সুরুজের মাথার ভেতর অসীম শূন্যতা। নিজ চোখে এমন ভীতিকর দৃশ্য সে এর আগে কোনোদিন দেখেনি। লোকটা চার হাত পা মেলে রাস্তার একপাশে শুয়ে আছে- পা থেকে গলা পর্যন্ত দেখলে মনে হবে একজন সুস্থ সবল মানুষ। কিছুই হয়নি, ঘুমিয়েছে মাত্র। কিন্তু, মানুষটার মাথা নেই। নেই মানে কেটে নেওয়া হয়েছে এমন না- মাথাটা থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। খুলি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে রাস্তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। থ্যাঁতলানো মগজ রাস্তার উপর পরে ঠান্ডায় জমে গেছে এই শীতভোরে। এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখার পর কী করতে হয়, তা সুরুজ জানে না। সে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে...
রাজধানী ঢাকার মগবাজার। একই দিনে প্রায় কাছাকাছি সময় এই ব্যস্ত এলাকায় পাওয়া গেলো দুটো লাশ। একটা লাশ পাওয়া গেলো মোটামুটি ব্যস্ত এক রাস্তার ধারের ফুটপাথে। হতভাগ্য লোকটার মাথা একেবারে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে খুনি। এছাড়া শরীরে আর কোন আঘাতের আলামত নেই। দ্বিতীয় লাশটা একজন নারীর। এটাকে লাশ না বলে টুকরো টুকরো করা হাড়-মাংসের স্তুপ বলাটাই বোধহয় যুক্তিযুক্ত। একটা বস্তায় ভরে অজ্ঞাত এই নারীর খণ্ডবিখণ্ড লাশটা খুনি ফেলে রেখে গেছে এক রিটায়ার্ড আর্মি অফিসারের বাড়ির সামনে। তীব্র শীতের এই কুয়াশামাখা সকালে ঢাকা সহ পুরো দেশ যেন এই লাশ দুটো আবিস্কারের ঘটনায় থমকে গেলো।
রমনা থানার ওসি কারদার জামিল তাঁর অধস্তন অফিসার এসআই আমিরুল ইসলামকে নির্দেশ দিলেন খুনের এই কেস দুটোর তদন্ত করতে। তদন্তে নেমে এসআই আমির দেখলো তিল পরিমাণ কোন সূত্রও রেখে যায়নি খুনি বা খুনিদ্বয়। দুটো খুন, এবং দুটোই করা হয়েছে সম্পূর্ণ আলাদা কায়দায়। শুধু মিল একটা জায়গাতেই। দুটো খুনই করা হয়েছে প্রচণ্ড পৈশাচিকতা নিয়ে। যেহেতু সম্ভাবনা আছে দুটোই আলাদা খুনের কেস হওয়ার, তাই অধিকতর তদন্তের জন্য মাঠে নামানো হলো পুলিশ ব্যুরো অভ ইনভেস্টিগেশন্স বা পিবিআই-এর চৌকস অফিসার এসআই দুর্জয় শাকিলকে। রমনা থানা থেকে নিয়োজিত এসআই আমির আর পিবিআই-এর এসআই শাকিল দুজন নিজেদের মতো খুনের কেস দুটো নিয়ে তদন্ত চালাতে লাগলো।
মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় এক হালিমওয়ালার সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লো রিকশাচালক আয়নাল। এর ফলশ্রুতিতে হাসপাতালে যেতে হলো তাকে। আয়নালের স্ত্রী ফরিদা নিজের স্বামীকে রক্ষা করতে এমন এক কাজ করতে বাধ্য হলো যেটা করার কথা সে কখনও স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। এদিকে সুনামের সাথে অবসরে যাওয়া সাবেক আর্মি ক্যাপ্টেন আশেকুল ইসলামের শান্তির জীবনে অকস্মাৎ নেমে এলো অশান্তির কালো ছায়া। বহু বছর আগে তাঁর করা এক পাপের স্মৃতি কেন যেন বারবার তাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগলো। বাবা অঢেল সম্পদ রেখে গেছে নয়নের জন্য। কিন্তু তার মনে কেমন যেন একটা অপ্রাপ্তির অনুভূতি কাজ করে সবসময়। অজানা এক খিদে নয়নের মাঝে। শান্তিতে নেই বস্তিতে বসবাস করা টোকাই সুরুজও। জইফার প্রতি উদগ্র ভালোবাসা তাকে কেন যেন অন্ধ করে ফেলতে লাগলো ধীরে ধীরে। মগবাজারে সম্প্রতি আবিস্কৃত হওয়া দুটো লাশের সাথে রিকশাচালক আয়নাল, রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার আশেকুল ইসলাম, টাকার কুমির নয়ন আর টোকাই সুরুজের সম্পর্কই বা কি!
অতীতে বেশ কয়েকটা জটিল হোমিসাইড কেস সামলানো দুর্ধর্ষ পিবিআই অফিসার দুর্জয় শাকিল সময়ের সাথে ধীরে ধীরে বুঝতে পারলো এবারের কেসটাও নেহাত সোজাসাপ্টা না। তার ওপর যেখানে একাধিক খুনি থাকার সম্ভাবনা আছে, সেখানে তো আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে কিছুই বলা যায় না। মুখোশধারী সব মানুষের ভিড়ে এসআই শাকিল কি পারবে আসল খুনির মুখোশটা খুলে তার আসল চেহারাটা সামনে আনতে?
বর্তমান সময়ে বাংলা থ্রিলার সাহিত্য নিয়ে যারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে লেখক মনোয়ারুল ইসলাম অন্যতম। লেখক হিসেবে তিনি যথেষ্ট প্রমিসিং, এটা মানতেই হয়। এর আগে আমি মনোয়ারুল ইসলামের দুটো বই পড়েছি। ক্রাইম থ্রিলার 'মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স' আর হরর থ্রিলার 'তাহার বাড়ি অন্য কোথাও'। ২০২৬-এর বইমেলায় তাঁর প্রকাশিত হওয়া ক্রাইম থ্রিলার 'মানুষের তিনটি মুখোশ' নিয়ে আমার শুরু থেকেই আগ্রহ ছিলো। অবশেষে বইটা পড়ে শেষ করলাম। আমার রিভিউগুলোতে আমি সবসময় চেষ্টা করি একটা বইয়ের পজিটিভ ও নেগেটিভ দিক উভয়ই তুলে ধরার। মনোয়ারুল ইসলামের 'মানুষের তিনটি মুখোশ' বইটার ক্ষেত্রেও আমার সেই চেষ্টাটা থাকবে।
প্রথমে আসি বইটার পজিটিভ দিকগুলোর ব্যাপারে। মনোয়ারুল ইসলামের লেখার ধরণ আমার বরাবরই ভালো লাগে। সাবলীলভাবে গল্প বলেন তিনি। তাঁর লেখায় বাহুল্যবর্জিত একটা ভাব থাকে। যে কারণে খুব দ্রুত মূল গল্পে ঢুকে যাওয়া যায়। 'মানুষের তিনটি মুখোশ' বইটাও এর ব্যতিক্রম না। চমৎকার লেখার ধরণ ও এংগেজিং প্লটের কারণে বইটা শুরু থেকেই বেশ ভালো লাগছিলো। একটা আদর্শ ক্রাইম থ্রিলার লেখার জন্য যে যে ক্রাইটেরিয়া ফিলাপ করতে হয় মনোয়ারুল ইসলাম 'একটা সময়' পর্যন্ত সেগুলোর সবই ফলো করার চেষ্টা করেছেন। দুটো খুনকে কেন্দ্র করে তাঁর গড়ে তোলা পুরো গল্পটা নানা অ্যাংগেল থেকে বেশ ইন্টারেস্টিং ওয়েতে দেখানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। পুলিশি তদন্ত প্রক্রিয়া আর ফরেনসিকের নানা গলি-ঘুপচি সম্পর্কে তাঁর বর্ণনা বেশ উপভোগ্য লেগেছে আমার কাছে। এছাড়া 'মানুষের তিনটি মুখোশ' উপন্যাসের 'প্রায়' প্রত্যেকটা চরিত্রের চরিত্রায়ণও বেশ নিখুঁত মনে হয়েছে আমার কাছে৷ নিঃসন্দেহে একটা দ্রুতগতির থ্রিলারের তকমা দেয়া যায় বইটাকে।
এবার নেগেটিভ কথাবার্তা বলি কিছু। 'মানুষের তিনটি মুখোশ'-এর শেষট সম্পর্কে যদি বিন্দুমাত্র আভাসও আমি পেতাম, তাহলে বোধহয় বইটা আমি পড়তামই না। গতো বছর মনোয়ারুল ইসলামের 'মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স' পড়া শেষেও একটা অপূর্ণতা থেকে গেছিলো উপন্যাসের শেষে তাঁর রাখা ক্লিফহ্যাংগারের কারণে। খুব হতাশার সাথে খেয়াল করলাম 'মানুষের তিনটি মুখোশ'-ও এই দোষে দুষ্ট। একটা চমৎকার প্লটের কি শোচনীয় পরিণতি! এই উপন্যাসের শেষের দিকে এসে মনে হলো লেখকের ওপর বোধহয় দ্রুত বই জমা দেয়ার প্রেশার ছিলো প্রকাশকের তরফ থেকে। এই কারণে একদম তাড়াহুড়া করে বইটার একটা সমাপ্তি টেনেছেন তিনি। এটাকে আদৌ সমাপ্তি বলা যায় কি-না তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। মানে একদম ব্যাড়াছ্যাড়া একটা অবস্থা এন্ডিংয়ের।
'মানুষের তিনটি মুখোশ' যখন শেষ হলো, তখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি। মূল অ্যান্টাগনিস্টের ব্যাকস্টোরি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই তিনি বলেননি। শেষদিকে এসে মনে হচ্ছিলো ধুপধাপ করে সবকিছুর একটা এন্ডিং পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাইছেন মনোয়ারুল ইসলাম। এটাতে তাড়াহুড়ার ভাব তো ছিলোই, সেই সাথে ছিলো অপরিপক্কতার ছাপ। লেখক অবশ্যই একটা বইয়ের একাধিক সিকুয়েল নিয়ে আসতে পারেন। 'এরপর কি হলো, জানতে হলে পড়ুন পরের বইটা' বলে দায় সারা যায়। কিন্তু সেটা করার জন্য একটা স্যাটিসফাইং এন্ডিং দিতে হয়। মনোয়ারুল ইসলাম এই জায়গাটাতে এসে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন 'মানুষের তিনটি মুখোশ' বইয়ে। পুরো ২৭৯ পৃষ্ঠার একটা বই পড়ে যদি পাঠক হিসেবে এই অনুভূতি আসে যে একটা অসম্পূর্ণ বই পড়লাম, তাহলে দুঃখের সাথে এই কথাগুলোই বলতে হয়।
'মানুষের তিনটি মুখোশ' একটা পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার ও পুলিশ প্রোসিডিউরাল হয়ে উঠতে পারতো লেখক যদি এই তাড়াহুড়াটা না করতেন। কাহিনির প্রয়োজনে এই উপন্যাসে বেশ কিছু টেকনিক্যাল টার্ম ব্যবহার করেছেন মনোয়ারুল ইসলাম৷ সেগুলোর কোন ব্যাখ্যা তিনি দেননি। পুরোটাই পাঠকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। আমি দাবী করছি না টেকনিক্যাল টার্মগুলোর পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়ার। কিন্তু নির্ঘন্ট বা শর্ট নোট আকারে এই টার্মগুলো সম্পর্কে কিছু তথ্য দিলে সেটা পাঠকের জন্য সহায়ক হতো বলে মনে হয়েছে আমার। অন্তত টার্মগুলোর ফুল ফর্মগুলোও মনোয়ারুল ইসলাম উল্লেখ করতে পারতেন। যাই হোক, তিনি সেই কষ্টটা করেননি। আরো কিছু ছোটখাটো অসঙ্গতি 'মানুষের তিনটি মুখোশ'-এ চোখে পড়েছে। সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গেলে রিভিউটা আরো বড় হয়ে যাবে। আপাতত সেগুলো বাদ রাখলাম।
মনোয়ারুল ইসলামের 'মানুষের তিনটি মুখোশ' ওভারঅল একটা ডিজ্যাপয়েন্টিং বই বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। যে বইটা বেশ সম্ভাবনাময় ভাবে শুরু হয়ে বেশ হতাশাজনক ভাবে শেষ হয়েছে। এই লুপহোলগুলো আর হতাশাজনক এন্ডিংটাকে এক সাইডে সরিয়ে রাখলে এটা একটা ওয়ান টাইম রিড হিসেবে পড়ে ফেলতে পারেন। ভবিষ্যতে বইটার সিকুয়েল যদি আসে সেটা পড়ার ইচ্ছা থাকলো। মানবের করা প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে। বইটার প্রোডাকশনও ছিলো চমৎকার।
অনেক দিন পর একটা সত্যিকারের ভালো থ্রিলার পড়লাম। বিল্ডআপ আর স্টোরিটেলিং ছিল একদম নিখুঁত—ক্লাসিক ধাঁচে এগিয়েছে গল্পটা। যাকে খুনি মনে হবে, সে আসলে নির্দোষ; আর যাকে একদমই সন্দেহ করবেন না, সেই হবে খুনি —এর ক্লাসিক উদাহরণ। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খুনিকে আন্দাজ করা কঠিন।
তবে সমস্যাটা ঠিক এখানেই—শেষে যাকে খুনি হিসেবে দেখানো হলো, তার বিরুদ্ধে প্রায় কোনো শক্ত প্রমাণই নেই। একটু গোঁজামিল দিয়েই সন্দেহটা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে মনে হয়েছে। টুইস্ট এর আনটুইস্টিংটা খুব স্মুথ লাগেনি।
আরেকটা বিষয়—উপন্যাসে চরিত্রের সংখ্যা একটু বেশি। কিছু কমানো গেলে ভালো হতো, কারণ এতগুলো নাম মনে রাখাও কঠিন হয়ে যায়।
তারপরও বলতে হয়, অনেক দিন পর একটা ভালো থ্রিলার পড়ে বেশ ভালো লাগল।
আমরা এক মুখে বাঁচি না! সমাজের জন্যে এক মুখ, আপনজনের জন্যে আরেক মুখ! আর দিনশেষে একান্ত নিজের সাথে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্তা! এই বহুমাত্রিক সত্তাকেই লেখক ধরতে চেয়েছেন, যাকে আমরা দেখি প্রতিদিন আবার দেখিও না!
উত্তেজনা একদম টান টান, ভাষা লক্ষণীয়ভাবে সংযত। কোথাও তাড়াহুড়া নেই, আবার অযথা অলঙ্কারও নেই। প্রত্যেকটি চরিত্র সময় নিয়ে গড়ে উঠেছে, সাথে কাহিনি প্যারালালভাবে চলেছে। নৃশংস খু/ন, ধ*র্ষ/ন, মাইন্ড গেম, এর উপর আছে দুর্জয় শাকিল! এই শাকিলকে এখন ভালোই লাগছে, কারণ অতিরঞ্জিত দেবদূতের চরিত্র না, কিন্তু সার্প ব্রেন বটে! লেখক এর চিত্রায়ণ ভালো করেছেন।
বইটা একটা “টু বি কনটিনিউ” রেখে শেষ। মনে হচ্ছে সাইকো কিলারদের ইউনিভার্স করার সখ জেগেছে। প্রশ্ন রইল লেখকের কাছে।
অনেকদিন পর মনে হচ্ছে দুর্দান্ত একটা থ্রিলার পড়লাম। বিল্ডাপ, স্টোরিটেলিং আর মনোয়ারুল ইসলাম স্পেশাল - গোর ডিটেইলস। রক্ত, খুন, ধর্ষন - আর দুর্জয় শাকিল (নামের সাথে মিল রেখে আসাধারণ একটা ক্যারেক্টার দেয়ার কারণে অবশ্য আমি একটু বায়াসড)। তবে এন্ডিংয়ের দিকটায় আরেকটু কিছু আশা ছিল, কিছু ক্যারেক্টারের রিয়েকশন গুলো লিপিবদ্ধ করা দরকার ছিল। কিছু মুখোশ আরো উন্মোচন করলে হয়তো মন ভরত, এস্পেশালি দ্যা ওয়ান উইথ দ্যা বিট্রেয়াল। আবার ভাবছি হয়ত না উন্মোচন করাটাই একপ্রকার গল্পের প্রয়োজনীয়তা ছিল, আমাদের চারপাশের নোংরা মুখোশগুলোর কয়টায় বা উপ্রে ফেলা যায়?
4.5🌟 কেমন লাগে যখন বইয়ের শেষ পর্যায়ে আর আপনার বই এর পৃষ্ঠা নাই? তাও ১/২ টা না, ৮ টা। তাও পরপর না তাই কাহিনি বুঝতে সমস্যা হয়নাই, তবুও ওই পেজগুলো পড়তে চাই যদি কারো কাছে pdf থাকে। এবার আসি কাহিনী তে। এটা আমার এই লেখকের পড়া ২য় বই। নিজের পরিচিত যায়গা নিয়ে বলায় ঘটনাগুলো বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে। তার আরো বই পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম।