রাইখেনবাখ জলপ্রপাতের গভীরে শার্লক হোমসের ছায়া মিলিয়ে যাওয়ার পর লন্ডন যেন নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছে। কুয়াশায় ঢাকা রাস্তাগুলোতে এখন এক অচেনা নীরবতা—যেন শহরটা জানে, তার প্রহরী আর ফিরে আসবে না। যে মানুষটি অন্ধকারকে চিনতেন নিজের রক্তের মতো, তিনি এখন কেবল কিংবদন্তির নাম। কিন্তু অন্ধকার নায়কের মৃত্যুর শোক মানে না। সে ফিরে আসে, আগের চেয়েও সাহসী রূপে। হোয়াইটচ্যাপেলের ভেজা গলি থেকে আবারও জেগে উঠেছে এক পুরনো আতঙ্ক—এক শিল্পী, যে রক্ত দিয়ে আঁকছে মৃত্যুর প্রতিকৃতি। পুলিশ দিশেহারা, শহর নিঃশব্দ আতঙ্কে কাঁপছে। তবু, কোথাও এক ঘরে, পর্দা টানা জানালার পেছনে, কেউ ভাবছে ঠান্ডা মাথায়। মাইক্রফট হোমস। শার্লকের বড় ভাই। গোয়েন্দা নন, কিন্তু গোটা সাম্রাজ্যের মস্তিষ্ক। তার জগৎ কাদা নয়, কৌশল। তর্ক নয়, তথ্য। আলো নয়, ছায়া। ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়া তার কাছে কেবল শোক নয়—এ এক ব্যাঘাত, এক অসম্পূর্ণ সমীকরণ। এখন তাকেই নামতে হবে সেই দাবার ছকে, যেখানে প্রতিটি ঘুঁটি রক্তে রাঙা, আর প্রতিপক্ষ হয়তো মানুষই নয়। শার্লক নেই, কিন্তু খেলা এখনো চলছে। প্রশ্ন একটাই— বুদ্ধি দিয়ে কি থামানো যায় পাগলামিকে? নাকি এই লন্ডনের অন্ধকার গিলে ফেলবে তাকেও, যে ছায়া থেকে সবসময় দূরে থাকতে চেয়েছিল মাইক্রফট?
আজ শেষ করলাম কাবিদ হাসান শিবলীর লিখা - মাইক্রফট হোমসঃ রাইখেনবাখের পরে
শার্লক হোমসের গল্পের সাথে আমরা সবাই কমবেশী পরিচিত, পরিচিত বললে ভুল হবে আসোলে। ছোটবেলায় শার্লক পড়ে নাই এমন মানুষ খুজে পাওয়া দায় হবে। কিন্তু এই বইটা সেই পরিচিত জগতকে একদম নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ করে দিবে। রাইখেনবাখ ফলসের ঘটনার পর যখন শার্লক কার্যত অনুপস্থিত, তখন তার বড় ভাই মাইক্রফট হোমস কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেন, এই কনসেপ্টটাই বইটাকে শুরু থেকেই আলাদা করে তোলে।
গল্পটা ধীরে ধীরে এগোয়, কিন্তু সেই ধীরগতির মধ্যেই একটা টানটান উত্তেজনা আছে। কাবিদ খুব সুন্দরভাবে রহস্য, রাজনীতি, গোপন ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধির খেলা, সবকিছু একসাথে মিশিয়েছে। একদম পার্ফেক্ট চটপটি বানানোর মত। টক,ঝাল আর ছোলার পার্ফেক্ট মিশ্রণ। পড়তে পড়তে অনেক জায়গায় মনে হয়েছে, এটা শুধু একটা ডিটেকটিভ স্টোরি না, বরং পাওয়ার আর ইন্টেলিজেন্সের একটা খেলা।
মাইক্রফট চরিত্রটাই এই বইয়ের প্রাণ। তাকে শুধু শার্লকের বড় ভাই হিসেবে না দেখিয়ে, বরং একজন ঠান্ডা মাথার স্ট্র্যাটেজিস্ট এবং শক্তিশালী মস্তিষ্ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তার চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন, সবকিছুই বেশ ইমপ্রেসিভ লেগেছে।
ভাষা ছিলো সহজ, সাবলীল এবং পড়তে আরামদায়ক। চ্যাপ্টার ভাগ করে দেয়াতে বুঝতে সুবিধা হয়েছে। সংলাপগুলো ন্যাচারাল, আর বর্ণনাগুলো এমনভাবে দেওয়া যে দৃশ্যগুলো কল্পনা করতে অসুবিধা হয় না।
তবে আমার কাছে কিছু জায়গায় গল্পটা একটু স্লো মনে হয়েছে। বিশেষ করে মাঝামাঝি অংশে। ধৈর্য্য কম থাকলে যা হয় আরকি 😅 যারা আমার মত একটানা অ্যাকশন বা দ্রুত টুইস্ট আশা করেন, তাদের একটু ধৈর্য ধরে পড়তে হতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই বইটা ক্লাসিক শার্লক ইউনিভার্সের একটা ইন্টারেস্টিং এক্সটেনশন। যারা রহস্য, বুদ্ধির খেলা আর একটু গভীর গল্প পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটা মাস্ট রিড একটা বই ❤️❤️
উমমম, যদি রেটিং দেয়াই লাগে তবে আমি বলব ৯/১০ ❤️ হ্যাপি রিডিং 🥰
লন্ডন, ১৮৯২। লন্ডন সহ পুরো পৃথিবীর কাছে শার্লক হোমস ইতিমধ্যে মৃত। ভয়ঙ্কর ক্রিমিনাল মাস্টারমাইন্ড প্রোফেসর জেমস মরিয়ার্টির সাথে এক মরণপণ লড়াইয়ে তারা দুজনই হারিয়ে গেছে রাইখেনবাখ জলপ্রপাতের বিপুল জলরাশির মাঝে। শার্লকের মৃত্যুর পর কি লন্ডনের অপরাধ জগত থেমে গেছে? না। কোনভাবেই সেটা হয়নি। বরং ধীরগতিতে লন্ডনের হৃদপিণ্ড থেকে অপরাধ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আনাচে-কানাচে। শার্লক হোমসের অগ্রজ মাইক্রফট হোমসকে যারা চেনে, তারা জানে এই মানুষটা পর্দার আড়াল থেকেই খেলতে ভালোবাসে। খোদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মস্তিষ্ক বলা হয় তাকে। মহান এই সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখতে মাইক্রফট হোমস সর্বদা তার ডায়োজেনিস ক্লাবের আরামকেদারায় বসেই নানা চাল চেলে চলে। শার্লক বিহীন অপরাধপ্রবণ লন্ডনের জন্যও যে তাকে এবার খেলার হালটা ধরতে হবে, এটা সে নিজেও জানতো।
লন্ডনের সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকা হিসেবে কুখ্যাত হোয়াইট চ্যাপেলে হঠাৎ-ই এক নৃশংস খুনির আবির্ভাব ঘটেছে। খুনির টার্গেট নিরীহ পতিতা নারীরা, যারা নিজেদের দেহ বিক্রি করে মানবেতর জীবনযাপন করে। ছুরি দিয়ে সারা দেহ ফালাফালা করে এই হতভাগ্য নারীদের খুন করে চলেছে সে। খুনের ধরণ মিলে যায় ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার জ্যাক দ্য রিপারের সাথে। তবে কি সে আবারও ফিরে এসেছে? পতিতাদের এই খুনের কেসগুলো স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডই তো সামলাতে পারতো। তাহলে এসবের মধ্যে মাইক্রফট হোমসের মতো উঁচুস্তরের সরকারি কর্মকর্তা কেন জড়ালো? কারণ, নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মাইক্রফট বিলক্ষণ বুঝলো এই খুনগুলোর পেছনে কোন বিকৃতমস্তিষ্ক সাইকোপ্যাথ না, বরং এগুলোর পেছনে আছে ব্রিটিশ অভিজাত সমাজেরই কর্তাব্যক্তিদের কেউ।
হোয়াইট চ্যাপেলে ঘটে চলা ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে মাইক্রফট হোমসের সামনে এমন কিছু সত্য উন্মোচন করলো যেগুলো প্রকাশ পেলে পুরো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নড়ে উঠবে। আর সাম্রাজ্যের একজন বিশ্বস্ত সেবক হিসেবে তো সে এটা হতে দিতে পারে না, তাই না? তাই সে একটা জটিল খেলার ছক কষলো। আর এতে মাইক্রফট টেনে আনলো আইরিন অ্যাডলার নর্টনকে। হ্যাঁ, সেই আইরিন অ্যাডলার নর্টন যে কি-না অনিন্দ্যসুন্দরী হওয়ার সাথে সাথে অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও যেকোন ছদ্মবেশ ধারণে সবসময়ই সিদ্ধহস্ত। ছায়ার আড়ালে থেকে খেলতে অভ্যস্ত মাইক্রফট হোমস আর বিপজ্জনক সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে মুখিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর সুন্দরী আইরিন নর্টনের একটা অদ্ভুত জুটি সৃষ্টি হলো। মাইক্রফটের সুনিখুঁত প্ল্যান আর আইরিনের স্মার্ট এক্সিকিউশন - এই খেলার মূল প্রাণ। লক্ষ্য একটাই। সমাজের উঁচুস্তরে বসে থাকা কিছু মানুষের মুখোশ খুলে দেয়া।
জমে উঠলো খেলা। মাইক্রফট আর আইরিনের প্রতিপক্ষও নেহাত চুনোপুঁটি কেউ না, রীতিমতো প্রচণ্ড ক্ষমতাবান এক অভিজাত গোষ্ঠী। কুয়াশা আর ছায়ায় ঘেরা লন্ডনের বুকে সাধারণ মানুষের অজান্তেই রচিত হতে থাকলো এমন এক গল্প, যার প্রতিটা পরতে পরতে মিশে আছে অবৈধ প্রেম, লোভ, ব্ল্যাকমেইল, খুন আর প্রতিহিংসা। আর এই সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে মাইক্রফট হোমসের চাওয়া শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ যেন ছায়া আর কায়ার মাঝে চলতে থাকা এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলা, যে খেলায় কে জিতবে তা আগে থেকে আন্দাজ করাটাও দুষ্কর।
স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের অমর সৃষ্টি গোয়েন্দাকূল শিরোমণি শার্লক হোমস। মাইক্রফট হোমস তার বড় ভাই। শার্লক নিজেও স্বীকার করেছে মাইক্রফট তার চেয়েও অনেক বেশি স্মার্ট। কিন্তু আমাদের কাছে হোমস নামটা শুনলে বা পড়লে সবার আগে শার্লক হোমসের নামটাই মাথায় আসে। 'মাইক্রফট হোমস: রাইখেনবাখের পরে' উপন্যাসের মূল চরিত্র গোয়েন্দাকূল শিরোমণি শার্লক হোমস না, বরং তার অগ্রজ মাইক্রফট হোমস। এই উপন্যাসের কাহিনি স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের লেখা হোমস কাহিনি 'দ্য ফাইনাল প্রবলেম'-এর পর থেকে শুরু। মাইক্রফট হোমসকে নিয়ে এর আগে অনেকেই অনেক গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু আমি 'মাইক্রফট হোমস: রাইখেনবাখের পরে' বইটা পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়েছিলাম, কারণ এটার লেখক কাবিদ হাসান শিবলী একজন বাংলাদেশি বলে। ইভেন, এটা এই লেখকের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌলিক উপন্যাস।
মাইক্রফট হোমসকে নিয়ে লেখা এই উপন্যাসে কাবিদ হাসান শিবলী তার পার্টনার হিসেবে হাজির করেছেন আরেক পাঠকপ্রিয় চরিত্র আইরিন অ্যাডলার নর্টনকে। আইরিন অ্যাডলার নর্টনই একমাত্র নারী যে খোদ শার্লক হোমসকে বুদ্ধির খেলায় হারিয়ে দিয়েছিলো। যাকে শার্লক সম্বোধন করতো দ্য ওম্যান নামে। স্যার ডয়েলের এই অমর দুই সৃষ্টি মাইক্রফট হোমস আর আইরিন অ্যাডলার নর্টনের যুগলবন্দিই পুরো 'মাইক্রফট হোমস: রাইখেনবাখের পরে'-এর কাহিনিকে টেনে নিয়ে গেছে। লেখক কাবিদ হাসান শিবলী বেশ চমৎকার ভাবে ভিক্টোরিয়ান যুগের লন্ডনকে তাঁর লেখায় ধরতে পেরেছেন। সেই সাথে পাঠকের সামনে উপস্থিত করেছেন এমন এক রহস্য যার সাথে জড়িয়ে আছে জ্যাক দ্য রিপারের মতো কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারের নাম। তাঁর বর্ণনার ভঙ্গিও বেশ ভালো লেগেছে আমার। কিছু কিছু স্থানে কাব্যিকতা, আবার কিছু কিছু স্থানে মাইক্রফটের যৌক্তিক চিন্তাধারা বেশ ব্যালেন্সড একটা ওয়ে-তে দেখানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। বিশেষ করে 'মাইক্রফট হোমস: রাইখেনবাখের পরে'-এর ফার্স্ট হাফ পড়ার সময় মনেই হচ্ছিলো না এটা কাবিদ হাসান শিবলীর প্রথম মৌলিক উপন্যাস। মাইক্রফট আর আইরিনের কিছু অ্যাকশন সিকোয়েন্স ছিলো এই উপন্যাসে। সেগুলোও চমৎকার উপভোগ করেছি। এই ব্যাপারগুলো প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে।
বইটার সেকেন্ড হাফ থেকে ছোটখাটো কিছু রিপিটেশন জনিত সমস্যা লক্ষ্য করেছি। বিশেষ করে মাইক্রফটের নিজস্ব চিন্তার জগতে চলা কথাবার্তা অনেক জায়গাতেই রিপিটেটিভ মনে হয়েছে। এটার আধিক্য বেড়েছে শেষ কয়েকটা অধ্যায়ে গিয়ে। আমার মতে, শেষের দুই অধ্যায়ে একই কথার বারবার রিপিটেশন ছাড়া নতুন কিছুই নেই। 'মাইক্রফট হোমস: রাইখেনবাখের পরে'-এর মূল কাহিনির কিছু ছেঁড়া সুতাও শেষমেষ জোড়া লাগতে দেখিনি। যেমন, কাহিনিতে একজন শিল্পীর উল্লেখ করেছেন লেখক, যার সম্পর্কে পরবর্তীতে আর কিছুই খুঁজে পাইনি। রয়্যাল অপেরা হাউজের 'প্রেতাত্মা'-এর ব্যাপারেও লেখক সন্তোষজনক কোন সমাপ্তি দেখাননি। মাইক্রফট হোমসকে নিয়ে কাবিদ হাসান শিবলীর ট্রিলজি লেখার পরিকল্পনা আছে, যতোদূর জানি। হয়তো এর পরের খণ্ডগুলোতে এই ছেঁড়া সুতাগুলোর ব্যাপারে কিছু জানতে পারবো।
'মাইক্রফট হোমস: রাইখেনবাখের পরে'-এর দুই/তিন জায়গায় ডিউক ক্লেটনের নাম টাইপিং মিস্টেকের কারণে ডিউক ক্রেটন হয়ে গেছে। আর একটা ভুল চোখে পড়েছে। সেটা সম্পর্কে বলি। 'অভিনয় ১' অধ্যায়ের শুরুতে দেখা যায় মাইক্রফট হোমস একজন অপরাধীর সাথে সম্পর্কিত কিছু প্রমাণ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছেন, যে প্রমাণগুলো তাঁকে এনে দিয়েছে আইরিন অ্যাডলার। প্রমাণগুলো যাচাই-বাছাই করে মাইক্রফট আইরিনকে চিঠি লিখতে বসেন। ওই একই অধ্যায়েই আবার দেখা যায় আইরিন অ্যাডলার ওই একই অপরাধীর বিরুদ্ধে সদ্য একাট্টা করা প্রমাণগুলো নাড়াচাড়া করছে। ঠিক ওই সময় মাইক্রফটের চিঠি পায় সে। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় অবস্থান করা মাইক্রফট ও আইরিন দুজনের কাছে একই প্রমাণ, একইসাথে আবার একই সময়ে কিভাবে থাকতে পারে? এই জায়গাটায় সামন্য গোলমাল পাকিয়ে ফেলেছেন কাবিদ হাসান শিবলী।
লেখকের প্রথম মৌলিক কাজ হিসেবে 'মাইক্রফট হোমস: রাইখেনবাখের পরে'-এর প্লট আর এর এক্সিকিউশন যথেষ্ট কনভিন্সিং লেগেছে আমার কাছে। যে সীমাবদ্ধতাগুলোর কথা এই রিভিউয়ে উল্লেখ করলাম সেগুলো ভবিষ্যতে কেটে যাবে সে ব্যাপারে আমি মোটামুটি নিশ্চিত। কাবিদ হাসান শিবলী ইতিমধ্যে বাংলা অনুবাদ জগতে নিজের একটা সুনামের জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন। বিশেষ করে জাপানিজ থেকে সরাসরি বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা অসাধারণ। একইভাবে বাংলা মৌলিক থ্রিলারের জগতেও একটা সময় তাঁর শক্ত অবস্থান দেখার সুযোগ হবে, এই আশা করি। কারণ, যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে এই লেখকের ভেতরে। মাইক্রফট হোমস বিষয়ক পরবর্তী উপন্যাসগুলোর অপেক্ষায় থাকলাম।
বইটা পড়তে গিয়ে একটু ঝামেলার সম্মুখীন হয়েছিলাম। প্রায় শেষদিকে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করি আমার কপিটাতে একটা পুরো ফর্মা (১৬ পৃষ্ঠা) মিসিং। পরবর্তীতে আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন লেখক ও অনুবাদক অনিক শাহরিয়ার। তাঁকে ধন্যবাদ। 'মাইক্রফট হোমস: রাইখেনবাখের পরে'-এর প্রচ্ছদটা চমৎকার লেগেছে আমার কাছে। বইটার মধ্যে প্রচুর ইলাস্ট্রেশন ব্যবহার করা হয়েছে। সেগুলোও ভালো লেগেছে। এটার প্রোডাকশন আর কাগজের মান নিয়েও আমি স্যাটিসফায়েড।
শার্লক হোমসের কাহিনির অনুরাগীরা চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন 'মাইক্রফট হোমস: রাইখেনবাখের পরে'। লেখকের প্রথম বই হিসেবে চেষ্টা করেছেন নিজের বেস্টটা দেয়ার। পরীক্ষাটা করেই দেখুন না হয়। রিকমেন্ডেড।
১৮৯১ থেকে ১৮৯৪ সাল। রাইখেনবাগ জলপ্রপাতের সেই ভয়াবহ লড়াইয়ের পর শার্লক হোমস যখন নিখোঁজ, লন্ডনের অপরাধ জগৎ তখন বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। গ্রেট ডিটেকটিভের অনুপস্থিতিতে শহরের আকাশে যে কালচে মেঘ জমেছে, তা শেষ পর্যন্ত খোদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার উপক্রম করে। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসেন শার্লকের বড় ভাই, মাইক্রফট হোমস। ডায়োজিনিস ক্লাবের নিভৃত কোণ ছেড়ে তাকে নামতে হয় ধুরন্ধর সব অপরাধীদের মোকাবিলায়। তবে মাইক্রফটের কাজের ধরন একদমই আলাদা। তিনি শার্লকের মতো রোমাঞ্চ খুঁজতে মাঠে ছোটেন না। তার আসল শক্তি হলো ক্ষুরধার মগজ আর তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ক্ষমতা। দাবা বোর্ডের তুখোড় খেলোয়াড়ের মতো তিনি একের পর এক নিপুণ চাল দেন, যার সামনে কুপোকাত হতে বাধ্য বাঘা বাঘা শত্রু। এই মিশনে তার যোগ্য সঙ্গী হিসেবে যোগ দেন রহস্যময়ী আইরিন অ্যাডলার। মাইক্রফটের কাছে আবেগ যেখানে কেবলই একটা ‘দুর্বলতা’, আইরিন সেখানে সেই আবেগকেই ব্যবহার করেন মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে। বুদ্ধি আর সাহসের এক অদ্ভুত মিশেলে তিনি হয়ে ওঠেন মাইক্রফটের ছায়াসঙ্গী। পুরো কাহিনির এই টানটান বুনন আর চরিত্রগুলোর বিবর্তন লেখক কাবিদ হাসান শিবলী অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে মাইক্রফট হোমস আর আইরিন অ্যাডলারের মতো শক্তিশালী দুটি চরিত্রকে এক সুতোয় গেঁথে এমন একটি থ্রিলার উপহার দেওয়ার জন্য লেখককে আলাদাভাবে সাধুবাদ জানাতেই হয়। রাজপুরুষ থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে গড়া বিশাল এক ষড়যন্ত্রের জাল যেভাবে লেখক উন্মোচিত করেছেন, তা পাঠককে শেষ পর্যন্ত বইয়ে ডুবিয়ে রাখতে বাধ্য করে। শার্লক ভক্তদের জন্য এই নতুন রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি লেখকের এক দারুণ সৃজনশীল কাজ।
১৮৯১ থেকে ১৮৯৪ সালের মধ্যবর্তী সময়টুকু শার্লক হোমস নিখোঁজ ছিলেন। রাইখেনবাগ জলপ্রপাতের পাদদেশে লন্ডনের কুখ্যাত মাফিয়া মরিয়ার্টির সাথে হাতাহাতির একটা পর্যায়ে গিয়ে জলপ্রপাতে পতিত হন বিখ্যাত শার্লক হোমস।
শার্লক নিখোঁজ হলেও লন্ডনের অপরাধ তো আর থেমে থাকেনি। শার্লকের অনুপস্থিতিতে লন্ডনের আকাশে আবারও যেন অপরাধের কালো ছায়া নেমে আসে।
শার্লক হোমসের বড়ো ভাই মাইক্রফট হোমস ডায়োজিনিস ক্লাবে নিজের আসনে বসে সবই প্রত্যক্ষ করছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী বিষয়ের সাথে জড়িত তিনি।
একটা সময় এ অপরাধের কালো ছায়া যেন আরও গাঢ় হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিতে আঘাত হানে। তাই সদা তৎপর মাইক্রফটকে তাই এবার মাঠে নামতে হয়। তবে তিনি শার্লকের মতো রোমাঞ্চপ্রিয় নন। তাঁর মূল অস্ত্র হচ্ছে তীব্র বিশ্লেষণধর্মী ও ক্ষুরধার চিন্তা। সে-সব ব্যবহার করে তিনি একের পর এক পরিকল্পনা সাজান। ঠিক যেন এক সুদক্ষ দাবাড়ু বোর্ডে নিপুণ কৌশলে চাল দিচ্ছেন।
এ কাজে তাঁর যোগ্য সহচরী যেন আইরিন অ্যাডলার। মাইক্রফটের কাছে আবেগটা দুর্বলতা মনে হলেও আইরিনের কাছে এটাই অন্যতম প্রধান অস্ত্র। সেই সাথে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের মিশেলে তিনি এ কাজে মাইক্রফটের সহোযোগী হন।
তাদের যৌথ প্রযোজনায় যেন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় বিশাল ষড়যন্ত্র। যার সাথে জড়িত আছে রাজপুরুষ থেকে শুরু করে অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও!
দারুণ একটা লেগেছে কাহিনিটা। আমার মতে লেখক মাইক্রফট হোমস আর আইরিনের মাধ্যমে দারুণ একটা চিত্র সাজাতে পেরেছেন। সে হিসেবে লেখককে ধন্যবাদ দিতেই হয়!