What do you think?


কোলাহলে
জলার মাঠের বয়সি সজনে গাছটি অস্তিত্বের মানে খোঁজে। তাকে কেন্দ্র করে ভেসে বেড়ায় এক মুন্ডুহীন লাশ। কীসের অপেক্ষা করে চারদিকে নদীঘেরা ঐ মায়াবী সবুজ জনপদ? সেখানে বৃষ্টির রাজত্ব। শেষরাতে মানুষের প্রকাশ্য জীবন আর গোপন কামনার কাহিনি বলে যায় পাটকলের বিপন্ন সাইরেন। জীবনকে চাকায় রূপান্তরিত করে নিয়ে চরকা কাটে সময়। উন্মোচিত হয় দক্ষিণবাংলার গ্রামজীবনের এক আশ্চর্য কালপর্ব, যা হারিয়ে গেছে, কিন্তু পড়ে আছে দীর্ঘ ছায়া।
168 pages, Hardcover
First published February 5, 2016
About the author
Enamul Reza
7 books196 followersএনামুল রেজা একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক। জন্ম ১৯৯১। শৈশব ও কৈশোর খুলনায় কেটেছে, বর্তমানে ঢাকায় বসবাস।
প্রকাশিত উপন্যাস:
কোলাহলে (২০১৬)
চায়ের কাপে সাঁতার (২০২৩)
শোনো, রিকুয়েম (২০২৬)
গল্পগ্রন্থ:
হন্ত্রক (২০২৫)
প্রকাশিত উপন্যাস:
কোলাহলে (২০১৬)
চায়ের কাপে সাঁতার (২০২৩)
শোনো, রিকুয়েম (২০২৬)
গল্পগ্রন্থ:
হন্ত্রক (২০২৫)
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 17 of 17 reviews
February 28, 2016
বই পড়ার শুরু থেকেই এক ধরণের উপন্যাসের নাম শুনে আসছি। "জীবনধর্মী উপন্যাস"। কিন্তু এর সঠিক সংজ্ঞা কি? এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার আলোকে বলব- জীবনবোধকে লেখক যখন সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেন কিছু অচেনা মানুষের জীবন পরিক্রমার মাধ্যমে সেটিই জীবনধর্মী উপন্যাস। সেদিক বিবেচনায় লেখক সফল। আমি মুগ্ধ। :)
খুব কমই ঝুঁকি নেই আমি নতুন লেখকদের বই কেনার ক্ষেত্রে(থ্রিলার সাহিত্য বাদে)। কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা সুবিধার নয় বিশেষ। কিন্তু তা সত্ত্বেও বইমেলা থেকে বেছে শুনে এবার তিনজন তরুণ লেখকের বই কিনেছি। তার মধ্যে এটা একটা। সিদ্ধান্তটা ভুল ছিলো না।
গল্পের শুরু এবং শেষ দুটোই হঠাত করে । চলমান জীবনের এক পর্যায়ে শুরু এবং তার কিছু দিনাতিপাতের পর শেষ। চরিত্রগুলোর পূর্ব বর্ণনা খুব বেশী না থাকলেও এটুকু ক্যনভাসেই লেখক মুন্সিয়ানার ছাপ দেখিয়েছেন নি:সন্দেহে। পড়ার সময় ঘটনাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ভাসছিলো আমার সামনে। লেখকের লেখার হাত অতিশয় ভালো। সামনে আরো চমতকার বই আশা করছি তার কাছ থেকে। অভিনন্দন। :)
খুব কমই ঝুঁকি নেই আমি নতুন লেখকদের বই কেনার ক্ষেত্রে(থ্রিলার সাহিত্য বাদে)। কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা সুবিধার নয় বিশেষ। কিন্তু তা সত্ত্বেও বইমেলা থেকে বেছে শুনে এবার তিনজন তরুণ লেখকের বই কিনেছি। তার মধ্যে এটা একটা। সিদ্ধান্তটা ভুল ছিলো না।
গল্পের শুরু এবং শেষ দুটোই হঠাত করে । চলমান জীবনের এক পর্যায়ে শুরু এবং তার কিছু দিনাতিপাতের পর শেষ। চরিত্রগুলোর পূর্ব বর্ণনা খুব বেশী না থাকলেও এটুকু ক্যনভাসেই লেখক মুন্সিয়ানার ছাপ দেখিয়েছেন নি:সন্দেহে। পড়ার সময় ঘটনাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ভাসছিলো আমার সামনে। লেখকের লেখার হাত অতিশয় ভালো। সামনে আরো চমতকার বই আশা করছি তার কাছ থেকে। অভিনন্দন। :)
May 13, 2026
'কোলাহলে' উপন্যাসে ক্লাসিক্যাল ভাইব আছে। চিরায়ত উপন্যাসের আবহ, গদ্যশৈলী, ঘটনাপ্রবাহ, চরিত্রায়নের স্বাদ সবই পেয়েছি। উপন্যাসের গ্রামীণ পটভূমি আমাকে বারবার শৈশবের গ্রামের স্মৃতিকাতরতায় ভাসিয়েছে।
সব ঠিকঠাক তবে অতিরিক্ত চরিত্রের কারণে এক তারা খসলো। এনামুল রেজার 'চায়ের কাপে সাঁতার' এর মতো বাংলা সাহিত্যে আরও অনেককিছু দেয়ার সামর্থ্য আছে।
সব ঠিকঠাক তবে অতিরিক্ত চরিত্রের কারণে এক তারা খসলো। এনামুল রেজার 'চায়ের কাপে সাঁতার' এর মতো বাংলা সাহিত্যে আরও অনেককিছু দেয়ার সামর্থ্য আছে।
January 23, 2022
লেখকের গদ্যশৈলী চমৎকার কিন্তু ছোট উপন্যাসে অনেক বেশি চরিত্র ও অনেক বেশি ঘটনা সন্নিবিষ্ট হওয়ায় পুরোপুরি উপভোগ করতে পারলাম না।
March 19, 2026
গ্রামের এক সজনে গাছের ডালে মুণ্ডুহীন একটা লাশ পাওয়া যায়। কার লাশ সেটা জানা যায় না। উপন্যাসের ঘটনা এখান থেকেই ঘটতে শুরু করে। বইটাকে মার্ডার মিস্ট্রির জনরায় ফেলা যায়। পুলিশি তদন্ত শুরু হয়, লাশ দেখা একটা বাচ্চার উপর জিনের আছর হয়, গ্রামের হুমড়া-চুমড়ারা নড়েচড়ে বসে, রাবেয়া-রোকেয়ার সংসারের আলাপ আসে, তাদের বাপ-চাচাদের কথা আসে। সব মিলিয়ে অনেকটা স্লাইস অব লাইফ ধরনের লেগেছে।
উপন্যাস ভালোই লেগেছে, তবে চায়ের কাপে সাঁতারের আগে এই বই পড়লে সম্ভবত আরো একটু বেশি ভালো লাগত। যখন জানলাম এই উপন্যাসটি ১০ বছর আগে লেখা তখনই উচ্চাশার পারদ নিচে নামিয়ে এনেছিলাম। স্বভাতই বুঝা যায় যে এনামুল রেজা তার বেস্ট বই চায়ের কাপে সাঁতারকে টপকে যেতে পারবেন না এই উপন্যাসে। তবে আমি আশাবাদী তিনি তার নিজের বেস্ট বইয়ের থেকেও ভালো বই লিখবেন। সেই আনন্দময় দিনের অপেক্ষায় থাকলাম।
সব্যসাচী মিস্ত্রীর করা প্রচ্ছদটা সুন্দর হয়েছে।
বইয়ের স্পাইনে কোলাহলে এ-কারের মাত্রাটা চোখে লাগছে খুব।
টাইপো - আছে।
উপন্যাস ভালোই লেগেছে, তবে চায়ের কাপে সাঁতারের আগে এই বই পড়লে সম্ভবত আরো একটু বেশি ভালো লাগত। যখন জানলাম এই উপন্যাসটি ১০ বছর আগে লেখা তখনই উচ্চাশার পারদ নিচে নামিয়ে এনেছিলাম। স্বভাতই বুঝা যায় যে এনামুল রেজা তার বেস্ট বই চায়ের কাপে সাঁতারকে টপকে যেতে পারবেন না এই উপন্যাসে। তবে আমি আশাবাদী তিনি তার নিজের বেস্ট বইয়ের থেকেও ভালো বই লিখবেন। সেই আনন্দময় দিনের অপেক্ষায় থাকলাম।
সব্যসাচী মিস্ত্রীর করা প্রচ্ছদটা সুন্দর হয়েছে।
বইয়ের স্পাইনে কোলাহলে এ-কারের মাত্রাটা চোখে লাগছে খুব।
টাইপো - আছে।
March 19, 2026
অপূর্ব!
লেখক কিছু বিষয়ের সমাপ্তি টানেননি। তদন্তের বিষয়টা অসমাপ্ত রেখে দেয়াই ভাল সিদ্ধান্ত ছিল, সত্যি কথা বলতে পুরো গল্পে 'মেদ' বলতে শুধু এই দিকটাই মনে হয়েছে। আবার কিছু চরিত্রের ক্লোজার দেয়া প্রয়োজন ছিল। তবে বলতেই হবে, এই ছোট দৈর্ঘ্যের উপন্যাসে এতগুলো চরিত্রকে সাজানোর কঠিন কাজটি লেখক বেশ ভালোভাবেই উতরেছেন, যদিও সবাই সমান জায়গা পায়নি।
সামনে লেখকের কাছ থেকে গ্রামীণ প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশদভাবে রচিত একটি উপন্যাস আশা করছি, যা হবে শুধুই সম্পর্ক এবং একাকিত্বের গল্প।
লেখক কিছু বিষয়ের সমাপ্তি টানেননি। তদন্তের বিষয়টা অসমাপ্ত রেখে দেয়াই ভাল সিদ্ধান্ত ছিল, সত্যি কথা বলতে পুরো গল্পে 'মেদ' বলতে শুধু এই দিকটাই মনে হয়েছে। আবার কিছু চরিত্রের ক্লোজার দেয়া প্রয়োজন ছিল। তবে বলতেই হবে, এই ছোট দৈর্ঘ্যের উপন্যাসে এতগুলো চরিত্রকে সাজানোর কঠিন কাজটি লেখক বেশ ভালোভাবেই উতরেছেন, যদিও সবাই সমান জায়গা পায়নি।
সামনে লেখকের কাছ থেকে গ্রামীণ প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশদভাবে রচিত একটি উপন্যাস আশা করছি, যা হবে শুধুই সম্পর্ক এবং একাকিত্বের গল্প।
July 2, 2026
আদিগন্ত বিস্তৃত এক মাঠ, নাম তার জলার মাঠ। মাঠের পশ্চিম প্রান্তে কেবল দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ এক সজনে গাছ। প্রাচীন বিকট সে গাছে কেউ কোনোদিন ফুল ধরতে দেখেনি, পাখি বসতে দেখেনি। ঘটনার শুরু এই গাছকে ঘিরে; আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায় ঐ গাছের ডালে ঝুলে থাকা এক মস্তকবিহীন মৃতদেহকে ঘিরে। বৈশাখের এক তপ্ত দুপুরে বিস্ফারিত চোখে তা আবিষ্কার করে পূবপাড়া গ্রামের মুদি দোকানী আজমত আর তার দশ বছর বয়সী ছেলে মনি। এ ঘটনায় বদলে যায় গোটা গ্রাম। এককালে এখানে বড় একটি পাটকল ছিল, নিয়ম করে সেখানে হাট বসতো, ঈদেপরবে মেলার আয়োজন হতো। পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গ্রামের লোকের আর্থিক অবস্থা পড়তির দিকে। নিস্তরঙ্গ সেই জনপদ হঠাৎ খুনের ঘটনায় উলটপালট হয়ে যায়। চাপা আতঙ্ক কাজ করে ছেলেবুড়ো সবার ভেতর। কেউ যেন মন খুলে কথা বলতে চায় না। একে একে কাহিনীতে ভিড় করে নানা চরিত্র- আলাল শেখ, জহুর আলী, মনোয়ারা, ইমাম সাহেব, কামরুল, রাবেয়া, রোকেয়া, হালিমা, মঞ্জু, গনি আরও কতজন! জন্ম নেয় নতুন কত প্রশ্ন! অতিপ্রাকৃত নানা অনুষঙ্গের আবর্তে সব প্রশ্নের উত্তর যেন চাপা পড়ে যায়। তবে সকল ঘটন-অঘটনের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে ঐ কালো ছোপওয়ালা বুড়ো সজনে গাছ।
প্রায় দুই যুগ আগে কাজের সূত্রে কয়েকবছর খুলনায় ছিলাম। লেখক এনামুল রেজার ‘কোলাহলে’ উপন্যাসটি পড়ে বহুকাল পর ফিরে গেলাম দক্ষিণ বাংলায় ফেলে আসা সেই সময়ে। উপন্যাসের দিঘলপুর যেন ভৈরব নদীর ওপারের দিঘলিয়া। বাকি নামগুলোও কি কাকতালীয়? দৌলতগঞ্জ কি দৌলতপুর! কিংবা খালিশহর কি খালিশপুর? পাঠক হিসেবে আমি ঐ সময়টাতে হারিয়ে যাই যখন সন্ধ্যা নামতো কাছেধারে টিকে থাকা সর্বশেষ পাটকলের সাইরেনের শব্দে। গোটা উপন্যাস জুড়ে এই ঘোর কাজ করে। দৃশ্যকল্পের বুনন আর বর্ণনা দুই'ই এতো নিখুঁত যে পূবপাড়ার ঐ জনপদেই পাঠক-মন ঘুরপাক খেতে থাকে। তাই লেখক যখন বেশকিছু প্রশ্ন রেখে উপন্যাসের যবনিকা নামান তখনো মনে হয় এই তো বেশ হলো, কিছু রহস্য অধরাই থাক না! সাইরেনের শব্দ একসময় থেমে যায়, অঝোর ধারায় নেমে আসে বিষন্ন, একঘেয়ে বৃষ্টি, চারদিক থেমে থেমে কেপে ওঠে বজ্রবিদ্যুতের শিখায় আর বিপুল সে কোলাহলে বুকের কাছে দলা পাকিয়ে থাকে সীমাহীন নিঃসঙ্গতা।
প্রায় দুই যুগ আগে কাজের সূত্রে কয়েকবছর খুলনায় ছিলাম। লেখক এনামুল রেজার ‘কোলাহলে’ উপন্যাসটি পড়ে বহুকাল পর ফিরে গেলাম দক্ষিণ বাংলায় ফেলে আসা সেই সময়ে। উপন্যাসের দিঘলপুর যেন ভৈরব নদীর ওপারের দিঘলিয়া। বাকি নামগুলোও কি কাকতালীয়? দৌলতগঞ্জ কি দৌলতপুর! কিংবা খালিশহর কি খালিশপুর? পাঠক হিসেবে আমি ঐ সময়টাতে হারিয়ে যাই যখন সন্ধ্যা নামতো কাছেধারে টিকে থাকা সর্বশেষ পাটকলের সাইরেনের শব্দে। গোটা উপন্যাস জুড়ে এই ঘোর কাজ করে। দৃশ্যকল্পের বুনন আর বর্ণনা দুই'ই এতো নিখুঁত যে পূবপাড়ার ঐ জনপদেই পাঠক-মন ঘুরপাক খেতে থাকে। তাই লেখক যখন বেশকিছু প্রশ্ন রেখে উপন্যাসের যবনিকা নামান তখনো মনে হয় এই তো বেশ হলো, কিছু রহস্য অধরাই থাক না! সাইরেনের শব্দ একসময় থেমে যায়, অঝোর ধারায় নেমে আসে বিষন্ন, একঘেয়ে বৃষ্টি, চারদিক থেমে থেমে কেপে ওঠে বজ্রবিদ্যুতের শিখায় আর বিপুল সে কোলাহলে বুকের কাছে দলা পাকিয়ে থাকে সীমাহীন নিঃসঙ্গতা।
April 2, 2026
বইয়ের নাম: কোলাহলে
লেখক: এনামুল রেজা
রেটিং: ৪.৫/৫
"চায়ের কাপে সাঁতার" পড়ার পর থেকেই এনামুল রেজার প্রথম বই 'কোলাহলে' নিয়ে আগ্রহ ছিলো। তবে দীর্ঘদিন(প্রায় দশ বছর) বইটা স্টক আউট হওয়ায় পড়ার সুযোগ হয়নি। এইবারের বইমেলায় পুন:মুদ্রন আসার সাথে সাথেই সংগ্রহের তালিকায় যুক্ত হলো 'কোলাহলে'।
'কোলাহলে'-র কোলাহল শুরু হয় আপাতদৃষ্টিতে সহজ- সরল এক গ্রামে সজনেগাছ ঝুলে থাকা এক মুন্ডুবিহীন লাশের মধ্য দিয়ে। ক্রমে কাহিনি আগাতে থাকে, গ্রাম রাজনীতি, সাথে আরও প্লট টুইস্ট- গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের আক্ষেপ। পুরো গল্প যেন শেষ পর্যন্ত আটকে রাখে পাঠককে। সব মিলিয়ে বেশ ভালো লেগেছে সামাজিক ঘরনার এই উপন্যাস।
তবে কাহিনির কলেবরের তুলনায় চরিত্র সমাবেশ বেশি - যদিও লেখক তা ব্যবহার করেছেন পুরো উপন্যাসকে বাস্তবিক রূপ দিতে। লেখকের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হিসেবে 'কোলাহলে' তার সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছে। 'চায়ের কাপে সাতার" এ লেখকের যেমন পরিপক্কতা ছিলো, এই উপন্যাসেও অনেকটা তেমন লেখনি অনেকটা আশাতীত।
লেখকের জন্য শুভকামনা!
লেখক: এনামুল রেজা
রেটিং: ৪.৫/৫
"চায়ের কাপে সাঁতার" পড়ার পর থেকেই এনামুল রেজার প্রথম বই 'কোলাহলে' নিয়ে আগ্রহ ছিলো। তবে দীর্ঘদিন(প্রায় দশ বছর) বইটা স্টক আউট হওয়ায় পড়ার সুযোগ হয়নি। এইবারের বইমেলায় পুন:মুদ্রন আসার সাথে সাথেই সংগ্রহের তালিকায় যুক্ত হলো 'কোলাহলে'।
'কোলাহলে'-র কোলাহল শুরু হয় আপাতদৃষ্টিতে সহজ- সরল এক গ্রামে সজনেগাছ ঝুলে থাকা এক মুন্ডুবিহীন লাশের মধ্য দিয়ে। ক্রমে কাহিনি আগাতে থাকে, গ্রাম রাজনীতি, সাথে আরও প্লট টুইস্ট- গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের আক্ষেপ। পুরো গল্প যেন শেষ পর্যন্ত আটকে রাখে পাঠককে। সব মিলিয়ে বেশ ভালো লেগেছে সামাজিক ঘরনার এই উপন্যাস।
তবে কাহিনির কলেবরের তুলনায় চরিত্র সমাবেশ বেশি - যদিও লেখক তা ব্যবহার করেছেন পুরো উপন্যাসকে বাস্তবিক রূপ দিতে। লেখকের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হিসেবে 'কোলাহলে' তার সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছে। 'চায়ের কাপে সাতার" এ লেখকের যেমন পরিপক্কতা ছিলো, এই উপন্যাসেও অনেকটা তেমন লেখনি অনেকটা আশাতীত।
লেখকের জন্য শুভকামনা!
April 13, 2022
সে এক গ্রাম আছে, যে গ্রামের উপর সর্বদা রাজত্ব করে বৃষ্টি। এমনকি করে মাঠের নামকরণও। কোন এক ঝড়ের রাতে জলার মাঠে বসে থাকতে থাকতে আপনার হয়তো বৃষ্টিকে মনে হতে পারে তুখোড় সন্ত্রাস আবার নাও হতে পারে, হয়তো বংশবিস্তারে বেরিয়ে পড়া কই মাছের মতো আপনিও মার্চ করে যেতে পারেন নতুন জলের দিকে। কিন্তু, ঘটনা শুধুই আটকে থাকে না প্রকৃতির মাঝে... ফলে জলার মাঠে কোন এক দুপুরে বাপ-ব্যাটা দোকানের জন্য সওদা করে ফেরার পথে কোন এক এতিম গাছে দেখতে পায় একটি গলা কাটা লাশ। অসুস্থ হয় পুত্র, অসুস্থ হয় পুত্রের বাপ। লাশের পরিচয় পাওয়া যায় না তবে অমাবস্যা রাত ঠিকই পাকড়াও করতে সাহায্য করে একজন খুনিকে... ঘটনা হয় আরও ঘনীভূত। ভিলেজ পলিটিক্স তখন মূলত ডালপালা ছড়াচ্ছিল, আর এইসব থেকে দূরে একজন আপেক্ষিকঅর্থে বোহেমিয়ান ব্যর্থ প্রেমিক তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যাচ্ছিল সুন্দরবনের দিকে আর তাঁর প্রেমিকার ভালো মানুষ স্বামী, নানান ছলাকলার সাহায্যে করতে চাইছিল নয়া বউয়ের মন জয়। ঘটনা এইরূপে ঘটে, বিষাদ আসে স্বাভাবিকভাবে, স্মৃতিচারণই তখন হয়ে ওঠে সুখের একমাত্র উপজীব্য... যেমন এককালে এই গ্রামে পাটকল ছিল, আজ আর নাই... আবার হয়তো খুলবে সামনে ... এই তো আশা, ভবিষ্যতের কাছে, এভাবেই জীবন কাটে। অজ্ঞাত লাশের পরিচয় অজ্ঞাতই থাকে আর নৈঃশব্দ্যের কোলাহলে ক্লান্ত হয় মন।
চিরায়ত উপন্যাস হতে একটা গল্পে যা যা উপকরণ লাগে, এই বইয়ে সেসব উপকরণ আছে পরিমাণমতো, ফলে স্বাদে হয়নি হেরফের বরং, এই পরিবেশ, এই পরিচিতি, এই বিজ্ঞান আমাদের মনে হয় খুব খুব পরিচিত। স্টোরি টেলিং স্পন্টেনিয়াস। গল্প এগিয়েছে এফোর্টলেসভাবে... উপন্যাসিক একটা নাটাই থেকেই ছেড়েছেন অনেকগুলো সুতো... এবং দিন শেষে সবগুলো ঘুড়ি নিয়েই ফিরেছেন ঘরে। তবু কথা থাকে, পাঠক মন হয়তো আরও কিছু চায় ... যেমন এই উপন্যাসের বিস্তার যদি আরও একটু বড় হতো, তবে কী ক্ষতি হতো কোন? কিছু কিছু চরিত্র ক্যামিও রোল থেকে বের হয়ে হয়তো আরও বড় কোন রোল প্লে করতে পারতো। স্টোরি টেলিংয়ে অনভ্যস্ত চোখ হয়তো ধাক্কা খাবে, কেনোনা কন্টিনিউটি ব্রেক করে লেখক বারবার ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে শুরু করেছেন গল্প, তবে কিছুটা মনোযোগ দিলে এই গল্প বলার ধরণের মধ্যেও পাওয়া যাবে শৃঙ্খলা, পাঠকের হয়তো মনে পড়ে যাবে হুয়ান রুলফো কিংবা মিলান কুন্ডেরার স্টোরি টেলিংয়ের কথা।
'কোলাহলে' এনামুল রেজার প্রথম উপন্যাস। এই কথা কোথাও উল্লেখ করা না থাকলে, যে কোন পাঠকের জন্যই এই বাস্তবতা বিশ্বাস করতে হয়তো কষ্ট হবে, কেনোনা উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠক আমি আবিষ্কার করেছি একজন পরিণত লেখককে, যে র্যাট রেইসে নাম লেখাতে নয় বরং এসেছে সত্যিকার অর্থেই ফিকশন তৈরি করতে।
চিরায়ত উপন্যাস হতে একটা গল্পে যা যা উপকরণ লাগে, এই বইয়ে সেসব উপকরণ আছে পরিমাণমতো, ফলে স্বাদে হয়নি হেরফের বরং, এই পরিবেশ, এই পরিচিতি, এই বিজ্ঞান আমাদের মনে হয় খুব খুব পরিচিত। স্টোরি টেলিং স্পন্টেনিয়াস। গল্প এগিয়েছে এফোর্টলেসভাবে... উপন্যাসিক একটা নাটাই থেকেই ছেড়েছেন অনেকগুলো সুতো... এবং দিন শেষে সবগুলো ঘুড়ি নিয়েই ফিরেছেন ঘরে। তবু কথা থাকে, পাঠক মন হয়তো আরও কিছু চায় ... যেমন এই উপন্যাসের বিস্তার যদি আরও একটু বড় হতো, তবে কী ক্ষতি হতো কোন? কিছু কিছু চরিত্র ক্যামিও রোল থেকে বের হয়ে হয়তো আরও বড় কোন রোল প্লে করতে পারতো। স্টোরি টেলিংয়ে অনভ্যস্ত চোখ হয়তো ধাক্কা খাবে, কেনোনা কন্টিনিউটি ব্রেক করে লেখক বারবার ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে শুরু করেছেন গল্প, তবে কিছুটা মনোযোগ দিলে এই গল্প বলার ধরণের মধ্যেও পাওয়া যাবে শৃঙ্খলা, পাঠকের হয়তো মনে পড়ে যাবে হুয়ান রুলফো কিংবা মিলান কুন্ডেরার স্টোরি টেলিংয়ের কথা।
'কোলাহলে' এনামুল রেজার প্রথম উপন্যাস। এই কথা কোথাও উল্লেখ করা না থাকলে, যে কোন পাঠকের জন্যই এই বাস্তবতা বিশ্বাস করতে হয়তো কষ্ট হবে, কেনোনা উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠক আমি আবিষ্কার করেছি একজন পরিণত লেখককে, যে র্যাট রেইসে নাম লেখাতে নয় বরং এসেছে সত্যিকার অর্থেই ফিকশন তৈরি করতে।
April 17, 2026
জীবনে থাকে প্রেম, বিরহ, দুঃখ, আনন্দ, প্রতিহিংসা, ক্ষমতার দাপট, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, সরলতা এবং রহস্য। অথবা আরো অনেক কিছু , ভিন্ন কিছু। সমাজের নানান দিকে, নানান বাঁকে লুকিয়ে থাকে গল্প। থাকে জীবনের বলা, না বলা অসংখ্য কথার ছড়াছড়ি। কিছুটা গোপনে, তবে সত্য হয়ে। সমাজ, জীবন কখনো সুন্দর, কখনো নির্মম। কখনো কাউকে দুহাত ভরে দেয়। কখনো কাউকে রাখে একেবারে রিক্তহস্তে। প্রকৃতির কোলাহলে মানুষ বসবাস করে নিশ্চুপ হয়ে। সত্যিকার অর্থে কখনো নিশ্চুপ থাকে? নাকি আড়ালে আবডালে সেসবই মস্তিষ্কে সৃষ্টি করে কোলাহল?
জলার মাঠের পুরোনো বিরাট সজনে গাছটি কতিপয় ব্যাক্তির অপরাধের নিরব সাক্ষী। প্রকাণ্ড সজনে গাছটির ডালে ঝুলতে দেখা যায় মস্তকহীন লাশ। কার লাশ কোন কূলকিনারা করা যায় না। বইয়ের শুরুটা এমনই ভয়ঙ্কর রহস্য সূচনার মাধ্যমে। মনে হয়েছিল এই লাশের রহস্য সমাধান করতেই হয়তো বইয়ের পাতায় ডুব দিতে চলেছি। তা কিছুটা সত্য হলেও পুরোপুরি নয়। কিছু দূর এগিয়ে মনে হলো এতো আমাদের চেনা পরিচিত জগৎ। আমাদের সমাজেরই টুকরো টুকরো ঘটনা। যেখানে জীবনের সবকিছু বর্তমান। আছে ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, সাহস,ভয়, বিশ্বাস,বিশ্বাসঘাতকতা এবং সমাজের কিছু নগ্ন চিত্র, একইসাথে রহস্যের ঘনঘটা।
সামাজিক উপন্যাস বরাবরই ভালো লাগে। কারণ, চেনা জগৎটাই লেখকের লেখায় উঠে আসে ভিন্ন রূপে, ভিন্ন আঙ্গিকে। 'কোলাহলে' ও তার ব্যতিক্রম নয় বলেই মনে হলো৷ লেখকের লেখায় জীবনের নানান চিত্র উঠে এসেছে জীবন্ত হয়ে৷ অতিরিক্ত নাটকীয় নয়। মনে হলো যেখানে যতটুকু দরকার সেখানে ঠিক ততটুকুই চিত্রিত করা হয়েছে। চরিত্রের আধিক্য যে একটুও বিরক্ত করেনি তা বলবো না। শুরুর দিকে অনেকটা কষ্টই হচ্ছিল বুঝতে। চরিত্রের সংখ্যা আরো কম হলে হয়তো আরো ভালোভাবে উপভোগ করা যেত। তবে চরিত্রগুলো অল্প কথায় দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা লেখকের দক্ষতা। নয়তো এত জীবন্তভাবে চোখের সামনে সমাজের টুকরো টুকরো চিত্র বোধহয় তুলে ধরা সম্ভব ছিল না। সব চরিত্র হয়তো সমানভাবে দাগ কেটে যাবে না। তবে কিছু কিছু চরিত্র বারবার বিষন্ন করে তুলবে, ভাবাবে আসলে আমরা কি চাই এই জীবনে!
সমস্ত চরিত্র নিয়ে আলাদা করে লেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। এদের মাধ্যমেই তো উঠে এসেছে সমাজের একাংশ চিত্র। তবুও সেসব নিয়ে লিখবো না। কারণ, সেসব চরিত্রদের নিয়ে আলাদা আলাদা মনোভাব তৈরি হবে সকলের মনে। সব চরিত্র সমানভাবে স্থায়ীত্ব না পেলেও প্রতিটি চরিত্রই হয়তো কারো না কারো সাথে মিলে যাবে। নিজের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাথে চরিত্রদের প্রতি ভালো লাগা, মন্দ লাগা ভিন্ন হবে নিঃসন্দেহে।
'কোলাহলে' লেখকের লেখা 'চায়ের কাপে সাঁতার' বইয়ের সাথে তুলনা করলে হয়তো কিছুটা ম্লান মনে হবে। তবে 'চায়ের কাপে সাঁতার'-কে সরিয়ে রাখলে মোটেও মন্দ লাগবে না। চায়ের কাপে সাঁতারের মতো কোলাহলেও বেশ কিছু প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে শেষ হয়েছে বলেই মনে হলো। তবে পাঠকের নিজস্ব ভাবনার জগৎকে নষ্ট না করার জন্য এটা বোধহয় প্রয়োজনীয়ই ছিল। সব রহস্য, সব ভাবনাকে মুক্ত করে দিলে সেই বইয়ের ভালো লাগার রেশ মুহুর্তেই বিলীন হয়ে যাবে।
কাজেই সেসব প্রশ্ন মনের গহীনে উঁকি দিবে বারবার। নিজের মতো একটা সমাপ্তি টানতে সেইসব অসমাপ্ত গল্পকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে। কামরুলের গন্তব্য সত্যিকার অর্থে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? কিংবা রোকেয়ার জীবন কোনদিকে মোড় নিবে? স্বপ্নে বিভোর মাহমুদার জীবনের গল্প লেখার সমাপ্তি কি হবে? নগেন চন্দ্র শীল কি আবার হাতে নিবে অসমাপ্ত কাজ? আজমতের স্ত্রী কিসের ছায়া দেখে, কাদের ছায়া? মনিরই বা কিসের এত ভয়? আলাল শেখ, হালিমারই বা কি পরিনতি হবে?
এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে হবে নিজের মতো করে। এই কাজটিই হয়তো ভালো লাগার মাত্রা আরেকটু বাড়িয়ে তুলবে।
আমাদের কোন কারণ ছাড়াই বিষন্ন হতে ভালো লাগে কখনো কখনো। কিছুক্ষণ মন খারাপ করে উদাস হয়ে বসে থাকা একটু অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয় বৈকি। 'কোলাহলে' ও এমন অনুভূতিরই জন্ম দেয়। অন্তত আামর কাছে তাই মনে হয়েছে। হয়তো কোলাহলে মনে থেকে যাবে দীর্ঘদিন। কারণ মানুষ বিষন্নতা মনে রাখে দীর্ঘ সময় ধরে। সময়ের বাঁকে বাঁকে জীবনের নানান গল্প পড়তে পড়তে বইয়ের মাঝেই হারিয়ে যাওয়ার আনন্দ ভিন্ন রকম।
বই থেকে একটু অংশ না লিখেই পারছি না৷ এটুকু পড়ে খানিক থমকে ছিলাম বোধহয়।
"ওই পাখিটারে দেখ কামরুল, কী বিশাল তার গা। আমি খুব ছোটবেলা থেকে ওরে এই মাগরিবের অক্তে পুব থেকে পশ্চিমে উইড়ে যাতি দেখি জানিস? ও চিরদিন একলা, কখনো কোনো সঙ্গী ছিল না ওর।"
বহু দূরে উড়ে যাবার পরেও পাখিটির বিপুলতা কামরুলকে বিস্ময়ে অভিভূত করেছিল সেদিন। অবাক কণ্ঠে বলেছিল, "মানুষের চেয়েও বড়ো পাখি তাহলি দুনিয়াতে আছে কাকা? "
জলার মাঠের পুরোনো বিরাট সজনে গাছটি কতিপয় ব্যাক্তির অপরাধের নিরব সাক্ষী। প্রকাণ্ড সজনে গাছটির ডালে ঝুলতে দেখা যায় মস্তকহীন লাশ। কার লাশ কোন কূলকিনারা করা যায় না। বইয়ের শুরুটা এমনই ভয়ঙ্কর রহস্য সূচনার মাধ্যমে। মনে হয়েছিল এই লাশের রহস্য সমাধান করতেই হয়তো বইয়ের পাতায় ডুব দিতে চলেছি। তা কিছুটা সত্য হলেও পুরোপুরি নয়। কিছু দূর এগিয়ে মনে হলো এতো আমাদের চেনা পরিচিত জগৎ। আমাদের সমাজেরই টুকরো টুকরো ঘটনা। যেখানে জীবনের সবকিছু বর্তমান। আছে ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, সাহস,ভয়, বিশ্বাস,বিশ্বাসঘাতকতা এবং সমাজের কিছু নগ্ন চিত্র, একইসাথে রহস্যের ঘনঘটা।
সামাজিক উপন্যাস বরাবরই ভালো লাগে। কারণ, চেনা জগৎটাই লেখকের লেখায় উঠে আসে ভিন্ন রূপে, ভিন্ন আঙ্গিকে। 'কোলাহলে' ও তার ব্যতিক্রম নয় বলেই মনে হলো৷ লেখকের লেখায় জীবনের নানান চিত্র উঠে এসেছে জীবন্ত হয়ে৷ অতিরিক্ত নাটকীয় নয়। মনে হলো যেখানে যতটুকু দরকার সেখানে ঠিক ততটুকুই চিত্রিত করা হয়েছে। চরিত্রের আধিক্য যে একটুও বিরক্ত করেনি তা বলবো না। শুরুর দিকে অনেকটা কষ্টই হচ্ছিল বুঝতে। চরিত্রের সংখ্যা আরো কম হলে হয়তো আরো ভালোভাবে উপভোগ করা যেত। তবে চরিত্রগুলো অল্প কথায় দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা লেখকের দক্ষতা। নয়তো এত জীবন্তভাবে চোখের সামনে সমাজের টুকরো টুকরো চিত্র বোধহয় তুলে ধরা সম্ভব ছিল না। সব চরিত্র হয়তো সমানভাবে দাগ কেটে যাবে না। তবে কিছু কিছু চরিত্র বারবার বিষন্ন করে তুলবে, ভাবাবে আসলে আমরা কি চাই এই জীবনে!
সমস্ত চরিত্র নিয়ে আলাদা করে লেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। এদের মাধ্যমেই তো উঠে এসেছে সমাজের একাংশ চিত্র। তবুও সেসব নিয়ে লিখবো না। কারণ, সেসব চরিত্রদের নিয়ে আলাদা আলাদা মনোভাব তৈরি হবে সকলের মনে। সব চরিত্র সমানভাবে স্থায়ীত্ব না পেলেও প্রতিটি চরিত্রই হয়তো কারো না কারো সাথে মিলে যাবে। নিজের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাথে চরিত্রদের প্রতি ভালো লাগা, মন্দ লাগা ভিন্ন হবে নিঃসন্দেহে।
'কোলাহলে' লেখকের লেখা 'চায়ের কাপে সাঁতার' বইয়ের সাথে তুলনা করলে হয়তো কিছুটা ম্লান মনে হবে। তবে 'চায়ের কাপে সাঁতার'-কে সরিয়ে রাখলে মোটেও মন্দ লাগবে না। চায়ের কাপে সাঁতারের মতো কোলাহলেও বেশ কিছু প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে শেষ হয়েছে বলেই মনে হলো। তবে পাঠকের নিজস্ব ভাবনার জগৎকে নষ্ট না করার জন্য এটা বোধহয় প্রয়োজনীয়ই ছিল। সব রহস্য, সব ভাবনাকে মুক্ত করে দিলে সেই বইয়ের ভালো লাগার রেশ মুহুর্তেই বিলীন হয়ে যাবে।
কাজেই সেসব প্রশ্ন মনের গহীনে উঁকি দিবে বারবার। নিজের মতো একটা সমাপ্তি টানতে সেইসব অসমাপ্ত গল্পকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে। কামরুলের গন্তব্য সত্যিকার অর্থে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? কিংবা রোকেয়ার জীবন কোনদিকে মোড় নিবে? স্বপ্নে বিভোর মাহমুদার জীবনের গল্প লেখার সমাপ্তি কি হবে? নগেন চন্দ্র শীল কি আবার হাতে নিবে অসমাপ্ত কাজ? আজমতের স্ত্রী কিসের ছায়া দেখে, কাদের ছায়া? মনিরই বা কিসের এত ভয়? আলাল শেখ, হালিমারই বা কি পরিনতি হবে?
এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে হবে নিজের মতো করে। এই কাজটিই হয়তো ভালো লাগার মাত্রা আরেকটু বাড়িয়ে তুলবে।
আমাদের কোন কারণ ছাড়াই বিষন্ন হতে ভালো লাগে কখনো কখনো। কিছুক্ষণ মন খারাপ করে উদাস হয়ে বসে থাকা একটু অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয় বৈকি। 'কোলাহলে' ও এমন অনুভূতিরই জন্ম দেয়। অন্তত আামর কাছে তাই মনে হয়েছে। হয়তো কোলাহলে মনে থেকে যাবে দীর্ঘদিন। কারণ মানুষ বিষন্নতা মনে রাখে দীর্ঘ সময় ধরে। সময়ের বাঁকে বাঁকে জীবনের নানান গল্প পড়তে পড়তে বইয়ের মাঝেই হারিয়ে যাওয়ার আনন্দ ভিন্ন রকম।
বই থেকে একটু অংশ না লিখেই পারছি না৷ এটুকু পড়ে খানিক থমকে ছিলাম বোধহয়।
"ওই পাখিটারে দেখ কামরুল, কী বিশাল তার গা। আমি খুব ছোটবেলা থেকে ওরে এই মাগরিবের অক্তে পুব থেকে পশ্চিমে উইড়ে যাতি দেখি জানিস? ও চিরদিন একলা, কখনো কোনো সঙ্গী ছিল না ওর।"
বহু দূরে উড়ে যাবার পরেও পাখিটির বিপুলতা কামরুলকে বিস্ময়ে অভিভূত করেছিল সেদিন। অবাক কণ্ঠে বলেছিল, "মানুষের চেয়েও বড়ো পাখি তাহলি দুনিয়াতে আছে কাকা? "
March 22, 2026
জলার মাঠে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো এক সজনে গাছ। মধ্য দুপুরে তারই মগডালে যখন দেখা মেলে স্কন্ধ কাটা লাশ, তখন কার-ই বা হুশ থাকে! গ্রামের মুদি দোকানদার আজমত আর তার ছেলে প্রথম দেখে লাশটি। তারপরই বদলে যায় সবকিছু। এক রহস্যের আবর্তে ঘুরপাক খায় খোলনগর। কোলাহলে পূর্ণ এই সময়টা তখন মানুষের জীবনকে টেনে সামনে নিয়ে আসে।
একটি উপন্যাসের শুরুটা যদি খুন দিয়ে হয়, তবে বইয়ের রহস্য যেন আরও ঘনীভূত হতে থাকে। তবে এই রহস্যের ফাঁকে মাঝে মাঝেই উঁকি দিতে থাকে, জীবনের গল্প। কামরুল, রোকেয়া বা রাবেয়াদের জীবন বা অতীত এখানে গুরুত্ব পেতে থাকে ধীরে। আর আমরাও প্রবেশ করি কিছু স্বাভাবিক, গ্রাম্য গল্পে। যেখানে প্রেম, ভালোবাসা থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু স্নেহ, মায়ার কমতি নেই।
গল্পটা কামরুল নামের একজনেরও। প্রচণ্ড জেদি তার বাবা একবার বাড়ি ছাড়া হয়। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী তখন পোয়াতি। তাকে নিয়েই নৌকায় নৌকায় ঘুরে বেড়ায়। কেননা সেই সময়টায় বর্ষা এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় চরাচর। কিন্তু জীবনের সুখ আর স্থায়ী হয় না। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যখন স্ত্রী মারা যায়, তখন দিশেহারা নেয়ামত নিজেও কোথাও যেন হারিয়ে যায়! তার আগে একটা কাজ করে যায়। সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানকে ভাইয়ের বাড়ির উঠানে রেখে যায়। ততদিনে পানি নেমে গেছে।
চাচার বাসাতে বোন রাবেয়ার ছত্রছায়ায় বড় হতে থাকে কামরুল। কিন্তু স্বভাবটা ঠিক বাবার মতন। উদাসীন ছেলেটা মাঝে মাঝেই কোথাও হারিয়ে যায়। কাজেকর্মে মন নেই। ঠিক করেছে দক্ষিণের পথে যাত্রা করবে। ঠিক কবে ফিরে আসবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ওদিকে এতিম ছেলের এই আবদারে দিশেহারা বোধ করে চাচা, চাচাতো বোনেরা। কিন্তু কামরুল নাছোড়বান্দা। সে যাবেই। তবে সময় কখন সমাগত হবে, তা কেবল সময়ই বলে দেবে।
খুনের ঘটনা দিয়ে যে গল্পের শুরু, সেখানে তদন্তের ছায়া না থাকলে পানসে মনে হতে পারে। ফলে এখানে একজন পুলিশ অফিসার আছে। নাম জহুর আলী। সৎ পুলিশ অফিসারের সামনে অনেক বাধা থাকে। এই বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া সহজবোধ্য কিছু না। তবুও তিনি চেষ্টা চালাচ্ছেন জটিল এ রহস্য সমাধানের। কিন্তু যার মাথা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তার পরিচয় খুঁজে বের করা কঠিন। ওদিকে লাশের দুই হাতের তালু পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে যাতে হাতের ছাপ পাওয়া না যায়। যে এই কাণ্ড ঘটিয়েছে সে খুবই চালাক।
তারপরও যখন এই রহস্যের গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়, তখন এমন অনেক কিছু সামনে আসে যা হয়তো গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। গ্রামীণ এই পরিবেশে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব খুব স্বাভাবিক বিষয়। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হওয়ার চেষ্টায় এহেন কোনো কাজ নেই যে কাজ করতে দ্বিধা করে না। তাই জহুর আলীর সন্দেহ জাগে, এই হত্যাকাণ্ড কি রাজনৈতিক কারণে সংগঠিত? জহুর আলী জানে না সে সাপের গর্তে পা দিয়েছে। সর্প দংশন করতে চাইলে সামনে ঘোর বিপদ।
আপনি যদি লেখকের “চায়ের কাপে সাঁতার” বইটা আগে পড়ে থাকেন, তাহলে এই বইটা কিছুটা হলেও ফিকে মনে হতে পারে। আর যদি প্রথমবার লেখকের লেখার স্বাদ পেয়ে থাকেন, কিংবা আগের বইয়ের কথা মাথায় থেকে দূর করে দিতে পারেন, তাহলে বইটা দারুণ এক সামাজিক উপন্যাস হিসেবে উপভোগ্য মনে হবে। খুন থাকলেই কোনো বই রহস্যপন্যাস হয় না। কারণ অপরাধ এই সমাজেরই অংশ। লেখক এই বইটি লিখেছেন আরও দশ বছর আগে। পরিমার্জন করে নতুন করে প্রকাশ করেছেন। আমার মনে হয়েছে লেখকের লেখায় পরিমিতিবোধ প্রবল।
কারণ এই বইতে অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশ লেখক ঘটিয়েছেন। বইয়ের কলেবরের চেয়ে চরিত্র বেশি হওয়ায় মাঝে মধ্যে খেই হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থা হতে পারে। এক্ষেত্রে লেখকের তারিফ করতেই হয়। তিনি স্বল্প পরিসরে চরিত্রগুলোকে ভালো মতোই সাজিয়েছেন। পরিমতিভাবে যতটুক প্রয়োজন ঠিক ততখানি ব্যাখার আশ্রয় নিয়েছেন। কিছু চরিত্রকে অবশ্য আরেকটু বিস্তারিতভাবে তুলে আনতে পারলে পূর্ণতা পেত। তারপরও চরিত্রগুলোর নিজস্বতা স্বল্প অবস্থাতে বেশ উজ্জ্বল ছিল।
গ্রামীণ আবহ, খুনের রহস্য, গ্রামের মানুষের জীবনের গল্পের পাশাপাশি এই উপন্যাসটি মোড় নেয় রাজনৈতিক সংঘাতে। একটি গ্রামে দুই পক্ষ, রাজনৈতিক লড়াই, ক্ষমতা দখলের মঞ্চ যখন উপস্থাপিত হয়; তখন সংঘাতের একটা রূপরেখা তৈরি হয়। এর মধ্যে দিয়েই গল্পটা বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এর ভেতরেও গল্প থাকে। জটিল কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে যায়নি। বরং গ্রামের ক্ষমতাধর মানুষের ক্ষমতার প্রদর্শনী, যেখানে নজর যায় নিজের করে পাওয়ার চেষ্টা তাকে সর্বগ্রাসী করে তোলে। আর এতেই বদলে যায় সবকিছু।
আপনি যখন জীবনবোধের কোনো গল্প পড়বেন, তখন এর সমাপ্তি আপনাকে ভাবাবে। জীবনের গল্পের তো সমাপ্তি হয় না। এক যাত্রা শেষে আরেক যাত্রার শুরু হয়। কোলাহলপূর্ণ এই জীবন তাই নতুন দিকে মোড় নেয়। এনামুল রেজার “কোলাহলে” বইতেও তাই সমাপ্তিগুলো খুঁজে পাওয়া যায় না। একটা গল্পের শেষ হয় ঠিক। রেখে যায় অনেক প্রশ্ন। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়, কিছু উত্তরের ধারণা নেওয়া হয়। বাকিটা থেকে যায় নতুন কোনো যাত্রায় শেষ হবে বলে।
এই যেমন এখানে জয়নালের কী হলো? কামরুল কি শেষ পর্যন্ত তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারল? অথবা মাহমুদা কি তার উপন্যাস শেষ করতে পারল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ভেবে নেওয়া যায়। অথবা সেই ছায়াগুলো আসলে কার? আজমতের স্ত্রী কাদের ছায়া দেখে? তাদের ছেলে কীসের ভয়ে একটু একটু করে নিঃশেষ হচ্ছে? এই জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া, আদিম ভয়গুলো মানুষের মনের মধ্যে একটু একটু করে বড় হতে থাকে। আর নিঃশেষ হতে থাকে জীবনীশক্তি। কিন্তু জীবন হারিয়ে ফেললে যে লড়াইয়ের কোনো উপকরণ বাকি থাকে না।
যেহেতু গল্পের মধ্যে রহস্য ছিল। এর পরিণতি, কারণ বা প্রক্রিয়া যেভাবে লেখক উত্থাপন করেছেন; ভালো লেগেছে। একটা ঘটনা, ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে, গ্রাম্য রাজনীতির শিকার হয়ে কেউ না কেউ জীবনের অন্তিমে পৌঁছে যায়। কে, কেন, কীভাবে — তা গল্পের মধ্য দিয়েই উঠে আসে। তখন জটিল সব গল্প সহজবোধ্য মনে হয়। আর ক্ষমতার শক্তিকে থামাতে গিয়ে পরিণতি বরণ করতে হয় সততাকেও।
গল্পের মধ্য দিয়ে সময়কে লেখক ধরেছেন। কখনও বর্তমান, কখনও অতীত। বর্তমান নিয়ে মানুষের থাকতে হয়। কিন্তু অতীত মানুষের অস্তিত্বের জানান দেয়। এই যেমন কামরুলের বাবার অতীত যেন তাকেও ডাকে। নাহলে কেন বাবার মতো উড়নচণ্ডী হবে? এই গল্পে নীরব এক প্রেমের উপাখ্যানও আছে। লেখকের তারিফ করতে হয় এখানে। প্রেমকে স্বচ্ছতার সাথে উপস্থাপন করেছেন। কোনো কোনো ভালোবাসার আসলে পরিণতি থাকে না। নীরব ভালোবাসা হারায় কিংবা নীরবে থেকে যায় আজন্মকাল।
“কোলাহলে” উপন্যাসের আরও একটি দারুণ উপাদান আছে, প্রকৃতি। প্রকৃতি ও জীবন যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। প্রাকৃতিক এই কোলাহলে একবার ডুবে যেতে পারলে জীবনটা অন্যরকম হয়ে ওঠে। লেখকের প্রকৃতির বর্ণনা মুগ্ধ করার মতো। বন্যার তীব্রতায় ভেসে যাওয়া প্রকৃতি ভীতি ছড়ানোর পাশাপাশি নিজের অবস্থান পোক্ত করেছে। জলার মাঠ কিংবা মাথার উপর চাঁদনী রাতের বর্ণনায় একবার ভেসে যাওয়া যায়। লেখক প্রকৃতি ও জীবনকে একসাথে এঁকেছেন। আর এতেই গল্পের নতুন রূপ সামনে এসেছে। প্রকৃতি বিনা যেমন জীবনের গল্প লেখা যায় না, তেমন করে জীবন জুড়ে প্রকৃতির এক প্রচ্ছন্ন অবদান আছে। আর দু’য়ের মিশেলে সাধারণ এক গল্পও অমরত্বের সুধা পান করে এগিয়ে যায়।
“কোলাহলে” বইটি প্রকাশ করেছে জ্ঞানকোষ প্রকাশনী। বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি দারুণ। কিছু ছাপার ভুল ছিল যদিও। আরেকটু সম্পাদনায় জোর দিলে ভুলগুলো চোখে পড়ত না। তবে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে বইটির প্রচ্ছদ। রংচঙ বা জটিল প্রচ্ছদের ভিড়ে এই সাদামাটা প্রচ্ছদ যেন গল্পকে ধারণ করছে।
পরিশেষে, গ্রামীণ পটভূমিতে জীবনের গল্প বলার মধ্যে এক অন্যরকম নিবেদন আছে। কেন যেন পড়তে ভালো লাগে। তা যতই সাদামাটা হোক না কেন। আর এখানে লেখকেরও দায়বদ্ধতা থেকে। গ্রামীণ প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তোলা, সেখানকার মানুষের চালচলন ব্যবহারগুলোকে বাস্তবসম্মত উপায়ে পাঠকের সামনে নিয়ে আসা, গ্রামীণ কূটনীতি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়। সম্পর্ক, বন্ধ, প্রেম যেন তারই প্রকৃত রূপ। “কোলাহলে” উপন্যাসে সবগুলো বিষয়কে লেখক নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। সাথে রহস্যজনক কিছু ঘটনার সন্নিবেশ। হালকা জাদুবাস্তবতা, আদিম ভয়ের সমন্বয়। নাহ, “কোলাহলে” খুব একটা বোরিং উপন্যাস না। বর্তমান সময়ে যেখানে যথাযথ সামাজিক উপন্যাসের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এই বইটা উপভোগ করার মতোই।
▪️বই : কোলাহলে
▪️লেখক : এনামুল রেজা
▪️প্রকাশনী : জ্ঞানকোষ প্রকাশনী
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.২৫/৫
একটি উপন্যাসের শুরুটা যদি খুন দিয়ে হয়, তবে বইয়ের রহস্য যেন আরও ঘনীভূত হতে থাকে। তবে এই রহস্যের ফাঁকে মাঝে মাঝেই উঁকি দিতে থাকে, জীবনের গল্প। কামরুল, রোকেয়া বা রাবেয়াদের জীবন বা অতীত এখানে গুরুত্ব পেতে থাকে ধীরে। আর আমরাও প্রবেশ করি কিছু স্বাভাবিক, গ্রাম্য গল্পে। যেখানে প্রেম, ভালোবাসা থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু স্নেহ, মায়ার কমতি নেই।
গল্পটা কামরুল নামের একজনেরও। প্রচণ্ড জেদি তার বাবা একবার বাড়ি ছাড়া হয়। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী তখন পোয়াতি। তাকে নিয়েই নৌকায় নৌকায় ঘুরে বেড়ায়। কেননা সেই সময়টায় বর্ষা এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় চরাচর। কিন্তু জীবনের সুখ আর স্থায়ী হয় না। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যখন স্ত্রী মারা যায়, তখন দিশেহারা নেয়ামত নিজেও কোথাও যেন হারিয়ে যায়! তার আগে একটা কাজ করে যায়। সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তানকে ভাইয়ের বাড়ির উঠানে রেখে যায়। ততদিনে পানি নেমে গেছে।
চাচার বাসাতে বোন রাবেয়ার ছত্রছায়ায় বড় হতে থাকে কামরুল। কিন্তু স্বভাবটা ঠিক বাবার মতন। উদাসীন ছেলেটা মাঝে মাঝেই কোথাও হারিয়ে যায়। কাজেকর্মে মন নেই। ঠিক করেছে দক্ষিণের পথে যাত্রা করবে। ঠিক কবে ফিরে আসবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ওদিকে এতিম ছেলের এই আবদারে দিশেহারা বোধ করে চাচা, চাচাতো বোনেরা। কিন্তু কামরুল নাছোড়বান্দা। সে যাবেই। তবে সময় কখন সমাগত হবে, তা কেবল সময়ই বলে দেবে।
খুনের ঘটনা দিয়ে যে গল্পের শুরু, সেখানে তদন্তের ছায়া না থাকলে পানসে মনে হতে পারে। ফলে এখানে একজন পুলিশ অফিসার আছে। নাম জহুর আলী। সৎ পুলিশ অফিসারের সামনে অনেক বাধা থাকে। এই বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া সহজবোধ্য কিছু না। তবুও তিনি চেষ্টা চালাচ্ছেন জটিল এ রহস্য সমাধানের। কিন্তু যার মাথা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তার পরিচয় খুঁজে বের করা কঠিন। ওদিকে লাশের দুই হাতের তালু পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে যাতে হাতের ছাপ পাওয়া না যায়। যে এই কাণ্ড ঘটিয়েছে সে খুবই চালাক।
তারপরও যখন এই রহস্যের গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়, তখন এমন অনেক কিছু সামনে আসে যা হয়তো গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। গ্রামীণ এই পরিবেশে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব খুব স্বাভাবিক বিষয়। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হওয়ার চেষ্টায় এহেন কোনো কাজ নেই যে কাজ করতে দ্বিধা করে না। তাই জহুর আলীর সন্দেহ জাগে, এই হত্যাকাণ্ড কি রাজনৈতিক কারণে সংগঠিত? জহুর আলী জানে না সে সাপের গর্তে পা দিয়েছে। সর্প দংশন করতে চাইলে সামনে ঘোর বিপদ।
আপনি যদি লেখকের “চায়ের কাপে সাঁতার” বইটা আগে পড়ে থাকেন, তাহলে এই বইটা কিছুটা হলেও ফিকে মনে হতে পারে। আর যদি প্রথমবার লেখকের লেখার স্বাদ পেয়ে থাকেন, কিংবা আগের বইয়ের কথা মাথায় থেকে দূর করে দিতে পারেন, তাহলে বইটা দারুণ এক সামাজিক উপন্যাস হিসেবে উপভোগ্য মনে হবে। খুন থাকলেই কোনো বই রহস্যপন্যাস হয় না। কারণ অপরাধ এই সমাজেরই অংশ। লেখক এই বইটি লিখেছেন আরও দশ বছর আগে। পরিমার্জন করে নতুন করে প্রকাশ করেছেন। আমার মনে হয়েছে লেখকের লেখায় পরিমিতিবোধ প্রবল।
কারণ এই বইতে অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশ লেখক ঘটিয়েছেন। বইয়ের কলেবরের চেয়ে চরিত্র বেশি হওয়ায় মাঝে মধ্যে খেই হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থা হতে পারে। এক্ষেত্রে লেখকের তারিফ করতেই হয়। তিনি স্বল্প পরিসরে চরিত্রগুলোকে ভালো মতোই সাজিয়েছেন। পরিমতিভাবে যতটুক প্রয়োজন ঠিক ততখানি ব্যাখার আশ্রয় নিয়েছেন। কিছু চরিত্রকে অবশ্য আরেকটু বিস্তারিতভাবে তুলে আনতে পারলে পূর্ণতা পেত। তারপরও চরিত্রগুলোর নিজস্বতা স্বল্প অবস্থাতে বেশ উজ্জ্বল ছিল।
গ্রামীণ আবহ, খুনের রহস্য, গ্রামের মানুষের জীবনের গল্পের পাশাপাশি এই উপন্যাসটি মোড় নেয় রাজনৈতিক সংঘাতে। একটি গ্রামে দুই পক্ষ, রাজনৈতিক লড়াই, ক্ষমতা দখলের মঞ্চ যখন উপস্থাপিত হয়; তখন সংঘাতের একটা রূপরেখা তৈরি হয়। এর মধ্যে দিয়েই গল্পটা বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এর ভেতরেও গল্প থাকে। জটিল কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে যায়নি। বরং গ্রামের ক্ষমতাধর মানুষের ক্ষমতার প্রদর্শনী, যেখানে নজর যায় নিজের করে পাওয়ার চেষ্টা তাকে সর্বগ্রাসী করে তোলে। আর এতেই বদলে যায় সবকিছু।
আপনি যখন জীবনবোধের কোনো গল্প পড়বেন, তখন এর সমাপ্তি আপনাকে ভাবাবে। জীবনের গল্পের তো সমাপ্তি হয় না। এক যাত্রা শেষে আরেক যাত্রার শুরু হয়। কোলাহলপূর্ণ এই জীবন তাই নতুন দিকে মোড় নেয়। এনামুল রেজার “কোলাহলে” বইতেও তাই সমাপ্তিগুলো খুঁজে পাওয়া যায় না। একটা গল্পের শেষ হয় ঠিক। রেখে যায় অনেক প্রশ্ন। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়, কিছু উত্তরের ধারণা নেওয়া হয়। বাকিটা থেকে যায় নতুন কোনো যাত্রায় শেষ হবে বলে।
এই যেমন এখানে জয়নালের কী হলো? কামরুল কি শেষ পর্যন্ত তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারল? অথবা মাহমুদা কি তার উপন্যাস শেষ করতে পারল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ভেবে নেওয়া যায়। অথবা সেই ছায়াগুলো আসলে কার? আজমতের স্ত্রী কাদের ছায়া দেখে? তাদের ছেলে কীসের ভয়ে একটু একটু করে নিঃশেষ হচ্ছে? এই জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া, আদিম ভয়গুলো মানুষের মনের মধ্যে একটু একটু করে বড় হতে থাকে। আর নিঃশেষ হতে থাকে জীবনীশক্তি। কিন্তু জীবন হারিয়ে ফেললে যে লড়াইয়ের কোনো উপকরণ বাকি থাকে না।
যেহেতু গল্পের মধ্যে রহস্য ছিল। এর পরিণতি, কারণ বা প্রক্রিয়া যেভাবে লেখক উত্থাপন করেছেন; ভালো লেগেছে। একটা ঘটনা, ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে, গ্রাম্য রাজনীতির শিকার হয়ে কেউ না কেউ জীবনের অন্তিমে পৌঁছে যায়। কে, কেন, কীভাবে — তা গল্পের মধ্য দিয়েই উঠে আসে। তখন জটিল সব গল্প সহজবোধ্য মনে হয়। আর ক্ষমতার শক্তিকে থামাতে গিয়ে পরিণতি বরণ করতে হয় সততাকেও।
গল্পের মধ্য দিয়ে সময়কে লেখক ধরেছেন। কখনও বর্তমান, কখনও অতীত। বর্তমান নিয়ে মানুষের থাকতে হয়। কিন্তু অতীত মানুষের অস্তিত্বের জানান দেয়। এই যেমন কামরুলের বাবার অতীত যেন তাকেও ডাকে। নাহলে কেন বাবার মতো উড়নচণ্ডী হবে? এই গল্পে নীরব এক প্রেমের উপাখ্যানও আছে। লেখকের তারিফ করতে হয় এখানে। প্রেমকে স্বচ্ছতার সাথে উপস্থাপন করেছেন। কোনো কোনো ভালোবাসার আসলে পরিণতি থাকে না। নীরব ভালোবাসা হারায় কিংবা নীরবে থেকে যায় আজন্মকাল।
“কোলাহলে” উপন্যাসের আরও একটি দারুণ উপাদান আছে, প্রকৃতি। প্রকৃতি ও জীবন যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। প্রাকৃতিক এই কোলাহলে একবার ডুবে যেতে পারলে জীবনটা অন্যরকম হয়ে ওঠে। লেখকের প্রকৃতির বর্ণনা মুগ্ধ করার মতো। বন্যার তীব্রতায় ভেসে যাওয়া প্রকৃতি ভীতি ছড়ানোর পাশাপাশি নিজের অবস্থান পোক্ত করেছে। জলার মাঠ কিংবা মাথার উপর চাঁদনী রাতের বর্ণনায় একবার ভেসে যাওয়া যায়। লেখক প্রকৃতি ও জীবনকে একসাথে এঁকেছেন। আর এতেই গল্পের নতুন রূপ সামনে এসেছে। প্রকৃতি বিনা যেমন জীবনের গল্প লেখা যায় না, তেমন করে জীবন জুড়ে প্রকৃতির এক প্রচ্ছন্ন অবদান আছে। আর দু’য়ের মিশেলে সাধারণ এক গল্পও অমরত্বের সুধা পান করে এগিয়ে যায়।
“কোলাহলে” বইটি প্রকাশ করেছে জ্ঞানকোষ প্রকাশনী। বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি দারুণ। কিছু ছাপার ভুল ছিল যদিও। আরেকটু সম্পাদনায় জোর দিলে ভুলগুলো চোখে পড়ত না। তবে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে বইটির প্রচ্ছদ। রংচঙ বা জটিল প্রচ্ছদের ভিড়ে এই সাদামাটা প্রচ্ছদ যেন গল্পকে ধারণ করছে।
পরিশেষে, গ্রামীণ পটভূমিতে জীবনের গল্প বলার মধ্যে এক অন্যরকম নিবেদন আছে। কেন যেন পড়তে ভালো লাগে। তা যতই সাদামাটা হোক না কেন। আর এখানে লেখকেরও দায়বদ্ধতা থেকে। গ্রামীণ প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তোলা, সেখানকার মানুষের চালচলন ব্যবহারগুলোকে বাস্তবসম্মত উপায়ে পাঠকের সামনে নিয়ে আসা, গ্রামীণ কূটনীতি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়। সম্পর্ক, বন্ধ, প্রেম যেন তারই প্রকৃত রূপ। “কোলাহলে” উপন্যাসে সবগুলো বিষয়কে লেখক নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। সাথে রহস্যজনক কিছু ঘটনার সন্নিবেশ। হালকা জাদুবাস্তবতা, আদিম ভয়ের সমন্বয়। নাহ, “কোলাহলে” খুব একটা বোরিং উপন্যাস না। বর্তমান সময়ে যেখানে যথাযথ সামাজিক উপন্যাসের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এই বইটা উপভোগ করার মতোই।
▪️বই : কোলাহলে
▪️লেখক : এনামুল রেজা
▪️প্রকাশনী : জ্ঞানকোষ প্রকাশনী
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.২৫/৫
March 18, 2017
বইটা ভালো ছিল। তবে দুই কারণে মন ভরেনি। প্রথমত ছোট বইতে চরিত্রের আধিক্য। বলতে গেলে কোন চরিত্রই আলাদাভাবে দাগ কাটে না এতে। আর দুই, ময়মনসিংহের ভাষা। প্রথম ৩০ পাতা পড়তে খুব কষ্ট হচ্ছিল। একবার পরিচিত হবার পর আর সমস্যা হয় নাই।
গুরুত্বপূর্ণ না হলেও একটা নাম বিভ্রাট আছে মাঝে। দুই একটা বানান ভুলও দেখলাম। তবে সব মিলিয়ে বেশ ভালো একটা বই।
গুরুত্বপূর্ণ না হলেও একটা নাম বিভ্রাট আছে মাঝে। দুই একটা বানান ভুলও দেখলাম। তবে সব মিলিয়ে বেশ ভালো একটা বই।
March 30, 2026
বই: কোলাহলে
লেখক: এনামুল রেজা
প্রকাশনী: জ্ঞানকোষ প্রকাশনী
মূল্য: ৪০০ টাকা।
প্রাণবন্ত ও নাটকীয় - এনামুল রেজার "কোলাহলে" উপন্যাসকে সরলভাবে বলতে গেলে ওই দুই শব্দের সহবস্থান আসবে। সাবলীলতার সাথে এগিয়ে চলা গল্পে পাঠক একবার যখন উপন্যাসের অন্দরমহলে উঁকি দিবেন, খুব স্বাভাবিকভাবেই ধীরে ধীরে তিনি চষে বেড়াবেন বাকি কামরাগুলোও। পাঠক বেড়াতে বেড়াতে এমন কিছু ঘটনার মুখোমুখি হবেন যা কখনও হয়তো রহস্যে ঘেরা; তবে খুব অস্বস্তিকর নয়। আমাদের খুব অচেনাও না, তবে চেনা বলেই সেটা মনোটোনাস হয়ে ওঠেনি।
থ্রিল আছে, কিন্তু থ্রিলার না।
এনামুল রেজার ন্যারেশন খুবই ক্র্রিষ্টাল-ক্লিয়ার। পাঠকের ইমাজিনেশন আর লেখকের শব্দে ফুঁটিয়ে তোলা দৃশ্যপট - ওয়াই-ফাই এর অটোমেটিক কানেক্টিভিটির মতো মুহূর্তেই কানেক্ট হয়ে যায়। যার দরুন, উপন্যাসে অঙ্কিত ইলাষ্ট্রেশনগুলো আমার নিজের কাছে কিছু পৃষ্ঠার অপচয় বা বৃথা সন্নিবেশ ছাড়া কিছুই না। দারুন ন্যারেশনের কারনেই আমার মতো উপন্যাসের ব্যপ্তি অথবা আকার আরও বৃহৎ হতেই পারতো। কাহিনি প্রলম্বিত না করেই। বেশ অনেক জায়গায় কুইক দৃশ্যপট চেঞ্জ থেকে বরং আরও স্লোলি এগিয়ে গল্পটাকে আরও জমিয়ে তোলা যেত। আরব্য রজনীর শাহরাজাদ যেমন পারস্যের রাজাকে রাতের পর রাত গল্প বলে গিয়েছেন, এনামুল রেজা সেভাবে পৃষ্টার পর পৃষ্ঠা গল্প বলে গেলে পাঠকের বিরক্তি অনাকাঙ্খিত অতিথির মতো কড়া নাড়তো না। অল ক্রেডিট গোস টু লেখকের কলমের যাদু। একবার সেন্ট্রাল কোরে অনুপ্রবেশ - তো সেটা থেকে তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায় বহুদূর।
এনামুল রেজার "কোলাহলে" উপন্যাসের চরিত্র অনেক। গল্পের প্রয়োজনে কোন কোন চরিত্র ভুস করে ভেসে উঠতেছে পানির উপরে, আবার হারিয়ে যাচ্ছে অতল গহ্ববরে। বিশেষ করে নারী চরিত্রগুলো। তবে নিঃসন্দেহে উপন্যাসের এত চরিত্রের মধ্যে সবথেকে সবর চরিত্র বোধহয় "শূন্যস্থান" - যা পাঠককে মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তবে এটাও বলে রাখা ভালো - সেটা গভীর না, মৃদু। উপন্যাসের শুরুতেই সজনে গাছে ঝুলে থাকা রহস্যময় দেহের কাঁধের শূন্যস্থান থেকে শুরু করে গল্পের চরিত্রগুলোর শূন্যস্থান - ফলস্বরূপ, "emptiness বা শূন্যতা "কোলাহলের" অন্যতম শক্তিশালী চরিত্র।
উপন্যাসে প্রেম আছে, কাম আছে, রহস্য আছে, রাজনীতি আছে। সম্পর্কের টনাপোড়েন আছে। তবে "কোলাহলে"-এর সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিক বোধহয় লেখকের গল্প বলার কৌশলে। নৈতিক উপদেশ দেয়ার পথে না হেঁটে তিনি একধরনের স্যোশাল এক্সপেরিমেন্টশনের দিকে কলম চালিয়েছেন। ফলতঃ মন্থর সময়ের সাথে জীবনের ছন্দপতন প্রমিনেন্ট হয়ে উঠেছে "মানবিক মূল্যবোধ"-এর ক্লিশে কৌশল আঁকার থেকে।
প্রেম, কাম থেকে ভিলেজ পলিটিক্স - সব জায়গায় তাই স্পর্শ করে লেখকের কলম।
উপন্যাসের চরিত্রগুলো এমনভাবে গড়া, পাঠকের না কারও প্রতি তীব্র ঘৃনা হয়, না কোমল সহানুভূতি। কম বেশি সকল চরিত্রই ভাঙা-মানচিত্রের মতো - সামাজিক নিপীড়নব্যবস্থার বাই-প্রোডাক্ট হয়েই উপস্থিত আমাদের সামনে। যেমন হালিমা আর আলাল শেখের অবৈধ সম্পর্ক আমরা পড়ে যাই। কৌতুহুলী হই স্বভাবগত কারনে। কোন প্রকারের বাড়তি সহানুভূতি বা ঘৃনা কাজ করে না। ইমাম সাহেব কে যেমন অন্য গ্রাম্য ইমামের তুলনায় বেশ স্বাভাবিকতায় পাই, ঠিক পর মুহূর্তেই তিনিই হালিমার ঘটনায় জুম্মার খুতবায় হয়ে ওঠেন মোরালি গ্রে। আবার লম্বা টাইম তার ইমামতির জায়গাটা বজায় রাখার সংকল্পেও মোরালি গ্রে হয়ে উঠতে দেখি। এই জায়গাগুলোয় লেখক চরিত্রগুলো একরৈখিক না রেখে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।
রোকেয়া আর কামরুলের অংশটুক বলতেই হয়। এনামুল রেজা এই দুই চরিত্রের প্রেমটুকু প্রকাশে বাড়তি শব্দ বা ন্যারেশন সৃজন করেননি, বরং সেমিওটিক ফিল্ডের স্বরূপ - কামরুল ও রোকেয় এক অন্যের উপর ছায়া ফেলে আলাদা ভাষা হয়ে উঠেছে। কোন আলিঙ্গন নয়, কোন বাড়তি নৈকট্য নয়, নিজেদের ধরার সেরূপ চেষ্টা অনুপস্থিত - বরং এহেন দূরত্বই "কোলাহলে" উপন্যাসের কবিতা যেমন হয়ে উঠেছে, তেমনি হয়ে উঠেছে ট্রাজেডি। হয়তো পাঠকের কিছুটা বিষণ্ণতার জায়গা এখানেই।
Resolution না থাকাটাও এই উপন্যাসের কিছু ঘটনায় পাঠকের অস্বস্তির উদ্রেক হলেও, সেটাই উপন্যাসের স্ট্রং দিক। কামরুলে পরিনতি, রোকয়োর কাঁজল, নগেনের শেষ আকুতি অথবা নেয়ামতের খোঁজ .. এমন অনেক বেশ কিছু resolution না থাকাটা বরং বেশ আকর্ষণীয়। পাঠকের আশা থাকতেই পারে - বাস্তবে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, বা গুটি কয়েক পৃষ্ঠায় উত্তর হয়ে ধরা দেবে না।
এনামুল রেজার "কোলাহলে" তার নির্মেদ ন্যারেশন, সুন্দর চিত্রনির্মাণ এবং অনেকগুলো সাবলীল চরিত্রের সন্নিবেশে উপভোগ্য। তবে শুরুতেই যে আভাস দিয়েছি, উপন্যাসের ব্যাপ্তি আরও একটু বড় হলে চরিত্রগুলো আরও বেশি রক্তমাংসের হয়ে উঠতো। হয়তো আমাদের আপনও হয়ে উঠতো। textbook character হয়ে থাকতো না।
বইয়ে বেশ কিছু টাইপো আছে। যেগুলো গল্পের কাঠামোতে হয়তে কোন ইফেক্ট ফেলবে না। তবে একটু চোখ রাখা প্রয়োজন। নেয়ামতের স্ত্রী-র মৃত্যু এবং তার বয়স খুব সিগনিফিকেন্ট ব্যাপার ছিল উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলোর অবস্থা এবং ওই গ্রামের সামাজিক অবস্থা নিরূপনে। সেখানে "সপ্তদশীনি" বানান ভুল চোখে পড়ার মতো। এই শব্দটা খুব সিগনিফিকেন্ট ছিল। সফুর শেখে কন্যা এর জায়গায় "নেয়ামতের কন্যা" হয়ে গেছে এক জায়গায়। একটা জায়গায় কোন প্যারা ব্রেক নেই (পৃ:৩০ শুরুতে), তাই হুট করে পাঠকালে হোঁচট খেতে হয়। যাই হোক - এগুলো পরবর্তী এডিশনে শুধরে নেয়া সম্ভব। পরবর্তী এডিশনের দিকে আগ্রসর হোক বই দ্রুত, এটুকু কামনা করাই যায়।
তবে এনামুল রেজার "চায়ের কাপে সাঁতার" উপন্যাস "কোলাহলে"-এর প্রতিনায়ক হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে "চাকাসঁ" উপন্যাস পাঠকেদর জন্যে। ঠিক এই কারনেই পাঠকের অন্তর্লোকে সঞ্চার করার সক্ষমতা এনামুল রেজার থাকলেও, "কোলাহলে"-এর সঞ্চারপথ হয়ত আছে; তবে অন্তর্লোকের খুব গভীরে হয়ত না।
লেখক: এনামুল রেজা
প্রকাশনী: জ্ঞানকোষ প্রকাশনী
মূল্য: ৪০০ টাকা।
প্রাণবন্ত ও নাটকীয় - এনামুল রেজার "কোলাহলে" উপন্যাসকে সরলভাবে বলতে গেলে ওই দুই শব্দের সহবস্থান আসবে। সাবলীলতার সাথে এগিয়ে চলা গল্পে পাঠক একবার যখন উপন্যাসের অন্দরমহলে উঁকি দিবেন, খুব স্বাভাবিকভাবেই ধীরে ধীরে তিনি চষে বেড়াবেন বাকি কামরাগুলোও। পাঠক বেড়াতে বেড়াতে এমন কিছু ঘটনার মুখোমুখি হবেন যা কখনও হয়তো রহস্যে ঘেরা; তবে খুব অস্বস্তিকর নয়। আমাদের খুব অচেনাও না, তবে চেনা বলেই সেটা মনোটোনাস হয়ে ওঠেনি।
থ্রিল আছে, কিন্তু থ্রিলার না।
এনামুল রেজার ন্যারেশন খুবই ক্র্রিষ্টাল-ক্লিয়ার। পাঠকের ইমাজিনেশন আর লেখকের শব্দে ফুঁটিয়ে তোলা দৃশ্যপট - ওয়াই-ফাই এর অটোমেটিক কানেক্টিভিটির মতো মুহূর্তেই কানেক্ট হয়ে যায়। যার দরুন, উপন্যাসে অঙ্কিত ইলাষ্ট্রেশনগুলো আমার নিজের কাছে কিছু পৃষ্ঠার অপচয় বা বৃথা সন্নিবেশ ছাড়া কিছুই না। দারুন ন্যারেশনের কারনেই আমার মতো উপন্যাসের ব্যপ্তি অথবা আকার আরও বৃহৎ হতেই পারতো। কাহিনি প্রলম্বিত না করেই। বেশ অনেক জায়গায় কুইক দৃশ্যপট চেঞ্জ থেকে বরং আরও স্লোলি এগিয়ে গল্পটাকে আরও জমিয়ে তোলা যেত। আরব্য রজনীর শাহরাজাদ যেমন পারস্যের রাজাকে রাতের পর রাত গল্প বলে গিয়েছেন, এনামুল রেজা সেভাবে পৃষ্টার পর পৃষ্ঠা গল্প বলে গেলে পাঠকের বিরক্তি অনাকাঙ্খিত অতিথির মতো কড়া নাড়তো না। অল ক্রেডিট গোস টু লেখকের কলমের যাদু। একবার সেন্ট্রাল কোরে অনুপ্রবেশ - তো সেটা থেকে তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায় বহুদূর।
এনামুল রেজার "কোলাহলে" উপন্যাসের চরিত্র অনেক। গল্পের প্রয়োজনে কোন কোন চরিত্র ভুস করে ভেসে উঠতেছে পানির উপরে, আবার হারিয়ে যাচ্ছে অতল গহ্ববরে। বিশেষ করে নারী চরিত্রগুলো। তবে নিঃসন্দেহে উপন্যাসের এত চরিত্রের মধ্যে সবথেকে সবর চরিত্র বোধহয় "শূন্যস্থান" - যা পাঠককে মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তবে এটাও বলে রাখা ভালো - সেটা গভীর না, মৃদু। উপন্যাসের শুরুতেই সজনে গাছে ঝুলে থাকা রহস্যময় দেহের কাঁধের শূন্যস্থান থেকে শুরু করে গল্পের চরিত্রগুলোর শূন্যস্থান - ফলস্বরূপ, "emptiness বা শূন্যতা "কোলাহলের" অন্যতম শক্তিশালী চরিত্র।
উপন্যাসে প্রেম আছে, কাম আছে, রহস্য আছে, রাজনীতি আছে। সম্পর্কের টনাপোড়েন আছে। তবে "কোলাহলে"-এর সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিক বোধহয় লেখকের গল্প বলার কৌশলে। নৈতিক উপদেশ দেয়ার পথে না হেঁটে তিনি একধরনের স্যোশাল এক্সপেরিমেন্টশনের দিকে কলম চালিয়েছেন। ফলতঃ মন্থর সময়ের সাথে জীবনের ছন্দপতন প্রমিনেন্ট হয়ে উঠেছে "মানবিক মূল্যবোধ"-এর ক্লিশে কৌশল আঁকার থেকে।
প্রেম, কাম থেকে ভিলেজ পলিটিক্স - সব জায়গায় তাই স্পর্শ করে লেখকের কলম।
উপন্যাসের চরিত্রগুলো এমনভাবে গড়া, পাঠকের না কারও প্রতি তীব্র ঘৃনা হয়, না কোমল সহানুভূতি। কম বেশি সকল চরিত্রই ভাঙা-মানচিত্রের মতো - সামাজিক নিপীড়নব্যবস্থার বাই-প্রোডাক্ট হয়েই উপস্থিত আমাদের সামনে। যেমন হালিমা আর আলাল শেখের অবৈধ সম্পর্ক আমরা পড়ে যাই। কৌতুহুলী হই স্বভাবগত কারনে। কোন প্রকারের বাড়তি সহানুভূতি বা ঘৃনা কাজ করে না। ইমাম সাহেব কে যেমন অন্য গ্রাম্য ইমামের তুলনায় বেশ স্বাভাবিকতায় পাই, ঠিক পর মুহূর্তেই তিনিই হালিমার ঘটনায় জুম্মার খুতবায় হয়ে ওঠেন মোরালি গ্রে। আবার লম্বা টাইম তার ইমামতির জায়গাটা বজায় রাখার সংকল্পেও মোরালি গ্রে হয়ে উঠতে দেখি। এই জায়গাগুলোয় লেখক চরিত্রগুলো একরৈখিক না রেখে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।
রোকেয়া আর কামরুলের অংশটুক বলতেই হয়। এনামুল রেজা এই দুই চরিত্রের প্রেমটুকু প্রকাশে বাড়তি শব্দ বা ন্যারেশন সৃজন করেননি, বরং সেমিওটিক ফিল্ডের স্বরূপ - কামরুল ও রোকেয় এক অন্যের উপর ছায়া ফেলে আলাদা ভাষা হয়ে উঠেছে। কোন আলিঙ্গন নয়, কোন বাড়তি নৈকট্য নয়, নিজেদের ধরার সেরূপ চেষ্টা অনুপস্থিত - বরং এহেন দূরত্বই "কোলাহলে" উপন্যাসের কবিতা যেমন হয়ে উঠেছে, তেমনি হয়ে উঠেছে ট্রাজেডি। হয়তো পাঠকের কিছুটা বিষণ্ণতার জায়গা এখানেই।
Resolution না থাকাটাও এই উপন্যাসের কিছু ঘটনায় পাঠকের অস্বস্তির উদ্রেক হলেও, সেটাই উপন্যাসের স্ট্রং দিক। কামরুলে পরিনতি, রোকয়োর কাঁজল, নগেনের শেষ আকুতি অথবা নেয়ামতের খোঁজ .. এমন অনেক বেশ কিছু resolution না থাকাটা বরং বেশ আকর্ষণীয়। পাঠকের আশা থাকতেই পারে - বাস্তবে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, বা গুটি কয়েক পৃষ্ঠায় উত্তর হয়ে ধরা দেবে না।
এনামুল রেজার "কোলাহলে" তার নির্মেদ ন্যারেশন, সুন্দর চিত্রনির্মাণ এবং অনেকগুলো সাবলীল চরিত্রের সন্নিবেশে উপভোগ্য। তবে শুরুতেই যে আভাস দিয়েছি, উপন্যাসের ব্যাপ্তি আরও একটু বড় হলে চরিত্রগুলো আরও বেশি রক্তমাংসের হয়ে উঠতো। হয়তো আমাদের আপনও হয়ে উঠতো। textbook character হয়ে থাকতো না।
বইয়ে বেশ কিছু টাইপো আছে। যেগুলো গল্পের কাঠামোতে হয়তে কোন ইফেক্ট ফেলবে না। তবে একটু চোখ রাখা প্রয়োজন। নেয়ামতের স্ত্রী-র মৃত্যু এবং তার বয়স খুব সিগনিফিকেন্ট ব্যাপার ছিল উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলোর অবস্থা এবং ওই গ্রামের সামাজিক অবস্থা নিরূপনে। সেখানে "সপ্তদশীনি" বানান ভুল চোখে পড়ার মতো। এই শব্দটা খুব সিগনিফিকেন্ট ছিল। সফুর শেখে কন্যা এর জায়গায় "নেয়ামতের কন্যা" হয়ে গেছে এক জায়গায়। একটা জায়গায় কোন প্যারা ব্রেক নেই (পৃ:৩০ শুরুতে), তাই হুট করে পাঠকালে হোঁচট খেতে হয়। যাই হোক - এগুলো পরবর্তী এডিশনে শুধরে নেয়া সম্ভব। পরবর্তী এডিশনের দিকে আগ্রসর হোক বই দ্রুত, এটুকু কামনা করাই যায়।
তবে এনামুল রেজার "চায়ের কাপে সাঁতার" উপন্যাস "কোলাহলে"-এর প্রতিনায়ক হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে "চাকাসঁ" উপন্যাস পাঠকেদর জন্যে। ঠিক এই কারনেই পাঠকের অন্তর্লোকে সঞ্চার করার সক্ষমতা এনামুল রেজার থাকলেও, "কোলাহলে"-এর সঞ্চারপথ হয়ত আছে; তবে অন্তর্লোকের খুব গভীরে হয়ত না।
April 7, 2026
সহজ কথায় বললে- লেখকের লেখনী সুন্দর। দৃশ্যপট ও প্রকৃতি, বিশেষ করে গ্রমীণ প্রেক্ষাপট এমন করে বর্ণনা করেন যেনো কালারফুল এনিমেশন মুভি দেখছি। গ্রামকে যতটা দেখেছি, ততটাই সুন্দর করে ইপস্থাপন করেছেন।
তবে, গল্পে জীবন ততটাই বিষাদময়। যেমন- কামরুল ও রোকেয়া সম্পর্কটা। প্রায় পুরোটা সময়ই প্রত্যক্ষভাবে কিছু না বলেও পাঠককে এই চরিত্রের সম্পর্কটা অনুভব করানো, যেনো সারাক্ষণই বুকের মাঝে একটা পাথর চেপে আছে।
ভালোবাসা, সম্পর্কের টানাপোড়ন, ভিলেজ পলিটিক্স থেকে শুরু করে মানুষের লোভ, ক্রোধ ও কামের মত রিপুগুলোর সংমিশ্রনই কোলাহলে।
ছোট বইয়ে চরিত্রের আধিক্য, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে হাজির হয়েছে এবং আবার হারিয়ে গেছে। তবে সামাজিক উপন্যাসগুলোর মতোই হুট শেষ হয়ে যাওয়া। পাঠককে সেই একই প্রশ্ন ‘তারপর কী’ -তে আটকে থেকে নিজেই উত্তর খুঁজতে হয়।
তবে, গল্পে জীবন ততটাই বিষাদময়। যেমন- কামরুল ও রোকেয়া সম্পর্কটা। প্রায় পুরোটা সময়ই প্রত্যক্ষভাবে কিছু না বলেও পাঠককে এই চরিত্রের সম্পর্কটা অনুভব করানো, যেনো সারাক্ষণই বুকের মাঝে একটা পাথর চেপে আছে।
ভালোবাসা, সম্পর্কের টানাপোড়ন, ভিলেজ পলিটিক্স থেকে শুরু করে মানুষের লোভ, ক্রোধ ও কামের মত রিপুগুলোর সংমিশ্রনই কোলাহলে।
ছোট বইয়ে চরিত্রের আধিক্য, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে হাজির হয়েছে এবং আবার হারিয়ে গেছে। তবে সামাজিক উপন্যাসগুলোর মতোই হুট শেষ হয়ে যাওয়া। পাঠককে সেই একই প্রশ্ন ‘তারপর কী’ -তে আটকে থেকে নিজেই উত্তর খুঁজতে হয়।
December 19, 2018
"এরপর তারা ঝড়ের মাঝে বেরিয়ে যেত । আমের ডাল ভেঙ্গে পড়ছে পথের ক্ষণে ক্ষণে আকাশ ডাকছে গুড়ুরগুড়ু, সুঁই সুঁই বৃষ্টি মাথায় নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছুত তারা । মাইল মাইল লম্বা নদীর হুহু ফাঁকা পাড়, তীরের গাছপালা কাঁপছে আর করছে নাচানাচি ।
কামরুল ভাই নদীতি নামবা?
পাগলে ধরিসে? এন্নে নামলে পানিতি, টাইনে কুথায় নিয়ে চইলে যাবে আমাইগে জানিস?
নিলিই তো ভাল ।"
'কোলাহলে'র ফ্ল্যাপের এই অংশটুকু রোমান্টিক একটি কাহিনির দিকে ইঙ্গিত করে । একইসাথে চরিত্রের সংলাপ ও পরিবেশ এর গ্রামীণ পটভূমিতে লেখার কথাও জানান দেয় আমাদের ।
কিন্তু পাঠ শেষে এই উপন্যাসের কাহিনিকে ঠিক রোমান্টিক বলা যায় না । যদিও কামরুল আর রোকেয়ার মধ্যে প্রেমঘটিত একটা সম্পর্ক ছিল ।
সেটা কি একপক্ষীয় প্রেম নাকি দ্বিপক্ষীয়?
এমন একটা প্রশ্ন যদিওবা থেকে যায় । তারপরেও শেষপর্যন্ত মীমাংসায় পৌঁছুতে পারি না ।
এছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে আরো কিছু রোমান্টিক চরিত্র আছে । উপন্যাসে সেগুলোর প্রত্যক্ষ কোন আবেদন না থাকলেও রোমান্টিক আবহ তৈরির ক্ষেত্রে এগুলোর পরোক্ষ কিছু অবদান আছে বৈকি ।
পুবপাড়া কে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসের কাহিনির বিস্তার, যাতে গ্রামীণ জনজীবনের রূঢ বাস্তবতা, একইসাথে বৈচিত্র্যপূর্ণ সব চরিত্রের গ্রাম্য সরলতার বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ আর একটি অযাচিত হত্যাকান্ডের রহস্য ক্রমশ উম্মোচিত হয়েছে পাঠকের সামনে ।
এই হত্যাকান্ডের রহস্যজট আরো ঘনীভূত হয় যখন চেয়ারম্যান আলাল শেখের শালা মনজু নিখোঁজ হয় । যার সাথে চেয়ারম্যান আলাল শেখ ও মনজুর স্ত্রী হালিমার গোপন সম্পর্কের একটা যোগসূত্র আছে ।
ঘটনার ঘনঘটার সাথে মানবিক স্খলন আর মানুষের আদিম প্রবণতায় যে বহুমূখী উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল একসময়, একের পর এক ফ্ল্যাশব্যাকের কারণে সেটা অনেকটা স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল, আর একইসাথে কাহিনিও তার গতি হারিয়েছিল; পাঠের মাঝে তেমনটাই মনে হয়েছে আমার ।
এই উপন্যাসে কতোরকম বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রের সাথে যে দেখা হয়ছে গল্পের বাঁকে বাঁকে,তার কোন হিসেব নেয়।চরিত্র নির্ভর এই উপন্যাসে সেসব চরিত্রের জীবনচিত্র আলাদা আলাদাভাবে বিকাশের দাবি করলেও এর অন্তিম পরিণতি গল্পের মতো হওয়ায় তেমনটা করা সম্ভব হয়নি হয়তো । যার কারণে গলাকাটা লাশের রহস্যজট উপন্যাসের শেষে খুললেও সেসব চরিত্রের যাপিত জীবনের পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাঠ শেষে পাওয়া যায়নি । এক্ষেত্রে লেখকের স্বীকার্যটি গুরুত্বপূর্ণ । ভূমিকাতে যেমনটা তিনি বলেছেন-
'চরিত্রগুলো আরও একটু বিকাশের দাবিদার ছিল,উপন্যাসটির পটভূমি পুবপাড়াও চাইছিল তাকে আরও খানিক পরিষ্কার (ঘোলাটে?) করে তুলিনা কেন?'
গ্রামীণ পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে গ্রাম্যতাকে লেখক যেভাবে চিত্রিত করেছেন, অর্থাৎ এই উপন্যাসের চরিত্র, ভাষা, সংলাপের ব্যবহার, আবহ ইত্যাদি সবকিছুই এই উপন্যাসকে বিশিষ্টতা দান করেছে ।
যদিও লেখক চাইলে উপন্যাসের চরিত্রদের জীবনবোধ নির্মাণে আরো বিস্তৃত গল্পকে ধারণ করতে পারতেন । তাঁর গ্রাম্য জীবনবীক্ষণকে, সমাজবীক্ষণকে আরো স্পষ্ট, আরো অর্থবহ এবং আরো তাৎপর্যপূর্ণ করতে পারতেন ।
কামরুল ভাই নদীতি নামবা?
পাগলে ধরিসে? এন্নে নামলে পানিতি, টাইনে কুথায় নিয়ে চইলে যাবে আমাইগে জানিস?
নিলিই তো ভাল ।"
'কোলাহলে'র ফ্ল্যাপের এই অংশটুকু রোমান্টিক একটি কাহিনির দিকে ইঙ্গিত করে । একইসাথে চরিত্রের সংলাপ ও পরিবেশ এর গ্রামীণ পটভূমিতে লেখার কথাও জানান দেয় আমাদের ।
কিন্তু পাঠ শেষে এই উপন্যাসের কাহিনিকে ঠিক রোমান্টিক বলা যায় না । যদিও কামরুল আর রোকেয়ার মধ্যে প্রেমঘটিত একটা সম্পর্ক ছিল ।
সেটা কি একপক্ষীয় প্রেম নাকি দ্বিপক্ষীয়?
এমন একটা প্রশ্ন যদিওবা থেকে যায় । তারপরেও শেষপর্যন্ত মীমাংসায় পৌঁছুতে পারি না ।
এছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে আরো কিছু রোমান্টিক চরিত্র আছে । উপন্যাসে সেগুলোর প্রত্যক্ষ কোন আবেদন না থাকলেও রোমান্টিক আবহ তৈরির ক্ষেত্রে এগুলোর পরোক্ষ কিছু অবদান আছে বৈকি ।
পুবপাড়া কে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসের কাহিনির বিস্তার, যাতে গ্রামীণ জনজীবনের রূঢ বাস্তবতা, একইসাথে বৈচিত্র্যপূর্ণ সব চরিত্রের গ্রাম্য সরলতার বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ আর একটি অযাচিত হত্যাকান্ডের রহস্য ক্রমশ উম্মোচিত হয়েছে পাঠকের সামনে ।
এই হত্যাকান্ডের রহস্যজট আরো ঘনীভূত হয় যখন চেয়ারম্যান আলাল শেখের শালা মনজু নিখোঁজ হয় । যার সাথে চেয়ারম্যান আলাল শেখ ও মনজুর স্ত্রী হালিমার গোপন সম্পর্কের একটা যোগসূত্র আছে ।
ঘটনার ঘনঘটার সাথে মানবিক স্খলন আর মানুষের আদিম প্রবণতায় যে বহুমূখী উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল একসময়, একের পর এক ফ্ল্যাশব্যাকের কারণে সেটা অনেকটা স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল, আর একইসাথে কাহিনিও তার গতি হারিয়েছিল; পাঠের মাঝে তেমনটাই মনে হয়েছে আমার ।
এই উপন্যাসে কতোরকম বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রের সাথে যে দেখা হয়ছে গল্পের বাঁকে বাঁকে,তার কোন হিসেব নেয়।চরিত্র নির্ভর এই উপন্যাসে সেসব চরিত্রের জীবনচিত্র আলাদা আলাদাভাবে বিকাশের দাবি করলেও এর অন্তিম পরিণতি গল্পের মতো হওয়ায় তেমনটা করা সম্ভব হয়নি হয়তো । যার কারণে গলাকাটা লাশের রহস্যজট উপন্যাসের শেষে খুললেও সেসব চরিত্রের যাপিত জীবনের পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাঠ শেষে পাওয়া যায়নি । এক্ষেত্রে লেখকের স্বীকার্যটি গুরুত্বপূর্ণ । ভূমিকাতে যেমনটা তিনি বলেছেন-
'চরিত্রগুলো আরও একটু বিকাশের দাবিদার ছিল,উপন্যাসটির পটভূমি পুবপাড়াও চাইছিল তাকে আরও খানিক পরিষ্কার (ঘোলাটে?) করে তুলিনা কেন?'
গ্রামীণ পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে গ্রাম্যতাকে লেখক যেভাবে চিত্রিত করেছেন, অর্থাৎ এই উপন্যাসের চরিত্র, ভাষা, সংলাপের ব্যবহার, আবহ ইত্যাদি সবকিছুই এই উপন্যাসকে বিশিষ্টতা দান করেছে ।
যদিও লেখক চাইলে উপন্যাসের চরিত্রদের জীবনবোধ নির্মাণে আরো বিস্তৃত গল্পকে ধারণ করতে পারতেন । তাঁর গ্রাম্য জীবনবীক্ষণকে, সমাজবীক্ষণকে আরো স্পষ্ট, আরো অর্থবহ এবং আরো তাৎপর্যপূর্ণ করতে পারতেন ।
June 23, 2023
গ্রাম্য পরিবেশ, সংস্কার-কুসংস্কার, আচার-ব্যবহার আর কাদামাটি মাখানো গেঁও ভাষা কার না ভালো লাগে? আমারতো দারুণ লাগে। এধরণের রচনাগুলো যেন আত্মার কথা বলে। কোলাহলে ঠিক তেমনই একটি উপন্যাস। গ্রাম্য কুসংস্কারের অংশ হিসেবে ভৌতিক পরিবেশ তৈরী করে রহস্যময় খুনকে সামনে আনা হয়। শিরবিহীন সেই ঝুলন্ত লাশ ভয় পাইয়ে দেয় ভূতে বিশ্বাস করা বাবা ছেলেকে। তারপরে একে একে চরিত্রগুলোর আত্মপ্রকাশ। এমনকি গল্পের একেবারে শেষ মুহূর্তেও নতুন চরিত্রের আবির্ভাব। এজন্যই বোধয় গল্পের নাম কোলাহলে। গ্রামীণ মানুষেদের জীবনাচার বর্ণনার মধ্যে দিয়ে মু্ন্ডুহীন লাশ এবং খুনির পরিচয় উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়েছে। অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়েও দুটো মানুষের আলাদা থেকে বাস্তবতার সাফাই গাওয়ার নিষ্ঠুরতার কথা বলা আছে এখানে। লেখক খুব সুন্দর করে ক্যারেক্টার বিল্ড আপ করেছেন। খুব সূক্ষ্মভাবে ভাবনার উপাদান যোগ করেছেন, একে একে রহস্য যোগ করেছেন আবার সমাধান করেছেন। বইটি থ্রিলিং না হলেও মজিয়ে রাখার মতো। আর এমনভাবে শেষ করা হয়েছে যে মনে হবে আরো অনেক কিছু জানা বাকি। এ যেন শেষ হয়েও হলোনা শেষ।
ব্যক্তিগত রেটিং : ৭.৫/১০(অনেক বেশি চরিত্র আর ঘনঘন দৃশ্য বদলের জন্য)
ব্যক্তিগত রেটিং : ৭.৫/১০(অনেক বেশি চরিত্র আর ঘনঘন দৃশ্য বদলের জন্য)
March 23, 2026
কোলাহলের পর ঠিক কী নামে? সীমাহীন নৈঃশব্দ্য?... বোধ হয়।
আক্ষরিক কোলাহলকে মোটাদাগে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগ: প্রকৃতি আর দ্বিতীয় ভাগ: মানুষ। এনামুল রেজার প্রথম উপন্যাস ‘কোলাহলে’ এই দুটো ভাগ সমানরূপে দৃশ্যমান। প্রকৃতির মাঝে মানুষের বিচরণ, আর মানুষের মাঝে প্রকৃতির অস্তিত্ব-যাপন। কখনও বা আমরা এভাবে ভেবে দেখিনি, মানুষের জ্ঞানবোধ, ইন্দ্রিয়, আবেগ, অনুভূতি যদি না থাকত, তবে প্রকৃতি অজানা থেকে যেত না; সহস্র অজানাকে না জানার মতো, আজও?
এইতো, কোলাহলে একসময় মুখরিত পুবপাড়ায় ঘটে যাওয়া সব ঘটনার শেষ কি আমাদের জানা হয়? কামরুলের সাথে দক্ষিণে আমাদের আর যাওয়া হয় না, কেবল রোকেয়ার কাজল গলে যাওয়া দেখা ছাড়া। জহিরের কী হয়? জয়নাল? নগেন? গনি? মনি? হালিমার সাথে ঠিক কী ঘটে পরদিন সকালে তা আর জানা হলো কই? জুটমিল কি পুরোদমে চালু হয়েছিল? মাহমুদা কি তার পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লিখেছিল পরে? এসব অপূর্ণতা, শূন্যতার দায় কার? আমাদের নাদান বুভুক্ষ বিচলিত মন আর লেখকের কল্পনার এই যে সমাপ্তিগত ছলনা, এসব চোর-পুলিশি খেলা মনঃকষ্ট দেয়।
মাঝে মাঝে ভাবি, সমকালীন উপন্যাস, ঔপন্যাসিকদের আর লেখা উচিত না। কারণ এর কোনো শেষ নেই, কেবল হঠাৎ সমাপ্তিতে উত্থাপিত দীর্ঘশ্বাস কিংবা নিরন্তর বেদনার লক্ষ্যভ্রষ্ট তীর ছোড়া ছাড়া।
‘কোলাহলে’ মন ভালো করা কোনো উপন্যাস না। বড়োজোর বলা যায় প্রকৃতির মাঝে লুকানো বিষণ্ণময় আখ্যান। অথবা বৃহৎ কোনো ট্র্যাজেডিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে ভাঙলে যা হয়—সেটা কোলাহলে। উপন্যাসের শুরুতে পুবপাড়ায় একটি মুণ্ডুহীন লা শ নিয়ে যে হইচই শুরু হয়, গল্পের শেষ হতে হতে তা হয়ে পড়ে নিখাদ ব্যক্তিগত। যেন বয়সি সজনে গাছটি ঘিরে যে অদৃশ্য জটলা সকালে শুরু হয়েছিল, রাত নামতেই সেইসব হয়ে উঠে ব্যক্তিগত জীবনের অপ্রাপ্তি আর বিষাদের চারা। করুণ, শূন্যতা আর গোপন সব ছন্দে ছন্দে এগোয় কাহিনি, প্রকৃতি তাল মিলোয় সাথে। বৃষ্টি আর মেঘের এত স্নিগ্ধ, ঘোরলাগা আর শৈশবকে ঝট করে তুলে আনার মতো বর্ণনা... বহুদিন স্মরণে থাকবে। এতে লেখক তার অপরাধ থেকে খানিকটা ক্ষমা পাবে।
কোলাহলের গভীরে যেতে যেতে একবার ভ্রম হয়, আমি এনামুল রেজার কল্পনার জগতে বিচরণ করছি না সেই জগতের ঘনকালো মেঘের ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে রোদের দুই-তিনটে চেনা হলদে আলো? কারা ওঁরা? ইলিয়াস, ওয়ালীউল্লাহ্ না কি শহীদুল... না, আমি আলাদা করতে পারি। লেখক তার ছন্দ থেকে বিচ্যুত হন না, প্রতারণা করেন না অনুভূতির সাথে, প্রকৃতিকে জীবন্ত করার সাথে। সবচেয়ে বড়ো কথা, স্বতন্ত্রার সাথে কোনো আপস করেন না।
চরিত্র, সংলাপ ও প্রকৃতিনির্ভর ‘কোলাহলে’র শক্তিশালী দিকটা হলো এর প্রেক্ষাপট, সংলাপ, মনস্তত্ত্ব ও গ্রামীণ আবহের চেনা রাজনৈতিক ছক, প্রেতময় রহস্য ও গোপন প্রেমের কেচ্ছা। তার ভেতর আলাদা করে নজর কাড়ে চরিত্র কামরুল। পুরো পুবপাড়া, সজনে গাছ আর কামরুলকে ঘিরে আবর্ত হয়েছে বললে ভুল হবে না। মাঝে মাঝে কিছু চরিত্র হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। নারী-অনুভূতি এখানে অন্যতম শক্তিশালী দিক। তাছাড়া পুরুষদের ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে নিপুণভাবে। রহস্য, ভয়, ষড়যন্ত্র, কাম... সবই রয়েছে কোলাহলে; উপস্থাপনায় সেসব খুঁজে নিতে হয় কেবল। এতে ঘোর লাগতে পারে বা পারে ধাঁধা। একটু মিলিয়ে নিলেই জানা হয় সব।
লেখকের ‘চায়ের কাপে সাঁতার’, গল্পগন্ত্র ‘হন্ত্রক’র মতো ‘কোলাহলে’ আমার বহুদিন মনে থাকবে। কোলাহলে নামই একটা ফাঁদ, এই ফাঁদে পাঠকের পা ফেলা একবার হলে আবশ্যক মনে করি। দক্ষিণ বাংলার গ্রামজীবনের এই আশ্চর্য কালপর্বের ছায়া আপনার জীবনের ওপর নেমে আসুক। এই কামনা।
আক্ষরিক কোলাহলকে মোটাদাগে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগ: প্রকৃতি আর দ্বিতীয় ভাগ: মানুষ। এনামুল রেজার প্রথম উপন্যাস ‘কোলাহলে’ এই দুটো ভাগ সমানরূপে দৃশ্যমান। প্রকৃতির মাঝে মানুষের বিচরণ, আর মানুষের মাঝে প্রকৃতির অস্তিত্ব-যাপন। কখনও বা আমরা এভাবে ভেবে দেখিনি, মানুষের জ্ঞানবোধ, ইন্দ্রিয়, আবেগ, অনুভূতি যদি না থাকত, তবে প্রকৃতি অজানা থেকে যেত না; সহস্র অজানাকে না জানার মতো, আজও?
এইতো, কোলাহলে একসময় মুখরিত পুবপাড়ায় ঘটে যাওয়া সব ঘটনার শেষ কি আমাদের জানা হয়? কামরুলের সাথে দক্ষিণে আমাদের আর যাওয়া হয় না, কেবল রোকেয়ার কাজল গলে যাওয়া দেখা ছাড়া। জহিরের কী হয়? জয়নাল? নগেন? গনি? মনি? হালিমার সাথে ঠিক কী ঘটে পরদিন সকালে তা আর জানা হলো কই? জুটমিল কি পুরোদমে চালু হয়েছিল? মাহমুদা কি তার পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লিখেছিল পরে? এসব অপূর্ণতা, শূন্যতার দায় কার? আমাদের নাদান বুভুক্ষ বিচলিত মন আর লেখকের কল্পনার এই যে সমাপ্তিগত ছলনা, এসব চোর-পুলিশি খেলা মনঃকষ্ট দেয়।
মাঝে মাঝে ভাবি, সমকালীন উপন্যাস, ঔপন্যাসিকদের আর লেখা উচিত না। কারণ এর কোনো শেষ নেই, কেবল হঠাৎ সমাপ্তিতে উত্থাপিত দীর্ঘশ্বাস কিংবা নিরন্তর বেদনার লক্ষ্যভ্রষ্ট তীর ছোড়া ছাড়া।
‘কোলাহলে’ মন ভালো করা কোনো উপন্যাস না। বড়োজোর বলা যায় প্রকৃতির মাঝে লুকানো বিষণ্ণময় আখ্যান। অথবা বৃহৎ কোনো ট্র্যাজেডিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে ভাঙলে যা হয়—সেটা কোলাহলে। উপন্যাসের শুরুতে পুবপাড়ায় একটি মুণ্ডুহীন লা শ নিয়ে যে হইচই শুরু হয়, গল্পের শেষ হতে হতে তা হয়ে পড়ে নিখাদ ব্যক্তিগত। যেন বয়সি সজনে গাছটি ঘিরে যে অদৃশ্য জটলা সকালে শুরু হয়েছিল, রাত নামতেই সেইসব হয়ে উঠে ব্যক্তিগত জীবনের অপ্রাপ্তি আর বিষাদের চারা। করুণ, শূন্যতা আর গোপন সব ছন্দে ছন্দে এগোয় কাহিনি, প্রকৃতি তাল মিলোয় সাথে। বৃষ্টি আর মেঘের এত স্নিগ্ধ, ঘোরলাগা আর শৈশবকে ঝট করে তুলে আনার মতো বর্ণনা... বহুদিন স্মরণে থাকবে। এতে লেখক তার অপরাধ থেকে খানিকটা ক্ষমা পাবে।
কোলাহলের গভীরে যেতে যেতে একবার ভ্রম হয়, আমি এনামুল রেজার কল্পনার জগতে বিচরণ করছি না সেই জগতের ঘনকালো মেঘের ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে রোদের দুই-তিনটে চেনা হলদে আলো? কারা ওঁরা? ইলিয়াস, ওয়ালীউল্লাহ্ না কি শহীদুল... না, আমি আলাদা করতে পারি। লেখক তার ছন্দ থেকে বিচ্যুত হন না, প্রতারণা করেন না অনুভূতির সাথে, প্রকৃতিকে জীবন্ত করার সাথে। সবচেয়ে বড়ো কথা, স্বতন্ত্রার সাথে কোনো আপস করেন না।
চরিত্র, সংলাপ ও প্রকৃতিনির্ভর ‘কোলাহলে’র শক্তিশালী দিকটা হলো এর প্রেক্ষাপট, সংলাপ, মনস্তত্ত্ব ও গ্রামীণ আবহের চেনা রাজনৈতিক ছক, প্রেতময় রহস্য ও গোপন প্রেমের কেচ্ছা। তার ভেতর আলাদা করে নজর কাড়ে চরিত্র কামরুল। পুরো পুবপাড়া, সজনে গাছ আর কামরুলকে ঘিরে আবর্ত হয়েছে বললে ভুল হবে না। মাঝে মাঝে কিছু চরিত্র হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। নারী-অনুভূতি এখানে অন্যতম শক্তিশালী দিক। তাছাড়া পুরুষদের ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে নিপুণভাবে। রহস্য, ভয়, ষড়যন্ত্র, কাম... সবই রয়েছে কোলাহলে; উপস্থাপনায় সেসব খুঁজে নিতে হয় কেবল। এতে ঘোর লাগতে পারে বা পারে ধাঁধা। একটু মিলিয়ে নিলেই জানা হয় সব।
লেখকের ‘চায়ের কাপে সাঁতার’, গল্পগন্ত্র ‘হন্ত্রক’র মতো ‘কোলাহলে’ আমার বহুদিন মনে থাকবে। কোলাহলে নামই একটা ফাঁদ, এই ফাঁদে পাঠকের পা ফেলা একবার হলে আবশ্যক মনে করি। দক্ষিণ বাংলার গ্রামজীবনের এই আশ্চর্য কালপর্বের ছায়া আপনার জীবনের ওপর নেমে আসুক। এই কামনা।
April 27, 2026
প্লাস:
১) বর্ণনা গতিশীল। পাঠক হিসাবে বোরড হই নাই একরত্তি।
২) দৃশ্যের বর্ণনা সুন্দর।
৩) প্লটটা ইন্টারেস্টিং।
৪) প্রচ্ছদ
৫) যে রহস্য দিয়ে গল্পটা শুরু, সেটা কেন কীভাবে হয়েছে, সেটার মনমতো ব্যাখ্যা।
মাইনাস:
১) চরিত্রের আনাগোনা অনেক কিন্তু মনে রাখার মতো কোনো চরিত্র পাই নাই। কামরুলের স্টোরিটা একটু ইন্টারেস্টিং ছিল, বাট যথেষ্ট লাগে নাই আমার জন্য।
২) অনেকগুলা চরিত্রের ক্লোজার টানা হয় নাই। গল্পের প্রয়োজনে আসছে, কিন্তু হারায়ে গেসে দ্রুত।
৩) আধিভৌতিক দুই একটা রহস্যের অবতারণা আছে, কিন্তু কোনো প্রপার ব্যাখ্যা নাই। কেন এইসব রহস্য লেখক নিয়া আসছেন, তাও বুঝি নাই।
৪) বইয়ের এন্ডিং ভাল্লাগে নাই।
১) বর্ণনা গতিশীল। পাঠক হিসাবে বোরড হই নাই একরত্তি।
২) দৃশ্যের বর্ণনা সুন্দর।
৩) প্লটটা ইন্টারেস্টিং।
৪) প্রচ্ছদ
৫) যে রহস্য দিয়ে গল্পটা শুরু, সেটা কেন কীভাবে হয়েছে, সেটার মনমতো ব্যাখ্যা।
মাইনাস:
১) চরিত্রের আনাগোনা অনেক কিন্তু মনে রাখার মতো কোনো চরিত্র পাই নাই। কামরুলের স্টোরিটা একটু ইন্টারেস্টিং ছিল, বাট যথেষ্ট লাগে নাই আমার জন্য।
২) অনেকগুলা চরিত্রের ক্লোজার টানা হয় নাই। গল্পের প্রয়োজনে আসছে, কিন্তু হারায়ে গেসে দ্রুত।
৩) আধিভৌতিক দুই একটা রহস্যের অবতারণা আছে, কিন্তু কোনো প্রপার ব্যাখ্যা নাই। কেন এইসব রহস্য লেখক নিয়া আসছেন, তাও বুঝি নাই।
৪) বইয়ের এন্ডিং ভাল্লাগে নাই।
Displaying 1 - 17 of 17 reviews


















