সগির আলী একজন উন্মাদ। ঢাকার রাস্তায় সে ঘুরে বেড়ায়। নিজের ইচ্ছেমত উদ্ভট সব কথাবার্তা বলে পথিকদের বিরক্তির কারণ হয়। অন্যদিকে, শিউলি বেগম এক কালে বাসা বাড়িতে কাজ করত এমন এক চরিত্র। তাদের দুই সন্তান। রাজু ও টুনি। রাজু টোকাইয়ের কাজ করে এবং টুনি পথে পথে মালা বিক্রি করে ফিরে। তারা প্রত্যেকে সারাদিন যে যার মত এদিক সেদিক ছুটে বেড়ালেও রাতের আগেই একত্রিত হয় এক ঘরে। বলা বাহুল্য, ঘরটি এক পরিত্যক্ত ভবনের অংশ।
পরিবার অনেক রকমের হয়। প্রত্যেক পরিবারের চিন্তা আলাদা, মূল্যবোধ আলাদা। এই কাহিনীতে আমরা খুবই অদ্ভুত এক পরিবারকে নিয়ে জানব। মিরপুর এগারোর সাথে তাদের সম্পর্ক নিয়ে জানব।
হাসিন ইশরাকের নতুন বই মিরপুর এগারো হইতে সাবধান পড়ার অভিজ্ঞতা আমার কাছে ভালো-খারাপ দুই-ই। বইটির বর্ণনা বেশ কাব্যিক এবং লেখক লাইন সাজাতে গোছাতে জানেন, যার ফলে পড়তে বেশ ভালো লাগে। অনেক জায়গায় ভাষার সৌন্দর্য আলাদা করে চোখে পড়ে।
তবে পড়তে গিয়ে কিছু জায়গায় আমার খটকা লেগেছে, অবশ্য সেটার পেছনে আমার মনোযোগের ঘাটতিও থাকতে পারে। প্রথমত, আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি বইটি আসলে কোন সময়কে কেন্দ্র করে লেখা। এটি কি বর্তমান সময়ের গল্প নাকি নব্বইয়ের দশক নাকি তারও আগের কোনো সময়, এই বিষয়টি আমার কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। যদিও এতে গল্পের মূল স্টোরিলাইন ভেঙে যায় না তবে কিছু অংশ অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ মনে হয়েছে, বিশেষ করে অতীতের পাপ বা পুরোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তির জায়গাগুলো।
আরেকটি বিষয় হলো, গল্পটির প্রধান চরিত্র ঠিক কে? সেটাও আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়নি। গল্পে এমন কোনো নির্দিষ্ট হিরো বা ভিলেন খুঁজে পাইনি, যাকে কেন্দ্র করে গল্পের টোন আরও শক্ত হতে পারত। বইটির শেষটা আরও স্পষ্ট হতে পারত বলে আমার মনে হয়েছে।
এই জায়গায় অনিচ্ছাকৃতভাবেই হুমায়ুন আহমেদের কথা মনে পড়ে। তিনি অনেক সময় গল্পের সমাপ্তি খোলা রেখে দিতেন কিন্তু তার লেখার জাদু এমন ছিল যে পাঠকরা নিজ নিজভাবে শেষটা কল্পনা করতেন এবং সেই কল্পনাগুলোর পেছনে শক্ত যুক্তিও থাকত। এই বইয়ের ক্ষেত্রে সমাপ্তিটা একটু বেশি পরিষ্কার হলে হয়তো পাঠকের তৃপ্তি আরও বাড়ত।
বইটিতে অল্প কিছু বানান ভুল চোখে পড়েছে তবে সেগুলো পড়ার অভিজ্ঞতাকে খুব একটা ব্যাহত করে না। প্রোডাকশন কোয়ালিটিও ভালো।
সবশেষে বলতে হয়, লেখক এমন এক শ্রেণির মানুষদের নিয়ে লিখেছেন যাদের নিয়ে বর্তমানে খুব বেশি লেখা হয় না আর সেই মানুষদের মধ্যেও যে অন্ধকার দিক থাকতে পারে, সেটি তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই দিক থেকে গল্পটিকে কিছুটা ইউনিকও বলা যায়।
আমি ঠিক জানি না এটাকে রিভিউ বলা যায় কি না। বরং বইটি নিয়ে একধরনের ব্যক্তিগত আলোচনা বা অনুভূতির প্রকাশ বলাই হয়তো বেশি ভালো হবে।
কিছুদিন আগে ‘থ্রিলার পাঠকদের আসর’ গ্রুপে ‘মিরপুর এগারো হইতে সাবধান’ বইটি নিয়ে রিভিউ প্রতিযোগিতা নজরে আসে। সেখানে একের পর এক পজিটিভ রিভিউ দেখে সিদ্ধান্ত নিই বইটি পড়ার। হাসিন ইশরাকের ১ম বই ‘নিদ্রিত নগরী’ তেমন মানসম্মত না হলেও ২য় বই নিয়ে আগ্রহ কাজ করছিল। ভেবেছিলাম, লেখক সাহেব হয়ত পরিপক্ব লেখনী এবং শক্ত গাঁথুনির একটা গল্প উপহার দেবেন। এ গল্পের প্লট ১ম বইয়ের তুলনায় ভাল হলেও দুঃখের বিষয়, এক্সিকিউশন ও সিনারিও বিল্ডআপে রয়েছে অসংখ্য দুর্বলতা। ফলে এটাকে কোনভাবেই সফল বা পরিপূর্ণ গল্প/নভেলা বলা যাচ্ছেনা।
তবে সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছি এটা দেখে যে, গুডরিডসে যেসব আইডি দেখলেই ফেক আইডি বলে সন্দেহ হয়, যাদের পঠিত বইয়ের সংখ্যা ১-২টা বা ক্ষেত্রবিশেষে ১০-২০টা, তারা এ বইকে কষে ৪ বা ৫ তারা রেটিং দিয়েছে। ব্যাপারটা হাস্যকর।
✒️কাহিনী সংক্ষেপঃ মিরপুর ১১ এর একটি পরিত্যাক্ত নির্মাণাধীন বাড়িতে বাস করে চরম দরিদ্র একটি পরিবার। পরিবারের কর্তা সগীর আলী (হাসান আলী), তার স্ত্রী শিউলী বেগম, পুত্র রাজু হাসান আর কন্যা টুনি (পদ্মরানী)। সগীর আলীর ছেলে রাজু এবং তার বন্ধু বাবু এক রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনে ভয়ংকর এক ঘটনার সাক্ষী হয়। এরপর থেকেই আস্তেআস্তে তাদের জীবনে নেমে আসে বিভীষিকা। ঘটনাচক্রে সগীর আলীর পুরো পরিবার নিষ্ঠুর এবং ক্ষমতাশালী একদল নরপিশাচের অন্ধকার খেলায় বন্দী হয়। কী ঘটতে চলেছে তাদের ভাগ্যে?
🔍ভুলের খেরোখাতাঃ এ বইয়ের সবচেয়ে বড় হতাশার দিক হল, শুরুতে লেখক যে ইম্প্রেশন ক্রিয়েট করেছেন, তার কোনটাই কাহিনীতে সেভাবে দেখাননি। সাথে যোগ হয়েছে সময় এবং সিনারিও রিলেটেড অজস্র ভুল আর তথ্যগত অসঙ্গতি। আলাপ অতিরিক্ত না বাড়িয়ে ভুলগুলো তুলে ধরছি -
(১) কাহিনীর সবচেয়ে বড় ভুল - বাংলাদেশে কোন আমলে রেডিও ব্যবহৃত হত আর কোন আমলে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং মোবাইল ফোন এসেছে, লেখক তা জানেন না। গল্পে বারবার দেখানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের মানুষ রেডিওতে খবর শোনে। চায়ের দোকান থেকে পুলিশ স্টেশন, সবখানেই রেডিওতে খবর প্রচার হয়। অথচ লেখক ফ্রিকোয়েন্টলি এটাও দেখিয়েছেন যে, ঢাকা শহরে অজস্র সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো আছে, সেগুলোতে দিব্যি অপরাধকর্ম রেকর্ড হচ্ছে। সেসব রেকর্ডিং সাংবাদিকদের কাছেও চলে যাচ্ছে। আবার কয়েকজন চরিত্রের হাতে মোবাইল ফোনও আছে। আশ্চর্য, এতবড় ভুল একজন লেখক কীভাবে করতে পারেন?
বাংলাদেশের মানুষ ৮০-৯০র দশকে রেডিওতে খবর শুনতো। তখন ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটে হারিকেন দিয়ে খুঁজলেও একটা সিসিটিভি ক্যামেরা পাওয়া যেত কী না সন্দেহ, মানুষের হাতে সেলুলার ফোন থাকা তো দূরের কথা। ২০০০ সালের পর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোয় সিসিক্যাম স্থাপন করা হয়। সেলফোন মানুষের হাতে এসেছে আনুমানিক ২০০৩ এর পরে, সহজলভ্য হয়েছে ২০০৮-১০ সালের দিক থেকে।
রাস্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয় ২০১০ সালের পর থেকে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ডিএমপি এর উদ্যোগে রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি সিসিক্যাম বসানো হয়েছে।
যে আমলে রেডিও সহজলভ্য ছিল সে আমলে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের টাওয়ারই তো ছিল না, ফোন চালানো দূরের কথা। অথচ লেখক দেখিয়েছেন সগীর আলীর মত এক চালচুলোহীন মানুষও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। আবার বাবু নামের এক টোকাই ছেলে, যে টাকার অভাবে টং দোকান থেকে ফ্রিতে কেক-বিস্কুট খায়, তার কাছেও মোবাইল ফোন আছে।
অপরাধীদের কাছে মোবাইলের অ্যাক্সেস থাকতেই পারে, কিন্তু বিপত্তি ঘটেছে সময়কাল নিয়ে। রেডিও আর মোবাইল ফোন এদেশে একই সময় ছিলনা। আগের বই নিদ্রিত নগরী-তে লেখক সাইকিয়াট্রিস্ট আর সাইকোলজিস্টের পার্থক্য না বুঝে গল্পটা নষ্ট করেছিলেন। এ বইতে অতীত আর বর্তমান একত্রে মিশিয়ে একটা বিশ্রি ভজগট করলেন। বিষয়টি আসলেই হতাশাব্যাঞ্জক।
এই একটি ভুল, পুরো গল্পের গাঁথুনি নষ্ট করে দিয়েছে। কাহিনীতে বারবার বলা হয়েছে, যে অমুক সিসিটিভিতে তমুক জিনিস দেখা গেছে, অথচ যে আমলে রেডিও শোনা হত, সে আমলে ঢাকার রাস্তায় সিসিক্যাম ছিলই না। যারা এ বইয়ের এত প্রশংসা করলেন, তাদের কারও মাথায় এ প্রশ্নটা আসেনি?
(২) কাহিনীর ২য় বৃহত্তম ভুল - একটা ক্রিমিন্যাল সিন্ডিকেট কীভাবে কাজ করে এবং পুলিশ প্রসিডিউর কী জিনিস, লেখক সে বিষয়ে সম্যক ধারনা রাখেননা। ভুলটা বুঝতে হলে কাহিনীর মূল থিমটা জানতে হবে। সেটা একটু বলি -
তো কাহিনীর মূল থিম হল, ঢাকা শহরে গড়ে উঠেছে ভয়াল এক অপরাধী চক্র। দরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষদের কিডন্যাপ করে, তারপর হত্যা করে তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার করে এই চক্রটি। সেসব অর্গান ব্ল্যাক মার্কেটে মোটা দামে বিক্রি হয়। মন্ত্রী, এমপি, ক্ষমতাসীন আমলারাও এ কাজের সাথে যুক্ত। তাই পুলিশও এদের কিছু করতে পারেনা।
এবার ভুলটা বলি - এত ক্ষমতাধর একটি অপরাধী চক্র অথচ তারা মানুষ খুন করে লাশ গুম করার বদলে গাড়িতে করে বা ব্যাগে ঝুলিয়ে লাশের অংশবিশেষ ঢাকা শহরের যেখানে সেখানে ফেলে দিয়ে যায় (যেমন, কমলাপুর রেলওয়ে, শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ইত্যাদি)। ফলে খুব সহজেই তা পাবলিকের চোখে পড়ে, সাংবাদিকেরাও ব্যস্ত হয়ে ওঠে এবং এক পর্যায়ে দেশজুড়ে একটা প্রবল আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এমনকি শেষের দিকে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলনও গড়ে ওঠে। বাস্তবের কোন অপরাধী কী এভাবে খুনের প্রমাণ পথেঘাটে ফেলে দিয়ে যায়?
আরও ভুল আছে। অপরাধী চক্রটা এতই কাঁচা যে তারা সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে দিয়ে লাশ ফেলতে যায়, সবকিছু ক্যামেরায় রেকর্ড হয়। তারপর সেগুলো নিয়ে নিউজ হলে তারাই আবার উত্তেজিত হয়ে পুলিশকে ঘনঘন ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে যে, সাংবাদিকেরা কীভাবে এতকিছু জেনে যাচ্ছে, আশ্চর্য!
লেখক বিষয়টা এভাবে দেখিয়েছেন যে, একটা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র মানুষ খুন করে নিজেরাই সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে দিয়ে জনাকীর্ণ স্থানে লাশ ফেলে দিয়ে যায়, তারপর সেই লাশ আবিষ্কৃত হলে, সেটা নিয়ে নিউজ হলে নিজেরাই উত্তেজিত হয়ে পুলিশকে অনবরত ফোনে গালিগালাজ করে, যে কেন লাশটা পাওয়া গেল। নিজেরাই পাবলিক স্পটে প্রমাণ রেখে যাচ্ছে, কিন্তু সেই প্রমাণ আবিষ্কৃত হলে নিজেরাই উত্তেজিত হয়ে পুলিশকে ম্যানেজ করার জন্য চাপ দিচ্ছে, পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করছে! প্রশ্ন জাগে, এত বড় অপরাধী চক্রের লোকেরা এরকম গাছবলদ হলো কী করে?
ঢাকা শহরে একের পর এক লাশ মিলছে, জনগণ ভীত এবং ক্ষুব্ধ হচ্ছে অথচ পুরো বইজুড়ে পুলিশের কোন কার্যক্রম নেই, মানে একেবারেই নেই। পুলিশ প্রসিডিওর নামক জিনিসটা এ বইতে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। পুলিশের এক্টিভিটি লেখক এভাবে দেখিয়েছেন যে, খানিকক্ষণ পরপর ঢাকার বিভিন্ন থানায় অজ্ঞাতনামা কারও কল আসে, সেই ব্যক্তি বাংলা-ইংরেজির খিচুড়ি ভাষায় পুলিশকে একগাদা গালি দেয় আর পুলিশ তাকে, “জি স্যার”, “দেখছি স্যার”, “স্পেশাল ব্যবস্থা নিমু”, এসব বলে আশ্বাস দেয়। কিন্তু পুলিশ ক্রাইম সিনে কখন যায়, গিয়ে কী করে - এসব একবারের জন্যও দেখানো হয়নি। কাঁচা লেখনীরও তো একটা লেভেলে থাকে ভাই!
(৩) ঢাকা থেকে লালমনিরহাট যেতে কতক্ষণ লাগে আর কোন ট্রেন কয়টার সময় লালমনিরহাট যায়, লেখক সেটি জানেননা। কমলাপুর থেকে মাত্র দু'টি ট্রেন লালমনিরহাট যায় - লালমনি এক্সপ্রেস আর বুড়িমারী এক্সপ্রেস। লালমনি ঢাকা ছাড়ে রাত ৯:৪৫ এ আর বুড়িমারী ছাড়ে সকাল ৮:৩০ এ। অনেক বছর ধরেই এরকমটা হয়ে আসছে। গুগল থেকেই এটা জেনে নেওয়া সম্ভব। অথচ লেখক এই জায়গায় তথ্য এবং সময়ের বড়সড় অসঙ্গতি করেছেন।
কাহিনীর শুরুতে দেখানো হয় রাজুর বন্ধু বাবু রাত ১২টার পর কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে টাকমাথার এক লোককে ফলো করছে। লোকটির ফেলে যাওয়া ব্যাগে হাত দিয়ে তারা বুঝতে পারে যে, ভেতরে একটি লাশের অংশবিশেষ রাখা। সাথেসাথেই ওই লোকটি এবং তার সাগরেদরা ওদের পেছনে লাগে। উপায় না দেখে রাজু আর বাবু, হাতভর্তি রক্ত এবং মানুষের চুলে মাখামাখি অবস্থায়ই ট্রেনে উঠে লালমনিরহাট চলে যায়। লালমনিরহাটের ট্রেন ছাড়ে রাত ৯:৪৫ এ, তাহলে সেই ট্রেনে রাজু আর বাবু রাত ১২টার পরে কীভাবে উঠলো?
ধরলাম ট্রেন সঠিক সময়ে ছাড়েনি। তা সত্ত্বেও, রক্তাক্ত হাত নিয়ে দু'টি টোকাই ছেলে ট্রেনে উঠল অথচ কেউ সন্দেহ করলোনা, তাদের টিকিট আছে কী না চেক করলোনা, তারা দিব্যি লালমনিরহাট চলে গেল। কী নড়বড়ে কাহিনী!
১৯ নং পৃষ্ঠায় লেখক এক সাংবাদিকের জবানিতে বলেছেন, যে গতরাতে কমলাপুর রেলের স্লিপারের উপর পড়ে থাকা একটি ব্যাগ থেকে মৃতদেহ পাওয়া গেছে। তার মানে সেই রাতেই রাজু আর বাবু ট্রেনে করে লালমনিরহাট গিয়েছে। অথচ, ২০ নং পৃষ্ঠায়ই লেখক রাজুর জবানিতে বলেছেন, “আমি আর বাবু চাচার সামনে বসা, কিছুক্ষণ আগেই ঢাকা ফিরেছি।” ঢাকা থেকে রেলযোগে লালমনিরহাটের দুরত্ব প্রায় ৪০৫ কিমি। এত বিশাল দুরত্ব অতিক্রম করতে লাগে প্রায় ৯-১০ ঘন্টা। তাহলে প্রশ্ন হল, রাজু আর বাবু গতরাতে লালমনিরহাট এসে পরেরদিন বেলা গড়ানোর আগেই ঢাকা ফিরল কীভাবে? লেখক এটাও পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন যে, লালমনিরহাটে দুই বন্ধু বেশ কয়েকঘন্টা ছিল, তারা সেখানকার একটা মন্দিরে প্রসাদও খেয়েছে। তাহলে এত অল্প সময়ে ঢাকায় ফেরা কী করে সম্ভব? লেখক কী এটা ইমপ্লাই করতে চাচ্ছেন যে রাজু আর বাবু প্লেনে করে ঢাকা ফিরেছে? কোন লেভেলের বুজরুকি ভাই!
(৪) যেকোন কাহিনীর একটা অলিখিত নিয়ম হল, “Show, don't tell.” অর্থাৎ গল্পে কী হচ্ছে, এটা এর তার জবানিতে না বলে সরাসরি ঘটনা দেখিয়ে দিতে হয়। কিন্তু এ বইয়ের লেখক বিষয়টি ভালভাবে জানেন বা বোঝেন বলে মনে হয়নি। আর তাই গল্পের ফ্লোতে রয়েছে অদ্ভুত অনিয়ম -
কাহিনীতে একাধিকবার বলা হয়েছে যে, দেশে খুনের বিচারের দাবিতে নাকি আন্দোলন হচ্ছে, কিন্তু ওই বলা পর্যন্তই। কোথায় আন্দোলন হচ্ছে, কারা করছে, অবস্থা সামাল দিতে প্রশাসন কী করছে, সরকারের দায়িত্বশীল কুশলীরা মিডিয়ায় কী বিবৃতি দিচ্ছে, নাকি দিচ্ছেনা - এসবের কোন অস্তিত্বই নেই গল্পে। যেন সগীর আলী, শিউলী বেগম, রাজু, বাবু, টুনি আর করিম চাচা ব্যতীত আর কোনকিছুই এ গল্পে এক্সিস্ট করেনা।
প্রধান চরিত্র সগীর আলী হলেও কাহিনী তার হাত ধরে এগোয়নি। প্রকৃতপক্ষে, গল্প যে কোনদিকে আগাচ্ছে, কীভাবে আগাচ্ছে তা বোঝা মুশকিল ছিল। খানিকক্ষণ পরপর রাজু বা সগীর আলীর ন্যারেশনে বেশ কিছু গুরুগম্ভীর দার্শনিক ডায়লগ, মাঝখানে টুনির অপ্রয়োজনীয় ব্যাকস্টোরি, থানায় অজ্ঞাতনামা লোকের ফোনকল আর পুলিশকে গালাগালি, রাস্তায় সগীর আলীর পাগলামি আর বাড়িতে অসুস্থ শিউলী বেগমের আহাজারি - গল্পে এ কয়েকটি ঘটনাই ঘুরেফিরে বারবার ঘটেছে। শেষভাগে সগীর আলীর কাছে একটা খুনের ডিল আসে, এখানে লেখক একটা টুইস্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোন পরিণতি না দেখিয়েই হুট করে গল্পের সমাপ্তি টেনেছেন । What is this!
(৫) সিনারিও এবং চরিত্র চিত্রণ বেশ দুর্বল -
১৯ পৃষ্ঠায় দেখানো হয়, করিম চাচা তার চায়ের টং দোকানে রেডিও শুনছেন। সেই রেডিওতে বলা হয় কমলাপুর স্টেশনে ব্যাগের ভেতর থেকে লাশ আবিষ্কারের কথা। অথচ খানিকপরে সেই একই ঘটনা যখন রাজু আর বাবু করিম চাচাকে বলে, তখন তিনি বিশ্বাসই করতে পারেন না।
কাহিনীর এক পর্যায়ে দেখানো হয়, যে মাংসের দোকানের সামনে ভিক্ষা চাওয়ায় একদল উত্তেজিত লোক সগীর আলীকে বেদম পিটাচ্ছে। সামান্য ভিক্ষা চাওয়া বা পাগলামি করার অপরাধে রাস্তার মানুষ নিজের কাজ রেখে একজন পাগলকে পেটাবে, এরকম উদ্ভট সিনারিও একদমই বাস্তবধর্মী না। লেখক কাহিনীকে অতিরিক্ত বাস্তবধর্মী দেখাতে গিয়ে প্রায় সব চরিত্রকেই অত্যন্ত খারাপ মানুষ হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু চরিত্রদের কাজকারবার হয়েছে খুবই অবাস্তব।
(৬) বেশিরভাগ চরিত্রের ডায়লগ ডেলিভারি বেশ মাত্রাছাড়া গুরুগম্ভীর। অশিক্ষিত, নিম্নবিত্ত মানুষের একটা জীবনদর্শন আছে, এটা মানছি। কিন্তু আট-দশ বছরের বাচ্চা ছেলে রাজু একের পর এক দার্শনিক ডায়লগ বলে যাচ্ছে, এটা খুবই খাপছাড়া, কেউ মানুক বা না মানুক। অন্যদিকে, সগীর আলীর মত নৃশংস খুনি পাঠকদের জীবনবোধের শিক্ষা দিচ্ছে, এটাও বেমানান এবং বিদঘুটে। লেখক কী খুনির সাইকোলজির তালাশ করেছেন নাকি এরকম ঘৃণ্য লোকের অপকর্মকে গ্লোরিফাই করেছেন, আমার বোধগম্য হয়নি।
(৭) তারচেয়েও বিরক্তিকর যে ব্যাপারটা, গল্পের বেশিরভাগ চরিত্রই শুদ্ধ চলিত ভাষার মাঝখানে হঠাৎ আঞ্চলিক ভাষা বলে এবং মাঝেমাঝে অশ্রাব্য গালি দেয়। লেখক কাহিনীর শুরুতে একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, গল্প ন্যারেশনের স্বার্থে তিনি এভাবে লিখেছেন, কিন্তু সত্যি কথা হল এতে গল্পের বাচনভঙ্গি খুব কাঁচা হয়ে গিয়েছে।
বইটা পড়ে এরকম মনে হল যে, লেখক আলাদা আলাদাভাবে কয়েকটি সিনারিও ডেভেলপ করে সবগুলোকে একত্রে জুড়ে একটা প্লট সাজিয়েছেন। কিন্তু সিনারিওগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত কো-রিলেশন রাখেননি। গল্পটাকে সফলতা দিতে হলে তার উচিত ছিল সময় নিয়ে এবং বইয়ের কলেবর বাড়িয়ে সবগুলো প্লট এলিমেন্ট আস্তেধীরে ডেভেলপ করা।
রাজধানী ঢাকার মিরপুর এগারো। এখানকারই এক পরিত্যক্ত বাড়িতে বাস করে একটা পরিবার। খুবই নিম্নবিত্ত পরিবার৷ এই পরিবারের প্রধান সগির আলী একজন উন্মাদ। সারাদিন ঢাকার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পাগলামি করে বেড়ানোই তার নেশা। সগিরের স্ত্রী শিউলি একসময় মানুষের বাসা-বাড়িতে বুয়ার কাজ করলেও এখন ভয়াবহ অসুস্থ হয়ে রীতিমতো বিছানাগতো। সগির-শিউলির দুই ছেলে-মেয়ে। ছেলে রাজু একজন টোকাই। সে সারাদিন ঢাকার পথেঘাটে মানুষের ফেলে দেয়া জিনিসপত্র টুকিয়ে বিক্রি করে। আর মেয়ে টুনি ফুলের মালা বিক্রি করে রাস্তায় রাস্তায়।
রাজুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নাম বাবু। সে-ও রাজুর মতোই একজন টোকাই। অবশ্য তার আরো কিছু গুণ আছে। যেমন, সে হাতসাফাই বা পিকপকেটিংয়ে বেশ পারদর্শী। রাজু আর বাবু আসলে হরিহর আত্মা বন্ধু বলতে যা বোঝাই, তাই। এক রাতে কমলাপুর স্টেশনে এই দুই টোকাই কিশোরের সাথে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে যায়। ঘটনাটাকে শুধু অদ্ভুত বললে ভুল হবে। বরং বলা ভালো, ভয়ঙ্কর একটা ঘটনা ঘটে যায় তাদের সাথে সেই রাতে। এই একটা ঘটনা যেন রাজু আর বাবুর পুরো পৃথিবীটাই বদলে দেয়।
গতো কয়েকমাস ধরে রাজধানী ঢাকা জুড়ে ঘটে চলেছে একের পর এক খু'নের ঘটনা। বিভিন্ন জায়গায় মিলছে মানুষের ছি'ন্ন'বি'চ্ছি'ন্ন দে'হা'ব'শে'ষ। স্বাভাবিকভাবেই উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাকা সহ পুরো দেশ৷ কে এই নৃ'শং'স খু'নি? সে কি কোন সি'রি'য়া'ল কি'লা'র? কেন সে এমন একের পর লা'শ ফেলে যাচ্ছে তিলোত্তমা এই শহরের বুকে? একের পর এক খুনের ঘটনায় চাপ বাড়ছে পুলিশের ওপরেও। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা দেশকে অ'চ'ল করে দেয়ারও হু'ম'কি দিয়েছে। যেকোন মূল্যে এখন এই উন্মাদ খু'নীকে গ্রেপ্তার করতে হবে পুলিশের।
মিরপুর এগারোর পরিত্যক্ত ওই বিল্ডিংটার মাঝে আসলে কি ঘটছে? সগির আলী কেন ইদানীং তার পরিবারের চোখেও অচেনা একজন মানুষ হয়ে উঠছে? শিউলির যে ভয়ঙ্কর রোগটা হয়েছে, সেটা থেকে কি সে সুস্থ হয়ে বেঁচে ফিরবে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ঢাকার বুকে শুরু হওয়া এই লা'শের মিছিল কি থামাতে পারবে পুলিশ? প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে, হয়তো পাওয়া যাবে না।
নবীন লেখক হাসিন ইশরাকের 'মিরপুর এগারো হইতে সাবধান' বইটার প্রতি আমি আগ্রহী হই এর নাম দেখে। তারপর যখন জানলাম এই উপন্যাসটা একটা নিম্নবিত্ত ছিন্নমূল পরিবারের ওপর লেখা, তখন আগ্রহটা আরো বেড়ে যায়। আর এরই ফলশ্রুতিতে বইটা পড়ার সিদ্ধান্ত নিই আমি। হাসিন ইশরাকের উদ্দেশ্য ছিলো ঢাকার বুকে পরিত্যক্ত একটা ভবনে বসবাসরত চার সদস্যের একটা অতি দরিদ্র পরিবার কিভাবে বিভিন্ন অপরাধের সাথে নিজেদের জড়িয়ে ফেলে সেটা একটা থ্রিলার কাহিনির আঙ্গিকে দেখানোর। প্লটটাও আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে। কিন্তু ওভারঅল বইটা পড়ে আমি বেশ হতাশ হয়েছি।
'মিরপুর এগারো হইতে সাবধান'-এর ফার্স্ট হাফ মোটামুটি ভালোই লেগেছে আমার। কাহিনি গতিশীল মনে হয়েছে। শহরের নিম্নবিত্ত মানুষদের নিয়ে লেখক যে কল্পচিত্র আঁকার চেষ্টা করেছেন তার অনেকটাই সফল মনে হয়েছে এই ফার্স্ট হাফে। বিশেষ করে রাজু আর বাবুর বন্ধুত্ব, একজন মহৎ হৃদয় চা-ওয়ালার সাথে তাদের সম্পর্ক আর শিউলির ভয়ঙ্কর রোগভোগের দৃশ্যকল্পগুলো বেশ মানবিক ও আন্তরিক লেগেছে আমার কাছে। এসবের পাশাপাশি উপন্যাসের মূল কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া রহস্যটাও বেশ ভালোভাবেই নিজের উপস্থিতির জানান দিচ্ছিলো। ঠিক এরপর থেকেই শুরু হলো ডাউনফল। উপন্যাসটা শেষ হতে হতে একের পর এক প্রশ্নের না পাওয়া উত্তরের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। ফলশ্রুতিতে ছোটখাটো প্রচুর লুপহোল দিয়ে ভরে যেতে লাগলো কাহিনি।
এই উপন্যাসে লেখক হাসিন ইশরাক সবচেয়ে হাস্যকর ভাবে দেখিয়েছেন পুলিশকে। এখানে এমন একজন পুলিশও পাইনি, যিনি নিজের দায়িত্বের প্রতি সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ। মাঝেমাঝেই এই পুলিশদের কাছে অচেনা কারো কল আসছে। সেই ব্যক্তি আবার ধুমসে পুলিশের ওপর হম্বিতম্বি করছে। আর পুলিশ শুধু বলছে জ্বি স্যার জ্বি স্যার। এই অতি ক্ষমতাবান ব্যক্তির কোন পরিচয় 'মিরপুর এগারো হইতে সাবধান'-এর শেষ পর্যন্ত পাইনি। এটাও একটা বিরক্তির কারণ। অ'র্গা'ন ট্রা'ফি'কিং নিয়ে লেখকের তৈরি করা সিকোয়েন্সগুলোতেও ছিলো প্রচুর দুর্বলতা। আর এই ব্যাপারগুলোই একের পর এক সৃষ্টি হওয়া লুপহোলের কারণ।
হাসিন ইশরাক তাঁর 'মিরপুর এগারো হইতে সাবধান'-এ প্রচুর পরিমাণে গেসি, খাইসি, দেখসি টাইপ শব্দ ব্যবহার করেছেন। এগুলোও আমার বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে। নিন্মবিত্ত মানুষের ভাষা আমি বুঝি। কিন্তু এই শব্দগুলোকে কিছু আল্ট্রা স্মার্ট জেন-জি দ্বারা ব্যবহৃত ফেসবুকীয় শর্টকাট ভাষা ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। লেখক তাঁর এই উপন্যাসের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছেন এটার এন্ডিংটা ওপেন এন্ডিং হিসেবে দেখাতে গিয়ে। লেখক হাসিন ইশরাককে বলছি, একটা ক্রাইম থ্রিলার লিখতে গিয়ে আপনি এন্ডিংটা পাঠকের ওপর ছেড়ে দিতে পারেন না। আপনার শুরু থেকে বিল্ড করা এই থ্রিলার উপন্যাসের একটা সমাপ্তি অন্তত আপনাকে টানতে হতো। সেই সমাপ্তিটা হয়তো পাঠকের পছন্দ হতো, হয়তো পছন্দ হতো না। কিন্তু আপনি যেটা করলেন, বইটার পরবর্তী সিক্যুয়েলের লোভ দেখানোর চেষ্টা করলেন পাঠককে। তাও আবার একটা ওপেন এন্ডিং দিয়ে। সবকিছুর ওপেন এন্ডিং হয় না। আর যেখানে বেশিরভাগ প্রশ্নের কোন উত্তর নেই, সেখানে তো আরো হয় না। এই ব্যাপারটা 'মিরপুর এগারো হইতে সাবধান' বইটার জন্য রীতিমতো হাস্যকর ও আ'ত্ম'ঘা'তী বলে মনে হয়েছে আমার কাছে।
লেখক হাসিন ইশরাকের গল্প বলার ধরণ ভালো। তাঁর লেখা পড়তে হোঁচট খেতে হয় না। কিন্তু তাঁর উন্নতির প্রচুর জায়গা আছে। 'মিরপুর এগারো হইতে সাবধান'-এর সম্ভাবনাময় একটা প্লট ছিলো। সেটা একটু যত্ন নিয়ে এক্সিকিউট করলে দারুণ কিছু দাঁড়াতো আমার মতে। এই বইয়ের শেষে তিনি একটা সিরিজ টাইপ কিছু আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আমার পরামর্শ থাকবে সেখানে এই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করার। বিশেষ করে লুপহোল কমানোর দিকে আর প্রোপার এন্ডিংয়ের দিকে হাসিন ইশরাককে আরো মনোযোগ দিতে হবে।
২০২৬-এর আরেকটা হতাশাজনক বই পড়লাম। 'মিরপুর এগারো হইতে সাবধান'-এর প্রচ্ছদটা মোটামুটি ভালো লেগেছে। বইটার প্রোডাকশনও ছিলো ভালোই। একটা ওয়ান টাইম রিড হিসেবে এটাকে রিকমেন্ড করতে চেয়েও পারলাম না উপরে উল্লেখ করা ত্রুটিগুলোর কারণে। তাই নট রিকমেন্ডেড। তবে হাতে অফুরন্ত সময় থাকলে পড়ে দেখতে পারেন।
⬛ বইটি নিয়ে ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি/ফ্লপের কাহিনী নিয়ে বিশ্লেষণ: আমাদের জীবনটা কতই না ক্ষুদ্র?কতই না নগণ্য?জীবনের মায়াজালে কিছু ঘটনা আমাদের চেনা-পরিচিত আবার কিছু কিছু ঘটনা আমদের পরিবেশ-পরিস্থিতিকে দেখে মানিয়ে নিয়ে চলতে শেখায়। ভালো-মন্দের সংমিশ্রণ মিলেই আমাদের জগতের এই প্রেক্ষাপট রচিত,মানুষ শুধু তার উপলক্ষ্য মাত্র। "মিরপুর এগারো হইতে সাবধান" বইটিতে তেমনই কতক সাধারণ চরিত্রের মাধ্যমে অসাধারণ বর্ণনা ফুটে উঠেছে।যেখানে স্থান দেওয়া হয়েছে কতক নিম্ন-জীবনযাপন করা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনদের। মিরপুর ১১ নং বাড়িকে কেন্দ্র করে চলতে থাকে একের পর এক গা শিউরে উঠার মতো কাহিনী। যেখানে সগীর আলীর মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো পাগল,ঢাকা শহরের মতো শহরে পথে-ঘাটে হেঁটে ফুল বিক্রি করা টুনি,অন্যের বাড়িতে গৃহ-কর্ম করে বেড়া শিউলি বেগম এবং সদ্য শৈশবে পা দেওয়া রাজু,বাবুসহ দেশের বড় বড় প্রভাবশালী মাথাদের জড়িত হওয়ার গন্ধ ভেসে আসে প্লটে। গল্পে করিম চাচাদের মতো কাহিনী আমাদের বাস্তব জগতের কিছু অস্বাভাবিক ঘটনাকেও ইঙ্গিত করে যার নির্যাস গল্পের প্রধান বিষয়বস্তুকে স্পর্শ করে। কি ছিলো করিম চাচাদের মতো মানুষদের ভাগ্যে?কেনো নেপথ্যে সেই পুরোনো মিরপুর ১১ নাম্বার বাড়ি? আর কেনই বা দেশের বড় বড় মাথারা এসবের মতো তুচ্ছ্য শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে জড়িত?এসব কিছুই বইটিতে রাজকীয়ভাবে থ্রিলার আকারে লেখক প্রকাশ করেছেন বইটিতে। যার নাম মাত্র সমাপ্তি আপনাকে চমকে দিতে বাধ্য করবে গল্পের শেষাংশে। 🛑আমার পছন্দের জায়গাগুলো: সাধারণত সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারগুলোতে আমরা দেখতে পারি গল্পের শুরুর দিকে প্লটের গতিপথ কিছুটা পন্থর হয়ে থাকে কিন্তু "মিরপুর এগারো হইতে সাবধান" বইটিতে আমি ভিন্ন স্বাদ পেয়েছি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টপ টু বোটাম সবকিছুর মধ্যে রহস্যের গন্ধ পেয়েছি। লেখকের লেখনীর ভাষা যতেষ্ট স্বচ্ছ। পড়তে কোনো বেগ পেতে হয় নি। ঝড়ঝড়ে লেখনী। ১৪৪ পৃষ্ঠার বইটি এক বসায় শেষ করার মতো ন। অনেকে একটা বিষয়ে আমার সাথে একমত নাও হতে পারেন।সাধারণত গল্পের লেখনীগুলোতে যেকোনো একটা চরিত্রকে বিশেষ মূল্যায়ণ করে প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয় কিন্তু এই গল্পে সকল চরিত্রকে অত্যন্ত সাবলিলভাবে সম-মূল্যায়ণ করা হয়েছে। যেখানে দেখে বুঝার উপায় নেই কোনটি প্রধান চরিত্র আর কোনটি নয়। যা আমার বইটির প্রতি ভালো লাগার অন্যতম প্রধান কারণ। 🔵কিছু সংশোধনের ক্ষেত্র: বইটিতে অল্প কয়েক জায়গায় সামান্য বানানের ভুল পেয়েছি এছাড়া মেজর কোনো সমস্যা চোখে পড়ে নাই। আর ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে বইয়ে কিছু ইলাস্ট্রেশন দেওয়া যেতে পারতো তাতে লেখনীকে আরও সুন্দরভাবে উপলব্ধি করা যেতে পারতো এবং বইটিকে আরও আকর্ষণীয় মনে হতো। 🔴প্রকাশনীকে নিয়ে কিছু কথা: প্রিমিয়াম পাবলিকেশন্সের বই বেশ কিছু সংগ্রহে রয়েছে এবং তাদের ছোট বইগুলোর কাজ বেশ ভালো। তার উদাহরণ এই বইটিতেও পেয়েছি যা কোনো ব্যতিক্রম ঘটনা নয়। বাঁধাই+মলাট+পেজের কোয়ালিটি সব মানান সই। এ ব্যাপারে পাঠক হিসেবে আমি সন্তুুষ্ট। 🟣লেখকের উদ্দেশ্য কিছু কথা: শুরুতেই আমার শ্রদ্ধেও বড় ভাই Hasin Ishraq ভাইকে মনের অন্তস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাই এতো ইউনিক একটা টপিককে নিয়ে পাঠক মহলে থ্রিলারের স্বাদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য। নিম্নমহলকে নিয়ে এই ধরণের টপিক আমার দেখা এটাই প্রথম। বইখানায় যে টান টান উত্তেজনা ১ম থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত রেখেছেন আর যে টুইস্ট দিয়ে প্লটের নামমাত্র ইতি টেনেছেন পাঠক হিসেবে তা আমি কল্পনা করতে পারি নাই এবং এর রেশ বহুদিন মাথায় থেকে যাবে। আপনার নিকট একটাই চাওয়া এর ২য় পাঠ খুব দ্রুত বাজারে নিয়ে আসুন। 🔘ফ্ল্যাপের কাহিনী: সগির আলী একজন উন্মাদ। ঢাকার রাস্তায় সে ঘুরে বেড়ায়। নিজের ইচ্ছেমত উদ্ভট সব কথাবার্তা বলে পথিকদের বিরক্তির কারণ হয়। অন্যদিকে, শিউলি বেগম এক কালে বাসা বাড়িতে কাজ করত এমন এক চরিত্র। তাদের দুই সন্তান। রাজু ও টুনি। রাজু টোকাইয়ের কাজ করে এবং টুনি পথে পথে মালা বিক্রি করে ফিরে। তারা প্রত্যেকে সারাদিন যে যার মত এদিক সেদিক ছুটে বেড়ালেও রাতের আগেই একত্রিত হয় এক ঘরে। বলা বাহুল্য, ঘরটি এক পরিত্যক্ত ভবনের অংশ। পরিবার অনেক রকমের হয়। প্রত্যেক পরিবারের চিন্তা আলাদা, মূল্যবোধ আলাদা। এই কাহিনীতে আমরা খুবই অদ্ভুত এক পরিবারকে নিয়ে জানব। মিরপুর এগারোর সাথে তাদের সম্পর্ক নিয়ে জানব। বইয়ের নাম: মিরপুর এগারো হইতে সাবধান লেখক: হাসিন ইশরাক জনরা: সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার প্রকাশনী: প্রিমিয়াম পাবলিকেশন্স পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৪৪ মুদ্রিতমূল্য: ১৭৫৳
ঢাকায় বসবাস করা একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের জীবনের গল্প নিয়ে লেখা "মিরপুর এগারো হইতে সাবধান"। যেখানে আছে সগির আলি নামের একজন উন্মাদ, যে কিনা আসলে উন্মাদ নয়।বরং তার এই মুখোশের পেছনে লুকিয়ে আছে গুরুতর কিছু অপরাধ।তার স্ত্রী শিউলি বেগম মৃত্যুপথযাত্রী।তবু তাকে ঘিরে সগির আলির সবকিছু। সে তাকে বাঁচাতে সবকিছু করতে রাজি থাকে।আর আছে তাদের দুই সন্তান রাজু এবং টুনি। রাজু টোকাই, সারাদিন পরিশ্রম করে যা অর্থ পায় সবটাই ব্যায় করে মায়ের চিকিৎসায়।টুনি সারাদিন ঢাকার রাস্তায় ফুল বিক্রি করে। বাস্তুহারা হয়ে তারা আশ্রয় নেয় মিরপুর এগারোর একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে।বাইরে থেকে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি হলেও এর ভেতরে চলতে থাকে লোমহর্ষক কিছু ঘটনা।এই ছোট্ট পরিবারটি ক্রমে নিজেদের এক বিশাল অপরাধের সাথে জড়িয়ে ফেলে।কেউ অপরাধ করে আবার কারো সাথে অপরাধ করা হয়। গল্পের অন্যান্য চরিত্রদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র বাবু।সে রাজুর বন্ধু।ঢাকার শহরে অলিতে গলিতে দুজনে ঘুরে বেড়ায়, টোকাইয়ের কাজ করে। আবার মাঝে মধ্যে চুরি, ছিনতাই ও করে। তাদের বন্ধুত্ব বেশ গভীর। বন্ধুর থেকে বেশি তারা যেনো দুই ভাই।সেই বন্ধুত্বের রুপরেখাও সময় এবং পরিস্থিতির কারনে মোড় নেয় এক নতুন দিকে।
রাজু এবং বাবু একদিন রেলস্টেশনে এক ব্যক্তিকে ছিনতাই করতে গিয়ে চুরি করা ব্যাগ থেকে খুজে পায় কিছু অপ্রত্যাশিত জিনিস।বিপদ বুঝে সেখান থেকে পালিয়ে গেলেও এই বিপদ তাদের পিছু ছাড়ে না।এই বিপদ তাদের কোথা থেকে কোন পরিস্থিতিতে নিয়ে যায় সেসব ঘটনা নিয়েই এগোতে থাকে গল্প। সগির আলির অপরাধও তাকে নিয়ে যায় এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে।যা সবকিছুই একই সূত্রে গাথা। অন্যদিকে শিউলি বেগম আর তার মেয়ে টুনির চরিত্র বেশ রহস্যময়।দুজনেই ধারন করছে এক অপ্রিয় সত্য যা হয়তো ভেংঙে দিতে পারে পুরো পরিবারকে।।।।
সব মিলিয়ে লেখকের লেখনশৈলী বেশ চমৎকার। লেখার ফ্লো ভালো, পড়ার মাঝে আটকে থাকা যায়।সামান্য কিছু বানান ভুল, এবং এক জায়গায় সময়ের বর্ননা করতে গিয়ে কিছুটা ভুল হয়েছে।সেসব খুব বেশি চোখে পরার মতো না। ছোট একটা বই হলেও অপ্রয়োজনীয় কিছু ছিলো না।যতটুকু ছিলো তা একেবারেই যথেষ্ট। ছোট বই, তার ওপর আবার থ্রিলার, এবং তা আবার সাইকোলজিকাল থ্রিলার। এই জনরার বই পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে ধারনা করেছিলাম গল্পটা কিছুটা ধধীরগতির হবে।তবে তা একদমই হয়নি।প্রথম দিক থেকেই বেশ ধরে রাখছিল।প্রতিটা অধ্যায় পড়ার পর পরের অধ্যায় পড়ার জন্য ইচ্ছা হবে।
“আছে ভাবের তালা যেই ঘরে, সেই ঘরে সাঁই বাস করে।। ভাব দিয়ে খোল ভাবের তালা দেখবি সে মানুষের খেলা ঘুচে যাবে শমন-জ্বালা থাকলে সে রূপ নিহারে।।” মানুষের ভেতরের আসল রূপ ও জীবনের রহস্য যখন উপলব্ধি করা সম্ভব হয়, তখন দুঃখ-কষ্ট ও মৃ'ত্যুভয় দূর হয়ে যায় আর মানবমন তখন শান্তি লাভ করে।
বইয়ের শুরু থেকেই কাহিনি তার ধারাবাহিক গতিতে এগিয়েছে বিধায় বইটি পড়ে ভালোই লেগেছে। কখনো জীবনের স্বাভাবিক গতি, কখনো বা একে অপরকে বাঁচাতে চালিয়ে যাওয়া যুদ্ধ, সুখী জীবনে হুট করে নেমে আসা অন্ধকারাচ্ছন্ন পতন আর এতোকিছুর মাঝেও কিছু চরিত্রের একে-অন্যের প্রতি ভালোবাসাকে ফুটিয়ে তোলার ধরণটা বেশ ভালো লেগেছে। তবে বইটির মধ্যে কিঞ্চিৎ বানান ভুলের বিষয়টা যতোটা না বির'ক্ত করেছে, তার চাইতে বেশি বি'রক্ত করেছে ইন্সপেক্টর ও সাংবাদিকের চরিত্রগুলোকে এলোমেলো করে ফেলা। আমি পড়তে গিয়ে বেশ কয়েকবার দ্বিধার সম্মুখীন হয়েছি।
লেখক বইটিতে আসলে যা তুলে ধরতে চেয়েছেন তা তিনি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামকে তিনি একেকটি যুদ্ধের মতো করে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, পাশাপাশি উচ্চবিত্তের কিছু হীন'মন্য মানুষের ক্ষমতার অপব্যবহারও বইটিতে তিনি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। পুলিশ বিভাগের দিকটিও তিনি যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা বাস্তব জীবনে অহরহ চোখে পড়ে। কিন্তু একের পর এক খু'ন হওয়ার পর তাদের দে'হের খন্ডিত অংশ পেয়েও পুলিশ বিভাগকে একটুও সতর্কতা না করার দিকটি কেমন যেনো বেশিই খাপছাড়া হয়ে গিয়েছে।
লেখনী কিছুটা দুর্বল লাগলেও, বইটির প্লট সাজানোর ধরণটি সুন্দর ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে এই ঘটনাটার লেখনী আরেকটু সুন্দর করে শেষ করে দিলেই বইটা নিয়ে আমার কোনো অভি'যোগ থাকতো না। বইটির শুরু থেকে আমি যে মনোভাব নিয়ে আগাচ্ছিলাম, শেষের দিকে এসে যেনো নিমেষেই তা আমাকে হতাশ করে দিয়েছে। এই বইটার এখানেই সুন্দর একটা সমাপ্তি দিয়ে দিলে পাঠক সমাজে আরো ভালো পাঠ প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেত। সবটা মিলিয়ে বলতে গেলে বইটির প্রচ্ছদ, নামকরণ, প্রোডাকশন দারুণ লেগেছে। প্রুফরিডিংয়ের ক্ষেত্রে আরও যত্নবান হওয়া দরকার।
আমার পড়া প্রথম থ্রিলার বই "মিরপুর এগারো হইতে সাবধান"। বইটিতে রহস্যের ভাঁজে নিম্নবিত্তের জীবনের বাঁচার দায়ে জড়িয়ে যাওয়া নানা সংগ্রামের চিত্র বেশ গঠনমূলক রচনাশৈলীর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের প্রধান চরিত্র সমূহের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনের গল্প ও সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। ইন্ডিং ও ছিল বেশ আনস্পেক্টেড। একবারেই পড়ে শেষ করার মতো নাতি দীর্ঘ বইটি বেশ কিছু অংশে তুলে ধরেছে চরম কিছু সত্য। সবমিলিয়ে আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। যদিও থ্রিলার বই সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান নেই, তবে ওভারঅল বই হিসেবে বেশ ভালো ছিল।
শহরের পিচঢালা পথে আমরা প্রতিদিন যাদের পাশ কাটিয়ে চলি, যাদের অস্তিত্ব আমাদের কাছে কেবলই একজোড়া মলিন মুখ—সেই অবহেলিত নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনের এক অন্ধকার ও রহস্যময় জগৎ নিয়ে লেখা উপন্যাস "মিরপুর এগারো হইতে সাবধান"। ঢাকার চিরচেনা মিরপুর এলাকাকে কেন্দ্র করে এক রোমহর্ষক কাহিনী বুনেছেন লেখক।
. . .
#সারসংক্ষেপ গল্পের শুরু হয় দুই বন্ধু রাজু আর বাবুকে নিয়ে, যারা ঢাকায় টোকাইয়ের কাজ করে জীবন চালায়। তাদের সাদামাটা জীবনে এক ভয়ানক ঝড় বয়ে আনে কমলাপুর স্টেশনের এক ঘটনা। চুরির উদ্দেশ্যে এক লোকের ব্যাগ পিছু নিতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করে ব্যাগের ভেতর কোনো সম্পদ নয় বরং আছে মানুষের খণ্ডিত দেহাংশ—আঙুল আর কান! খুনিদের হাত থেকে বাঁচতে তারা এক চলন্ত ট্রেনে চড়ে পালিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় লালমনিরহাটে। কিন্তু বিপদ তাদের পিছু ছাড়ে না। মিরপুরের এক পরিত্যক্ত ভবনে বাস করা এক অদ্ভুত পরিবার এবং এক বীভৎস অপরাধচক্রের রহস্যের জালে জড়িয়ে পড়ে তারা।
. . .
#চরিত্র_পরিচিতি
🔹রাজু কাহিনীর মূল কথক। সে একজন টোকাই, যে শত অভাবের মাঝেও নিজের নৈতিকতা আর পরিবারের প্রতি টান ধরে রাখার চেষ্টা করে।
🔹বাবু রাজুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে একটু চঞ্চল এবং হাতসাফাইয়ে ওস্তাদ। চুরির নেশাই তাদের এক ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
🔹সগির আলী রাজুর বাবা, একজন উন্মাদ প্রকৃতির লোক, যে ঢাকার রাস্তায় উদ্ভট কথা বলে বেড়ায়। তবে এই উন্মাদনার আড়ালে হয়তো কোনো গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে।
🔹শিউলি বেগম রাজু ও টুনির মা। এককালে মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন, এখন অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী।
🔹টুনি রাজুর ছোট বোন, মায়ের চিকিৎসার টাকা যোগাতে এক পর্যায়ে যে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মালা বিক্রি করে।
. . .
রহস্য-রোমাঞ্চ যাদের পছন্দ, তাদের জন্য এটি একটি দারুণ বই। লেখক অত্যন্ত নিপুণভাবে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের ভাষা এবং টিকে থাকার লড়াইকে ফুটিয়ে তুলেছেন। একইসাথে গল্পের প্রতিটি পরতে থাকা সাসপেন্স আপনাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখবে।
ঢাকা শহর এক আজব শহর। কত রকমের মানুষ, কতভাবে জীবিকা নির্বাহ করে! এই বইটাও সেই শহরেরই এক অদ্ভুত দিক তুলে ধরে।
গল্পটা সাবলীলভাবে এগিয়েছে, আর লেখক ভালো মোমেন্টাম ধরে রাখতে পেরেছেন। ঢাকার বেশ কিছু পরিচিত জায়গাকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে এক অস্বাভাবিক অথচ বিশ্বাসযোগ্য জগৎ। কেন্দ্রবিন্দুতে আছে এক অদ্ভুত পরিবার—যাদের সহজে সাধারণের কাতারে ফেলা যায় না।
লেখক গল্পে যথেষ্ট রহস্য ধরে রেখেছেন, বিশেষ করে শেষের ক্লিফহ্যাঙার ইঙ্গিত দেয়—এখানেই সব শেষ নয়। হয়তো সামনে সিকুয়েল আসবে, যেখানে কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর মিলবে, আর নতুন চরিত্রও যোগ হতে পারে।