এক দুঃখী যুবকের নাম কুসুমকুমার, যার একমাত্র সফলতা হল মাধ্যমিকে অঙ্কে ষাট নম্বর। ভাগ্যের ফেরে শান্তিপুরের ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে, কলকাতার বনেদিবাবু মধুসূদন দত্তের বাড়িতে সে আশ্রয় পেল সেই অঙ্কের জোরেই। কুলিগিরি থেকে শুরু হল তার নতুন জীবন। সে জীবন এতই সংক্ষিপ্ত যে তার সূর্যোদয় ঘটে তিলজলায়, সূর্যাস্ত শিবপুরে। অন্যদিকে মধুরিমা এক দরিদ্র পুরোহিতের মেয়ে। পাড়ার ক্যারাটে ক্লাবে মধুরিমাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে ভাবী বউ হিসেবে নির্বাচন করেছে এম. টেক. পাশ যুবক সুজিত। এদিকে সুজিতের মতো চাঁদ হাতে পেয়েও মধুরিমার বুকে ঝড় উঠল না। বরং এক প্রেমহীনতার যন্ত্রণা তাকে অবশ করে দিল। এমনই এক মুহূর্তে তার সঙ্গে দেখা হল কুসুমকুমারের। এদের তিনজনের নানা টানাপোড়েনে যারা ঢুকে পড়ে, তাদের একজন মধুসূদনের আপাতসুখী স্ত্রী কিন্তু গভীর বঞ্চনার শিকার নন্দরানী আর একটি পনেরো ভরির সীতাহার। শেষ পর্যন্ত মধুরিমা কাকে জীবনে গ্রহণ করবে? সুজিত নাকি কুসুমকুমার?
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
'আমি যা কুচ্ছিৎ দেখতে। কেউ আমাকে রেপও করবে না।' (পৃষ্ঠা ২০-২১) গঙ্গা নামের নারী চরিত্রটি বলছে।
' মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে দু-তিনজন সোলজার এসে আমাকে রেপ করুক। ' (পৃষ্ঠা ২৭)সংলাপটি মধুরিমা নামের মেয়েটির।
অত্যন্ত অস্বাভাবিক কথা৷ কোনো পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা কখনোই সম্ভব নয় একজন ধর্ষিত নারীর মনের অবস্থা। শীর্ষেন্দু একটি প্রেক্ষাপটে কথাটা মুখে গুঁজে দিলেন গঙ্গার।আরেকটি প্রেক্ষাপটে মধুরিমার। কিন্তু ন্যূনতম ভাবলেন না তিনি কী লিখছেন। স্বাভাবিক মনস্তত্ত্বসম্পন্ন কোনো লেখকের এমন কথা লেখা সম্ভব নয়। তা সুরুচির এবং নারীর প্রতি সম্মানবোধের পরিচয়ও বহন করে না। ব্যক্তিগতভাবে শীর্ষেন্দু খুবই রক্ষণশীল। কট্টরপন্থী যাকে বলে। রীতিমতো লোকের ছোঁয়া এড়িয়ে চলেন, অব্রাহ্মণের হাতে অন্নে জাত যাওয়ার ভয়ে ভীত থাকেন (বাদল বসুর 'পিওন থেকে প্রকাশক' বইটি পড়ুন)। এইসবই ব্যক্তি শীর্ষেন্দুর মতাদর্শ। কিন্তু লেখক শীর্ষেন্দুর কলমেও যখন গা ঘিন করা অত্যন্ত নীচুমানসিকতার পরিচয় পাই, তখন পাঠক হিসেবে কষ্ট লাগে। বড় বেদনা হয় শীর্ষেন্দুর মতো মানুষদের জন্য। এরা বড় লেখক, খ্যাতিমান ব্যক্তি হয়েছেন। কিন্তু মানবসন্তান হননি।
এই উপন্যাসটিতে শীর্ষেন্দু তাঁর ভিক্টোরিয়ান মানসিকতার বাইরে একটু পা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন, কেবল ঐটুকুই অন্য রকম বাকি সব শীর্ষেন্দুর নিজস্ব ব্যাকরণের নিয়ম মেনে করা। সিরিয়ালের কাহিনী যেমন তাদের নিজস্ব ব্যাকরণের পথ ধরে হাঁটে শীর্ষেন্দুর এইসব 'সামাজিক উপন্যাস' তেমন তাঁর নিজস্ব ব্যাকরণের পথ ধরে হাঁটে। বাস/ট্রেন/প্লেন/স্টিমারে বা ওসবের স্টেশনে অপেক্ষার সময় বা বড় ডাক্তারদের চেম্বারে রোগী দেখানোর জন্য লম্বা অপেক্ষার প্রহরে পড়ার জন্য বই। পড়া শেষ হলে বইটা ওখানেই ফেলে এলে ক্ষতি নেই।
এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘সুন্দরী’ মধুরিমা ভাবে, “বললে লোকে বিশ্বাস করবে না, মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে দু-তিনজন সোলজার এসে আমাকে রেপ করুক”। মধুরিমার ‘অসুন্দরী’ বান্ধবী গঙ্গার ভাষ্য আরও ভয়াবহ — “গঙ্গা অবশ্য দুঃখ করে বলল, আর আমি যা কুচ্ছিত দেখতে, কেউ আমাকে রেপও করবে না”। ধর্ষণ কতোটা বীভৎস ও ভয়াবহ ব্যাপার সেটা জ্ঞানসম্পন্ন প্রত্যেকটা নারী জানেন। ধর্ষণের ট্রমা যে একজন ধর্ষিতাকে সারা জীবন পদে পদে তাড়িত করে সেটাও নারীরা জানেন। তাই কোন নারীর পক্ষে ‘সোলজার দিয়ে গ্যাং রেপড্’ হবার স্বপ্ন দেখা সম্ভব না, অথবা নিজে ‘ধর্ষণযোগ্যা’ না অমনটা ভেবে দুঃখ করার কথা না।
ধর্ষণ নিয়ে নারীরা কী ভাবেন সেটা আমরা সবাই বহু বহু বার বহু বহু জায়গায় পড়েছি, শুনেছি। সেটা নিয়ে কারো দ্বিধা থাকার কথা না। মধুরিমা বা গঙ্গার মতো কোন মেয়ে কখনো ধর্ষিতা হবার স্বপ্ন দেখে কিনা সেটা আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন বয়সী নারীকে জিজ্ঞেস করে জানার চেষ্টা করেছি। তাদের মধ্যে যাদের বয়স অল্প তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল — এই প্রকার ইতর চিন্তা আমার মাথায় আসলো কী করে! তখন আমি তাদেরকে প্রেক্ষিতটা বই খুলে দেখিয়েছি। যাদের বয়স বেশি ছিল তাদের কেউ কেউ বলেছেন, একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসাবে এক জন নারী তার কাঙ্খিত মানুষের সাথে শারিরীকভাবে মিলিত হবার স্বপ্ন দেখেন, কখনো কখনো ধর্ষিতা হবার দুঃস্বপ্নও দেখে থাকতে পারেন; কিন্তু ধর্ষণ কখনোই একজন নারীর কাম্য বিষয় নয়। এখন যদি কেউ বলেন, আপনি কি সারা দুনিয়ার ৩.৮ বিলিয়ন নারীকে ইন্টারভিউ করেছেন যে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাচ্ছেন? সেক্ষেত্রে আমার উত্তর হচ্ছে কিছু কিছু বিষয় হচ্ছে বোধের, সেগুলোকে নিজের বোধ দিয়ে বুঝতে হবে।
এমন ভাবনা কোন কোন পুরুষের ভাবনাসঞ্জাত। সাহিত্যে এমন ভাবনার প্রকাশের ফলে কোন কোন পুরুষ পাঠক এমন ভাবতে পারে যে, নারীদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো ধর্ষিতা হতে আগ্রহী। অমন কোন পুরুষ পাঠক ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ হলে তাকে প্রেষণা দেবার দায় কি ঐসব সাহিত্যিকদের ওপরেও বর্তায় না?
ঠিক এই মুহূর্তেও বাজারে এমন শত-সহস্র ফিকশন আছে যেগুলোর পরতে পরতে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, নারীবিদ্বেষ, জাতবিদ্বেষ, ধর্মবিদ্বেষ, শ্রেণীশ্রেষ্ঠতার মতো বিষাক্ত আবর্জনা আছে। শিল্প, সাহিত্য, সৃষ্ট চরিত্রের দায় লেখকের না - ইত্যাদি খোঁড়া যুক্তি দিয়ে ঐসব ফিকশনের লেখকদের কি আমরা ডিসকাউন্ট করতে পারবো? সৃষ্টিশীল কর্ম যদি বলা হয় তাহলে শুধু ফিকশন কেন? নাটক-চলচ্চিত্র-সঙ্গীত-চিত্রকর্ম-শিল্পকর্ম ইত্যাদিতেও কি অনুরূপ বিষাক্ত আবর্জনাকে ডিসকাউন্ট করতে পারবো? আর শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করলেও পুরীষ তো পুরীষই থাকবে।
অনেক কিছুই লিখতে পারতাম, কিন্তু লিখলাম না। কারন এই জিনিসকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছি, এটাই বইটার সাত জন্মের ভাগ্য। শুধু এটাই বলবো, এই বইয়ের নাম যদি দ্বিচারিণীর বদলে 'বালস্য বাল' রাখা হতো এবং লেখকের নামের জায়গায় যদি 'হরিদাস পাল' ছাপা হতো তাতে এমন কোন ইতরবিশেষ হতো না। গু থেকে আর যাই হোক, গোলাপের সুবাস বের হয় না, সে যিনিই লিখে থাকুন না কেন।
মানুষ মুক্তি চায়। বন্দি দশা তো মানুষের জন্য নয়। তাও, আমরা বন্দী হয়ে যায়, সংসার নামক কারাগারে! কেউ চাই মুক্তি পেতে, কেউ ঐ পুতুল দশাকেই নিজের নিয়তি মেনে নেয়।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর লেখা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বেশ শক্ত পোক্ত লেখনী। বইটা শুরু থেকেই বেশ আগ্রহ জাগিয়ে তুললেও,শেষ টা কেন জানি বেশিই নাটকীয়!
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আমার একজন পছন্দের লেখক। অন্য লোকের কাছে অফেন্সিভ কথাবার্তা শুনলে, বেশি খারাপ লাগেনা। তবে পছন্দের লেখকের কলমে এসব কথাবার্তা এবং অতি নিম্ন মানের ইন্টেলেকচুয়ালিটির দর্শন পাওয়া গেলে, বিষয়টা মেনে নেওয়া বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।।
কুসুমকুমারের ডাক নাম টুলু। কলকাতার প্রত্যেকটা অলিগলি তার চেনা। নিজেকে গলিবাজ ভাবতে তার মন্দ লাগেনা। ছোটবেলা থেকেই অঙ্কে ভাল বলে ডাকনাম আছে। সেই অঙ্কের জোড়েই ৮০০ টাকা মাইনের একটা চাকরিও করে। মধুসূদন বাবুর ছেলেকে অঙ্ক পড়িয়ে তার বাড়িতে থাকার জায়গাও করে নিয়েছে।
টুলুদেরও বাড়ি ছিল নদিয়ায়। সেই বাড়ির আশা এখন ছেড়ে দেয়াই ভালো। কিভাবে কি হলো সেটা নাহয় বইটি পড়েই জানবেন। আপাতত ধরে নিন ও ভাসমান একটা ছেলে।
মধুরিমার বয়স সতেরো আঠারো। সবে মাধ্যমিক দিয়েছে। কলকাতা শহরেই থাকে। তাদের পাড়ায় নবকুমারি বলে একটা মেয়ে কিছুদিন আগে রেপ হল। এজন্যে পাড়ায় মিটিং টিটিং হচ্ছে। পাড়ার অতনুদা মেয়েদের আত্নরক্ষার জন্য কারাটে ক্লাসের ব্যবস্থা করলেন। মধুরিমা ও তার বান্ধবি গঙ্গা মিলে কারাটে ক্লাস করতে লাগল। দুদিন বাদেই ও বুঝতে পারল এসবে আসলে কোনও লাভ নেই। তাই কারাটে ক্লাস বাদ দিল। দুদিনের মাথায় তার নামে চিঠি এল,
কারাটে ক্লাসে কেনো আসছেন না? আমি যে আপনার জন্য অপেক্ষা করে থাকি।
দেড় লাইনের চিঠি। নিচে নাম সই করা আছে সুজিত। ঘটনাক্রমে এই সুজিতের সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। ছেলে কানাডায় যাচ্ছে। মেয়েকেও বিয়ের পর নিয়ে যাবে। এরকম পাত্র পেয়ে ওর মা বাবাও খুশি। কিন্তু মধুরিমার মধ্যে সুজিতের বেপারে কোনও অনুভূতি নেই। অনেকটা এরকম যে, বিয়ে হচ্ছে বলেই হচ্ছে। অতনু দা ওদের মেডিটেশন শেখাচ্ছিল। ও একাগ্রচিত্তে মেডিটেশন করে সুজিতের প্রতি ভালবাসা তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। হয়নি।
সুজিতের প্রতি ভালবাসা তৈরি করতে গিয়ে কিভাবে টুলুর প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়ে গেল সেটা মধুরিমা নিজেও জানেনা
এখানে কথা হল টুলুর সাথে মধুরিমার পরিচয় কেমনে হলো? একই শহরে থাকে, পরিচয় হয়ে যেতে কতক্ষন? টুলু যে বাড়িতে লজিং থাকে সে বাড়িতে মধুরিমার বাবা পূজো করে। বিশ্বকর্মাপূজোর দিন ঠাকুরমশাই না আসাতে টুলু মধুরিমাদের বাড়ি যায়।
বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়া মেয়ের সাথে কি টুলুর পরিণয় হবে? যদি হয়ও তাহলে ওদের পরিণয়ের পরিণাম কি? -আদী ভাই