মাও চেয়েছিলেন, ফসলের ক্ষতি করে এমন চারটি প্রাণীকে গ্রামবাসীরা মেরে ফেলুক, যার মধ্যে চড়াই অন্যতম। এবাদেও তিনটি প্রাণী হলো: ইঁদুর, মাছি ও মশা। গ্রামের বাচ্চাবুড়ো মাওয়ের নির্দেশ মতো মেতে উঠলো চড়াই মারতে। কেউ গুলতি দিয়ে মারছে, কেউ ঢাকঢোল বাজিয়ে চড়াইদের সারাদিন দৌড় করাচ্ছে। ক্লান্ত হয়ে দম হারিয়ে চড়াই নিজেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
রাষ্ট্রের প্রচারে নাকি রাষ্ট্রের ভয়ে সরল গ্রামবাসীরা তাদের স্বাভাবিক বুদ্ধি নির্বাসন দিয়ে এই মারাত্মক কাজে ঢলে পড়েছিলো, তা বলা মুশকিল, কিন্তু ফল হয়েছিলো মারাত্মক।
রাজর্ষি দাশ ভৌমিকের জন্ম ১৯৮৭ সালে কলকাতায়। সাত বছর বয়েসে যৌথপরিবার থেকে আলাদা হয়ে বাবামায়ের সঙ্গে মফস্বল শহর বারাসাতে চলে আসা। বাবা-মা সরকারী কর্মচারি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন বারাসাত মহাত্মা গান্ধী মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। কবিতা লেখার শুরু ক্লাস এইট থেকে, প্রথম কবিতার বই সতেরো বছর বয়েসে। এঞ্জিনিয়ারিং পড়েছেন শিবপুর বিই কলেজ থেকে, পরবর্তীতে আই আই টি কানপুরে। পিএইচডি নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে। গবেষণার বিষয় জলসম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন। বর্তমানে ব্যাঙ্গালোরের ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থানে অধ্যাপনা করছেন। প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সঙ্গে পাঁচ; একটি বাদে সব কবিতাবই স্বউদ্যোগে প্রকাশিত। গল্প-উপন্যাসের বই এযাবত আটটি; তিন প্রকাশক সৃষ্টিসুখ, বৈভাষিক এবং একতারা। গোয়েন্দা কানাইচরণ চরিত্রটির স্রষ্টা। কানাইচরণের উপন্যাসিকা 'চড়াই হত্যা রহস্য' অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ওয়েবসিরিজ 'ব্যাধ'। সম্প্রতি কয়েকটি বইয়ের ইংরিজি অনুবাদের কাজ শুরু হয়েছে।
"হয়েছেটা কী এই শহরের? সব সহজ মার্ডার আর সহজ জালিয়াতির কেসে ভরে গেছে। কেউ একটা কঠিন খুন অবধি করতে শেখেনি।"
"কলকাতা নুয়া"র মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে আগমন ঘটে গোয়েন্দা কানাইচরণের। সেই বইয়ের একমাত্র ঔপন্যাসিকা "চড়াই হত্যা রহস্য" এবার প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।
গোয়েন্দা বলতে আমাদের মানসচক্ষে যে ক্ষুরধার, স্থিতধী মানুষের চেহারা ভেসে ওঠে কানাইচরণ ঠিক তেমন নন। তাকে শার্লক হোমস, ফেলুদাগোত্রীয় ভাবাই যায় না। অতি জটিল রহস্যের সমাধান তিনি তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অল্প সময়েই করে ফেলতে পারেন না। লেখকের ভাষ্যমতে, তিনি হচ্ছেন ক্লাসের সেই ভালো ছেলেটা যে প্রতিদিন পড়ে পাশ করেছে। কানাইচরণ পুরোপুরি ছা-পোষা ব্যক্তি। সাধারণ মধ্যবিত্ত মধ্যবয়স্ক বাঙালির সব দোষই তার মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বহাল। তাহলে এই গোয়েন্দা সিরিজের বিশেষত্ব কী? একটা রহস্যের সমাধান করা দীর্ঘমেয়াদী, ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া। গোয়েন্দা গল্পে আমরা যে প্রক্রিয়ায় রহস্য সমাধান হতে দেখি বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি সময় ও শ্রম দিতে হয় গোয়েন্দাদের। তারা কল্পলোকের নায়ক নন, তাদেরও কার্য উদ্ধার করতে হাড়ভাঙা খাটুনি দিতে হয়। ছোট ছোট ক্লু ধরে ধরে, দিনের পর দিন উদয়াস্ত পরিশ্রম করে, একটা সূত্রের সাথে আরেকটা সূত্র জোড়া মিলিয়ে কানাইচরণ যেভাবে রহস্য সমাধানে ব্রতী হন তাতে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।এতে বিস্ময়কর কিছু নেই; তবে আছে বাস্তবসম্মত, নির্ভেজাল গোয়েন্দা গল্পের অনুভব। কানাইচরণের শ্রমসাধ্য ও কষ্টসাধ্য এ যাত্রা সফল হলে তার মতো আমরাও বিপুল আনন্দ বোধ করি। শুধু শেষটা নয়, পুরো যাত্রাপথটাই এক্ষেত্রে স্মরণীয়। "চড়াই হত্যা রহস্য" এর কল্যাণেই কানাইচরণ আমার প্রিয় একজন গোয়েন্দাতে পরিণত হয়েছিলেন এবং প্রিয় থাকবেন। আশা রাখি, সিরিজের পরের বই তিনটিও বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হবে।
অবশেষে এমন একজন বাঙালি গোয়েন্দার দেখা মিলল, যিনি কেবল নিজের চিন্তা বা অনুমানের ওপর নির্ভর করেন না বরং রহস্য সমাধানে তাকে প্রচন্ড খাটতে দেখা যায়। আমরা মেনে নিই শার্লক হোমস হয়তো একমাত্র চরিত্র, যিনি নিখাদ চিন্তাশক্তির জোরে মুহূর্তেই রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেন এরপর হয়তো ফেলুদা। কিন্তু বাস্তবে ঘরে ঘরে শার্লক হোমস বা ফেলুদা আমরা মানতে চাই না।
সময় বদলেছে। এখন আর পাঠক শুধু অনুমাননির্ভর গল্পে সন্তুষ্ট নয় (এ কথা বললাম কারণ বাংলাদেশের অনেক লেখক নিজের গোয়েন্দা চরিত্রকে হিরো বানাতে গল্পে অনেক কাকতালীয় ঘটনা ঘটান কিংবা কেবল অনুমান করেই অনেক কিছু করে ফেলেন) যদি সেটাই চাইতাম তাহলে শার্লকের কাছেই ফিরে যাওয়া যেত নতুন কারো বই পড়ার প্রয়োজন কী? বর্তমান পাঠক চায় গোয়েন্দার পরিশ্রম দেখতে, তার অনুসন্ধানের প্রতিটি ধাপ অনুভব করতে। সেই দিক থেকে এই বইটি এক কথায় অসাধারণ।
চিরকুট প্রকাশনী বইটি প্রকাশ না করলে হয়তো পড়াই হতো না তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। এখন অপেক্ষা পরবর্তী বইয়ের। মোটের ওপর, এটি যেন কেইগো হিগাশিনোর গল্পের এক কলকাতা সংস্করণ।
চিরায়ত গোয়েন্দা সাহিত্যের সূত্রমতে গোয়েন্দাদের কাছে আমরা অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর ভাগ্যের সুপ্রসন্নতার চরম শিখরে অবস্থান করা - এসমস্তই আশা করে থাকি। সেই সিলেবাসের বাইরে গিয়ে প্রথম দেখলাম গোয়েন্দা কানাইচরণকে, যিনি আদপে একজন রক্ত মাংসের মানুষ। পুলিশের আর দশটা গোয়েন্দা যেমন করে ডেস্ক জব, ফিল্ড ওয়ার্ক করে করে সমস্যা সমাধান করেন, এই ভদ্রলোক ঠিক সেরকম। এই নতুনত্বটা ভালো লেগেছে।
ব্যাপার হচ্ছে যে কলকাতার উপকণ্ঠের কিছু গ্রামে সিরিয়াল কিলিং হচ্ছে। মানুষ না, চড়ুই পাখির। প্রতিটি গ্রামেই অর্ধশতাধিক চড়ুইয়ের গলাকাটা লাশ ধানক্ষেতের পাশে পড়ে থাকতে দেখা গেল। এরপর সেই কেসটা আসে গোয়েন্দা কানাইচরণের হাতে। আর ঘটনার পালাবদলে আমরা দেখবো একজন পরিশ্রমী রক্ত মাংসের গোয়েন্দাকে। এন্ডিং ভালোই।
"ভয়ানক চিন্তাভাবনাকে কৌটোর মধ্যে আটকে রাখাই ভালো, দশজন জেনে ফেললে, অন্তত একজনের মাথায় সেটা চিরকালের মতো থেকে যায়"
মানুষ হত্যা, বা খুন নিয়ে তো অনেক তদন্ত হয়। আচ্ছা, যদি কোনো পশুপাখি মারা পড়ে? তাদেরকে খুন করা হয়? তাহলে কি একই ধারায় সে হত্যার তদন্তও সম্ভব?
সময়টা নব্বই দশকের। কানাইচরণ তখন লালবাজারের গোয়েন্দা। তৎকালীন ভারতীয় সিআইডির বদৌলতে একটা কেসের কথা জানতে পারে সে। কলকাতার আশেপাশে অনেক এলাকাতে মৃত চড়াই পাখি পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম প্রথম একে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও যখন একাধিকবার একই ঘটনা ঘটে, তখন নড়েচড়ে বসতে হয় বৈকি!
কিন্তু এভাবে অবলা পাখিকে কেন কেউ হত্যা করবে? কেন এতগুলো পাখির গলাকাটা লাশ উদ্ধার হবে? কী ক্ষোভ থাকতে পারে? পাখিরা প্রতিবাদ করতে পারে না। নিজেদের হত্যার বিচার জানাতে পারে না। তাই এ নিয়ে মাথাব্যথা খুব একটা থাকার কারণও নেই। তদন্ত চলবে আপন নিয়মে। কিন্তু এর জন্য শ্রম দেওয়া অনেকের ধাতে সয় না। এরচেয়েও গুরুত্বপুর্ণ কাজ আছে। তার দিকে নজর দিতে হবে।
কলকাতায় বইমেলা হবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্গাপূজার সময় আসন্ন। ইডেন গার্ডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে টেস্ট ম্যাচ আছে। এতগুলো নিরাপত্তায় নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে। সেখানে মারা পড়া সামান্য চড়াইদের জন্য ভাবনাচিন্তা করার সময় কোথায়? এত লোকবল তো পাওয়া সম্ভব নয়
কিন্তু কানাইচরণ নাছোড়বান্দা। এর শেষ দেখে ছাড়বে। পাখিগুলো মারা পড়েনি। তাদের খুন করা হয়েছে। আর একজন খুনির শাস্তি পাওয়া উচিত।
আজ এতগুলো বছর পর সেই গল্পটাই কানাই বলছে তার সমকর্মীদের সাথে। এই তো কিছুদিন পর অবসরে যাবে সে। কিন্তু তার স্মৃতিতে এখনো টাটকা নব্বই দশকের সেই সময়টা। কথা উঠেছিল সিরিয়াল কিলারদের নিয়ে। চড়াই হত্যার এ রহস্যও তো অনেকটা সিরিয়াল কিলিংয়ের মতো। আর তার গল্প বলতে গিয়ে ফিরে গিয়েছিল অতীতে!
গোয়েন্দা গল্পের ক্ষেত্রে আমরা চৌকষ, বুদ্ধি দিয়ে রহস্য সমাধান করা ফেলুদা, ব্যোমকেশ বা শার্লক হোমসদের চিনি। কিন্তু বাস্তবে আসলে তেমন হয় না। পুলিশের গোয়েন্দাদের রহস্য সমাধান করতে গায়ে গতরে খাটতে হয়। একটু একটু করে সূত্র খুঁজে বের করতে হয়। তার উপর নির্ভর করে পরবর্তী পদক্ষেপ।
এই বইটির মূল আকর্ষণ এটিই। তদন্তের গভীরতা খোঁজা। যেখানে কোনো সূত্র নেই, সেখান থেকে সূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা। যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই; পাইলে পাইতে পারো অমূল্য রতন। এভাবেই আসলে এগিয়েছে তদন্ত। ��িন্তু যেহেতু পাখিদের হত্যা নিয়ে এই তদন্ত, এখানে অনেকের গরজ তেমন নেই। যদিও একটা পর্যায়ে সিআইডি সিরিয়াসলি নিয়েছিল। কিন্তু সূত্র না পেয়ে, তারাও ধীরে ধীরে দমে গিয়েছে।
তখনকার সময়ের ভারতের চিত্র অবশ্য লেখক ভালোই তুলে ধরেছেন। সেই সাথে পাখিদের জীবনের চেয়ে দুর্গাপূজা, ক্রিকেট ম্যাচ বা বইমেলা যে গুরুত্বপুর্ণ তাও যেন প্রকট হয়ে উঠেছিল। পশুপ্রেম না থাকলেও নৈতিকতার দিক দিয়েও তো পাখিদের যে বা যারা এভাবে নির্দয়ভাবে হত্যা করেছে তাদের শাস্তি দেওয়া উচিত।
আমার কাছে বইটা ঠিক জমল না। কেন জানি না, খুব একটা আকর্ষণ বোধ করিনি। তদন্ত প্রক্রিয়া ভালো লেগেছে, কানাইচরণের মানবিক দিকের কারণে এই রহস্যে লেগে থাকা, সূত্র পেয়ে অপরাধী পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশ ইন্টারেস্টিং। তবে আমার আকর্ষণবোধ না করার মূল কারণ হয়তো লেখক আগেই মোটিভ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
লেখক বইতে একটা বাক্য ব্যবহার করেছেন — বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দিবো কীসে।
একজন পাঠক, যিনি প্রচুর থ্রিলার পড়েন; তিনি আগেই ধরে নিতে পারবেন এই অপরাধের কারণ। ফলে বইয়ের যে মূল আকর্ষণ, তা শুরুতেই ঝিমিয়ে পড়েছিল। যদিও একটা আকর্ষণ ছিল, এই অপরাধী কে? আর কীভাবে তাকে ধরা হবে? তবে মূল মোটিভ আগে উন্মুক্ত করে দেওয়ার কারণে কারণে লেখকের উদ্দেশ্য এখানে ব্যহত হয়েছে বলে মনে হয়েছে।
এর সাথে নকশাল আন্দোলন, সমাজ বিপ্লব, রাষ্ট্রযন্ত্র ঠিক করার চেষ্টা, পুঁজিপতি সমাজ ব্যবস্থার খন্ড অংশের যে কঠিন কঠিন বিষয় লেখক জুড়ে দিয়েছেন; তার কারণ ঠিক বোধ্যগম্য হয়নি। এত জটিল বিষয়বস্তুর মধ্য দিয়ে চড়াই পাখিকে কেন মারতে হবে? যে ঘটনার কারণে মারা হয়েছে, তার জন্য চড়াই পাখিই তো কেবল দায়ী না। আরও অনেক পতঙ্গও আছে। এখানে “স্প্যারো মুভমেন্ট” নামে একটা আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে, যা চায়নায় ঘটেছিল। এই সিরিয়াস বিষয়গুলোর কথা বিবেচনা করে চড়াইয়ের মতো ক্ষুদ্র পাখিদের হত্যা যে করতে পারে, সে সম্ভবত মানসিকভাবে অসুস্থ।
মোট কথা, এই বইটা আমার কাছে বিলো এভারেজ লেগেছে। কোনো আকর্ষণ বোধ করিনি। ছোট বই বলে এক টানে পড়ে ফেলতে পেরেছি। মাঝে ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। একঘেয়ে লাগছিল ভীষণ। পুলিশ প্রসিডিউয়াল বইগুলো একটু ধীর গতির হয় ঠিকই, কিন্তু তারপরও কোথাও একটা সাসপেন্স থাকে। চমক থাকে। এই বইতে সেসব কিছুই নেই। লেখকের লেখা অবশ্য ভালো। ভারতীয় লেখকের নিজস্ব ভাষার টান ছিল। কখনও পড়তে ভালো লেগেছে। কখনও বিরক্তি এসেছে। তারপরও বলা যায়, লেখকের গল্প বলার ধরন সাবলীল।
চিরকুট প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই বইটির প্রোডাকশন ভালো হয়েছে। ছাপার ভুল তেমন নেই। বাঁধাই ঠিকঠাক। প্রচ্ছদও সুন্দর।
পরিশেষে, বাস্তুসংস্থান বলে একটা বিষয় আছে। এই সমাজে প্রতিটি পশু পাখি বা পতঙ্গ গুরুত্বপুর্ণ। একজনের অত্যাচারে যখন তাকে নিধনের মতো গুরুতর কাজ করা হয়, তখন ইকো সিস্টেমে প্রচুর রদবদল হয়। তাতে যে ভাবনায় কাজ করা, তার হিতে বিপরীত হয়।
বেশ অন্যরকম একটা থ্রিলার বা গোয়েন্দা বই। কানাইচরণের নাম কলকাতা নুয়াতে শুনেছিলাম কিন্তু পড়া হয়নি। এবার দেশে সেই সিরিজের বই আসায় প্রথম পড়ার সুযোগ হলো। বেশ ভালো লেগেছে বইটা। মানুষের বদলে এখানে খুন হচ্ছে অসংখ্য চড়ুই পাখি। সেটার রহস্য সমাধানে কানাইচরণ লেগে থাকেন। ভিন্নধর্মী বইটা পড়লে বেশ ভালোই লাগবে।
শুরুটা দারুণ। হালকা হিউমার আছে। খুব উপভোগ করার মতো। কিন্তু এত ছোট বই হওয়ায় পরেও মাঝামাঝি গিয়ে গতি অনেকটাই পড়ে যায়। সেটুকু পার হয়ে ক্লাইম্যাক্সে আবার একদম হুড়মুড় করে সমাপ্তি।
পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়াটা ইন্টারেস্টিং তবে অপরাধীর মোটিভটা খুব শক্ত মনে হলো না।
আমরা অনেক খুনের ঘটনা পড়ি। রোজকার হয় হামেশাই ঘটে যায় এমন ঘটনা। মানুষ খুন হয় এটা তো বোঝা গেল এবং মানুষের খুনের বিচার ও আদালত করে। কিন্তু নব্বই দশকের লালবাজার পুলিশের গোয়েন্দা কানাইচরণ তৎকালীন সিআইডির মাধ্যমে এমন এক কেসের কথা জানতে পারেন যে রীতিমতো তিনি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন যে এটাও কী আদৌও সম্ভব!
খুন হচ্ছে চড়াই পাখি! শত শত চড়াই পাখির গলাকাটা দেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। কিন্তু অবলা পাখিদের খুন করা হচ্ছে কেন! কে এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে? পাখিদের উপর কারো এমন রাগ থাকতে পারে? কানাইচরণ ভেবে পেলেন না আসলে এই চড়াই পাখিগুলো খুন করে কার কোনদিক থেকে লাভ হবে। পাখিদের মৃতদেহ নিয়ে বিক্ষোভ হয় না, মিছিল হয় না। তাই হয়তো বিষয়টি নিয়ে কারো কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। আর পাখিদের নিয়ে কার কী মাথাব্যথা হবে।
পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা আছেন অন্য চিন্তা নিয়ে। তাদের হাতে কত কাজ আছে তাই না। কলকাতায় বইমেলা হবে, দুর্গাপূজার সময় আসন্ন। ইডেন গার্ডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে টেস্ট ম্যাচ আছে। এতগুলো নিরাপত্তায় নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে। আরো হাজারটা ঝামেলা। কোথাকার কোন চড়াই পাখিদের খুন নিয়ে কে মাথা ঘামায়। কানাইচরণ শুধুমাত্র মরিয়া হয়ে উঠেছেন। শত শত পাখি কে এভাবে খুন করছে এটা তো সাধারণ বিষয় হতে পারে না। এই খুনি কী মানসিকভাবে অসুস্থ নাকি অন্য কোনো কারণে এই হত্যা চলছে। কানাইচরণ ভাবছেন, তিনি এত সহজে এই কেস ছাড়বেন না।
আমরা কানাইচরণের মুখে শুনতে পারবো সেই চড়াই হত্যা রহস্য। যেটা তিনি এত বছর পর গল্প করছেন সহকর্মীদের সাথে। নব্বই দশকের স্মৃতি এখনো তার মনে জ্বলজ্বল করছে যেন। শেষমেষ কানাইচরণ কীভাবে চড়াই হত্যার খুনীকে ধরতে পারলেন সেটাই আসল রহস্য। কারণ খুনি তো যে কেউ নয়। এ খুন করছে চড়াই পাখিদের। নিরীহ পাখিরা কারো শত্রু হতে পারে ভাবতেই কেমন ইন্টারেস্টিং লাগছে না ব্যাপারটা?
----------পাঠ প্রতিক্রিয়া--------
গোয়েন্দা কাহিনি পড়তে গেলে সাধারণত পাঠকের মাথায় থাকে রহস্য, চমক আর শেষ মুহূর্তের বিস্ময়। এই বইটি সেই প্রচলিত ধারার থেকে অনেকটাই আলাদা। এখানে তদন্তের গতি ধীর, বাস্তবসম্মত এবং অনেক বেশি ক্লান্তিকর। কোনো অলৌকিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রহস্য উন্মোচন নয়; বরং ছোট ছোট সূত্র জড়ো করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা— সেটাই গল্পের মূল শক্তি।
পাখি হত্যার মতো একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তদন্ত শুরু হলেও সমাজের বড় অংশের উদাসীনতা বইটিতে বারবার চোখে পড়ে। মানুষের কাছে যেন উৎসব, রাজনীতি বা ক্রিকেটই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই উদাসীনতার মাঝেও কিছু মানুষ সত্য খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। বিশেষ করে কানাইচরণের চরিত্রটি মানবিক দিক থেকে বেশ ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। তার একরোখা অনুসন্ধান গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তবে বইটির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা মনে হয়েছে রহস্য নির্মাণে। শুরুতেই এমন কিছু ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ঘটনার কারণ অনেকটাই আন্দাজ করা যায়। ফলে পাঠকের কৌতূহল কিছুটা কমে যায়। বরং এরপর গল্পটা “কেন” থেকে সরে গিয়ে “কে” এবং “কীভাবে”র দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে।
লেখক গল্পের ভেতরে সমাজব্যবস্থা, বিপ্লব, কৃষি সংকট কিংবা রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো বিষয় ঢুকিয়েছেন। চিন্তার জায়গা তৈরি করলেও সবকিছু সবসময় গল্পের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে যায়নি। কিছু জায়গায় মনে হয়েছে বিষয়গুলো অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভারী হয়ে গেছে। বিশেষ করে চড়াই পাখি হত্যার মতো একটি ঘটনার সঙ্গে এত জটিল তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা জুড়ে দেওয়াটা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।
লেখার ধরন অবশ্য সাবলীল। কিছু কিছু বর্ণনা বেশ ভালো লেগেছে। কিন্তু একইসঙ্গে বইয়ের গতি অনেক সময় মন্থর মনে হয়েছে। টানটান উত্তেজনার অভাব ছিল, যেটা এই ধরনের গল্পে পাঠক সাধারণত খোঁজে।
সব মিলিয়ে, বইটি পড়ার অভিজ্ঞতা একেবারে খারাপ না হলেও খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। বাস্তবধর্মী তদন্তের দিকটি আলাদা লেগেছে, কিন্তু রহস্যের তীব্রতা আর সাসপেন্সের ঘাটতি বইটিকে আমার কাছে মাঝামাঝি পর্যায়েই আটকে রেখেছে।
----------আনুসাঙ্গিক--------
চিরকুট প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই বইটির প্রোডাকশন ভালো হয়েছে। চিরকুটের বইগুলোর বাঁধাই বেশ ভালো মজবুত থাকে। এটা একটা ভালো দিক কারণ বই সহজে ছেড়ে না। তাই বলা যায় এই বইয়েও বাঁধাই ঠিকঠাক। আর প্রচ্ছদও সুন্দর হয়েছে কারণ বইয়ের সাথে মিল রেখেই করা হয়েছে। বিশেষ করে কালার কম্বিনেশনটা ভালো লেগেছে বেশ।
এই পৃথিবীতে সবার বেঁচে থাকার অধিকার আছে। সৃষ্টিকর্তা কোনো কিছুই এমনি এমনি তৈরি করেননি। চড়াই পাখিরা আকাশে উড়তে উড়তে ডানা মেলে দেবে শূন্যে তবেই তো তাদের দেখতে ভালো দেখাবে। একজন চাইলেই পাখিদের খুন করে উৎসব করতে পারে না। তাতে কারণ যেটাই হোক। পাখিরা নিশ্চয়ই মানুষের মতো বুদ্ধিমান নয় যে তাদের করা ভুলগুলো এত গভীরে তলিয়ে ভাবতে ভাবতে তাদের সরিয়ে দিতে হবে।
খুবই দুর্বল লিখনি। বর্তমানে বসে কানাইচরন যখন ২০ বছর আগের ঘটনা বলছিলে তখন হঠাৎ করেই ২০১৭ সালের একটা ইনফো ডাম্প করে দিলেন! এই জিনিসটা খুব চোখে লেগেছে। আই মিন, তিনি বর্তমানে ফিরে এসে আলাপের মাধ্যকে সেটা করতে পারতেন। এছাড়া বাক্যগঠনও কেমন যানি! পড়ে আরাম পাইনি। সব মিলিয়ে এই বই পড়ার অভিজ্ঞতা খুব সুখকর ছিলনা। তবু পড়ে গেছি প্লটটার কারনে। ভালো বলতে শুধু এটুকুই।