উন্নয়ন-রাজনীতির সহজবোধ্য উদাহরণ তৈরির লক্ষ্যে বহুকাল আগে পুরো শহর এবং আমাদের জনপদ একটি সমাধিক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়। মৃতমানুষেরা সেদিন সন্তর্পণে তাদের মৃত্যুগান লিখে-লিখে একখণ্ড মলিন ‘বৃহৎ-বঙ্গ’ দিকচিহ্নহীন পৃষ্ঠার ভাঁজে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু বিবিধ দুর্যোগের পরম্পরা সেইসব মৃত্যুদৃশ্যকে আবারও হত্যা করে, অথবা অপরূপ সেই হত্যাচক্রের সঠিক দিনতারিখ অগোছালো করে ফেলে।
বর্তমান লেখক সেই অপ্রকাশিত জীবনপঞ্জির কিয়দংশ বাংলাভাষী পাঠকদের উদ্দেশ্যে সঙ্কলিত করেছেন। এই পাঠচক্র আমাদের পূর্বাপর সকল আত্মরক্ষার কলাকৌশল তছনছ করে, অথবা নিয়ে চলে ‘… এক অচিত নিক্রপলিসের ভেতর-উঠোনে, যেন মৃত্যু আমাদের জন্য কিঞ্চিৎ সহজ হয়, আর সুখকর হয়।’
মামুন হুসাইন ৪ মার্চ ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন কুষ্টিয়া জেলা শহরের কমলাপুরে। শৈশব-কৈশোর কেটেছে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলায়। পড়ালেখা করেছেন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। ১৯৭৭ সালে এসএসসি এবং ১৯৭৯ সালে আইএসসি পাস করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এমবিবিএস করেন ১৯৮৫ সালে। এরপর বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন-এর অধীনে ডাক্তার হিসেবে সরকারি চাকুরিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। মামুন হুসাইনের সাহিত্যে হাতেখড়ি আশির দশকে হলেও প্রাথমিক অবস্থায় তিনি সাহিত্যের ছোটকাগজগুলোতেই লিখতেন। বেশ পরে ১৯৯৫ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি’ প্রকাশ করেন। গ্রন্থটি প্রকাশের আগেই তিনি বাংলাদেশের গল্পধারায় সিরিয়াসধর্মী গল্পকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কথাসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য মামুন হুসাইন ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।
আমাকে আরো লম্বা হতে হবে। এজন্য যে বইটা আবার পড়লে যাতে এর বিষয়বস্তু আমার মাথার অনেক উপর দিয়ে না যায়। আমি এ বইকে রেইটও করতে পারছি না। না বুঝে কিভাবে করি?
'নিক্রপলিস' মামুন হুসাইনের ব্যতিক্রমধর্মী লেখা । এক কথায় একে গল্প, ফিকশন বা ডকুমেন্টেশন কিছুই বলা যায় না, বরং এসব কিছুর নতুন এক সন্নিবেশ বলতে হয় । বাস্তব চরিত্র, ঘটনা, ব্যক্তি, জীবন, কথা ও সম্পর্ক আছে লেখকের বর্ণনায় । আছে রাজনৈতিক বাঁক বদল, প্রেক্ষাপট ও নিকট থেকে দেখা বিশ্বাস ও অবিশ্বাস । উৎসর্গ পাতায় লেখাঃ- 'লক্ষ্যহীন, অর্থহীন, স্বল্পায়ু- কিন্তু সত্য । একটি অসাধারণ সত্য কবিতা যদি এইসব দিনে মাত্র সেইরকম একটি লিখতে পারতুম!' -সাতো হারুও
লেখার শুরুর লাইন থেকে মধ্যের দিকে যেতে যেতে যেন সাতো হারুওর কবিতার মত 'লক্ষ্যহীন, অর্থহীন, / স্বল্পায়ু/ কিন্তু সত্য' কথাগুলো মনে করায় । লেখার শুরুতে 'I could imagine no other reality than that which we normally see with our two eyes.' -Augustine এর কোট এর মত লেখকের অভিজ্ঞতা ও ঘটনা বর্ণনা চলতে থাকে । 'বারান্দা থেকে দেখলো - একখন্ড গৃহত্যাগী কটনবার্ড উড়ে আসার সময় ধূসর আতাগাছের পাতায় জড়িয়ে থাকা মাকড়সার জালে এইমাত্র আটকে গেল । কিছুদিন থেকে ওকে লম্বা কবিতায় পেয়েছে । অরফ্যানেজ থেকে কয়েক ছাত্র - এরকম নাম দিয়ে অনেক ক'টি বাক্য তৈরি করল মাথায় । জানালা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়- পাশের দোতলায় মেয়েটি 'লাইফ ইজ এলস হোয়ার' পাশে রেখে স্ট্যাটিক সাইকেলে অ্যারোবিক্স করছে । গত বিশ্বকাপের 'ব্রাজিল' লেখা টি-শার্ট আঁটো হয়ে মেয়েটির শরীরে লেগে থাকলে, ও কয়েকটি ইরোটিক কথা ভাবল- অ্যানপ্রটেক্টেড ইন্টারকোর্স হলে কত ঘন্টা পর কন্ট্রাসেপটিভস কার্যকর হয় জানো কি? কিম্বা স্পার্ম কত বেগে বেরোয়? ৫... ১৩... না ২৮ মাইল পার আওয়ার? ইটস এম.সি.কিউ, মাইডিয়ার' - পড়তে পড়তে কৌতুহলকে নিয়ে যাবে লেখক হয়ত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধ সময়ে যখন 'জেনারেল মঞ্জু বলছে হোয়াট ব্লাডি এরশাদ' বা কর্ণেল তাহের প্রহসন বা জিয়া হত্যা ঘটনা । লিখছেন '২১ জুলাই গভীর রাতে কর্ণেল তাহেরকে ফাঁসির মঞ্চে নেয়া হল । আম খেলেন । আমার লেখা কবিতাটি পড়লেন ফাঁসির মঞ্চে । ৪২ মিনিট সময় লাগে তার মৃত্যু হতে' ।
লেখায় আসতে থাকে লেখকের পরিচিত বা সন্মূখের কোন ব্যক্তি বা ঘটনার বর্ণনা । বাক্যের মধ্যে জোক ও হিউমার চর্চাও অব্যাহত থাকে । 'আমি ইমমোরাল, ঘুষ না নিলেও' বা 'স্বাতী এসেছিল । সুনীলর সামনে বলছে, টিভিতে টোয়েনটি ওয়ান ডেইজ অফ দস্তয়েভস্কি দেখে অনেকে বলেছে সুনীলের সাথে দস্তয়েভস্কির মিল আছে ।'
লেখায় বিবিধ বিষয় ও কথার বিচরণ । 'বিনয়বাবু ভালো জ্যামিতি জানেন, অ্যালজেব্রা জানেন । আর কি জানেন? বিনয়বাবু সবুজ টানাক্ষেতে ফ্রিসবি খেলছিলেন । ফ্রিসবি আকাশের পথে যেয়ে আবার ফেরত আসে- আমি বলি, ফিরে এসো চাকা' । 'ঋত্বিক কি গল্প লিখতেন? ওঁর মতো কবি গল্পই বা লিখতে গেলেন কেন? আর ফিল্মই বা কেন? 'মেঘে ঢাকা তারা'র পাইরেট কপি দেখতে দেখতে, আমাদের অন্তরে হঠাৎ ফ্যানে ঝুলে পড়া মেয়েটির লালা, রক্ত এবং প্রস্রাব এসে পড়লো' । 'হুমায়ুন নিশ্চিত গলায় কথা বলেন, দেশ থেকে আমরা যখন বসন্ত ও পোলিও'র মত ব্যাধি দূর করেছি, তখন সন্ত্রাস কেন নয়?' বা 'কে ভয়ের গলায় চিৎকার করে ওঠে- নোয়াপাড়া হাইস্কুল মাঠে আহসাউল্লাহ মাস্টার রক্তাক্ত শরীরে কাউকে খুঁজছে!' । 'সাইমন যে হাত দিয়ে ছবি আঁকতো, সেই হাত উড়ে যেয়ে প্রধান বিচারপতির উইন্ডসিলে স্টিকার হয়ে লেগে আছে' এরকম এক একটা লাইন এক একটা ঘটনাকে যেন ডকুমেন্টেড করে ।
মামুন হুসাইন এর লেখা এরকম গল্পচ্ছলে বাস্তব ঘটনা আর হাস্যচ্ছলে মানুষের মৌখিক কথাবার্তা ও চিন্তাকে বলে, যার জন্য মামুন হুসাইন হয়ত দ্বিতীয়বার পাঠের দাবি রাখে ।
একেকটা বাক্য কিংবা অনুচ্ছেদ এখানে সেখানে মেলে ধরেছে পৃথক ননফিকশন তুমুল ব্রিকোলাজ। মনে হয়েছে অস্থির ভাতঘুমে ডিসঅরিয়েন্টেড অবস্থায় দেখে যাচ্ছি কোন ডকুমেন্টারি আর হাতড়ে খুঁজে ফিরছি রিমোট; একটু পিছিয়ে দেখে বুঝে নেয়ার তাগিদে।
নিক্রপলিস বাংলা ভাষায় এক অনন্য সংযোজন। বইটি পাঠ করবার জন্য পাঠকের একটা দীর্ঘ প্রস্তুতির দরকার। অন্তত ৫ বছরের নির্বিচ্ছিন্ন সিরিয়াস সাহিত্য পাঠের পর কেউ যদি নিক্রপলিস পড়তে আসে তবেই সে প্রকৃত স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। শুধু পাঠের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ঠ না। নিক্রপলিস ভাষার যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণা পেতে চাইলে পূর্ব প্রস্তুতি দরকার।
বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের ইতিহাস নিক্রপলিস। গুম খুন আর ক্রসফায়ারের দলিল। এটা ডিস্টার্বিং। এটা বর্ণনা করার মত না। এটা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। যেমন এই উপন্যাসেরও কোনো শেষ নাই, শুরু নাই। এটা যাস্ট একটা সময়ের ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করা।
আমাদের বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করলেন মামুন হুসাইন, ইমতিয়ার শামীম, শিমুল মাহমুদ। তাদের আমরা ভুলব না।