সুন্দরবন-সংলগ্ন গ্রাম। গ্রামের মানুষ জীবিকার সন্ধানে সুন্দরবনে যায়। কেউ কেউ প্রাণ দেয় বাঘের থাবায়। তাদের স্ত্রীরা বাঘ-বিধবা হয়ে দিন কাটায়। গ্রামের নাম হয়ে যায় বাঘ-বিধবাদের গ্রাম। কাজ খঁুজতে হয় গ্রামের মানুষের। কাজের সন্ধানে কখনো কখনো তারা সীমান্ত অতিক্রম করে। তাদের জন্য বেঁচে থাকাই এক কঠিন সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনও তাদের জীবিকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বৈরী প্রকৃতি, বৈরী মানুষের আচরণ। অন্যদিকে সন্ত্রাসীরা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বসতি পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনা ঘটতেই থাকে। তারা কখনো থিতু হতে পারে না। বাতাসে ওড়ে ছিন্নভিন্ন জীবনের হাহাকার। তার পরও বেঁচে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষায় মানুষ তার স্বপ্ন গড়ে তুলতে চায়। এ দেশের শরবানুদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প দিনকালের কাঠখড়।
Selina Hossain (Bangla: সেলিনা হোসেন) is a famous novelist in Bangladesh. She was honored with Bangla Academy Award in 1980. she was the director of Bangla Academy from 1997 to 2004.
সেলিনা হোসেন (জন্ম: ১৯৪৭) বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি এ অনার্স পাশ করলেন ১৯৬৭ সালে। এম এ পাশ করেন ১৯৬৮ সালে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমীর গবেষণা সহকারী হিসেবে। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমীর প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ২০০৪ সালের ১৪ জুন চাকুরি থেকে অবসর নেন।
গল্প ও উপন্যাসে সিদ্ধহস্ত। এ পর্যন্ত ৭টি গল্প সংকলন, ২০টি উপন্যাস, ৫টি শিশুতোষ গল্প, ৫টি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক (১৯৬৯); বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮০); আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১); কমর মুশতরী স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৭); ফিলিপস্ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮); অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪)। তাঁর গল্প উপন্যাস ইংরেজি, রুশ, মেলে এবং কানাড়ী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
বেদনা না থাকলে হয়ত জীবনের কোনো সুখ মানুষ পেত না! শূন্যতা না থাকলে ভালোবাসার অর্থ বোঝার মতো সাধ্য মানুষের ছিল না। জীবনের পথ চলায় পিছিয়ে পরা একটা জাতিকে জানার জন্য খুব যে পড়তে হবে তা নয়, ইন্টারনেটের সার্চ লিস্টের সবার উপরে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় হয়তো বাংলাদেশ নামক ছোট দেশটি থাকবে। অনিয়ম, আর দুনীর্তির কারণে স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। নতুন করে আমাদের কোনো ইতিহাস নেই। আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর মতো কোনো রসদ নেই।
এতকিছুর মাঝেও আমাদের একটুকরো প্রশান্তি সুন্দরবন! যা নিয়ে আমাদের গর্ব করার কোনো কমতি নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। সুন্দরবনের কথা বললে কমবেশ সবার মাঝে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখার ইচ্ছে জাগে। কিন্তু কতজন আমরা জানি সেই জনজীবনে বাস করা কিছু ক্ষুদ্র মানুষের জীবন। গরীব হলে মানুষ যে ক্ষুদ্র হয়ে যায় সে মানুষ গুলোকে না দেখলে বোঝা যাবে না!
"দিনকালের কাঠখড়" বইটি সুন্দরবন এলাকায় প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন নিয়ে লেখা। একজন সাংবাদিক কেমন করে একজন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাদের জনজীবন, নুন আনতে পান্তা ভাতের গল্প, বিশ্ব জননেতাদের চোখ বুজে থাকা মুহুর্ত গুলো তিনি বর্ণনা করেছেন। কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যে বাংলাদেশ বারবার বইটিতে ফুটে উঠেছে।
শারমিন, শরীফ, শাবনুর কিংবা হনুফা বিবির জীবন একসূত্রে লেখক তুলে ধরেছেন। গল্প করেছেন একে অপরের সাথে। ছোট টিপুর জীবনের রোমাঞ্চ, হাসমত আলীকে বাঘে নিয়ে যাওয়া অদ্ভুত ভয়াবহ গল্প গুলোর কথা উঠে এসেছে। এ যেন নৃশংস হত্যাযজ্ঞের নিশ্চুপ ব্যক্তব্য। কর্তৃপক্ষ কথা বলবে না, সরকার নিশ্চুপ, মানুষের মৃত্যু যেন ছেলে খেলা সেই সবচেয়ে সুন্দর ম্যানগ্রোভ বনের তীরের মানুষ গুলোর।
অবসান নয় তাদের জীবনে এখন মুক্তি চায়। ঠাঁই যায় একটি সুন্দর জীবনের। কে দিবে তাদের সে জীবনের নিশ্চয়তা? সাথে ভালোবাসা বীজ বপন করতে লেখিকা ভুলে যান নি! সুন্দর সাবলীল সে ভালোবাসার বন্ধন পাঠককে তুলে দিয়েছেন।
বিষয়বস্তু হিসেবে যেটি লেখিকা বেছে নিয়েছেন এবং যেভাবে এর পরিস্ফুটন করেছেন, তা প্রশংসনীয়। দেশের রাজধানী শহর থেকে উল্লেখিত অঞ্চলের দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু জীবন যাপনে কী নিষ্ঠুর বৈপরীত্য। নিজের নিরাপদ বেষ্টনীর বাইরে গিয়ে এই জীবনটা দেখতে চাইলে এই বইটা নেড়েচেড়ে দেখা যেতে পারে অবশ্যই। গল্পের উপস্থাপনা আরও প্রাণবন্ত, আরও আকর্ষণীয় করা যেত বলে মনে হয়েছে। সেলিনা হোসেনের মত শক্তিমান লেখিকার জন্য এটা অসম্ভব কিছু নয়, সেজন্যেই মনে হয়েছে এটা হয়ত কিছুটা ইচ্ছাকৃতই। তবে একেবারে শেষভাগে এসে যে ধাক্কাটা দিয়েছেন, তাতে করে মন বেশ নাড়া খেয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ভিন্ন স্বাদের বই, দৃষ্টি-উন্মোচক গল্প।