কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
' ছায়া–অরণ্য ' বইটা মূলত ছয়টি ভিন্ন স্বাদের ছোট গল্পের সংকলন। প্রত্যেকটা গল্পই আবার বিদেশি কাহিনীর ছায়া অবলম্বনে লেখা। কাজী আনোয়ার হোসেনের ভাবানুবাদ ও অ্যাডাপ্টেশনের গুণে সবগুলো গল্পই অবশ্য মৌলিক বলে মনে হয়।
নিচে প্রত্যেকটা গল্পের আলাদা রিভিউ দিলামঃ
১.ছায়া–অরণ্যঃ ৪.৫/৫
রবার্ট মার্ফির " দ্য ফ্যান্টম সেটার " এর ছায়া অবলম্বনে লেখা হরর গল্পটা এই সংকলনের সবচেয়ে সেরা গল্প। দারুন লেগেছে আমার। দেশীয় প্রেক্ষাপটে যে গল্পটার অ্যাডাপ্টেশন দুর্দান্ত হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
২.ভয়াল দ্বীপঃ ৪/৫
আধিভৌতিক গল্প " ভয়াল দ্বীপ " এর প্লটটা বেশ ইউনিক,মিথলজির ছোঁয়া আছে গল্পটাতে। ক্লাইম্যাক্সের টুইস্টটা অপ্রত্যাশিত ছিল। লেখক শেষে একটা রহস্য রেখে দিয়েছেন। ভালো লেগেছে ব্যাপারটা। মূল গল্প উইলিয়াম স্যামব্রেটের " দ্য আইল্যান্ড অফ ফিয়ার "।
৩.যন্ত্রনাঃ ২.৫/৫
এক প্রতিশোধস্পৃহার গল্প " যন্ত্রনা " লেখা হয়েছে রে ব্র্যাডবেরির " দি অক্টোবর গেম " গল্পের ছায়া অবলম্বনে। শুরুটা বেশ ভালো,মাঝামাঝি জায়গায় এসে মনে হয়েছিল শেষে কিছু একটা ঘটবে। কিন্তু হুট করে শেষ হয়ে গেল গল্পটা। শেষটা কি হলো বোঝা গেল না।
৪.ইচ্ছাঃ ৩/৫
নকল টাকা বানানোর এক আশ্চর্য আখ্যান নিয়ে লেখা " ইচ্ছা " বেশ অন্যরকমের একটা গল্প। সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের এই গল্পটা আমার মোটামুটি লেগেছে। তবে ক্লাইম্যাক্সের টুইস্টটা যে ভালো ছিল তা মানতেই হবে। মূল গল্প টি. এল. শেরেডের " আই ফর ইনইকুইটি "।
৫.ঠিক দুক্ষুর বেলাঃ ১/৫
সংকলনের সবচেয়ে বাজে গল্প প্রাইস ডে এর " ফোর ও ক্লক " অবলম্বনে লেখা এই গল্পটা। গল্পের আগামাথা কিছুই নেই,কোথা থেকে যে কি হলো মোটেও বুঝতে পারিনি। টোটালি টাইম ওয়েস্ট!
৬.এপ্রিল ফুলঃ ৩.৫/৫
সংকলনের শেষ গল্প মূলত রবার্ট আর্থারের " জোকস্টার " গল্পটার অ্যাডাপ্টেশন। শুরুটা হালকাভাবে হলেও এর শেষটা অসাধারণ। পড়তে গিয়ে বাঘ ও মিথ্যাবাদী রাখালের গল্পটা বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল। সবকিছু নিয়েই যে মজা করা উচিত নয় এই গল্পটা তারই শিক্ষা দেয়। বেশ ভালো লেগেছে।
থ্রিলার গল্পের প্রেমে পড়ার উপলক্ষ ছিল এই বইটা। এত্ত সাবলীল, সুন্দর,ঝরঝরে ভাবানুবাদ ছিল যে বুঝতেই পারিনি সবগুলোই বিদেশী লেখকের গল্পের ছায়ায় লেখা। ছায়া অরণ্য চিরদিনই আমার কাছে প্রথম ভালোলাগার কিছু বইয়ের তালিকায় থাকবে। সেবার সোনালী সময়ের বইগুলো নিয়ে অবশ্য কিছু বলার নেই। এখন যতই অনেকে বলুক কাটছাঁট অনুবাদ, হেন তেন গা করিনা। কারণ সময় আর বইপ্রাপ্যতার সময়ের বিবেচনায় সেবা যা করেছিল তা এদেশে আর কোন প্রকাশনী করতে পারবেনা। এখন তো লেখক হয়ই অনুবাদ করে করে, কিন্তু কয়জনের অনুবাদ যে শিল্পের কাতারে যায় তা আর মনে করে মন বিষিয়ে উঠুক চাইনা।