তোবারক সাহেব তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে সামনে বসা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছেন। বয়স নয় বছর নয় মাস। মেয়েটি আর দশটা বাচ্চা বা বালিকার মতো নয়; সে খানিকটা আলাদা। গ্রাম্য ভাষায় বলা যেতে পারে ‘জ্বিনে ধরা কন্যা’। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এই মেয়ের তেমন কোনো সমস্যা নেই। ভীতু প্রকৃতির এবং কথা খুবই কম বলে; এছাড়া তাকে আর দশটা সাধারণ বালিকার কাতারেই ফেলা যেতে পারে। তবে মেয়েটির ভয়ঙ্কর এক সমস্যা আছে। বেশিরভাগ সময় এই সমস্যা গর্তে লুকিয়ে থাকে; মাঝে মাঝে সমস্যাটি গর্ত থেকে বের হয়ে আসে। মেয়েটি তখন ঘুমায় না। রেকর্ড আছে—একনাগাড়ে সতেরো ঘণ্টা এই মেয়ে ঘুমায়নি। এই সময়ে সে প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখে। মেয়েটি কি মানসিকভাবে অসুস্থ? অথবা এমনও কী হতে পারে এর পেছনে অনৈসর্গিক কিছু আছে? অথবা প্রকৃতির কোনো বিচিত্র খেয়াল?
গল্প ভালো লেগেছে, খানিকটা মিসির আলি ভাইভ ছিল। শেষটা কেমন হবে তা মাঝপথে কিছুটা আঁচ করতে পারলেও লেখিকার ঝরঝরে গল্প বলার ক্ষমতার জন্য উপভোগ্য ছিল। রেকোমেন্ডেড..
অনেকটাই মিসির আলি ভাইব পেয়েছি।বইটা শুরু করার কিছুক্ষণের মাঝেই একটা বেশ জোরালো কৌতূহল তৈরি হয়—যাকে কোনো ভাবেই উপেক্ষা করা যায়না বইটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
বইয়ের ভাষা সহজ সুন্দর এবং আগ্রহ ধরে রাখার মতো।
নিজস্ব একটা লেখার স্টাইল তৈরি করার জন্য এবং ধরে রাখার জন্য লেখিকার যে আপ্রাণ চেষ্টা সেটাকে মন থেকে সাধুবাদ জানাই।
সুফাই রুমিন তাজিন আমার প্রিয় একজন লেখক। বিশেষভাবে বলতে গেলে নারী লেখিকাদের মধ্যে তিনি অবশ্যই এগিয়ে থাকবেন।
এই লেখিকার বইগুলো ভালো লাগার অন্যতম কারণ চমৎকার গুছানো লেখনী এবং শক্তিশালী চরিত্রায়ন। “তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না আ্যালিস” এর ব্যতিক্রম নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছুটা পরিচিত এবং কিছুটা অপরিচিত থিমের চমৎকার একটি প্লট। ওনার ‘অন্তঃশূন্যে অন্ধ হিম’ এর পর এই বইয়ের প্লট আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। নামের সঙ্গে বইয়ের সমাপ্তি যথাযথ ছিল। চরিত্রায়ন বরাবরের মতোই শক্তিশালী।
বইটি চমৎকার, কিন্তু সমালোচনার জায়গা অবশ্যই রয়েছে। মনে হয়, বইটি আরও ৫০ পৃষ্ঠা বৃদ্ধি পেলে ক্ষতি ছিল না; বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও পরিপূর্ণতা পেত। বইয়ে চরিত্র খুব কম। এর মধ্যে হাসান নামের গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রের উপস্থিতি কম মনে হয়েছে। তার ব্যাকস্টোরি বা গল্পের পরিধি আরেকটু বেশি হবে—এমনটা আশা করেছিলাম।
এই লেখিকার বই হাতে নিলে এক বসাতেই পড়ে ফেলা যায়— হয়তো ওনার ঝরঝরে লেখনীর কারণে। বইপ্রেমীদের জন্য হাইলি রিকমেন্ডেড।
তোবারক সাহেব একজন রিটায়ার্ড সাইকোলজিস্ট। দীর্ঘদিন সুনামের সাথে একজন সাইকোলজিস্ট হিসেবে কাজ করার পর এখন তাঁর হাতে অখণ্ড অবসর। বাগান করা আর মাছ চাষ নিয়ে বেশ ভালোই সময় কাটছিলো তাঁর। হঠাৎ-ই এক কাছের বন্ধুর অনুরোধে একটা কেস হাতে নিলেন তোবারক সাহেব। পেশেন্টের নাম কাশফিয়া। কিন্তু সে নিজেকে পরিচয় দেয় অ্যালিস নামে। আমরা তাকে অ্যালিস বলেই ডাকবো। তো, এই অ্যালিসের বয়স মাত্র দশ বছর নয় মাস। নিতান্তই বাচ্চা একটা মেয়ে। কিন্তু তার মানসিক সমস্যাটা বেশ জটিল। বহুদিন পর এমন একজন পেশেন্ট পেয়ে তোবারক সাহেবের ভেতরের পুরোনো সাইকোলজিস্ট সত্ত্বা আবারও জেগে উঠলো। অ্যালিসের মানসিক সমস্যাটা নিয়ে খুবই আগ্রহী হয়ে উঠলেন তিনি।
নয় মাস আগে থেকে সমস্যাটা শুরু হয় অ্যালিসের। হাসিখুশি স্বভাবের মেয়েটা হঠাৎ যেন চুপ হয়ে যায়। মাঝেমাঝেই ভয়াবহ ভায়োলেন্ট আচরণ করতে থাকে সে। অবস্থা বেশি খারাপ হলে একদম ঘুমাতে পারে না। আর ঘুমালেও ভয়ানক সব দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে। অ্যালিসের মা জিনাত আর বাবা হাসানকেও সে তার সমস্যাগুলো নিয়ে কিছুই বলে না। এরকম যখন অবস্থা, একজন সাইকোলজিস্ট হিসেবে তোবারক সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়েটার সমস্যার গভীরে যাওয়ার৷ আর এটা করতে গিয়েই তিনি ধীরে ধীরে জানলেন অ্যালিসের মা জিনাতের ট্রমাটিক অতীত সম্পর্কে। তাঁর সামলে এলো একসময়ের জনপ্রিয় ফিল্ম ডিরেক্টর আর বর্তমানে একজন ব্যর্থ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা অ্যালিসের বাবা হাসানের গল্প। আর এই সবকিছু ছাপিয়ে তোবারক সাহেবের সামনে মূর্ত হয়ে উঠলো জিনাত ও হাসানের মধ্যেকার অদ্ভুত প্রবলেমেটিক সম্পর্ক।
অ্যালিসকে তার এই মানসিক দুরাবস্থা থেকে উদ্ধার করতে তোবারক সাহেব তাঁর ভাগ্নি আরশিরও সাহায্য নিলেন। ধীরে ধীরে জট খুলতে লাগলো রহস্যের। একটা বাচ্চা মেয়েকে সুস্থ করতে গিয়ে তোবারক সাহেব লক্ষ্য করলেন অসুস্থতা যেন শুধু সেই মেয়েটারই না বরং সেটা ছড়িয়ে আছে তার আশেপাশের সবকিছুতেই। মানুষের ভেতরের অন্ধকার দিকগুলো যেন আরো একবার ধরা দিতে শুরু করলো সিনিয়র এই সাইকোলজিস্টের সামনে। ক্রমশ কেসটা জটিল থেকে আরো জটিল হতে লাগলো। কিন্তু তোবারক সাহেবও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, বাচ্চা মেয়েটাকে তিনি সুস্থ করে তুলবেনই যে করে হোক। অ্যালিসকে তিনি হারিয়ে যেতে দেবেন না।
সুফাই রুমিন তাজিনের 'তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না অ্যালিস' মূলত একটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। এটার সাথে মিশে আছে মিস্ট্রি আর কিছুটা প্যারাসাইকোলজিক্যাল ব্যাপারস্যাপারও। বইটার ব্যাক কভারের লেখাগুলো পড়ে এটা নিয়ে বেশ আগ্রহী হই আমি। সেই আগ্রহ থেকে হাতে পেয়েই পড়া শুরু করেছিলাম বইটা। এবং শেষ করার পর বলতেই হচ্ছে 'তোমাকে হারিয়ে যেতে দে��� না অ্যালিস' আমার জন্য বেশ ইন্টারেস্টিং একটা জার্নি ছিলো। বইটা পড়তে গিয়ে যেন আমি এর কাহিনির একদম ভেতরে ডুবে গেছিলাম। মূল চরিত্র সাইকোলজিস্ট তোবারক সাহেবের কর্মকাণ্ড মাঝেমাঝেই আমাকে হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত চরিত্র মিসির আলির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো। যদিও তোবারক সাহেব চরিত্রটি একদমই মৌলিক ও স্বতন্ত্র। কিন্তু সেই পুরোনো নস্টালজিয়াটা যেন ফিরে এসেছিলো বইটা পড়তে গিয়ে।
'তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না অ্যালিস'-এর শুরুতে অ্যালিসের মানসিক সমস্যাটার বর্ণনা সুফাই রুমিন তাজিন এমন চমৎকার ভাবে দিয়েছেন যে কাহিনিটার প্রতি আগ্রহ আর কৌতূহল বেড়ে গিয়েছে। সেই আগ্রহ উত্তরোত্তর আরো বাড়িয়ে দিয়েছে অ্যালিসের মা জিনাতের লাইফের ব্যাকস্টোরি। এই জায়গাটার বিল্ডআপ লেখিকা এতো চমৎকার ভাবে করেছেন, আমার মনে হয়েছে পুরো উপন্যাসটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার পেছনে এটার একটা বিশাল ভূমিকা আছে। যা একইসাথে গুরুত্বপূর্ণও বটে। কাহিনির ভেতরে পুরোপুরি ঢুকে যাওয়ার কারণে বারংবার জিনাতের জন্য আমার ভেতরে প্রবল দুঃখবোধ ও সহমর্মিতার সৃষ্টি হয়েছে। পাঠকের হৃদয়কে নিজের লেখা দিয়ে স্পর্শ করতে পারাটা একজন লেখকের জন্য অনেক বড় একটা ব্যাপার। আর সেই মাহাত্ম্যপূর্ণ ব্যাপারটা ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন সুফাই রুমিন তাজিন তাঁর সৃষ্ট চরিত্র জিনাতের ব্যাকস্টোরির মাধ্যমে।
এই উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্ররা যেমন হাসান সাহেব, আফরোজা বুবু, আরশি আর বিখ্যাত লেখক শোয়েব দ্য ওসাকাঁর সাথে তোবারক সাহেবের কথোপকথন বেশ উপভোগ্য লেগেছে। বিশেষ করে শোয়েব দ্য ওসাকাঁর নানা কর্মকাণ্ড ও তোবারক সাহেবের সাথে তার সেশনগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং ও ইনফর্মেটিভ ছিলো। এই জায়গাগুলো রহস্যময় করে তোলার পাশাপাশি যতোটা সম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত করে তুলতে চেয়েছিলেন সুফাই রুমিন তাজিন। এতে তিনি অনেকটা সফলও হয়েছেন, আমার মতে৷ আর যে অ্যালিসকে নিয়ে এই উপন্যাস, তার মানসিক সমস্যাটার শিকড় পর্যন্ত যখন গিয়েছি রীতিমতো শিউরে উঠেছি। যদিও এই ব্যাপারটা আমি 'তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না অ্যালিস'-এর অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। তারপরও সেই আন্দাজ মিলে যাওয়ায় সীমাহীন এক ক্রোধ আর ঘৃণা টের পেয়েছি নিজের ভেতরে। মানুষের মন যে কতোটা অন্ধকার হতে পারে, সেটা সম্পর্কে আরো একবার জানা হলো বইটা পড়া শেষ করে।
'তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না অ্যালিস'-এর শেষটা আমাকে পুরোপুরি স্যাটিসফাই করতে পারেনি। হয়তো আমি একটু ড্রামাটিক আর ভায়োলেন্ট এন্ডিং-ই আশা করছিলাম। কিন্তু কেন এমনটা আশা করছিলাম সেটা এই উপন্যাস যারা পড়েছেন আর পরবর্তীতে পড়বেন তারা বুঝতে পারবেন। অবশ্য সবকিছু সবার মনমতো হয় না। হবেও না। সুফাই রুমিন তাজিনের গল্প বলার ধরণ চমৎকার। এক ধরণের সরলতা আছে তাঁর লেখায়। কিন্তু কিছু ব্যাপারে তাঁর আরো উন্নতির জায়গা আছে। যেমন, অনেক সম্বোধন জনিত সমস্যা লক্ষ্য করেছি। একই চরিত্রের ক্ষেত্রে কখনও লেখিকা 'তিনি' আবার কখনও 'সে' সম্বোধন করেছেন। প্রায় সব জায়গায় মিসেস জিনাত-কে মিস জিনাত লিখেছেন। যদিও জিনাত বিবাহিতা। শেষের দিকের পুরোটা জুড়েই আফরোজা বুবুর নাম বদলে আফসানা বুবু হয়ে গেছে। কিছু ভুল বানানের দেখাও পেয়েছি। যেমন, কমনীয়তা-কে কোমনীয়তা, বিষাদময় হয়ে ওঠা-কে বিষোদগার হয়ে ওঠা ও প্রমাদ-কে প্রমোদ লেখা হয়েছে। এরকম ছোটখাটো ভুল আরো আছে। যে ভুলগুলোর কথা উল্লেখ করলাম সেগুলোর ব্যাপারে সুফাই রুমিন তাজিন ভবিষ্যতে সতর্ক হবেন আশা করি। তাঁর লেখা সময়ের সাথে আরো পরিণত হোক, এটাই চাই।
আবুল ফাতাহ'র করা প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে। যারা এক বা দুই বসায় পড়ে শেষ করা যায় এমন কোন মিস্ট্রি বা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার খুঁজছেন, তারা চাইলে 'তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না অ্যালিস' পড়ে দেখতে পারেন। হিউম্যান সাইকোলজির ডার্ক সাইড নিয়ে আগ্রহ থাকলে বইটা আপনার ভালো লাগলেও লাগতে পারে। রিকমেন্ড করলাম।
এটা কিন্তু কোন প্রেমের বই না। এর জনরা জানতে হলে পড়তে হবে। এই সাসপেন্সটা ভাঙতে চাই না। লেখিকা এতো বাস্তব একটা সমাধান দিয়ে গল্প শেষ করলেন যে, সাধারণত আমরা সেটা গল্প কিংবা উপন্যাসে আশাই করি না। আমিও চাচ্ছিলাম অন্যকিছু হোক, ভায়োলেন্স হোক। কিন্তু কখনো কখনো নির্লজ্জ সত্য ঢাকতে হয় এই সমাজ নামক কাঠামোর ভেতরকার কদর্যতার জন্যেই। আমার যুক্তি মানাতে চাইছে শেষটা এটাই হবার ছিল, কিন্তু আবেগ চাইছে নাহ, রক্ত ঝরুক।
যদিও এক বসায় এখন আর কোন বই পড়া হয় না; কিন্তু এইখানা কেমন যেন হাত থেকে নামাতে মন চাইছিল না। একদম কড় কড়া নতুন, এই বইমেলায় বের হলো। বুক স্ট্রিট প্রকাশনীকে ধন্যবাদ দারুণ এই বইখানা উপহার দেবার জন্য।
প্রথম এই লেখিকার লেখায় চোখ বুলানো; এবং আশাতীত ভাললাগা। সম্পর্কের জটিল চড়াই-উৎরাই এতো সহজ প্রাঞ্জলতায় লিখেছেন বলে একটুও বোর হই নি। বরং কি হয়েছিল এবং কি হতে যাচ্ছে সেটাই জানার প্রবল তাগিদ ছিল পুরোটা সময় জুড়ে। আমার মতন গল্পে বেশি ডুবে গেলে হয়ত মনের অজান্তে চোখ ভিজেও যেতে পারে। হাহাকার থেকে যাবে শেষটায়।
অনেক শুভেচ্ছা লেখিকার জন্য। “ইটের পর ইট মধ্যে মানুষ কীট” পড়তে হবে।