ভাবলেও বিস্ময় জাগে যে, এ উপন্যাসটি হাসান আজিজুল হক লিখেছেন তাঁর ১৮ বছর বয়সে। এবং একটি অমোঘ বাক্য দিয়ে শুরু তার: ‘তেলাপোকা পাখি নয়।’ কথাটি বলেছেন বিশ শতকের তিনের দশকের বাঙালি নিম্ন-মধ্যবিত্তর চেহারা-চরিত্র, বিশেষত একটি কেরানি-চরিত্রর জীবনবাস্তবতা নির্মাণ করতে গিয়ে। কিন্তু ভাবুন বয়সটা। অবশ্য সুকান্ত ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতাটাও মনে পড়ছে, যে সময়ে ‘বিরাট দুঃসাহসেরা’ উঁকি দেয়। একটা পুরো জীবনের পোড়া-বাস্তবতা যে ভাষা ও ভঙ্গিতে তিনি লিখেছেন, একই সঙ্গে পক্কতা ও পাকামোর যে অপূর্ব সমন্বয়, এমনকি ‘শামুক’ নামকরণ- এ থেকেই তাঁর প্রস্ততি ও প্রতিভার আভাসটা বোধকরি অনেকেই টের পেয়েছিলেন। নইলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি পুরস্কার প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত একশো উপন্যাসের চূড়ান্ত বাছাইয়ে সেরা সাতটির মধ্যে এই বইটি জায়গা পেত না। ‘শামুক’ রচিত হবার ইতিহাস লেখক স্বয়ং লিখেছেন ভূমিকায়। উপন্যাসটি পড়ার আগে অবশ্যপাঠ্য এ লেখাটি পড়ে নিলেই পাঠক জানবেন বিস্তারিত। তাই আমাদের বলার কথা নেই তেমন। শুধু এটুকু বলার যে, এক-একজন লেখকের গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় তাঁর সৃজন আর লিখনভঙ্গিও শুরু থেকেই কেমন একটা নিজস্ব চেহারা নিতে থাকে, সেটুকু বোঝার জন্য প্রাথমিক লেখার বিশেষ গুরুত্ব থাকে। অন্য লেখকদের ভাষা ও ভঙ্গির প্রভাব সত্ত্বেও, অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও এখানটাতেই ‘শামুক’-এর মূল্য। এত বড় একজন কথাসাহিত্যিক কীভাবে পথহাঁটা শুরু করলেন তার অনেক চিহ্ন ধরা আছে এই বইয়ে।
Hasan Azizul Huq (Bengali: হাসান আজিজুল হক) is a Bangladeshi writer, reputed for his short stories. He was born on 2 February, 1939 in Jabgraam in Burdwan district of West Bengal, India. However, later his parents moved to Fultala, near the city of Khulna, Bangladesh. He was a professor in the department of philosophy in Rajshahi University.
Huq is well known for his experiments with the language and introducing modern idioms in his writings. His use of language and symbolism has earned him critical acclaim. His stories explore the psychological depths of human beings as well as portray the lives of the peasants of Bangladesh.
He has received most of the major literary awards of Bangladesh including the Bangla Academy Award in 1970.
'তেলাপোকা পাখি নয়' এমনই একটি সাধারন কিন্তু অসামান্য গম্ভীর্য্যপূর্ন লাইন দিয়ে শুরু হয়েছে একটি উপন্যাস 'শামুক'। লেখক 'হাসান আজিজুল হক'। ১৯৫৭ সাল। হাসান আজিজুল হকের বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর। সেই বয়সেই 'মানিক স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতার' জন্য লেখেন 'শামুক' নামের একটি উপন্যাস। প্রতিযোগিতায় কোন পুরষ্কারও না পেলেও, ৩০০ উপন্যাসের মধ্যে সেরা ৭ এ স্থান ছিল 'শামুক' বইটির। এর পর উপন্যাসটির কথা ভুলেই গেলেন তিনি। ১৯৬২ সালে 'পূর্বমেঘ' পত্রিকার জন্য 'শামুক' এ কিছু পরিবর্তন আনেন। হিন্দু চরিত্রকে মুসলমান করা হয়। ব্যস, এতটুকুই। আবার তিনি ভুলে গেলেন। এরপর ২০১৫ সালেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ হয় 'শামুক'। এখানে যার কৃতিত্ব অসামান্য তিনি হলেন 'চন্দন আনোয়ার' যিনি হাসান আজিজুল হকের উপর পিএইচডি করেছেন, আর একে একে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন হাসান আজিজুল হকের বিস্মৃতপ্রায় লেখা। বইটি প্রকাশের সময় 'পূর্বমেঘ' পত্রিকার সবটুকুই হুবুহু ছাপানো হয়েছে। কোন পরিবর্তনই করা হয়নি। এ বিষয়ে হাসান আজিজুল হক বলেন - 'আমি এ উপন্যাসটির কোন রকম সংশোধনে যাইনি। বিস্তৃত করা, সংশোধন বা কাটাকাটি করার জন্য হাত লাগাইনি। কারন তা করলেই আমি জানি, বর্তমানের আমি এর মধ্যে ঢুকে পড়ব।' লেখাটি সম্পূর্নভাবেই রয়েগেছে ১৮ বছর বয়সি হাসান আজিজুল হকের। কোথাও একটু কাঁচা, কোথাও একটু পাকা। কোথাও অগোছালো, কোথাও বা অসামান্য লেখা। এটাতো হল 'শামুক' এর আঁতুরঘরের কথা। এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে- মূল উপন্যাস টা মাত্র ৭২ পৃষ্টার। যদিও হাসান আজিজুল হক বলেছেন, এটা উপন্যাসের অর্ধেক। বাকি অংশও আছে এর পরে। কিন্তু সেটা কোথায় আছে, খোঁজ করা হয় নি। এই উপন্যাসের কথা যে আজিজুল হক বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন সেটা 'শামুক' আর 'আগুন পাখি' পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যায়। শামুকের কথা ভুলে গেলেও, কিছু কাহিনি আজিজুল হকের অবচেতন মনে রয়ে গিয়েছিল। এজন্যই 'শামুক' এর কিছু কিছু ছোট্ট ঘটনার পুনরাবৃত্তি 'আগুন পাখি' তে পাওয়া যায়। উপন্যাসটাতে অবশ্যই কিছু কিছু কাঁচা লেখা নজরে আসে, মানে 'আগুনপাখি' 'র সাথে তুলনা করলে। তবুও এটা হাসান আজিজুল হকের 'হাসান আজিজুল হক' হয়ে ওঠার সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর পথচলার শুরুটা দেখা যায়। সাথে, এটাও মনে রাখতে হবে 'শামুক' ১৮ বছর বয়সে লেখা। সেই বয়সের কিছুটা ছাপ উপন্যাসে সুস্পষ্ট। সব মিলিয়ে, একটা অসাধার রচনা 'শামুক'। তবে, 'শামুক' পড়তে গেলে আগে থেকেই "হাসান আজিজুল হক" কে চিনতে হবে। তার লেখার সাথে পরিচিত থকতে হবে। তবেই 'শামুক' পড়ে তার গভীরতা অনুভব করতে পারবের। পুনশ্চ: এটা কোন রিভিউ না। বইটা সম্পর্কে কিছু তথ্য বা মতামত। আমি বইয়ের মূলকাহিনির ধারে কাছের একটা শব্দও বলিনি। এটা ইচ্ছাকৃত।
বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি হাসান আজিজুল হকের প্রথম উপন্যাস 'শামুক'। ১৯৫৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার প্রতিযোগিতায় জমা দেওয়ার জন্য মাত্র ১৮ বছর বয়সে উপন্যাসটি লিখেন। প্রতিযোগিতায় ২০০ লেখার মধ্যে এই লেখাটি প্রথম সাতটির মধ্যে ছিল। একসময় এই লেখাটির কথা ভুলে যান তিনি। লেখককে নিয়ে পিএইচডি করার সময় চন্দন আনোয়ার লেখাটির খোঁজ পান এবং লেখককে জানান যে বইটি প্রকাশ করা উচিৎ। তবে বইটি সম্পূর্ণ না; শেষ অর্ধেক হারিয়ে গিয়েছে। প্রথম যখন বইটি লিখেন তখন মূল চরিত্র হিন্দু থাকলেও পরবর্তীতে প্রকাশের সময় মূল চরিত্রকে মুসলিমে পরিবর্তন করেন। এছাড়া আর কোনো সংশোধন করা হয়নি; কারণ লেখক চেয়েছিলেন তাঁর 'দরকচা' লেখার সাথেও যেন পাঠকের পরিচয় হয়। বইটি পড়ার মাধ্যমে পরিণত হাসান আজিজুল হকের লেখার সাথে সদ্যোজাত লেখক হাসান আজিজুল হকের পরিবর্তন বেশ ভালোভাবেই লক্ষ করা যায়।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র পঞ্চাশোর্ধ মুনীর পেশায় কেরানি। পঁয়তাল্লিশ বছর পূর্বে জীবনে প্রথমবার যখন স্রোতের বিপরীতে চলার সিদ্ধান্ত নেয়, সেই ভাবনায় উপন্যাসের পুরো কাহিনি প্রবাহিত হয়েছে। রামপুর গ্রামের সুদ ও মহাজনি কারবার করেন হায়দার। তারই সর্বকনিষ্ঠ সন্তান মুনীর। মুনীর শিশু বয়সেই তার মাকে হারায়। হায়দার চাইতেন ছেলে বড় হয়ে যেন তারই ব্যবসায় ঢুকে পড়ে। কিন্তু পড়ালেখায় ভালো হওয়াতে পূর্বপুরুষের পেশার দিকে না গিয়ে, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার বাসনা বাবাকে জানায়। কিন্তু হায়দার সাফ মানা করে দেন যে, পড়ালেখার জন্য কানা-কড়িও মিলবেনা। এদিকে মুনীর উপায় না পেয়ে দুলাভাই হাসানকে চিঠি লেখে। হাসান ছিলেন স্কুল শিক্ষক। তিনি শ্যালককে দ্রুত তাঁর বাড়িতে চলে যেতে নির্দেশ দেন। পিতার আদেশ অমান্য করে মুনীর পড়ালেখার জন্য বোনের বাড়ি যায়। কিন্তু সেই বাড়িতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় এক বিধবা বৃদ্ধার বাড়িতে জায়গীর থাকে। এদিকে মুনীরের খরচ মেটাতে হাসান শ্বশুরের গোলা ভেঙে ধান বিক্রি করে দেন। এতে ভীষণ ক্ষুদ্ধ হন হায়দার। পূর্বপুরুষের পেশা গ্রহণ না করে, পিতার বিরোধিতা করে, মুনীর কতটুকু সফলতা অর্জন করতে পারবে?
লেখক এমন একটি চরিত্রকে বেছে নিয়েছিলেন যে কিনা 'তেলাপোকা পাখি নয়।' ভাবনাটি গত পঁয়তাল্লিশ বছরেও দূর করতে পারেনি। ডানা থাকলেও যেভাবে তেলাপোকা বেশিদূর উড়তে পারেনা, তেমনি মুনীর তার জীবনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে অনেক স্বপ্ন থাকা সত্ত্বেও সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। শামুকের খোলসের ভেতরে যেভাবে গুটিয়ে থাকে শামুক, সেভাবে মুনীর কেরানির চাকরি করে যাচ্ছে। বেঁচে থেকেও যেন সব স্থবির হয়ে আছে। পলাশির যুদ্ধের পর হিন্দু সম্প্রদায় পাশ্চাত্য শিক্ষাকে আপন করে নিলেও, মুসলিমরা আরবি-ফারসিকে বুকে লালন করেছিল। ফলশ্রুতিতে প্রশাসন বা শিক্ষয় হিন্দুরাই ছিল সর্বেসর্বা। আর মুসলিমরা ফিরে গিয়েছিল আদিম পেশা কৃষিকাজে। মুসলিমদের মধ্যে কুসংস্কার ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করলে বাবা-দাদার ধর্ম চলে যাবে। গল্পের প্রধান চরিত্র মুনীর সেই আদিম পেশার বিরুদ্ধে গিয়েই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখে।
বইটাতে লিখনশৈলীর যে কমতি আছে সেটি লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন। তবে গল্পটা যে সুন্দর এটা মানতেই হবে। অন্যান্য লেখকদের প্রভাব আছে এটা যেমন সত্য, তেমনিভাবে লেখক নিজস্ব একটি আবহ তৈরি করতে পেরেছে এটাও সত্য। বইটির ভূমিকা পড়া ব্যতীত কেউ ধরতেই পারবেন না, এটা অর্ধেক উপন্যাস। বাকি অর্ধেকে লেখক দেখিয়েছিলেন মুনীরের কেরানি জীবনের শামুক হয়ে পড়ার গল্প। তবে আফসোস সেটুকু পড়ার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। তবু যেটুকু পড়তে পেরেছি, এটাও বা কম কীসে! হ্যাপি রিডিং।
বইটা খুব একটা আহমরি কিছু না। পাতায় পাতায় অপ্রাপ্তবয়স্কতার ছাপ প্রচণ্ড রকম ভাবে ফুটে আছে। প্রকৃতির বর্ণনা খুবই বেরসিক। অনেকটা জল পরে। পাতা নড়ে টাইপের। তবে সত্যি বলতে অনেক ছাইপাশ উপন্যাস এর মতো এই বইটার কাহিনী একবারে খারাপ না। তবে যখন জানবেন লেখক এই লেখাটা লিখেছিল তার ১৮ বছর বয়সে তখন চমকে জেতেই হবে।
কাহিনী আবর্তিত হয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্ত এক কিশোর মুনীরকে ঘিরে। প্রচণ্ড ইচ্ছে পড়াশুনা করার, কিন্তু বাবা চায় না মুনীর পড়ুক। দুলাভাই হাসানের সহযোগিতায় ঘর ছারে মুনীর। যায়গির থেকে শুরু হয় পড়াশুনা। অদ্ভুৎ কারনে আশ্রয় মেলে রোকেয়া বেগমের ঘরে, যা অবাক করে ��্রামের সকলকে। যে রোকেয়ার উঠোনে ছায়া ফেলতেও ভয় পায় গ্রামের মানুষ সে বাড়িতে আশ্রয় পেয়ে চলতে থাকে পড়াশুনা। এরি ফাকে এসে পরে প্রেম। বিচ্ছেদ ও এসে পরে খুব তারাতারিই। লেখক গল্পের শুরু করেছেন দারুণ একটা উক্তি দিয়ে- "তেলাপকা পাখি নয়"। মুনীর সেটা অনুধাবন করেছে তার জীবনের প্রতিটা বাকে। এন্ট্রান্স পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েও চালিয়ে যেতে পাড়নি বাবার কারনে। পড়াশুনা বাদ দিয়ে কেরানির চাকরি নেয়। এর পর বিয়ে। কিন্তু এ জীবন তো চায়নি মুনীর। এ যেন শামুকের জীবন। বেঁচে আছে, কিন্তু স্থবির সে বেঁচে থাকা।
"শামুক" জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের প্রথম উপন্যাস। ১৯৫৭ সালে লিখলেও বেই আকারে বেড়িয়ে মাত্র গতবছর। এর আগে ১৯৬২ সালে "পূর্বমেঘ"পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। উপন্যাসটির কিছু কিছু জায়গায় অপ্রাপ্তবয়স্কতার ছাপ ও কিছু কিছু জায়গায় অকাল পক্কতার ছাপ থাকলেও লেখক সেগুলো অপরিবর্তিত রেখেই ছেপেছেন।
'তেলাপোকা পাখি নয়, হতেই পারেনা।' উফ এত ভালো বই অনেকদিন পরি নাই। Cant believe this is his first novel and he never got to publish it till now. Beautiful.
'তেলাপোকা পাখি নয়' মুনিরের এটা বুঝতে সময় লেগে গেল। কী আশ্চর্য তাই না! ওড়ার ক্ষমতা থাকা স্বত্ত্বেও তেলাপোকা একটা সামান্য ঘৃন্য কীট হয়ে বেঁচে আছে। তেলাপোকার কদর কী কেউ করে কখনো? উড়তে পারলেই তো আর পাখি হওয়া যায় না।
যেমন মুনিরের স্বপ্ন ছিল একদিন সে উড়বে। উড়তে উড়তে আকাশ ছুঁয়ে দেবে, পূর্ণ হবে সব স্বপ্ন। কিন্তু মুনীর আজ পঁয়তাল্লিশ বছর পর এসেও জীবনের সেই সাধ পূরণ করতে পারেনি। জীবনটা কেটে গেছে সামান্য কেরানীগিরি করে। সেও কী তেলাপোকার মতো নয়? নাকি তাঁর জীবনটা শামুকের মতো হয়ে গেছে। খোলস আবৃত জীবন। মুনীর কী এমন জীবন চেয়েছিল!
কত কষ্ট করে সে লেখাপড়া শিখেছে আজ এত বছর পরে এসে অতীতের কথা বড্ড মনে পড়ে। বাবা হায়দারের শত বাঁধা, অভিশাপ ডিঙিয়ে মুনীর যখন দুলাভাইয়ের আশ্রয়ে পড়তে গেল তাঁর কাছে, দুলাভাই হাসান শ্যালকের জন্য যথেষ্ট করেছেন। নিজেও শিক্ষক হাসান, তাই বোধহয় মুনীরের স্বপ্নটা তিনি বোঝেন। হাসান এরপর গিয়েছিল আরেক গ্ৰামে। আশ্রয় পেয়েছিল বিধবা রোকেয়া খানমের বাড়িতে। এরপর লেখাপড়া এবং সাথে ছিলো রিনাও। রিনার কথা বরং রহস্য রাখলাম। মুনীরের লেখাপড়া শেখার ইচ্ছে তাঁকে আসলে থামতে দেয়নি।
কিন্তু তারপরও সময়ের স্রোত সব বদলে দেয়। মুনীর কীভাবে সামান্য কেরানীর জীবনযাপন পেলো সে অনেক কথা। সবাই তো বলতো তাঁকে বড় হাকিম, মোক্তার হবার কথা। মুনীরের জীবন তবে আজ কেন এমন শামুকের মতো খোলসে ঢেকে ধুঁকে ধুঁকে চলছে? গভীরে রয়েছে নিগুঢ় কথা, সব কথা কী আর এভাবে হয়! বইয়ের পাতায় হোক না হয় বাকিটা।
১৯৫৭ সালে হাসান আজিজুল হকের বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর। সেই বয়সেই ''মানিক স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতার'' জন্য লেখেন ''শামুক'' নামের একটি উপন্যাস। প্রতিযোগিতায় কোন পুরষ্কারও না পেলেও, ৩০০ উপন্যাসের মধ্যে সেরা ৭ এ স্থান ছিল ''শামুক'' বইটির।
এর পর উপন্যাসটির কথা ভুলেই গেলেন তিনি। ১৯৬২ সালে ''পূর্বমেঘ'' পত্রিকার জন্য ''শামুক'' এ কিছু পরিবর্তন আনেন। হিন্দু চরিত্রকে মুসলমান করা হয়। কিন্তু আবার তিনি ভুলে গেলেন। শামুক হারিয়ে গেল স্মৃতি থেকে তাঁর।
এরপর ২০১৫ সালেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ হয় ''শামুক''। 'চন্দন আনোয়ার' যিনি হাসান আজিজুল হকের উপর পিএইচডি করেছেন, আর একে একে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন হাসান আজিজুল হকের বিস্মৃতপ্রায় লেখা। বইটি প্রকাশের সময় ''পূর্বমেঘ'' পত্রিকার তিন খন্ডে ছাপা সবটুকুই হুবহু ছাপানো হয়েছে। কোন পরিবর্তনই করা হয়নি।
এই উপন্যাসের কথা যে আজিজুল হক বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন সেটা ''শামুক'' আর ''আগুন পাখি'' পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যায়। ''শামুক'' এর কিছু কিছু ঘটনার পুনরাবৃত্তি ''আগুন পাখি'' উপন্যাসে পাওয়া যায়।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন হাসান আজিজুল হক। হয়তো কিছু কিছু জায়গায় কাঁচা হাতের লেখা কিন্তু আবার অনেক জায়গায় ভাষাগত দিক ভালো লেগেছে যেটা ১৮ বছর বয়সী ছেলের লেখা ভেবেই চমৎকৃত হলাম। এই উপন্যাসটি যদিও অসম্পূর্ণ, এর আরেকটি অংশ খুঁজে পাওয়া যায়নি তবে আমার মনে হয় খুঁজে পেলে পূর্ণাঙ্গ বইটি পাঠকদের মাঝে সাড়া ফেলে দিতো। তবে পড়তে ভালো লেগেছে।
ছোট্ট বই এবং এক ১৮ বছর বয়সী ছেলের লেখা। কোনো রদবদল নেই ঠিক সেরকমই ছাপা হয়েছে। ভাষাগত দিক কিছু জায়গায় বেশ গাম্ভীর্যের ছোঁয়া দেয় আবার কিছু জায়গায় বড্ড ছেলেমানুষী প্রসঙ্গও আছে। আমি লেখকের আগুন পাখি পড়িনি বলে বুঝতে পারিনি শামুকের সঙ্গে ঠিক কতটা মিল কোন কোন ঘটনার। শামুকের যাবতীয় ইতিহাস তথ্য বইয়ের মাঝে পেলাম কীভাবে শামুক লেখা এবং বই আকারে ছাপা হলো। সব মিলিয়ে বলতে গেলে খারাপ নয়।
🐌 বইয়ের নাম: "শামুক" 🐌 লেখক: হাসান আজিজুল হক 🐌 প্রকাশনা: কথা প্রকাশ 🐌 ব্যক্তিগত রেটিং: ৩.৬/৫
হাসান আজিজুল হক একজন বাংলাদেশী ঔপন্যাসিক ও ছোট গল্পকার। ষাটের দশকে আবির্ভূত এই কথাসাহিত্যিক। জীবনসংগ্রামে লিপ্ত মানুষের কথকতা তাঁর গল্প-উপন্যাসের প্রধানতম অনুষঙ্গ। রাঢ়বঙ্গ তাঁর অনেক গল্পের পটভূমি।" আগুনপাখি "হক রচিত শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।
তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ও ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। এই অসামান্য গদ্যশিল্পী তার সার্বজৈবনিক সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে “সাহিত্যরত্ন” উপাধি লাভ করেন।
"তেলাপোকা পাখি নয়।" এই লাইনটা দিয়েই উপন্যাস টা শুরু। এবং খুব অবাক করা ব্যাপার যে মাত্র ১৮ বছর বয়সে লেখা হয় এই উপন্যাস।১৯৫৭ সালে উপন্যাস টা যখন লেখেন তখন তিনি দৌলতপুর বিএল কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং উপন্যাস টি তিনি মানিক স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতায় জমা দেন। এই প্রতিযোগিতায় প্রথমে ৩০০ বইয়ের মাধ্যে ১০০ বই বাছাই করে, তারপর ১০০ বইয়ের মধ্যে ২৮ টি বই বাছাই করে, তার পর ২৮ টা বইয়ের মধ্যে বেছে নেয় ৭ টা বই। "শামুক " এই ৭ টা বইয়ের মধ্যে ও ছিলো।
হায়দার নিজের ছেলে মুনীরের ইংরেজি শেখার কথা শুনে আঁতকে উঠলেন। ইংরেজি শিখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে এটা বলে, নানা রকমের গালি দিতে থাকেন ছেলেকে। বাবার এসব কথাতে বাধা দেবার কেউ নাই কারন মুনীরের মা বেঁচে নাই।
মুনীর গোপনে দুলাভাইকে চিঠি লিখলেন এবং দুলাভাই হাসান এর সাহায্যে পড়ালেখার সুযোগ পায়। কুসুমগাঁয়ে দুলাভাই এর বাড়ী থেকে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ালেখা করে ধুলগাঁয়ে স্কুলে ভর্তে হয় এবং রোকেয়া নামে এক বিধবার বাড়ীতে মুনীরের থাকার ব্যবস্থা হয়।
সন্তানহীনা রোকেয়াকে সকলে ভয় পেলেও মুনীর তার মায়ের ছায়া খুজে পে��ো। সেই বাড়ীতেই মাঝে মাঝে তারই বন্ধু তাহেরের বোন রিনা আসতো রোকেয়াকে পুথি পড়ে শোনাতে। মুনীরের ইচ্ছা ছিলো লেখক হবার এবং এই বাসনাতেই সে মাঝে মাঝে লিখতো এবং এই লেখাগুলোই রিনাকে পড়তে দিতো।
কোন এক বিকেলে মুনীর তার জীবনের ইতিহাস বললো রিনার কাছে আর তা যেন জমানো ছিলো তাকে বলার জন্যই। রিনার কাঁদতে ইচ্ছে হয়নি তবুও তার মনে সহানুভূতির জন্ম থেকেই কান্না করলো।
সেই বিকেলের পর অনেক দিন তাদের দেখা হয়েছে। রিনাকে সে জানতে পারেনি, এই তাদের শেষ দেখা। আর কোন দিন কোন রকমেই দেখা হবে না। অনুরোধ করতে পারতো, অবসর পেলে, মাঝে মাঝে যেন সে তার লেখাগুলো পরে। এসব আর কখনই বলা হলো না মুনীরের।
হাসান আজিজুল হকের লেখাতে সব সময় আমৃত আর গরল দুই-ই থাকে। অপরিনত বয়সের লেখা "শামুক " উপন্যাসেও এটা সমান ভাবেই উপস্থিত। চরিত্র এবং কাহিনির বিন্যাস, পরিবেশের বর্ণনা সব খানে কাঁচা হাতের কঁচা মনের দাগ লেগে আছে যদিও, তবুও হঠাৎ করেই উঁকি দিতে দেখা যায় বুদ্ধিদীপ্ত পরিনত হাসান আজিজুল হককে। "আগুন পাখি" উপন্যাসে লেখকের লেখাতে যে মোহনীয়তা ছিলো, "শামুক "কে তা একই রকম বিদ্যমান যারা পড়েছেন শুধু তারাই বুঝবেন। ১৮ বছর বয়সে লেখা প্রথম উপন্যাস এমনটা হতে পারে?...