রকিব হাসান-এর জন্ম কুমিল্লায়, ১৯৫০ সালে । স্বনামে-বেনামে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৪০০টি । তার লেখা প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে, ছদ্মনামে । স্বনামে প্রথম প্রকাশিত বইটি ছিল অনুবাদগ্ৰস্থ, ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা” । এরপর অনুবাদ করেছেন এরিক ফন দানিকেন, ফার্লে মোয়াট, জেরাল্ড ডুরেল-এর মত বিখ্যাত লেখকদের অনেক ক্লাসিক বই । অনুবাদ করেছেন মহাক্লাসিক অ্যারাবিয়ান নাইটস’ ও এডগার রাইস বারোজএর টারজান’ সিরিজ । বড়দের উপযোগী তার লেখা কিছু রহস্য উপন্যাসও খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে । সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছে ছোটদের জন্য লেখা "তিন গোয়েন্দা” সিরিজটি । এই রবিনকে নিয়ে লিখেছেন আরও দুটাে সিরিজ তিন বন্ধু' ও 'গোয়েন্দা কিশোর মুসা রবিন' । লিখেছেন কিশোর গোয়েন্দা” সিরিজ, খুদে গোয়েন্দা’ সিরিজ, জাফর চৌধুরী ছদ্মনামে রোমহর্ষক’ সিরিজ এবং আবু সাঈদ ছদ্মনামে গোয়েন্দা রাজু সিরিজ । এ ছাড়া কিশোরদের জন্য বেশ কিছু ভূতের বই ও সাইন্স ফিকশনও লিখেছেন তিনি।
রকিব হাসান বাংলাদেশের একজন গোয়েন্দা কাহিনী লেখক। তিনি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তিন গোয়েন্দা নামক গোয়েন্দা কাহিনীর স্রষ্টা। তিনি মূলত মূল নামে লেখালেখি করলেও জাফর চৌধুরী ছদ্মনামেও সেবা প্রকাশনীর রোমহর্ষক সিরিজ লিখে থাকেন। থ্রিলার এবং গোয়েন্দা গল্প লেখার পূর্বে তিনি অন্যান্য কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি রহস্যপত্রিকার একজন সহকারী সম্পাদক ছিলেন।রকিব হাসান শুধুমাত্র তিন গোয়েন্দারই ১৬০টি বই লিখেছেন। এছাড়া কমপক্ষে ৩০টি বই অনুবাদ করেছেন। তিনি টারজান সিরিজ এবং পুরো আরব্য রজনী অনুবাদ করেছেন। তাঁর প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ ড্রাকুলা। রকিব হাসান লিখেছেন নাটকও। তিনি "হিমঘরে হানিমুন" নামে একটি নাটক রচনা করেন, যা টিভিতে সম্প্রচারিত হয়।
কিংবা বলতে পারেন, বহুদিন পর কিশোর মুসা রবিনকে পড়ে মনে হল আসলেই সেই পুরনো ফ্লেভারের তিন গোয়েন্দা পড়েছি। সেবা প্রকাশনী থেকে রকিব হাসান চলে যাওয়ার পরে সেখান থেকে 'তিন গোয়েন্দা' সিরিজের নামে যেসব গল্প বের হয়, সেগুলির বেশিরভাগ মূলত ফ্যান্টাসি জনরার অ্যাডাপ্টেশন। কিন্তু তিন গোয়েন্দা তো এমন ছিল না। এটা ছিল থ্রিলার/কিশোর থ্রিলার সিরিজ।
'অপারেশন বাহামা আইল্যান্ড' পড়ে তেমনই একটা থ্রিলার সিরিজের গন্ধ পেয়েছি। প্লটের বিচারে এটা অবশ্যই রকিব হাসানের সেরা কাজগুলির একটি নয়। গল্পের প্লট সাধারণ। তিন গোয়েন্দার একজন সদস্য রবিন মিলফোর্ড হারিয়ে যাওয়ার পরে তাকে খুঁজে ক্যারিবিয়ান দ্বীপে পাড়ি জমায় তিন গোয়েন্দা। সেখানে ঘটনাচক্রে তারা জড়িয়ে পড়ে গুপ্তধন কান্ডের সাথে। ধীরে ধীরে তাদের মনে প্রশ্ন উদ্যত হয়- ক্যাপ্টেন কুপার এত খাটুনির পরও কেন গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারছেন না? এই গুপ্তধন আর হারানো বন্ধু রবিন মিলফোর্ড মিলে ক্রমেই জটিল হয়ে যায় গল্প। আর শেষ অব্দি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়- রবিন মিলফোর্ড কি বেঁচে আছে?
গল্পের প্লট কিংবা লেখা কোনটাকেই আসলে বিচারের আতশকাচের নিচে ফেলব না। কারণ, এই বইটা লেখা হয়েছে উঠতি কিশোরদের জন্যে। তাদের জন্যে অবশ্যই আরেকটু ভাল মানের গল্প লেখা যেত, কিন্তু বইয়ে যেটুকু ত্রুটি আছে সেটা একটা কিশোর জনররা বইয়ের জন্যে খুব একটা ধর্তব্য নয়।
বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন। বইয়ের বাইন্ডিং এবং পেজ কোয়ালিটি দুর্দান্ত। কিন্তু সবকিছুর উর্ধ্বেও একটি কথা বলতে হয়। বইটিতে তিন সদস্যের কাউকে জোরেশোরে 'তিন গোয়েন্দা' শব্দটি বলতে দেখা যায়না। যেখানে তিন গোয়েন্দার পুরনো গল্পে তারা এই ব্যাপারটি সশব্দে বলে থাকে। এমনকি আমার মনে হয়েছে, লেখকও বইটি 'তিন গোয়েন্দা'র বদলে শুধুমাত্র 'কিশোর মুসা রবিন'-এর গল্প হিসেবেই পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিতে আগ্রহী। রকিব হাসান নিজেই তিন গোয়েন্দার স্রষ্টা, তার কাছ থেকে এমন আচরণ আসলে খুব একটা কাম্য নয়।
বইতে আবেগকালীন মুহুর্তের বর্ণনার অভাব রয়েছে। লেখক বইটি লিখতে বেশি তাড়াহুড়ো করেছেন বলে মনে হয়েছে। অবশ্য, এ ধরণের বইয়ের কলেবর ছোট করার যে তাড়না কাজ করে, সেটিও এর একটা কারণ হতে পারে।
যা হোক, অন্তত পুরনো ফ্লেভারের কিশোর থ্রিলার 'তিন গোয়েন্দা'র একটা স্বাদ পাওয়া যাবে গল্পে। এটাই বা বহুদিন পর কম কী!
আগেকার দিনের সেই তিন গোয়েন্দার কথা মনে আছে? ডানে বামে উপরে নিচে সব দিকে যারা গুপ্তধন খুঁজে পেত? এরাও একি কিন্তু পার্থক্য হল এখন একটু জেমস ভন্ড/মাসুদ নানা স্টাইলে গোলাগুলি খুন খারাপি যোগ হয়েছে।