বিপুল আগ্রহ ধীরে ধীরে ঘন হবে জ্বাল দেয়া দুধের মতোন। অন্দরমহলে ভাষার লাবণ্যের রোদে পেখম মেলে ওম পোহাচ্ছে সাহিত্যের ঘ্রাণ। শুরু থেকে শেষ - যতটা বহমান তার স্রোত - কোথাও শুস্ক হয়ে ওঠেনি, পাঠকের জার্নির নৌকাটা বিরক্তির শুস্ক চরে আটকে যাওয়ারও সম্ভাবনা নেই। যারা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়েননি কখনো, তাদের জন্যে উপন্যাসটি হয়ে উঠতে পারে অলৌকিক আবিষ্কারের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ জার্নি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়ুয়া পাঠকদের জন্যে বর্তামান এবং অতীত দুয়ের মিশ্রনে নিজিকে পুনরায় ঝালিয়ে নেবার নতুন এক দৃষ্টিপথ।
ব্যক্তিগত কক্ষপথে বিচরণ হেতু অন্তর্গত ও সূক্ষ্ণ এপিগ্রামে আলিঙ্গন করা আরও সাবলীল ও পরিনত এক সুহান রিজওয়ানকে।
"অন্য কারও খোঁয়ারি" এ বছরে পড়া অন্যতম সেরা উপন্যাস হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে।
আমার এখনও মনে আছে—প্রথমবার খোয়াবনামা পড়ার অনুভূতি, সেই ২০১৮ সালে। One Hundred Years of Solitude পড়ার পরেও আমার ঠিক এমনটাই লেগেছিল, যেমন মাকোন্দো থেকে বের হতে আমার অনেক সময় লেগেছিল, তেমনই কাৎলাহার বিল থেকেও বের হতে আমার অনেক সময় লেগেছিল।
যখন শুনলাম খোয়াবনামার স্রষ্টা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে বইটা লেখা, তখনই ভাবলাম—এটা তো অবশ্যই পড়তে হবে। পড়ার পর বলতে গেলে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হইনি। মানে, লেখকের ভাষাতেই যদি বলি, ইলিয়াসের আসল এসেন্সটা যেন এখানে পুরোপুরি ধরা পড়েনি, কিছু একটা যেন মিসিং রয়ে গেছে।
তবে পড়তে খারাপ লাগেনি একদমই। কোথাও কোনো অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা নেই, লেখার স্টাইলটাও বেশ ভালো লেগেছে। যখনই কাৎলাহার বিল, পাকুড় গাছ, মুনশি, তমিজের বাপ, কুলসুম—এরা ফিরে ফিরে আসছিল, কয়েকবার সত্যিই গুজবাম্পস হয়েছিল। এই অনুভূতিটা একটু আলাদা, যখন কেউ আপনার খুব প্রিয় একটা বই নিয়ে কথা বলে, আর আপনি হা করে, গভীর আগ্রহ নিয়ে তার কথা শুনতে থাকেন, ঠিক সেইরকম একটা অনুভূতি।
ইলিয়াস তাঁর সেরা উপন্যাসটা লিখতে চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা আর সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি(আহা, যদি আর দুটো বছর সময় পেতেন!) এখানে সুহান রিজওয়ান যে অংশটা লিখেছেন সেই অসমাপ্ত উপন্যাসকে ভেবে—ওটা আমাকে তেমন টানেনি। তবে নাসিমা চরিত্রটা ইন্টারেস্টিং ছিল, যদিও শেষটা ভালো লাগেনি। আর একটা বিষয়—আমি আসলে খুব একটা পছন্দ করি না, যখন কেউ আমার প্রিয় লেখকের অসমাপ্ত কাজকে শেষ করতে চায়। আমার মনে হয়, ওটা যেমন আছে, তেমনই থাকুক।
তবে স্ক্রিপ্ট হিসেবে এটা ঠিক আছে। তাঁর জীবন নিয়ে সিনেমা হতে পারে, তাঁর লেখা নিয়েও আলোচনা হতে পারে, কিন্তু ওই গল্পের অংশটা আমি নিতে পারিনি। এই এক জায়গা ছাড়া, বইটা ভালো—এক অর্থে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রতি একটা ট্রিবিউট।
বইটাতে একটা জায়গায় হিমেল শাহাদুজ্জামানকে একটা প্রশ্ন করে, “আপনি যদি ইলিয়াসকে নিয়ে লিখতেন; মানে, আপনার প্রিয় একজন লেখক আপনাকে কীভাবে ইন্সপায়ার করেছে, সেটা নিয়ে লিখতেন, সেই গল্পটা কেমন হতো?” এখন আমি নিজেই সেই একই প্রশ্নটা ভাবছি। যদিও শাহাদুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে একটা চ্যাপ্টার লিখেছিলেন ’এ জীবন লইয়া কি করিবো, তে।
সবশেষে মনেপ্রাণে চাই—ইলিয়াসকে নিয়ে একটা সিনেমা হোক। আশা করছি সুহান ভাই একদিন সফল হবেন এই কাজে। বইয়ের নাম এবং প্রচ্ছদটা অনেক সুন্দর হয়েছে।
শিরিষগাছের থেকে এক ধ্বনিবহুল সংকেত আসে। তখন দুপুর। নদীপাড় ধরে ছুটছেন ইলিয়াস গল্পের খোঁজে। প্রতিবাদ করছে শরীর। ফুরিয়ে আসছে সময়। তবু চলছে মহাযজ্ঞ। লিখে যেতে হবে।
মানুষ সিঙারা খাচ্ছে, জিলাপি খাচ্ছে.. ফুটপাতে মানুষের সঙ্গ দিচ্ছে কসমোপলিটন আলো। এই আলোতে পথ দেখা যায় বটে, কিন্তু মায়ার ছায়া এখানে অনুপস্থিত। গল্পটা হিমেলের, অনীমের। উদ্দেশ্য আমাদের জানা, পরিণতির সাথে আছে পূর্ব পরিচয়। লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এখানে যুক্ত করেছে নতুন পালক।
পীরবাড়ির সাজ্জাদ তো আমাদের আরশিনগরের পড়শি। সাজ্জাদের ভ্রমণ আমাদের ক্লান্ত করে, ব্যথিত করে.. এই এতদিন পর কোন এক মৃতপ্রায় গাছের নিচে এনে দাঁড় করিয়ে বলে, দুঃখী মানুষই বোঝে দুঃখী মানুষের কথা। আমাদের এমনই বাস্তবতা। দেশ পাল্টায় না। মানুষ পাল্টায় না।
সুহান রিজওয়ান প্যারালালি তিনটি গল্প ডিল করেছেন, তিনটি ভিন্ন আঙ্গিকে.. ভাষায় ইলিয়াসকে এঁকেছেন শুদ্ধ কবিতার মতো.. প্রেমটা এখানে অটুট। রাজনীতি এখানে জীবনের বাস্তবতা। ক্রাফ্টিংয়ে আছে নতুনত্বের স্বাদ। দীর্ঘ উপন্যাস, তবু মেদহীন। গল্পের গতি শ্লথ কিন্তু পেইজ টার্নার। গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্সে যারা এসেছেন, তারাও কী ভীষণ জীবন্ত। যেন অদ্ভুত এক ফিউশন।
কাৎলাহার বিলে আবারও পানকৌড়ির মতো উড়ে যাওয়ার স্বাদ দেয়ার জন্য সুহান রিজওয়ানকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাতেই হয়।
সুহান রিজওয়ানের থেকে যা আশা করি তার সূচনা ঘটলো 'অন্য কারোও খোঁয়ারি' দিয়ে। বাক্য গঠন, শব্দচয়ন থেকে শুরু করে সমাপ্তিতে তারিখ বসিয়ে দেয়া পর্যন্ত প্রতিটি জায়গায় ইলিয়াসের ছাপ ছেড়ে গেছেন তিনি। ট্রিবিউট দেয়া বোধহয় এটাকেই বলে। এরপরও কিছু জায়গায় অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়, ত্রিমুখী এই কাহিনির একটা ট্র্যাক অসমাপ্ত থেকে গেছে। লেখনীর ব্যাপারে লেখক আরেকটু যত্নশীল হবেন বলে আশা করছি। কারণ তার প্রতি প্রত্যাশার পারদটা অনেক বেশি, তার থেকে আরও অনেক কিছু পাওয়া সম্ভব বলেই মনে করি। 'অন্য কারও খোঁয়ারি' বড় পর্দায় দেখার জন্য বসে আছি সেই প্রথম দিন থেকে। আশা করি, বাস্তবের অনীম আর সুহান দের পরিণতি গল্পের অনীম আর সোহেলের দের মতো হবে না। সাড়ে চার।
বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমাদের একটা আফসোস আছে। সেই আফসোসের আবার শাখা আছে কয়েকটা। প্রথম শাখা, বাংলা সাহিত্যে নাকি ভালো লেখা নেই। দ্বিতীয় শাখা, ভালো যা আছে তা নিয়ে আলাপ নেই। এইগুলোর মধ্যেই যে কয়জন লেখকের প্রসঙ্গ আসে বাংলাদেশের সাহিত্যের ক্ল্যাসিকের কাতারে তার মধ্যে শীর্ষে থাকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম। কিন্তু তাকে নিয়েও ���লাপটা ইন্টেলেকচুয়াল বোরিং সার্কিটের বাইরে কই? সেই সংষ্কৃতির মধ্যেই কেউ যদি ইলিয়াসকে নিয়ে সিনেমা বানাতে চায়? আসে আরেকটা আফসোসের জায়গা—আমাদের সিনেমার হালচাল? আর সবচেয়ে বড় আফসোস, সময়ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বদলে যাওয়া ন্যারেটিভ। সুহান রিজওয়ানের অন্য কারও খোঁয়ারিতে এই বিষয়গুলো জ্বলজ্বল করে।
এই লেখার সূচনা অংশ দেখে মনে হতে পারে, উপন্যাসটা বোধহয় কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আফসোসের বহর নিয়ে রচিত। আদতে তা নয়। অন্য কারো খোঁয়ারি কতগুলো গল্প বহন করে। একটা উপন্যাসের কাজ অনেকগুলো গল্প বলা। এই উপন্যাসে তা আছে। একটা গল্প সাজ্জাদের, একটা গল্প ইলিয়াসের, একটা গল্প হিমেল কিংবা খোদ সুহান রিজওয়ানের। সেই গল্পগুলোর মধ্যে থাকে আরো গল্প। সেখানেই ইলিয়াসের ভূবন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাস্তবতা ও বদলে যাওয়া ন্যারেটিভ, আমাদের সিনেমাপাড়ার চিত্র উঠে আসে। সেই সঙ্গে থাকে মিথ। গ্রাম বাংলার কালচার আর তার সমান্তরালে—এই শহরের মানুষ ও তার যাপিত জীবন।
হিমেল একটা সিনেমা বানাতে চায়। সৎ সিনেমা। কিন্তু সাকিবের কনটেন্ট টিমে থাকা হিমেল খুব বেশিকিছু কর উঠতে পারে না। সবখানেই একটা করে সীমাবদ্ধতা। নিকিপাড়ায় (নিকেতন) সে ঘুরে বেড়ায় একটা সুযোগের অপেক্ষায়। সবশেষে জুটে যায় অনীম সৈয়দের সঙ্গে। বানাতে চায় ইলিয়াসকে নিয়ে তার সিনেমাটা। আর হিমেলের এই যাত্রার সমান্তরালে সুহান রিজওয়ান রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের একটি গল্প ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প।
বাংলা সাহিত্য নিয়ে আমার একটা আফসোস, এখানে ঐতিহাসিক উপন্যাস, ঐতিহাসিক চরিত্র নির্ভর উপন্যাস কম। যা-ও লেখা হয়েছে তাতে একটা খামতি চোখে পড়ে। তুলনায় যাচ্ছি না। না লেখার কারণও আছে। অন্য কারো খোঁয়ারি উপন্যাসেও সে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সিনেমার প্রডিউসার খুঁজতে গিয়ে হিমেল আর অনীম তাদের কাছ থেকে শোনে ‘কী কী বিষয় থাকলে সিনেমার জন্য তারা ফান্ড পাবে’। আর সেসব রাখতে হলে সিনেমাটা অবশ্যই তাদের থাকবে না। সেই সূত্রে চরিত্রদের মুখ থেকেই আমরা শুনি এই দেশে কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে লিখতে গেলে তাদের মুরিদরাই তম্বি শুরু করে। মানুষের গ্রে এরিয়া দেখতে তারা রাজি না।
সুহান রিজওয়ানের এই উপন্যাসে সমান্তরালে তিনটা গল্প চলে—ইলিয়াস, সাজ্জাদ ও হিমেল। ইলিয়াস ঐতিহাসিক, বাস্তব চরিত্র। সাজ্জাদ এই বাংলার যে কোনো মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেন। আর হিমেল আমাদের পরিচিত এই সময়ের যে কোনো চিত্রনাট্যকার হতে পারে। তবে উপন্যাস অনুসারে সাজ্জাদ চরিত্রটি ইলিয়াসের খাতা থেকে আসা যাকে নিয়ে ইলিয়াস তার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসটি লিখতে চেয়েছিলেন। ইলিয়াসকে নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে রিজওয়ান ইলিয়াসের প্রতি ঐতিহাসিকভাবে দায়বদ্ধ থেকেছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে পড়াশোনার সূত্রে তার সম্পর্কে যা জেনেছি, যা জরুরী তা এনেছেন রিজওয়ান। ইলিয়াসের জীবন, যাপন, ভাষা তার আশেপাশের চরিত্ররা সুহানের উপন্যাসে এসেছে। তাদের মূর্ত করে তুলেছেন। সেই সঙ্গে তিনি এনেছেন ইলিয়াসের স্মৃতি বিজড়িত স্থান, তার উপন্যাসের স্থান ও চরিত্রদের। তমিজের বাপ স্পষ্ট হয় আমাদের সামনে। আমরা দেখতে পাই কাৎলাহার বিল। আমরা দেখতে পাই সাজ্জাদের দহন। নাম উল্লেখ না করেও সাজ্জাদের গল্পে তিনি আমাদের নিয়ে যান হুমায়ূন আহমেদের কাছে। আমরা দেখি তরুণ শাহাদুজ্জামান, আনু মুহম্মদ, মিহির সেনগুপ্ত থেকে মহাশ্বেতা দেবীকে।
সুহান রিজওয়ানের ভাষা, গদ্য পোক্ত। তিনি চরিত্র ও পরিস্থিতি অনুসারে ভাষা বদলেছেন। তার অন্যান্য উপন্যাসের তুলনায় এই উপন্যাসকেও (ব্যক্তিগত মত) কনক্রিট মনে হয়েছে। লেখক জানতেন তিনি কী লিখছেন, কী বলতে চান, কতটা বলতে চান। সে কারণেই অতীতের সঙ্গে বর্তমানও মূর্ত তার লেখায়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দেশের বদলে যাওয়া পরিস্থিতির পাশে উঠে আসে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি। যেখানে মানুষ সব বোঝে কিন্তু বলতে পারে না কিছু।
এই সবকিছুর মধ্যে সুহান তার উপন্যাসের পাঠকের সামনে বারবার নিয়ে আসেন ইলিয়াসকে। কেননা এটিই তার লক্ষ্য। তাই অনীম ও হিমেলকে নিয়ে যান কাৎলাহারে। সামান্য উন্নাসিক অনীম সেখানে গিয়ে খুঁজে পায় সহজাত মিথকে। সেই জায়গায় মিথ, বাস্তব আর উপন্যাস তথা গল্প একাকার হয়ে যায়। পাঠকও জড়িয়ে যায় অনীমের মতো। সেও চিনতে চায় উপন্যাসের চরিত্রদের। খুঁজতে চায় কোনো খোয়াবনামা।
“জীবিত”—শব্দটির ভেতরেই এক ধরনের অদৃশ্য গতি নিহিত। কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর দৃশ্যমান গতি না থাকলেও তার অন্তর্গত প্রাণশক্তি তাকে জীবিত করে রাখে। সেই প্রাণশক্তি হয় নিজেকে গতিশীল করে, নয়তো তার আশপাশের জগৎকে। আর যা নিথর, নিশ্চল, প্রাণহীন আমরা তাকে বলি মৃত। এই বোধ থেকেই উপন্যাসকে আমি দুই ঝুড়িতে রাখি—‘জীবিত আখ্যান’ এবং ‘মৃত আখ্যান’। ‘সুহান’-এর লেখার শৈল্পিকতা, জীবনবোধ, এবং অতিবর্ণনাবর্জিত সংযম আমাকে বাধ্য করেছে ‘অন্য কারো খোঁয়ারি’কে প্রথম ঝুড়িতে স্থান দিতে। এমনকি নির্দ্বিধায় বলা যায়, এই বইটি হাতে তুলে দিয়ে কাউকে বলা সম্ভব, “বইটির মতো আপনার জীবনও দীর্ঘ হোক।”
এই আখ্যানের শিকড় ছড়িয়ে আছে আমাদের সাহিত্য-ঐতিহ্যের গভীরে। যেমন ‘খোয়াবনামা’র মুনসী বয়তুল্লা শাহ, যিনি একাধারে মৃত, আবার জীবিত; অতীত, আবার বর্তমান; চেতন ও অবচেতনের মধ্যবর্তী এক বিস্ময়কর উপস্থিতি। তাঁর মতোই এই উপন্যাসেও অনুপস্থিতির ভেতর দিয়ে উপস্থিতির শক্তি কাজ করে। তমিজের বাপের অনুসন্ধানের মতোই এখানে চরিত্রগুলোও যেন এক অদৃশ্য স্রোতের ভেতর দিয়ে চলমান।
গল্পের বুননে ধীরে ধীরে উঠে আসে ইলিয়াস, সুরাইয়া, পার্থ, খালিকুজ্জামান, সাজ্জাদ, নাসিমা, দুলাল, রাশেদ, হিমেল, অনীম, আনু মুহাম্মদ, মহাশ্বেতা দেবী প্রমুখ—যারা প্রত্যেকে আলাদা হলেও একটি বৃহত্তর সময় সচেতনতার অংশ। এখানে ব্যক্তি আর জনপদ আলাদা থাকে না, ইতিহাস ও বর্তমান একই বয়ানে মিশে যায়।
জীবনচরিতের প্রসঙ্গে যেমন বলা হয়, লেখকের কাজ কেবল তথ্য সাজানো নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ মানবচরিত্র নির্মাণ করা, এই উপন্যাসেও সেই সচেতনতা স্পষ্ট। লেখক কোথাও অন্ধ শ্রদ্ধায় আচ্ছন্ন হননি, আবার নির্মম বিচ্ছেদও ঘটাননি। বরং গ্রহণ ও বর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি এমন এক বয়ান নির্মাণ করেছেন, যেখানে চরিত্রগুলো পূর্ণতা পায় তাদের সীমাবদ্ধতাসহ।
উপন্যাসটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি কোনো সম্পূর্ণ জীবনী নয়। বরং ইলিয়াসের অসমাপ্ত স্বপ্ন, তাঁর দীর্ঘ সাধনা এবং আকস্মিক ঝরে পড়ার বেদনা, সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের ‘উন্মোচিত জীবনী আখ্যান’। মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করার জন্য তাঁর দশ বছরের শ্রম এখানে প্রতিধ্বনিত হয়।
“ম্যালা কষ্ট হচ্ছে, বাবা! লাখ লাখ মানুষের নাম…”
এই সংলাপ শুধু ব্যক্তিগত ক্লান্তি নয়, এটি এক জাতির ইতিহাস বহনের যন্ত্রণা। সাজ্জাদ চরিত্রটি সেই যন্ত্রণার প্রতীক, যিনি মুক্তিযুদ্ধে পরিবার হারিয়েও থেমে থাকেন না, বরং আজীবন শহীদদের তালিকা তৈরি করে যান। কিন্তু এই সমাজ তাঁকে সম্মান দেয় না, বরং বারবার অপমানিত করে। এখানেই লেখক আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য তুলে ধরেন, ত্যাগ সবসময় স্বীকৃতি পায় না।
অন্যদিকে হিমেল ও অনীমের মাধ্যমে উঠে আসে জুলাই অভ্যুত্থান ও বর্তমান জীবন জিজ্ঞাসা(এখানে লেখকের আরো সচেতন হওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিছু জায়গায় তুলনার অতিরঞ্জিত হয়েছে)। চলচ্চিত্র নির্মাণের ভেতরের সংকট, নব্য ফ্যাসিবাদের অভিঘাত, এবং শিল্পচর্চার সংগ্রাম। ইলিয়াস-প্রেম থেকে বায়োপিক নির্মাণের চেষ্টা যেন অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক সেতুবন্ধন তৈরি করে।
ইলিয়াস, সাজ্জাদ ও হিমেল—এই তিনটি চরিত্র তিনটি ভিন্ন সময়ের প্রতিনিধি হলেও তাদের অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে রয়েছে একটাই বিষয় ‘ত্যাগ’।
একজন সৃষ্টির জন্য জীবন ব্যয় করেছেন, আরেকজন ইতিহাসের দায় মেটাতে জীবন কাটিয়েছেন, শেষজন ভালোবাসা ও শিল্পের প্রকাশে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
নান্দনিকতার দিক থেকে উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর সংযম। লেখক কোথাও অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হন না, বরং সংলাপ, নীরবতা এবং ইঙ্গিতের মাধ্যমে গভীর জীবনদর্শন তুলে ধরেন।
চমৎকার🫡
এই লেখার মাধ্যমেই হয়তো লেখক শিল্প জগতে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।
লেখকের দুটো বিগত দুটো বই সংগ্রহে থাকলেও পড়া হয়ে ওঠেনি সময়াভাবে। তবে এটা তো পড়তেই হতো, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেখানে সেন্টারে সেটা তো আর ফেলে রাখা যায় না!
বইয়ে তিনটা স্ট্রীমে যুগপৎ গল্প এগোয়; এক লেখক/ফিল্মমেকার যে কিনা ইলিয়াসের বায়োপিক বানাতে চায়, সেই বায়োপিকের স্ক্রিপ্ট যা কিনা ইলিয়াসের শেষ উপন্যাস, আর ইলিয়াসের জীবনের শেষলগ্ন।
উপন্যাসটা ভালো; লেখকের পরিশ্রম, যত্ন এবং ইলিয়াসের প্রতি প্যাশন প্রতিটা পাতায় স্পষ্ট।
ধরা যাক চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা, খোঁয়াড়ি, মিলির স্টেনগান প্রভৃতি কখনো লেখা হয়নি; আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলে কেউ ছিলেন না, বইটি লেখা হয়েছে কোন এক ইমাজিনারি লেখককে আধার করে, তবুও হিমেল, সাজ্জাদ, নাসিমা, লেখকের গল্প মিলিয়ে এটা একটা ভালো উপন্যাসই হতো। এটাই এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নামক এক মহীরুহ কে আশ্রয় করে বেড়ে উঠে, ইলিয়াসে পরিপূর্ণভাবে নিমজ্জিত থেকেই এই উপন্যাস নিজের স্বতন্ত্র আইডেন্টিটি তৈরী করে।
আশা থাকবে লেখকের ইচ্ছা পূর্ণ হবে এবং এই গল্প আমরা বড় পর্দায় দেখতে পাবো।
সুহান রিজওয়ানের এই উপন্যাসে সমান্তরালে তিনটা গল্প চলে—ইলিয়াস, সাজ্জাদ ও হিমেল!
ইলিয়াস ঐতিহাসিক, বাস্তব চরিত্র! সাজ্জাদ এই বাংলার যে কোনো মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেন। আর হিমেল আমাদের পরিচিত এই সময়ের যে কোনোচিত্রনাট্যকার হতে পারে তবে উপন্যাস অনুসারে সাজ্জাদ চরিত্রটি ইলিয়াসের খাতা থেকে আসা যাকে নিয়ে ইলিয়াস তার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসটি লিখতে চেয়েছিলেন!
ইলিয়াসকে নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে রিজওয়ান ইলিয়াসের প্রতি ঐতিহাসিকভাবে দায়বদ্ধ থেকেছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে পড়াশোনার সূত্রে তার সম্পর্কে যা জেনেছি, যা জরুরী তা এনেছেন রিজওয়ান! ইলিয়াসের জীবন, যাপন, ভাষা তার আশেপাশের চরিত্ররা সুহানের উপন্যাসে এসেছে ।তাদের মূর্ত করে তুলেছেন!
সেই সঙ্গে তিনি এনেছেন ইলিয়াসের স্মৃতি বিজড়িত স্থান, তার উপন্যাসের স্থান ও চরিত্রদের| তমিজের বাপ স্পষ্ট হয় আমাদের সামনে| আমরা দেখতে পাই কাৎলাহার বিল| আমরা দেখতে পাই সাজ্জাদের দহন! নাম উল্লেখ না করেও সাজ্জাদের গল্পে তিনি আমাদের নিয়ে যান হুমায়ূন আহমেদের কাছে| আমরা দেখি তরুণ শাহাদুজ্জামান, আনু মুহম্মদ, মিহির সেনগুপ্ত থেকে মহাশ্বেতা দেবীকে
ভালো সাহিত্যের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর প্রাসঙ্গিকতা। এই মুহূর্তে, ‘অন্য কারও খোঁয়ারি’র চেয়ে প্রাসঙ্গিক আর কিছু আমি অন্তত খুঁজে পাচ্ছি না। নিঃসন্দেহে, এটা সুহান রিজওয়ানের (এখন পর্যন্ত) সেরা সৃষ্টিকর্ম এবং গত কয়েক বছরে প্রকাশিত হওয়া আমার পড়া শ্রেষ্ঠতম উপন্যাস। এটা এমন একখানা উপন্যাস যে, জনে জনে মানুষকে গিয়ে জোর করে পড়াতে ইচ্ছা করে। বলা বাহুল্য, এমন ইচ্ছা আমার সচরাচর হয় না।