Jump to ratings and reviews
Rate this book

তারাঝরা অনাথ আকাশে

Rate this book

48 pages, Hardcover

Published February 1, 2026

1 person want to read

About the author

Pias Majid

41 books11 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
0 (0%)
4 stars
1 (100%)
3 stars
0 (0%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 of 1 review
Profile Image for Shahnewaz Shahin.
111 reviews6 followers
March 7, 2026
‘একটা চেনা গান তখনই সুন্দর হয় যখন তা অচেনা সুরের কবলে পড়ে’


পড়লাম ছাব্বিশের ব‌ইমেলার কবি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত পিয়াস মজিদ-এর কাব্যগ্রন্থ “তারাঝরা অনাথ আকাশে”। বইটি কেবল কবিতার একটি সংকলন নয়; বরং এটি একজন মানুষের আত্মিক ও মানসিক ভাবনার প্রকাশ‌। ব্যক্তিগত অনুভূতি, নগরজীবনের ক্লান্তি, স্মৃতি, প্রেম, মৃত্যু, রাজনীতি এবং অস্তিত্বগত প্রশ্ন—সবকিছু একসঙ্গে মিশে এখানে একটি জটিল কিন্তু গভীর কবিতাজগত তৈরি করেছে। আধুনিক মানুষের মানসিক বিচ্ছিন্নতা, ভাঙাচোরা অনুভূতি এবং পৃথিবীকে বোঝার অন্তহীন প্রচেষ্টা এই বইয়ের বিভিন্ন কবিতায় নানা রূপে ফিরে আসে।

বইটির শুরুতেই কবি কবিতা লেখা ও মুছে ফেলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে এক ধরনের আত্মসংলাপ তৈরি করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন—
“একটা কবিতা লিখি, তারপর মুছে ফেলি। কবিতা আমাদের প্রকাশ করে না লুকায়?”

এই প্রশ্নটি আসলে কবিতার প্রকৃতি সম্পর্কে একটি গভীর দার্শনিক ভাবনা উত্থাপন করে। কবিতা কি মানুষের অন্তরের অনুভূতিকে প্রকাশ করে, নাকি তাকে আরও রহস্যময় করে তোলে? এই আত্মসন্দেহ ও অনুসন্ধানই যেন পুরো কাব্যগ্রন্থের প্রধান সুর। এখানে কবিতা কেবল প্রকাশের মাধ্যম নয়; বরং তা আত্ম-অনুসন্ধানের একটি উপায়।

বইটির নাম “তারাঝরা অনাথ আকাশে” নিজেই একটি শক্তিশালী প্রতীক। সাধারণত তারাভরা আকাশ মানুষের কাছে সৌন্দর্য, বিস্ময় এবং অসীমতার প্রতীক। কিন্তু এখানে আকাশকে বলা হয়েছে “অনাথ”। এই শব্দটি আধুনিক মানুষের অস্তিত্বগত একাকীত্বের গভীর অনুভূতিকে প্রকাশ করে। আকাশের অসীমতার ভেতর মানুষ যেন নিজের ক্ষুদ্রতা ও বিচ্ছিন্নতাকে আরও তীব্রভাবে অনুভব করে। ফলে বইটির শিরোনামই এর দার্শনিক ভাবনার একটি ইঙ্গিত বহন করে।

এই কাব্যগ্রন্থে নগরজীবনের উপস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশেষ করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন দৃশ্য—রাস্তা, বাসস্ট্যান্ড, কফিশপ, অফিস কিংবা ভোরের শহর—কবিতার ভেতরে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু শহর এখানে কেবল একটি পটভূমি নয়; বরং যেন একটি চরিত্র। মানুষের ভিড়ের মাঝেও যে গভীর নিঃসঙ্গতা তৈরি হয়, কবি সেটিকেই তুলে ধরেছেন। শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতা মানুষের অনুভূতিকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়—এই উপলব্ধি বইটির অনেক কবিতায় ফিরে আসে।

স্মৃতি এই কাব্যগ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। হারিয়ে যাওয়া মানুষ, বন্ধুত্ব, ভাঙা সম্পর্ক কিংবা পারিবারিক স্মৃতি—এসব বিষয় বারবার কবিতায় ফিরে আসে। স্মৃতি কখনো কোমল, কখনো বেদনাময়; কিন্তু তা সবসময় বর্তমানকে প্রভাবিত করে। বন্ধুর মৃত্যুর প্রসঙ্গে কবির একটি লাইন এই অনুভূতিকে গভীরভাবে প্রকাশ করে—
“ভাইবন্ধুর মৃত্যু হলে তার শেষযাত্রার খাটিয়া ছুঁয়ে এসে নিজের ঘুমানোর খাটকেও আর বিশ্বাস হতে চায় না।”

এই লাইনটি জীবনের অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর বাস্তবতাকে অত্যন্ত তীব্রভাবে অনুভব করায়। একজন ঘনিষ্ঠ মানুষের মৃত্যু আমাদের হঠাৎ করেই বুঝিয়ে দেয় যে জীবন কতটা ভঙ্গুর।

কবিতাগুলোর ভাষা ও শৈলীও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অধিকাংশ কবিতাই মুক্তছন্দে লেখা, যেখানে প্রচলিত ছন্দের কঠোর কাঠামোর চেয়ে ভাবনা ও চিত্রকল্পের প্রবাহ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কবিতা গদ্যধর্মী মনে হলেও তাদের ভেতরে একটি অন্তর্নিহিত সুর ও আবেগগত ধারাবাহিকতা রয়েছে। অনেক সময় কবিতাগুলো স্বপ্নের মতো ভাঙা বা অসংলগ্ন মনে হয়—যাকে বলা যায়। এই শৈলী বইটিকে একদিকে আধুনিক করেছে, অন্যদিকে পাঠকের জন্য নতুন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।

চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহার এই বইয়ের অন্যতম শক্তি। বৃষ্টি, পাখি, আকাশ, ধুলো, কবর, লাশ কিংবা শহরের দৃশ্য—এসব সাধারণ উপাদান কবির হাতে নতুন অর্থ পায়। বৃষ্টি কখনো স্মৃতি ধুয়ে যাওয়ার প্রতীক, কখনো সম্পর্কের ভাঙনের ইঙ্গিত। পাখি কখনো স্বাধীনতার প্রতীক, আবার কখনো হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মারক। এই প্রতীকী ভাষা বইটিকে বহুস্তরীয় করে তুলেছে এবং পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কবি বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনা ও বাস্তবতার প্রতিফলনও কবিতায় তুলে ধরেছেন। এর ফলে কবিতাগুলো কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির বর্ণনা হয়ে থাকে না; বরং এক ধরনের বৈশ্বিক চেতনার অংশ হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত জীবন ও বিশ্ববাস্তবতার এই সংযোগ কাব্যগ্রন্থটিকে আরও বহুমাত্রিক করেছে।

প্রেমের উপস্থিতিও এখানে উল্লেখযোগ্য, তবে তা প্রচলিত রোমান্টিক প্রেম নয়। এই বইয়ের প্রেম অনেক সময় অসম্পূর্ণ, স্মৃতিবন্দি কিংবা বিচ্ছেদের মধ্যে আটকে থাকা। সম্পর্কের জটিলতা, ভালোবাসার অনিশ্চয়তা এবং ভাঙনের বেদনা কবিতাগুলোকে একটি বিষণ্ণ কিন্তু বাস্তবধর্মী আবহ দেয়।

তবে এই কাব্যগ্রন্থ পড়তে গিয়ে কিছু কবিতা অনেক পাঠকের কাছে জটিল বা বিমূর্ত মনে হতে পারে। কারণ কবি অনেক সময় সরাসরি বক্তব্য না দিয়ে ইঙ্গিত ও প্রতীকের মাধ্যমে ভাব প্রকাশ করেছেন। ফলে কবিতাগুলোর অর্থ উপলব্ধি করতে পাঠককে মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়, কখনো একাধিকবারও পড়তে হয়। কিন্তু এই জটিলতাই বইটির সৌন্দর্যের একটি অংশ, কারণ এতে পাঠকের নিজস্ব ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়।

“তারাঝরা অনাথ আকাশে” এর প্রতীকী ভাষা, নগরজীবনের গভীর অনুভূতি, স্মৃতির ভার, প্রেমের অনিশ্চয়তা এবং দার্শনিক ভাবনা বইটিকে একটি আলাদা স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।

অতএব বলা যায়, এই বইটি কেবল কবিতার সংকলন নয়—এটি মানুষের ভেতরের প্রশ্ন, দ্বন্দ্ব এবং অস্তিত্বের অনুসন্ধানের ভাবনাও বটে। “তারাঝরা অনাথ আকাশে” পড়ার মাধ্যমে পাঠক শুধু কবির ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হন না; বরং নিজের ভেতরের নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি এবং জীবনের অর্থ নিয়েও নতুন করে ভাবতে শুরু করেন।
Displaying 1 of 1 review

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.