বঙ্গদেশে কি রেনেসন্স হয়েছিলো?—উনিশ শতকের বঙ্গদেশে? অনেকে বলেন, হয়েছিলো। কেবল হয়নি, তাঁদের মতে, রেনেসন্সের আলোকে যুগান্তর এসেছিলো, বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজে। কিন্তু অনেকেই এই দাবিকে অস্বীকার করেন। তাঁরা বলেন, বঙ্গদেশের জাগরণের সঙ্গে ইটালীয় রেনেসন্সের বিশেষ কোনো সাদৃশ্য নেই। সে জাগরণকে তাই রেনেসন্স বলা অযৌক্তিক।
রেনেসন্স হয়েছিলো, অথবা হয়নি—এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও সবাই একমত যে, আলোচ্য সময়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত এবং শিক্ষাক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব জাগরণ দেখা দিয়েছিলো। মধ্যযুগীয়তা থেকে বাঙালি সমাজ প্রথমবারের মতো পা বাড়িয়েছিলো আধুনিকতার পথে। গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতার জায়গায় সে সমাজের একাংশের দেখা দিয়েছিলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। অবগুণ্ঠন-বন্দী মর্যাদাবিহীন নারীদের অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আশার আহ্বানও শোনা গিয়েছিলো এ সময়ে। রেনেসন্সের সমর্থকরা বলেন, এ সবই রেনেসন্সের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। কিন্তু সত্যটা কী?
সঠিক উত্তরটা দিতে গেলে প্রথমেই জানতে জানতে হয়, রেনেসন্স কী।
পনেরো-ষোলো শতকের ইটালিতে জগৎ ও জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা দিয়েছিলো, এবং তার প্রবল প্রকাশ ঘটেছিলো ভাষা, সাহিত্য, চিত্রকলা, স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য-সহ সৃজনশীলতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে বলা হয় ভাসারির ভাষায় ‘রিনাসীতা’ (rinascita)আর জুল মিশেলের ভাষায় ‘রেনেসাঁস’। যার অর্থ পুনর্জন্ম।
বঙ্গদেশেও কি পুনর্জন্ম হয়েছিলো? না-হয়ে থাকলে, যা হয়েছিলো, তার নাম কবে কী? এর উত্তর মিলবে এই বইতে। সেই সঙ্গে অবসান ঘটবে রেনেসন্স সম্পর্কে বহু ভ্রান্ত ধারণার। রেনেসন্স মানে কি ইহলৌকিকতা? মানবমুখিতা? অতীতের পুনরুত্থান?
Ghulam Murshid (Bengali: গোলাম মুরশিদ) is a Bangladeshi author, scholar and journalist, based in London, England.
জন্ম ১৯৪০, বরিশালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. এ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। পি এইচ ডি— ঐতিহাসিক ডেইভিড কফের তত্ত্বাবধানে। গবেষণার বিষয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু সমাজ সংস্কার আন্দোলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দু দশক ধরে অধ্যাপনা । মাঝখানে দু বছর কেটেছে মেলবোর্নে, শিবনারায়ণ রায়ের তত্ত্বাবধানে, পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা কর্মে। ১৯৮৪ সাল থেকে লন্ডন-প্রবাসী। | বেতার-সাংবাদিকতা এবং শিক্ষকতার অবসরে প্রধানত আঠারো শতকের বাংলা গদ্য এবং মাইকেল-জীবন নিয়ে গবেষণা। প্রধান নেশা গবেষণার— অতীতকে আবিষ্কারের । বারোটি গ্রন্থ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত বিদ্যাসাগর বক্তৃতামালার ওপর ভিত্তি করে রচিত গ্রন্থ: রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা (১৯৮১)। পিএইচ ডি. অভিসন্দর্ভের ওপর ভিত্তি করে লেখা সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও বাংলা নাটক (১৯৮৫)। মহিলাদের নিয়ে লেখা Reluctant Debutante: Response of Bengali Women to Modernization (১৯৮৩) (বাংলা অনুবাদ: সংকোচের বিহ্বলতা [১৯৮৫]) এবং রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া : নারীপ্রগতির একশো বছর (১৯৯৩)। অন্য উল্লেখযোগ্য রচনা, কালান্তরে বাংলা গদ্য (১৯৯২), যখন পলাতক (১৯৯৩) এবং বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার আদি-পর্ব (১৯৮৬)। প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২)। আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বক্তৃতা দান (১৯৯১-৯২)। ছদ্মনাম হাসান মুরশিদ। এই নামে একটি উপন্যাসও লিখেছেন।
ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও ঊনবিংশ শতকের বঙ্গীয় রেনেসাঁর ব্যাপারে সাধারণ ধারণা পাবার জন্য বইটি চমৎকার। দুই ক্ষেত্রেই বিষয়বস্তুর খুব ভেতরে ঢোকেননি লেখক; খুবই স্বাভাবিক, কারণ ওটাই মূল লক্ষ্য ছিল বলেই ধারণা করি। আর বইয়ের প্রোডাকশন খুবই উন্নতমানের; চাররঙ্গা বইটির পুরোটাই গ্লসি কাগজে ছাপা হয়েছে; দামটাও তাই বেড়েছে, মানও বেড়েছে। সব মিলিয়ে, বইটি সংগ্রহে রাখার মতো কিংবা উপহার দেওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছে।
ইওরোপের রেনেসাঁন্স-এর কথা তো আজ আমরা সব্বাই-ই জানি। দানবীয় সব পরিবর্তন ও সংস্কারের ভেতর দিয়ে নতুন এক ইওরোপের জন্ম হয়েছিলো মধ্যযুগে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকারে ঘেরা সে সমাজের খোলনলচেই পুরো পাল্টে দিয়েছিলো বুদ্ধিবৃত্তিক পুণর্জাগরণের এই আন্দোলনটি। ১৯ শতকে বঙ্গীয় সমাজেও এমন একটি সংস্কারমূলক আন্দোলন ঘটেছিলো, যাকে কেউ কেউ রেনেসাঁন্স হিসেবে অভিহিত করেন। গোলাম মুরশিদের এ বইটি লেখার মূল উদ্দেশ্য বাঙালি পাঠকের সঙ্গে সেই “বঙ্গীয় রেনেসাঁন্স”-এর পরিচয় করিয়ে দেয়া। বাঙলায় রেনেসান্স সত্যিই এসেছে কি না তা নিয়ে অনেকেরই হয়তো প্রশ্ন থাকবে মনে। অনেকটা সে প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যই বইয়ের প্রায় ৬৩% তিনি ব্যয় করেছেন ইতালীয় রেনেসাঁন্স-এর ইতিহাস বর্ণনায়। পাঠককে ১৫/১৬ শতকের সে রেনেসাঁন্স-এর একটি সম্যক ধারণা দিয়ে এরপর তিনি ১৯ শতকে বঙ্গীয় সমাজে ঘটে যাওয়া বড় বড় সামাজিক পরিবর্তনগুলোর দিকে চোখ ফিরিয়েছেন। দুই সমাজের সংস্কারকে সমান্তরালভাবে দেখতে এবং দেখাতে চেয়েছেন মুরশিদ।
সত্যিই কি বাঙলায় রেনেসাঁন্স ঘটেছিলো? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আগে চোখ ফেরাতে হবে সে সময়ের বঙ্গীয় সমাজ কী কী পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গিয়েছে সেসবের ওপর। কফির কাপটা নামিয়ে শক্ত হয়ে বসুন, ইতিহাসের রোলার কোস্টারে বসতে চলেছি এক্ষুনি!
ইওরোপে প্রোটো-রেনেসাঁন্স ১২-১৩ শতকের দিকে শুরু হয়েছিলো, যা পরিপূর্ণ রূপ পায় ১৫ শতকে এসে। যে সমাজ-সংস্কারকে মুরশিদ বঙ্গীয় রেনেসাঁন্স অভিহিত করেছেন, তার সূচনা ১৯ শতকের শুরুতে। দুই “রেনেসাঁন্স”-এর মাঝে প্রায় ৫০০ বছরের পার্থক্য। তবে এই বঙ্গীয় রেনেসাঁন্স নাকি প্রথমে শুরু হয়েছিলো এশিয়াটিক সোসাইটির কয়েকজন ইংরেজ পণ্ডিতের হাতে, ১৮ শতকের শেষে। ১৭৮৪ সালের জানুয়ারী মাসে ইস্ট ইণ্ডিয়া কম্পানির কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন; ভারতবর্ষের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ভূগোল ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা ছিলো এদের লক্ষ্য। এই সোসাইটির একজন পণ্ডিত উইলিয়াম জোনস একদিন অতর্কিতে ঘোষণা করেন সংস্কৃত (এবং, বাঙলা সমেত উত্তর ভারতের ভাষাসমূহ) এবং ইওরোপীয় ভাষাগুলো আসলে একে অপরের আত্নীয়; এরা ইন্দো-ইওরোপিয়ান পরিবারের অন্তর্গত। এর অব্যবহিত পরেই ১৮৩৬-৩৮ সালের দিকে জেমস প্রিন্সেপ প্রায় ২০০০ বছর পর সম্রাট অশোকের সময়ের ব্রাহ্মীলিপি পাঠোদ্ধার করেন। অশোক এবং তাঁর সময়কাল নিয়ে পুরোদমে গবেষণা শুরু হয় এরপরই।
গোলাম মুরশিদ রাজা রামমোহন রায়কে (তাঁর) বাঙলার রেনেসাঁন্সের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। ইওরোপের রেনেসাঁন্সে বহুভাষাবিদ পণ্ডিতেরা বিভিন্ন ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কাজ অনুবাদ করে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। রামমোহন রায়কেও তেমনি একটি ভুমিকাতেই দেখেছেন মুরশিদ। তিনি বাঙলা, এবং ইংরেজির পাশাপাশি আরবী, ফার্সি, হিন্দী, সংস্কৃত-এই ভাষাগুলো শিখেছিলেন, এমনকি, বাইবেলের আদি গ্রন্থ (ওল্ড টেস্টামেন্ট) পড়বার জন্য তিনি হিব্রিউও নাকি রপ্ত করেছিলেন। আমার মতো অনেকেরই হয়তো ভীষণ অবাক লাগবে জেনে, ১৮০৩ সালে রামমোহন রায় তাঁর প্রথম যে বইটি প্রকাশ করেন, সেটি তিনি লিখেছিলেন ফার্সি ভাষায় (তুহফাতুল মুয়াহেদিন)। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের এই বইটির ভূমিকা আবার লিখেছিলেন আরবী ভাষায়।
তুহফাতুল-এর এক যুগ পর ১৮১৫ সালে রামমোহন বেদান্ত গ্রন্থ নামে একটি বই প্রকাশ করেন, যেখানে বেদের সংস্কৃত শ্লোকগুলোর আলোকে হিন্দুধর্মকে একেশ্বরবাদী একটি জীবন বিধান হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছেন তিনি। বেদ-উপনিষদের বাঙলা অনুবাদ এর আগে খুব একটা প্রচলিত ছিলো না সম্ভবত, ফলে বেদের দর্শন ও শিক্ষাও সাধারণ্যের অবোধ্য ছিলো। রামমোহন রায় নিজের ব্যাখ্যা সহ সহজ ভাষায় এই অনুবাদকর্মটি সম্পন্ন করেন। একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি এরপর একে একে কেনোপনিষৎ (১৮১৬), ঈশোপনিষৎ (১৮১৬), কঠোপনিষৎ (১৮১৭), মাণ্ডূক্যোপনিষৎ (১৮১৭), গায়ত্রীর অর্থ (১৮১৮), মুণ্ডকোপনিষৎ (১৮১৯) ইত্যাদি সংস্কৃত গ্রন্থগুলো বাঙলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। রক্ষণশীল হিন্দু পণ্ডিতদের সঙ্গেও তিনি নিয়মিত বিতর্কে নামতেন। এসবের বাইরে তিনি বাঙলা ভাষার ব্যাকরণ নিয়েও গ্রন্থ প্রকাশ করেন গৌড়ীয় ব্যাকরণ নামে। রামমোহন রায়ের এই কীর্তিগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে গোলাম মুরশিদ তাঁকে ইটালীয় হিউম্যানিস্টদের সমান্তরালে রেখেছেন, যাঁরা কী না “মানুষ” পরিচয়টিকে ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে রেখেছিলেন।
ইটালীয় হিউম্যানিস্টদের সাথে এই সাদৃশ্য মুরশিদ টেনেছেন আরো দুজন বাঙালি সমাজ সংস্কারকের ক্ষেত্রেওঃ রাধাকান্ত দেব, এবং কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। দুজনই সংস্কৃত ভাষার চর্চা করেছেন, এবং ভারতীয় প্রাচীন জ্ঞান পুণোরোদ্ধারে ভূমিকা রেখেছেন। রাধাকান্ত দেবের শব্দকল্পদ্রুম, এবং কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্যাকল্পদ্রুম তাঁদের অন্যতম অবদান। এছাড়া অক্ষয়কুমার দত্ত ভারতবর্ষের বিভিন্ন উপাসক সম্প্রদায়কে নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করে গেছেন। বাঙালি সংস্কৃত পণ্ডিতদের মাঝে সবচেয়ে বড় নাম সম্ভবত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি প্রাচীন শাস্ত্র ও সাহিত্যের পাঠোদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, বিশেষত একই গ্রন্থের কয়েকটি করে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে সেগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতার একটি উদাহরণ মুরশিদ দিয়েছেনঃ কালিদাস রচিত মেঘদূত সম্পাদনার সময় বিদ্যাসাগর ৩৭টি শ্লোক চিহ্নিত করেন যেগুলোকে তিনি কালিদাসের রচিত নয় বলে সিদ্ধান্ত দেন। পরবর্তীতে কাশ্মীরে মেঘদূত-এর একটি প্রাচীনতর পাণ্ডুলিপি উদ্ধার হলে আবিষ্কৃত হয় সেখানে সে ৩৭টি শ্লোক ছিলো না।
ব্রিটিশদের গড়া এশিয়াটিক সোসাইটিতে অনেক বাঙালি পণ্ডিতেরাও কাজ করেছেন। মাইকেল মধূসুদন দত্তের বন্ধু রাজেন্দ্রলাল মিত্র তাঁদের একজন। লুপ্ত বৌদ্ধশাস্ত্র এবং সাহিত্য পুণোরোদ্ধারে তিনি বড় ভূমিকা রেখেছেন। রাজেন্দ্রলাল ১৮৫৩ সালে বিবিধার্থ সংগ্রহ নামে একটি পত্রিকা চালু করেন যেখানে তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করতেন। মাইকেল তাঁর প্রথম কাব্য তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য এই পত্রিকাতেই বেনামে প্রকাশ করেন। এই কীর্তিমান মানুষদের প্রচেষ্টায় ১৮৩০ থেকে ১৮৫০ সালের ভেতর প্রাচীন ভারতবর্ষ সম্পর্কে জানবার ব্যাপারে একটি আগ্রহ গণমানুষের ভেতর জন্ম নেয় বলে মুরশিদ মন্তব্য করেছেন।
সমাজ সংস্কারের অন্যতম প্রধান শর্ত ধর্মের সংস্কার। কার্যত ধর্ম-সংস্কার না করে সমাজের সংস্কার সম্ভব নয়। বঙ্গদেশে ধর্ম-সংস্কারের আন্দোলনটি শুরু হয় রামমোহন রায়ের হাত ধরে। তিনি পৌত্তলিকতা বর্জিত একেশ্বরবাদী একটি সমাজ গঠন করতে চেয়েছিলেন, যেটিকে আমরা আ��� ব্রাহ্মসমাজ নামে জানি। এ সমাজের ব্রহ্মসভাতে শুদ্রদের বেদ শোনার অধিকার ছিলো, যদিও প্রচলিত লোকাচার অনুযায়ী শুদ্ররা বেদ শুনতে পারতেন না, তা নিষিদ্ধ ছিলো। তবে এ সমাজ পুরোপুরি বিকাশ লাভ করবার আগেই রামমোহন রায় বিলেতে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর এ সমাজের হাল ধরেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রামমোহন চেয়েছিলেন আচার বিবর্জিত একটি একেশ্বরবাদী সমাজ গড়তে, দেবেন্দ্রনাথ একে আচার-অনুষ্ঠানে বাঁধা একটি ধর্মীয় রূপ দেন। এই ধর্মটির নাম তিনি দেন ব্রাহ্মধর্ম। প্রচলিত হিন্দুধর্মকে তিনি এতটাই সংস্কার করেন, সে সময়ে কেউ ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলে হিন্দুসমাজে তার জাত চলে যেতো। ১৮৪৩ সালে দেবেন্দ্রনাথ রাজনারায়ণ বসুকে সাথে নিয়ে বিস্কিট খেয়ে, আর মদ্য পান করে হিন্দুধর্ম চিরতরে ত্যাগ করেন।
যে সময়টায় দেবেন্দ্রনাথ এই ধর্ম সংস্কারে নেমেছেন, সে সময়ে ধর্মবাদীরা বিভিন্ন ছেলেমানুষী ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে তাঁদের ধর্মটির শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চেয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ মুরশিদ উল্লেখ করেছেন এক নেতার কথা যিনি প্রচার করতেন ইংরেজি গডকে উল্টো করে লিখলে তা ডগ হয়, কিন্তু হিন্দুদের অবতার নন্দনন্দনকে উল্টো করে লিখলে নন্দনন্দনই থাকে (অতএব, আর কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবেন… )। মুরশিদ উল্লেখ করেছেন, এই ধার্মিকেরা নাকি দাবী করতেন “বেদে সব আছে”, অর্থাৎ কী না, আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের অবদান যা কিছু আমরা আমাদের চারপাশে দেখতে পাই, তার সবই হাজার হাজার বছর আগে বেদে বলা হয়ে গেছে, পশ্চিমারা এখন এই বেদ পড়েই এই সব কিছুর সন্ধান পেয়েছেন। বাঙলাদেশের মুসলমানেরা এমন একটি বয়ানের সাথে খুব ভালোভাবে পরিচিত; মসজিদে মসজিদে এমন একটি খুৎবা-ই তাঁরা ঈমাম সাহেবের কাছ থেকে শুনে আসেনঃ এ জগতের সমস্ত বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের কথা ১৪০০ বছর আগেই কোরানে এসেছে।। আমেরিকায় খ্রীষ্টানেরা ঠিক একই কথাটি চার্চে শুনে আসেন ফাদারদের কাছ থেকে, বাইবেলকে ঘিরে।
গোঁড়া ধর্মবাদীদের নানান ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় আস্থা হারিয়ে বাঙলার তরুণ সমাজের কেউ কেউ সে সময়ে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁদের ধারণা হয়েছিলো খ্রীষ্টধর্মই আধুনিকতার প্রথম ধাপ। কুলীন ব্রাহ্মণ কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৩২ সালে খ্রীষ্টধর্মের দীক্ষা নিয়ে বেশ সাড়া ফেলে দেন। প্রায় একই সময়ে মধুসূদন দত্ত, লালবিহারী দে, কৃষ্ণদাস পাল, হিন্দু কলেজের ছাত্র মহেশচন্দ্র ঘোষ, এবং আনন্দচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ ধর্ম পাল্টে খ্রীষ্টান হন। তবে হিন্দু ধর্ম ছেড়ে আসায় সমাজ, এবং সম্পত্তিচ্যুত হতে হতো বলে ধর্মান্তরের ব্যাপারটি সম্ভবত খুব আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি। ধর্মান্তর ছাড়াও সমাজ সংস্কারের অন্যান্য যে দিকগুলো ছিলো সেদিকে বাঙলার মুসলমানেরা আগ্রহী হননি মোটেই। রেনেসাঁন্স-এর আলোতে আগ্রহী হবার জন্য যে শিক্ষার প্রয়োজন সেটিই তাঁদের ছিলো না বলে মুরশিদ মন্তব্য করেছেন।
রামমোহন রায় যে তাঁর লেখালেখির মাধ্যমে ধর্ম এবং সমাজের সংস্কার করতে চেয়েছেন সে তো কিছুটা একটু আগেই জানতে পেলাম। মুরশিদ জানাচ্ছেন তাঁর ধর্ম সংস্কার শুধু হিন্দুধর্মের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তিনি দেশী খ্রীষ্টানদের পৌত্তলিকতার বিপক্ষেও নাকি লড়াই চালিয়েছেন; পত্রিকা এবং পুস্তিকায় বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে খ্রীষ্টান মিশনারিদের সঙ্গে ধর্মীয় নানান কুসংস্কার নিয়ে বিতর্কে নেমেছেন। শুধু ধর্ম সংস্কারই নয়, বাঙলার নারীদের অবস্থানের উন্নতির জন্যও কাজ করে গেছেন রামমোহন; সতীদাহ প্রথা রদ করবার উদ্দেশ্যে লণ্ডনের আইনসভায় বিতর্ক করতে যাওয়াটাই তাঁর বিলেতে যাবার অন্যতম কারণ ছিলো বলে মুরশিদ রায় দিয়েছেন।
নারীকল্যাণ প্রসঙ্গে অক্ষয়কুমার দত্তের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন মুরশিদ; তিনি ১৮৪২ সালে বিদ্যাদর্শন নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন, যেটিকে মুরশিদ সমসাময়িক অন্য যেকোন পত্রিকার চেয়ে অনেক বেশি নারীবান্ধব হিসেবে দেখেছেন। বাল্যবিবাহের দোষ, বালবিধবাদের বিবাহের ঔচিত্য, স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, নারীদের “কিঞ্চিৎ” স্বাধীনতা-ইত্যাদি বিষয়ে এই পত্রিকায় নিয়মিত লেখা প্রকাশ হতো। “স্ত্রীলোকের স্বাধীনতা” কথাটিও নাকি অক্ষয়কুমার দত্তই প্রথম ব্যবহার করেন সবার আগে। তিনি তত্ত্ববোধিনী নামে একটি ধর্মীয় পত্রিকা পরিচালনা করতেন, কিন্তু প্রার্থনার ফল যে শূণ্য, তা চমৎকার একটি গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সমীকরণটি ছিলোঃ
ইওরোপীয় রেনেসাঁন্স-এর মূল যে চেতনা, সেটির সারকথা মূলত অলৌকিকতায় অন্ধ বিশ্বাস রাখা ধর্মকেন্দ্রিক একটি সমাজকে মানবমুখী করে তোলা। এর মানে অবশ্য এই নয় যে ধর্মকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেয়া, বরং মানুষের ভেতরেই যে ঈশ্বরের মহিমার প্রকাশ ঘটেছে তাকে স্বীকার করে নেয়া। ইতালীর রেনেসাঁন্সের সময়কালে সৃষ্ট মানুষ এবং দেবদেবীদের ছবি এবং ভাস্কর্যে নগ্নতার ছড়াছড়ি দেখতে পাই আমরা; এর সাথে যে কামনার কোন সংযোগ নেই, বরং এই নগ্নতার মাধ্যমে মানুষ আর দেবতার পার্থক্য ঘুচিয়ে দেবার একটি প্রচেষ্টাই চোখে পড়ে-তা মুরশিদ তাঁর ইওরোপীয় রেনেসাঁন্স-এর আলোচনায় বারবার ব্যাখ্যা করেছেন।
দেবতা ও মানুষকে একই চোখে দেখার অমন একটি প্রচেষ্টা যে “বাঙলার রেনেসাঁন্স”-এও লক্ষ্যণীয়, তা মাইকেল মধুসূদনের কাব্য বিশ্লেষণ করে মুরশিদ আমাদের দেখিয়েছেন। প্রথম কাব্য তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য থেকে শুরু করে বেশীর ভাগ লেখাই মাইকেল লিখেছেন পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে (যেমনটি ইওরোপীয় রেনেসাঁন্স-এও ঘটেছে)। তিলোত্তমাসম্ভব-এর মূল বিষয় সুরাসুর, অর্থাৎ দানব ও দেবতার দ্বন্দ্ব। কিন্তু মাইকেল দেবতাদের প্রতি এখানে মোটেই সহানুভূতিশীল নন। তাঁর সহানুভূতি সুন্দ এবং উপসুন্দ-এই অসুর ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতি। এই দুজন অসুর মানুষ নয়, কিন্তু মাইকেল তাদের গড়েছেন দেবতার অলৌকিক ক্ষমতার সামনে অসহায় মানুষের আদলে। মুরশিদ মন্তব্য করেছেন সুন্দ, এবং উপসুন্দ-এই নাম দুটি বদলে দিলে তারা আসলে যেকোন মানুষের মতোই।
মাইকেলের শ্রেষ্ঠ কর্ম মেঘনাদবধ কাব্য নিয়েও মুরশিদ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যেখানে তিনি মানুষকে দেবতার ওপরে রাখার মাইকেলীয় প্রবণতাটির দিকে পাঠকের নজর ফেরাতে চেয়েছেন। ২ হাজারেরও বেশি বছর আগে যে রামকে নায়ক বানিয়ে বাল্মিকী রামায়ণ রচনা করেছেন, যে রামের নায়কোচিত দিকগুলো নিয়ে পরবর্তী কালের কবিরা ২ হাজার বছর ধরে কাব্য রচনা করে গেছেন, সেই রামকেই কাপুরুষ, ষড়যন্ত্রকারী, এবং দুর্বল চিত্তের একজন “মানুষ” হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন মাইকেল। এ কাব্যের নায়ক রামায়ণের খলনায়ক রাবণ। মেঘনাদবধ-এ দিনশেষে রাবণ রামের কাছে পরাজিত হলেও মাইকেল যে রাবণকেই গৌরবাণ্বিত করেছেন, এবং রাবণ-পুত্র মেঘনাদকে দেবতারা ষড়যন্ত্র করে নিরস্ত্র অবস্থায় কাপুরুষের মতো হত্যা করায় মাইকেল প্রকারান্তরে তাঁদের এক হাত নিয়েছেন-এমন একটি বয়ানই উঠে আসে মুরশিদের বিশ্লেষণে ।
কেবল কাব্যেই নয়, নাটকের মাধ্যমেও চিরাচরিত নায়ক-খলনায়কদের ভেঙে নতুন রূপে পরিবেশন করেছেন মাইকেল। মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে লেখা তাঁর প্রথম নাটক শর্মিষ্ঠা থেকেই তিনি এ ‘প্রপাগ্যাণ্ডা’ চালিয়েছেন। মহাভারতের শর্মিষ্ঠা নিজেই কৌশলে রাজা যযাতির কাছে আত্ননিবেদন করেছিলো। মুরশিদের মতে মাইকেলের কাছে এ কাহিনীটি স্থূল ঠেকায় তাঁর নাটকে তিনি পাত্রমিত্রদের পাল্টে দেন। শর্মিষ্ঠায় যযাতিই বরঞ্চ দেবযানী, এবং শর্মিষ্ঠা-উভয়ের কাছেই প্��েম নিবেদন করেন। মহাভারতের কাহিনীর নায়িকা দেবযানীকেও পাশে সরিয়ে শর্মিষ্ঠাকে নায়িকা বানিয়েছেন মাইকেল। পরবর্তী সময়ে জেমস টড-এর রাজস্থান ইতিবৃত্ত‘র কাহিনী নিয়ে মাইকেল লেখেন তাঁর ৩য় (অনেকের মতে তাঁর শ্রেষ্ঠতম) নাটক কৃষ্ণকুমারী। টড উল্লেখ করেছিলেন এ নাটকে কৃষ্ণকুমারীর আত্নবিসর্জনের ঘটনার সাথে ইউরিপিদেস-এর ইফেজেনিয়া অ্যাট আউলিস-এর অসাধারণ সাদৃশ্য রয়েছে; নিরপরাধ হয়েও রাজায় রাজায় বিরোধে কৃষ্ণকুমারীকে প্রাণ দিতে হয় নিয়তির পরিহাসে।
মেঘনাদবধ মহাকাব্য হিসেবে স্বীকৃত হবার পর সমসাময়িক আরো কয়েকজন কবি মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মেঘনাদবধের অনুকরণে বৃত্রসংহার কাব্য রচনা করেন। বৃত্রাসুরকে এখানে রাবণের ভূমিকায় দেখা যায়, আর রামের ভূমিকায় ইন্দ্রকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বালক বয়েসে এ কাব্যকে মেঘনাদবধের ওপরে স্থান দিয়েছেন, তবে কালের পরীক্ষায় সম্ভবত তা পাশ করে উঠতে পারেনি। হেমচন্দ্র ছাড়াও মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেছেন নবীনচন্দ্র সেন। শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে ৩টি গ্রন্থে এ মহাকাব্য লেখেন। গ্রন্থগুলো হলোঃ রৈবতক (১৮৮৬), কুরুক্ষেত্র (১৮৯৩), এবং প্রভাস (১৮৯৬)। আর্য-অনার্যের দ্বন্দ্ব ঘুচিয়ে অখণ্ড এক ভারত গড়ার আহ্বান জানান মূলত তিনি এ মহাকাব্যে।
১৯ শতকের বঙ্গীয় সমাজের সংস্কারমূলক আন্দোলনটির অন্যতম প্রধান একটি নাম হেনরি ডিরোজিও। মাত্র ষোল বছর বয়সে তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন। সাহিত্য, ধর্ম, সমাজ, দর্শন ইত্যাদি প্রসঙ্গে নিজের বৈপ্লবিক ধারণাগুলো দ্বারা ছাত্রদের একটি অংশকে তিনি ভীষণভাবে আলোড়িত করতে পেরেছিলেন। পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় রীতিনীতিগুলোকে রীতিমতো মধ্যমা দেখিয়ে তিনি ও তাঁর শিষ্যরা নানান “সমাজ-বিধ্বংসী” কাজে নামেন, যেমন গরুর মাংস খাওয়া, গুরুজনদের মান্য না করা, ইংরেজিতে কথা বলা, হিন্দুধর্মের প্রতি অসম্মান দেখানো… ইত্যাদি। ডিরোজিওর একজন শিষ্য রসিককৃষ্ণ মল্লিক প্রকাশ্যে হিন্দুধর্মকে অস্বীকার করেন; তিনি আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছিলেন গঙ্গাজলকে তিনি পবিত্র বলে মানেন না। মাধবচন্দ্র ঘোষ পত্রিকায় লিখেছিলেন তিনি যদি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে কোন কিছুকে ঘৃণা করে থাকেন তবে তা হলো হিন্দুধর্ম। সমাচারদর্পণ, এবং সমাচারচন্দ্রিকায় এঁদের কঠোর নিন্দা করে লেখা প্রকাশ হয়েছে নিয়মিত। এঁদেরই আরেকজন -দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়-১৮৪০ সালের দিকে আদালতের সহায়তায় একজন বিধাবকে বিয়ে করেন; তখনো পর্যন্ত বিধবা বিবাহের কোন আইন বা রেওয়াজ ছিলো না। এই সমাজবিরোধী “অপরাধ”টি করায় তাঁকে বঙ্গদেশ ছেড়ে উত্তর ভারতে গিয়ে বাস করতে হয়।
নিজ পছন্দে বিয়ে-ব্যাপারটিকে আজও দুই বাঙলার একটি বড় অংশের মানুষ রীতিমতো ঘৃণা করেন; দেড়শ বছর আগে এ সমাজটি কতটা দম বন্ধ করা ছিলো তা আজ আমরা কেবল কল্পনাই করতে পারি। বিশেষতঃ মেয়েদের ভীষণ অল্প বয়েসেই বিয়ে হয়ে যেতো, নিজের মতামত জানাবার কোন সুযোগ তাদের ছিলো না। খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ৩ মেয়েকে যথাক্রমে ১৪ বছর ৮ মাস, ১০ বছর ৮ মাস, এবং সাড়ে ১৪ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরও এমন পরিবারের নির্দেশে ৯ বছরের একটি বালিকাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর বিলেত যাবার পর তাঁর মনোজগতে বড় পরিবর্তন আসে, তিনি বিলেত থেকে পিতাকে চিঠি লিখে পাঠান যে তিনি তাঁর স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীকে লেখাপড়া শেখাতে চান, যাতে তিনি শিক্ষিত হয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তিনি সত্যেন্দ্রনাথকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে চান কি না। এর আগে তিনি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে প্রবেশ করবেন না। দাদার এ ঘোষণার ২০ বছর পরও রবীন্দ্রনাথ অনুরূপ কোন মনোভাব দেখাতে পারেননি বলে সমালোচনা করেছেন গোলাম মুরশিদ।
নাটক, কবিতা, উপন্যাসে্র পাশাপাশি সাহিত্যের আরো একটি ধারা ১৯ শতকে বিস্তার লাভ করেঃ জীবনচরিত। ১৮০১ সালে রামরাম বসু বাঙলার স্বাধীন বারো ভুঁইয়াদের একজনকে নিয়ে রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র লেখেন। এর প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর সমসাময়িক বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী লেখার একটি প্রচলন শুরু হয়; রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুরদের পাশাপাশি রামদুলাল দে, মতিলাল শীলের মতো সফল ব্যবসায়ীদের নিয়েও জীবনী লেখা হয়। মুরশিদ মন্তব্য করেছেন জীবনী লেখার কাজটা এই সময়টায় কারো কারো শখে পরিণত হয়, যেমন কিশোরীচাঁদ মিত্র। তিনি রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, মতিলাল শীল, রামগোপাল ঘোষ, চৈতন্যদেব প্রমুখের জীবনী রচনা করেছিলেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্যারীচাঁদ মিত্র বাঙলা সাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক হিসেবে স্বীকৃত, তবে তিনিও তারাচাঁদ চক্রবর্তী, ডেভিড হেয়ার, রামকমল সেন, কলসওয়ার্দি গ্র্যান্ট, এবং রুস্তমজী কাওয়েসজীকে নিয়ে জীবনী লিখেছেন।
জীবনী রচনার এই ধারা ১৯ শতকের শেষের দিকে এসে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায় বলে মুরশিদ উল্লেখ করেছেন, একদিকে সাহিত্যিকেরা, আরেকদিকে ঐতিহাসিক ব্যক্তিরা। এই ধারায় দীনবন্ধু মিত্র, ঈশ্বর গুপ্ত, বিদ্যাসাগর, মাইকেলদের পাশাপাশি সিরাজদ্দৌলা, মীরকাসিম, সীতারাম, শিবাজী এঁদের জীবনীর ব্যাপক প্রসার ঘটে। এই জীবনীগুলোতে অতিরঞ্জন এবং ভক্তির বাড়াবাড়ি লক্ষ করা যায় বলে মুরশিদ মন্তব্য করেছেন। যে নারীদের এ সমাজে এতদিন কোন মূল্যই প্রায় ছিলো না, তাঁরাও এবার জীবনীতে স্থান পেলেন। ১৮৫২ সালে নীলমণি বসাক নবনারী নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন যেখানে ৭টি পৌরাণিক, এবং ২টি ঐতিহাসিক নারী-জীবনী সংকলিত হয়। শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রাহ্মসমাজের নারীরা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেন জীবনীসাহিত্যে; ক্ষেত্রমোহন দত্তের স্ত্রীকে নিয়ে রচিত হয় কুমুদিনীচরিত (১৮৭২), দুর্গামোহন দাসের স্ত্রী ব্রহ্মময়ীকে নিয়ে লখা হয় জীবানালেখ্য (১৮৭৬)। এর পর ১৮৯১ সালে প্রকাশিত হয় মুক্তকেশীর জীবনচরিত। উল্লেখ্য, ইওরোপের রেনেসাঁন্সেও ঠিক এভাবেই আগের শতকগুলোতে চরম অবহেলিত নারীরা সাহিত্যের পাতায় জায়গা পেতে থাকেন। বাঙলার সমাজ সংস্কারকে রেনেসাঁন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবার এটি আরেকটি যুক্তি মুরশিদের।
জীবনী সাহিত্যের হাত ধরেই আত্নজীবনী লেখার রেওয়াজ চালু হয়। প্রথম মুদ্রিত আত্নজীবনী হিসেবে কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ইতিবৃত্ত (১৮৬৮) আজ স্বীকৃত। বঙ্কিমচন্দ্রের পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭২ সালে তাঁর সংক্ষিপ্ত আত্নজীবনী প্রকাশ করেন। কিশোরীচাঁদ মিত্রের স্ত্রী কৈলাসবাসিনী দেবী ১৮৫০-এর দিকে যে ডায়রী লেখা শুরু করেন সেটিই ২০ শতকে এসে আত্নজীবনী হিসেবে প্রকাশিত হয়। তবে প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্নজীবনী যিনি রচনা করেন তিনি ছিলেন একজন অর্ধশিক্ষিত গ্রাম্য নারী-রাসসুন্দরী দেবী। তিনি ৮-১০ বছর বয়েসে তাঁর বাড়ির পাঠশালায় অন্য ছেলেদের লেখাপড়া করতে দেখে নিজে নিজেই পড়তে শিখে ফেলেন। বহু বছর পর পুত্রকে চিঠি লেখার তাগিদে লেখাও শিখে ফেলেন। ১৮৬৯ সালে ৫৯ বছর বয়সে তিনি আপন মনে নিজের কথা লিখতে লিখতে একটি আত্নজীবনীই লিখে ফেলেন যা আমার কথা নামে ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত হয়। এর এক দশক পর নাট্যকার উপেন্দ্রনাথ দাসের ভ্রাতা দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী কৃষ্ণভাবিনী দাস তাঁর ইংল্যান্ডের জীবন নিয়ে লেখেন ইংলণ্ডে বঙ্গমহিলা।
ধর্ম, সাহিত্য, গান, চিত্রকলা, স্থাপত্যবিদ্যা, নারী স্বাধীনতা-সমাজের এই উপকরণগুলো যে ১৯ শতকের বাঙলায় ভীষণ এক সংস্কারের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এই সংস্কারমূলক আন্দোলনটিকে রেনেসাঁন্��� বলা যায় কি না সে নিয়ে বাঙালি পণ্ডিতেরা আজ দু ভাগে ভাগ হয়ে একে অপরের চুল ছেঁড়াছিঁড়ি করছেন। গোলাম মুরশিদের সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটেছেন বদরুদ্দীন উমর (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ)। তিনি রামমোহন রায়কে মুরশিদের মতো একপেশেভাবে নায়ক হিসেবে দেখতে পারেননি। রামমোহন ব্রিটিশ সরকারের কাছে দেন দরবার করে বাঙলার লবণ শিল্পকে ধ্বংস করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে পথে বসিয়েছেন, এবং দেশীয় অর্থনীতির বিকাশে বাধা দান করে ব্রিটিশের লাভের একাংশ নিজের পাতে তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। নিপীড়িত কৃষকদের পাশে বিদ্যাসাগর কেন এসে দাঁড়াননি সে প্রশ্ন উত্থাপন করে বিদ্যাসাগরকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। রামমোহন, এবং বিদ্যাসাগর-উভয়কেই কার্যত ব্রিটিশের দালাল হিসেবে দেখেছেন উমর।
গোলাম মুরশিদ অতি আবেগী। বদরুদ্দীন উমর বামপন্থী-যা মূলত ধর্মবাদীর একটি ঈশ্বরবিহীন প্রতিবিম্ব মাত্র। কাকে বেশি বিশ্বাস করা চলে?
ইওরোপের রেনেসাঁন্স-এর কথা তো আজ আমরা সব্বাই-ই জানি। দানবীয় সব পরিবর্তন ও সংস্কারের ভেতর দিয়ে নতুন এক ইওরোপের জন্ম হয়েছিলো মধ্যযুগে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকারে ঘেরা সে সমাজের খোলনলচেই পুরো পাল্টে দিয়েছিলো বুদ্ধিবৃত্তিক পুণর্জাগরণের এই আন্দোলনটি। ১৯ শতকে বঙ্গীয় সমাজেও এমন একটি সংস্কারমূলক আন্দোলন ঘটেছিলো, যাকে কেউ কেউ রেনেসাঁন্স হিসেবে অভিহিত করেন। গোলাম মুরশিদের এ বইটি লেখার মূল উদ্দেশ্য বাঙালি পাঠকের সঙ্গে সেই “বঙ্গীয় রেনেসাঁন্স”-এর পরিচয় করিয়ে দেয়া। বাঙলায় রেনেসান্স সত্যিই এসেছে কি না তা নিয়ে অনেকেরই হয়তো প্রশ্ন থাকবে মনে। অনেকটা সে প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যই বইয়ের প্রায় ৬৩% তিনি ব্যয় করেছেন ইতালীয় রেনেসাঁন্স-এর ইতিহাস বর্ণনায়। পাঠককে ১৫/১৬ শতকের সে রেনেসাঁন্স-এর একটি সম্যক ধারণা দিয়ে এরপর তিনি ১৯ শতকে বঙ্গীয় সমাজে ঘটে যাওয়া বড় বড় সামাজিক পরিবর্তনগুলোর দিকে চোখ ফিরিয়েছেন। দুই সমাজের সংস্কারকে সমান্তরালভাবে দেখতে এবং দেখাতে চেয়েছেন মুরশিদ।
সত্যিই কি বাঙলায় রেনেসাঁন্স ঘটেছিলো? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আগে চোখ ফেরাতে হবে সে সময়ের বঙ্গীয় সমাজ কী কী পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গিয়েছে সেসবের ওপর। কফির কাপটা নামিয়ে শক্ত হয়ে বসুন, ইতিহাসের রোলার কোস্টারে বসতে চলেছি এক্ষুনি!
ইওরোপে প্রোটো-রেনেসাঁন্স ১২-১৩ শতকের দিকে শুরু হয়েছিলো, যা পরিপূর্ণ রূপ পায় ১৫ শতকে এসে। যে সমাজ-সংস্কারকে মুরশিদ বঙ্গীয় রেনেসাঁন্স অভিহিত করেছেন, তার সূচনা ১৯ শতকের শুরুতে। দুই “রেনেসাঁন্স”-এর মাঝে প্রায় ৫০০ বছরের পার্থক্য। তবে এই বঙ্গীয় রেনেসাঁন্স নাকি প্রথমে শুরু হয়েছিলো এশিয়াটিক সোসাইটির কয়েকজন ইংরেজ পণ্ডিতের হাতে, ১৮ শতকের শেষে। ১৭৮৪ সালের জানুয়ারী মাসে ইস্ট ইণ্ডিয়া কম্পানির কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন; ভারতবর্ষের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ভূগোল ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা ছিলো এদের লক্ষ্য। এই সোসাইটির একজন পণ্ডিত উইলিয়াম জোনস একদিন অতর্কিতে ঘোষণা করেন সংস্কৃত (এবং, বাঙলা সমেত উত্তর ভারতের ভাষাসমূহ) এবং ইওরোপীয় ভাষাগুলো আসলে একে অপরের আত্নীয়; এরা ইন্দো-ইওরোপিয়ান পরিবারের অন্তর্গত। এর অব্যবহিত পরেই ১৮৩৬-৩৮ সালের দিকে জেমস প্রিন্সেপ প্রায় ২০০০ বছর পর সম্রাট অশোকের সময়ের ব্রাহ্মীলিপি পাঠোদ্ধার করেন। অশোক এবং তাঁর সময়কাল নিয়ে পুরোদমে গবেষণা শুরু হয় এরপরই।
গোলাম মুরশিদ রাজা রামমোহন রায়কে (তাঁর) বাঙলার রেনেসাঁন্সের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। ইওরোপের রেনেসাঁন্সে বহুভাষাবিদ পণ্ডিতেরা বিভিন্ন ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কাজ অনুবাদ করে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। রামমোহন রায়কেও তেমনি একটি ভুমিকাতেই দেখেছেন মুরশিদ। তিনি বাঙলা, এবং ইংরেজির পাশাপাশি আরবী, ফার্সি, হিন্দী, সংস্কৃত-এই ভাষাগুলো শিখেছিলেন, এমনকি, বাইবেলের আদি গ্রন্থ (ওল্ড টেস্টামেন্ট) পড়বার জন্য তিনি হিব্রিউও নাকি রপ্ত করেছিলেন। আমার মতো অনেকেরই হয়তো ভীষণ অবাক লাগবে জেনে, ১৮০৩ সালে রামমোহন রায় তাঁর প্রথম যে বইটি প্রকাশ করেন, সেটি তিনি লিখেছিলেন ফার্সি ভাষায় (তুহফাতুল মুয়াহেদিন)। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের এই বইটির ভূমিকা আবার লিখেছিলেন আরবী ভাষায়।
তুহফাতুল-এর এক যুগ পর ১৮১৫ সালে রামমোহন বেদান্ত গ্রন্থ নামে একটি বই প্রকাশ করেন, যেখানে বেদের সংস্কৃত শ্লোকগুলোর আলোকে হিন্দুধর্মকে একেশ্বরবাদী একটি জীবন বিধান হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছেন তিনি। বেদ-উপনিষদের বাঙলা অনুবাদ এর আগে খুব একটা প্রচলিত ছিলো না সম্ভবত, ফলে বেদের দর্শন ও শিক্ষাও সাধারণ্যের অবোধ্য ছিলো। রামমোহন রায় নিজের ব্যাখ্যা সহ সহজ ভাষায় এই অনুবাদকর্মটি সম্পন্ন করেন। একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি এরপর একে একে কেনোপনিষৎ (১৮১৬), ঈশোপনিষৎ (১৮১৬), কঠোপনিষৎ (১৮১৭), মাণ্ডূক্যোপনিষৎ (১৮১৭), গায়ত্রীর অর্থ (১৮১৮), মুণ্ডকোপনিষৎ (১৮১৯) ইত্যাদি সংস্কৃত গ্রন্থগুলো বাঙলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। রক্ষণশীল হিন্দু পণ্ডিতদের সঙ্গেও তিনি নিয়মিত বিতর্কে নামতেন। এসবের বাইরে তিনি বাঙলা ভাষার ব্যাকরণ নিয়েও গ্রন্থ প্রকাশ করেন গৌড়ীয় ব্যাকরণ নামে। রামমোহন রায়ের এই কীর্তিগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে গোলাম মুরশিদ তাঁকে ইটালীয় হিউম্যানিস্টদের সমান্তরালে রেখেছেন, যাঁরা কী না “মানুষ” পরিচয়টিকে ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে রেখেছিলেন।
ইটালীয় হিউম্যানিস্টদের সাথে এই সাদৃশ্য মুরশিদ টেনেছেন আরো দুজন বাঙালি সমাজ সংস্কারকের ক্ষেত্রেওঃ রাধাকান্ত দেব, এবং কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। দুজনই সংস্কৃত ভাষার চর্চা করেছেন, এবং ভারতীয় প্রাচীন জ্ঞান পুণোরোদ্ধারে ভূমিকা রেখেছেন। রাধাকান্ত দেবের শব্দকল্পদ্রুম, এবং কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্যাকল্পদ্রুম তাঁদের অন্যতম অবদান। এছাড়া অক্ষয়কুমার দত্ত ভারতবর্ষের বিভিন্ন উপাসক সম্প্রদায়কে নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করে গেছেন। বাঙালি সংস্কৃত পণ্ডিতদের মাঝে সবচেয়ে বড় নাম সম্ভবত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি প্রাচীন শাস্ত্র ও সাহিত্যের পাঠোদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, বিশেষত একই গ্রন্থের কয়েকটি করে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে সেগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতার একটি উদাহরণ মুরশিদ দিয়েছেনঃ কালিদাস রচিত মেঘদূত সম্পাদনার সময় বিদ্যাসাগর ৩৭টি শ্লোক চিহ্নিত করেন যেগুলোকে তিনি কালিদাসের রচিত নয় বলে সিদ্ধান্ত দেন। পরবর্তীতে কাশ্মীরে মেঘদূত-এর একটি প্রাচীনতর পাণ্ডুলিপি উদ্ধার হলে আবিষ্কৃত হয় সেখানে সে ৩৭টি শ্লোক ছিলো না।
ব্রিটিশদের গড়া এশিয়াটিক সোসাইটিতে অনেক বাঙালি পণ্ডিতেরাও কাজ করেছেন। মাইকেল মধূসুদন দত্তের বন্ধু রাজেন্দ্রলাল মিত্র তাঁদের একজন। লুপ্ত বৌদ্ধশাস্ত্র এবং সাহিত্য পুণোরোদ্ধারে তিনি বড় ভূমিকা রেখেছেন। রাজেন্দ্রলাল ১৮৫৩ সালে বিবিধার্থ সংগ্রহ নামে একটি পত্রিকা চালু করেন যেখানে তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করতেন। মাইকেল তাঁর প্রথম কাব্য তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য এই পত্রিকাতেই বেনামে প্রকাশ করেন। এই কীর্তিমান মানুষদের প্রচেষ্টায় ১৮৩০ থেকে ১৮৫০ সালের ভেতর প্রাচীন ভারতবর্ষ সম্পর্কে জানবার ব্যাপারে একটি আগ্রহ গণমানুষের ভেতর জন্ম নেয় বলে মুরশিদ মন্তব্য করেছেন।
সমাজ সংস্কারের অন্যতম প্রধান শর্ত ধর্মের সংস্কার। কার্যত ধর্ম-সংস্কার না করে সমাজের সংস্কার সম্ভব নয়। বঙ্গদেশে ধর্ম-সংস্কারের আন্দোলনটি শুরু হয় রামমোহন রায়ের হাত ধরে। তিনি পৌত্তলিকতা বর্জিত একেশ্বরবাদী একটি সমাজ গঠন করতে চেয়েছিলেন, যেটিকে আমরা আজ ব্রাহ্মসমাজ নামে জানি। এ সমাজের ব্রহ্মসভাতে শুদ্রদের বেদ শোনার অধিকার ছিলো, যদিও প্রচলিত লোকাচার অনুযায়ী শুদ্ররা বেদ শুনতে পারতেন না, তা নিষিদ্ধ ছিলো। তবে এ সমাজ পুরোপুরি বিকাশ লাভ করবার আগেই রামমোহন রায় বিলেতে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর এ সমাজের হাল ধরেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রামমোহন চেয়েছিলেন আচার বিবর্জিত একটি একেশ্বরবাদী সমাজ গড়তে, দেবেন্দ্রনাথ একে আচার-অনুষ্ঠানে বাঁধা একটি ধর্মীয় রূপ দেন। এই ধর্মটির নাম তিনি দেন ব্রাহ্মধর্ম। প্রচলিত হিন্দুধর্মকে তিনি এতটাই সংস্কার করেন, সে সময়ে কেউ ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলে হিন্দুসমাজে তার জাত চলে যেতো। ১৮৪৩ সালে দেবেন্দ্রনাথ রাজনারায়ণ বসুকে সাথে নিয়ে বিস্কিট খেয়ে, আর মদ্য পান করে হিন্দুধর্ম চিরতরে ত্যাগ করেন।
যে সময়টায় দেবেন্দ্রনাথ এই ধর্ম সংস্কারে নেমেছেন, সে সময়ে ধর্মবাদীরা বিভিন্ন ছেলেমানুষী ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে তাঁদের ধর্মটির শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চেয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ মুরশিদ উল্লেখ করেছেন এক নেতার কথা যিনি প্রচার করতেন ইংরেজি গডকে উল্টো করে লিখলে তা ডগ হয়, কিন্তু হিন্দুদের অবতার নন্দনন্দনকে উল্টো করে লিখলে নন্দনন্দনই থাকে (অতএব, আর কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবেন…)। মুরশিদ উল্লেখ করেছেন, এই ধার্মিকেরা নাকি দাবী করতেন “বেদে সব আছে”, অর্থাৎ কী না, আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের অবদান যা কিছু আমরা আমাদের চারপাশে দেখতে পাই, তার সবই হাজার হাজার বছর আগে বেদে বলা হয়ে গেছে, পশ্চিমারা এখন এই বেদ পড়েই এই সব কিছুর সন্ধান পেয়েছেন। বাঙলাদেশের মুসলমানেরা এমন একটি বয়ানের সাথে খুব ভালোভাবে পরিচিত; মসজিদে মসজিদে এমন একটি খুৎবা-ই তাঁরা ঈমাম সাহেবের কাছ থেকে শুনে আসেনঃ এ জগতের সমস্ত বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের কথা ১৪০০ বছর আগেই কোরানে এসেছে।। আমেরিকায় খ্রীষ্টানেরা ঠিক একই কথাটি চার্চে শুনে আসেন ফাদারদের কাছ থেকে, বাইবেলকে ঘিরে।
গোঁড়া ধর্মবাদীদের নানান ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় আস্থা হারিয়ে বাঙলার তরুণ সমাজের কেউ কেউ সে সময়ে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁদের ধারণা হয়েছিলো খ্রীষ্টধর্মই আধুনিকতার প্রথম ধাপ। কুলীন ব্রাহ্মণ কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৩২ সালে খ্রীষ্টধর্মের দীক্ষা নিয়ে বেশ সাড়া ফেলে দেন। প্রায় একই সময়ে মধুসূদন দত্ত, লালবিহারী দে, কৃষ্ণদাস পাল, হিন্দু কলেজের ছাত্র মহেশচন্দ্র ঘোষ, এবং আনন্দচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ ধর্ম পাল্টে খ্রীষ্টান হন। তবে হিন্দু ধর্ম ছেড়ে আসায় সমাজ, এবং সম্পত্তিচ্যুত হতে হতো বলে ধর্মান্তরের ব্যাপারটি সম্ভবত খুব আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি। ধর্মান্তর ছাড়াও সমাজ সংস্কারের অন্যান্য যে দিকগুলো ছিলো সেদিকে বাঙলার মুসলমানেরা আগ্রহী হননি মোটেই। রেনেসাঁন্স-এর আলোতে আগ্রহী হবার জন্য যে শিক্ষার প্রয়োজন সেটিই তাঁদের ছিলো না বলে মুরশিদ মন্তব্য করেছেন।
রামমোহন রায় যে তাঁর লেখালেখির মাধ্যমে ধর্ম এবং সমাজের সংস্কার করতে চেয়েছেন সে তো কিছুটা একটু আগেই জানতে পেলাম। মুরশিদ জানাচ্ছেন তাঁর ধর্ম সংস্কার শুধু হিন্দুধর্মের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তিনি দেশী খ্রীষ্টানদের পৌত্তলিকতার বিপক্ষেও নাকি লড়াই চালিয়েছেন; পত্রিকা এবং পুস্তিকায় বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে খ্রীষ্টান মিশনারিদের সঙ্গে ধর্মীয় নানান কুসংস্কার নিয়ে বিতর্কে নেমেছেন। শুধু ধর্ম সংস্কারই নয়, বাঙলার নারীদের অবস্থানের উন্নতির জন্যও কাজ করে গেছেন রামমোহন; সতীদাহ প্রথা রদ করবার উদ্দেশ্যে লণ্ডনের আইনসভায় বিতর্ক করতে যাওয়াটাই তাঁর বিলেতে যাবার অন্যতম কারণ ছিলো বলে মুরশিদ রায় দিয়েছেন।
নারীকল্যাণ প্রসঙ্গে অক্ষয়কুমার দত্তের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন মুরশিদ; তিনি ১৮৪২ সালে বিদ্যাদর্শন নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন, যেটিকে মুরশিদ সমসাময়িক অন্য যেকোন পত্রিকার চেয়ে অনেক বেশি নারীবান্ধব হিসেবে দেখেছেন। বাল্যবিবাহের দোষ, বালবিধবাদের বিবাহের ঔচিত্য, স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, নারীদের “কিঞ্চিৎ” স্বাধীনতা-ইত্যাদি বিষয়ে এই পত্রিকায় নিয়মিত লেখা প্রকাশ হতো। “স্ত্রীলোকের স্বাধীনতা” কথাটিও নাকি অক্ষয়কুমার দত্তই প্রথম ব্যবহার করেন সবার আগে। তিনি তত্ত্ববোধিনী নামে একটি ধর্মীয় পত্রিকা পরিচালনা করতেন, কিন্তু প্রার্থনার ফল যে শূণ্য, তা চমৎকার একটি গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সমীকরণটি ছিলোঃ
ইওরোপীয় রেনেসাঁন্স-এর মূল যে চেতনা, সেটির সারকথা মূলত অলৌকিকতায় অন্ধ বিশ্বাস রাখা ধর্মকেন্দ্রিক একটি সমাজকে মানবমুখী করে তোলা। এর মানে অবশ্য এই নয় যে ধর্মকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেয়া, বরং মানুষের ভেতরেই যে ঈশ্বরের মহিমার প্রকাশ ঘটেছে তাকে স্বীকার করে নেয়া। ইতালীর রেনেসাঁন্সের সময়কালে সৃষ্ট মানুষ এবং দেবদেবীদের ছবি এবং ভাস্কর্যে নগ্নতার ছড়াছড়ি দেখতে পাই আমরা; এর সাথে যে কামনার কোন সংযোগ নেই, বরং এই নগ্নতার মাধ্যমে মানুষ আর দেবতার পার্থক্য ঘুচিয়ে দেবার একটি প্রচেষ্টাই চোখে পড়ে-তা মুরশিদ তাঁর ইওরোপীয় রেনেসাঁন্স-এর আলোচনায় বারবার ব্যাখ্যা করেছেন।
দেবতা ও মানুষকে একই চোখে দেখার অমন একটি প্রচেষ্টা যে “বাঙলার রেনেসাঁন্স”-এও লক্ষ্যণীয়, তা মাইকেল মধুসূদনের কাব্য বিশ্লেষণ করে মুরশিদ আমাদের দেখিয়েছেন। প্রথম কাব্য তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য থেকে শুরু করে বেশীর ভাগ লেখাই মাইকেল লিখেছেন পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে (যেমনটি ইওরোপীয় রেনেসাঁন্স-এও ঘটেছে)। তিলোত্তমাসম্ভব-এর মূল বিষয় সুরাসুর, অর্থাৎ দানব ও দেবতার দ্বন্দ্ব। কিন্তু মাইকেল দেবতাদের প্রতি এখানে মোটেই সহানুভূতিশীল নন। তাঁর সহানুভূতি সুন্দ এবং উপসুন্দ-এই অসুর ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রতি। এই দুজন অসুর মানুষ নয়, কিন্তু মাইকেল তাদের গড়েছেন দেবতার অলৌকিক ক্ষমতার সামনে অসহায় মানুষের আদলে। মুরশিদ মন্তব্য করেছেন সুন্দ, এবং উপসুন্দ-এই নাম দুটি বদলে দিলে তারা আসলে যেকোন মানুষের মতোই।
মাইকেলের শ্রেষ্ঠ কর্ম মেঘনাদবধ কাব্য নিয়েও মুরশিদ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যেখানে তিনি মানুষকে দেবতার ওপরে রাখার মাইকেলীয় প্রবণতাটির দিকে পাঠকের নজর ফেরাতে চেয়েছেন। ২ হাজারেরও বেশি বছর আগে যে রামকে নায়ক বানিয়ে বাল্মিকীরামায়ণ রচনা করেছেন, যে রামের নায়কোচিত দিকগুলো নিয়ে পরবর্তী কালের কবিরা ২ হাজার বছর ধরে কাব্য রচনা করে গেছেন, সেই রামকেই কাপুরুষ, ষড়যন্ত্রকারী, এবং দুর্বল চিত্তের একজন “মানুষ” হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন মাইকেল। এ কাব্যের নায়ক রামায়ণের খলনায়ক রাবণ। মেঘনাদবধ-এ দিনশেষে রাবণ রামের কাছে পরাজিত হলেও মাইকেল যে রাবণকেই গৌরবাণ্বিত করেছেন, এবং রাবণ-পুত্র মেঘনাদকে দেবতারা ষড়যন্ত্র করে নিরস্ত্র অবস্থায় কাপুরুষের মতো হত্যা করায় মাইকেল প্রকারান্তরে তাঁদের এক হাত নিয়েছেন-এমন একটি বয়ানই উঠে আসে মুরশিদের বিশ্লেষণে ।
কেবল কাব্যেই নয়, নাটকের মাধ্যমেও চিরাচরিত নায়ক-খলনায়কদের ভেঙে নতুন রূপে পরিবেশন করেছেন মাইকেল। মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে লেখা তাঁর প্রথম নাটক শর্মিষ্ঠা থেকেই তিনি এ ‘প্রপাগ্যাণ্ডা’ চালিয়েছেন। মহাভারতের শর্মিষ্ঠা নিজেই কৌশলে রাজা যযাতির কাছে আত্ননিবেদন করেছিলো। মুরশিদের মতে মাইকেলের কাছে এ কাহিনীটি স্থূল ঠেকায় তাঁর নাটকে তিনি পাত্রমিত্রদের পাল্টে দেন। শর্মিষ্ঠায় যযাতিই বরঞ্চ দেবযানী, এবং শর্মিষ্ঠা-উভয়ের কাছেই প্রেম নিবেদন করেন। মহাভারতের কাহিনীর নায়িকা দেবযানীকেও পাশে সরিয়ে শর্মিষ্ঠাকে নায়িকা বানিয়েছেন মাইকেল। পরবর্তী সময়ে জেমস টড-এর রাজস্থান ইতিবৃত্ত'র কাহিনী নিয়ে মাইকেল লেখেন তাঁর ৩য় (অনেকের মতে তাঁর শ্রেষ্ঠতম) নাটক কৃষ্ণকুমারী। টড উল্লেখ করেছিলেন এ নাটকে কৃষ্ণকুমারীর আত্নবিসর্জনের ঘটনার সাথে ইউরিপিদেস-এর ইফেজেনিয়া অ্যাট আউলিস-এর অসাধারণ সাদৃশ্য রয়েছে; নিরপরাধ হয়েও রাজায় রাজায় বিরোধে কৃষ্ণকুমারীকে প্রাণ দিতে হয় নিয়তির পরিহাসে।
মেঘনাদবধ মহাকা���্য হিসেবে স্বীকৃত হবার পর সমসাময়িক আরো কয়েকজন কবি মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মেঘনাদবধের অনুকরণে বৃত্রসংহার কাব্য রচনা করেন। বৃত্রাসুরকে এখানে রাবণের ভূমিকায় দেখা যায়, আর রামের ভূমিকায় ইন্দ্রকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বালক বয়েসে এ কাব্যকে মেঘনাদবধের ওপরে স্থান দিয়েছেন, তবে কালের পরীক্ষায় সম্ভবত তা পাশ করে উঠতে পারেনি। হেমচন্দ্র ছাড়াও মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেছেন নবীনচন্দ্র সেন। শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে ৩টি গ্রন্থে এ মহাকাব্য লেখেন। গ্রন্থগুলো হলোঃ রৈবতক (১৮৮৬), কুরুক্ষেত্র (১৮৯৩), এবং প্রভাস (১৮৯৬)। আর্য-অনার্যের দ্বন্দ্ব ঘুচিয়ে অখণ্ড এক ভারত গড়ার আহ্বান জানান মূলত তিনি এ মহাকাব্যে।
১৯ শতকের বঙ্গীয় সমাজের সংস্কারমূলক আন্দোলনটির অন্যতম প্রধান একটি নাম হেনরি ডিরোজিও। মাত্র ষোল বছর বয়সে তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন। সাহিত্য, ধর্ম, সমাজ, দর্শন ইত্যাদি প্রসঙ্গে নিজের বৈপ্লবিক ধারণাগুলো দ্বারা ছাত্রদের একটি অংশকে তিনি ভীষণভাবে আলোড়িত করতে পেরেছিলেন। পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় রীতিনীতিগুলোকে রীতিমতো মধ্যমা দেখিয়ে তিনি ও তাঁর শিষ্যরা নানান “সমাজ-বিধ্বংসী” কাজে নামেন, যেমন গরুর মাংস খাওয়া, গুরুজনদের মান্য না করা, ইংরেজিতে কথা বলা, হিন্দুধর্মের প্রতি অসম্মান দেখানো… ইত্যাদি। ডিরোজিওর একজন শিষ্য রসিককৃষ্ণ মল্লিক প্রকাশ্যে হিন্দুধর্মকে অস্বীকার করেন; তিনি আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছিলেন গঙ্গাজলকে তিনি পবিত্র বলে মানেন না। মাধবচন্দ্র ঘোষ পত্রিকায় লিখেছিলেন তিনি যদি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে কোন কিছুকে ঘৃণা করে থাকেন তবে তা হলো হিন্দুধর্ম। সমাচারদর্পণ, এবং সমাচারচন্দ্রিকায় এঁদের কঠোর নিন্দা করে লেখা প্রকাশ হয়েছে নিয়মিত। এঁদেরই আরেকজন -দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়-১৮৪০ সালের দিকে আদালতের সহায়তায় একজন বিধাবকে বিয়ে করেন; তখনো পর্যন্ত বিধবা বিবাহের কোন আইন বা রেওয়াজ ছিলো না। এই সমাজবিরোধী “অপরাধ”টি করায় তাঁকে বঙ্গদেশ ছেড়ে উত্তর ভারতে গিয়ে বাস করতে হয়।
নিজ পছন্দে বিয়ে-ব্যাপারটিকে আজও দুই বাঙলার একটি বড় অংশের মানুষ রীতিমতো ঘৃণা করেন; দেড়শ বছর আগে এ সমাজটি কতটা দম বন্ধ করা ছিলো তা আজ আমরা কেবল কল্পনাই করতে পারি। বিশেষতঃ মেয়েদের ভীষণ অল্প বয়েসেই বিয়ে হয়ে যেতো, নিজের মতামত জানাবার কোন সুযোগ তাদের ছিলো না। খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ৩ মেয়েকে যথাক্রমে ১৪ বছর ৮ মাস, ১০ বছর ৮ মাস, এবং সাড়ে ১৪ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরও এমন পরিবারের নির্দেশে ৯ বছরের একটি বালিকাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর বিলেত যাবার পর তাঁর মনোজগতে বড় পরিবর্তন আসে, তিনি বিলেত থেকে পিতাকে চিঠি লিখে পাঠান যে তিনি তাঁর স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীকে লেখাপড়া শেখাতে চান, যাতে তিনি শিক্ষিত হয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তিনি সত্যেন্দ্রনাথকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে চান কি না। এর আগে তিনি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে প্রবেশ করবেন না। দাদার এ ঘোষণার ২০ বছর পরও রবীন্দ্রনাথ অনুরূপ কোন মনোভাব দেখাতে পারেননি বলে সমালোচনা করেছেন গোলাম মুরশিদ।
নাটক, কবিতা, উপন্যাসে্র পাশাপাশি সাহিত্যের আরো একটি ধারা ১৯ শতকে বিস্তার লাভ করেঃ জীবনচরিত। ১৮০১ সালে রামরাম বসু বাঙলার স্বাধীন বারো ভুঁইয়াদের একজনকে নিয়ে রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র লেখেন। এর প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর সমসাময়িক বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী লেখার একটি প্রচলন শুরু হয়; রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুরদের পাশাপাশি রামদুলাল দে, মতিলাল শীলের মতো সফল ব্যবসায়ীদের নিয়েও জীবনী লেখা হয়। মুরশিদ মন্তব্য করেছেন জীবনী লেখার কাজটা এই সময়টায় কারো কারো শখে পরিণত হয়, যেমন কিশোরীচাঁদ মিত্র। তিনি রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, মতিলাল শীল, রামগোপাল ঘোষ, চৈতন্যদেব প্রমুখের জীবনী রচনা করেছিলেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্যারীচাঁদ মিত্র বাঙলা সাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক হিসেবে স্বীকৃত, তবে তিনিও তারাচাঁদ চক্রবর্তী, ডেভিড হেয়ার, রামকমল সেন, কলসওয়ার্দি গ্র্যান্ট, এবং রুস্তমজী কাওয়েসজীকে নিয়ে জীবনী লিখেছেন।
জীবনী রচনার এই ধারা ১৯ শতকের শেষের দিকে এসে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায় বলে মুরশিদ উল্লেখ করেছেন, একদিকে সাহিত্যিকেরা, আরেকদিকে ঐতিহাসিক ব্যক্তিরা। এই ধারায় দীনবন্ধু মিত্র, ঈশ্বর গুপ্ত, বিদ্যাসাগর, মাইকেলদের পাশাপাশি সিরাজদ্দৌলা, মীরকাসিম, সীতারাম, শিবাজী এঁদের জীবনীর ব্যাপক প্রসার ঘটে। এই জীবনীগুলোতে অতিরঞ্জন এবং ভক্তির বাড়াবাড়ি লক্ষ করা যায় বলে মুরশিদ মন্তব্য করেছেন। যে নারীদের এ সমাজে এতদিন কোন মূল্যই প্রায় ছিলো না, তাঁরাও এবার জীবনীতে স্থান পেলেন। ১৮৫২ সালে নীলমণি বসাক নবনারী নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন যেখানে ৭টি পৌরাণিক, এবং ২টি ঐতিহাসিক নারী-জীবনী সংকলিত হয়। শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রাহ্মসমাজের নারীরা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেন জীবনীসাহিত্যে; ক্ষেত্রমোহন দত্তের স্ত্রীকে নিয়ে রচিত হয় কুমুদিনীচরিত (১৮৭২), দুর্গামোহন দাসের স্ত্রী ব্রহ্মময়ীকে নিয়ে লখা হয় জীবানালেখ্য (১৮৭৬)। এর পর ১৮৯১ সালে প্রকাশিত হয় মুক্তকেশীর জীবনচরিত। উল্লেখ্য, ইওরোপের রেনেসাঁন্সেও ঠিক এভাবেই আগের শতকগুলোতে চরম অবহেলিত নারীরা সাহিত্যের পাতায় জায়গা পেতে থাকেন। বাঙলার সমাজ সংস্কারকে রেনেসাঁন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবার এটি আরেকটি যুক্তি মুরশিদের।
জীবনী সাহিত্যের হাত ধরেই আত্নজীবনী লেখার রেওয়াজ চালু হয়। প্রথম মুদ্রিত আত্নজীবনী হিসেবে কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ইতিবৃত্ত (১৮৬৮) আজ স্বীকৃত। বঙ্কিমচন্দ্রের পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭২ সালে তাঁর সংক্ষিপ্ত আত্নজীবনী প্রকাশ করেন। কিশোরীচাঁদ মিত্রের স্ত্রী কৈলাসবাসিনী দেবী ১৮৫০-এর দিকে যে ডায়রী লেখা শুরু করেন সেটিই ২০ শতকে এসে আত্নজীবনী হিসেবে প্রকাশিত হয়। তবে প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্নজীবনী যিনি রচনা করেন তিনি ছিলেন একজন অর্ধশিক্ষিত গ্রাম্য নারী-রাসসুন্দরী দেবী। তিনি ৮-১০ বছর বয়েসে তাঁর বাড়ির পাঠশালায় অন্য ছেলেদের লেখাপড়া করতে দেখে নিজে নিজেই পড়তে শিখে ফেলেন। বহু বছর পর পুত্রকে চিঠি লেখার তাগিদে লেখাও শিখে ফেলেন। ১৮৬৯ সালে ৫৯ বছর বয়সে তিনি আপন মনে নিজের কথা লিখতে লিখতে একটি আত্নজীবনীই লিখে ফেলেন যা আমার কথা নামে ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত হয়। এর এক দশক পর নাট্যকার উপেন্দ্রনাথ দাসের ভ্রাতা দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী কৃষ্ণভাবিনী দাস তাঁর ইংল্যান্ডের জীবন নিয়ে লেখেন ইংলণ্ডে বঙ্গমহিলা।
ধর্ম, সাহিত্য, গান, চিত্রকলা, স্থাপত্যবিদ্যা, নারী স্বাধীনতা-সমাজের এই উপকরণগুলো যে ১৯ শতকের বাঙলায় ভীষণ এক সংস্কারের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এই সংস্কারমূলক আন্দোলনটিকে রেনেসাঁন্স বলা যায় কি না সে নিয়ে বাঙালি পণ্ডিতেরা আজ দু ভাগে ভাগ হয়ে একে অপরের চুল ছেঁড়াছিঁড়ি করছেন। গোলাম মুরশিদের সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটেছেন বদরুদ্দীন উমর (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ। তিনি রামমোহন রায়কে মুরশিদের মতো একপেশেভাবে নায়ক হিসেবে দেখতে পারেননি। রামমোহন ব্রিটিশ সরকারের কাছে দেন দরবার করে বাঙলার লবণ শিল্পকে ধ্বংস করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে পথে বসিয়েছেন, এবং দেশীয় অর্থনীতির বিকাশে বাধা দান করে ব্রিটিশের লাভের একাংশ নিজের পাতে তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। নিপীড়িত কৃষকদের পাশে বিদ্যাসাগর কেন এসে দাঁড়াননি সে প্রশ্ন উত্থাপন করে বিদ্যাসাগরকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। রামমোহন, এবং বিদ্যাসাগর-উভয়কেই কার্যত ব্রিটিশের দালাল হিসেবে দেখেছেন উমর।
গোলাম মুরশিদ অতি আবেগী। বদরুদ্দীন উমর বামপন্থী-যা মূলত ধর্মবাদীর একটি ঈশ্বরবিহীন প্রতিবিম্ব মাত্র। কাকে বেশি বিশ্বাস করা চলে?
এত সুন্দর একটা বই! কেবল লেখা নয়, বইয়ের পৃষ্ঠা, পরিবেশনা সবকিছুই খুব সুন্দর।
গোলাম মুরশিদের লেখা সবসময়ই ভালো লাগে। খুব সহজ-সাবলীল ভাষায় লেখেন। ইতিহাস লিখে যান গল্পের মত। পড়তে গেলে মনেই হয় না কোনো কাঠখোট্টা প্রবন্ধের বই পড়ছি।
এই বইয়ের বাড়তি পাওনা হল অসাধারণ সব ছবি আর তার বিশ্লেষণ। প্রাচীন কিছু বহুল প্রচলিত ছবি, ভাস্কর্য আগেও দেখেছি কিন্তু কিভাবে সোজা হয়ে আর এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্য ভিন্ন, কিভাবেই বা তাতে নতুনত্ব প্রকাশ পেল তা ভাবিনি৷
ইতালির রেনেসন্সের মূল প্রভাব দেখা যায় চিত্র ও ভাস্কর্যে আর বাংলায় বেশি পরিবর্তন আসে ভাষা ও সাহিত্যে। এ যুগে এসে অভ্র কিবোর্ডে এত সহজে বাংলা লিখতে গিয়ে ভাবতেও অবাক লাগে যে, কিভাবে বাংলা গদ্য লেখা হবে, কোথায় যতি চিহ্ন ব্যবহৃত হবে, কোন নিয়মে ভাষার পরিবর্তন হবে এসব মানুষকে রীতিমত গবেষণা করে, বই লিখে নির্ধারণ করতে হয়েছে!