ছোট্ট বই। জার্মানিতে নিজের দুই সন্তান ও তাদের পরিবারের কাছে বেড়াতে গিয়েছিলেন বেগম মমতাজ। সময়টা সত্তরের দশক। পুরো বইতে আছে জার্মানি ঘুরতে ঘুরতে লেখিকার যারপরনাই মুগ্ধতা, নিজের সন্তান ও নাতিদের নিয়ে উচ্ছ্বাস। বেগম মমতাজের আবেগ বেশি, সারল্যও চোখে পড়ার মতো কিন্তু সাথে সাথে এও বোঝা যায় যে, তিনি বেশ আধুনিক এবং ইতিবাচক পরিবর্তন সানন্দে গ্রহণ করতে রাজি।সবার সাথে অনায়াসে মিশে তিনি নিজের উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। স্বামী জসীম উদ্দীনের মতো অল্পতেই সন্তুষ্ট হওয়া ও মানুষের ইতিবাচক দিকের প্রতি জোর দেওয়ার অনুপম গুণটি লেখিকার মধ্যেও বিদ্যমান। এমনধারা মানুষ সময়ের সাথে সাথে বাড়ার কথা কিন্তু দুঃখজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এ কেমন উল্টোরথে যাত্রা!
সুখী সুখী এক বই। জসীম উদদীনের অ্যাপেনডিসাইটিসের শল্যচিকিৎসা চলছে ডয়েচলান্ডে, সেখানে তাঁর দুই ছেলে থাকে। বেগম মমতাজও হাজির হলেন সে মুল্লুকে। এই-ই তাঁর প্রথম বিদেশযাত্রা—অবশ্য বিদেশ বলতে ভারত-পাকিস্তানকে বাদ দিয়েই রাখতে হয়, যেহেতু তিনি অবিভক্ত ভারতবর্ষে জন্ম নেওয়া নাগরিক। যা দেখেন, তাতেই মুগ্ধ হন বেগম মমতাজ—তবে তাতে কৃত্রিমতা নেই, মেদ নেই। কেউ ডয়েচলান্ডের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুভার আলোচনা পড়তে চাইলে, তার জন্য এ বই নয়; খাদবিহীন পরিব্রাজনের আনন্দে ভাগ বসাতে চাইবে যে, তার জন্য। ডয়েটশেরিন পুত্রবধূ বা বেয়াই-বেয়াইনের সনে তাঁর সপ্রেম মুলাকাতে বুঝি, তিনি ও কবি কুয়ার ব্যাং ছিলেন না। হ্যাঁ, সুখী এই বইয়ে দুঃখ একবার তাঁকে ঘা দিয়েছে: ডয়েচ কিন্ডারগার্টেনগুলোর মতন প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশে নেই বলে। তবে মমতাজের আশা, স্বাধীনতা-উত্তর এই ১৯৭৫ সালে এমন অবস্থা হলে কী হবে, সত্যিকার স্বাধীনতা যেহেতু পেয়েইছি—অমন কিন্ডারগার্টেন আমাদের দেশেও হবে। কিন্ডারগার্টেন শব্দটা ধার করে আমরা রঙ্গশালা আর পেষণশালা বানিয়েছি [ব্যতিক্রমী দু-একটা আছে উদ্যোগ, যেমন সহজপাঠ উচ্চবিদ্যালয় (shahajpath.com)], কিন্তু দেশবিস্তারী কোনো সুবিদ্যালয় চোখে পড়ে নি। ৪৬ বছর এবং গুনতে থাকেন...
বেগম মমতাজ জসীম উদদীন এর অনেক দিনের ইচ্ছা জার্মানিতে যাওয়ার, কারণ সেখানে তার ছেলেরা ও নাতী নাতনীরা থাকেন। চাইলেই তাদের কাছে পাওয়া যায় না তাই মন ব্যাকুল থাকে সব সময় তাদের জন্য। অবশেষে একদিন সেই শুভ সময় আসলো। বড়মেয়ে হাস্না জার্মানির একটা রিটার্ন টিকিট এনে দিলেন। দিল্লি হয়ে ইরানের মাটিতে পা ফেলে, তেহরান, ইস্তাম্বুল, হামবুর্গ হয়ে তবে ছেলেদের কাছে পৌঁছালেন তিনি। কবি তখন জার্মানির হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, এপেন্ডিসাইটিসের অপারেশন হয়েছে।
জার্মানিতে নিজের লোকদের সাথে চমৎকার পরিবেশে চমৎকার কিছু সময় কাটানোর বর্ণনা নিয়েই " জার্মানির কিল শহরে" বইটা। বেগম মমতাজ জসীম উদদীন নিজের মত করে বর্ণনা করেছেন তাঁর দেখা সব প্রকৃতি ও ঘটনা সেই সাথে আছে অনুভূতির সুন্দর প্রকাশ। কবির লেখা পড়লেও কবি পত্নীর কোন লেখা আগে কখনও পড়া হয়নি, জানাই ছিলো না উনার লেখা কোন বই আছে।
জার্মানির অজানা অনেক কিছু উঠে এসেছে বইটাতে সেই সাথে কবি পত্নীর প্রতিভাও প্রকাশ ঘটেছে। বইটাতে কবির উপস্থিতি সামান্যই তাতে বইয়ের মাধুর্য হারায় যায়নি।
বেগম মমতাজ জসিমউদ্দীনের সত্তর দশকে জার্মান ভ্রমণ বৃত্তান্ত, যদিও পুরোপুরি ভ্রমণকাহিনী একে বলা যাবেনা। কিছুটা স্মৃতিকথা, কিছুটা ভ্রমণ, কিছুটা জর্নাল টাইপ। লেখিকার মুগ্ধ হবার ক্ষমতা অসীম। যা দেখেন তাতেই তিনি কিশোরীর মতো উচ্ছসিত হয়ে যান। লেখিকার আবেগের সারল্য আর লেখার প্রাঞ্জলতা সত্যই মুগ্ধ করেছে। এমন মানুষ পৃথিবীতে সত্যই খুব কম। সত্যিকার মুগ্ধতা আর সারল্যের অনাবিল বহিঃপ্রকাশ পড়তে চাইলে এই বইটি পড়া উচিত।
নাম শুনে ভ্রমণকাহিনী মনে হলেও এই বই ঠিক ভ্রমণকাহিনী না। এটি জসিম উদ্দীনের সহধর্মিণীর লিখা একটি ছোটখাটো স্মৃতিকথা। জার্মানীতে মূলত তার ছেলে ও নাতনীরা থাকতো। তাদের কথা ভেবে সারাক্ষণ মন পুড়ত তার। হঠাৎই একদিন যাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেল। জসিম উদ্দীনও তখন অসুস্থ অবস্থায় জার্মানীতে চিকিৎসা করাচ্ছেন। এই বই হয়ে উঠল জার্মানীতে অবকাশ কালীন ডায়েরী। এখানে তিনি ভ্রমণ কথা উল্লেখ করেছেন সাদামাটা ভাবে। তারচেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তার নাতনীদের প্রতি তার স্নেহ ও তাদের নিয়ে ভাবনার কথা। এই বইয়ের স্বতন্ত্রতা আসলে এই সরলতার ব্যাপারটা।
বই: জার্মানির কিল শহরে লেখিকা: বেগম মমতাজ জসীমউদ্দীন প্রকাশক: পলাশ প্রকাশনী মুদ্রিত মূল্য: ৮০ টাকা পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪০
বেগম মমতাজ জসীমউদ্দীনকে তো সবাই চেনেন। পল্লীকবি জসীমউদ্দীপ্ত নের অর্ধাঙ্গিনী। জীবনে প্রথমবারের মত জার্মানীতে যাত্রা নিয়ে লেখা জার্মানীর কিল শহরে৷ বইটিতে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে কাহিনির বর্ণনা দিয়েছেন লেখিকা। জার্মানীতে তার সফরের মূল কারণ আদরের দুই নাতি আমিন ও আরিফ৷ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই আমিন ও আরিফ পূর্ব পাকিস্তান থেকে জার্মানিতে পাড়ি জমায় তাদের মা-বাবার সাথে। সেখানেই তারা নতুন জীবন শুরু করে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর তারা আর বাংলাদেশে আসার সুযোগ পায়নি। এদিকে লেখিকা আদরের দুই নাতিকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। অবশেষে সেই মোক্ষম সুযোগ পেয়েও যান। লেখিকার বড় মেয়ে হাস্না জার্মানিতে যাওয়ার জন্য তাকে টিকিট কেটে দেন। অবশেষে লেখিকা নাতিদের কাছে পাওয়ার সুযোগ পান।
ইরান, ইস্তাম্বুল হয়ে অবশেষে জার্মানীর মাটিতে পা ফেলেন। আমিন, আরিফ বহুদিন পর দাদীকে কাছে পায়। তাদের কাছে তাদের দাদী "আম্মা"। কারণ তাদের বাবা দাদীকে আম্মা বলে ডাকেন তাই লেখিকা তাদেরও আম্মা। দুই নাতি আর ছেলের শ্বশুরবাড়ির সাথে কবির সাথেও দেখা হয় তার। কবি অসুস্থ তাই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
একদিন সাগরপাড়ে কবির সাথে লেখিকা ঘুরতে যান। কবির সাথে লেখিকাকে দেখে একজন জানতে চান লেখিকা ভারতীয় নাকি। তিনি হেসে উত্তর দেন তিনি বাংলাদেশী৷ এরপর কবিকে দেখিয়ে আরেকজন জিজ্ঞেস করেন তিনি আফ্রিকান নাকি। এই অংশটুকু পড়ার সময় অনেক হেসেছি৷ এখানে উল্লেখ্য, লেখিকা দেখতে খুব সুন্দরী ছিলেন। আর লেখক জসীমউদ্দীনের গায়ের রঙ কালো ছিল। এজন্যই সমুদ্রের ধারে ঘুরতে গেলে সেখানকার মেয়েরা তাদের এসব প্রশ্ন করে। আর কবি-কবিপত্নীর অনেক ছবি গুগলে সার্চ করলে পেয়ে যাবেন।
বাংলাদেশের মুক্তিয��দ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে নিয়ে সবাই নতুন স্বপ্ন বুনেছে। লেখিকাও তেমন স্বপ্ন দেখেন। সাথে কিছু আফসোসও তুলে ধরেছেন বইটিতে। যেমন এক জায়গায় দেখা যায় জার্মানীতে বরফ (স্নো ফল) পড়ার সময়েও জার্মানী শ্রমিকরা কোনোরকম বিরক্তি ছাড়াই কাজ করছে। ট্রেন, বাসে যাত্রী না থাকলেও দায়িত্বরত ব্যক্তিরা ঠিকই দায়িত্ব পালন করছে। বাড়ির মহিলারাও স্নো ফলের সময় বাড়ির বাইরে বাচ্চাদের শরীর, হাত মুখ ঢেকে বাইরে নিয়ে আসে। ছোট ছোট বাচ্চারা তীব্র শীত উপেক্ষা করে বাড়ির সামনে রাস্তায় সার ধরে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যায়। আমিনকে তীব্র শীতে একা একা স্কুলে যেতে দেখে লেখিকা কাঁদেন৷ তখন তার ছেলে বাঁসু তাকে বুঝান এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য জার্মানরা ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রম করে। এজন্যই এই জাতি এত উন্নত। লেখিকাও চোখের পানি মুছে মনকে শক্ত করেন, আমিন-আরিফের জন্য মন থেকে দোয়া করেন। অবশেষে বিদায়বেলার বর্ণনা দিয়ে লেখিকা লেখনীর সমাপ্তি টানেন।
পুরো বইটি চাইলেই এক বসায় শেষ করা যায়। অল্প সময়ে পড়ার জন্য চমৎকার একটি বই। যাদের ভ্রমণকাহিনি ভালো লাগে তারা চাইলে সংগ্রহে রাখতে পারেন।
জার্মানীর কিল শহরে-বেগম জসীমউদদীন কবির জার্মানী যাত্রার কিছুদিন পরই কবিপত্নী কিল শহরে ছেলে ও নাতিদের সাক্ষাৎ পেতে যাত্রা করেন।তার অল্পকিছুদিনের সফরের উপর তিনি এই বইটি লেখেন।এটা আসলে বই না বলে অনেকটা ডায়েরী বা দিনলিপি বলা চলে,মাত্র ৪০ পৃষ্ঠার।এটি যত না ভ্রমণকাহিনী,তারচেয়ে বেশি কবিপত্নীর ছেলে-নাতিদের সঙ্গ উপভোগ করার সুখ ও আকুলতা।কবিপত্নীর সাধারণ গৃহবধু ও সরল মমতাময়ী বাঙালী নারী রূপটি ফুটে উঠেছে তার লেখায়।